(৫২:২৮) অতীত জীবনে আমরা তাঁর কাছেই দোয়া করতাম সত্যিই তিনি অতি বড় উপকারী ও দয়াবান৷
(৫২:২৯) তাই হে নবী (সা), তুমি উপদেশ দিতে থাক৷ আল্লাহর মেহেরবাণীতে তুমি গণকও নও, পাগলও নও৷২২
(৫২:৩০) এসব লোক কি বলে যে, এ ব্যক্তি কবি, যার ব্যাপারে আমরা কালের আবর্তনের অপেক্ষা করছি৷ ২৩
(৫২:৩১) তাদেরকে বলো, ঠিক আছে অপেক্ষা করতে থাক, আমিও তোমাদের সাথে অপেক্ষা করছি৷ ২৪
(৫২:৩২) তাদের বিবেক-বুদ্ধি কি তাদেরকে এসব কথা বলতে প্ররোচিত করে, না কি প্রকৃতপক্ষে তারা শত্রুতায় সীমালংঘনকারী লোক ? ২৫
(৫২:৩৩) তারা কি বলে যে, এ ব্যক্তি নিজেই কুরআন রচনা করে নিয়েছে? প্রকৃত ব্যাপার হচ্ছে তারা ঈমান গ্রহণ করতে চায় না৷ ২৬
(৫২:৩৪) তাদের একথার ব্যাপারে তারা যদি সত্যবাদী হয় তাহলে এ বাণীর মত একটি বাণী তৈরি করে আনুক৷২৭
(৫২:৩৫) কোন সৃষ্টিকর্তা ছাড়া এরা কি নিজেরাই সৃষ্টি হয়েছে ? না কি এরা নিজেরাই নিজেদের সৃষ্টিকর্তা?
(৫২:৩৬) না কি পৃথিবী ও আসমানকে এরাই সৃষ্টি করেছে ? প্রকৃত ব্যাপার হলো, তারা বিশ্বাস পোষণ করে না৷২৮
(৫২:৩৭) তোমার রবের ভাণ্ডারসমূহ কি এদের অধিকারে? নাকি ঐ সবের ওপর তাদের কৃর্তৃত্ব বলে ?২৯
(৫২:৩৮) তাদের কাছে কি কোন সিঁড়ি আছে, যাতে আরোহণ করে তারা উর্ধজগতের কথা শুনে নেয় ? এদের মধ্যে যে শুনেছে সে পেশ করুক কোন সুস্পষ্ট প্রমাণ৷
(৫২:৩৯) আল্লাহর জন্য কি কেবল কন্যা সন্তান আর তোমাদের জন্য যত পুত্র সন্তান? ৩০
(৫২:৪০) তুমি কি তাদের কাছে কোন পারিশ্রমিক দাবী করছো যে, তাদের ওপর জোরপূর্বক চাপানো জরিমানার বোঝার নীচে তারা নিশেষিত হচ্ছে ? ৩১
(৫২:৪১) তাদের কাছে কি অদৃশ্য সত্যসমূহের জ্ঞান আছে যার ভিত্তিতে তারা লিখছে? ৩২ তারা কি কোন চক্রান্ত আঁটতে চাচ্ছে ? ৩৩
(৫২:৪২) (যদি তাই হয়) তাহলে কাফেররাই উল্টো নিজেদের ষড়যন্ত্রের জালে আটকা পড়বে৷ ৩৪
(৫২:৪৩) আল্লাহ ছাড়া কি তাদের আর কোন ইলাহ আছে ? যে শির্‌ক তারা করছে আল্লাহ তা থেকে পবিত্র৷৩৫
(৫২:৪৪) এরা যদি আসমানের একটি অংশ পতিত হতে দেখে তাহলেও বলবে, এ তো ধাবমান মেঘরাশি৷৩৬
(৫২:৪৫) অতএব, হে নবী, তাদেরকে আপন অবস্থায় থাকতে দাও৷ যাতে তারা সে দিনটির সাক্ষাত পায় যেদিন তাদেরকে মেরে ভূপাতিত করা হবে৷
(৫২:৪৬) সেদিন না তাদের কোন চালাকি কাজে আসবে, না কেউ তাদেরকে সাহায্য করতে এগুবে৷
(৫২:৪৭) আর সেদিনটি আসার আগেও জালেমদের জন্য একটা আযাব আছে৷ কিন্তু তাদের অধিকাংশই জানে না ৷ ৩৭
(৫২:৪৮) হে নবী! তোমার রবের ফায়সালা আসা পর্যন্ত ধৈর্য ধারণ করো৷ ৩৮ তুমি আমার চোখে চোখেই আছ৷ ৩৯ তুমি যখন উঠবে তখন তোমার রবের প্রশংসায় তাসবীহ পাঠ করো ৪০
(৫২:৪৯) তাছাড়া রাত্রিকালেও তার তাসবীহ পাঠ করো৷ ৪১ আর তারকারাজি যখন অস্তমিত হয় সে সময়ও৷ ৪২
২২. মক্কার কাফেররা জুলুম ও হঠকারিতার মাধ্যমে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দাওয়াতের মোকাবিলা করেছিল ৷ ওপরে আখেরাতের চিত্র পেশ করার পর এখন বক্তব্যের মোড় এখানে তাদের জুলুম ও হঠকারিতার দিকে ঘুরে যাচ্ছে ৷ এখানে বাহ্যতঃ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সম্বোধন করা হলেও প্রকৃতপক্ষে তার মাধ্যমে মক্কার কাফেরদেরকেই এসব কথা শুনানো হচ্ছে ৷ তিনি যখন তাদের সামনে কিয়ামত, হাশর-নশর, হিসেব-নিকেশ, শাস্তি ও পুরস্কার এবং জান্নাত ও জাহান্নামের কথা বলতেন আর এসব বিষয় সম্বলিত কুরআন মজীদের আয়াত শুনিয়ে দাবী করতেন, এসব খবর আল্লাহর পক্ষ থেকে আমার কাছে এসেছে, এ হচ্ছে আল্লাহর বাণী আল্লাহ তা'আলা অহীর মাধ্যমে এ বাণী নাযিল করেছেন তখন তাদের নেতৃবৃন্দ, ধর্মীয় পুরোহিত গোষ্ঠী এবং তাদের বখাটে লোকেরা তাঁর এ বক্তব্য যেমন কখনো সুস্থ মস্তিষ্কে ভেবে -চিন্তে দেখতো না, তেমনি এও চাইতো না যে, জনসাধারণ তাঁর বক্তব্যের প্রতি মনোযোগ দিক ৷ তাই তারা কখনো বলতো তিনি গণক, কখনো বলতো তিনি পাগল, কখনো বলতো, তিনি কবি, আবার কখনো বলতো তিনি নিজেই এসব অদ্ভুত কথা রচনা করেন এবং নিজের প্রভাব বৃদ্ধির জন্য আল্লাহর নাযিলকৃত অহী বলে পেশ করেন ৷ তাদের ধারণা ছিল, এভাবে অপবাদ আরোপ করে মানুষের মনে তাঁর ব্যাপারে খারাপ ধারণা সৃষ্টি করে দিতে পারবে এবং তাঁর সব কথা ব্যর্থ হয়ে যাবে ৷ সূতরাং এখানে বলা হচ্ছে , হে নবী, বাস্তব অবস্থা তো তাই যা সূরার শুরু থেকে এ পর্যন্ত বর্ণনা করা হয়েছে ৷ কিন্তু এসব কারণে এসব লোক যদি তোমাকে গণক এবং পাগল বলে তাহলে তার পরোয়া করো না ৷ আল্লাহর বান্দাদেরকে তাদের গাফলতি সম্পর্ক সতর্ক এবং প্রকৃত সত্য সম্পর্কে সাবধান করার কাজ করতে থাকো ৷ কারণ, আল্লাহর মেহেরবানীতে তুমি , গণকও নও, পাগলও নও ৷

আরবী ভাষায় ( ) শব্দটি জোতিষী , ভবিষ্যৎ বক্তা ও জ্ঞানবান অর্থে ব্যবহৃত হয় ৷ জাহেলী যুগে এটি একটি স্বতন্ত্র পেশা ছিল ৷ গণকরা দাবী করতো এবং দুর্বল আকীদার লোকেরা মনে করতো যে, তারা নক্ষত্র বিশারদ বা আত্মা, শয়তান ও জিনদের সাথে তাদের বিশেষ সম্পর্ক আছে, যার মাধ্যমে তারা গায়েবী খবর জানতে পারে ৷ কোন জিনিস হারিয়ে গেলে তা কোথায় পড়ে আছে তা তারা বলে দিতে পারে ৷ কারো বাড়ীতে চুরি হলে কে চোর তা তারা বলে দিতে পারে ৷ কেউ তার ভাগ্য সম্পর্কে জানতে চাইলে তারা বলে দিতে পারে তার ভাগ্যে কি লেখা আছে ৷ মানুষ এসব উদ্দেশ্য নিয়েই তাদের কাছে যেতো ৷ তারা কিছু নযর-নিয়াজ নিয়ে তাদেরকে গায়েবী কথা বলে দিতো ৷ মানুষ যাতে তাদের কাছে আসে এ উদ্দেশ্যে তারা নিজেরাও অনেক সময় বস্তিতে গিয়ে হাঁক ছেড়ে বেড়াতো ৷ তাদের একটা বিশেষ ঢং হতো , যা দিয়ে তাদের চেনা যেতো ৷ তাদের কথাবার্তাও সাধারণ বোলচাল থেকে ভিন্ন হতো ৷ তারা বিশেষ ভংগীতে কিছুটা গানের সূরে ছন্দবদ্ধ কথা বলতো এবং সাধারণত এমন হেঁয়ালিপূর্ণ কথা বলতো যা থেকে প্রত্যেক ব্যক্তি তার মনের কথার সন্ধান করে নিতে পারে ৷ জনসাধারণকে ধোঁকা দেয়ার জন্য কুরাইশ নেতারা রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি তারা গণক হওয়ার অপবাদ আরোপ করেছিল ৷ আর তা করেছিল শুধু এ কারণে যে, তিনি এমন সব বিষয়ে কথা বলতেন যা মানুষের দৃষ্টির আড়ালে ছিল, তাছাড়া তিনি দাবী করতেন যে আল্লাহর পক্ষে থেকে একজন ফেরেশতা এসে তার কাছে অহী নাযিল করে এবং আল্লাহর যে বাণী তিনি পেশ করেন তাও ছিল ছন্দায়িত ৷ কিন্তু তাদের এ অপবাদের কারণে আরবের কোন মানুষই প্রতারিত হয়নি ৷ কারণ গণকদের পেশা, তাদের চালচলন , তাদের কথাবার্তা এবং তাদের কারবার কারোই অজানা ছিল না ৷ সবাই জানতো, তারা কি কাজ করে , কি উদ্দেশ্য লোকজন তাদের কাছে যায় কি, কি কথা তারা তাদেরকে বলে, তাদের ছন্দবদ্ধ কথাগুলো কেমন হয় এবং তার বিষয়বস্তু কি থাকে ৷ সবচেয়ে বড় কথা হলো, এটা আদৌ কোন গণকের কাজ হতে পারে না যে, জাতির মধ্যে তৎকালে প্রচলিত আকীদা-বিশ্বাসের পরিপন্থী আকীদা-বিশ্বাস সে তুলে ধরবে, দিনরাত তার প্রচার প্রসারে জীবনপাত করবে এবং সে জন্য গোটা জাতির শত্রুতার ঝুঁকি নেবে ৷ তাই রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে গণক হওয়ার এ অপবাদের নাম মাত্র সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় ৷ সুতরাং আরবের কোন নিরেট বোকা লোকও এতে প্রতারিত হয়নি ৷

অনুরূপভাবে মক্কার কাফেররা নিছক তাদের মনের সান্ত্বনার জন্য নবীকে ( সা) পাগল হওয়ার অপবাদ দিতো ৷ যেমন বর্তমান যুগের কোন কোন বেশরম পাশ্চত্য লেখক ইসলামের বিরুদ্ধে তাদের হিংসা চরিতার্থ করার জন্য দাবী করে যে, নবীর ( সা) ওপর মৃগি রোগের ( ) আক্রমণ হতো এবং আক্রান্ত অবস্থায় তাঁর মুখ থেকে যেসব কথা বের হতো লোকে তাকেই অহী মনে করতো ৷ সে যুগের কোন জ্ঞানী লোকও এসব বেহুদা অপবাদকে বিশ্বাসযোগ্য মনে করেনি, এ যুগের কোন মানুষও কুরআন মজীদ অধ্যয়ন করে এবং রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নেতৃত্বের ও তত্ত্বাবধানে সাধিত বিস্ময়কর কীর্তিসমূহ দেখে একথা বিশ্বাস করতে পারে না যে, এসবকিছু মৃগী রোগে আক্রান্ত হওয়ার ফল ৷
২৩. অর্থাৎ এ ব্যক্তির ওপর কোন আকস্মিক বিপদ আপতিত হোক এবং আমরা তার জ্বালাতন থেকে রক্ষা পাই, এ জন্য আমরা অপেক্ষা করছি ৷ সম্ভবত তাদের ধারণা ছিল, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যেহেতু আমাদের উপাস্যদের বিরোধিতা এবং তাদের অলৌকিক কর্মকাণ্ড অবিশ্বাস করেন, তাই হয় তাঁর ওপরে আমাদের কোন উপাস্য দেব-দেবীর কোপনল পড়বে অথবা কোন দুঃসাহসী বীর তার এসব কথা শুনে ধৈর্য হারিয়ে ফেলবে এবং তাকে হত্যা করবে ৷
২৪. এর দুটি অর্থ হতে পারে ৷ একটি অর্থ হচ্ছে, আমিও দেখছি তোমাদের এ আকাংখা পূরণ হয় কিনা ৷ অপর অর্থটি হচ্ছে দুর্ভাগ্য আমার আসে না তোমাদের আসে, তা দেখার জন্য আমিও অপেক্ষা করছি ৷
২৫.

এ দুটি বাক্যে বিরোধীদের সমস্ত অপপ্রচার খণ্ডন করে দিয়ে তাদের মুখোশ সম্পূর্ণরূপে খুলে দেয়া হয়েছে ৷ যুক্তির সারকথা হলো, কুরাইশদের এসব নেতা এ প্রবীণ ব্যক্তি বড় বড় জ্ঞানী ও বুদ্ধিমান সেজে বসে আছে ৷ কিন্তু তাদের জ্ঞানবুদ্ধি কি বলে, যে ব্যক্তি কবি নয় তাকে কবি বলো, গোটা জাতির লোক যাকে একজন জ্ঞানী বলে জানে তাকে পাগল বলো এবং গণনা বিদ্যার সাথে যার দূরতম সম্পর্কও নেই তাকে অযথা গণক বলে আখ্যায়িত করো ৷ এরপরও যদি তারা জ্ঞান ও যুক্তির ভিত্তিতেই এ সিদ্ধান্ত নিতো তাহলে যে কোন একটি কথাই বলতো ৷ অনেকগুলো পরস্পর বিরোধী উপাধী তো কাউকে একসাথে দেয়া যায় না ৷ এক ব্যক্তি কবি পাগল ও গণক একই সাথে কিভাবে হতে পারে? সে যদি পাগল হয়ে থাকে তাহলে গণক বা কবি হতে পারে না ৷ গণক হলে কবি হতে পারে না এবং কবি হলে গণক হতে পারে না ৷ কেননা, কবিতায় ভাষা ও আলোচ্য বিষয় যা গণক বা জোতিষীদের ভাষা ও বিষয়বস্তু তা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন ৷ একই কথারকে যুগপৎ কাব্য ও গণকদের গণনা বলে আখ্যায়িত করা এমন কোন ব্যক্তির কাজ হতে পারে না, যে কাব্য ও গণনা বিদ্যার পার্থক্য সম্পর্কে অবহিত ৷ অতএব, এটা অত্যন্ত পরিস্কার কথা যে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিরুদ্ধে পরস্পর বিরোধী কথা ও মন্তব্য জ্ঞান-বুদ্ধির ভিত্তিতে নয়, বরং সরাসরি জিদ ও হঠকারীতার ভিত্তিতে করা হচ্ছে ৷ জাতির এসব বড় বড় নেতা শুধু শত্রুতার আতিশয্যে অন্ধ হয়ে এমন সব ভিত্তিহীন অপবাদ আরোপ করছে যা কোন সুস্থ ও স্থির মস্তিষ্কের মানুষ গ্রহণযোগ্য মনে করতে পারে না ৷ ( আরো ব্যাখ্যার জন্য দেখুন, তাফহীমুল কুরআন, সূরা আল আরাফ টীকা, ১০৪;ইউনুস, টীকা ৩; বানী ইসরাইল , টীকা ৫৩ ৫৪; আশ শু'আরা , টীকা ১৩০, ১৩১, ১৪০, ১৪২, ১৪৩ ১৪৪, ) ৷

২৬. অন্য কথায় ও উক্তির তাৎপর্য হচ্ছে, কুরাইশদের মধ্যে যেসব লোক বলতো, কুরআন মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিজের রচিত বাণী তারাও জানতো যে, এটা তার বানী হতে পারে না ৷ তাছাড়া অন্য যেসব লোকের ভাষা আরবী, তারা এ বাণী শোনা মাত্র পরিস্কার বুঝে ফেলতো যে, এটা মানুষের কথার চেয়ে অনেক উর্ধের জিনিসই শুধু নয়, বরং তাদের মধ্যে যে ব্যক্তিই মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জানতো সে কখনো ধারণাই করতে পারতো না যে, এটা সত্যিই তার নিজের কথা ৷ অতএব, পরিস্কার ও সোজা কথা হলো, কুরআনকে তার নিজের রচনা বলে আখ্যা দানকারী আসলে ঈমান আনতে চায় না ৷ তাই তারা নানা রকমের মিথ্যা বাহানা খাড়া করেছে ৷ আর এটা সেসব বাহানারই একটি ৷ ( আরো ব্যাখ্যার জন্য দেখুন, তাফহীমুল কুরআন, ইউসূফ, টীকা ২১;আল ফুরকান, টীকা ১২;আল কাসাস, টীকা ৬৪;আল আনকাবূত , টীকা, ৮৮-৮৯; আস সাজদা, টীকা ১থেকে ৪; হা-মীম আস সাজদা;টীকা ৫৪;আল আহকাফ, টীকা ৮ থেকে ১০) ৷
২৭. অর্থাৎ কথা শুধু এ টুকু নয় যে, এটা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাণী নয়, বরং এটা আদৌ মানুষের কথা নয় ৷ এ রকম বাণী রচনা করাও মানুষের সাধ্যাতীত ৷ তোমরা যদি একে মানুষের কথা বলতে চাও তাহলে মানুষের রচিত এ মানের কোন কথা এনে প্রমান করো ৷ শুধু কুরাইশদের নয়, বরং দুনিয়ার মানুষকে এ আয়াতের মাধ্যম সর্বপ্রথম এ চ্যালেঞ্জ জানানো হয়েছিল ৷ এরপর পুনরায় মক্কায় তিনবার এবং মদীনায় শেষ বারের মত এ চ্যালেঞ্জ জানানো হয়েছে ৷ ( দেখুন ইউনুস, আয়াত ৩৮;হূদ, ১৩; বনী ইসরাঈল, ৮৮; আল বাকারা , ২৩) ৷ কিন্তু সে সময়ও কেউ এর জবাব দেয়ার সাহস দেখাতে পারেনি ৷ তার পরেও আজ পর্যন্ত কেউ কুরআনের মোকাবিলায় মানুষের রচিত কোন কিছু পেশ করার দুঃসাহস দেখাতে পারেনি ৷ কেউ কেউ এ চ্যালেঞ্জের প্রকৃত ধরন না বুঝার কারণে বলে থাকে, শুধু কুরআন কেন, কোন একক ব্যক্তির নিজস্ব রীতিতেও অন্য কেউ গদ্য বা কবিতা লিখতে সমর্থ হয় না ৷ হোমার, রুমী, সেক্সপিয়ার, গেটে, গালিব, ঠাকুর , ইকবাল, সবাই এদিক দিয়ে অনুপম যে তাদের অনুকরণ করে তাদের মত কথা রচনা করার সাধ্য কারোই নেই ৷ কুরআনের চ্যালেঞ্জের এ জবাবদাতারা প্রকৃতপক্ষে এ বিভ্রান্তিত আছে যে, ( ) আয়াতাংশের অর্থ হুবহু কুরআনের মতই কোন গ্রন্থ রচনা করে দেয়া ৷ অথচ এর অর্থ বাকরীতির দিক দিয়ে সমমান নয় ৷ এর অর্থ সামগ্রিকভাবে এর গুরুত্ব ও মর্যাদার সমপর্যায়ের কোন গ্রন্থ নিয়ে এসো ৷ যেসব বৈশিষ্টের কারণে কুরআন একটি মু'জিযা ঐ গ্রন্থও সে একই রকম বৈশিষ্ট মণ্ডিত সমপর্যায়ের হতে হবে ৷ যেসব বড় বড় বৈশিষ্টের কারণে কুরআন পূর্বেও মু'জিযা ছিল এবং এখনো মু'জিযা তার কায়েকটি সংক্ষেপে নিম্নরূপঃ

একঃ যে ভাষায় কুরআন মজীদ নাযিল হয়েছে তা সে ভাষায় সাহিত্যে উচ্চতম ও পূর্ণাঙ্গ নমুনা ৷ গোটা গ্রন্থের একটি শব্দ বা একটি বাক্যও মানের নিচে নয় ৷ যে বিষয়টিই ব্যক্ত করা হয়েছে সেটিই উপযুক্ত শব্দ ও উপযুক্ত বাচনভংগীতে বর্ণনা করা হয়েছে ৷ একই বিষয় বার বার বর্ণিত হয়েছে এবং প্রতিবারই বর্ণনার নতুন ভংগী গ্রহণ করা হয়েছে কিন্তু সেজন্য পৌনপুনকতার দৃষ্টিকটূতা ও শ্রুতিকটূতা কোথাও সৃষ্টি হয়নি ৷ গোটা গ্রন্থে প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত শব্দের গাঁথুনি এমন যেন আংটির মুল্যবান পাথারগুলো ছেঁটে ছেঁটে বসিয়ে দেয়া হয়েছে ৷ কথা এতটা মর্মস্পর্শী যে, তা শুনে ভাষাভিজ্ঞ কোন ব্যক্তিই মাথা নিচু না করে থাকতে পারে না ৷ এমন কি অমান্যকারী এবং বিরোধী ব্যক্তির মনপ্রাণ ও ভাবাবেগ পর্যন্ত উদ্বেলিত হয়ে ওঠে ৷ ১৪ শত বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পরও আজ অবধি এ গ্রন্থ তার ভাষায় সাহিত্যের সবচেয়ে উন্নত নমুনা ৷ এর সমপর্যায়ের তো দূরের কথা সাহিত্যিক মর্যাদা ও মূল্যমানে আরবী ভাষায় কোন গ্রন্থ আজ পর্যন্ত এর ধারে কাছেও পৌছনি ৷ শুধু তাই নয়, এ গ্রন্থ আরবী ভাষাকে এমনভাবে আঁকড়ে ধরে বসেছে যে, ১৪ শত বছর অতিবাহিত হওয়ার পরও এ ভাষার বিশুদ্ধতার মান তাই আছে যা এ গ্রন্থ প্রতিষ্ঠিত করে দিয়েছিল ৷ অথচ এ সময়ের মধ্যে ভাষাসমূহ পরিবর্তিত হয়ে ভিন্ন রূপ ধারণ করে ৷ পৃথিবীতে আর কোন ভাষা এমন নেই যা এত দীর্ঘ সময় পর্যন্ত লিখন পদ্ধতি, রচনা রীতি, বাচনভংগী, ভাষার নিয়মকানুন এবং শব্দ ব্যবহারের ক্ষেত্রে একই রূপ নিয়ে টিকে আছে ৷ এর সাহিত্যমান আজ পর্যন্ত আরবী ভাষার উচ্চ মানের সাহিত্য ৷ ১৪ শত বছর আগে কুরআনে যে বিশুদ্ধ ভাষা ব্যবহার করা হয়েছিল বক্তৃতা ও লেখার আজও সেটাই বিশুদ্ধ ভাষা বলে মানা হচ্ছে ৷ দুনিয়ার কোন ভাষায় মানুষের রচিত কোন গ্রন্থ কি এ মর্যাদা লাভ করেছে ৷ !

দুইঃ এটা পৃথিবীর একমাত্র গ্রন্থ যা মানব জাতির ধ্যান-ধারণা , স্বভাব -চরিত্র , সভ্যতা, -সংস্কৃতি এবং জীবন প্রণালির ওপর এমন ব্যাপক, এমন গভীর এবং এমন সর্বাত্মক প্রভাব বিস্তার করেছে যে, পৃথিবীতে তার কোন নজির পাওয়া যায় না ৷ এর প্রভাব প্রথমে একটা জাতির মধ্যে পরিবর্তন আনলো ৷ অতপর সেই জাতি তৎপর হয়ে পৃথিবীর একটি বিশাল অংশে পরিবর্তন আনলো ৷ দ্বিতীয় আর কোন গ্রন্থ নেই যা এতটা বিপ্লবাত্মক প্রমাণিত হয়েছে ৷ এ গ্রন্থ কেবলমাত্র কাগজের পৃষ্ঠাসমূহেই লিপিবদ্ধ থাকেনি বরং তার এক একটি শব্দ ধ্যান-ধারণাকে বাস্তবে রূপদান করেছে এবং একটি স্বতন্ত্র সভ্যতা নির্মাণ করেছে ৷ ১৪ শত বছর ধরে তার এ প্রভাব চলে আসছে এবং দিনে দিনে তা আরো বিস্তৃত হচ্ছে ৷

তিনঃ এ গ্রন্থ যে বিষয়ে আলোচনা করে তা একটি ব্যাপকত বিষয় ৷ এর পরিধি আদি থেকে অন্ত পর্যন্ত গোটা বিশ্ব -জাহানকে পরিব্যাপ্ত করে আছে ৷ এ গ্রন্থ বিশ্ব-জাহানের তাৎপর্য তার শুরু ও শেষ এবং তার নিয়ম-শৃংখলা সম্পর্কে বক্তব্য ও মত পেশ করে ৷ এ গ্রন্থ বলে দেয় এ বিশ্ব -জাহানের স্রষ্টা, শৃংখলাবিধানকারী এবং পরিচালক কে? কি তাঁর গুণাবলী , কি তাঁর ইখতিয়ার ও ক্ষমতা এবং কি সেই মূল ও আসল বিষয় আর যার ভিত্তিতে তিনি এ গোটা বিশ্ব ব্যবস্থার প্রতিষ্ঠা করেছেন ৷ সে এ পৃথিবীতে মানুষের প্রকৃত মর্যাদা ও অবস্থান সঠিকভাবে নির্দিষ্ট করে বলে দেয় যে, এটা তার স্বাভাবিক অবস্থান এবং এটা তার জন্মগত মর্যাদা ৷ সে এ অবস্থান ও মর্যাদা পাল্টে দিতে সক্ষম নয় ৷ এ অবস্থান ও মর্যাদার দিক দিয়ে মানুষের জন্য সত্য ও বাস্তবতার সাথে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যশীল সঠিক পথ কি এবং সত্য ও বাস্তবের সাথে সংঘাতপূর্ণ ভ্রান্ত পথ কি তা সে বলে দেয় ৷ সঠিক পথের সঠিক হওয়া এবং ভ্রান্ত পথের ভ্রান্ত হওয়া প্রমাণের জন্য সে যমীন ও আসমানের এক একটি বস্তু থেকে মহাবিশ্ব ব্যবস্থার এক একটি প্রান্ত থেকে মানুষের নিজের আত্মা ও সত্তা থেকে এবং মানুষেরই নিজের ইতিহাস থেকে অসংখ্য যুক্তি -প্রমাণ পেশ করে ৷ এর সাথে সে বলে দেয় মানুষ কিভাবে ও কি কি কারণে ভ্রান্ত পথে চলেছে এবং প্রতি যুগে তাকে কিভাবে সঠিক পথ বাতলে দেয়া হয়েছে যা সবসময় একই ছিল এবং একই থাকবে ৷ সে কেবল সঠিক পথ দেখিয়েই ক্ষান্ত হয় না ৷ বরং সে পথে চলার জন্য একটা পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থার চিত্র পেশ করে যার মধ্যে আকায়েদ, আখলাক, আত্মার পরিশুদ্ধি , ইবাদত, -বন্দেগী , সামাজিকতা, তাহযীব , তামাদ্দুন, অর্থনীতি, রাজনীতি, ন্যায়বিচার , আইন-কানুন, এক কথায় মানব জীবনের প্রতিটি দিক সম্পর্কে অত্যন্ত সুসংবদ্ধ বিধি-বিধান বর্ণনা করা হয়েছে ৷ তাছাড়া এ সঠিক পথ অনুসরণ করার এবং ভ্রান্ত পথসমূহে চলার কি কি ফলাফল এ দুনিয়ায় দেখা দেবে এবং দুনিয়ার বর্তমান ব্যবস্থা ধ্বংস হওয়ার পর অন্য আরেকটি জগতে দেখা দেবে তাও সে বিস্তারিত বলে দেয় ৷ সে এ দুনিয়ার পরিসমাপ্তি এবং আরেকটি দুনিয়া প্রতিষ্ঠার অবস্থা অত্যন্ত বিস্তারিতভাবে আলোচনা করে, এ পরিবর্তনের সমস্ত স্তর এক এক করে বলে দেয়, দৃষ্টির সামনে পরজগতের পূর্ণ চিত্র অংকন করে এবং সেখানে মানুষ কিভাবে আরেকটি জীবন লাভ করবে তা স্পষ্ট করে বর্ণনা করে, কিভাবে তার পার্থিব জীবনের কার্যাবলীর হিসেব-নিকেশ হবে, কোন কোন বিষয়ে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে, কেন অনস্বীকার্য রূপে তার সামনে তার আমলনামা পেশ করা হবে ৷ সেসব কাজের প্রমাণ স্বরূপ কি ধরনের অকাট্য সাক্ষসমূহ পেশ করা হবে, পুরস্কার ও শাস্তিলাভকারী কেন পুরস্কার ও শাস্তিলাভ করবে ৷ পুরস্কার লাভকারীরা কি ধরনের পুরস্কারলাভ করবে এবং শাস্তি প্রাপ্তরা কি কি ভাবে তাদের কার্যাবলীর মন্দফল ভোগ করবে, এ ব্যাপক বিষয়ে যে বক্তব্য এ গ্রন্থে পেশ করা হয়েছে তার মর্যাদা এমন নয় যে তার রচয়িতা তর্ক শাস্ত্রের কিছু যুক্তিতর্ক একত্রিত করে কতকগুলো অনুমানের প্রসাদ নির্মাণ করেছেন, বরং এর রচয়িতা প্রকৃত সত্য সম্পর্কে সরাসরি জ্ঞান, রাখের তার দৃষ্টি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সবকিছু দেখছে ৷ সমস্ত সত্য তাঁর কাছে উন্মুক্ত ৷ মহাবিশ্বের গোটাটাই তাঁর কাছে একখানা উন্মুক্ত গ্রন্থের মত ৷ মানব জাতির শুরু থেকে শেষ পর্যন্তই শুধু নয় ৷ লয় প্রাপ্তির পর তার অপর জীবনও তিনি যুগপৎ এক দৃষ্টিতে দেখছেন এবং শুধু অনুমান ও ধারণার ভিত্তিতে নয়, জ্ঞানের ভিত্তিতে মানুষকে পথপ্রদর্শন করেছেন ৷ এ গ্রন্থ যেসব সত্যকে তাত্বিকভাবে পেশ করে থাকে আজ পর্যন্ত তার কোন একটিকে ভুল বা মিথ্যা বলে প্রমাণ করা যায়নি ৷ বিশ্ব-জাহান ও মানুষ সম্পর্কে সে যে ধারণা পেশ করে তা সমস্ত দৃশ্যমান বস্তু ও ঘটনাবলীর পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা পেশ করে এবং জ্ঞানের প্রতিটি শাখায় গবেষণার ভিত্তি রচনা করে ৷ দর্শন বিজ্ঞান এবং সমাজ বিজ্ঞানের সমস্ত সাম্প্রতিকতম প্রশ্নের জবাব তার বাণীতে বর্তমান এবং এসবের মধ্যে এমন একটা যৌক্তিক সম্পর্ক বিদ্যমান, যে, ঐগুলোকে ভিত্তি করে একটা পূর্ণাংগ সুসংবদ্ধ ও ব্যাপক চিন্তাপদ্ধতি গড়ে ওঠে ৷ তাছাড়া জীবনের প্রতিটি দিক সম্পর্কে সে মানুষকে যে বাস্তব পথনির্দেশনা দিয়েছে তা শুধু যে, সর্বোচ্চ মানের যুক্তিগ্রাহ্য ও অত্যন্ত পবিত্র তাই নয় ৷ বরং ১৪ শত বছর ধরে ভূপৃষ্ঠের বিভিন্ন আনাচে কানাচে অসংখ্য মানুষ কার্যত তার অনুসরণ করেছে ৷ আর অভিজ্ঞতা তাকে সর্বোত্তম ব্যবস্থা বলে প্রমাণিত করেছে ৷ এরূপ মর্যাদার মানব রচিত কোন গ্রন্থ কি দুনিয়ায় আছে কিংবা কোন সময় ছিল, যা এ গ্রন্থের মোকাবিলায় এনে দাঁড় করিয়ে যেতে পারে?

চারঃ এ গ্রন্থ পুরোটা একেবারে লিখে দুনিয়ার সামনে পেশ করা হয়নি ৷ বরং কতকগুলো প্রাথমিক নির্দেশনা নিয়ে একটি সংস্কার আন্দোলন শুরু করা হয়েছিল ৷ এরপর ২৩ বছর পর্যন্ত উক্ত আন্দোলন যেসব স্তর অতিক্রম করেছে তার অবস্থা ও প্রয়োজন অনুসারে ঐ আন্দোলনের নেতার মুখ দিয়ে এর বিভিন্ন অংশ কখনো দীর্ঘ ভাষণ এবং কখনো সংক্ষিপ্ত বাক্যের আকারে উচ্চারিত হয়েছে ৷ অতপর এ কার্যক্রম পূর্ণতা লাভের পর বিভিন্ন সময়ে মুখ থেকে উচ্চারিত এসব অংশ পূর্ণাংগ গ্রন্থের আকারে সাজিয়ে দুনিয়ার সামনে পেশ করা হয়েছে যাকে, 'কুরআন' নামে অভিহিত করা হয়েছে ৷ আন্দোলনের নেতার বক্তব্য হলো, এসব ভাষন ও বাক্য তার রচিত নয়, বরং তা বিশ্ব -জাহানের রবের পক্ষ থেকে তার কাছে নাযিল হয়েছে ৷ কেউ যদি একে ঐ নেতার নিজের রচিত বলে অভিহিত করে , তাহলে সে দুনিয়ার গোটা ইতিহাস থেকে এমন একটি নজির পেশ করুক যে, কোন মানুষ বছরের পর বছর নিজে একাধারে একটি বড় সংঘবদ্ধ আন্দোলনের নেতৃত্ব দিতে গিয়ে কখনো একজন বক্তা এবং কখনো একজন নৈতিক শিক্ষক, হিসেবে, কখনো একটি মজলূম দলের নেতা হিসেবে , কখনো একটি রাষ্ট্রের শাসক হিসেবে, কখনো আইন ও বিধান দাতা হিসেবে মোটকথা অসংখ্য ভিন্ন ভিন্ন পরিবেশ-পরিস্থিতি ও সময়ে ভিন্ন ভিন্ন মর্যাদায় অধিষ্ঠিত থেকে ভিন্ন ভিন্ন যেসব বক্তব্য পেশ করেছেন, কিংবা কথা বলেছেন, তা একত্রিত হয়ে একটি পূর্ণাংগ , সুসংবদ্ধ ও সর্বাত্মক চিন্তা ও কর্মপ্রণালীতে পরিণত হয়েছে এবং তার মধ্যে কোথাও কোন বৈপরীত্য পাওয়া যায় না , তার মধ্যে প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত একটিই মাত্র কেন্দ্রীয় ধারণা ও চিন্তার ধারাবাহিকতা সক্রিয় দেখা যায় ৷ প্রথম দিন থেকে তিনি তাঁর আন্দোলনের যে ভিত্তি বর্ণনা করেছিলেন শেষ দিন পর্যন্ত সে ভিত্তি অনুসারে আকীদা-বিশ্বাস ও কার্যাবলীর এমন একটি ব্যাপক ও সার্বজনীন আদর্শ নির্মাণ করেছেন যার প্রতিটি অংশ অন্যান্য অংশের সাথে পূর্ণরূপে সামঞ্জস্য রাখে এবং এ সংকলন অধ্যয়নকারী কোন দূরদৃষ্টি সম্পন্ন ব্যক্তিই একথা উপলব্ধি না করে পারবে না যে আন্দোলনের সূচনাকালে আন্দোলনকারীর সামনে আন্দোলনের শেষ পর্যায় পর্যন্ত গোটা আন্দোলনের পূর্ণাংগ চিত্র বর্তমান ছিল ৷ এমন কখনো হয়নি মধ্য পথে কোন স্থানে তাঁর মাথায় এমন কোন ধারণার উদ্ভব হয়েছে যা পূর্বে তার কাছে পরিস্কার ছিল না অথবা যা পরে পরিবর্তন এমন কোন মানুষ যদি কোন সময় জন্মগ্রহণ করে থাকে তাহলে তা দেখিয়ে দেয়া হোক ৷

পাঁচঃ যে নেতার মুখ থেকে এসব ভাষণ ও বাণীসমূহ উচ্চারিত হয়েছে, তিনি হঠাৎ কোন গোপন আস্তানা থেকে শুধু এগুলো শোনানোর জন্য বেরিয়ে আসতেন না এবং শোনাবার পর আবার কোথাও চলে যেতেন না ৷ এ আন্দোলন শুরু করার পূর্বেও তিনি মানব সমাজে জীবন যাপন করেছিলেন এবং পরও জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সবসময় ঐ সমাজেই থাকতেন ৷ মানুষ তার আলোচনা ও বক্তব্যের ভাষা এবং বাচনভংগীর সাথে ভালভাবে পরিচিত ছিল ৷ হাদীসসমূহ তার একটি বড় অংশ এখনও সংরক্ষিত আছে ৷ পরবর্তী সময়ের আরবী ভাষাবিজ্ঞ মানুষ যা পড়ে সহজেই দেখতে পারে না যে, সেই নেতার বাচনভংগী কেমন ছিল ৷ তার স্বাভাষী মানুষ সে সময়ও পরিস্কার উপলব্ধি করতো এবং আরবী ভাষা জানা মানুষ আজও উপলব্ধি করে যে, এ গ্রন্থের ( কুরআন, ) ভাষা ও বাকরীতি সেই নেতার ভাষা ও বাকরীতি থেকে অনেক ভিন্ন ৷ এমন কি তার ভাষণের মধ্যে যেখানে এ গ্রন্থের কোন বাক্যের উদ্ধৃতি আসে তখন উভয়ের ভাষার পার্থক্য সুস্পষ্টভাবে পরিলক্ষিত হয় ৷ এখন প্রশ্ন হচ্ছে, পৃথিবীতে কোন মানুষ কি কখনো দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন স্টাইলে বছরের পর বছর কথা বলার ভান করতে সক্ষম হয়েছে ব হতে পারে অথচ দুটিই যে, একই ব্যক্তির স্টাইলে , সে রহস্য কখনো প্রকাশ পায় না? এ ধরনের ভান বা অভিনয় করে আকস্মিক বা সাময়িকভাবে সফল হওয়া সম্ভব ৷ কিন্তু একাধারে ২৩ বছর পর্যন্ত এমনটি হওয়া কোনক্রমেই সম্ভব নয় যে, এক ব্যক্তি যখন আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা অহী হিসেবে কথা বলে তখন তার ভাষা ও স্টাইল এক রকম হবে আবার যখন নিজের পক্ষ থেকে কথা বলে যা বক্তৃতা করে তখন তার ভাষা ও স্টাইলে সম্পূর্ণ আরেক রকম হবে ৷

ছয়ঃ এ আন্দোলনের নেতৃত্ব দান কালে সেই নেতা বিভিন্ন পরিস্থিতিতে সম্মুখীন হয়েছেন ৷ কখনো তিনি বছরের পর বছর স্বদেশবাসী ও স্বগোত্রীয় লোকদের উপহাস, অবজ্ঞা ও চরম জুলুম -নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, কখনো তাঁর সংগী-সাথীদের ওপর এমন জুলুম করা হয়েছে যে, তারা দেশ ছেড়ে চল যেতে বাধ্য হয়েছেন ৷ কখনো শত্রুরা তাকে হত্যার ষড়যন্ত্র করেছে, কখনো তার নিজেকেই স্বদেশভূমি ছেড়ে হিজরত করতে হয়েছে ৷ কখনো তাঁকে চরম দারিদ্রকষ্ট সইতে এবং ভুখা জীবন কাটাতে হয়েছে ৷ কখনো তাঁকে একের পর এক লড়াইয়ের সম্মুখীন হতে হয়েছে এবং তাতে বিজয় ও পরাজয় উভয়টিই এসেছে ৷ কখনো তিনি দুশমনদের বিরুদ্ধে বিজয় লাভ করেছেন এবং যেসব দুশমন তাঁর ওপর নির্যাতন চালিয়েছিল তাদেরকেই তাঁর সামনে অধোবদন হতে হয়েছে ৷ কখনো তিনি এমন ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব লাভ করেছেন যা খুব কম লোকের ভাগ্যেই জুটে থাকে ৷ একথা স্পষ্ট যে, এ ধরনের নানা পরিস্থিতিতে কোন মানুষের আবেগ অনুভূতি এক রকম থাকতে পারে না ৷ এসব রকমারি ক্ষেত্র ও পরিস্থিতিতে সেই নেতা যখনই তার ব্যক্তিগত অবস্থান থেকে কথা বলেছেন তখনই তার মধ্যে স্বভাবসূলভ মানবোচিত আবেগ অনুভূতির প্রভাব পরিলক্ষিত হয়েছে যা এরূপ ক্ষেত্র ও পরিস্থিতিতে একজন মানুষের মনে সচারাচার সৃষ্টি হয়ে থাকে ৷ কিন্তু এসব পরিস্থিতিতে তার মুখ হতে আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা অহী হিসেবে যেসব কথা শোনা গিয়েছে তা ছিল মানবিক আবেগ-অনুভূতি থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত ৷ কোন একটি ক্ষেত্রেও কোন কট্রর সমালোচকও অঙ্গুলি নির্দেশ করে বলতে পারবে না যে, এখানে মানবিক আবেগ-অনুভূতির প্রভাব পড়েছে বলে পরিলক্ষিত হচ্ছে ৷

সাতঃ এ গ্রন্থে যে ব্যাপক ও পূর্ণাংগ জ্ঞান পাওয়া যায় তা সে যুগের আরববাসী, রোমান, গ্রীক, ও ইরানবাসীদের কাছে তো দূরের কথা এ বিংশ শতাব্দীর বড় বড় পণ্ডিতদেরও কারো ঝুলিতে নেই ৷ বর্তমানে অবস্থা এই যে, দর্শন , বিজ্ঞান এবং সমাজ বিদ্যার কোন একটি শাখার অধ্যয়নে গোটা জীবন কাটিয়ে দেয়ার পরই কেবল কোন ব্যক্তি জ্ঞানের সেই শাখার সর্বশেষ সমস্যাবলী জানতে পারে ৷ তারপর যখন গভীর দৃষ্টি নিয়ে সে কুরআন অধ্যয়ন করে তখন জানতে পারে যে, এ গ্রন্থে সেসব সমস্যার একটি সুস্পষ্ট জবাব বিদ্যমান ৷ এ অবস্থা জ্ঞানের কোন একটি শাখার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং যেসব জ্ঞান বিশ্ব-জাহান ও মানুষের সাথে কোনভাবে সম্পর্কিত তার সবগুলোর ক্ষেত্রেই সঠিক ৷ কি করে বিশ্বাস করা যেতে পারে যে, ১৪ শত বছর পূর্বে আরব -মরুর এক নিরক্ষর ব্যক্তি জ্ঞানের প্রতিটি শাখায় এমন ব্যাপক দক্ষ ছিল এবং তিনি প্রতিটি মৌলিক সমস্যা সম্পর্কে চিন্তা -ভাবনা করে সেগুলোর একটি পরিস্কার ও চূড়ান্ত জওয়াব খুঁজে পেয়েছিলেন?

কুরআনের মু'জিযা হওয়ার যদিও আরো অনেক কারণ আছে ৷ তবে কেউ যদি শুধু এ কয়টি কারণ নিয়ে চিন্তা করে তাহলে সে জানতে পারবে কুরআন নাযিল হওয়ার যুগে কুরআনের মু'জিযা হওয়া যতটা স্পষ্ট ছিল আজ তার চেয়ে অনেক গুণে বেশী স্পষ্ট এবং ইনশায়াল্লাহ কিয়ামত পর্যন্ত স্পষ্টতম হতে থাকবে
২৮. ইতিপূর্বে যেসব প্রশ্ন উত্থাপন করা হয়েছিলো তার উদ্দেশ্য ছিল মক্কার কাফেরদের বুঝানো যে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের রিসালাতের দাবীকে মিথ্যা সাব্যস্ত করার জন্য তারা যেসব কথা বলেছে তা কতটা অযৌক্তিক ৷ এ আয়াতে তাদের সামনে প্রশ্ন রাখা হয়েছে যে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে দাওয়াত পেশ করেছেন তার মধ্যে এমন কি আছে যে, জন্য তোমরা ক্রোধান্বিত হচ্ছো? তিনি তো একথাই বলেছেন যে, আল্লাহ তোমাদের স্রষ্টা এবং তোমাদের উচিত তারই বন্দেগী করা ৷ এতে তোমাদের ক্রোধান্বিত হওয়ার যুক্তিসংগত কি কারণ থাকতে পারে? তোমরা কি নিজে নিজেই সৃষ্টি হয়েছো, কোন স্রস্টা তোমাদের সৃষ্টি করেননি? নাকি তোমরা নিজেরাই নিজেদের স্রষ্টা? কিংবা এ বিশাল মহাবিশ্ব তোমাদের তৈরী? এসব কথার কোনটিই যদি সত্য না হয়, আর তোমরা নিজেরাই স্বীকার করো যে তোমাদের স্রষ্টা আল্লাহ আর এই বিশ্ব-জাহানের স্রষ্টাও তিনিই, তাহলে যে ব্যক্তি তোমাদের বলে, সেই আল্লাহই তোমাদের বন্দেগী ও উপাসনা পাওয়ার অধিকারী সেই ব্যক্তির প্রতি তোমরা এত ক্রোধান্বিত কেন? আসলে ক্রোধোদ্দীপক ব্যাপার তো যে স্রষ্টা নয় তার বন্দেগী করা এবং যিনি স্রষ্টা তার বন্দেগী না করা ৷ তোমরা মুখে একথা অবশ্যই স্বীকার করো যে, বিশ্ব-জাহান ও তোমাদের স্রষ্টা আল্লাহ ৷ কিন্তু সত্যিই যদি একথায় বিশ্বাস থাকতো তাহলে তার বন্দেগীর প্রতি আহবানকারীর পেছনে এভাবে আদাপানি খেয়ে লাগতে না ৷ এটা ছিল এমন একটি তীক্ষ্ণ ছুঁচালো প্রশ্ন যা মুশরিকদের আকীদা-বিশ্বাসের ভিত্তিমূলকেই কাঁপিয়ে দিয়েছে ৷ বুখারী ও মুসলিম বর্ণিত হাদীসে আছে, বদর যুদ্ধের পর বন্দী কুরাইশদের মুক্ত করার বিষয়ে আলেচনা করার জন্য মক্কার কাফেরদের পক্ষ থেকে জুবাইর ইবনে মুতয়িম মাদীনায় আসে ৷ তখন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মাগরিবের নামাযে ইমামতি করেছিলেন ৷ নামাযে তিনি সূরা তূর পড়েছিলেন ৷ তার নিজের বর্ণনা হচ্ছে , নবী ( সা) যখন সূরার এ আয়াত পড়েছিলেন তখন মনে হলো, আমার কলিজাটা বুঝি বক্ষ থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে ৷ সেদিন এ আয়াত শুনে তার মনে, ইসলাম বদ্ধমূল হয়েছিল ৷ পরবর্তী সময়ে এটি তার ইসলাম গ্রহণ করার একটি বড় কারণ হয়েছিল ৷
২৯. মক্কার কাফেরদের প্রশ্ন ছিল , শেষ পর্যন্ত আবদুল্লাহর পুত্র মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকেই কেন রসূর বানানো হলো? এটি তাদের সে প্রশ্নের জবাব ৷ এ জবাবের তাৎপর্য হচ্ছে, এসব লোককে গায়রুল্লাহ ইবাদতের গোমরাহী থেকে মুক্ত করার জন্য কাউকে না কাউকে তো রসূল বানিয়ে পাঠাতেই হতো ৷ এখন প্রশ্ন হলো, সে সিদ্ধান্ত কে গ্রহণ করবেন? আল্লাহ কাকে তাঁর রসূল মনোনীত করবেন আর কাকে করবেন না সে সিদ্ধান্ত কে গ্রহণ করবে? এরা যদি আল্লাহর মনোনীত রসূলকে মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে থাকে তাহলে তার অর্থ দাঁড়ায় এই যে, হয় তারা নিজেদেরকে আল্লাহর রাজ্যের মালিক মনে করে নিয়েছে ৷ নয়তো তারা ধারণা করে বসে আছে , যে বিশ্ব জাহানের মালিক মনিব তো আল্লাহ তা'য়ালাই থাকবেন, তবে সেখানে বাস্তব কর্তৃত্ব চলবে তাদের ৷
৩০. এ সংক্ষিপ্ত বাক্যসমূহে একটা বিরাট যুক্তি-তর্ক ধরা হয়েছে ৷ এর বিস্তারিত রূপ হলো, তোমরা যদি রসূলের কথা মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানাও তাহলে সত্যকে জানার জন্য তোমাদর কাছে কি উপায় ও মাধ্যম আছে? তোমাদের কেউ কি উর্ধজগতে আরোহণ করে আল্লাহ তা'আলা কিংবা তার ফেরেশতাদের নিকট থেকে সরাসরি একথা জেনে নিয়েছে যে, যেসব আকীদা-বিশ্বাসের ওপর তোমাদের বাতিল ধর্মের ভিত্তি স্থাপিত তা পুরোপুরি বাস্তব সম্মত ও সত্য? কেউ যদি এ দাবী করতে চায় তাহলে সে সামনে আসুক এবং বলুক, সে কবে কিভাবে উর্ধজগতে আরোহণের অধিকার লাভ করেছে, এবং সেখান থেকে কি জ্ঞান সে নিয়ে এসেছে? কিন্তু এটা যদি তোমাদের দাবী না হয়, তাহলে নিজেরাই ভেবে দেখো, বিশ্ব-জাহানের পালকর্তা আল্লাহর সন্তান আছে বলে তোমরা যে দাবী করছো তাও আবার কন্যা সন্তান-যাকে নিজের জন্য তোমরা লজ্জা ও অপমানের কারণ বলে মনে করো -এর চেয়ে অধিক হাস্যকর ধারণা আর কিছু হতে পারে কি? প্রকৃত জ্ঞান ছাড়াই তোমরা এ ধরনের স্পষ্ট মূর্খতার অন্ধাকারে হাতড়ে বেড়াচ্ছো, আর যে ব্যক্তি আল্লাহর পক্ষ থেকে তোমাদের সামনে জ্ঞানের আলো পেশ করেছে, তোমরা তার প্রাণের দুশমন হয়ে দাঁড়াচ্ছো ৷
৩১. প্রশ্নের মূল লক্ষ কাফেররা ৷ অর্থাৎ তোমাদের কাছে রসূলের যদি কোন স্বার্থ থাকতো এবং নিজের কোন ব্যক্তিগত স্বার্থের জন্য তিনি তৎপরতা দেখাতেন তাহলে তাঁর নিকট থেকে সরে যাওয়ার একটা যুক্তিসংগত কারণ অন্তত তোমাদের থাকতো ৷ কিন্তু তোমরা জান ও আন্দোলনের ব্যাপারে তিনি সম্পূর্ণ নিস্বার্থ, শুধু তোমাদের কল্যাণের জন্যই তিনি জীবনপাত করেছেন ৷ এরপরও ধির স্থির মন -মেজাজ নিয়ে তার কথা শোনার মত উদারতা তোমাদের না থাকার কি কারণ থাকতে পারে? এ প্রশ্নের মধ্যে একটি সুক্ষ্ম সমালোচনও বিদ্যমান ৷ সারা দুনিয়ার ভণ্ড ধর্মগুরুরা এবং ধর্মীয় আস্তানার সেবকদের মত আরবেও মুশরিকদের ধর্মীয় নেতা এবং পণ্ডিত পুরোহিতরা খোলাখুলি ধর্মীয় কারবার চালিয়ে যাচ্ছিল ৷ তাই তাদের সামনে প্রশ্ন রাখা হয়েছে যে, একদিকে আছে এসব ধর্ম ব্যবসায়ীরা যারা তোমাদের নিকট থেকে প্রকাশ্যে নজর-নিয়াজ এবং প্রতিটি ধর্মীয় কাজ আঞ্জাম দেয়ার জন্য পারিশ্রমিক আদায় করছে ৷ অপরদিকে এক ব্যক্তি সম্পূর্ণ নিস্বার্থভাবে, বরং নিজের ব্যবসায়-বাণিজ্য ধ্বংস করে অত্যন্ত যুক্তিসংগত প্রমাণ দিয়ে তোমাদেরকে দীনের সোজা পথ দেখানোর চেষ্ট করছে অথচ তোমরা তার নিকট থেকে সরে যাচ্ছো এবং তাদের দিকে দৌড়ে অগ্রসর হচ্ছো এটা চরম নির্বুদ্ধিতা ছাড়া আর কি?
৩২. অর্থাৎ রসূল তোমাদের সামনে যেসব সত্য পেশ করেছেন তা মিথ্যা প্রমাণ করার জন্য তোমাদের কাছে এমন কি প্রমাণ আছে যা পেশ করে দাবী করতে পারো দৃশ্যমান বস্তু ছাড়া চোখের আড়ালে যেসব সত্য লুকিয়ে আছে তোমরা যাদেরকে সরাসরি তা জানো? তোমরা কি সত্যিই জানো যে, আল্লাহ এক নন এবং তোমরা যাদেরকে উপাস্য বানিয়ে রেখেছো তারাও আল্লাহর গুণাবলী ও ক্ষমতা-ইখতিয়ারের অধিকারী? তোমরা কি সত্যিই ফেরেশতাদের দেখেছো; তারা যে মেয়ে তা জানতে পেরেছো এবং নাউযুবিল্লাহ আল্লাহর ঔরসেই তারা জন্ম নিয়েছে, তোমরা কি সত্যিই জানো যে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে কোন অহী আসেনি এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে কোন বান্দার কাছে তা আসতেও পারে না? তোমরা কি সত্যিই একথা জানতে পেরেছো যে, কিয়ামত সংঘটিত হবে না মৃত্যুর পরে আর কোন জীবন হবে না, আখেরাত কায়েম হবে না যেখানে মানুষের হিসেব-নিকেশ করে তাকে শাস্তি ও পুরস্কার দেয়া হবে? তোমরা এ ধরনের কোন জ্ঞানের দাবী করলে একথা লিখে দিতে কি প্রস্তুত আছ যে, তোমরা এ সম্পর্কে রসূলের পেশকৃত বর্ণনা ও তথ্য যে অস্বীকার করছো তার কারণ হলো পরদার পেছনে উঁকি দিয়ে তোমরা দেখে নিয়েছো, রসূল যা বলছেন তা বাস্তব ও সত্য নয় ৷ এখানে কেউ একথা বলে সন্দেহ প্রকাশ করতে পারেন যে, এ জবাব ঐ সব মানুষ যদি হঠকারিতার আশ্রয় নিয়ে তা লিখে দেয় তাহলে কি এসব যুক্তি অর্থহীন হয়ে পড়ে না? কিন্তু এরূপ সন্দেহ করা ভুল ৷ কারণ, হঠকারিতা করে যদি তা লিখেও দেয় তাহলেও যে সমাজে জন সমক্ষে এ চ্যালেঞ্জ পেশ করা হয়েছিল সেখানে সাধারণ মানুষ অন্ধ ছিল না ৷ প্রত্যেকেই জানতে পারতো , একথা নিছক হঠকারিতা করেই লিখে দেয়া হয়েছে এবং রসূলের বর্ণনাসমূহে এ জন্য অস্বীকার করা হচ্ছে না যে, তার অসত্য ও বাস্তবতা বিরোধী হওয়া সম্পর্কে কেউ প্রত্যক্ষ ও নির্ভুল জ্ঞান লাভ করেছে ৷
৩৩. মক্কার কাফেররা রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কষ্ট দেয়া ও তাঁকে হত্যা করার জন্য একত্রে বসে যে সলাপরামর্শ করতো ও ষড়যন্ত্র পাকাতো এখানে সেদিকে ইংগিত করা হয়েছে ৷
৩৪. এটি কুরআনের সুস্পষ্ট ভবিষ্যতবাণীসমূহের একটি ৷ মক্কী যুগের প্রথম দিকে যখন মুষ্টিমেয় সহায় সম্বলহীন মুসলমান ছাড়া রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাহ্যত আর কোন শক্তি ছিল না ৷ গোটা জাতিই তাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধরত ছিল এবং প্রত্যেকেই ইসলাম ও কুফরী শক্তির নিতান্তই অসম মোকাবিলা প্রত্যক্ষ করছিল ৷ কেউ-ই সে সময় ভাবতে পারেনি যে, কয়েক বছর পরই এখানে কুফরী শক্তির মূলোৎপাটিত হতে যাচ্ছে ৷ স্থুল দৃষ্টির অধিকারীরা দেখতে পাচ্ছিলো, কুরাইশ ও গোটা আরবের বিরোধিতা শেষ পর্যন্ত এ আন্দোলনকে উৎখাত করে ছাড়বে ৷ এ পরিস্থিতিতেও কাফেরদেরকে চূড়ান্ত ও পরিস্কার ভাষায় চ্যালেঞ্জ করে বলে দেয়া হয়েছে যে, এ আন্দোলনকে হেয় করার জন্য যত অপকৌশল ও ষড়যন্ত্র তোমরা করতে চাও তা করে দেখো ৷ ঐ ষড়যন্ত্র ও অপকৌশল উল্টো তোমাদের বিরোদ্ধেই যাবে ৷ তোমরা কখনো এ আন্দোলনকে পরাস্ত করতে সক্ষম হবে না ৷
৩৫. প্রকৃত ব্যাপার হলো , যাদেরকে তারা ইলাহ বানিয়ে রেখেছে প্রকৃতপক্ষে তারা ইলাহ নয় এবং শিরক আগাগোড়া একটি ভিত্তিহীন জিনিস ৷ তাই যে ব্যক্তি তাওহীদের আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন তাঁর সাথে আছে সত্যের শক্তি ৷ আর যারা শিরকের সহযোগিতা করছে, তারা একটি অবাস্তব ও অসত্য জিনিসের জন্য লড়াই করছে ৷ লড়াইয়ে শিরক কি করে বিজয় লাভ করবে?
৩৬. একথার উদ্দেশ্য এক দিকে কুরাইশ নেতাদের হঠকারিতার মুখোস খুলে দেয়া, অন্যদিকে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং তাঁর সংগী-সাথীদের সান্ত্বনা দেয়া ৷ নবী ( সা) ও সাহাবায়ে কেরামের মনে বারবার এ আকাংখা জাগতো যে, এসব লোককে আল্লাহর পক্ষ থেকে এমন কোন মু'জিযা দেখানো হোক যার দ্বারা মুহাম্মাদের ( সা) নবুওয়াতের সত্য বুঝতে পারবে ৷ তাই বলা হয়ছে , এরা যদি নিজ চোখে কোন মু'জিযাও দেখে তবুও তার কোন না কোন অপব্যাখ্যা করে কুফরীর ওপর অবিচল থাকার অজুহাত খুজে নেবে ৷ কারণ, তাদের মন ঈমান আনার জন্য প্রস্তুত নয় ৷ কুরাআন মজীদের আরো কয়েকটি স্থানেও তাদের এ হঠকারিতার উল্লেখ করা হয়েছে ৷ যেমন সূরা আনআমে বলা হয়েছে, আমি যদি তাদের কাছে ফেরেশতাও পাঠাতাম, মৃত ব্যক্তিরা এদের সাথে কথা বলতো এবং এদের চোখের সামনে সারা দুনিয়ার সবকিছু এনে জড়ো করে দিতাম তবুও এরা ঈমান আনতো না ৷ ( আয়াত ১১) সূরা হিজরে বলা হয়েছে, আমি যদি তাদের জন্য আসমানেরর কোন দরজা খুলেও দিতাম আর এরা প্রকাশ্য দিবালোকে সে দিকে উঠতে থাকতো তারপরও একথাই বলতো, আমাদের চোখ প্রতারিত হচ্ছে, আমাদেরকে যাদু করা হয়েছে ৷ ( আয়াত ১৫) ৷
৩৭. এটি সূরা আস সাজদার ২১ আয়াতের বিষয়বস্তুর পুনরাবৃত্তি ৷ সেখানে বলা হয়েছে "সেই বড় আযাবের পূর্বে আমি দুনিয়াতেই তাদেরকে কোন না কোন ছোট আযাবের স্বাদ ভোগ করাতে থাকবো ৷ হয়তো এরা তাদের বিদ্রোহত্মক আচরণ থেকে বিরত হবে" ৷ অর্থাৎ দুনিয়াতে মাঝে মাঝে ব্যক্তিগত ও জাতিগত পর্যায়ে আযাব নাযিল করে আমি তাদের একথা স্বরণ করিয়ে দিতে থাকবো যে, ওপরে কোন এক উচ্চতর শক্তি তাদের ভাগ্যের ফায়সালা করছে ৷ তাঁর ফায়সালা পরিবর্তন করার শক্তি কেউ রাখে না ৷ তবে যারা জাহেলিয়াতের মধ্যে ডুবে আছে তারা এ ঘটনাবলী থেকে পূর্বেও কোন শিক্ষা গ্রহণ করেনি এবং ভবিষ্যতেও কখনো করবে না ৷ দুনিয়াতে যেসব বিপর্যয় আসে তারা তার অর্থ বুঝে না ৷ তাই তারা এসব বিপর্যয়ের এমন এমন সব ব্যাখ্যা করে যা তাদেরকে সত্য উপলব্ধি করা থেকে আরো দূরে নিয়ে যায় ৷ নিজেদের নাস্তিকতা বা শিরকের ক্রুটি ধরা পড়ে তাদের মেধা ও মস্তিষ্ক এমন ব্যাখ্যার দিকে কখনো আকৃষ্ট হয় না ৷ একটি হাদীসে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ বিষয়টি ব্যক্ত করেছেন ৷ তিনি বলেছেনঃ

------------------------------

"মুনাফিক যখন অসুস্থ হয়ে পড়ে এবং পরে যখন সুস্থ হয়ে যায় তখন তার অবস্থা হয় সেই উটের মত যাকে তার মালিক বেঁধে রাখলো কিন্তু সে বুঝলো না তাকে কেন বেঁধে রাখা হয়েছিল এবং তারপর আবার যখন খুলে দিল তখনও সে কিছু বুঝলো না তাকে কেন ছেড়ে দেয়া হলো" ৷ ( আরো ব্যাখ্যার দেখুন, তাফহীমুল কুরআন, আল আম্বিয়া, টীকা ৪৫; আন নামল, টীকা ৬৬; আল আনকাবূত, টীকা ৭২ ও ৭৩) ৷

৩৮. আরেকটি অর্থ হতে পারে ধৈর্য ও দৃঢ়তার সাথে আপন প্রভুর নির্দেশ পালন করতে বদ্ধপরিকর থাকো ৷
৩৯. অর্থাৎ আমি তোমাদের রক্ষণাবেক্ষণ করছি ৷ তোমাদেরকে তোমাদের অবস্থার ওপর ছেড়ে দেইনি ৷
৪০. একথাটির কয়েকটি অর্থ হতে পারে এবং এখানে সবগুলো অর্থ গ্রহণীয় হওয়া অসম্ভব নয় ৷

একটি অর্থ হচ্ছে, তুমি যখনই কোন মজলিসে থেকে উঠবে আল্লাহর প্রশংসা ও তাসবীহ করে উঠবে ৷ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজেও এ নির্দেশ পালন করতেন এবং মুসলমানদেরকে নির্দেশ দিয়েছিলেন যে তারা যেন কোন মজলিস থেকে উঠার সময় আল্লাহর প্রশংসা ও তাসবীহ করে ৷ এভাবে সেই মজলিসে যেসব কথাবার্তা হয়েছে তার কাফ্ফারা হয়ে যায় ৷ আবু দাউদ, তিরমিযী, নাসায়ী, এবং হাকেম হযরত আবু হুরাইরার ( রা) মাধ্যমে নবীর ( সা) এ বাণী উদ্ধৃত করেছেন , যে ব্যক্তি কোন মজলিসে বসলো এবং সেখানে অনেক বাকবিতণ্ডা করলো সে যদি উঠে যাওয়ার সময় বলেঃ

------------------------------------------

"হে আল্লাহ! আমি তোমার প্রশংসাসহ তাসবীহ করছি ৷ আমি সাক্ষ দিচ্ছি, তুমি ছাড়া কোন মাবুদ নেই ৷ আমি তোমার কাছে ক্ষমা চাচ্ছি এবং তোমার কাছে তওবা করছি ৷ "

তাহলে সেখানে যেসব ভুল-ত্রুটি হবে আল্লাহ তা মাফ করে দেবেন ৷

এর দ্বিতীয় অর্থ হচ্ছে, যখন তোমরা ঘুম থেকে জেগে বিছানা ছাড়বে তখন তাসবীহসহ তোমার রবের প্রশংসা করো ৷ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এটিও নিজে আমল করতেন এবং ঘুম থেকে জেগে উঠার পর একথা গুলো বলার জন্য সাহাবীদের শিক্ষা দিয়েছিলেনঃ

-------------------------------------------

এর তৃতীয় অর্থ হচ্ছে, তোমরা যখন নামাযের জন্য দাঁড়াবে তখন আল্লাহর হামদ ও তাসবীহ দ্বারা তার সূচনা করো ৷ এ হুকুম পালনের জন্য নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নির্দেশ দিয়েছেন যে, তাকবীর তাহরীমার পর নামায শুরু করবে একথা বলেঃ

--------------------------------------------

এর চতুর্থ অর্থ হচ্ছে, যখন তোমরা আল্লাহর পথে আহবান জানানোর জন্য প্রস্তুত হবে তখন আল্লাহর প্রশংসা ও তাসবীহ দ্বারা তার সূচনা করো ৷ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ নির্দেশটিও স্থায়ীভাবে পালন করতেন ৷ তিনি সবসময় আল্লাহর প্রশংসা দ্বারা তার খুতবা শুরু করতেন ৷

তাফসীর বিশারদ ইবনে জারীর এর আরো একটি অর্থ বর্ণনা করেছেন ৷ সে অর্থটি হচ্ছে, তোমরা যখন দুপুরের আরামের পর উঠবে তখন নামায পড়বে ৷ অর্থাৎ যোহরের নামায ৷
৪১. এর অর্থ মাগরিব, ইশা এবং তাহাজ্জুদের নামায ৷ সাথে সাথে এর দ্বারা কুরআন তিলাওয়াত এবং আল্লাহর যিকরও বুঝানো হয়েছে ৷
৪২. তারকারাজির অস্তমিত হওয়ার অর্থ রাতের শেষভাগে এগুলোর অস্তমিত হওয়া এবং ভোরের আলো দেখা দেয়ার তার আলো নিষ্প্রভ হয়ে যাওয়া ৷ এটা ফজরের নামাযের সময় ৷