(৫৩:১) তারকারাজির শপথ যখন তা অস্তমিত হলো৷
(৫৩:২) তোমার বন্ধু পথভ্রষ্ট হয়নি বা বিপথগামীও হয়নি৷
(৫৩:৩) সে নিজের খেয়াল খুশীমত কথা বলে না৷
(৫৩:৪) যা তার কাছে নাযিল করা হয় তা অহী ছাড়া আর কিছুই নয়৷
(৫৩:৫) তাকে মহাশক্তির অধিকারী একজন শিক্ষা দিয়েছে, যে অত্যন্ত জ্ঞানী৷
(৫৩:৬) সে সামনে এসে দাঁড়ালো৷
(৫৩:৭) তখন সে উঁচু দিগন্তে ছিল৷
(৫৩:৮) তারপর কাছে এগিয়ে এলো এবং ওপরে শূন্যে ঝুলে রইলো৷
(৫৩:৯) অতপর তাদের মাঝে মুখোমুখি দু’টি ধনুকের জ্যা-এর মত কিংবা তার চেয়ে কিছু কম ব্যবধান রাইলো৷
(৫৩:১০) তখন আল্লাহর বান্দাকে যে অহী পৌছানোর ছিল তা সে পৌছিয়ে দিল৷
(৫৩:১১) দৃষ্টি যা দেখলো মন তার মধ্যে মিথ্যা সংমিশ্রিত করলো না৷১০
(৫৩:১২) যা সে নিজের চোখে দেখেছে তা নিয়ে কি তোমরা তার সাথে ঝগড়া করো?
(৫৩:১৩) পুনরায় আর একবার সে তাকে
(৫৩:১৪) সিদরাতুল মুনতাহার কাছে দেখেছে৷
(৫৩:১৫) যার সন্নিকটেই জান্নাতুল মা’ওয়া অবস্থিত৷ ১১
(৫৩:১৬) সে সময় সিদরাকে আচ্ছাদিত করছিলো এক আচ্ছাদনকারী জিনিস৷ ১২
(৫৩:১৭) দৃষ্টি ঝলসেও যায়নি কিংবা সীমা অতিক্রমও করেনি৷ ১৩
(৫৩:১৮) সে তার রবের বড় বড় নিদর্শনসমূহ দেখেছে৷ ১৪
(৫৩:১৯) এখন একটু বলতো, তোমরা কি কখনো এ লাত, এ উযযা
(৫৩:২০) এবং তৃতীয় আরো একজন দেবতা মানাতের প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে গভীর ভাবে চিন্তা-ভাবনা করে দেখেছো? ১৫
(৫৩:২১) তোমাদের জন্য পুত্র সন্তান আর কন্যা সন্তান কি আল্লাহর জন্য ? ১৬
(৫৩:২২) তাহলে এটা অত্যন্ত প্রতারণামূলক বন্টন৷
(৫৩:২৩) প্রকৃতপক্ষে এসব তোমাদের বাপ দাদাদের রাখা নাম ছাড়া আর কিছুই না৷ এজন্য আল্লাহ কোন সনদপত্র নাযিল করেননি৷ ১৭ প্রকৃত ব্যাপার হচ্ছে, মানুষ শুধু ধারণা ও প্রবৃত্তির বাসনার দাস হয়ে আছে৷ ১৮ অথচ তাদের রবের পক্ষ থেকে তাদের কাছে হিদায়াত এসেছে৷১৯
(৫৩:২৪) মানুষ যা চায় তাই কি তার জন্য ঠিক? ২০
(৫৩:২৫) দুনিয়া ও আখেরাতের মালিক তো একমাত্র আল্লাহ৷
১. মূল আয়াতে () শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে৷ ইবনে আব্বাস, মুজাহিদ, এবং সুফিয়ান সাওরী বলেন এর অর্থ সপ্তর্ষিমণ্ডল (Pleiades) ৷ ইবনে জারীর ও যামাখশারী এ মতকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন৷ কারণ, আরবী ভাষায় শুধু নাজম শব্দ বলা হলে তা দ্বারা সাধারণত সপ্তর্ষিমণ্ডলকেই বুঝানো হয়ে থাকে৷ সুদ্দী বলেন, এর অর্থ শুক্রগ্রহ (Venus) ৷ আবু উবায়দা নাহবীর বক্তব্য হলো, এখানে নাজম বলে সমস্ত তারকাকে বুঝানো হয়েছে ৷ অর্থাৎ বলতে চাওয়া হয়েছে যখন সকাল হলো এবং সমস্ত তারকা অস্তমিত হলো৷ পরিবেশ ও স্থান-কাল -পাত্রের বিচারে আমাদের কাছে এ শেষ মতটিই অধিক অগ্রাধিকার পাওয়ার যোগ্য৷
২. রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বুঝানো হয়েছে এবং কুরাইশদের সম্বোধন করা হয়েছে৷ মূল শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে--- (তোমাদের বন্ধু) ৷ আরবী ভাষায় () বলতে বন্ধু, সাথী, নিকটে অবস্থানকারী এবং সাথে উঠা-বসা করে এমন লোককে বুঝায়৷ এখানে নবীর (সা) নাম উল্লেখ করা বা "আমার রসূল"বলার পরিবর্তে "তোমাদের বন্ধু" বলে তাঁর কথা উল্লেখ করার মধ্যে অত্যন্ত গভীর তাৎপর্য আছে৷ এভাবে কুরাইশদের একথা বুঝানো হয়েছে যে, তোমাদের কাছে যে ব্যক্তির কথা বলা হচ্ছে তিনি তোমাদের এখানে বাইরে থেকে আসা কোন অপরিচিত ব্যক্তি নন যে, আগে থেকে তোমাদের সাথে তাঁর কোন জানা শোনাই নেই৷ তিনি তোমাদের নিজ কওমের লোক৷ তোমাদের মধ্যেই তিনি থাকেন এবং বসবাস করেন৷ তিনি কে, কি তাঁর পরিচয়, তিনি কেমন চরিত্র ও কর্মের অধিকারী মানুষ, কেমন তাঁর আচার -আচরণ, কেমন তাঁর অভ্যাস ও স্বভাব চরিত্র এবং আজ পর্যন্ত তোমাদের মাঝে তাঁর জীবন কেমন কেটেছে তা তোমাদের প্রতিটি শিশু পর্যন্ত জানে৷ তাঁর সম্পর্কে কেউ যদি নির্লজ্জের মত কিছু বলে তাহলে তাঁকে জানে তোমাদের মধ্যে এমন বহু মানুষ বর্তমান যারা নিজেরাই বিচার করে দেখতে পারে, একথা তাঁর ব্যাপারে প্রযোজ্য হয় কিনা৷
৩. এটিই মূল কথা যার জন্য অস্তমিত তারকা বা তারকারাজির শপথ করা হয়েছে৷ পথভ্রষ্ট হওয়ার অর্থ পথ না চেনার কারণে কারো ভুল পথে চলা এবং বিপথগামী হওয়ার অর্থ জেনে শুনে কারো ভুল পথ অবলম্বন করা৷ আল্লাহর এ বাণীর তাৎপর্য হলো মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তোমাদের একান্ত পরিচিত ব্যক্তি৷ তিনি পথভ্রষ্ট বা বিপথগামী হয়েছেন তাঁর বিরুদ্ধে তোমাদের এ অভিযোগ সম্পূর্ণরূপে ভুল৷ প্রকৃতপক্ষে তিনি পথভ্রষ্ট বা বিপথগামী কিছুই হননি৷ একথা বলতে যে কারণে তারকারাজির অস্তমিত হওয়ার শপথ করা হয়েছে তা হলো, রাতের অন্ধকারে যখন তারকা জ্বল জ্বল করে তখন কোন ব্যক্তি তার চারপাশের বস্তুকে স্পষ্ট দেখতে পায় না এবং বিভিন্ন বস্তুকে অস্পষ্টভাবে দেখতে পেয়ে সেগুলো সম্পর্কে ভুল অনুমান করতে পারে৷ যেমন অন্ধকারে দূরে থেকে কোন গাছ দেখে তাকে ভূত মনে করতে পারে৷ রশি পড়ে থাকতে দেখে তাকে সাপ মনে করতে পারে৷ বালুক স্তুপের কোন পাথর উঁচু হয়ে থাকতে দেখে কোন হিংস্র জন্তু বসে আছে বলে মনে করতে পারে৷ কিন্তু যে সময় তারকাসমূহ অদৃশ্য হয়ে যায় এবং সকালের আলো উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে তখন প্রতিটি বস্তু তার মূল আকার-আকৃতিতে মানুষের সামনে প্রকাশ পায়৷ সে সময় কোন বস্তুর মূল রূপ ও আকার আকৃতির ব্যাপারে কোন সন্দেহের সৃষ্টি হয় না৷ তোমাদের মধ্যে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ব্যাপারটিই তাই৷ তাঁর জীবন ও ব্যক্তিত্ব অন্ধাকারে ঢাকা নয়, বরং আলোক উদ্ভাসিত ভোরের মত স্পষ্ট৷ তোমরা জান, তোমাদের এ 'বন্ধু" একজন অতি নম্র স্বাভাব, জ্ঞানীও বিচক্ষণ ব্যক্তি৷ তাঁর সম্পর্কে কুরাইশদের কোন ব্যক্তির এ ভুল ধারণা কি করে হতে পারে যে, তিনি পথভ্রষ্ট হয়েছেন৷ তোমরা এও জান যে, তিনি অত্যন্ত সদিচ্ছা পরায়ণ এবং সত্যবাদী মানুষ৷ তোমাদের কেউ তাঁর সম্পর্কে কি করে এ মত পোষণ করতে পারে যে, তিনি জেনে শুনে শুধু যে নিজে বাঁকা পথ অবলম্বন করে বসে আছেন তাই নয়, অন্যদেরও সে বাঁকা পথের দিকে আহবান জানাতে উঠে পড়ে লেগেছেন৷
৪. অর্থাৎ যেসব কথার কারণে তোমরা তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ করছো যে, তিনি পথভ্রষ্ট বা বিপথগামী হয়েছেন সেসব কথা তাঁর মনগড়া নয় কিংবা তাঁর প্রবৃত্তির কামনা-বাসনা ঐ সবের উৎস নয়৷ তা আল্লাহর পক্ষ থেকে অহীর মাধ্যমে তাঁর ওপর নাযিল করা হয়েছে এবং হচ্ছে৷ তিনি নিজে নবী হওয়ার আকাংখা করেননি৷ তাই নিজের আকাংখা পূরণের জন্য নবুওয়াতের দাবী করে বসেছেন এমন নয়৷ বরং আল্লাহ তা'আলা অহীর মাধ্যমে যখন তাঁকে এ পদে অভিষিক্ত হতে আদেশ দিলেন তখনই তিনি তোমাদের মাঝে রিসালাতের তাবলীগ তথা প্রচারের জন্য তৎপরতা শুরু করলেন এবং বললেন, আমি তোমাদের জন্য আল্লাহর নবী৷ একইভাবে ইসলামের এ আন্দোলন, তাওহীদের এ শিক্ষা, আখেরাত, হাশর -নাশর, এবং কাজকর্মের প্রতিদানের এ খবর মহাবিশ্বে ও মানুষ সম্পর্কে এসব সত্য ও তথ্য এবং পবিত্র জীবন যাপন করার জন্য যেসব নীতিমালা তিনি পেশ করেছেন এসবও তাঁর নিজের রচিত দর্শন নয়৷ আল্লাহ তা'আলা অহীর মাধ্যমে তাঁকে এসব বিষয়ের জ্ঞান দান করেছেন৷ অনুরূপভাবে তিনি তোমাদেরকে যে কুরআন শুনিয়ে থাকেন তাও তাঁর নিজের রচিত নয়৷ এসব আল্লাহর বাণী৷ এসব বাণী অহীর মাধ্যমে তাঁর ওপর নাযিল হয়৷

এখানে একটি প্রশ্ন আসে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলার এ উক্তি যে, "তিনি নিজের খেয়াল খুশীমত কথা বলেন না, যা বলেন তা তাঁর কাছে নাযিলকৃত অহী ছাড়া আর কিছুই নয়৷ " তাঁর পবিত্র মুখ থেকে উচ্চারিত কোন কোন কথার সাথে সম্পর্কিত? তিনি যত কথা বলতেন এ উক্তি কি তার সবটার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য? নাকি কিছু কিছু কথার ওপর প্রযোজ্য আর কিছু কথার জন্য প্রযোজ্য নয়? এর জবাব হচ্ছে আল্লাহ তা'আলার এ উক্তি কুরআন মজীদের ক্ষেত্রে তো প্রযোজ্য হবেই৷ কুরআন মজীদ ছাড়া আরো যেসব কথা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পবিত্র মুখ থেকে উচ্চারিত হতো তাও অনিবার্যরূপে তিন ভাগে বিভক্ত হতে পারে৷

দীনের প্রচার ও আল্লাহর পথে মানুষকে আহবানের জন্য তিনি যেসব কথাবার্তা বলতেন অথবা কুরআন মজীদের বিষয়বস্তু তার শিক্ষা এবং আদেশ-নিষেধ ও হিদায়াতসমূহের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ হিসেবে যা কিছু বলতেন অথবা কুরআনেরই উদ্দেশ্যও দাবী পূরণ করার জন্য যেসব বক্তৃতা করতেন বা লোকদের উপদেশ ও শিক্ষা দিতেন এগুলো এক শ্রেনীর কথা৷ এসবকথা সম্পর্কে এরূপ সন্দেহ করার আদৌ কেন অবকাশ নেই যে, তিনি (নাউযুবিল্লাহ) মনগড়া ভাবে বলতেন৷ এ ব্যাপারে প্রকৃতপক্ষে তাঁর মর্যাদা ছিল কুরআনের সরকারী ভাষ্যকার বা মুখপত্র এবং আল্লাহ তা'আলার মনোনীত প্রতিনিধি হিসেবে৷ কুরআনের প্রতিটি শব্দ যেসব নবীর (সা) ওপরে নাযিল করা হতো অনুরূপ এসব কথার প্রতিটি শব্দ যদিও তাঁর ওপর নাযিল করা হতো না কিন্তু তা অবশ্যই তাঁর ওপর নাযিলকৃত ওহীর জ্ঞান ভিত্তিক ছিল৷ এসব কথা ও কুরআনের মধ্যে শুধু এতটুকু পার্থক্য ছিল যে, কুরআনের ভাষা ও ভাব সব কিছুই আল্লাহর পক্ষ থেকে ছিল৷ এসব কথার অর্থ ও ভাব আল্লাহ তাঁকে শিখিয়েছিলেন৷ কিন্তু তিনি নিজের ভাষায় ও শব্দে তা প্রকাশ করতেন৷ এ পার্থক্যের কারণে কুরআনকে "অহীয়ে জলী" (প্রকাশ্য অহী ) এবং নবীর (সা) অবশিষ্ট এসব কথাবার্তাকে "অহীয়ে খফী" (অপ্রকাশ্য অহী ) বলা হয়৷

নবীর (সা) দ্বিতীয় আরেক প্রকারের কথাবার্তা ছিল যা তিনি আল্লাহর বিধানের তাবলীগ ও প্রচারণার চেষ্টা সাধনায় এবং দীন প্রতিষ্ঠার তৎপরতার ক্ষেত্রে বলতেন৷ এ কাজে তাঁকে মুসলমানদের জামায়াতের নেতা এ পথ প্রদর্শক হিসেবে বিভিন্ন রকমের অসংখ্য দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করতে হতো৷ এসব ব্যাপারে অনেক সময় তিনি তাঁর সংগী সাথীদের পরামর্শও গ্রহণ করেছেন, নিজের মত বিদ দিয়ে তাদের মতও গ্রহণ করেছেন ৷ তাদের জানতে চাওয়ার প্রেক্ষিতে কোন কোন সময় স্পষ্টভাবে বলেছেন ও যে, একথা আমি আল্লাহর আদেশে নয়, নিজের মত হিসেবেই বলছি৷ তাছাড়া অনেকবার এ রকমও হয়েছে যে, তিনি নিজের ইজতিহাদের ভিত্তিতে কোন কথা বলেছেন কিন্তু পরে আল্লাহর পক্ষ থেকে তার পরিপন্থী নির্দেশনা এসেছে৷ এ ধরনের যত কথা তিনি বলেছেন তার কোন কথাই আদৌ এমন ছিল না এবং থাকতে পারে না যা তাঁর প্রবৃত্তির খেয়ালখুশী ও কামনা -বাসনার ফল৷ এখন প্রশ্ন হলো, তাঁর এ ধরনের সব কথা কি অহী ভিত্তিক ছিল?এ প্রশ্নের জবাব হলো, যেসব কথা সম্পর্কে তিনি নিজে স্পষ্ট করে বলেছেন যে, একথা আল্লাহর নির্দেশ ভিত্তিক নয়, কিংবা যে ক্ষেত্রে তিনি সাহাবীদের (রা) পরামর্শ চেয়েছেন এবং তাদের মতামত গ্রহণ করেছেন অথবা যেসব ক্ষেত্রে কোন কথা বা কাজ হয়ে যাওয়ার পর আল্লাহ তা'আলা তার পরিপন্থী হিদায়াত নাযিল করেছেন সে কথা ছাড়া তাঁর আর সব কথাই পূর্বোক্ত ধরনের কথাসমূহের মত 'অহীয়ে খফী'র অন্তরভুক্ত৷ তাই ইসলামী আন্দোলনের নেতা ও পথ প্রদর্শক, মু'মিনদের দলের সরদার এবং ইসলামী রাষ্ট্রের শাসকের যে পদ মর্যাদায় তিনি অধিষ্ঠিত ছিলেন তা তাঁর রচিত বা মানুষের প্রদত্ত ছিল না৷ তিনি আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে এ কাজ করার জন্য আদিষ্ট ও নিযুক্ত হয়েছিলেন৷ এ পদমর্যাদার দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করতে গিয়ে তিনি যা কিছু বলতেন এবং করতেন তা আল্লাহর ইচ্ছার প্রতিনিধিত্বের মর্যাদা নিয়ে করতেন৷ এ ক্ষেত্রে যেসব কথা তিনি তাঁর ইজতিহাদের ভিত্তিতে বলতেন, তাঁর ঐসব ইজতিহাদের অনেকগুলো আল্লাহর কাছে অত্যন্ত পছন্দনীয় ছিল৷ আল্লাহ তাঁকে জ্ঞানের যে আলো দিয়েছিলেন ওগুলো তা থেকে উৎসারিত ছিল৷ এ কারণে তাঁর ইজতিহাদ যেখানেই আল্লাহর পছন্দের বাইরে চলে গিয়েছে সেখানে তৎক্ষনাৎ "অহীয়ে জলী'র মাধ্যমে তা সংশোধন করে দেয়া হয়েছে৷ আল্লাহর পক্ষ থেকে তাঁর কোন কোন ইজতিহাদের এ সংশোধনই এ কথা প্রমাণ করে যে, তাঁর অবশিষ্ট সমস্ত ইজতিহাদ হুবহু আল্লাহর মর্জির সাথে সংগতিপূর্ণ ছিল৷

তৃতীয় আরেক রকমের কথা ছিল যা মানুষ হিসেবে নবী (সা) সাধারণ কাজকর্মে বলতেন৷ নবুওয়াতের দায়-দায়িত্ব পালনের সাথে এসব কথার কোন সম্পর্ক ছিল না৷ এ ধরনের কথা তিনি নবী হওয়ার পূর্বেও বলতেন এবং নবী হওয়ার পরেও বলতেন ৷ এ ধরনের কথা সম্পর্কে সর্ব প্রথমে বুঝে নিতে হবে যে, ঐ গুলো নিয়ে কাফেরদের সাথে কোন ঝগড়া বিবাদ ছিল না৷ এসব কথার কারণে কাফেররা তাঁকে পথভ্রষ্ট ও বিপথগামী বলেনি৷

তারা এ অভিযোগ আরোপ করতো প্রথম দুই শ্রেণীর কথার ক্ষেত্রে৷ তাই তৃতীয় প্রকারের কথা আদৌ আলোচ্য বিষয় ছিল না৷ অতএব আল্লাহ তা'আলার এ বাণী এ প্রকারের কথার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়৷ কিন্তু ঐ প্রকারের কথা এখানে আলোচনা বহির্ভূত হওয়া সত্ত্বেও এটা বাস্তব যে, জীবনের একান্ত ব্যক্তিগত ক্ষেত্রেও রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মুখ থেকে কখনো সত্যের পরিপন্থী কোন কথা বের হতো না৷ নবী ও মুত্তাকী সুলভ জীবন যাপনের জন্য আল্লাহ তা'আলা তাঁর জন্য কথা ও কাজের যে সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন তাঁর কথা ও কাজ সদা সর্বদা সে গণ্ডির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতো৷ তাই প্রকৃত পক্ষে ঐ সব কাথার কোন মধ্যেও অহীর নূর প্রতিফলিত হতো৷ কোন কোন সহীহ হাদীসে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে একথাটিই বর্ণিত হয়েছে৷ মুসনাদে আহমদে হযরত আবু হুরাইরা থেকে বর্ণিত হয়েছে, যে এক সময় নবী (সা) বলেছিলেন, () "আমি সত্য কথা ছাড়া কিছু বলি না৷ "এক সাহাবী বললেনঃ "হে আল্লাহর রসূল, অনেক সময় তো আপনি আমাদের সাথে হাসি-ঠাট্টাও করেন ৷ " জবাবে নবী (সা) বললেনঃ " () "প্রকৃতপক্ষে তখনো আমি সত্য ছাড়া কিছু বলি না৷ " মুসনাদে আহমাদ ও আবু দাউদে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আ'স থেকে বর্ণিত আছে৷ তিনি বলেনঃ আমি (রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লমের পবিত্র মুখ থেকে যা-ই শুনতাম তা সংরক্ষিত করার উদ্দেশ্য লিখে রাখতাম৷ কুরাইশরা আমাকে এ কাজ করতে নিষেধ করলো তারা বলতে শুরু করলো, তুমিতো সব কথাই লিপিবদ্ধ করে যাচ্ছো৷ অথচ রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তো মানুষ৷ অনেক সময় রাগান্বিত হয়েও কোন কথা বলেন৷ এতে আমি লেখা ছেড়ে দিলাম৷ পরবর্তী সময়ে আমি এ বিষয়টি নবীর (সা) কাছে বললে তিনি বললেনঃ

---------------------

"তুমি লিখতে থাকো, যাঁর মুঠিতে আমার প্রাণ, সে মহান সত্তার শপথ, আমার মুখ থেকে সত্য ছাড়া কখনো কোন কথা উচ্চারিত হয়নি৷ "

এ বিষয়ে বিস্তারিত জানার জন্য দেখুন, আমার গ্রন্থ তাফহীমাত, ১ম খণ্ড, শিরোনাম "রিসালাত আওর উসফে আহকাম৷ " (নির্বাচিত রচনাবলী, ১ম খণ্ড) ৷
৫. অর্থাৎ তাঁকে শিক্ষাদানকারী কোন মানুষ নয়, যা তোমরা মনে করে থাকো৷ মানব সত্তার উর্ধের একটি মাধ্যম থেকে তিনি এ জ্ঞান লাভ করেছেন৷ "মহাশক্তির অধিকারী" অর্থ কারো কারো মতে আল্লাহর পবিত্র সত্তা৷ কিন্তু তাফসীরকারদের ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ এ ব্যাপারে একমত যে, এর অর্থ জিবরাঈল আলাইহিস সালাম৷ হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা) , হযরত আয়েশা (রা) , হযরত আবু হুরাইরা (রা) , কাতাদা, মুজাহিদ, এবং রাবী, ইবনে আনাস থেকে এ মতটিই বর্ণিত হয়েছে৷ ইবনে জারীর, ইবনে কাসীর, রাযী, আলূসী, প্রমুখ তাফসীরকারগণও এমতটিই গ্রহণ করেছেন৷ শাহ ওয়ালিউল্লাহ সাহেব এবং মাওলানা আশরাফ আলী সাহেব ও তাদের অনুবাদে এটিই অনুসরণ করেছেন৷ সত্য বলতে কি, কুরআন মজীদের অন্যান্য বর্ণনা থেকেও এটি প্রমাণিত হয়েছে৷ সূরা তাকভীরে আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ

----------------------------

"প্রকৃতপক্ষে এ এক মহাশক্তিধর সম্মানিত ফেরেশতার বর্ণনা, আরশের অধিপতির কাছে অত্যন্ত মর্যাদাবান৷ তাঁর আদেশ পালিত হয় এবং সেখানে অত্যন্ত বিশ্বাসী৷ তোমাদের বন্ধু মোটেই পাগল নন৷ তিনি সে ফেরেশতাকে আসমানের পরিষ্কার দিগন্তে দেখেছেন৷ "

যে ফেরেশতার মাধ্যমে নবীর (সা) হৃদয়-মনে এ শিক্ষা নাযিল করা হয়েছিল সূরা বাকারার ৯৭ আয়াতে সে ফেরেশতার নামও বলে দেয়া হয়েছেঃ

-----------------------

যদি এসব আয়াত সূরা 'নাজমের'এ আয়াতের সাথে মিলিয়ে পাঠ করা হয় তাহলে এ ব্যাপারে আদৌ সন্দেহের অবকাশ থাকে না যে, মহাশক্তিধর শিক্ষক বলতে যে, আল্লাহ তা'আলাকে নয়, বরং জিবরাঈলকে বুঝানো হয়েছে সে ব্যাপারে আদৌ কোন সন্দেহের অবকাশ থাকে না৷ এ বিষয়ে পরে আরো বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে৷

এ ক্ষেত্রে কেউ কেউ সন্দেহ প্রকাশ করেন যে, জিবরাঈলকে কি করে রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের শিক্ষক বলা যায়৷ তাহলে তো এর অর্থ দাঁড়াবে তিনি শিক্ষক আর নবী (সা) ছাত্র৷ এভাবে তো নবীর (সা) তুলনায় জিবরাঈল আলাইহিস সালামের মর্যাদা অধিক বলে স্বীকার করে নেয়া হয়৷ কিন্তু এরূপ সন্দেহ করা ভুল৷ কারণ, জিবরাঈল নবীকে (সা) তাঁর নিজের জ্ঞান শিক্ষা দিতেন না যে, তার মর্যাদ অধিক হয়ে যাবে৷ তাঁকে আল্লাহ তা'আলা রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পর্যন্ত জ্ঞান পৌছে দেয়ার মাধ্যম বানিয়েছিলেন৷ শিক্ষার মাধ্যম ব বাহক হওয়ার কারণে তিনি রূপক অর্থ নবীর (সা) শিক্ষক ছিলেন৷ এতে তাঁর শ্রেষ্ঠত্বের কোন ব্যাপার নেই৷ পাঁচ ওয়াক্ত নামায ফরয হওয়ার পর রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে নামাযের সঠিক সময় জানানোর জন্য তাঁকে দু'দিন পর্যন্ত পাঁচ ওয়াক্ত নামায পড়ানোর উদ্দেশ্যে আল্লাহ তা'আলা জিবরাঈল আলাইহিস সালামকে তাঁর কাছে পাঠিয়েছিলেন৷ বুখারী, মুসলিম, আবু দাউদ, তিরমিযী, এবং মুযাত্তা প্রভৃতি হাদীস গ্রন্থে সহীহ সনদে এ ঘটনা বর্ণিত হয়েছে৷ এসব হাদীসে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজেই বলেছেন যে, তিনি মুক্তাদী হয়েছিলেন এবং জিবরাঈল আলাইহিস সালাম ইমাম হয়ে নামায পড়েয়েছিলেন৷ এভাবে শুধু শিক্ষার জন্য তাঁকে ইমাম বানানোর অর্থ এ নয় যে, জিবরাঈল আলাইহিস সালাম নবীর (সা) চেয়ে শ্রেষ্ঠ ছিলেন৷ এটাও ঠিক অনুরূপ ব্যাপার৷
৬. মূল আয়াতে () শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে৷ ইবনে আব্বাস ও কাতাদা একে সুন্দর ও জাঁকজমকপূর্ণ অর্থে গ্রহণ করেছেন৷ মুজাহিদ, হাসান বাসরী, ইবনে যায়েদ এবং সুফিয়ান সাওরী বলেনঃ এর অর্থ শক্তিশালী৷ সাঈদ ইবনে মুসাইয়েবের মতে এর অর্থ জ্ঞানের অধিকারী৷ হাদীসে বনী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ () এ হাদীসে () শব্দকে তিনি সুস্থ ও সবল অর্থ ব্যবহার করেছেন৷ আরবী বাক রীতিতে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে, সক্ষম, বুদ্ধিমানও জ্ঞানী অর্থেও এ শব্দটি ব্যবহৃত হয়৷ এখানে জিবরাঈল আলাইহিস সালামের ক্ষেত্রে আল্লাহ তা'আলা এ ব্যাপক অর্থব্যঞ্জক শব্দটি ব্যবহার করেছেন এই জন্য যে, তাঁর মধ্যে বুদ্ধিবৃত্তিক ও শারীরিক উভয় প্রকার শক্তি পূর্ণ মাত্রায় বিদ্যমান৷ এর সবগুলো অর্থ এক সাথে বুঝানোর মত কোন শব্দ বাংলা ভাষায় নেই৷ তাই অনুবাদে আমরা এর মধ্যে থেকে একটি অর্থকে গ্রহণ করেছি৷ কারণ, পূর্বের আয়াতাংশেই দৈহিক শক্তির পূর্ণতার উল্লেখ করা হয়েছে৷
৭. দিগন্ত অর্থ আসমানের পূর্ব প্রান্ত যেখানে সূর্য উদিত হয় এবং দিনের আলো ছড়িয়ে পড়ে৷ সূরা তাকভীরের ২৩ আয়াতে একেই পরিস্কার দিগন্ত বলা হয়েছে৷ দুটি আয়াত থেকেই পরিষ্কার বুঝা যায় যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রথমবার যখন জিবরাঈল আলাইহিস সালামকে দেখেন তখন তিনি আসমানের পূর্ব প্রান্ত থেকে আত্মপ্রকাশ করেছিলেন৷ নির্ভরযোগ্য কিছুসংখ্যক রেওয়ায়াত থেকে জানা যায় আল্লাহ তা'আলা তাঁকে মূল যে আকৃতিতে সৃষ্টি করেছিলেন সে সময় তিনি মূল আকৃতিতে ছিলেন৷ যে রেওয়ায়াতে এ বিষয়ে বর্ণনা করা হয়েছে পরে আমরা তার সবগুলোই উদ্ধৃত করবো৷
৮. অর্থাৎ আসমানের পূর্ব দিগন্তের উপরের দিকে আবির্ভূত হওয়ার পর জিবরাঈল আলাইহিস সালাম রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দিকে অগ্রসর হতে থাকলেন এবং অগ্রসর হতে হতে তাঁর কাছে এসে উপর দিকে শূন্যে ঝুলে থাকলেন৷ এরপর তিনি তাঁর দিকে এগিয়ে গেলেন এবং এতটা নিকটবর্তী হলেন যে, তাঁর এবং রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মধ্যে মুখোমুখি দু'টি ধনুকের জ্যা পরিমাণ কিংবা তার চেয়েও কিছু কম ব্যবধান রইলো৷ সাধারণভাবে মুফাসসিরগণ () অর্থ দুই ধনুক পরিমাণই বর্ণনা করেছেন ৷ কিন্তু হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা) এবং হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা) , () শব্দের অর্থ করেছেন হাত এবং () অর্থ করেছেন এই যে, উভয়ের মাঝে তখন দুই হাত পরিমাণ ব্যবধান ছিল মুখোমুখি লাগানো দুটি ধনুকের মধ্যবর্তী ব্যবধানের সমান কিংবা তার চেয়ে কিছু কম ব্যবধান ছিল বলার অর্থ এই নয় যে, দুরত্বের পরিমাণ নির্ণয়ের ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলার কোন সন্দেহ হয়েছে, (নাউযুবিল্লাহ) ৷ এ ধরনের বাচনভঙ্গি গ্রহণের কারণ হলে সব ধনুক একই পরিমাপের হয় না৷ সূতরাং ঐ হিসেব অনুসারে যদি কোন কোন দূরত্ব বর্ণনা করা হয় তাহলে দূরত্বের পরিমাণে অবশ্যই কম বেশী হবে৷
৯. মূল আয়াত হচ্ছে, () ৷ এ আয়াতাংশটির দু'টি অনুবাদ সম্ভব৷ একটি হচ্ছে, তিনি আল্লাহর বান্দার প্রতি যা কিছু অহী নাযিল করার ছিল তা করলেন৷ দ্বিতীয়টি হচ্ছে, তিনি অহী করলেন নিজের বান্দার ওপর যা কিছু অহী করার ছিল৷ প্রথম অনুবাদ করা হলে তার অর্থ হবে জিবরাঈল আল্লাহর বান্দাকে অর্থাৎ রসূল (সা) -কে অহী দিলেন যা তাঁকে অহী দেয়ার ছিল৷ দ্বিতীয় অনুবাদটি করলে তার অর্থ হবে আল্লাহ তা'আলা জিবরাঈলের মাধ্যমে তাঁর বান্দাহকে অহী দিলেন যা অহী দেয়ার ছিল৷ তাফসীরকারগণ এ দু'টি অর্থই বর্ণনা করেছেন৷ কিন্তু প্রথম অর্থটাই পূর্বাপর বিষযের সাথে অধিক সামঞ্জস্যশীল৷ হযরত হাসান বাসরী এবং ইবনে যায়েদ থেকে এ অর্থটাই বর্ণিত হয়েছে এ ক্ষেত্রে প্রশ্ন উত্থাপিত হতে পারে যে, () শব্দের (হু) সর্বনাম () ক্রিয়ার কর্তার প্রতি ইংগিত করার পরিবর্তে আল্লাহর প্রতি কিভাবে ইংগিত করবে? কারণ সূরার শুরু থেকে এ পর্যন্ত কোথাও আদৌ আল্লাহর নাম উল্লেখিত হয়নি৷ এর জবাব হলো, যেখানে বক্তব্যের পূর্ব প্রসংগ দ্বারা সর্বনামের উদ্দিষ্ট বিশেষ ব্যক্তির প্রতি সুস্পষ্ট ইংগিত পাওয়া যায় সেখানে পূর্বে উল্লেখ করা হোক বা না হোক সর্বনাম দ্বারা আপনা থেকেই সে ব্যক্তিকে বুঝাবো৷ কুরআম মজীদে এর অনেকগুলো দৃষ্টান্ত আছে৷ যেমনঃ আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ () "আমি কদরের রাতে তা নাযিল করেছি"৷ এখানে কোথাও কুরআনের উল্লেখ মোটেই করা হয়নি৷ কিন্তু বক্তব্য থেকে ইংগিত পাওয়া যাচ্ছে যে, (হু) সর্বনাম দ্বারা কুরআনকেই বুঝানো হয়েছে৷ অন্য এক জায়গায় বলা হয়েছেঃ

---------------------

"আল্লাহ যদি মানুষকে তাদের কৃতকর্মের জন্য পাকড়াও করতে শুরু করেন তাহলে তার পৃষ্ঠে জীবন্ত কিছুই রাখবেন না৷ "

এখানে আগে বা পরে পৃথিবীর কোন উল্লেখ করা হয়নি৷ কিন্তু কথার ধরন থেকে আপনিই প্রকাশ পায় যে, তার পৃষ্ঠ অর্থ ভূ-পৃষ্ঠ৷ সূরা ইয়াসীনে বলা হয়েছে () "আমি তাকে কবিতা শিক্ষা দেইনি৷ আর কবিতা তার জন্য শোভাও পায় না"৷ এখানে পূর্বে বা পরে কোথাও রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কোন উল্লেখ নেই৷ কিন্তু কথার ধরন থেকে প্রকাশ পায় যে, সর্বনামগুলো তাঁর প্রতি ইংগিত করেছে ৷ সূরা আর-রহমানে বলা হয়েছে:--------" তার ওপরে যা আছে সবই ধ্বংস হয়ে যাবে৷ " এখানে আগে ও পরে পৃথিবী পৃষ্ঠের কোন উল্লেখ নেই৷ কিন্তু বাচনভঙ্গি দ্বারা বুঝা যায় () এর সর্বনাম (হা) দ্বারা সেদিনকেই ইংগিত করা হয়েছে৷

সূরা ওয়াকিয়ায় বলা হয়েছেঃ--------- "আমি তাদেরকে বিশেষভাবে সৃষ্টি করবো৷ আশে পাশে এমন কোন বস্তু নেই যার প্রতি () শব্দটি দ্বারা ইংগিত করা হয়েছে বলে মনে করা যেতে পারে৷ কথার ভঙ্গি থেকে প্রকাশ পায় যে, এর দ্বারা জান্নাতের নারীদের বুঝানো হয়েছে৷ জিবরাঈল নিজের বান্দাকে অহী দিলেন () আয়াতাংশের অর্থ যেহেতু এরকম হতে পারে না৷ তাই "জিবরাঈল (আ) আল্লাহর বান্দাকে অহী দিলেন কিংবা আল্লাহ জিবরাঈলের মাধ্যমে তাঁর বান্দাকে অহী দিলেন৷ " অনিবার্যরূপে এই অর্থই গ্রহণ করতে হবে৷
১০. অর্থাৎ দিনের আলোতে, পূর্ণ জাগ্রত অবস্থায় এবং খোলা চোখে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যা কিছু দেখলেন সে সম্পর্কে তাঁর মন বলেনি যে, এসব দৃষ্টিভ্রম কিংবা আমি কোন জিন বা শয়তান দেখছি কিংবা আমার সামনে কোন কাল্পনিক ছবি ভেসে উঠেছে এবং জেগে জেগেই কোন স্বপ্ন দেখছি৷ বরং তাঁর চোখ যা দেখছিলো মন হুবহু তাই বিশ্বাস করেছে৷ তিনি যে সত্যিই সত্যিই জিবরাঈল এবং যে বাণী তিনি পৌছিয়ে দিচ্ছিলেন তাও বাস্তবে আল্লাহর অহী সে ব্যাপারে তার মনে কোন সন্দেহ জাগেনি৷

এখানে প্রশ্ন জাগে যে, কি কারণে এ বিস্ময়কর ও অস্বাভাবিক ব্যাপার দেখা সত্ত্বেও রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মনে আদৌ কোন সন্দেহ সৃষ্টি হলো না এবং তিনি পূর্ণ নিশ্চয়তা সহ জানতে পারলেন যে, তাঁর চোখ যা দেখছে তা প্রকৃতপক্ষেই সত্য ও বাস্তব কোন কাল্পনিক বস্তু বা কোন জিন কিংবা শয়তান নয়? এ প্রশ্ন নিয়ে আমরা যখন গভীরভাবে চিন্তা করি তখন পাঁচটি কারণ আমাদের বোধগম্য হয়৷

প্রথম কারণ, যে পারিপার্শিক অবস্থা ও পরিবেশ দেখার কাজটি সংঘটিত হয়েছিল সেটাই তার সত্যতা সম্পর্কে দৃঢ় প্রত্যয় সৃষ্টি করে দেয়৷ রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অন্ধকারে মুরাকাবারত অবস্থায় স্বপ্নে কিংবা অর্ধ জাগ্রত অবস্থায় এ দর্শন লাভ করেছিলেন না, বরং তখন সকালের পরিস্কার আলোর চারদিক উদ্ভাসিত ছিল, তিনি পুরোপুরি জাগ্রত ছিলেন, খোলা আকাশে এবং দিনের পূর্ণ আলোতে তিনি নিজ চোখে ঠিক তেমনিভাবে এ দৃশ্য দেখতে পাচ্ছিলেন যেমন কোন ব্যক্তি পৃথিবীর অন্যান্য জিনিস দেখে থাকে৷ এত যদি সন্দেহের অবকাশ থাকে তাহলে আমরা দিনের বেলা নদ-নদী, পাহাড়-পর্বত, মানুষ ঘরবাড়ী, মোট কথা যা কিছু দেখে থাকি তা সবই সন্দেহ যুক্ত এবং শুধু দৃষ্টিভ্রম ছাড়া আর কিছুই হতে পারেনা৷

দ্বিতীয় কারণ, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মানসিক অবস্থাও এর সত্যতার স্বপক্ষে দৃঢ় প্রত্যয় সৃষ্টি করেছিলো৷ তিনি পূর্ণরূপে স্বজ্ঞান ও সুস্থ ছিলেন৷ তাঁর ইন্দ্রিয়সমূহ সুস্থ ও সচল ছিল৷ তাঁর মন -মগজে পূর্ব থেকে এরূপ কোন খেয়াল চেপে ছিল না যে, এ ধরনের কোন দর্শন লাভ হওয়া উচিত বা হতে যাচ্ছে৷ এরূপ চিন্তা এবং তা অর্জন করার চেষ্টা থেকে মন -মগজ সম্পূর্ণরূপে মুক্ত ছিল৷ এ পরিস্থিতিতে তিনি আকস্মিকভাবে এ ঘটনার মুখোমুখি হলেন৷ তাই সন্দেহ করার আদৌ কোন অবকাশ ছিল না যে, চোখ কোন বাস্তব দৃশ্য দেখছে না, বরং সামনে এসে দাঁড়ানো একটি কাল্পনিক বস্তু দেখছে৷

তৃতীয় কারণ, এ পরিস্থিতিতে তাঁর সামনে যে সত্তা আবির্ভূত হয়েছিল তা এত বিরাট, এত জাঁকালো, এত সুন্দর এবং এতই আলোকোদ্ভাসিত ছিল যে, ইতিপূর্বে নবীর (সা) চিন্তায় ও ধ্যান -ধারণায় এরূপ সত্তার কল্পিত রূপও আসেনি৷ সুতরাং তা তাঁর কল্পনা প্রসূতও ছিল না৷ কোন জিন বা শয়তান এমন জাঁকালো হতে পারেনা না৷ তাই তিনি তাকে ফেরেশতা ছাড়া আর কিছু ভাবতে পারেন নি৷ হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ থেকে বর্থিত হয়েছে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ সে সময় আমি জিবরাঈলকে দেখেছি, তাঁর তখন ছয়শত ডানা ছিল (মুসনাদে আহমাদ) ৷ অপর এটি বর্ণনায় আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা) আরো ব্যাখ্যা করেছেন যে, জিবরাঈল আলাইহিস সালামের এক একটি ডানা এমন বিশাল ছিল যে, গোটা দিগন্ত জুড়ে আছে বলে মনে হচ্ছিল (মুসনাদে আহমাদ) ৷ আল্লাহ তায়ালা নিজে তাঁর অবস্থাকে () এবং () শব্দ দিয়ে বর্ণনা করেছেন৷

চতুর্থ কারণ, সে সত্তা যেসব শিক্ষা দান করেছিলেন তাও এ সাক্ষাতের সত্যতা সম্পর্কে প্রশান্তিদায়ক ছিল৷ তাঁর মাধ্যমে তিনি হঠাৎ যেসব জ্ঞান-বিজ্ঞান এবং গোটা মহাবিশ্বের প্রকৃত সত্য ও তাৎপর্যের ধারক যেসব জ্ঞান লাভ করলেন তাঁর মন-মগজে সে সম্পর্কে কোন ধারণাও ছিল না৷ তাই তিনি সন্দেহ করেননি যে, আমারই ধ্যান-ধারণা ও কল্পনা সুবিন্যস্ত হয়ে আমার সামনে এসে হাজির হয়েছে৷ অনুরূপভাবে ঐ জ্ঞান সম্পর্কে এমন সন্দেহ পোষণেরও কোন অবকাশ ছিল না যে, শয়তান ঐ আকৃতিতে এসে তাঁকে ধোঁকা দিচ্ছে৷ কারণ, মানুষকে শিরক, ও মূর্তিপূজার পরিবর্তে নির্ভেজাল তাওহীদের শিক্ষা দেয়া কি কখনো শয়তানের কাজ হতে পারে, না শয়তান কোনদিন এমন কাজ করেছে? আখেরাতের জবাবদিহি সম্পর্কে কি শয়তান কখনো মানুষকে সাবধান করেছে? জাহেলীয়াত ও তার রীতিনীতির বিরুদ্ধে কি মানুষকে কখনো ক্ষেপিয়ে তুলেছে? নৈতিক গুনাবলীর প্রতি কি আহবান জানিয়েছে? না কি কোন ব্যক্তিকে বলেছে তুমি নিজে শুধু এ শিক্ষাকে গ্রহণ কর তাই নয়, বরং গোটা বিশ্বের বুক থেকে শিরক জুলুম এবং পাপ পঙ্কিলতাকে উৎখাত এবং ঐসব দুস্কৃতির জায়গায় তাওহীদ, ন্যায়বিচার এবং তাকওয়ার সূফলসমূহ প্রতিষ্ঠা করার জন্য উঠে পড়ে লেগে যাও?

পঞ্চম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো, আল্লাহ তা'আলা যখন কোন ব্যক্তিকে নবুওয়াত দানের জন্য বাছাই করেন তখন তাঁর হৃদয়-মনকে সব রকম সন্দেহ সংশয় ও শয়তানী প্ররোচনা থেকে মক্ত করে দৃঢ় বিশ্বাস ও প্রত্যয় দ্বারা পূর্ণ করে দেন৷ এ অবস্থায় তাঁর চোখ যা দেখে এবং কান যা শোনে তার সত্যতা সম্পর্কে তাঁর মন-মগজে সামান্যতম দ্বিধা-দ্বন্দ্বও সৃষ্টি হয় না৷ তিনি সম্পূর্ণ উদার ও উন্মুক্ত মনে এমন প্রতিটি সত্যকে গ্রহণ করে নেন যা তাঁর রবের পক্ষ থেকে তাঁর কাছে প্রকাশ হয়৷ তা চোখে দেখার মত প্রত্যক্ষ পর্যবেক্ষন হতে পারে, ইলহামী জ্ঞান হিসেবে তার মনে সৃষ্টি করা হতে পারে কিংবা অহীর পয়গাম হিসেবে আসতে পারে একটি একটি করে যার প্রতিটি শব্দ শুনানো হয়ে থাকে৷ এর সবকটি ক্ষেত্রেই নবীর এ উপলদ্ধি পুরোপুরিই থাকে যে, তিনি সব রকম শয়তানী হস্তক্ষেপ থেকে চূড়ান্তভাবে সুরক্ষিত৷ যে আকারেই হোক না কেন যা কিছু তাঁর কাছে পৌছেছে তা অবিকল তাঁর প্রভুর নিকট থেকে এসেছে৷ আল্লাহ প্রদত্ত সমস্ত অনুগ্রহ ও নিয়ামতের মত নবীর এ উপলব্ধি ও অনুভূতিও এমন একটি নিশ্চিত জিনিস যার মধ্যে ভুল বুঝাবুঝি বা বিভ্রান্তির কোন সম্ভাবনা নেই৷ মাছের যেমন তার সাঁতরু হওয়া সম্পর্কে অনুভূতি আছে এবং তা আল্লাহ প্রদত্ত ৷ এতে যেমন বিভ্রান্তির লেশমাত্র থাকতে পারে না৷ অনুরূপ নবীর তাঁর নবী হওয়া সম্পর্কে যে অনূভূতি তাও আল্লাহ প্রদত্ত হয়ে থাকে৷ কখনো এক মুহুর্তের জন্যও তাঁর মনে এ সন্দেহ জাগে না যে, নবী হওয়ার ব্যাপারে হয়তো সে বিভ্রান্তির শিকার হয়েছে৷
১১. এটা জিবরাঈল আলাইহিস সালামের সাথে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দ্বিতীয়বারের মত সাক্ষাত৷ এ সাক্ষাতের সময় জিবরাঈল আলাইহিস সালাম নবীর (সা) সামনে তাঁর আসল চেহারায় আবির্ভূত হয়েছিলেন৷ এ সাক্ষাকারের স্থান বলা হয়েছে () ৷ সাথে সাথে একথাও বলা হয়েছে যে, তার নিকটেই "জান্নাতুল মা'ওয়া"অবস্থিত৷

আরবীতে 'সিদরা'বলা হয় রবই গাছকে আর 'মুনতাহা' অর্থ শেষ প্রান্ত সুতরাং () এর আভিধানিক অর্থ হচ্ছে শেষ প্রান্তে অবস্থিত বরই -গাছ৷ আল্লামা আলূসী "রুহুল মাআনীতে"এর ব্যাখ্যা করেছেনঃ () "এ পর্যন্ত গিয়ে সব জ্ঞানীর জ্ঞান শেষ হয়ে যায়৷ এর পরে যা আছে তা আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না৷ " ইবনে জারীর তাঁর তাফসীরে এবং ইবনে কাসীর" () এও প্রায় অনুরূপ ব্যাখ্যা করেছেন৷ বস্তু জগতের শেষ প্রান্তে অবস্থিত সে কুল বৃক্ষ কেমন এবং তার প্রকৃতি ও পরিচয় কি তা জানা আমাদের জন্য কঠিন৷ এটা আল্লাহ তা'আলার সৃষ্ট মহাবিশ্বের এমন রহস্যাবৃত বিষয় যেখানে আমাদের বোধ ও উপলব্ধি পৌছতে অক্ষম৷ যাই হোক, সেটা হয়তো এমন কোন জিনিস যা বুঝানোর মানুষের ভাষায় () শব্দের চেয়ে অধিক উপযুক্ত শব্দ আল্লাহ তা'আলা আর কোন কিছুকে মনে করেননি৷

"জান্নাতুল মা'ওয়া"র আভিধানিক অর্থ এমন জান্নাত যা অবস্থান স্থল হতে পারে৷ হযরত হাসান বাসরী বলেনঃ এটি সেই জান্নাত যা আখেরাতে ঈমানদার ও তাকওয়ার অধিকারী লোকেরা লাভ করবে৷ এ আয়াত দ্বারাই তিনি প্রমাণ করেছেন যে, এ জান্নাত আসমানে অবস্থিত৷ কাতাদা (রা) বলেনঃ এটাই সে জান্নাত যেখানে শহীদদের রূহসমূহ রাখা হয়৷ আখেরাতের যে জান্নাত পাওয়া যাবে এটা সে জান্নাত নয়৷ ইবনে আব্বাসও (রা) একথাই বলেন৷ তিনি অধিক এতটুকু বলেছেন যে আখেরাতে ঈমানদারগণ যে জান্নাত লাভ করবেন এটা সে জান্নাত নয়৷ সে জান্নাতের স্থান এ পৃথিবীতেই৷
১২. অর্থাৎ তার অবস্থাও প্রকৃত বর্ণনার অতীত৷ সেটা ছিল এমন আলোকোচ্ছটা মানুষ যার কল্পনাও করতো না এবং মানুষের কোন ভাষা তার বর্ণনা দিতেও সক্ষম নয়৷
১৩. অর্থাৎ একদিকে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চরম সহ্য ও গ্রহণ ক্ষমতার অবস্থা ছিল এই যে, এ ধরনের সাংঘাতিক আলোকোচ্ছ্বটার সামনেও তাঁর দৃষ্টি কোন রকম ঝলসে যায়নি৷ তিনি পূর্ণ প্রশান্তিসহ ঐ সব দেখেছেন৷ অপরদিকে তাঁর সংযম ও একাগ্রতার পরাকাষ্ঠা ছিল এই যে, যে উদ্দেশ্যে তাঁকে ডেকে নেয়া হয়েছিল সেদিকেই তিনি তাঁর মন -মগজ ও দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখেছেন৷ যেসব বিস্ময়কর দৃশ্যাবলী সেখানে ছিল তা দেখার জন্য তিনি একজন কৌতুহলী ও বিমুগ্ধ দর্শকের মত এদিক সেদিক দৃষ্টি দেননি৷ উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় কোন ব্যক্তি কোন পরাক্রমশালী বাদশাহর দরবারে যাওয়ার সুযোগ লাভ করলো এবং সেখানে সে এমন জাঁকজমকপূর্ণ কিছু জিনিস দেখতে পেল যা সে কোন দিন কল্পনার চোখ দিয়েও দেখেনি৷ লোকটি যদি নীচাশয় হয় তাহলে সেখানে গিয়ে সে বিস্ময় বিমুঢ় হয়ে পড়বে এবং দরবারের আদব কায়দা সম্পর্কে যদি অজ্ঞ হয় তাহলে শাহী মর্যাদা সম্পর্কে অমনযোগী হয়ে দরবারের সাজ সজ্জা দেখার জন্য সবদিকে ঘুরে ঘুরে তাকাতে থাকবে৷ কিন্তু একজন উঁচুমনা ও বুদ্ধিমান, রীতিনীতি ও নিয়ম-কানুন সম্পর্কে সচেতন এবং কর্তব্য পরায়ণ কোন ব্যক্তি সেখানে গিয়ে হতভম্ব হবে এবং দরবারের দৃশ্য দেখার জন্যও ব্যস্ত হয়ে পড়বে না৷ সে গাম্ভীর্য ও ব্যক্তিত্ব নিয়ে সেখানে হাজির হবে৷ যে উদ্দেশ্যে তাকে দরবারে ডাকা হয়েছে সেদিকে মনোনিবেশ করবে৷ এ আয়াতে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এ গুণটির প্রশংসা করা হয়েছে৷
১৪. এ আয়াত থেকে সুস্পষ্টরূপে প্রকাশ পায় যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহ তা'আলাকে দেখেননি কেবল তার বিশাল ও বিপুল নিদর্শনাদি দেখেছেন৷ যেহেতু পূর্বাপর প্রসংগে বিচারে দ্বিতীয় বারও রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহিওয়া সাল্লামের সে সত্তার সাথে সাক্ষাত হয়েছিল যার সাথে প্রথম বার সাক্ষাত হয়ছিল ৷ তাই অনিবার্যরূপে একথা মানতে হবে যে, প্রথমবার তিনি উঁচু দিগন্তে যাকে দেখেছিলেন তিনিও আল্লাহ ছিলেন না এবং দ্বিতীয়বার () 'র কাছে যাকে দেখেছিলেন তিনিও আল্লাহ ছিলেন না৷ এ দুটি ক্ষেত্রের কোন একটিতেও যদি তিনি আল্লাহকে দেখতেন তাহলে তা হতো এমন একটি অতি গুরুত্ব পূর্ণ ব্যাপার যা অবশ্যই স্পষ্ট করে বলে দেয়া হতো৷ হযরত মূসা সম্পর্কে কুরআন মজীদে বলা হয়েছে তিনি আল্লাহ তা'আলাকে দেখার প্রার্থনা করেছিলেন৷ কিন্তু তাঁকে জবাব দেয়া হয়েছিল () "তুমি আমাকে দেখতে পারবে না৷ " (আল আ'রাফ-১৪৩) ৷ সুতরাং একথা স্পষ্ট যে, হযরত মূসাকে যে মর্যাদা দেয়া হয়নি তা যদি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দেয়া হতো তাহলে তা এতই গুরুত্বপূর্ণ ছিল যে, বিষয়টি স্পষ্ট ভাষায় বর্ণনা করা হতো৷ কিন্তু আমরা দেখতে পাচ্ছি কুরআন মজীদে কোথাও বলা হয়নি, নবী (সা) তাঁর রবকে দেখেছিলেন৷ পক্ষান্তরে মি'রাজের ঘট্না বর্ণনা প্রসংগে সূরা বনী ইসরাঈলেও বলা হয়েছে, আমি আমার বান্দাকে নিয়ে গিয়েছিলাম এজন্য যে, তাকে আমার নিদর্শনাদি দেখাবো৷ " () আর 'সিদরাতুল মুনতাহায়' যাওয়া প্রসঙ্গে এখানে বলা হয়েছে যে, তিনি তাঁর রবের বড় বড় নিদর্শন দেখেছেন৷

---------------------

এসব কারণে বাহ্যত এ বিতর্কের কোন প্রয়োজনই ছিল না যে, এ দুটি ক্ষেত্রে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহ তা'আলাকে দেখেছিলেন, না জিবরাঈল আলাইহিস সালামকে দেখেছিলেন? কিন্তু যে কারণে এ বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে তা হচ্ছে, এ বিষয়ে বর্ণিত হাদীসসমূহে মতানৈক্য দেখা যায়৷ এ বিষয়ে বিভিন্ন সাহাবা কিরাম কর্তৃক বর্ণিত হাদীসসমূহ আমরা নীচে এক এক করে বর্ণনা করলাম৷

একঃ হযরত আয়েশা (রা) বর্ণিত হাদীসসমূহঃ

হাদীস গ্রন্থ বুখারীর কিতাবুত তাফসীরে হযরত মাসরূক থেকে বর্ণিত হয়েছে, আমি হযরত আয়েশা (রা) কে জিজ্ঞেস করলাম; "আম্মাজান, হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কি আল্লাহকে দেখেছিলেন?" তিনি জবাব দিলেন৷ "তোমার একথা শুনে আমার গায়ের পশম শিউরে উঠেছে৷ তুমি কি করে ভুলে গেলে যে, তিনটি বিষয় এমন যা কেউ দাবী করলে মিথ্যা দাবী করা হবে৷ " (তার মধ্যে প্রথম কথাটি হয়রত আয়েশা (রা) যা বললেন, তা হচ্ছে) "কেউ যদি তোমাকে বলে যে, হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহিওয়া সাল্লাম আল্লাহকে দেখেছিলেন, তাহলে সে মিথ্যা বলে৷ " তারপর হযরত আয়েশা (রা) এ আয়াতগুলো পাঠ করলো৷ () দৃষ্টিসমূহ তাঁকে দেখতে সক্ষম নয়৷ ) ৷

--------------

"কোন মানুষেরই এমন মর্যাদা নেই যে, আল্লাহ তার সাথে সরাসরি কথা বলবেন৷ তবে হয় অহী হিসেবে বা পর্দার আড়াল থেকে কিংবা তিনি কোন ফেরেশতা পাঠাবেন এবং সে তাঁর ইচ্ছা মাফিক তার প্রতি অহী নাযিল করবে৷ " এরপর তিনি বললেনঃ "তবে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহিওয়া সাল্লাম জিবরাঈল আলাইহিস সালামকে দু'বার তাঁর আসল আকৃতিতে দেখেছেন"৷

এ হাদীসের একটি অংশ বুখারীর কিতাবুত তাওহীদের ৪র্থ অনুচ্ছেদে বর্ণিত হয়েছে৷ তাছাড়া বাদউল খালক অধ্যায়ে ইমাম বুখারীর মাসরূক বর্ণিত যে হাদীসটি উদ্ধৃত করেছেন তাতে মাসরূপ (রা) বর্ণনা করেছেন৷ হযরত আয়েশার একথা শুনে আমি বললাম তাহলে আল্লাহ তা'আলার একথার কি অর্থ হবে? () তিনি বললেন এর দ্বারা জিবরাঈল আলাইহিস সালামকে বুঝানো হয়েছে৷ তিনি সব সময় মানুষের রূপ ধরে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে আসতেন৷ কিন্তু ঐ সময় তিনি তাঁর আসল আকৃতিতে তাঁর কাছে এসেছিলেন এবং তাঁর শরীরে গোটা দিগন্ত আড়াল হয়ে গিয়েছিল৷

মুসলিম কিতাবুল ঈমানের () এ হযরত আয়েশার (রা) সাথে মাসরূকের এ কথোপকথন অধিক বিস্তারিত রূপে উদ্ধৃত হয়েছে৷ তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছেঃ হযরত আয়েশা (রা) বললেনঃ যে ব্যক্তি দাবী করে যে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর রবকে দেখেছেন সে আল্লাহ তা'আলার প্রতি অতি বড় অপবাদ আরোপ করে৷" মাসরূক বলেনঃ আমি হেলান দিয়ে বসেছিলাম৷ একথা শুনে আমি উঠে বসলাম এবং বললাম উম্মুল মু'মিনীন তাড়াহুড়ো করবেন না৷ আল্লাহ তা'আলা কি বলেন নি () এবং () জবাবে হযরত আয়েশা (রা) বললেনঃ এ উম্মতের মধ্যেই আমিই সর্ব প্রথম এ ব্যাপারে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞেস করেছিলাম৷ তিনি বললেনঃ

------------------------------

তিনি তো ছিলেন জিবরাঈল আলাইহিস সালাম৷ আল্লাহ তা'আলা তাঁকে যে আকৃতি দিয়ে সৃষ্টি করেছেন সে আসল আকৃতিতে আমি তাঁকে এ দু'বার ছাড়া আর কখনো দেখিনি৷ দু'বারই আমি তাঁকে আসমান থেকে নেমে আসতে দেখেছি৷ সে সময় তাঁর বিশাল সত্তা পৃথিবী ও আসমানের মধ্যবর্তী সমগ্র শূন্যলোক ছেয়ে ফেলেছিলো৷ "

মাসরূক বর্ণিত এ হাদীস ইবনে মারদুইয়া যে ভাষায় বর্ণনা করেছেন তা হচ্ছেঃ হযরত আয়েশা (রা) বলেছেনঃ আমিই সর্ব প্রথম রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞেস করেছিলামঃ আপনি কি আপনার রবকে দেখেছিলেন? জবাবে নবী (সা) বললেন, না ৷ "আমি তো জিবরাঈলকে আসমান থেকে নেমে আসতে দেখেছিলাম৷ "

দুইঃ হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা) বর্ণিত হাদীসসমূহঃ বুখারী কিতাবুত তাফসীর, মুসলিম কিতাবুল ঈমান এবং তিরমিযী আবওয়াবুত তাফসীরে যির ইবনে হুবাইশ থেকে বর্ণিত হয়েছে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা) () আয়াতটির তাফসীর প্রসংগে বর্ণনা করেছেন যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জিবরাঈল আলাইহিস সালামকে এমন আকৃতিতে দেখেছেন যে, তাঁর ছয়শত ডানা ছিল৷

মুসলিমে অন্যান্য রেওয়ায়াতে () এবং () আয়াতেরও এ একই তাফসীর আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা) থেকে যির ইবনে হুবাইশ বর্ণনা করেছেনঃ

মুসনাদে আহমাদে আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদের এ তাফসীর যির ইবনে হুবাইশ ছাড়া আবদুর রহমান ইবনে ইয়াযীদ এবং আবু ওয়ায়েলের মাধ্যেমেও বর্ণিত হয়েছে৷ তাছাড়াও মুসনাদে আহমাদে যির ইবনে হুরাইশের আরো দুটি হাদীস বর্ণিত হয়েছে যাতে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা) () আয়াতের তাফসীর বর্ণনা প্রসংগে বলেছেনঃ

-------------

"রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ "আমি জিবরাঈলকে সিদরাতুল মুনতহার কাছে দেখেছি৷ সে সময় তাঁর ছয়শত ডানা ছিল৷ "

এ একই বিষয়বস্তু সম্বলিত হাদীস শাকীক ইবনে সালামা থেকে ইমাম আহমদও বর্ণনা করেছেন৷ এ হাদীসে বলেছেন, আমি আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদের (রা) মুখ থেকে শুনেছি যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজে বলেছিলেনঃ আমি জিবরাঈল আলাইহিস সালামকে এ আকৃতিতে "সিদরাতুল মুনহাতায়" দেখেছিলাম৷

তিনঃ আতা ইবনে আবী রাবাহ হযরত আবু হুরাইরা (রা) কে () অর্থ জিজ্ঞেস করলে তিনি জবাব দিয়েছিলেনঃ () নবী (সা) জিবরাঈল আলাইহিস সালামকে দেখেছিলেন (মুসলিম, কিতাবুল ঈমান) ৷

চারঃ ইমাম মুসলিম কিতাবুল ঈমানে হযরত আবু যার গিফারীর মাধ্যমে আবদুল্লাহ ইবনে শাকীক বর্ণিত দুটি হাদীস উদ্ধৃত করেছেন৷ এক রেওয়াতে তিনি বলেছেনঃ আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞেস করলাম, আপনি কি আপনার রবকে দেখেছিলেন? জবাবে নবী (সা) বললেনঃ () ৷ অপর রেওয়ায়াতে বলেছেনঃ তিনি আমার এ প্রশ্নের জবাব দিয়েছিলেনঃ () ৷ ইবনুল কাইয়েম () গ্রন্থে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রথম উক্তির অর্থ বর্ণনা করে বলেছেন আমার ও আল্লাহকে দেখার মধ্যে প্রতিবন্ধক ছিল নূর৷ তিনি দ্বিতীয় উক্তির অর্থ বর্ণন করেছেন এই যে, আমি আমি আমার রবকে দেখিনি, বরং নূর দেখেছি৷ "

নাসায়ী ও ইবনে আবী হাতেম নিম্নোক্ত ভাষায় হযরত আবু যারের (রা) বক্তব্য উদ্ধৃত করেছেন৷ রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অন্তর দিয়ে তাঁর রবকে দেখেছেন, চোখ দিয়ে দেখেন নি৷ "

পাঁচঃ ইমাম মুসলিম কিতাবুল ঈমানে হযরত আবু মুসা আশ'আরী (রা) থেকে একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন ৷ উক্ত হাদীসে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ "আল্লাহ তা'আলার সৃষ্টির মধ্য থেকে কারো চোখই আল্লাহ তা'আলা পর্যন্ত পৌছেনি৷ "

ছয়ঃ হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস বর্ণিত হাদীসসমূহঃ

মুসলিমের হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাসকে () - () আয়াত দুটির অর্থ জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বললেনঃ রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর রবকে দু'বার অন্তর দিয়ে দেখেছেন৷ মুসনাদে আহমাদেও এ হাদীসটি আছে৷

আতা ইবনে আবী রাবাহর বরাত দিয়ে ইবনে মারদুইয়াহ ইবনে আব্বাসের উক্তি উদ্ধৃত করেছেন যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহ তা'আলাকে চোখ দিয়ে নয়, অন্তর দিয়ে দেখেছিলেন৷

নাসায়ীতে ইকরিমা থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, ইবনে আব্বাস বলেছেনঃ

------------------

"আল্লাহ তা'আলা হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালামকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করেছেন, মূসা আলাইহিস সালামের সাথে কথা বলে তাঁকে সম্মানিত করেছেন এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে তাঁর দর্শনলাভের মর্যাদা দিয়েছেন" এতে কি তোমরা বিস্ময়বোধ করছো? হাকেমও এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন এবং একে সহীহ বলে উল্লেখ করেছেন৷

তিরমিযীতে শা'বী থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, ইবনে আব্বাস এক মজলিসে বললেনঃ আল্লাহ তা'আলা তাঁর সাক্ষাতলাভ ও কথোপকথনকে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও মূসা আলাইহিস সালামের মধ্যে ভাগ করে দিয়েছিলেন৷ তিনি মুসা আলাইহিস সালামের সাথে দু'বার কথা বলেছেন এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে দু'বার দেখেছেন৷ " ইবনে আব্বাসের এ কথা শুনে মাসরূক হযরত আয়েশার (রা) কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলেনঃ মুহম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কি তাঁর রবকে দেখেছিলেন? "তিনি বললেনঃ তুমি এমন কথা বলেছো যা শুনে আমার পশম শিউরে উঠেছে৷ " এরপর হযরত আয়েশা (রা) ও মাসরূকের মধ্যে যে কথাবার্তা হয়েছে আমরা উপরে হযরত আয়েশার (রা) বর্ণিত হাদীসসমূহের মধ্যে উদ্ধৃত করেছি৷

তিরমিযীতেই অন্য যেসব হাদীস ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত হয়েছে তার একটিতে তিনি বলেছেন, নবী (সা) আল্লাহ তা'আলাকে দেখেছিলেন৷ দ্বিতীয় একটি হাদীসে বলেছেন ; দু'বার দেখেছিলেন এবং তৃতীয় আরেকটি হাদীসে বলেছেন, তিনি অন্তর দিয়ে আল্লাহ তা'আলাকে দেখেছিলেন৷ "

মুসনাদে আহমাদে ইবনে আব্বাস বর্ণিত একটি হাদীসে আছেঃ () "আমি আমার মহাকল্যাণময় ও মর্যাদাবান রবকে দেখেছি৷ " আরেকটি হাদীসে তিনি বলেনঃ

------------------

রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ "আমার রব আজ রাত অতীব সুন্দর আকৃতিতে আমার কাছে এসেছিলেন৷ আমার মনে হয় নবীর (সা) এ কথার অর্থ তিনি স্বপ্নে আল্লাহ তা'আলাকে দেখেছিলেন৷ "

তাবারানী ও ইবনে মারদুইয়াহ ইবনে আব্বাস বর্ণিত একটি হাদীসে এও উদ্ধৃত করেছেন যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দু'বার তাঁর রবকে দেখেছেন৷ একবার দেখেছেন চোখে আরেকবার দেখেছেন অন্তর দিয়ে৷

সাতঃ মুহাম্মাদ ইবনে কা'ব আল -কুরাযী বর্ণনা করেছেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহাবীদের মধ্যে কেউ কেউ তাঁকে জিজ্ঞেস করলেনঃ আপনি কি আপনার রবকে দেখেছেন? নবী (সা) জবাব দিলেনঃ আমি তাঁকে দু'বার অন্তর দিয়ে দেখেছি৷ (ইবনে আবী হাতেম) ৷ এ বর্ণনাটিকে ইবনে জারীর যেরূপ ভাষায় উদ্ধৃত করেছেন তা হচ্ছে, নবী (সা) বললেনঃ "আমি তাঁকে চোখ দিয়ে অন্তর দিয়ে দু'বার দেখেছি৷ "

আটঃ মি'রাজের ঘটনা প্রসংগে শারীক ইবনে আবদুল্লাহর বরাত দিয়ে ইমাম বুখারী কিতাবুল তাওহীদে হযরত আনাস ইবনে মালেক বর্ণিত যে হাদীসটি উদ্ধৃত করেছেন তাতে এ কথাগুলো আছেঃ

----------------------------

"তিনি যখন সিদরাতুল মুনতাহায় পৌছলেন তখন মহাপরাক্রান্ত ও মহিমান্বিত আল্লাহ তাঁর নিকটবর্তী হলেন এবং তার উপর দিকে শূন্যে অবস্থান করলেন৷ এমন কি নবী (সা) ও তাঁর মধ্যে মুখোমুখি দুটি ধনুকের মধ্যকার সমান বা তার চেয়েও কম ব্যবধান রইলো৷ অতপর আল্লাহ তা'আলা তাঁর কাছে যেসব বিষয়ে অহী করলেন তার মধ্যে পঞ্চম ওয়াক্ত নামাযের নির্দেশও ছিল৷ "

কিন্তু এ হাদীসের সনদ ও বিষয়বস্তু সম্পর্কে ইমাম খাত্তাবী, হাফেজ ইবনে হাজার, ইবনে হাযম এবং () প্রণেতা হাফেয আবদুল হক যেসব আপত্তি উত্থাপন করেছেন তা ছাড়াও সবচেয়ে বড় আপত্তি হচ্ছে এটি স্পষ্টরূপে কুরআনের পরিপন্থী৷ কারণ, কুরআন মজীদে দু'টি ভিন্ন ভিন্ন সাক্ষাতের কথা উল্লেখ করে৷ তার মধ্যে প্রথমটি নবুওয়াতের প্রাথমিক যুগে একটি উঁচু দিগন্তে অনুষ্ঠিত হয়েছিল এবং সেখানে () বিষয়ক ঘটনাটি সংঘটিত হয়েছিল৷ আর দ্বিতীয়টি সিদরাতুল মুনতাহার সন্নিকটে সংঘটিত হয়েছিল৷ কিন্তু ওপরে বর্ণিত এ রেওয়ায়াতটি দুটি সাক্ষাতের ঘটনাকে একসাথে মিলিয়ে জগাখিচুড়ি করে একই সাক্ষাত বানিয়ে ফেলেছে৷ অতএব কুরআন মজীদের পরিপন্থী হওয়ার কারণে কোন ক্রমেই তা গ্রহণ করা যেতে পারে না৷

এরপর ওপরে বর্ণিত হাদীসগুলোর প্রসংগে আসা যাক৷ ও গুলোর মধ্যে আবার হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা) এবং হযরত আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত হাদীসগুলোই অধিক গুরুত্বপূর্ণ৷ কারণ, তাঁরা উভয়েই ঐকমত্য সহকারে খোদ রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে একথা বর্ণনা করেছেন যে, উভয় ক্ষেত্রেই তিনি আল্লাহ তা'আলাকে নয়, জিবরাঈল আলাইহিস সালামকে দেখেছিলেন৷ তাছাড়া এসব হাদীস কুরআন মজিদের বক্তব্য ও ইংগিতের সাথেও সম্পূর্ণরূপে সংগতিপূর্ণ৷ এছাড়া হযরত আবু যার (রা) এবং হযরত আবু মূসা আশ'আরী (রা) নবীর (সা) যেসব উক্তি উদ্ধৃত করেছেন তা থেকেও এর সমর্থন পাওয়া যায়৷ পক্ষান্তরে হাদীস গ্রন্থসমূহে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস থেকে যেসব হাদীস বর্ণিত হয়েছে তাতে গুরুতর অনৈক্য পরিলক্ষিত হয়৷ কোন হাদীসে উভয় সাক্ষাতকেই চাক্ষুষ সাক্ষাত বলা হয়েছে, কোনটিতে উভয় সাক্ষাতকেই অন্তরের সাক্ষাত বলা হয়েছে, কোনটাতে একটি সাক্ষাতকে চাক্ষুষ অপরটিকে অন্তরের বলা হয়েছে, আবার কোনটিতে চাক্ষুষ দর্শনকে পরিস্কার ভাষায় অস্বীকার করা হয়েছে৷ এসব বর্ণনার একটিও এমন নয় যাতে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিজের উক্তি উদ্ধৃত করা হয়েছে৷ আর যেখানে তারা রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিজের কোন কথা বা উক্তি উদ্ধৃত করেছেন সেখানে প্রথমত কুরআন মজীদে বর্ণিত এ দুটি সাক্ষাত লাভের কোনটিরও নামের উল্লেখ নেই৷ তাছাড়া তাদের একটি রেওয়ায়াতের ব্যাখ্যা অন্য রেওয়ায়াতের থেকে যা জানা যায় তা হচ্ছে নবী (সা) কোন সময়ই জাগ্রত অবস্থায় আল্লাহ তা'আলাকে দেখেননি, স্বপ্নে আল্লাহ তা'আলাকে দেখেছিলেন৷ তাই প্রকৃতপক্ষে এসব আয়াতের ব্যাখ্যায় হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাসের সাথে সম্পর্কিত রেওয়ায়াতসমূহের ওপর নির্ভর করা যেতে পারে না৷ অনুরূপভাবে মুহাম্মাদ ইবনে কা'ব আল -কুরাযীর বর্ণনাসমূহে যদিও রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উক্তি উদ্ধৃত হয়েছে কিন্তু যেসব সাহাবয়ে কিরাম নবী (সা) থেকে একথা থেকে একথা শুনেছেন তাতে তাদের নাম বলা হয়নি৷ তার একটিতে আবার বলা হয়েছে যে, নবী (সা) চাক্ষুষ দেখার বিষয় সরাসরি অস্বীকার করেছেন৷
১৫. অর্থাৎ মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তোমাদের যে শিক্ষা দিচ্ছেন তোমরা তা তাকে গোমরাহী ও কুপথগামিতা বলে আখ্যায়িত করছো৷ অথচ এ জ্ঞান তাঁকে আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে দেয়া হচ্ছে৷ আর আল্লাহ তা'আলা তাঁকে চাক্ষুষভাবে এমন সব সত্য ও বাস্তবতা দেখেয়েছেন যার সাক্ষ তিনি তোমাদের সামনে পেশ করেছেন৷ এখন তোমরা নিজেরাই একটু ভেবে দেখ, যে আকীদা-বিশ্বাস মেনে চলার জন্য তোমরা গোঁ ধরে আছো তা কত অযৌক্তিক৷ অন্য দিকে যে ব্যক্তি তোমাদের সোজা পথ দেখিয়ে দিচ্ছেন তার বিরোধিতা করে তোমরা কার ক্ষতি করছো? এ প্রসংগে বিশেষভাবে তিনজন দেবীর কথা উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে যাদেরকে মক্কা, তায়েক, মদীনা, এবং হিজাজের আশে পাশের লোক জন বেশী বেশী পূজা করতো৷ তাদের সম্পর্কে প্রশ্ন করা হয়েছে, কখনো কি তোমরা বুদ্ধি বিবেক খাটিয়ে চিন্তা করে দেখেছো, যমীন ও আসমানের প্রভুত্বের ক্ষেত্রে এদের সামান্যতম দখল বা কর্তৃত্বও থাকতে পারে কি? না বিশ্ব-জাহানের প্রভুর সাথে সত্যিই তাদের কোন সম্পর্ক হতে পারে?

লাতের আস্তানা ছিল তায়েফে৷ বনী সাকীফ গোত্র তার এত ভক্ত ছিল যে, আবরাহা যে সময় হস্তী বাহিনী নিয়ে কা'বা ঘর ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে মক্কার ওপর আক্রমণ করতে যাচ্ছিল তখন তারা শুধু তাদের এ উপাস্যের আস্তানা রক্ষা করার জন্য সে অত্যাচারীকে মক্কার রাস্তা দেখানোর জন্য পথ প্রদর্শক সরবরাহ করেছিল যাতে সে লাতের কোন ক্ষতি না করে৷ অথচ কা'বা যে আল্লাহর ঘর গোটা আরববাসীর মত সাকীফ গোত্রও একথা বিশ্বাস করতো৷ লাত শব্দের অর্থ নিয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে মতানৈক্য আছে৷ ইবনে জারীর তাবারীর জ্ঞানগর্ভ বিশ্লেষণ হচ্ছে এ শব্দটি আল্লাহ শব্দের স্ত্রীলিংগ৷ মূল শব্দটি ছিল () ৷ এটিকেই পরিবর্তন করে () করা হয়েছে৷ যামাখশারীর মতে- () থেকে শব্দটির উৎপত্তি৷ এর অর্থ ঘুরা বা কারো প্রতি ঝুঁকে পড়া৷ মুশরিকরা যেহেতু ইবাদতের জন্য তার প্রতি মনযোগী হতো, তার সামনে ঝুঁকতো এবং তার তাওয়াফ করতো তাই তাকে 'লাত' আখ্যা দেয়া শুরু হলো৷ ইবনে আব্বাস () বর্ণটিতে "তাশদীদ" প্রয়োগ করে () পড়তেন এবং () থেকে এর উৎপত্তি হয়েছে বলতেন৷ এর অর্থ মন্থন করা বা লেপন করা ৷ ইবনে আব্বাস ও মুজাহিদ বর্ণনা করেছেন যে, মূলত সে ছিল একজন মানুষ, যে তায়েফের সন্নিকটে এক কঙ্করময় ভূমিতে বাস করতো এবং হজ্জের উদ্দেশ্যে গমনকারীদের ছাতু ও অন্যান্য খাদ্য খাওয়াতো৷ সে মারা গেলে লোকেরা ঐ কঙ্করময় ভূমিতে তার নামে একটা আস্তানা গড়ে তোলে এবং তার উপাসনা করতে শুরু করে৷ কিন্তু লাতের এ ব্যাখ্যা ইবনে আব্বাস ও মুজাহিদের মত সম্মানিত ব্যক্তিদের থেকে বর্ণিত হওয়া সত্ত্বেও দু'টি কারণে গ্রহণযোগ্য নয়৷ একটি কারণ হলো একে () লাত বলা হয়েছে () "লাত্তা" বলা হয়নি৷ অপর কারণটি হলো, কুরআন মজীদে তিনজনকেই দেবী বলে উল্লেখ করেছে কিন্তু বর্ণিত হাদীস অনুসারে সে পুরুষ ছিল নারী নয়৷

() উয্যা শব্দটির উৎপত্তি () শব্দ থেকে৷ এর অর্থ সম্মানিতা৷ এটা ছিল কুরাইশদের বিশেষ দেবী৷ এর আস্তানা ছিল মক্কা ও তায়েফের মধ্যবর্তী "নাখলা" উপত্যকার "হুরাদ" নামক স্থানে (নাখলার অবস্থান জানার জন্য দেখুন তাফহীমূল কুরআন, আল -আহকাফ, টীকা -৩৩) বনী হাশেমের মিত্র বনী শায়বান গোত্রের লোক এর প্রতিবেশী ছিল৷ কুরাইশ এবং অন্যান্য গোত্রের লোকজন এর যিয়ারতের জন্য আসতো, এর উদ্দেশ্যে মানত করতো এবং বলি দান করতো৷ কা'বার মত এ স্থানটিতেও কুরবানী বা বলির জন্তু নিয়ে যাওয়া হতো এবং এটিকে সমস্ত মুর্তির চেয়ে অধিক সম্মান দেয়া হতো৷ ইবনে হিশাম বর্ণনা করেছেন আবু উহায়হার মৃত্যু ঘনিয়ে আসলে আবু লাহাব তাকে রোগ শয্যায় দেখতে গিয়ে দেখলো সে কাঁদছে৷ আবু লাহাব জিজ্ঞেস করলোঃ আবু উহায়হা, তুমি কাঁদছ কেন? তুমি কি মৃত্যুর ভয়ে ভীত হয়ে পড়েছো? মৃত্যু তো সবারই হবে৷ সে বললোঃ আল্লাহর শপথ, আমি মৃত্যুর ভয়ে ভীত হয়ে কাঁদছি না৷ আমার মৃত্যুর পর উয্যার পূজার কি উপায় হবে সে দুশ্চিন্তা আমাকে নিশেষ করে দিচ্ছে৷ আবু লাহাব বললোঃ তোমার জিবদ্দশায় ও তোমার কারণে উয্যার পূজা করা হতো না আর তোমার মৃত্যুর পরে তাকে পরিত্যাগ করাও হবে না৷ আবু উহায়হা বললোঃ এখন আমি নিশ্চিন্ত হলাম যে, আমার মৃত্যুর পরে কেউ অবশ্যই আমার স্থান পূরণ করবে৷

মানাতের আস্তানা ছিল মক্কা ও মদীনার মাঝে লোহিত সাগরের তীরবর্তী কুদাইদ নামক স্থানে৷ বিশেষ করে খুযা'আ, আওস এবং খাযরাজ গোত্রের লোকেরা এর খুব ভক্ত ছিল৷ তার হজ্জ ও তাওয়াফ করা হতো এবং তার উদ্দেশ্যে মানতের বলি দেয়া হতো৷ হজ্জের মওসূমে হাজীরা বায়তুল্লাহর তাওয়াফ এবং আরাফাতের ও মিনার অবস্থানের পর সেখান থেকে মানতের যিয়ারত তথা দর্শনলাভের জন্য লাব্বায়কা লাব্বায়কা ধ্বনি দিতে শুরু করতো৷ যারা এ দ্বিতীয় হজ্জের নিয়ত করতো তারা সাফা ও মারওয়ার মাঝে সাঈ করতো না৷
১৬. অর্থাৎ এসব দেবীদেরকে তোমরা আল্লাহর কন্যা সন্তান বলে ধরে নিয়েছো৷ এ অর্থহীন আকীদা-বিশ্বাস গড়ে নেয়ার সময় তোমরা আদৌ এ চিন্তা করনি যে, মেয়ে সন্তান জন্মগ্রহণকে তোমরা নিজেদের জন্য অপমানকর ও লজ্জাকর মনে করে থাকো৷ তোমরাও চাও যেন তোমরা পুত্র সন্তান লাভ করো৷ কিন্তু যখন আল্লাহর সন্তান আছে বলে ধরে নাও, তখন তাঁর জন্য কন্যা সন্তান বরাদ্দ করো৷
১৭. অর্থাৎ তোমরা যাদের দেবী ও দেবতা বলে থাকো তারা দেবীও নয় দেবতাও নয়৷ তাদের মধ্যে খোদায়ার কোন বৈশিষ্টও যেমন দেখা যায় না, তেমনি প্রভুত্বের ক্ষমতাও এখতিয়ারের সামন্যতম অংশও তাদের মধ্যে নেই৷ তোমরা নিজেরাই তাদেরকে আল্লাহর সন্তান, উপাস্য এবং প্রভুত্বের অংশীদার বানিয়ে নিয়েছো৷ নিজেদের মনগড়া এসব বিষয়ের সমর্থনের আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা কোন প্রমাণ তোমরা পেশ করতে সক্ষম নও৷
১৮. অন্য কথায় তাদের গোমরাহীর মৌলিক কারণ দু'টিঃ এক, তারা কোন জিনিসকে নিজেদের আকীদা-বিশ্বাস ও দীন বানিয়ে নেয়ার জন্য প্রকৃত বস্তুনিষ্ঠ জ্ঞানের কোন প্রয়োজন অনুভব করে না, বরং অনুমান ও ধারণার ওপর ভিত্তি করে একটি জিনিস মেনে নেয় এবং পরে এমনভাবে তা বিশ্বাস করে নেয়, যেন সেটিই সত্য ও বাস্তব৷ দুই, প্রকৃতপক্ষে তারা নিজেদের নফসের নানা রকম কামনা বাসনা পূরণ করার জন্যই এ নীতি ও আচরণ গ্রহণ করে থাকে৷ তাদের মন চায় তাদের এমন কোন উপাস্য থাকুক যে দুনিয়ায় তাদের আশা-আকাংখা পুরণ করবে এবং আখেরাত যদি সংঘটিত হয়-ই তাহলে সেখানে তাদেরকে ক্ষমা করিয়ে দেয়ার দায়িত্ব গ্রহণ করবে৷ কিন্তু সে হালাল হারামের কোন বাধ্য বাধকতা আরোপ করবে না এবং কোন রূপ নৈতিক বিধিবন্ধনেও আবদ্ধ করবে না৷ একারণেই তারা নবী-রাসূলের আনীত নিয়ম পদ্ধতি অনুসারে এক আল্লাহর দাসত্ব ও আনুগত্যের জন্য প্রস্তুত হতো না৷ এবং নিজেদের গড়া এসব দেবদেবীর দাসত্ব করাই তাদের মনঃপুত ছিল৷
১৯. অর্থাৎ প্রত্যেক যুগেই আল্লাহর পক্ষ থেকে নবী -রসূলগণ এসব পথহারা মানুষকে প্রকৃত সত্য সম্পর্কে অবহিত করেছেন৷ তারপর এখন মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এসে সত্যিকার অর্থে বিশ্ব-জাহানের প্রভুত্ব কার তা জানিয়ে দিয়েছেন৷
২০. এ আয়াতের দ্বিতীয় অর্থ এও হতে পারে যে, যাকে ইচ্ছা তাকেই উপাস্য বানিয়ে নেয়ার অধিকার কি মানুষের আছে? এর তৃতীয় অর্থ এও গ্রহণ করা যেতে পারে যে, ঐসব উপাস্যের কাছে মানুষ তার কামনা-বাসনা ও আকাংখা পূরণের যে আশা করে তা কি কখনো পূরণ হওয়া সম্ভব?