(৫১:৪৭) আসমানকে ৪৩ আমি নিজের ক্ষমতায় বানিয়েছি এবং সে শক্তি আমার আছে৷ ৪৪
(৫১:৪৮) যমীনকে আমি বিছিয়ে দিয়েছি৷ আমি উত্তম সমতলকারী৷৪৫
(৫১:৪৯) আমি প্রত্যেক জিনিসের জোড়া বানিয়েছি৷ ৪৬ হয়তো তোমরা এ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করবে৷৪৭
(৫১:৫০) অতএব আল্লাহর দিকে ধাবিত হও৷ আমি তাঁর পক্ষ থেকে তোমার জন্য স্পষ্ট সাবধানকারী৷
(৫১:৫১) আল্লাহর সাথে আর কউকে উপাস্য বানাবে না৷ আমি তাঁর পক্ষ থেকে তোমাদের জন্য স্পষ্ট সাবধানকারী৷ ৪৮
(৫১:৫২) এভাবেই হয়ে এসেছে৷ এদের পূর্ববর্তী জাতিসমূহের কাছেও এমন কোন রসূল আসেনি যাকে তারা যাদুকর বা পাগল বলেনি৷ ৪৯
(৫১:৫৩) এরা কি এ ব্যাপারে পরস্পর কোন সমঝোতা করে নিয়েছে ? না, এরা সবাই বরং বিদ্রোহী৷৫০
(৫১:৫৪) অতএব, হে নবী, তাদের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নাও৷ এ জন্য তোমার প্রতি কোন তিরস্কার বাণী নেই৷ ৫১
(৫১:৫৫) তবে উপদেশ দিতে থাকো৷ কেননা, উপদেশ ঈমান গ্রহণকারীদের জন্য উপকারী৷৫২
(৫১:৫৬) জিন ও মানুষকে আমি শুধু এ জন্যই সৃষ্টি করেছি যে, তারা আমার দাসত্ব ৫৩ করবে৷
(৫১:৫৭) আমি তাদের কাছে কোন রিযিক চাই না কিংবা তারা আমাকে খাওয়াবে ৫৪ তাও চাই না৷
(৫১:৫৮) আল্লাহ নিজেই রিযিকদাতা এবং অত্যন্ত শক্তিধর ও পরাক্রমশালী৷৫৫
(৫১:৫৯) তাই যারা জুলুম করেছে ৫৬ তাদের প্রাপ্য হিসেবে ঠিক তেমনি আযাব প্রস্তুত আছে যেমনটি এদের মত লোকেরা তাদের অংশ পুরো লাভ করেছে৷ সে জন্য এসব লোক যেন আমার কাছে তাড়াহুড়ো না করে৷৫৭
(৫১:৬০) যেদিনের ভয় তাদের দেখানো হচ্ছে পরিণামে সেদিন তাদের জন্য ধ্বংস রয়েছে৷
৪৩. আখেরাতের সপক্ষে ঐতিহাসিক প্রমাণাদি পেশ করার পর এখন তার সমর্থনে বাস্তব জগতের বিদ্যমান প্রমাণাদি পেশ করা হচ্ছে ৷
৪৪. মূল আয়াতাংশ ( ) ৷ ( ) অর্থ ক্ষমতা ও শক্তির অধিকারী এবং প্রশস্তকারী উভয়টিই হতে পারে ৷ প্রথম অর্থ অনুসারে এ বাণীর অর্থ হয় আমি কারো সাহায্যে এ আসমান সৃষ্টি করিনি, বরং নিজের ক্ষমতায় সৃষ্টি করেছি আর তা করা আমার সাধ্যের বাইরে ছিল না ৷ তা সত্ত্বেও তোমাদের মন-জগজে এ ধারণা কি কররে আসলো যে, আমি পুনরায় তোমাদের সৃষ্টি করতে পারবো না? দ্বিতীয় অর্থ অনুসারে একথার অর্থ দাঁড়ায় এ বিশাল বিশ্ব-জাহানকে একবার সৃষ্টি করেই ক্ষান্ত হইনি , বরং ক্রমাগত তার সম্প্রসারণ ঘটাচ্ছি এবং তার মধ্যে প্রতি মুহূর্তে সৃষ্টির নতুন নতুন বিস্ময়কর দিক প্রকাশ পাচ্ছে ৷ এরূপ মহা পরাক্রমশালী সৃষ্টিকারী সত্তার পুনরায় সৃষ্টি করার ক্ষমতাকে তোমরা অসম্ভব মনে করে নিয়েছো কেন?
৪৫. ১৮নং টীকায় এর ব্যাখ্যা করা হয়েছে ৷ আরো ব্যাখ্যার জন্য দেখুন তাফহীমূল কুরআন, আন নামল, টীকা, ৭৪; সূরা ইয়াসীমের ব্যাখ্যা, টীকা ২৯ এবং আয যুখরূফ, টীকা ৭ থেকে ১০ ৷
৪৬. অর্থাৎ জোড়ায় জোড়ায় সৃজনের নীতির ভিত্তিতে পৃথিবীর সমস্ত বস্তু সৃষ্টি করা হয়েছে ৷ একটি জিনিসের সাথে আরেকটি জিনিসের সম্মিলিত বা সংযোগ ঘটে এবং তাদের সংযুক্ত হওয়ার সাথে সাথে নানা রকমের যৌগিক বস্তু অস্তিত্ব লাভ করে ৷ এখানে কোন বস্তুই এমন স্বতন্ত্র ও একক নয় যে, অন্য কোন জিনিসের সাথে তার জোড়া হয় না ৷ প্রতিটি বস্তুই তার জোড়ার সাথে মিলে ফলপ্রসূ হয় ৷ ( আরো ব্যাখ্যর জন্য দেখুন, তাফহীমুল কুরআন, ইয়াসীন, টীকা ৩১; আয যুখরূফ, টীকা ১২) ৷
৪৭. অর্থাৎ গোটা বিশ্ব-জাহানকে জোড় বেঁধে সৃষ্টি করার নীতির ভিত্তিতে সৃষ্টি করা এবং পৃথিবীর সব জিনিস জোড়ায় জোড়ায় হওয়া এমন একটি সত্য যা আখেরাতের অনিবার্যতার সুস্পষ্ট সাক্ষ দিচ্ছে ৷ তোমরা যদি গভীরভাবে চিন্তা করো তাহলে তোমাদের বিবেক-বুদ্ধি এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারে যে, দুনিয়ার প্রতিটি জিনিসের যখন জোড়া আছে এবং কোন কিছু তার জোড়ার সাথে না মিশে ফলপ্রসূ হতে পারে না তখণ দুনিয়ার এ জীবন জোড়াহীন কি করে হতে পারে?আর আখেরাতই এর অনিবার্য জোড়া ৷ আখেরাত না থাকলে এ দুনিয়া একেবারেই নিষ্ফল হবে ৷ পরবর্তী বিষয় বুঝার জন্য এখানে একথাটিও ভাল করে বুঝে নিতে হবে যে, এ পর্যন্তকার গোটা আলোচনা যদিও আখেরাত সম্পর্কিত বিষয়েই হয়ে আসছে তা সত্ত্বেও এসব আলোচনা ও যুক্তিতর্ক থেকে তাওহীদের প্রমাণও পাওয়া যায় ৷ বৃষ্টির ব্যবস্থাপনা, পৃথিবীর গঠনাকৃতি, আসমানের সৃষ্টি, মানুষের নিজের অস্তিত্ব, গোটা বিশ্ব-জাহানে জোড়া বেঁধে সৃষ্টির নীতির বিস্ময়কর, কর্মকাণ্ড ও ফলাফল, এসব জিনিস যেমন আখেরাতের সম্ভাব্যতা ও অনিবার্যতার সাক্ষী তেমনি তা এ সাক্ষও পেশ করেছে যে, এ বিশ্ব-জাহান আল্লাহহীনও নয় কিংবা বহু খোদার রাজত্ব নয় বরং এক মহাজ্ঞানী ও মহাশক্তিমান আল্লাহই এর সৃষ্টিকর্তা, মালিক এবং ব্যবস্থাপক, ও শাসক ৷ তাই পরে এসব যুক্তি -প্রমাণের ভিত্তিতেই তাওহীদের দাওয়াত পেশ করা হচ্ছে ৷ তাছাড়া আখেরাত বিশ্বাস করার অনিবার্য ফল হচ্ছে মানুষ আল্লাহর বিরুদ্ধে বিদ্রোহাত্মক আচরণ পরিত্যাগ করে আনুগত্য ও দাসত্বের পথ অবলম্বন করে ৷ মানুষ ততক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহবিমুখ থেকে যতক্ষণ সে মনে করে যে, তাকে কারো সামনে জবাবদিহি করতে হবে না ৷ এবং তার পার্থিব জীবনের কাজ -কর্মের হিসেবও কারো কাছে দিতে হবে না ৷ যখনই এ ভ্রান্ত ধারণা দূরীভূত হবে সে মুহূর্তেই ব্যক্তির বিবেকের মধ্যে এ অনুভূতি জাগ্রত হয় যে, সে নিজেকে দায়িত্বমুক্ত মনে করে বড় ভুল করেছিলো ৷ এ অনুভূতিই তাকে আল্লাহর দিকে ফিরে আসতে বাধ্য করে ৷ একারণেই আখেরাতের সপক্ষে যুক্তি প্রমাণ পেশ করার পর পরই বলা হয়েছে, "অতপর আল্লাহর দিকে দ্রুত অগ্রসর হও" ৷
৪৮. এ বাক্যাংশ যদিও আল্লাহ তা'আলাই বাণী, কিন্তু এর বক্তা আল্লাহ তা'আলা নন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ৷ ব্যাপারটা যেন এই যে, আল্লাহ তাঁর নবীকে মুখ দিয়ে বলাচ্ছেন, যে, আল্লাহর দিকে দ্রুত অগ্রসর হও ৷ আমি তাঁর পক্ষ থেকে তোমাদের সাবধান করে দিচ্ছি ৷ এ ধরনের কথা উদাহরণ কুরআন মজীদের সর্বপ্রথম সূরা অর্থাৎ সূরা ফাতিহায় বিদ্যমান যেখানে বক্তব্য আল্লাহর কিন্তু বক্তা হিসেবে বান্দা কথাগুলো পেশ করে ৷ ( ) সেখানে যেমন একথা বলা হয়নি যে, হে ঈমানদারগণ, তোমরা তোমাদের রবের কাছে এভাবে দোয়া করো ৷ কিন্তু কথার ধরণ থেকে আপনা আপনি একথার ইংগিত পাওয়া যায় যে, এটা একটা দোয়া যা আল্লাহ তা'আলা তাঁর বান্দাদের শিখিয়ে দিচ্ছেন ৷ ঠিত তেমনি এখানেও বলা হয়নি যে, "হে নবী, তুমি এসব লোককে বলো" ৷ কিন্তু কথার ধরণ থেকে ইংগিত পাওয়া যাচ্ছে যে এতে আল্লাহ তা'আলার নির্দেশনা অনুসারে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাওহীদ গ্রহণের জন্য একটা আহবান পেশ করেছেন ৷ সূরা ফাতিহা ছাড়াও কুরআন মজীদের আরো কতিপয় স্থানে এ ধরনের বাণী বিদ্যমান যেখানে বক্তব্য আল্লাহর কিন্তু বক্তা কোথাও ফেরেশতা এবং কোথাও নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ৷ ঐ সব ক্ষেত্রে বক্তা কে তার সুস্পষ্টভাবে পেশ করা না হলেও কথার ধরণ থেকেই স্বতই প্রকাশ পায় যে, কার মুখ দিয়ে আল্লাহ তার বক্তব্য পেশ করেছেন ৷ উদাহরণ হিসেবে দেখুন, সূরা মারয়াম, ৬৪, ৬৫; আস সাফ্ফাত, ১৫৯ থেকে ১৬৭ ও সূরা আশ শূরা, ১০ ৷
৪৯. অর্থাৎ এ ঘটনা এই প্রথম সংঘটিত হয়নি যে, আল্লাহর প্রেরিত রসূলের মুখে আখেরাতের খবর এবং তাওহীদের দাওয়াত শুনে মানুষ তাঁকে যাদুকর ও পাগল বলছে ৷ রিসালাতের গোটা ইতিহাস সাক্ষী, মানব জাতির হিদায়াতের জন্য যখন থেকে রসূলের আগমন ধারা শুরু হয়েছে জাহেলরা তখন থেকে আজ পর্যন্ত একইভাবে এ নির্বুদ্ধিতার কাজটি বারবার করে যাচ্ছে ৷ যে রসূলই এসে এ মর্মে সাবধান করেছেন যে, তোমরা বহু সংখ্যক খোদার বান্দা নও, বরং একমাত্র আল্লাহই তোমাদের স্রষ্টা, উপাস্য এবং তোমাদের ভাগ্যের মালিক ও নিয়ন্তা, জাহেলরা তখনই এমর্মে হৈ চৈ শুরু করে দিয়েছে যে, এ ব্যক্তি যাদুকর ৷ সে তার যাদুর সাহায্যে আমাদের বিবেক-বুদ্ধি বিকৃত করতে চায় ৷ যে রসূলই এসে সাবধান করেছেন যে, তোমাদেরকে পৃথিবীতে দায়িত্ব মুক্ত করে ছেড়ে দেয়া হয়নি বরং জীবনের কাজ-কর্ম শেষ করার পর তোমাদেরকে তোমাদের সৃষ্টিকর্তা ও মালিকের সামনে হাজির হয়ে হিসেব দিতে হবে এবং সে হিসেবের পরিণামে নিজের কাজ-কর্মের প্রতিদান বা শাস্তি পেতে হবে, তাতে নির্বোধ লোকেরা বলে উঠেছে- এ লোকটি পাগল, এর বিবেক বুদ্ধি লোপ পেয়েছে ৷ আরে মৃত্যুর পরে কি আমারা পুনরায় জীবিত হবো?
৫০. অর্থাৎ এ কথা সুস্পষ্ট যে, হাজার হাজার বছর ধরে প্রতিটি যুগে বিভিন্ন দেশ ও জাতির লোকদের নবী-রসূলের দাওয়াতের মোকাবিলায় একই আচরণ করা এবং তাঁদের বিরুদ্ধে একই রকমের কথা বলার কারণ এ নয় যে, একটি সম্মেলন করে আগের ও পরের সমস্ত মানুষ সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যখনই কোন নবী এসে এ দাওয়াত পেশ করবে তখনই তাঁকে এ জবাব দিতে হবে ৷ স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে যে, তাহলে তাদের আচরণের এ সাদৃশ্য এবং একই প্রকৃতির জবাবের ক্রমাগত পুনরাবৃত্তি কেন? এর একমাত্র জবাব এই যে, অবাধ্যতা ও সীমালংঘন এদের সবার সাধারণ বৈশিষ্ট ৷ তাছাড়া এ আচরণের আর কোন কারণ নেই ৷ প্রত্যেক অজ্ঞ লোকেরাই যেহেতু আল্লাহর দাসত্ব থেকে মুক্ত ও তাঁর জিজ্ঞসাবাদ সম্পর্কে বেপরোয়া হয়ে পৃথিবীতে লাগামহীন পশুর মত জীবন যাপন করতে আগ্রহী, তাই শুধু এ কারণেই যিনিই তাদেরকে আল্লাহর দাসত্ব ও আল্লাহভীতিমূলক জীবন যাপনের আহবান জানিয়েছেন তাঁকেই তারা একই ধরাবাঁধা জবাব দিয়ে এসেছে ৷ এ আয়াত থেকে আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্যের ওপর আলোকপাত হয় ৷ সেটি হচ্ছে, হিদায়াত, গোমরাহী, নেক কাজ ও বদ কাজ, জুলুম ও ন্যায় বিচার এবং ধরনের আরো অনেক কাজ-কর্মের যেসব প্রবণতা ও উদ্দীপণা স্বভাবসূলভভাবেই মানুষের মধ্যে বিদ্যমান থাকে, উপায়-উপকরণের উন্নতির কারণে বাহ্যত তার রূপ -প্রকৃতি যত ভিন্নই প্রতিয়মান হোক না কেন, প্রত্যেক যুগে এ পৃথিবীর প্রতিটি কোণে একইভাবে তার বহির্প্রকাশ ঘটে ৷ আজকের মানুষ ট্যাং, বিমান ও হাইড্রোজেন বোমার সাহায্য যুদ্ধ করলেও এবং প্রাচীর যুগের মানুষ লাঠি ও পাথরের সাহায্য লড়াই করলেও যে মৌলিক কারণে মানুষে মানুষে লড়াই বাধে, তাতে চুল পরিমাণ পার্থক্যও আসেনি ৷ আজ থেকে ৬ হাজার বছর পূর্বে কোন নাস্তিকের গ্রহণের পেছনে যে চালিকা শক্তি কাজ করেছে বর্তমান যুগের কোন নাস্তিক তার নাস্তিকতার সপক্ষে যত যুক্তিই পেশ করুক না কেন তাকে এ পথে পরিচালিত করার পেছনেও হুবহু সেসব চালিকা শক্তিই কাজ করে ৷ যুক্তি-প্রমাণ পেশের ক্ষেত্রেও সে তার পূর্বাসূরীদের চেয়ে মৌলিকভাবে ভিন্ন কিছু বলে না ৷
৫১. এ আয়াতে দীনর তাবলীগের একটি নিয়ম বর্ণনা করা হয়েছে ৷ বিষয়টি ভালভাবে বুঝে নিতে হবে ৷ হকের দাওয়াত পেশকারী যখন যুক্তিসংগত প্রমাণাদিসহ কারো সামনে সুস্পষ্টভাবে দাওয়াত পেশ করে এবং তার সন্দেহ-সংশয় আপত্তি, ও যুক্তি-প্রমাণের জবাবও পেশ করে তখন সত্য প্রকাশ করার যে দায়িত্ব ও কর্তব্য তার ওপরে থাকে তা থেকে সে অব্যহতি লাভ করে ৷ এরপরও যদি সেই ব্যক্তি তার আকীদা-বিশ্বাস ও ধ্যাণ-ধারণার প্রতি অটল থাকে, তার দায়-দায়িত্ব হকের দাওয়াত পেশকারীর ওপর বর্তায় না ৷ এরপরও ঐ ব্যক্তির পেছনে লেগে থাকা, তার সাথে আলাপ-আলোচনা ও তর্ক-বিতর্ক করে নিজের সময় ব্যয় করা এবং কোন না কোনভাবে ঐ একজন মাত্র ব্যক্তিকে নিজের সমমনা বানানোকে নিজের একমাত্র কাজ মনে করা তার জন্য জরুরী নয় ৷ এ ক্ষেত্রে দাওয়াত পেশকারী তার কর্তব্য পালন করেছে ৷ সে মানতে না চাইলে না মানবে ৷ তার প্রতি ভ্রক্ষেপ না করার কারণে দাওয়াত পেশকারীকে এ অপবাদ দেয়া যাবে না যে, সে একজন মানুষের গোমরাহীর মধ্যে ডুবে থাকতে দিয়েছে ৷ কেননা, এখন সে নিজেই তার গোমরাহীর জন্য দায়ী ৷ রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে লক্ষ করে এ নিয়মটি বর্ণনা করার উদ্দেশ্য এ নয় যে, তিনি দীনের তাবলীগের জন্য অনর্থক মানুষের পেছনে লেগে যেতেন ৷ তাই আল্লাহ তাঁকে এ থেকে বিরত রাখতে চাইতেন ৷ প্রকৃতপক্ষে একথা বলার কারণ হচ্ছে, ন্যায় ও সত্যের দিকে আহবানকারী যখন যথাসাধ্য সর্বাধিক যুক্তিসংগত পন্থায় কিছু লোককে বুঝানোর দায়িত্ব পালন করেন এবং তাদের মধ্যে হঠকারীতা ও ঝগড়াটে মনোবৃত্তির লক্ষণ দেখে তাদেরকে এড়িয়ে যান তখন তারা তার পেছনে লেগে যায় এবং তার প্রতি এ বলে দোষারূপ করতে থাকে যে, আরে ভাই আপনি তো দেখছি ন্যায় ও সত্যের আচ্ছা ঝাণ্ডাবাহী ৷ কথা বুঝার জন্য আমরা আপনার সাথে আলোচনা করতে চাই ৷ কিন্তু আপনি আমাদের দিকে ফিরেও দেখেন না ৷ অথচ তাদের উদ্দেশ্য কথা বুঝা নয়, বরং নিজেদের উদ্দেশ্যমূলক বিতর্কের মধ্যে ন্যায় ও সত্যের দাওয়াত পেশকারীকে জড়ানো এবং শুধু তার সময় নষ্ট করাই তাদের লক্ষ্য হয়ে থাকে ৷ তাই আল্লাহ তা'আলা তাঁর পবিত্র কালামের মধ্যে সুস্পষ্ট ভাষায় বলে দিয়েছেন যে, "এ ধরনের মানুষের প্রতি ভ্রুক্ষেপ করো না, তাদের প্রতি ভ্রুক্ষেপ না করায় তোমাকে তিরস্কার করা যেতে পারে না৷" এরপর কোন ব্যক্তি একথা বলে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দোষারূপ করতে পারতো না যে, আপনি তো আমাদেরকে আপনার দীন বুঝানো জন্য আদিষ্ট ৷ তা সত্ত্বেও আপনি আমাদের কথার জবাব দেন না কেন?
৫২. এ আয়াতে দীন প্রচারের আরেকটি নিয়ম বর্ণনা করা হয়েছে ৷ ন্যায় ও সত্যের দাওয়াত প্রকৃত উদ্দেশ্য সেসব পূণ্যাত্মদের কাছে ঈমানের নিয়ামত পৌছিয়ে দেয়া, যারা নিয়ামতের মূল্য বুঝে এবং নিজেরা তা অর্জন করতে চায় ৷ কিন্তু দাওয়াত পেশকারী জানে না মানব সামজের লক্ষ লক্ষ মানুষের মধ্যে সেসব পূণ্যাত্ম কোথায় আছে ৷ তাই তার কাজ হচ্ছে, ব্যাপকভাবে তার দাওয়াতের কাজ ক্রমাগত চালিয়ে যাওয়া ৷ যাতে যেখানে যেখানে ঈমান গ্রহণ করার মত লোক আছে সেখানেই যেন তার কথা পৌছে যায় ৷ এ লোকেরাই তার প্রকৃত সম্পদ ৷ তাদের খুঁজে বের করাই তার মূল কাজ ৷ এদের বাছাই করে এনে আল্লাহর রাস্তায় দাঁড় করানো তার লক্ষ হওয়া উচিত ৷ মাঝ পথে আদম সন্তানদের যেসব বাজে উপাদানের সাথে তার সাক্ষাত হবে তাদের প্রতি ততক্ষন পর্যন্ত তার মনোযোগ দেয়া উচিত যতক্ষণ সে অভিজ্ঞতা দ্বারা না জানবে যে, এগুলো বাজে জিনিস ৷ তাদের বাজে ও ফাসাদ সৃষ্টিকারী হওয়া সম্পর্কে অবহিত হওয়ার পর এ পৃকৃতির লোকদের পেছনে তাঁর মূল্যবান সময় নষ্ট না করা উচিত ৷ কারণ, এরা তার উপদেশে উপকৃত হওয়ার মত মানুষ নয় ৷ এদের পেছনে শক্তি ব্যয় করার বরঞ্চ সেসব লোকের ক্ষতি হয় যারা এ উপদেশ দ্বারা উপকৃত হয় ৷
৫৩. অর্থাৎ আমি তাদেরকে অন্য কারো দাসত্বের জন্য নয় আমার নিজের দাসত্বের জন্য সৃষ্টি করেছি ৷ তারা আমার দাসত্ব করবে এ জন্য যে, আমি তাদের স্রষ্টা ৷ যখন অন্য কেউ তাদের সৃষ্টি করেনি তখন তার দাসত্ব করার কি অধিকার এদের আছে? তাছাড়া তাদের জন্য এটা কি করে বৈধ হতে পারে যে, এদের স্রষ্টা আমি অথচ এরা দাসত্ব করবে অন্যদের!

এখানে প্রশ্ন দেখা দেয় যে, আল্লাহ তা'আলা শুধু জিন ও মানুষের স্রষ্টা নন ৷ তিনি সমগ্র বিশ্ব-জাহান ও তাঁর প্রতিটি জিনিসের স্রষ্টা ৷ কিন্তু এখানে কেবল জিন ও মানুষ সম্পর্কে কেন বলা হয়েছে যে, আমি তাদেকে আমার ছাড়া আর কারো দাসত্বের জন্য সৃষ্টি করিনি? অথচ গোটা সৃষ্টির প্রতিটি অণু-পরমাণু শুধু আল্লাহর দাসত্বের জন্য ৷ এর জবাব হচ্ছে পৃথিবীতে জিন ও মানুষই শুধু সৃস্টি যাদের স্বাধীনতা আছে ৷ তারা তাদের ক্ষমতা ও ইখতিয়ারের গন্ডির মধ্যে আল্লাহ তা'আলার দাসত্ব করতে চাইলে কিংবা তাঁর দাসত্ব থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে চাইলে নেবে এবং আল্লাহ ছাড়া অন্যদের দাসত্ব করতে চাইলেও করতে পারে ৷ জিন ও মানুষ ছাড়া এ পৃথিবীতে আর যত সৃষ্টি আছে তাদের এ ধরনের কোন স্বাধীনতা নেই ৷ তাদের আদৌ কোন ক্ষমতা ও ইখতিয়ার নেই যে, তারা আল্লাহর দাসত্ব করবে না অন্য কারো দাসত্ব করতে পারবে ৷ তাই এখানে শুধু জিন ও মানুষ সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, তারা তাদের ক্ষমতা ও ইখতিয়ারের গণ্ডির মধ্যে তাদের নিজ স্রষ্টার আনুগত্য ও দাসত্ব থেকে মুখ ফিরিয়ে এবং স্রষ্টা ছাড়া অন্যদের দাসত্ব করে নিজেরা নিজেদের স্বভাব প্রকৃতির বিরুদ্ধে লড়াই করছে ৷ তাদের জানা উচিত যে, তাদেরকে একমাত্র স্রষ্টা ছাড়া আর কারো দাসত্বের জন্য সৃষ্টি করা হয়নি ৷ তাদের সোজা পথ হচ্ছে যে স্বাধীনতা তাদেরকে দেয়া হয়েছে তার অন্যায় ব্যবহার যেন না করে ৷ বরং স্বাধিনতার এ সীমার মধ্যে নিজ নিজ ইচ্ছা অনুসারে ঠিক তেমনিভাবে যেন আল্লাহর দাসত্ব করে যেভাবে তার দেহের প্রতিটি লোক তার ক্ষমতা ও ইখতিয়ার বিহীন সীমার মধ্যে তার দাসত্ব করছে ৷

এ আয়াতে 'ইবাদত' শব্দটিকে শুধু নামায রোযা এবং এ ধরনের অন্যান্য ইবাদত অর্থে ব্যবহার করা হয়নি ৷ তাই কেউ এর এ অর্থ গ্রহণ করতে পারে না যে জিন ও মানুষকে শুধু নামায পড়া রোযা রাখা এবং তাসবীহ তাহলীল করার জন্যই সৃষ্টি করা হয়েছে ৷ এ অর্থটিও এর মধ্যে শামিল আছে বটে, তবে এটা তার পূর্ণাংগ অর্থ নয় ৷ এর পূর্ণাংগ অর্থ হচ্ছে, জিন ও মানুষকে আল্লাহ ছাড়া অন্যের পূজা আনুগত্য আদেশ পালন ও বিনীত প্রার্থনার জন্য সৃষ্টি করা হয়নি ৷ অন্য কারো সামনে নত হওয়া, অন্য কারো নির্দেশ পালন করা , অন্য কাউকে ভয় করা, অন্য কারো রচিত দীন বা আদর্শের অনুসরণ করা অন্য কাউকে নিজের ভাগ্যের নিয়ন্তা মনে করা এবং অন্য কোন সত্তার কাছে প্রার্থনার জন্য হাত বাড়ানোর তাদের কাজ নয় ৷ ( আরো ব্যাখ্যার জন্য দেখুন, তাফহীমুল কুরআন, সূরা সাবার ব্যাখ্যা টীকা, ৬৩; আয যুমার, টীকা ২; আল জাসিয়া, টীকা ৩০) ৷

এ আয়াত থেকে আরো একটি অনুষাঙ্গিক বিষয় সুস্পষ্টভাবে প্রকাশ পায় ৷ তা হচ্ছে জিনেরা মানুষ থেকে স্বতন্ত্র একটি সৃষ্টি ৷ যারা দাবী কররে মানব জাতিরই কিছু সংখ্যক লোককে কুরআন জিন বলা হয়েছে, এর দ্বারা তাদের ধারণার ভ্রান্তি অত্যন্ত স্পষ্ট হয়ে যায় ৷ কুরআন মজীদের নিম্ন বর্ণিত আয়াতসমূহ এ সত্যেরই অনিস্বীকার্য প্রমাণ পেশ করে ( আল আন'আম , ১০০, ১২৮;আল আ'রাফ, ৩৮, ১৭৯; হূদ, ১১৯; আল হিজর, ২৭ থেকে ৩৩; বনী ইসরাঈল, ৮৮; আল কাহ্ফ, ৫০; আস সিজদা, ১৩; সাবা, ৪১; সাদ, ৭৫ ও ৭৬; হা-মীম আস সাজদা, ২৫; আল আহক্বাফ, ১৮; আর রহমান, ১৫, ৩৯, ৫৬; আন নাম্ল, টীকা ২৩, ৪৫;সূরা সাবার ব্যাখ্য টীকা২৪) ৷
৫৪. অর্থাৎ জিন ও মানুষের কাছে আমার কোন উদ্দেশ্য বাঁধা পড়ে নেই যে, এরা আমার দাসত্ব করলে আমার প্রভুত্ব চলবে আর এরা আমার দাসত্ব থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলে আমি আর আল্লাহ থাকতে পারবো না ৷ আমি তাদের বন্দেগী বা দাসত্বের মুখাপেক্ষী নই ৷ বরং আমার বন্দেগী করা তাদের প্রকৃতির দাবী ৷ এ উদ্দেশ্যেই তাদেরকে সৃষ্টি করা হয়েছে ৷ নিজ প্রকৃতির বিরুদ্ধে লড়াই করা তাদের নিজেরদেরই ক্ষতি ৷ "আমি তাদের কাছে রিযিক চাই না, কিংবা তারা আমাকে খাবার দান করুক তাও চাই না" একথাটির মধ্যে একটি সূক্ষ্ম ইংগিত আছে ৷ আল্লাহ বিমুখ লোকেরা পৃথিবীতে যাদের বন্দেগী করছে তারা সবাই প্রকৃতপক্ষে এসব বান্দার মুখাপেক্ষী ৷ এরা যদি তার প্রভুত্ব না চালায় তাহলে তা একদিনও চলবে না ৷ সে এদের রিযিক দাতা নয় এরাই বরং তাকে রিযিক পৌছিয়ে থাকে ৷ সে এদের খাওয়ায় না , এরাই তাকে খাইয়ে থাকে ৷ সে এদের প্রাণের রক্ষক নয়, বরং এরাই তাদের প্রাণ রক্ষা করে থাকে ৷ এরাই তাদের সৈন্য সামন্ত ৷ এদের ওপর নির্ভর করেই তাদের প্রভুত্ব চলে ৷ যেখানেই কেউ এ মিথ্যা প্রভুদের সহযোগী বান্দা হয়নি কিংবা বান্দারা তাদেরকে সহযোগিতা করা থেকে বিরত থেকেছে সেখানেই তাদের সব জৌলুস হারিয়ে গিয়েছে এবং দুনিয়ার মানুষ তাদের পতন দেখতে পেয়েছে ৷ সমস্ত উপাস্যের মধ্যে একমাত্র মহান ও মহা পরাক্রমশালী আল্লাহই এমন উপাস্য, নিজের ক্ষমতায়ই যাঁর প্রভূত্ব চলেছে ৷ যিনি তাঁর বান্দাদের নিকট থেকে কিছু নেন না, বরং তিনিই তাদের সবকিছু দেন ৷
৫৫. মূল আয়াতে ( ) শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে যার অর্থ দৃঢ় ও অটল যা কেউ নড়তে পারে না ৷
৫৬. এখানে জুলুম অর্থ বাস্তব ও সত্যের প্রতি জুলুম করা এবং নিজে নিজের প্রকৃতির প্রতি জুলুম করা ৷ পূর্বাপর প্রসংগ থেকে একথা প্রকাশ পাচ্ছে যে, এখানে জুলুম-নির্যাতনকারী বলতে সেসব মানুষকে বুঝানো হয়েছে যারা বিশ্ব-জাহানের রবকে বাদ দিয়ে অন্যদের দাসত্ব করছে, যারা আখেরাত অস্বীকার করছে, পৃথিবীতে নিজেদেরকে দায়িত্ব মুক্ত মনে করছে এবং সেসব নবী-রসূলদের অস্বীকার করছে যারা তাদেরকে প্রকৃত সত্য সম্পর্কে সতর্ক করার চেষ্টা করেছেন ৷
৫৭. কাফেররা দাবী করে বলতো যে, সে প্রতিফল দিবস আসার পথে কোথায় আটকে গেল, তা এসে পড়েছে না কেন? এটা কাফেরদের সে দাবীরই জবাব ৷