(৫৩:৩৩) হে নবী, তুমি কি সেই ব্যক্তিকে দেখেছো যে আল্লাহর পথ থেকে ফিরে গিয়েছে
(৫৩:৩৪) এবং সামান্য মাত্র দিয়ে ক্ষান্ত হয়েছে? ৩৪
(৫৩:৩৫) তার কাছে কি গায়েবের জ্ঞান আছে যে সে প্রকৃত ব্যাপারটা দেখতে পাচ্ছে? ৩৫
(৫৩:৩৬) তার কাছে কি মূসার সহীফাসমূহের কোন খবর পৌছেনি? আর আনুগত্যের পরম পরাকাষ্ঠা দেখিয়েছে ৩৬
(৫৩:৩৭) সে ইবরাহীম তার সহীফাসমূহের কথাও কি পৌছেনি?
(৫৩:৩৮) একথা যে, “কোন বোঝা বহনকারী অন্যের বোঝা বহন করবে না৷ ” ৩৭
(৫৩:৩৯) একথা যে, “মানুষ যে চেষ্টা সাধনা করে তা ছাড়া তার আর কিছুই প্রাপ্য নেই৷ ৩৮
(৫৩:৪০) একথা যে, “তার চেষ্টা-সাধনা অচিরেই মূল্যায়ণ করা হবে৷৩৯
(৫৩:৪১) এবং তাকে তার পুরো প্রতিদান দেয়া হবে৷ ”
(৫৩:৪২) একথা যে, “শেষ পর্যন্ত তোমার রবের কাছেই পৌছতে হবে৷ ”
(৫৩:৪৩) একথা যে, “তিনিই হাসিয়েছেন এবং তিনিই কাঁদিয়েছেন৷ ” ৪০
(৫৩:৪৪) একথা যে, “তিনিই মৃত্যু দিয়েছেন এবং তিনিই জীবন দান করেছেন৷ ”
(৫৩:৪৫) একথা যে, “তিনিই পুরুষ ও নারী রূপে জোড়া সৃষ্টি করেছেন৷ ”
(৫৩:৪৬) এক ফোটা শুক্রের সাহায্যে যখন তা নিক্ষেপ করা হয়৷ ” ৪১
(৫৩:৪৭) একথা যে, “পুনরায় জীবন দান করাও তাঁরই কাজ৷ ”৪২
(৫৩:৪৮) একথা যে, “তিনিই সম্পদশালী করেছেন এবং স্থায়ী সম্পদ দান করেছেন৷ ” ৪৩
(৫৩:৪৯) একথা যে, “তিনিই শে’রার রব৷ ” ৪৪
(৫৩:৫০) আর একথাও যে, তিনিই প্রথম আদকে ৪৫ ধ্বংস করেছেন
(৫৩:৫১) এবং সামূদকে এমনভাবে নিশ্চিহ্ন করেছেন যে, কাউকে অবশিষ্ট রাখেননি৷
(৫৩:৫২) তাদের পূর্বে তিনি নূহের কওমকে ধ্বংস করেছেন৷ কারণ, তারা আসলেই বড় অত্যাচারী ও অবাধ্য লোক ছিল৷
(৫৩:৫৩) তিনি উল্টে দেয়া জনপদকেও উঠিয়ে নিক্ষেপ করেছেন৷
(৫৩:৫৪) তারপর ঐগুলোকে আচ্ছাদিত করে দিল তাই যা (তোমরা জানো যে কি) আচ্ছাদিত করেছিলো৷ ৪৬
(৫৩:৫৫) তাই, ৪৭ হে শ্রোতা, তোমরা তোমাদের রবের কোন কোন নিয়ামতের ব্যাপারে সন্দেহ পোষণ করবে? ৪৮
(৫৩:৫৬) এটি একটি সাবধান বাণী-ইতিপূর্বে আগত সাবধান বাণীসমূহের মধ্য থেকে৷৪৯
(৫৩:৫৭) আগমনকারী মুহূর্ত অতি সন্নিকটবর্তী হয়েছে৷ ৫০
(৫৩:৫৮) আল্লাহ ছাড়া আর কেউ তার প্রতিরোধকারী নেই৷ ৫১
(৫৩:৫৯) তাহলে কি এসব কথা শুনেই তোমরা বিস্ময় প্রকাশ করছো? ৫২
(৫৩:৬০) হাসছো কিন্তু কাঁদছো না? ৫৩
(৫৩:৬১) আর গান-বাদ্য করে তা এড়িয়ে যাচ্ছো? ৫৪
(৫৩:৬২) আল্লাহর সামনে মাথা নত কর এবং তাঁর ইবাদাত করতে থাকো৷ ৫৫
৩৪. কুরাইশদের বড় নেতাদের অন্যতম ওয়ালীদ ইবনে মুগীরার প্রতি ইংগিত করা হয়েছে৷ ইবনে জারীর তাবারী বর্ণনা করেছেন যে, এ ব্যক্তি প্রথমে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দাওয়াত গ্রহণ করতে মনস্থির করে ফেলেছিল৷ কিন্তু তার এক মুশরিক বন্ধু জানতে পারলো যে, সে মুসলমান হওয়ার ইচ্ছা পোষণ করেছে ৷ সে তাকে বললো তুমি পিতৃধর্ম ত্যাগ করো না৷ যদি তুমি আখেরাতের আযাবের ভয় পেয়ে থাকো তাহলে আমাকে এই পরিমাণ অর্থ দিয়ে দাও, তোমাদের পরিবর্তে আমি সেখানকার আযাব ভোগ করার দায়িত্ব গ্রহণ করছি৷ ওয়ালিদ একথা মেনে নিল এবং আল্লাহর পথে পথে প্রায় এসে আবার ফিরে গেল৷ কিন্তু সে তার মুশরিক বন্ধুকে যে পরিমাণ অর্থ দেবে বলে ওয়াদা করেছিল তার সামান্য মাত্র দিয়ে অবশিষ্ট অংশ বন্ধ করে দিল৷ এ ঘটনার প্রতি ইংগিত করার উদ্দেশ্য ছিল মক্কার কাফেরদের একথা জানিয়ে দেয়া যে, আখেরাত সম্পর্কে নিরুদ্বেগ এবং দীনের তাৎপর্য সম্পর্কে অজ্ঞতা তাদেরকে কি ধরনের মূর্খতা ও নির্বুদ্ধিতার মধ্যে নিমগ্ন করে রেখেছে৷
৩৫. অর্থাৎ সে কি জানতে পেরেছে যে, এ আচরণ তার জন্য সত্যিই কল্যাণকর? সে কি জানতে পেরেছে যে, এভাবে কেউ আখেরাতের আযাব থেকে বাঁচতে পারে?
৩৬. হযরত মুসা ও হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালামের সহীফাসমূহে যে শিক্ষা নাযিল করা হয়েছিল তার সংক্ষিপ্তসার এভাবে বর্ণনা করা হচ্ছে৷ হযরত মূসার সহীফাসমূহ বলতে তো তাওরাতকে বুঝানো হয়েছে৷ আর হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালামের পবিত্র গ্রন্থসমূহেও তার কোন উল্লেখ দেখা যায় না৷ কুরআনই একমাত্র গ্রন্থ যার দু'টি স্থানে ইবরাহীমের সহীফার শিক্ষাসমূহের কোন কোন অংশ উদ্ধৃত হয়েছে৷ তার একটি স্থান হলো এটি এবং অপর স্থানটি হলো সূরা আল আ'লার শেষ কয়েকটি আয়াত৷
৩৭. এ আয়াত থেকে তিনটি বড় মূলনীতি পাওয়া যায়৷ এক, প্রত্যেক ব্যক্তি নিজে তার কাজের জন্য নিজের দায়ী৷ দুই, একজনের কাজের দায়দায়িত্ব অন্যের ওপর চাপিয়ে দেয়া যেতে পারে না তবে সেই কাজ সংঘটিত হওয়ার ব্যাপারে তার কোন ভূমিকা থাকলে ভিন্ন করা৷ তিন, কেউ চাইলেও অন্য কারো কাজের দায়দায়িত্ব নিজে গ্রহণ করতে পারে না৷ আর প্রকৃত অপরাধীকে এ কারণে ছেড়ে দেয়া যেতে পারে না যে, তার শাস্তি ভোগ করার জন্য অন্য কেউ এগিয়ে আসছে৷
৩৮. একথাটি থেকেও তিনটি মূলনীতি পাওয়া যায়৷ এক, প্রত্যেক ব্যক্তি যা পরিণতি ভোগ করবে তা তার কৃতকর্মেরই ফল ৷ দুই, একজনের কর্মফল অন্যজন ভোগ করতে পারে না৷ তবে ঐ কাজের পেছনে তার কোন ভূমিকা থাকলে তা ভিন্ন কথা৷ তিন, চেষ্টা-সাধনা ছাড়া কেউ -ই কিছু লাভ করতে পারে না৷

কোন কোন ব্যক্তি এ তিনটি মূলনীতিকে ভুল পন্থায় অর্থনৈতিক ক্রিয়াকাণ্ডের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করে এরূপ সিদ্ধান্তে উপনীত হয় যে, কোন ব্যক্তি নিজের কাষ্টার্জিত আয় () ছাড়া কোন কিছুর বৈধ মালিক হতে পারে না৷ কিন্তু একথা কুরআন মজীদেরই দেয়া কিছু সংখ্যক আইন ও নির্দেশের সাথে সাংঘর্ষিক৷ উদাহরণ হিসেবে উত্তরাধিকার আইনের কথা বলা যেতে পারে ৷ এ আইন অনুসারে কোন ব্যক্তির পরিত্যক্ত সম্পদে বহু সংখ্যক লোক অংশ পায় এবং বৈধ উত্তরাধিকারী হিসেবে স্বীকৃত হয়৷ কিন্তু উত্তরাধিকার হিসেবে প্রাপ্ত এ সম্পদ তার শ্রম দ্বারা অর্জিত নয়৷ শত যুক্তি দেখিয়েও একজন দুগ্ধপোষ্য শিশু সম্পর্কে একথা প্রমাণ করা যাবে না যে, পিতার পরিত্যক্ত সম্পদের তার শ্রমের কোন ভূমিকা আছে৷ অনুরূপভাবে যাকাত ও সাদকার বিধান অনুসারে শুধুমাত্র শরয়ী ও নৈতিক অধিকারের ভিত্তিতে একজনের অর্থ-সম্পদ অন্যেরা লাভ করে থাকে৷ এভাবে তারা ঐ সম্পদের বৈধ মালিকানা লাভ করে৷ কিন্তু সেই সম্পদ সৃষ্টির ব্যাপারে তার শ্রমের কেন অংশ থাকে না৷ অতএব কুরআনের কেন একটি আয়াত নিয়ে বিচার -বিশ্লেষণ করে কুরআনের অন্যান্য শিক্ষার সাথে সাংঘর্ষিক কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা কুরআনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের সম্পূর্ণ পরিপন্থী৷

আবার কিছু সংখ্যক লোক এসব মূলনীতিকে আখেরাতের সাথে সম্পৃক্ত ধরে নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করে যে, এসব মূলনীতি অনুসারে এক ব্যক্তির কাজ কি কোন অবস্থায় অপর ব্যক্তির জন্য কল্যাণকর হতে পারে?এক ব্যক্তি যদি অপর ব্যক্তির জন্য কিংবা তার পরিবর্তে কোন আমল করে তাহলে তার পক্ষ থেকে তা গ্রহণ করা যেতে পারে? এক ব্যক্তির আমল কি অন্য কোন ব্যক্তিকে দিয়ে দেয়া সম্ভব? এসব প্রশ্নের জবাব যদি নেতিবাচক হয় তাহলে "ইসালে সওয়াব" বদলি হজ্জ ইত্যাদি সবই না জায়েজ হয়ে যায়৷ এমন কি অন্যের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করাও অর্থহীন হয়ে পড়ে৷ কেননা যার জন্য দোয়া করা হবে সেই দোয়াও তার নিজের কাজ নয়৷ তবে শুধুমাত্র মু'তযিলারা ছাড়া ইসলামের অনুসারীদের মধ্য থেকে আর কেউ -ই এ চরম দৃষ্টিভঙ্গী গ্রহণ করেনি৷ শুধু তারাই এ আয়াতের এ অর্থ গ্রহণ করে থাকে যে, এক ব্যক্তির চেষ্টা -সাধনা কোন অবস্থায়ই অন্যের জন্য কল্যাণকর হতে পারে ৷ অপরদিকে আহলে সুন্নাত একজনের দোয়া অন্যের জন্য কল্যাণকর হওয়ার বিষয়টা সর্বসম্মতভাবে স্বীকার করে৷ কেননা, কুরআন থেকেই তা প্রমাণিত ৷ "ইসালে সাওয়াব" এবং অন্য কারো পক্ষ থেকে কৃত কোন নেক কাজের কল্যাণকর হওয়ার ব্যাপারে তাদের মধ্যে মৌলিক দিয়ে কোন পার্থক্য নেই, বরং বিস্তারিত ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে মতানৈক্য বিদ্যমান৷

(১) ইসলে সওয়াব হলো, এক ব্যক্তির কোন নেক কাজ করে তার সওয়াব ও প্রতিদান অপর কোন ব্যক্তিকে দেয়া হোক বলে আল্লাহর কাছে দোয়া করা৷ এ মাসয়ালা সম্পর্কে ইমাম মালেক (র) ও ইমাম শাফেয়ী (র) বলেনঃ নিরেট শারীরিক ইবাদত যেমনঃ নামায, রোযা, ও কুরআন তিলাওয়াত ইত্যাদির সওয়াব অন্যেরা পেতে পারে না৷ তবে আর্থিক ইবাদত যেমনঃ সাদকা কিংবা আর্থিক ও শারীরিক উভয়টির সংমিশ্রিত ইবাদাত যেমনঃ হজ্জ-এ সবের সওয়াব অন্য পেতে পারে৷ কারণ, মূলনীতি হিসেবে এটা অবিসম্পাদিত যে, এক ব্যক্তির আমল অনের কল্যাণে আসবে না৷ তবে, অনেক সহীহ হাদীসের ভাস্য অনুসারে যেহেতু সাদকার সওয়াব পৌছানো যায় এবং বদলি হজ্জও করা যায়, তাই আমরা এ প্রকৃতির ইবাদতের "ইসালে সওয়াব" বা সওয়াব পৌছানোর বৈধতা স্বীকার করছি৷ পক্ষান্তরে হানাফী আলেমদের রায় হলো, মানুষ তাঁর সব রকম নেক আমলের সওয়াব অপরকে দান করতে পারে- তা নামায হোক বা রোযা, কুরআন তেলাওয়াত হোক বা যিকর কিংবা সাদকা হোক বা হজ্জ ও উমরা হোক৷ এর স্বপক্ষে যুক্তি হচ্ছে শ্রমের কাজ করে মানুষ যেমন মালিককে বলতে পারে, এর পারিশ্রমিক আমার পরিবর্তে অমুক ব্যক্তিকে দিয়ে দেয়া হোক৷ তেমনি কোন নেক কাজ করে সে আল্লাহর কাছে এ বলে দোয়া করতে পারে যে কাজের প্রতিদান আমার পক্ষ থেকে অমুক ব্যক্তিকে দিয়ে দেয়া হোক৷ এ ক্ষেত্রে কতিপয় নেকীর কাজকে বাদ দিয়ে অন্য কতিপয় নেকীর কাজের মধ্যে একে সীমিত রাখার কোন যুক্তি সংগত কারণ নেই৷ এ বিষয়টি বহু সংখ্যক হাদীস দ্বারা প্রমাণিতঃ

বুখারী, মুসলিম, মুসনাদে, আহমাদ, ইবনে মাজা, তাবারানী (ফীল -আওসাত) মুসতাদরিক এবং ইবনে আবী শায়বাতে হযরত আয়েশা, হযরত আবু হুরাইরা, হযরত জাবের ইবনে আবদুল্লাহ, হযরত আবু রাফে. হযরত আবু তালহা আনসারী এবং হুযাইফা ইবনে উসাইদুল গিফারী, কর্তৃক সর্বসম্মতভাবে বর্ণিত হয়েছে যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দুটি ভেড়া নিয়ে তার একি নিজের ও নিজের পরিবারের সবার পক্ষ থেকে এবং অপরটি তাঁর উম্মতের পক্ষ থেকে কুরবানী করেছেন৷

মুসলিম, বুখারী, মুসনাদে আহমাদ, আবু দাউদ, এবং নাসায়ীতে হযরত আয়েশা কর্তৃক বর্ণিত হয়েছে যে, এক ব্যক্তি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বললো, আমার মা অকস্মাত মারা গিয়েছেন৷ আমার বিশ্বাস, যদি তিনি কথা বলার সুযোগ পেতেন তাহলে অবশ্যই সাদকা করার জন্য বলতেন৷ এখণ আমি যদি তাঁর পক্ষ থেকে সাদকা করি তাহলে তিনি কি তার প্রতিদান পাবেন? নবী (সা) বললেন, হ্যাঁ৷

মুসনসাদে আহমাদ হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস থেকে বর্ণিত হয়েছে যে তার দাদা আস ইবনে ওয়ায়েল জাহেলী যুগে একশত উট কুরবানী করার মানত করেছিলেন৷ তার চাচা হিশাম ইবনুল আস তার অংশের পঞ্চাশটি উট কুরবানী করে দিয়েছেন৷ হযরত আমর ইবনুল আস রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞেস করলেন, তিনি কি করবেন৷ নবী (সা) বললেনঃ তোমার পিতা যদি তাওহদীদের অনুসারী হয়ে মারা যারা গিয়ে থাকেন তাহলে তুমি তার পক্ষ থেকে রোযা রাখো অথবা সাদকা করো৷ এতে তার কল্যাণ হবে৷

মুসনাদে আহমাদ, আবু দাউদ, নাসায়ী ও ইবনে মাজাতে হযরত হাসান বাসরীর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে যে, হযরত সা'দ ইবনে উবাই রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বললেনঃ আমার মা ইনতিকাল করেছেন? আমি কি তাঁর পক্ষ থেকে সাদকা করবো? তিনি বললেনঃ হ্যাঁ৷ বুখারী, মুসলিম, মুসনাদে আহমাদ, নাসায়ী, তিরমিযী, আবু দাউদ, ইবনে মাজা প্রভৃতি হাদীসগ্রন্থে হযরত আয়েশা (রা) , হযরত আবু হুরাইরা (রা) এবং হযরত ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত আরো কিছু সংখ্যক হাদীস আছে৷ ঐ সব হাদীসেও রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে সাদকা করার অনুমতি দিয়েছেন এবং বলেছেন তা মৃত ব্যক্তির জন্য কল্যাণকর৷

দারু কুতনীর বর্ণিত হয়েছেঃ এক ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞেস করলো, আমি আমার পিতা-মাতার সেবার তাঁদের জীবদ্দশায়ও করে যাচ্ছি৷ তাঁদের মৃত্যুর পর কিভাবে সেবা করবো? তিনি বললেনঃ "তাদের মৃত্যুর পর তোমার নামাযের সাথে তাদের জন্যও নামায পড়বে, তোমার রোযার সাথে তাদের জন্য রোযা রাখবে এটাও তাদের সেবায় অন্তরভুক্ত৷ " দারু কুতনীতে হযরত আলী (রা) থেকে আরো একটি হাদীস বর্ণিত হয়েছে৷ উক্ত হাদীসে তিনি বলেনঃ নবী (সা) বলছেন কোন ব্যক্তি যদি কবরস্থানের পাশ দিয়ে অতিক্রম করে এবং এগার বর কুল হুয়াল্লাহু আহাদ পড়ে ঐ কবরস্থানের মৃতদের জন্য তাহলে ওখানে যত মৃত আছে তাদের সকলকে সওয়াব দান করা হবে৷ একটি আরেকটির সমর্থক এ ধরনের বিপুল সংখ্যক হাদীসএ বিষয় স্পষ্ট করে যে "ইসালে সওয়াব" বা সওয়ার পৌছানো শুধু সম্ভবই নয়, বরং সব রকম ইবাদাত এবং নেকীর কাজের সওয়াবর পৌছানো যেতে পারে৷ এ জন্য বিশেষ ধরনের আমল বা ইবাদাত নিদিষ্ট নেই৷ তবে এ প্রসংগে চারটি বিষয় খুব ভালাভাবে বুঝে নিতে হবেঃ

একঃ কেবল এমন আমলের সওয়াবই পৌছানো যেতে পারে যা নিছক আল্লাহর উদ্দেশ্যে শরীয়াতের নিয়ম-কানুন মাফিক করা হয়েছে৷ তা না হলে একথা স্পষ্ট যে, গায়রুল্লাহর জন্য কিংবা শরীয়াতের বিধি-বিধানের পরিপন্থী কোন কাজ বা ইবাদাত করা হলে তা অন্য কারো জন্য দান করা তো দূরের কথা আমলকারী নিজেই তার কোন সওয়াব পেতে পারে না৷

দুইঃ যেসব ব্যক্তি আল্লাহ তা'আলার দরবারে সৎলোক হিসেবে মেহমান হয়ে আছে তারা তো নিশ্চিতভাবেই এ সওয়াবের উপহার লাভ করবেন৷ কিন্তু যারা সেখানে অপরাধী হিসেবে হাজতে বন্দী আছে তাদের কাছে কোন সওয়াব পৌছবে বলে আশা করা যায় না৷ আল্লাহর মেহমানদের কাছে তো উপহার পৌছতে পারে৷ কিন্তু আল্লাহর বন্দীদের কাছে উপহার পৌছানো কোন আশা নেই৷ কোন ব্যক্তি যদি ভুল বুঝার কারণে তার জন্য ইসালে সওয়াব করে তাহলে তার সওয়াব নষ্ট হবে না, বরং অপরাধীর কাছে পৌছার বদলে মূল আমলকারীর কাছে ফিরে আসবে৷ ঠিক মানি অর্ডার যেমন প্রাপকের হাতে না পৌছলে প্রেরকের কাছে ফিরে আসে৷

তিনঃ সওয়াব পৌছানো সম্ভব কিন্তু আযাব পৌছানো সম্ভব নয়৷ অর্থাৎ কেউ নেককাজ করে অন্য কাউকে তার সওয়াব দান করবে এটা সম্ভব কিন্তু গোনাহর কাজ করে তার আযাব অন্য কাউকে দান করবে আর তা তার কাছে পৌছে যাবে, তা সম্ভব নয়৷

চারঃ নেক কাজের দু'টি কল্যাণকর দিক আছে৷ একটি হচ্ছে, নেক কাজের সে শুভ ফলাফল যা আমলকারীর ব্যক্তিসত্তায় ও চরিত্রের প্রতিফলিত হয় এবং যার কারণে সে আল্লাহর পুরস্কার ও প্রতিদান লাভের যোগ্য বলে বিবেচিত হয়৷ দ্বিতীয়ত, তার সেই সব প্রতিদান যা তাকে আল্লাহ তা'আলা পুরস্কার হিসেবে দান করেন৷ এর প্রথমটির সাথে ইসালে সাওয়াবের কোন সম্পর্ক নেই, শুধু দ্বিতীয়টির সাথে এর সম্পর্ক৷ এর উদাহরণ হলোঃ কোন ব্যক্তি শরীর চর্চার মাধ্যমে কুস্তিতে দক্ষতা লাভ করে৷ এভাবে তার মধ্যে যে শক্তি ও দক্ষতা সৃষ্টি হয় তা সর্বাবস্থায় তার নিজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, তা অন্য কাউকে দেয়া যায় না৷ অনুরূপভাবে সে যদি কোন রাজ দরবারের কর্মচারী হয় এবং কুস্তিগীর হিসেবে তার জন্য একটি বেতন নির্দিষ্ট থাকে তাহলে সে বেতনও শুধু-সেই পাবে৷ অন্য কাউকে তা দেয়া হবে না৷ তবে তার কর্মতৎপরতায় খুশী হয়ে তার পৃষ্ঠপোষক তাকে যেসব পুরস্কার ও উপহার দেবে সেগুলো সম্পর্কে সে আবেদন করতে পারে যে তা তার শিক্ষক, মাতা-পিতা কিংবা অন্য কল্যাণকামী ও হিতাকাংখীদের দেয়া হোক৷ নেক কাজের ব্যাপারটাও তাই৷ এর আত্মিক কল্যাণসমূহ হস্তান্তর যোগ্য নয়৷ তার প্রতিদানও কাউকে হস্তান্তর করা যায় না৷ কিন্তু তার পুরস্কার ও সওয়াব সম্পর্কে সে আল্লাহর তা'আলার কাছে এ বলে দোয়া করতে পারে যে, তা তার কোন ঘনিষ্ঠ বন্ধু কিংবা কোন কল্যাণকামীকে দান করা হোক৷ এ কারণে একে "ইসালে জাযা" প্রতিদান পৌছানো নয়, "ইসালে সওয়াব" সওয়াব পৌছানো বলা হয়ে থাকে৷

(২) এক ব্যক্তির চেষ্টা ও তাৎপরতা অন্য কোন ব্যক্তির জন্য উপকার হওয়ার আরেকটি রূপ হচ্ছে, ব্যক্তি হয় অন্য কারোর ইচ্ছা বা ইংগিতে তার জন্য কোন নেক কাজ করবে৷ কিংবা তার ইচ্ছা বা ইংগিত ছাড়াই তার পক্ষ থেকে এমন কোন কাজ করবে যা মূলত ঐ ব্যক্তির জন্য ওয়াজিব ছিল কিন্তু সে নিজে তা আদায় করতে পারেনি৷ এ ব্যাপারে হানাফী ফিকাহবিদদের মত হলোঃ ইবাদাত তিন, প্রকারঃ এক, নিরেট, দৈহিক ইবাদাত, যেমনঃ নামায৷ দুই, নিরেট আর্থিক ইবাদাত, যেমনঃ যাকাত, এবং তিন, দেহ ও অর্থের সমন্বিত ইবাদাত৷ যেমনঃ হজ্জ৷ এসব ইবাদাতের মধ্যে প্রথম প্রকারের ইবাদাতে কোন রকম প্রতিনিধিত্ব চলে না৷ যেমন এক ব্যক্তির প্রতিনিধি হিসেবে আরেকট ব্যক্তির নামায পড়তে পারে না৷ দ্বিতীয় প্রকারের ইবাদাতের প্রতিনিধিত্ব চলতে পারে৷ যেমনঃস্বামী স্ত্রীর অলঙ্কারাদির যাকাত আদায় করতে পারে৷ তৃতীয় প্রকারের ইবাদতে প্রতিনিধিত্ব নিজের দায়িত্ব তখনি চলতে পারে যখন মূল ব্যক্তি যার পক্ষ থেকে কোন কাজ করা হচ্ছে, নিজের দায়িত্ব নিজে পালনে সাময়িকভাবে নয়, বরং স্থায়ীভাবে অক্ষম হয়ে পড়ে৷ যেমন, বদলি হজ্জ শুধু এমন ব্যক্তির পক্ষ থেকে হতে পারে যে, নিজে হজ্জ পালন করতে যেতে অক্ষম এবং কখনো হজ্জ পালনে যেতে সক্ষম হওয়ার আশাও করা যায় না৷ মালেকী ও শাফেয়ী মাযাহাবের অনুসারীগণও এ মতের সমর্থক৷ তবে বদলী হজ্জের জন্য ইমাম মালেক শর্ত আরোপ করেছেন যে, বাপ যদি ছেলেকে এ মর্মে অসীয়াত করে থাকে যে তার মৃত্যুর পর তার ছেলে তার পক্ষ থেকে হজ্জ করবে তাহলে তা জায়েজ হবে অন্যথায় নয়৷ তবে এব্যাপারে হাদীসের স্পষ্ট বক্তব্য হচ্ছে বাপের ইংগিত বা অসীয়ত থাক বা না থাক -ছেলে তার পক্ষ থেকে বদলি হজ্জ করতে পারে৷

ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত আছে যে, খাস'আম গোত্রের এক মহিলা রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বললোঃ আমার পিতার ওপর হজ্জের আদেশ এমন অবস্থায় প্রযোজ্য হয়েছে যখন তিনি অত্যন্ত বৃদ্ধ হয়ে পড়েছেন৷ তিনি উটের পিঠে বসে থাকতে পারেন না৷ নবী (সা) বললেনঃ "তার পক্ষ থেকে তুমি হজ্জ আদায় করো৷ (বুখারী, মুসলিম, আহমাদ, তিরমিযী, নাসয়ী) ৷ হযরত আলীও (রা) প্রায় অনুরূপ বিষয়বস্তু সম্বলিত হাদীস বর্ণনা করেছেন৷ " (আহমাদ, তিরমিযী) ৷

হযরত আবদুল্লাহ (রা) যুবায়ের খাস'আম গোত্রেরই একজন পুরুষের কথা উল্লেখ করে বলেন যে, সে ও তার বৃদ্ধ পিতা সম্পর্কে এ একই প্রশ্ন করেছিলো৷ নবী (সা) তাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ তুমিই কি তার বড় ছেলে৷ সে বললো হ্যাঁ৷ তিনি বললেনঃ () তুমি কি মনে করো, যদি তোমার পিতা ঋণী থাকে আর আর তুমি তা আদায় করে দাও তাহলে তার পক্ষ থেকে তা আদায় হয়ে যাবে? সে বললোঃ জি, হ্যাঁ৷ তিনি বললেন তাহলে অনুরূপভাবে তুমি তার পক্ষ থেকে হজ্জও আদায় করো৷ (আহমাদ নাসায়ী) ৷

ইবনে আব্বাস বলেনঃ জুহাইনা গোত্রের এক মহিলা এসে বললোঃ আমার মা হজ্জ করার মানত করেছিলেন৷ কিন্তু হজ্জ আদায় করার আগেই তিনি মারা গেছেন৷ এখন আমি কি তাঁর পক্ষ থেকে হজ্জ আদায় করতে পারি? রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জবাব দিলেনঃ তোমার মা যদি ঋণগ্রস্ত হতো তাহলে তুমি কি তা পরিশোধ করতে পারতে না? একইভাবে তোমারা আল্লাহর হকও আদায় করো৷ আল্লাহর সাথে কৃত ওয়াদা পালন করার মাধ্যমে আল্লাহর অধিকার প্রদান করা সবচেয়ে বেশী জরুরী কাজ৷ (বুখারী, নাসায়ী) বুখারী ও মুসলিমে আরো একটি রেওয়ায়াত হচ্ছে, এক ব্যক্তি এসে তার বোন সম্পর্কে প্রশ্ন করলো যা ওপরে উল্লেখ করা হয়েছে৷ নবী (সা) তাকেও এ একই জবাব দিলেন৷

এসব বর্ণনা থেকে অর্থ ও দেহের সমন্বিত ইবাদাতসমূহে প্রতিনিধিত্বের স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়৷ এরপর থাকে নিরেট দৈহিক ইবাদাতসমূহ৷ এ বিষয়ে এমন কিছু হাদীস আছে যা থেকে এ প্রকৃতির ইবাদাতসমূহের ক্ষেত্রেও প্রতিনিধিত্বের বৈধতার প্রমাণ পাওয়া যায়৷ যেমন ইবনে আব্বাসের (রা) এই বর্ণনা যে, জুহাইনা গোত্রের এক মহিলা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞেস করলোঃ আমার মা রোযা মানত করেছিলেন৷ কিন্তু তা পূরণ করার পূর্বেই তিনি মারা গিয়েছেন৷ আমি কি তার পক্ষ থেকে রোযা রাখতে পারি? নবী (সা) বললেনঃতার পক্ষ থেকে রোযা রাখো৷, (বুখারী মুসলিম, আহমাদ, নাসায়ী, আবু দাউদ) ৷ হযরত বুরাইদা (রা) বর্ণিত এ হাদীস থেকেও প্রমাণ পাওয়া যায় যে, এক মহিলা তার মা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলো যে, তার ওপর এক মাসের (অথবা আরেকটি বর্ণনা অনুসারে দুমাসের ) রোযা ওয়াজিব ছিল৷ আমি কি তার পক্ষ থেকে এ রোযা পালন করবো? নবী (সা) তাকেও অনুমতি দিলেন৷ (মুসলিম, আহমাদ, তিরমিযী আবু দাউদ) ৷ তাছাড়া হযরত আয়েশা (রা) বর্ণিত হাদীসেও নবী (সা) বলেছেনঃ () কেউ যদি মারা যায় আর তাঁর ওপর কিছু রোযা থাকে তাহলে তার পক্ষ থেকে তার অভিভাবক সেই রোযা রাখবে (বুখারী, মুসলিম, আহমাদ) বাযযার বর্ণিত হাদীসে নবীর (সা) কথা উল্লেখিত হয়েছে এরূপঃ অর্থাৎ তার অভিভাবক ইচ্ছা করলে তার পক্ষ থেকে রোযা রাখবে৷ এসব হাদীসের ভিত্তিতে আসহাবুল হাদীস, ইমাম আওযায়ী এব জাহেরিয়ারগণ দৈহিক ইবাদাতসমূহেও প্রতিনিধিত্ব জায়েজ হওয়ার সমর্থক৷ কিন্তু ইমাম আবু হানিফা, ইমাম মালেক, ইমাম শাফেয়ী, এবং ইমাম যায়েদ ইবনে আলীর ফতোয়া হচ্ছে, মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে রোযা রাখা যেতে পারে না৷ ইমাম আহমাদ, ইমাম লাইস এবং ইসহাক ইবনে রাহবিয়া বলেনঃ এটা কেবল তখনই করা যেতে পারে যখন মৃত ব্যক্তি তা মানত করেছে কিন্তু পূরণ করতে পারিনি৷ বিরোধিদের যুক্তি হলো, যেসব হাদীসে থেকে এর বৈধতার প্রমাণ পাওয়া যায় তার বর্ণনাকারীগণ নিজেরাই ঐ সব হাদীসের পরিপন্থী ফতোয়া দিয়েছেন৷ নাসায়ী ইবনে আব্বাসের ফতোয়া নিম্নোক্ত ভাষায় উদ্ধৃত করেছেনঃ () কোন ব্যক্তি যেন কারো পক্ষ থেকে নামায না পড়ে এবং রোযাও না রাখে৷ আবদুর রাযযাকের বর্ণনা অনুসারে হযরত আয়েশার ফতোয়া হলো () "তোমাদের মৃতদের পক্ষ থেকে রোযা রেখো না, খাবার খাইয়ে দাও৷ " আবদুর রাযযাক আবদুল্লাহ ইবনে উমর থেকেও একথাই উদ্ধৃত করেছেন, অর্থাৎ মৃতের পক্ষ থেকে যেন রোযা রাখা না হয়৷ এ থেকে জানা যায় যে, প্রথম প্রথম শারীরীক ইবাদাতসমূহেও প্রতিনিধিত্বের অনুমতি ছিল৷ কিন্তু শেষ পর্যন্ত স্থিরকৃত হয় যে, এটা করা জায়েজ নয়৷ অন্যথায় কি করে সম্ভব যে যারা রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এসব হাদীস বর্ণনা করেছেন তারা নিজেরাই আবার তার পরিপন্থী ফতোয়া প্রদান করবেন?

এক্ষেত্রে একথা ভালভাবে বুঝতে হবে, যে প্রতিনিধিত্বমূলকভাবে কোন ফরয পালন কেবল তাদের জন্যই উপকারী হতে পারে যারা নিজে ফরয আদায় আগ্রহী কিন্তু বাস্তব কোন অসুবিধার কারণে অপারগ হয়ে পড়েছেন৷ তবে সমর্থ ও সক্ষম হওয়া সত্ত্বেও কোন ব্যক্তি যদি ইচ্চাকৃতভাবে হজ্জ আদায় করা থেকে বিরত থাকে এবং এ ফরযটি আদায় করা সম্পর্কে তার মনে কোন অনুভূমি পর্যন্ত না থেকে থাকে তার জন্য বদলি হজ্জ যতই করা হোক না কেন তা তার জন্য কল্যাণকর হবে না৷ এটা ঠিক যেন কোন ব্যক্তি কর্তৃক অপর কোন ব্যক্তির ঋণের টাকা আত্মসাত করা এবং মৃত্যু পর্যন্ত পরিশোধ করার ইচ্ছা না থাকা৷ পরবর্তী সময়ে তার পক্ষ থেকে যদি প্রতিটি পাইও পরিশোধ করা হয় তবুও আল্লাহ তা'আলার দৃষ্টিতে সে ঋণ আত্মসাতকারী হিসেবেই গণ্য হবে৷ অপরের আদায় করে দেয়ায় কেবল সেই ব্যক্তিই নিষ্কৃতি পেতে পারে যে তার জীবদ্দশায় ঋণ আদায়ে আগ্রহী ছিল৷ কিন্তু কোন অসুবিধার কারণে আদায় করতে পারেনি৷
৩৯. অর্থাৎ আখেরাতে মানুষের কাজ-কর্মের যাঁচাই বাছাই হবে এবং কে কি কাজ করে এসেছে তা দেখা হবে৷ আয়াতের এ অংশটি যেহেতু পূর্ববর্তী অংশের পরপরই বলা হয়েছে তাই এ থেকে স্বতই একথা পরিস্কার হয়ে যায় যে, আখেরাতের প্রতিদান ও অর্থনৈতিক মূলনীতি হিসেবে পেশ করে থাকে তাদের কথা ঠিক নয়৷ কুরআন মজীদের কোন আয়াতের এমন কোন অর্থ গ্রহণ করা ঠিক নয় যা পূর্বাপর প্রসংগের পরিপন্থী এবং কুরআনের অন্যান্য বক্তব্যের সাথে সাংঘর্ষিক৷
৪০. অর্থাৎ আনন্দ ও দুঃখের কার্যকারণ তার পক্ষ থেকেই সৃষ্টি হয়ে থাকে৷ ভাল ও মন্দ ভাগ্যের মূলসূত্র তাঁরই হাতে৷ কারো ভাগ্যে যদি আরাম ও আনন্দ জুটে থাকে তাহলে তা তাঁর দানই হয়েছে৷ আবার কেউ বিপদাপদ ও দুঃখ-কষ্টের মুখোমুখি হয়ে থাকে তাও তাঁর ইচ্ছায়ই হয়েছে৷ এ বিশ্ব-জাহানে এমন আর কোন সত্তা নেই ভাগ্যের ভাঙা গড়ায় যার কোন হাত আছে৷
৪১. ব্যাখ্যার জন্য দেখুন, তাফহীমূল কুরআন, আর রূম, টীকা ২৭ থেকে ৩০;আশ শূরা টীকা ৭৭৷
৪২. ওপরের দু'টি আয়াতের সাথে এ আয়াতটি মিলিয়ে পড়লে বুঝা যায়, বাক্যের বিন্যাস থেকে আপনা আপনি মৃত্যুর পরের জীবনের প্রমাণও পাওয়া যাচ্ছে৷ যে আল্লাহ মৃত্যু এবং জীবন দান করার ক্ষমতা রাখেন, যিনি একফোটা নগণ্য শুক্র দিয়ে মানুষের মত একটি সৃষ্টিকে তৈরী করেন, বরং সৃষ্টির একই উপাদন ও একই সৃষ্টির পদ্ধতি থেকে নারী ও পুরুষের দু'টি স্বতন্ত্র শ্রণী সৃষ্টি করে দেখান, তার জন্য মানুষকে পুনরায় সৃষ্টি করা কোন কঠিন কাজ নয়৷
৪৩. মূল আয়াতে () শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে৷ ভাষাবিদ ও মুফাসসিরগণ এর বিভিন্ন অর্থ বর্ণন করেছেন৷ কাতাদা বলেনঃ ইবনে আব্বাস এর অর্থ বলেছেন () সম্মত করে দিয়েছেন৷ ইবনে আব্বাস থেকে ইকরিমা এর অর্থ বর্ণনা করেছেন () সন্তুষ্ট করে দিয়েছেন৷ ইমাম রাযী বলেনঃ মানুষকে তার প্রয়োজনের অতিরিক্ত যা-ই দেয়া হয়ে থাকে তাকেই () বলে৷ আবু উবায়দা এবং আরো কিছু সংখ্যক ভাষাভিজ্ঞের মতে () শব্দটির উদ্ভব () শব্দ থেকে৷ এর অর্থ অবশিষ্ট ও সংরক্ষিত থাকার মত সম্পদ৷ যেমনঃ ঘর-বাড়ী, জমিজমা, বাগান, গবাদিপশু ইত্যাদি৷ ইবনে যায়েদ এসব অর্থ থেকে ভিন্ন অর্থ গ্রহণ করেছেন৷ তিনি বলেন () শব্দটি এখানে () দরিদ্র করে দিয়েছে অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে৷ এভাবে আয়াতের অর্থ দাঁড়ায় তিনি যাকে ইচ্ছা সম্পদশালী করেছেন এবং যাকে ইচ্ছা দরিদ্র বানিয়েছেন৷
৪৪. শে'রা আকাশের উজ্জ্বলতম নক্ষত্র৷ আরবীতে একে () প্রভৃতি নামে উল্লেখ করা হয়ে থাকে৷ ইংরেজী ভাষায় Sirius, Dog star এবং Canis Majoris বলা হয়৷ এটি সূর্যের চেয়েও ২৩ গুণ বেশী উজ্জ্বল৷ কিন্তু পৃথিবী থেকে এর দূরত্ব আট আলোকবর্ষেরও বেশী৷ তাই একে সূর্যের চেয়ে ছোট ও কম উজ্জ্বল দেখা যায়৷ মিসরবাসীরা এর উপাসনা করতো৷ কারণ এর উদয়কালে নীল নদে জোয়ার ও প্লাবন হতো৷ সুতরাং তারা মনে করতো, এর উদয়ের প্রভাবেই এরূপ হয়েছে৷ জাহেলী যুগে আরবদেরও বিশ্বাস ছিল যে, এ নক্ষত্র মানুষের ভাগ্যের ওপর প্রভাব বিস্তার করে৷ সেই কারণে এটি আরবদের উপাস্য দেবতাদের মধ্যে অন্তরভুক্ত ছিল এবং বিশেষ করে কুরাইশদের প্রতিবেশী খুজা'আ গোত্র এর উপাসনার জন্য বিখ্যাত ছিল৷ আল্লাহ তা'আলার বক্তব্যের অর্থ হচ্ছে, শে'রা নক্ষত্র তোমাদের ভাগ্য পড়ে না বরং তার রব গড়ে থাকেন৷
৪৫. প্রথম আদ অর্থ প্রাচীন আদ জাতি যাদের কাছে হযরত হূদ আলাইহিস সালামকে পাঠানো হয়েছিল৷ হযরত হূদকে (আ) অস্বীকার করার অপরাধে এ জাতি আল্লাহর আযাবের শিকার হলে যারা তার ওপর ঈমান এনেছিল কেবল তারাই রক্ষা পায়৷ এদের বংশধরদেরকে ইতিহাসে পরবর্তীকালে আদ বা দ্বিতীয় আদ বলা হয়ে থাকে৷
৪৬. উল্টেয়ে দেয়া জনপদসমূহ অর্থ লূতের কওমের জনপদসমূহ৷ আর "আচ্ছন্ন করে দিয়েছিল তাদের ওপর যা কিছু আচ্ছন্ন করে দিয়েছিলো" অর্থ সম্ভবত মরু সাগরের পানি৷ তাদের জনপদসমূহ মাটিতে ডুবে যাওয়ার পর এ সমুদ্রের পানি তার ওপর ছড়িয়ে পড়েছিলো৷ আজ পর্যন্ত তা এ অঞ্চল প্লাবিত করে আছে৷
৪৭. কোন কোনমুফাসসিরের মতে একথাটিও ইবরাহীম ও মূসার সহীফাসমূহের একটি বাক্যাংশ৷ কিন্তু কোন কোন মুফাসসিরের মতে () পর্যন্তই সহীফাসমূহের বাক্য শেষ হয়েছে এবং এখান থেকে অন্য বিষয় শুরু হচ্ছে৷ পরবর্তী কথার প্রতি লক্ষ করলে প্রথমোক্ত বক্তব্যই সঠিক বলে মনে হয়৷ কারণ, পরবর্তী এই বাক্যঃ "এটি একটি সাবধান বাণী -ইতিপূর্বে আগত সাবধানবাণীসমূহের মধ্য থেকে'এ বিষয়ের প্রতিই ইংগিত করে যে, পূর্ববর্তী সবগুলো বাক্যই হযরত ইবরাহীম (আ) ও মূসার (আ) সহীফাসমূহে উদ্ধৃত হয়েছে৷ আর এগুলো সবই পূর্বেকার সাবধান বাণীসমূহের অন্তরভুক্ত৷
৪৮. মূল আয়াতে () শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে যার অর্থ সন্দেহ পোষন এবং ঝগড়া করা উভয়টিই৷ এখানে প্রত্যেক শ্রোতাকে সম্বোধন করা হয়েছে৷ যে ব্যক্তিই এ বাণী শুনছে তাকেই সম্বোধন করে বলা হচ্ছে, আল্লাহ তা'আলার নিয়ামতসমূহ অস্বীকার করা এবং তা নিয়ে নবী -রসূলেদের সাথে ঝগড়ায় লিপ্ত হওয়ার যে পরিণতি মানবেতিহাস দেখেছে তা সত্ত্বেও কি তুমি সেই নির্বুদ্ধিতার কাজ করবে? অতীত জাতিসমূহও তো এ একই সন্দেহ পোষন করেছিলো যে, তারা এ পৃথিবীতে যেসব নিয়ামত ভোগ করছে তা একমাত্র আল্লাহর নিয়ামত না তা সরবরাহের কাজে অন্য কেউ শরীক আছে? অথবা এসব কারে সরবরাহকৃত নিয়ামত নয়, বরং আপনা থেকেই পাওয়া গিয়েছে৷ এ সন্দেহের কারণেই তারা নবী -রসূলদের বিরোধিতায় লিপ্ত হয়েছিল৷ নবী -রসূলগণ তাদের বলতেন, আল্লাহ এবং এক আল্লাহই তোমাদেরকে এসব নিয়ামতের সবগুলো দান করেছেন৷ তাই তোমাদের উচিত তাঁরই প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়া এবং তাঁরই দাসত্ব করা৷ কিন্তু তারা একথা মানতো না এবং এ বিষয়টিই নিয়েই নবী -রসূলদের সাথে বিবাদে লিপ্ত হতো৷ এখন কথা হলো, এসব জাতি তাদের এ সন্দেহ ও বিবাদের কি পরিণাম দেখেছে তাকি তুমি ইতিহাসে দেখতে পাও না? যে সন্দেহ সংশয় ও বিবাদ অন্যদের জন্য ধ্বংসাত্মক প্রমাণিত হয়েছে তুমিও কি সেই সন্দেহ -সংশয় ও ঝগড়ায় লিপ্ত হবে? এ ক্ষেত্রে আরো লক্ষ রাখতে হবে যে, আদ সামূদ এবং নূহের কওমের লোকেরা হযরত ইবরাহীমের (আ) পূর্বে অতিবাহিত হয়েছিলো৷ এবং লূতের কওম হযরত ইবরাহীমের (আ) সময়েই আযাবে নিপতিত হয়েছিল৷ তাই এ বাক্যটি যে ইবরাহীমের সহীফার অংশ সে ব্যাপারে কোন অস্পষ্টতা বা জটিলতা নেই৷
৪৯. মূল কথাটি হল () ৷ এ আয়াতটির ব্যাখ্যায় মুফাসসিরগণের তিনটি মত হলো৷ এক () অর্থ মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম৷ দুই, এর অর্থ কুরআন৷ তিন, এর অর্থ অতীতের ধ্বংস প্রাপ্ত জাতিসমূহের পরিণতি যা পূর্ববর্তী আয়াতসমূহে বর্ণনা করা হয়েছে৷ পরবর্তী বিষয়বস্তু বিচারে আমাদের মতে এ তৃতীয় ব্যাখ্যাই অগ্রাধিকার পাওয়ার যোগ্য৷
৫০. অর্থাৎ একথা মনে করো না যে, চিন্তা-ভাবনা করার জন্য এখনো অনেক সময় আছে৷ তাই এসব কথা নিয়ে এখনই গুরুত্ব সহকারে চিন্তা-ভাবনা করার এবং অবিলম্বে এসব মেনে নেয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার জন্য তাড়াহুড়ার প্রয়োজনটা কি? কিন্তু না; তোমাদের কেউ -ই জানে না তার জন্য জীবনের আর কতটা সময় এখনো আছে৷ যে কোন সময় তোমাদের যে কোন লোকের মৃত্যু এসে হাজির হতে পারে এবং অকস্মাত কিয়ামতও এসে পড়তে পারে৷ তাই চূড়ান্ত ফায়সালার মুহূর্তকে দূরে মনে করো না৷ যে ব্যক্তিই নিজের পরিণাম সম্পর্কে ভেবে দেখতে চায় সে যেন এক মুহূর্তও বিলম্ব না করে নিজেকে সংযত করে৷ কারণ, প্রতিবার শ্বাস গ্রহণের সাথে সাথে এ সম্ভবনাও বিদ্যমান যে, দ্বিতীয়বার শ্বাস গ্রহণের আর কোন সুযোগ হয়তো পাওয়া যাবে না৷
৫১. অর্থাৎ ফায়সালার সময় যখন এসে পড়বে তখণ তোমরা না পারবে তা প্রতিরোধ করতে আর আল্লাহ ছাড়া তোমাদের যেসব উপাস্য আছে তাদের কারো এমন ক্ষমতাও নেই যে তা ঠেকাতে পারে৷ তা ঠেকালে কেবল মাত্র আল্লাহ তা'আলাই ঠেকাতে পারেন৷ কিন্তু আল্লাহ তা'আলা তা ঠেকাবেন না৷
৫২. মূল আয়াতে () শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে৷ রসূলুল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মাধ্যমে কুরআন মজীদের আকারে যেসব শিক্ষা পেশ করা হচ্ছিলো এর দ্বারা সেই সব শিক্ষাকে বুঝানো হয়েছে৷ আর বিস্ময় বলতে বুঝানো হয়েছে সেই বিস্ময়কে যা অভিনব ও অবিশ্বাস্য কথা শুনে মানুষ প্রকাশ করে থাকে৷ আয়াতটির প্রতিপাদ্য বিষয় হচ্ছে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে বিষয়ের প্রতি আহবান জানাচ্ছেন, তা তো এসব কথাই যা তোমরা শুনছো৷ তাহলে এগুলোই কি সেই সব কথা যা শুনে তোমরা কান খাড়া করে থাকো এবং বিস্ময়ের কথা এমনভাবে মুখের দিকে তাকাতে থাকো যেন তোমাদেরকে কোন অদ্ভুত ও অভিনব কথা শুনানো হচ্ছে?
৫৩. অর্থাৎ নিজেদের মূর্খতা ও গোমরাহীর কারণে যেখানে তোমাদের কান্না আসা দরকার সেখানে যে সত্য তোমাদের সামনে পেশ করা হচ্ছে ত নিয়ে তোমরা ঠাট্টা ও বিদ্রূপ করছো৷
৫৪. মূল আয়াতে () শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে৷ ভাষাবিদগণ এ শব্দটির দু'টি অর্থ বর্ণনা করেছেন৷ ইবনে আব্বাস, ইকরিমা এবং আবু উবায়দা নাহবীর মতে () অর্থ গান বাদ্য করা৷ মক্কার কাফেররা কুরআনের আওয়াজকে স্তব্ধ করতে ও মানুষের দৃষ্টি অন্যদিকে ফিরিয়ে দেয়ার জন্য জোরে জোরে গান বাদ্য শুরু করতো৷ এখানে সেদিকেই ইংগিত দেয়া হয়েছে৷ ইবনে আব্বাস ও ইকরিমা এর আরেকটি অর্থ বর্ণনা করেছেন৷ তা হচ্ছেঃ

------------------------

"অহংকার ভরে ঘাড় উঁচু বা বাঁকা করা৷ মক্কার কাফেররা রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় ক্রোধে ঘাড় উঁচু করে চলে যেতো৷ "

রাগের ইস্পাহানী তার 'মুফরাদাত'গ্রন্থে এ অর্থটিই গ্রহণ করেছেন৷ এ অর্থ বিবেচনা করে কাতাদা ছামিদুন () শব্দের অর্থ করেছেন গাফিলুন () এবং সায়ীদ ইবনে জুবাইর অর্থ করেছেন মু'য়রিদুন () ৷
৫৫. ইমাম আবু হানিফা, ইমাম শাফেয়ী ও অধিকাংশ আলেমের মতে এ আয়াত পাঠ করে সিজদা করা অবশ্য কর্তব্য৷ ইমাম মালেক, এ আয়াত তিলাওয়াত করে যদিও সব সময় সিজদা করতেন (যেমন কাজী আবু বকর ইবনুল আরাবী আহকামূল কুরআন গ্রন্থে উদ্ধৃত করেছে৷ ) কিন্তু এখানে সিজদা করা জরুরী নয় বলে তিনি মত পোষন করতেন৷ তাঁর এ মতের ভিত্তি যায়েদ ইবনে সাবেতের এই বর্ণনা যে, "আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সামনে সূরা নাজম পাঠ করলে তিনি সিজদা করেনি৷ " (বুখারী, মুসলিম, আহমাদ, তিরমিযী, আবু দাউদ, নাসায়ী) ৷ কিন্তু উক্ত হাদীসটি এ আয়াত পাঠ করে সিজদা করার বাধ্যবাধকতা রহিত করে না৷ কারণ এ ক্ষেত্রে এরূপ সম্ভবনা বিদ্যমান যে, কোন কারণে নবী (সা) সে সময় সিজদা করেননি কিন্তু পরে করেছেন৷ এ বিষয়ে অন্য সব রেওয়ায়াত থেকে সুস্পষ্টভাবে প্রকাশ পায় যে, এ আয়াত পাঠ করে সব সময় অবশ্যই সিজদা করা হয়েছে৷ হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা) , ইবনে আব্বাস (রা) ও মুত্তালিব (রা) ইবনে আবী ওয়াদা'আর সর্বসম্মত বর্ণনাসমূহ হচ্ছে, নবী (সা) সর্বপ্রথম যখন হারাম শরীফে তিলাওয়াত করেন তখন তিনি সিজদা করেছিলেন৷ সে সময় মুসলমান ও কাফের সবাই তাঁর সাথে সিজদায় পড়ে গিয়েছিলো৷ " (বুখারী, আহমাদ, নাসায়ী) ৷ ইবনে উমর (রা) বর্ণনা করেছেন যে, "নবী (সা) নামাযে সূরা নাজম তিলাওয়াত করে সিজদা করেছেন এবং অনেকক্ষণ পর্যন্ত সিজদায় থেকেছেন৷ "বায়হাকী, ইবনে মারদুইয়া) ৷ সাবুরাতুল জুহানী বলেনঃ হযরত উমর (রা) ফজরের নামাযে সূরা নাজম পড়ে সিজদা করেছেন এবং তারপর উঠে সূরা যিলযাল পড়ে রুকূ, করেছেন৷ " (সা'য়ীদ ইবনে মানসুর) ৷ ইমাম মালেক নিজেও মুয়াত্তা গ্রন্থের () অনুচ্ছেদে হযরত উমরের এ আলমের বিষয়টি উল্লেখ করেছেন৷