(৫১:২৪) হে নবী, ২১ ইবরাহীমের সম্মানিত মেহমানদের কাহিনী কি তোমার কাছে পৌঁছেছে? ২২
(৫১:২৫) তারা যখন তার কাছে আসলো, বললোঃ আপনার প্রতি সালাম৷ সে বললোঃ “আপনাদেরকেও সালাম- কিছু সংখ্যক অপরিচিত লোক৷ ২৩
(৫১:২৬) পরে সে নীরবে তার পরিবারের লোকদের কাছে গেল ২৪ এবং একটা মোটা তাজা বাছুর ২৫
(৫১:২৭) এনে মেহমানদের সামনে পেশ করলো৷ সে বললোঃ আপনারা খান না কেন?
(৫১:২৮) তারপর সে মনে মনে তাদের ভয় পেয়ে গেল৷ ২৬ তারা বললোঃ ভয় পাবেন না৷ তাছাড়া তারা তাকে এক জ্ঞানবান পুত্র সন্তান জন্মের সুসংবাদ দিল৷২৭
(৫১:২৯) একথা শুনে তার স্ত্রী চিৎকার করতে করতে অগ্রসর হলো৷ সে আপন গালে চপেটাঘাত করে বললোঃ বুড়ী বন্ধ্যা৷ ২৮
(৫১:৩০) তারা বললোঃ তোমার রব একথাই বলেছেন৷ তিনি মহাজ্ঞানী ও সর্বজ্ঞ৷ ২৯
(৫১:৩১) ইবরাহীম বললোঃ হে আল্লাহর প্রেরিত দূতগণ, আপনাদের অভিপ্রায় কি ? ৩০
(৫১:৩২) তারা বললোঃ আমাদেরকে একটি পাপী জাতির কাছে পাঠানো হয়েছে৷ ৩১
(৫১:৩৩) যাতে আমরা তাদের ওপর পোড়ানো মাটির পাথর বর্ষণ করি৷
(৫১:৩৪) যা আপনার রবের কাছে সীমালংঘনকারীদের জন্য চিহ্নিত আছে৷ ৩২
(৫১:৩৫) অতপর ৩৩ ঐ জনপদে যারা মু’মিন ছিলো তাদের সবাইকে বের করে নিলাম৷
(৫১:৩৬) আমি সেখানে একটি পরিবার ছাড়া আর কোন মুসলিম পরিবার পাইনি৷৩৪
(৫১:৩৭) অতপর যারা কঠোর আযাবকে ভয় করে তাদের জন্য সেখানে একটি নিদর্শন রেখে দিয়েছি৷ ৩৫
(৫১:৩৮) এ ছাড়া (তোমাদের জন্য নিদর্শন আছে) মূসার কাহিনীতে৷ আমি যখন তাকে স্পষ্ট প্রমাণসহ ফেরাউনের কাছে পাঠালাম ৩৬
(৫১:৩৯) তখন সে নিজের শক্তিমত্তার ওপর গর্ব প্রকাশ করলো এবং বললোঃ এ তো যাদুকর কিংবা পাগল৷ ৩৭
(৫১:৪০) অবশেষে আমি তাকে ও তার সৈন্যদেরকে পাকড়াও করলাম এবং সবাইকে সমুদ্রে নিক্ষেপ করলাম৷ আর সে তিরস্কৃত ও নিন্দিত হলো৷ ৩৮
(৫১:৪১) তাছাড়া (তোমাদের জন্য নিদর্শন আছে) আদ জাতির মধ্যে যখন আমি তাদের ওপর এমন অশুভ বাতাস পাঠালাম যে,
(৫১:৪২) তা যে জিনিসের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হলো তাকেই জরাজীর্ণ করে ফেললো৷ ৩৯
(৫১:৪৩) তাছাড়া (তোমাদের জন্য নিদর্শন আছে) সামূদ জাতির মধ্যে৷ যখন তাদের বলা হয়েছিলো, যে, একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত মজা লুটে নাও৷৪০
(৫১:৪৪) কিন্তু এ সতর্কীকরণ সত্ত্বেও তারা তাদের রবের হুকুম অমান্য করলো৷ অবশেষে তারা দেখতে দেখতে অকস্মাত আগমনকারী আযাব ৪১ তাদের ওপর আপতিত হলো৷
(৫১:৪৫) এরপর উঠে দাঁড়ানোর শক্তিও তাদের থাকলো না এবং তারা নিজেদের রক্ষা করতেও সক্ষম ছিল না৷৪২
(৫১:৪৬) আর এদের সবার পূর্বে আমি নূহের কওমকে ধ্বংস করেছিলাম৷ কারণ তারা ছিল ফাসেক৷
২১. এখান থেকে দ্বিতীয় রুকূ'র শেষ পর্যন্ত আম্বিয়া আলাইহিমুস সালাম এবং কিছু সংখ্যক অতীত জাতির পরিণতির প্রতি একের পর এক সংক্ষিপ্তভাবে ইংগিত দেয়া হয়েছে ৷ এর উদ্দেশ্য মানুষের মনে দুটি জিনিস বদ্ধমূল করে দেয়া ৷

একটি হচ্ছে, মানব ইতিহাসে আল্লাহর প্রতিদানের বিধান সবসময় কার্যকর আছে ৷ এ বিধানে নেককারদের জন্য পুরস্কার এবং জালেমদের জন্য শাস্তির দৃষ্টান্ত সবসময় কার্যকর দেখা যায় ৷ এটি এ বিষয়ের স্পষ্ট প্রমাণ যে, এ পার্থিব জীবনেও মানুষের সাথে তার স্রষ্টার আচরণ কেবল প্রাকৃতিক বিধান ( Physical Law) অনুসারে হয় না, বরং তার সাথে নৈতিক বিধানও ( Moral Law) সক্রিয় ৷ তাছাড়া এ গোটা বিশ্ব -জাহান সাম্রাজ্যের স্বভাবই যখন এই যে, যে সৃষ্টিকে বস্তুগত দেহে অবস্থান করে নৈতিক কাজ-কর্মের সুযোগ দেয়া হয়েছে তার সাথে পশু ও উদ্ভিদরাজির মত কেবল প্রাকৃতিক বিধান অনুসারে আচরণ করা হবে না, বরং তার নৈতিক কাজ-কর্মের ওপর নৈতিক প্রতিফলের বিধানও কার্যকর করা হবে তখন এ দ্বারা স্পষ্টতই বুঝা যায় যে, এ সাম্রাজ্যে এমন একটা সময় অবশ্যই আসতে হবে যখন এ প্রাকৃতিক জগতে মানুষের কাজ শেষ হয়ে যাওয়ার পর নিরেট নৈতিক আইননাসুরে তার নৈতিক কাজ-কর্মের ফলাফল পূর্ণরূপে প্রকাশ পাবে ৷ কারণ এ বস্তুজগতে তা পূর্ণরূপে প্রকাশ পেতে পারে না ৷

এ ঐতিহাসিক ইংগিতসমূহের মাধ্যমে দ্বিতীয় যে জিনিসটি মানুষের মনে বদ্ধমূল করানো হয়েছে তা হচ্ছে যেসব জাতিই আম্বিয়া আলাইহিমুস সালামের কথা মানেনি এবং নিজেদের জীবনের গোটা আচরণ তাওহীদ, রিসালাত ও আখেরাত অস্বীকৃতির ওপর ভিত্তি করে গড়ে তুলেছে শেষ পর্যন্ত তারা ধ্বংসের উপযুক্ত হয়ে গিয়েছে ৷ নবী-রসূলের মাধ্যমে আল্লাহর পক্ষ থেকে যে নৈতিক বিধান দেয়া হয়েছে এবং সে বিধানানুসারে আখেরাত মানুষের কাজ-কর্মের যে জবাবদিহি করতে হবে তা যে বাস্তব ও সত্য ইতিহাসের এ নিরবচ্ছিন্ন অভিজ্ঞতাই তার সাক্ষী ৷ কারণ যে জাতিই এ বিধানে তোয়াক্কা না করে নিজেকে দায়িত্ব ও জবাবদিহি মুক্ত মনে করে এ পৃথিবীতে তার করণীয় নির্ধারণ করেছে পরিণামে সে জাতি সরাসরি ধ্বংসের পথের দিকে অগ্রসর হয়েছে ৷
২২. ইতিপূর্বে কুরআন মজীদের তিনটি স্থানে এ কাহিনী বর্ণিত হয়েছে ৷ দেখুন, তাফহীমুল কুরআন, সূরা হূদ, ৬৯ থেকে ৭৬ আয়াত; সূরা আল হিজর, আয়াত ৫১থেকে ৬০; সূরা আল আনকাবূত, আয়াত ৩১ ও ৩২ টীকাসহ ৷
২৩. পূর্বাপর প্রসংগ অনুসারে এ আয়াতাংশের দুটি অর্থ হতে পারে ৷ একটি হচ্ছে, হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম নিজেই সে মেহমানদের বলেছিলেন যে, পূর্বে কখনো আপনাদের সাথে পরিচিত হওয়ার সুযোগ হয়নি ৷ আপনার হয়তো এ এলাকায় নতুন এসেছেন ৷ অপরটি হচ্ছে, তাদের সালামের জবাব দেয়ার পর হযরত ইবরাহীম মনে মনে বললেন কিংবা বাড়ীতে মেহেমানদারীর ব্যবস্থা করার জন্য যাওয়ার সময় তাদের খাদেমদের বললেন, এরা অপরিচিত লোক ৷ আগে কখনো এ এলাকায় এরূপ জাঁকজমক ও বেশভুষার লোক দেখা যায়নি ৷
২৪. অর্থাৎ নিজের মেহেমানদের একথা বলেননি যে, আপনাদের জন্য খাওয়ার ব্যবস্থা করেছি ৷ বরং তাদেরকে বসিয়ে রেখে নীরবে মেহমানদারীর ব্যবস্থা করতে চলে গিয়েছেন যাতে মেহমান সৌজন্যে খাতিরে একথা না বলে যে, এ কষ্ট স্বীকারের প্রয়োজন কি?
২৫. সূরা হুদের ( ) ভূনা বাছুর কথাটি আছে ৷ এখানে বলা হয়েছে যে, তিনি ভালভাবে বাছাই করে মোটা তাজা গো-বৎস ভূনা করিয়েছিলেন ৷
২৬. অর্থাৎ তাদের হাত যখন খাবরের দিকে এগুলো না , তখন ইবরাহীমের মনে ভয়ের সঞ্চার হলো ৷ গোত্রীয় জীবনধারায় কারো বাড়ীতে অপরিচিত মুসাফিরের খাবার গ্রহণ থেকে বিরত থাকা কোন অসদুদ্দেশে আগমনের লক্ষণ বলে মনে করা হয় ৷ এটাও তাঁর ভয়ের একটা কারণ হতে পারে ৷ তবে খুব সম্ভব, খাবার গ্রহণ থেকে তাদের বিরত থাকাতেই হযরত ইবরাহীম বুঝে ফেলেছিলেন যে, তারা ফেরেশতা, মানুষ রূপ ধরে এসে এখানে এসেছে ৷ তাছাড়া মানুষের আকৃতিতে ফেরেশতাদের আগমন যেহেতু অস্বাভিবক পরিস্থিতিতেই হয়ে থাকে তাই তিনি আশংকা করেছিলেন, কোন ভয়ংকর পরিস্থিতি আসন্ন , যার কারণে এসব ফেরেশতা এভাবে আগমন করেছে ৷
২৭. সূরা হূদে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, এটা ছিল হযরত ইসহাক আলাইহিস সালামের জন্মের সুসংবাদ ৷ এর মধ্যে এ সুসংবাদও আছে যে, হযরত ইসহাকের ঔরসে তিনি হযরত ইয়া'কুব আলাইহিস সালামের মত নাতিও লাভ করবেন ৷
২৮. অর্থাৎ একদিকে আমি বুড়ী অপর দিকে বন্ধ্যা ৷ এমন অবস্থায় আমার সন্তান হবে? বাইবেলে বলা হয়েছে , সে সময় হযরত ইবরাহীমের বয়স ছিল এক'শ বছর এবং হযরত সারার বয়স ছিল ৯০ বছর ৷ ( আদি পুস্তক, ১৮:১৭)
২৯. এ কাহিনী বলার উদ্দেশ্য হচ্ছে, আল্লাহর যে বান্দা দুনিয়ায় আল্লাহর বন্দেগীর হক যথাযথভাবে আদায় করেছিল আখেরাতে তার সাথে যে আচরণ হবার তাতো হবেই ৷ এ দুনিয়াতেও তাকে এভাবে পুরস্কৃত করা হয়েছে যে, সাধারণ প্রাকৃতিক বিধান অনুসারে যে বয়সে সন্তান হওয়ার কথা ছিল না এবং তার স্ত্রীও সারা জীবন নিঃসন্তান থেকে চূড়ান্তভাবে নিরাশ হয়ে পড়েছিলো সেই বয়সে আল্লাহ তাকে সন্তান দান করেছেন শুধু তাই নয় এমন নজীরবিহীন সন্তান দান করেছেন যা আজ পর্যন্ত কারো ভাগ্যে জোটেনি ৷ এ পৃথিবীতে দ্বিতীয় এমন কোন মানুষ নেই যার বংশ পর পর চারজন নবী জন্মলাভ করেছেন ৷ হযরত ইবরাহীমই ( আ) ছিলেন এমন ব্যক্তিত্ব যার বংশে অধস্তন তিন পুরুষ পর্যন্ত নবুওয়াতের ধারা নিরবিচ্ছিন্নভাবে চলেছিলো এবং তার পরিবারেই হযরত ইসমাঈল , হযরত ইসহাক, হযরত ইয়া'কুব এবং হযরত ইউসূফ আলাইহিমুস সালামের মত মহা সম্মানিত নবীদের জন্ম হয়েছিলো ৷
৩০. মানুষের আকৃতিতে ফেরেশতাদের যেহেতু কোন বড় গুরুত্বপূর্ণ কাজের জন্য হয়ে থাকে তাই তাদের আগমনের উদ্দেশ্য অবহিত হওয়ার জন্য হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম ( ) শব্দ ব্যবহার করেছেন ৷ আরবী ভাষায় ( ) শব্দটি কোন মামুলি কাজের জন্য ব্যবহৃত হয় না, বরং কোন বড় গুরুত্বপূর্ণ কাজ বুঝাতে ব্যবহৃত হয় ৷
৩১. অর্থাৎ লূতের ( আ) জাতি ৷ তাদের অপরাধ এতটা বৃদ্ধি পেয়েছিলো যে, 'অপরাধী জাতি'শুধু এ শব্দটাই জাতি হিসেবে তাদের পরিচয়ের জন্য যথেষ্ট ছিল ৷ এর আগে কুরআন, মজীদের নিম্ন বর্ণিত স্থানসমূহে এ বিষয়ে উল্লেখ করা হয়েছে ৷ তাফহীমুল কুরআন, সূরা সা'দ আয়াত ৮০ থেকে ৮৪; হূদ, ৭৩ থেকে ৮৩ সূরা আল আম্বিয়া, আয়াত ৭৪, ৭৫;সূরা আশ'শুয়ারা, ১৬০ থেকে ১৭৫;আন নামল, ৫৪থেকে ৫৮ ও ৬৩ থেকে ৬৮;সূরা সাফ্ফাত, ১৩৩ থেকে ১৩৮ টীকাসহ ৷
৩২. অর্থাৎ কোন পাথরটি কোন অপরাধীর মস্তক চূর্ণ করবে আপনার রবের পক্ষ থেকে তা ঐ পাথরের গায়ে চিহ্নিত করা হয়েছে ৷ সূরা হূদ ও আল হিজরে এ আযাবের যে বিস্তারিত বিবরণ দেয়া হয়েছে তা হচ্ছে, তাদের জনপদসমূহ ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে এবং ওপর থেকে পোড়ানো মাটির পাথর বর্ষন করা হয়েছে ৷ এ থেকে ধারণ করা যায় যে, প্রচণ্ড ভূমিকম্পে গোটা অঞ্চল উলটপালট করে দেয়া হয়েছে এবং যারা ভূমিকম্প থেকে রক্ষা পেয়ে পালিয়েছিলো আগ্নেয়গিরির লাভার সাথে নির্গত পাথর-বৃষ্টি তাদেরকে ধ্বংস করে দিয়েছে ৷
৩৩. এ ফেরেশতারা হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালামের নিকট থেকে কিভাবে হযরত লূতের ( আ) কাছে পৌছলো এবং সেখানে তাদের ও লূতের ( আ) জাতির মাঝে কি ঘটলো সেসব কাহিনীর বর্ণনা এখানে বাদ দেয়া হয়েছে ৷ সূরা হূদ আল হিজর ও আল আনকাবুতে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা আগেই করা হয়েছে ৷ যে সময় এ জাতির ওপর আযাব নাযিল হতে যাচ্ছে এখানে শুধু সেই চরম মুহুর্তের কথা উল্লেখ করা হয়েছে ৷
৩৪. অর্থাৎ গোটা জাতি ও এলাকায় একটি মাত্র পরিবার ছিল যেখানে ইসলামের আলো বিদ্যমান ছিল ৷ আর সেটা ছিল হযরত লূত আলাইহিস সালামের পরিবার ৷ এ ছাড়া গোটা জাতি অশ্লিলতা ও পাপাচারে ডুবে ছিল এবং তাদের গোটা দেশ পঙ্কিলতায় ভরে উঠেছিলো ৷ তাই আল্লাহ তা'আলা সেই একটি পরিবারের লোকজনকে রক্ষা করে বের করে নিলেন এবং তারপর সেই দেশে এমন প্রলয়ঙ্কারী আযাব নাযিল করলেন যে, এ দুশ্চরিত্র জাতির একটি লোকও রক্ষা পায়নি ৷ এ আয়াতেটিতে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বর্ণিত হয়েছেঃ

একঃ আল্লাহর প্রতিফল বিধান কোন জাতিকে ততদিন পরিপূর্ণরূপে ধ্বংস করার ফায়সালা করে না যতদিন তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কোন ভালো গুণ বিদ্যমান থাকে ৷ খারাপ লোকদের সংখ্যাধিক্যের মধ্যে নগণ্য সংখ্যক কিছু লোকও যদি অকল্যাণকে প্রতিরোধ করার এবং কল্যাণের পথের দিকে ডাকার জন্য তৎপর থাকে এবং তাদের কল্যাণকারিতা এখনো নিঃশেষ হয়ে না থাকে তাহলে তাদেরকে আরো কিছুকাল কাজ করার সুযোগ দেন এবং তাদের অবকাশকাল বাড়িয়ে দিতে থাকেন ৷ কিন্তু অবস্থা যদিও এই দাঁড়ায় যে, কোন জাতির মধ্যে যৎসামান্য সদগুণও অবশিষ্ট না থাকে সে ক্ষেত্রে আল্লাহর বিধান হচ্ছে, উক্ত জনপদে যে দু'চারজন লোক অকল্যাণের বিরুদ্ধে লড়াই করতে করতে ক্লান্ত হয়ে নেতিয়ে পড়েছে, তিনি তার মহা ক্ষমতাধীনে কোন না কোনভাবে রক্ষা করে নিরাপদে বের করেন এবং অবশিষ্ট লোকদের সাথে ঠিক তেমনি আচরণ করেন, যে আচরণ একজন সুস্থ বিবেক-বুদ্ধি সম্পন্ন লোক পঁচা ফলের সাথে করে থাকে ৷

দুইঃ 'মুসলমান' কেবল হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামে উম্মতের নাম নয় ৷ তাঁর পূর্বের সমস্ত নবী-রসূল ও তাঁদের উম্মতও মুসলমান ছিলেন ৷ তাঁদের দীনও ভিন্ন ভিন্ন ছিল না যে, কোনটা ইবরাহীমের দীন, কোনটা মূসার দীন আবার কোনটা ঈসার দীন বলে আখ্যায়িত হতে পারে ৷ তারা সবাই ছিলেন মুসলমান এবং তাদের দীনও ছিল এ ইসলাম ৷ কুরআন মজীদের বিভিন্ন জায়গায় এ সত্যটি এমন সুষ্পষ্টভাবে বর্ণনা করা হয়েছে যে, তাতে কোন সন্দেহের অবকাশ নেই ৷ উদাহরণ স্বরূপ নিম্নবর্ণিত আয়াতগুলো দেখুনঃ আল বাকারা, ১২৮. , ১৩১, ১৩২ ও ১৩৩;আলে ইমরান, ৬৭; আল মায়েদা, ৪৪ও ১১১; ইউনুস, ৭২ ও ৮৪ ; ইউসূফ, ১০১;আল আ'রাফ, ১২৬ও আল নাহল, ৩১, ৪২ ও ৪৪ ৷

তিনঃ 'মু'মিন'ও 'মুসলিম'শব্দ দুটি এ আয়াতে সম্পূর্ণ সমার্থক শব্দ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে ৷ এ আয়াতটি যদি সূরা হুজরাতের ১৪ আয়াতের সাথে মিলিয়ে পড়া যায় তাহলে সেসব লোকদের ধারণার ভ্রান্তি পুরোপুরি স্পষ্ট হয়ে ওঠে যারা মু'মিন ও মুসলিম শব্দকে কুরআন মজীদের এমন দুটি স্বতন্ত্র পরিভাষা বলে মনে করে যা সবখানে একই অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে এবং এও মনে করে যে, ঈমান ছাড়াই যে ব্যক্তি বাহ্যত ইসলামের গণ্ডির মধ্যে প্রবেশ করেছে সে -ই নিশ্চিত মুসলিম ৷ ( অধিক ব্যাখ্যার জন্য দেখুন, তাফহীমুল কুরআন, সূরা হুজরাতের ব্যাখ্যা , টীকা ৩১) ৷
৩৫. এ নিদর্শন অর্থ মরু সাগর ৷ ( Dead Sea) বর্তমানেও যার দক্ষিণাঞ্চল এক সাংঘাতিক ধ্বংসের নিদর্শন পেশ করছে ৷ প্রত্নতাত্মিক বিশেষজ্ঞদের ধারণ এই যে, লূতের ( আ) জাতির বৃহৎ শহর খুব সম্ভবত প্রচণ্ড ভূমিকম্পে ধসে ভূগর্ভে তলিয়ে গিয়েছিলো এবং তার উপরিভাবে মরু সাগরের পানি ছেয়ে গিয়েছিলো ৷ কারণ, এই সাগরের যে অংশ আল লিসান নামক ক্ষুদ্র উপদ্বীপের দক্ষিণে অবস্থিত তা পরবর্তী সময়ে সৃষ্ট বলে পরিস্কারভাবে বুঝা যায় এবং এ উপদ্বীপের উত্তর প্রান্ত পর্যন্ত প্রাচীন মরু সাগরের যেসব নিদর্শন দেখা যায় তা দক্ষিণের নিদর্শন থেকে ভিন্ন প্রকৃতির ৷ এ থেকে অনুমান করা হয় যে, উপদ্বীপের দক্ষিণের অংশ আগে মরু সাগর পৃষ্ঠ থেকে উচু ছিল ৷ পরবর্তীকালে কোন সময় ধসে নীচে দেবে গিয়েছে ৷ এর ধসে যাওয়ার সময়টাও খৃষ্টপূর্ব দু'হাজার সনের সম-সাময়িক বলে মনে হয় ৷ ঐতিহাসিকভাবে এটাই হযরত ইবরাহীম ও হযরত লূতের ( আ) যুগ ৷ ১৯৬৫ সালে একদল আমেরিকান প্রত্মতাত্বিক অনুসন্ধানী আল লিসানে এক বিশাল কবরস্থান আবিস্কার করেছে যেখানে ২০ হাজারের অধিক কবর আছে ৷ এ থেকে অনুমতি হয় যে, নিকটেই কোন বড় শহর অবশ্যই থাকবে ৷ কিন্তু আশেপাশে কোথাও এমন কোন শহরের নিদর্শন নেই যার পাশেই এত বড় কবরস্থান গড়ে উঠতে পারে ৷ এ থেকেও এসন্দেহ দৃঢ়মুল হয় যে, এটি যে শহরের কবরস্থান ছিল তা সাগরে নিমজ্জিত হয়েছে ৷ সাগরের দক্ষিণে যে এলাকা অবস্থিত সেখানে এখনো যত্রযত্র ধ্বংসের নিদর্শন বিদ্যমান এবং ভূমিতে গন্ধক, আলকাতরা, কয়লাজাত পিচ ও প্রাকৃতিক গ্যাসের এমন বিপুল মজুদ বর্তমান যা দেখে ধারণা জন্মে যে, এখানে কোন এক সময় বজ্রপাত হওয়ার কিংবা ভূমিকম্পের কারণে লাভা উদগীরণ হওয়ার ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের সৃষ্টি হয়ে থাকবে ( অধিক ব্যখ্যার জন দেখুন তাফহীমুল কুরআন, আশ'শুআরা, টীকা১১৪) ৷
৩৬. অর্থাৎ এরূপ সুস্পষ্ট মু'জিযা এবং প্রকাশ্য নিদর্শনসহ পাঠিয়েছিলেন যে, তিনি যে আসমান ও যমীনের স্রস্টার পক্ষ থেকে আদিষ্ট হয়ে এসেছিলেন সে বিষয়টি আর সন্দেহযুক্ত ছিল না ৷
৩৭. অর্থাৎ কোন সময় সে তাঁকে যাদুকর বলে আখ্যায়িত করেছিলো আবার কখনো বলেছিলো এ ব্যক্তি পাগল ৷
৩৮. এ ক্ষুদ্র বাক্যাংশটিতে ইতিহাসের একটি পূর্ণাংগ ঘটনা তুলে ধরা হয়েছে ৷ ঘটনাটা বুঝার জন্য কল্পনার চোখের সামনে এ চিত্রটি একটু নিয়ে আসুন যে, ফেরাউন তৎকালীন পৃথিবীর সভ্যতা ও সংস্কৃতির সবচেয়ে বড় কেন্দ্রের শক্তিধর শাসক ছিল, যার জাঁকজমক ও প্রভাব প্রতিপত্তিতে আশেপাশে সমস্ত জাতি ভীত সন্ত্রস্ত ছিল ৷ এ কথা সুবিদিত যে, হঠাৎ যখন সে তার সৈন্য সামন্তসহ পানিতে ডুবে মরলো তখন শুধু মিশরেই নয়, আশেপাশের সমস্ত জাতির মধ্যে এ ঘটনা ব্যাপাক প্রচার লাভ করে থাকবে ৷ কিন্তু এতে ডুবে মরা লোকদের নিকটাত্মীয় ছাড়া আর কেউই এমন ছিলো না যারা তাদের নিজের দেশে কিংবা পৃথিবীর অন্য কোন জাতির মধ্যে তাদের জন্য শোক প্রকাশ করতো, কিংবা অন্তত এতোটুকুই বলতো যে, হায়! এ দুর্ঘটনার শিকার লোকেরা কত ভাল মানুষ ছিল ৷ পক্ষান্তরে পৃথিবী যেহেতু তাদের জুলুম-অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিলো তাই তাদের এ দৃষ্টান্তমূলক পরিণতিলাভের কারণে প্রতিটি মানুষ স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেছিলো ৷ প্রতিটি মুখই তাদের ওপর তিরস্কার ও নিন্দাবাদ বর্ষণ করেছে এবং যে-ই খবরটি শুনেছে সে-ই বলে উঠছে, এ দূরাচার তার উপযুক্ত পরিণতিই ভোগ করেছে ৷ সূরা দুখানে এ অবস্থাটা এভাবে বর্ণনা করা হয়েছেঃ ( ) "অতপর না আসমান তাদের জন্য কেঁদেছে না যমীন তাদের জন্য অশ্রুবর্ষণ করেছে" ৷ ব্যাখ্যার জন্য দেখুন, তাফহীমুল কুরআন, সূরা দুখান, টীকা২৫) ৷
৩৯. এ বাতাসের জন্য ( ) শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে যা বন্ধ্যা নারীদের বুঝাতে ব্যবহৃত হয়ে থাকে ৷ অভিধানে এর প্রকৃত অর্থ ( ) বা শুষ্ক ৷ যদি শব্দটিকে আভিধানিক অর্থে গ্রহণ করা হয় তাহলে এর অর্থ হবে, তা ছিল এমন প্রচণ্ড গরম ও শুষ্ক বাতাস যে, তা যে জিনিসের ওপর দিয়েই প্রবাহিত হয়েছে তাকে শুষ্ক করে ফেলেছে ৷ আর যদি শব্দটিকে পারিভাষিক অর্থে গ্রহণ করা হয় তাহলে তার অর্থ হবে তা ছিল বন্ধ্যা নারীর মত এমন হওয়া যার মধ্যে কোন কল্যাণ ছিল না ৷ তা না ছিল আরামদায়ক, না ছিল বৃষ্টির বাহক ৷ না ছিল বৃক্ষরাজীকে ফলবানকারী না এমন কোন কল্যাণ তার মধ্যে ছিল যে জন্য বাতাস প্রবাহিত হওয়া কামনা করা হয় ৷ অন্য স্থানসমূহে বলা হয়েছে এ বাতাস শুধু কল্যাণহীন ও শুষ্কই ছিল না বরং তা প্রচণ্ড ঝড়ের আকারে এসেছিলো যা মানুষকে শূন্যে তুলে তুলে সজোরে আছড়িয়ে ফেলেছে এবং এ অবস্থা একাদিক্রমে আটদিন ও সাত রাত পর্যন্ত চলেছে ৷ এভাবে আদ জাতির গোটা এলাকা তছনছ করে ফেলেছে ( ব্যাখ্যার জন্য দেখুন , তাফহিমূল কুরআন, সূরা হা-মীম আস সাজদার তাফসীর, টীকা ২০-২১ ও আল আহক্বাফ, টীকা ২৫ থেকে ২৮) ৷
৪০. এখানো কোন অবকাশ বুঝানো হয়েছে সে ব্যাপারে মুফাস্সিরদের মধ্যে মতভেদ আছে ৷ হযরত কাতাদা, বলেন, এর দ্বারা সূরা হূদের সে আয়াতটির বিষয়বস্তুর প্রতি ইংগিত করা হয়েছে যাতে বলা হয়েছে সামূদ জাতির লোকেরা হযরত সালেহের ( আ) উটনীকে হত্যা করলে আল্লাহর পক্ষ থেকে তাদেরকে জানিয়ে দেয়া হয় যে, তোমরা তিন দিন পর্যন্ত ফূর্তি করে নাও ৷ এরপরই তোমাদের ওপর আযাব আসবে ৷ অপর দিকে হযরত হাসান বাসরী মনে করেন, একথা হযরত সালেহ আলাইহিস সালাম দাওয়াতের প্রথম দিকেই তাঁর কওমকে বলেছিলেন ৷ এর দ্বারা তাঁর উদ্দেশ্য ছিল , যদি তোমরা তওবা ও ঈমানের পথ অবলম্বন করো তাহলে একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত পৃথিবীতে বেঁচে থাকার সুযোগ লাভ করবে এবং এরপরেই কেবল তোমাদের দুর্দিন আসবে ৷ এ দুটির ব্যাখ্যার মধ্যে দ্বিতীয় ব্যাখ্যাটিই অধিক বিশুদ্ধ বলে মনে হয় ৷ কারণ পরবর্তী আয়াত ( ) (এরপর তারা তাদের রবের নির্দেশ লংঘন করলো) থেকে বুঝা যায় যে, এখানে যে অবকাশের কথা বলা হচ্ছে তা সীমালংঘণের পূর্বে দেয়া হয়েছিলো ৷ আর তারা সীমালংঘন করেছিল এ সতর্ক বাণীর পরে ৷ অন্যদিকে সূরা হূদের আয়াতে তিনদিনের যে অবকাশের উল্লেখ করা হয়েছে তা ঐ সব অপরাধীর পক্ষ থেকে চূড়ান্ত ও সিদ্ধান্তকর সীমালংঘন হয়ে যাওয়ার পরে দেয়া হয়েছিলো ৷
৪১. এ আযাবের কথা বুঝাতে কুরআন মজীদের বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে ৷ কোথাও একে ভীতি প্রদর্শনকারী ও প্রকম্পিতকারী বিপদ বলা হয়েছে ৷ কোথাও একে বিষ্ফোরণ ও বজ্রধ্বনি বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে ৷ কোথাও একে বুঝাতে কঠিনতম বিপদ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে ৷ আর এখানে একেই ( ) বলা হয়েছে যার অর্থ বিদ্যুতের মত অকস্মাত আগমনকারী বিপদ এবং কঠোর বজ্রধ্বনি উভয়ই ৷ সম্ভবত এ আযাব এমন এক ভূমিকম্পের আকারে এসেছিলো যার সাথে আতংক সৃষ্টিকারী শব্দও ছিল ৷
৪২. মূল আয়াতাংশ হচ্ছে ( ) ৷ আরবী ভাষায় ( ) শব্দটি দুটি অর্থে ব্যবহৃত হয় ৷ এর একটি অর্থ হচ্ছে নিজেকে কারো আক্রমণ থেকে রক্ষা করা ৷ অপর অর্থটি হচ্ছে হামলাকারী থেকে প্রতিশোধ নেয়া ৷