(৫১:১) শপথ সে বাতাসের যা ধূলাবালি উড়ায়৷
(৫১:২) আবার পানি ভরা মেঘরাশি বয়ে নিয়ে যায়
(৫১:৩) তারপর ধীর মৃদুমন্দ গতিতে বয়ে যায়৷
(৫১:৪) অতপর একটি বড় জিনিস (বৃষ্টি) বন্টন করে৷
(৫১:৫) প্রকৃত ব্যাপার হলো, তোমাদেরকে যে জিনিসের ভীতি প্রদির্শন করা হচ্ছে তা সত্য৷
(৫১:৬) কর্মফল প্রদানের সময় অবশ্যই আসবে৷
(৫১:৭) শপথ বিবিধ আকৃতি ধারণকারী আসমানের৷
(৫১:৮) (আখেরাত সম্পর্কে) তোমাদের কথা পরস্পর ভিন্ন৷
(৫১:৯) তার ব্যাপারে সে-ই বিরক্ত যে হকের প্রতি বিমুখ৷
(৫১:১০) ধ্বংস হয়েছে অনুমান ও ধারণার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীরা,
(৫১:১১) যারা অজ্ঞতায় নিমজ্জিত এবং গাফলতিতে বিভোর৷
(৫১:১২) তারা জিজ্ঞেস করে, তবে সেই কর্মফল দিবস কবে আসবে ?
(৫১:১৩) তা সেদিন আসবে যেদিন তাদের আগুনে ভাজা হবে৷১০
(৫১:১৪) (এদের বলা হবে) এখন তোমাদের ফিতনার ১১ স্বাদ গ্রহণ করো৷ এটা সেই বস্তু যার জন্য তোমরা তাড়াহুড়া করছিলে৷১২
(৫১:১৫) তবে মুত্তাকীরা ১৩ সেদিন বাগান ও ঝর্ণাধারার মধ্যে অবস্থান করবে৷
(৫১:১৬) তাদের রব যা কিছু তাদের দান করবেন তা সানন্দে গ্রহণ করতে থাকবে৷ ১৪সেদিনটি আসার পূর্বে তারা ছিল সৎকর্মশীল৷
(৫১:১৭) রাতের বেলা তারা কমই ঘুমাতো৷ ১৫
(৫১:১৮) তারপর তারাই আবার রাতের শেষ গ্রহরগুলোতে ক্ষমা প্রার্থনা করতো৷ ১৬
(৫১:১৯) তাদের সম্পদে অধিকার ছিল প্রার্থী ও বঞ্চিতদের৷১৭
(৫১:২০) দৃঢ় প্রত্যয় পোষাণকারীদের জন্য পৃথিবীতে বহু নিদর্শন করেছে৷ ১৮
(৫১:২১) এবং তোমাদের সত্তার মধ্যেও৷ ১৯ তোমরা কি দেখ না?
(৫১:২২) আসমানেই রয়েছে তোমাদের রিযিক এবং সে জিনিসও যার প্রতিশ্রুতি তোমাদের দেয়া হচ্ছে৷২০
(৫১:২৩) তাই আসমান ও যমীনের মালিকের শপথ, একথা সত্য এবং তেমনই নিশ্চিত যেমন তোমরা কথা বলছো৷
১. এ ব্যাপারে সমস্ত তাফসীরকার একমত যে, আয যারিয়াত অর্থ বিক্ষিপ্তকারী ও ধূলাবালি ছড়ানো বাতাস এবং --------- (ভারী বোঝা বহনকারী) অর্থ সেই বাতাস যা সমুদ্র থেকে লক্ষ কোটি গ্যালন বাষ্প মেঘের আকারে বহন করে আনে ৷ হযরত উমর, হযরত আলী হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর ( রা) , মুজাহিদ, সাঈদ, ইবনে জুবায়ের, হাসান বাসরী, কাতাদা ও সুদ্দী প্রমুখ মুফাস্সিরগণের থেকে বর্ণিত হয়েছে ৷
২. ( ) ও ( ) এর ব্যাখ্যায় মুফাস্সিরগণ ভিন্ন ভিন্ন মত পোষণ করেছেন ৷ কেউ এ কথাটিকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন বা এ অর্থ গ্রহণ করা যায়েজ মনে করেছিলেন যে, এ দুটি বাক্যাংশের অর্থও বাতাস ৷ অর্থাৎ এ বাতাসই আবার মেঘমালা বহন করে নিয়ে যায় এবং ভূপৃষ্ঠের বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে পড়ে ৷ আল্লাহর নির্দেশানুসারে যেখানে যতটুকু বর্ষণের নির্দেশ দেয়া হয় ততটুকু পানি বন্টন করে ৷ আরেক দল ( ) আয়াতাংশের অর্থ করেছেন দ্রুতগতিশীল নৌকাসমূহ এবং ( ) অর্থ করেছেন সেসব ফেরেশতা যারা আল্লাহর নির্দেশ অনুসারে তাঁর সমস্ত সৃষ্টির জন্য বরাদ্দকৃত জিনিস তাদের মধ্যে বন্টন করে ৷ একটি রেওয়ায়াত অনুসারে হযরত উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু এ দুটি আয়াতাংশের এ অর্থ বর্ণনা করে বলেছেন, আমি এ অর্থ রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে না শুনে থাকলে বর্ণনা করতাম না ৷ এর ওপর ভিত্তি করে আল্লামা আলুসী এ ধারণা প্রকাশ করেন যে, এটি ছাড়া এ আয়াতাংশ দুটির আর কোন অর্থ গ্রহণ করা জায়েয নয় ৷ যারা অন্য কোন অর্থ গ্রহণ করেছেন তারা অনর্থক দুঃসাহস দেখিয়েছেন ৷ কিন্তু হাফেয ইবনে কাসীর বলেন, এ রেওয়ায়াতের সনদ দূর্বল এবং এর ওপর ভিত্তি করে অকাট্যভাবে বলা যায় না যে, নবী ( সা) সত্যিই এসব আয়াতাংশের এ ব্যাখ্যাই বর্ণনা করেছেন ৷ এ ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই যে, সাহাবা ও তাবেয়ীদের একটি উল্লেখযোগ্য দল কর্তৃক এ দ্বিতীয় ব্যাখ্যাটিই বর্ণিত হয়েছে ৷ কিন্তু তাফসীরকারদের বড় দল প্রথম তাফসীরটও বর্ণনা করেছেন ৷ আর কথার ধারাবাহিকতার সাথে এ অর্থটিই অধিক সামঞ্জস্যপূর্ণ ৷ শাহ রাফীউদ্দিন সাহেব, শাহ আবদুল কাদের সাহেব এবং মাওলানা মাহমুদুল হাসান সাহেবও তাদের অনুবাদ প্রথম অর্থটিই গ্রহণ করেছেন ৷
৩. মূল আয়াতে ( ) ব্যবহার করা হয়েছে ৷ এ শব্দটি যদি মূল ধাতু ( ) থেকে গঠিত হয়ে থাকে, তাহলে তার অর্থ হবে তোমাদেরকে যে বিষয়ের প্রতিশ্রুতি দেয়া হচ্ছে, আর যদি ( ) থেকে গঠিত হয়ে থাকে তাহলে অর্থ হবে, "তোমাদেরকে যে জিনিসের ভয় দেখানো হচ্ছে ৷ " ভাষাগতভাবে দুটি অর্থই যথাযথ ও নির্ভুল ৷ কিন্তু প্রয়োগ ক্ষেত্রের সাথে দ্বিতীয় অর্থটিই অধিক সামঞ্জস্যপূর্ণ ৷ কারণ, যারা কুফর, শিরক ও পাপাচারে ডুবে ছিল এবং কখনো নিজ কৃতকর্মের প্রতিফল পেতে হবে এবং সে জন্য জবাবদিহির সম্মুখীন হতে হবে একথা মানতে প্রস্তুত ছিল না এখানে তাদেরকে সম্বোধন করে কথা বলা হয়েছে ৷ একারণে আমরা ( ) শব্দটিকে প্রতিশ্রুতি অর্থে গ্রহণ না করে ভীতি অর্থে গ্রহণ করেছি ৷
৪. এটাই ছিল মূল কথা যে জন্য শপথ করা হয়েছে ৷ এ শপথের অর্থ হচ্ছে যে নজিরবিহীন শৃঙ্খলা ও নিয়মতান্ত্রিকতার সাথে বৃষ্টিপাতের এ মহা ব্যবস্থাপনা তোমাদের চোখের সমানে চলছে এবং তার মধে যে যুক্তি, কৌশল ও উদ্দেশ্য সক্রিয় দেখা যাচ্ছে তা প্রমাণ করেছে যে, এ পৃথিবী কোন উদ্দেশ্যহীন এ অনর্থক বালু মাটির খেলাঘর নয় যেখানে লক্ষ কোটি বছর থেকে উদ্দেশ্যহীনভাবে অতি বড় একটি খেলা চলছে, বরং প্রকৃতপক্ষে এটা একটা পরিপূর্ণ বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থা যেখানে প্রতিটি কাজ কোন না কোন উদ্দেশ্য ও উপযোগিতা সামনে রেখে হচ্ছে ৷ এ ব্যবস্থাপনায় কোনক্রমেই এটা সম্ভব নয় যে, এখানে মানুষের মত এটা সৃষ্টিকে বিবেক-বুদ্ধি, চেতনা-বিবেচনা, বাছ-বিচার কর্মের ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব খাটানোর অধিকার দিয়ে তার মধ্যে ভাল ও মন্দের নৈতিক অনুভূতি সৃষ্টি করে এবং তাকে সব রকম ন্যায় ও অন্যায় এবং ভুল ও নির্ভুল কাজ করার সুযোগ দিয়ে পৃথিবীতে যথেচ্ছা আচরণ করার জন্য একেবারে উদ্দেশ্যহীনভাবে ছেড়ে দেয়া হবে এবং তাকে কখনো একথা জিজ্ঞেস করা হবে না যে, তাকে যে মন-মগজ ও দৈহিক শক্তি দেয়া হয়েছিল পৃথিবীতে কাজ করার জন্য যে ব্যাপক উপায়-উপকরণ তার হাতে ন্যস্ত করা হয়েছিল এবং আল্লাহর অসংখ্য সৃষ্টির ওপর ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব খাটানোর যেসব ইখতিয়ার তাকে দেয়া হয়েছিল তা সে কিভাবে ব্যবহার করেছে ৷ যে বিশ্ব-ব্যবস্থায় সবকিছুর পেছনেই একটা উদ্দেশ্য কার্যকর সেখানে শুধু মানুষের মত একটি মহাসৃষ্টির আবির্ভাব কিভাবে উদ্দেশ্যহীন হতে পারে? যে ব্যবস্থায় প্রতিটি জিনিস জ্ঞান ও যুক্তি নির্ভর সেখানে শুধুমাত্র মানুষের সৃষ্টি অর্থহীন হতে পারে কি করে? যেসব সৃষ্টির জ্ঞান-বুদ্ধি ও বোধশক্তি নেই এ বস্তুজগতেই তাদের সৃষ্টির উদ্দেশ্য পূরণ হয়ে যায় ৷ একারণে তাদের আয়ুস্কাল শেষ হওয়ার পর যদি তাদের ধ্বংস করে দেয়া হয় তাহলে তা যথাযথ ও যুক্তিসংগত ৷ কারণ তাদেরকে কোন ক্ষমতা ও ইখতিয়ার দেয়া হয়নি ৷ তাই তাদের জবাবদিহিরও কোন প্রশ্ন নেই ৷ কিন্তু জ্ঞান-বুদ্ধি , চেতনা, ও বিবেক এবং ক্ষমতা-ইখতিয়ারের অধিকারী সৃষ্টি -যার কাজ -কর্ম শুধু বস্তুজগতেরই মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং যার নৈতিক প্রভাবও আছে এবং যার নৈতিক ফলাফল সৃষ্টিকারী কাজ-কর্মের ধারাবাহিকতা শুধু জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত চলে না , মৃত্যুর পরও তার নৈতিক ফলাফল উদ্ভব হতে থাকে এমন সৃষ্টিকে শুধু তার বস্তুগত তৎপরতা শেষ হয়ে যাওয়ার পর উদ্ভিত ও জীব -জন্তুর মত কি করে ধ্বংস করা যেতে পারে? সে তার নিজের ক্ষমতা ও ইচ্ছায় যে নেক কাজ বা বদ কাজই করে থাকুক না কেন তার সঠিক ও ন্যায়সংগত প্রতিদান তার অবশ্যই পাওয়া উচিত ৷ কারণ যে উদ্দেশ্যে তাকে অন্যসব সৃষ্টির মত না করে ক্ষমতা ও ইখতিয়ার সম্পন্ন সৃষ্টি হিসেবে বানানো হয়েছে এটা তার মৌলিক দাবী ৷ তাকে যদি জবাবদিহি করতে না হয়, তার নৈতিক কাজ-কর্মের জন্য যদি পুরস্কার ও শাস্তি না হয় এবং ক্ষমতা ও ইখতিয়ারবিহীন সৃষ্টিকূলের মত স্বাভাবিক জীবন শেষ হওয়ার পর তাকে ধ্বংস করে দেয়া হয় তাহলে তাকে সৃষ্টি করা অবশ্যই অর্থহীন হবে ৷ কিন্তু একজন মহাজ্ঞানী ও বিচক্ষণ স্রষ্টার কাছে এরূপ নিরর্থক কাজের আশা করা যায় না ৷ এ ছাড়াও আখেরাত এবং পুরস্কার ও শাস্তি সংঘটিত হওয়ার ব্যাপারে সৃষ্টির এ চারটি নিদর্শনের নামে শপথ করার আরো একটি কারণ আছে ৷ আখেরাত অস্বীকারকারীরা যে কারণে মৃত্যুর পরের জীবনকে অসম্ভব মনে করে তাই এই যে, মৃত্যর পর আমরা যখন মাটিতে বিলীন হয়ে যাবো এবং আমাদের অণু-পরমাণু যখন মাটিতে বিক্ষিপ্ত হয়ে ছড়িয়ে পড়বে তখণ কি করে সম্ভব যে, দেহের এসব বিক্ষিপ্ত অংশ পুনরায় একত্রিত হবে এবং পুনরায় আমাদেরকে সৃষ্টি করা হবে ৷ আখেরাতের প্রমাণ হিসেবে সৃষ্টির যে চারটি নিদর্শনকে পেশ করা হয়েছে সেগুলো নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা-ভাবনা করলে আপনা থেকেই এ সন্দেহ ও ভ্রান্তি দূর হয়ে যায় ৷ ভূপৃষ্ঠের যতগুলো পানির ভাণ্ডারে সূর্যের কিরণ পৌছে ততগুলোর পানির ভাণ্ডারে সূর্যের তাপ প্রভাব বিস্তার করে থাকে ৷ এ প্রক্রিয়ায় পানির অগণিত বিন্দু তার ভাণ্ডারে পড়ে না থেকে শুন্যে উড়ে যায় ৷ কিন্তু তা নিঃষেশ হয়ে যায় না, বরং বাষ্পে রূপান্তরিত হয়ে প্রতিটি বিন্দু বাতাসের মধ্যে সংরক্ষিত থাকে ৷ অতপর আল্লাহর নির্দেশ অনুসারে এ বাতাসই বাষ্পে রূপান্তরিত ঐ সব বারিবিন্দুকে একত্রিত করে গাঢ় মেঘের সৃষ্টি করে ঐ মেঘরাশিকে নিয়ে ভূপৃষ্ঠের বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে পড়ে এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে যে সময় নির্ধারিত আছে ঠিক সেই সময় প্রতিটি বিন্দুকে ঠিক সেই আকৃতিতে পুনরায় পৃথিবীতে পাঠিয়ে দেয় যে আকৃতিতে তা পূর্বে ছিল ৷ প্রতিনিয়ত এই যে দৃশ্য মানুষের চোখের সামনে অতিক্রান্ত হচ্ছে তা সাক্ষ্য দেয় যে, মৃত মানুষদের দেহের অঙ্গ-পত্যঙ্গও আল্লাহর একটি মাত্র ইংগিতেই একত্রিত হতে পারে এবং ঐসব মানুষ আগে যেমন ছিল ঠিক সেই আকৃতিতেই তাদেরকে পুনরায় জীবিত করা যেতে পারে ৷ এসব অংগ-প্রত্যংগ মাটি, বাতাস বা পানি যার মধ্যেই মিশে যেয়ে থাক না কেন সর্বাবস্থায়ই তা এ পৃথিবী এবং এর পরিমণ্ডলেই আছে ৷ যে আল্লাহ পানি থেকে বাষ্পরাশি তৈরী করে তা বাতাসের মধ্যে ছড়িয়ে দেয়ার পর পুনরায় সেই বাতাসের সাহায্যেই তা একত্রিত করেন, এবং পরে পানির আকারে তা বর্ষণ করেন, তাঁর জন্য মানব-দেহের অংগ-প্রত্যংগকে বাতাস, পানি, ও মাটির মধ্য থেকে বেছে একত্রিত এবং পূর্বের মত সংযোজিত করে দেয়া কঠিন হবে কেন?
৫. মূল আয়াতে ( ) শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে ৷ ( ) রাস্তাসমূহ অর্থেও ব্যবহৃত হয় ৷ বায়ূ প্রবাহের কারণে মরুভূমির বালুকারাশি এবং বদ্ধ পানিতে যে ঢেউ সৃষ্টি হয় তাকেও বলে ৷ আবার কোঁকড়া চুলে যে গুচ্ছ ও ভাঁজের সৃষ্টি হয় তা বুঝানোর জন্যও এ শব্দটিকে ব্যবহৃত হয় ৷ এখানে আসমানকে ( ) এর অধিকারী বলার কারণ হচ্ছে যে, অধিকাংশ সময় আসমানে নানা আকৃতির মেঘরাশি ছেয়ে থাকে এবং বাতাসের প্রভাবে বারবার তার আকৃতি পরিবর্তিত হতে থাকে ৷ এবং কখনো কোন আকৃতি না স্থায়িত্ব লাভ করে না অন্য আকৃতির সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ হয় ৷ অথবা এ কারণে বলা হয়েছে যে, রাতের বেলা যখন আকাশে তারকাসমূহ চড়িয়ে থাকে তখন মানুষ তার নানা রকম আকৃতি দেখতে পায় যাঁর কোনটি অন্যগুলোর সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ হয় না ৷
৬. এ ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্যের ব্যাপারে বিভিন্ন আকৃতির আসমানের শপথ করা হয়েছে উপমা হিসেবে ৷ অর্থাৎ আসমানের মেঘমালা ও তারকাপুঞ্জের আকৃতি যেমন ভিন্ন এবং তাদের মধ্যে কোন সাদৃশ্য ও মিল দেখা যায় না, তোমরাও আখেরাত সম্পর্কে অনুরূপ রকমারি মতামত ও বক্তব্য পেশ করেছো এবং তোমাদের একজনের কথা আরেকজনের থেকে ভিন্ন ৷ তোমাদের কেউ বলে এ পৃথিবী অনাদি ও চিরস্থায়ী ৷ তাই কোন রকম কিয়ামত সংঘটিত হতে পারে না৷ কেউ বলে, এ ব্যবস্থা ধ্বংসশীল এবং এক সময় এটা ধ্বংস হয়ে যেতে পারে ৷ তবে মানুষসহ যেসব জিনিস ধ্বংস হয়ে গিয়েছে তার পুনরুজ্জীবন সম্ভব নয় ৷ কেউ পুনরুজ্জীবনকে সম্ভব বলে মনে করে কিন্তু তার আকীদা-বিশ্বাস এই যে, মানুষ তার ভাল কাজের ফলাফল ভোগের জন্য এ পৃথিবীতে বারবার জন্ম নেয় ৷ কেউ জান্নাত এবং জাহান্নামও বিশ্বাস করে, কিন্তু তার সাথে আবার জন্মান্তরবাদেরও সমন্বয় সাধন করে অর্থাৎ তার ধারণা হচ্ছে গোনাহর ব্যক্তি জাহান্নামেও শাস্তি ভোগ করে এবং এ পৃথিবীতেও শাস্তি পাওয়ার জন্য বারবার জন্ম লাভ করতে থাকে ৷ কেউ বলে, দুনিয়ার এ জীবনটাই তো একটা শাস্তি ৷ মানবাত্মার যতদিন পর্যন্ত বন্তু জীবনের সাথে সম্পর্ক থাকে ততদিন পর্যন্ত মরে পুনরায় এ পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করেতে থাকে ৷ তার প্রকৃত মুক্তি ( নির্বান লাভ) হচ্ছে, অস্তিত্বহীন হয়ে যাওয় ৷ কেউ আখেরাত এবং জান্নাত ও জাহান্নাম বিশ্বাস করে ঠিকই, কিন্তু বলে, আল্লাহ তাঁর একমাত্র পুত্রকে ক্রুশে মৃত্যু দান করে মানুষের সর্বকালের গোনাহর কাফ্ফারা আদায় করে দিয়েছেন ৷ মানুষ আল্লাহর সেই পুত্রের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে নিজের কুকর্মের মন্দ পরিণতি থেকে রক্ষা পেয়ে যাবে ৷ কিছু লোক আছে যারা আখেরাত এবং শাস্তি ও পুরস্কারের বিশ্বাস করেও এমন কিছু বুযর্গ ব্যক্তিকে সুপারিশকারী মনে করে নেয়-তাদের ধারণায় তারা আল্লাহর এতই প্রিয় বা আল্লাহর কাছে এমন ক্ষমতার অধিকারী যে, যারাই তাদের ভক্ত হয়ে যাবে তারা পৃথিবীতে সবকিছু করেও শাস্তি থেকে বেঁচে যাবে ৷ এসব সম্মানিত সত্তা সম্পর্কে এ আকীদা পোষণকারীদের মধ্যে মতের মিল নেই ৷ প্রত্যেক গোষ্ঠিই তাদের নিজেদের আলাদা আলাদা সুপারিশকারী বানিয়ে রেখেছে ৷ মতের এ ভিন্নতাই প্রমাণ করে যে, অহী ও রিসালাতের তোয়াক্কা না করে মানুষ তার নিজের এবং এ পৃথিবীর পরিণতি সম্পর্কে যখনই কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে তা অজ্ঞতা প্রসূত হয়েছে ৷ অন্যথায়, মানুষের কাছে সত্যিই যদি এ ব্যাপারে সরাসরি জ্ঞানলাভের কোন মাধ্যম থাকতো তাহলে এত ভিন্ন ভিন্ন ও পরস্পর বিরোধী আকীদা-বিশ্বাস সৃষ্টি হতো না ৷
৭. মূল আয়াতের বাক্য হলো ( ) ৷ এ আয়াতাংশে ব্যবহৃত ( ) সর্বনাম দ্বারা দুটি জিনিস বুঝানো হয়ে থাকতে পারে ৷ এক, কৃতকর্মের প্রতিদান ৷ দুই, ভিন্ন ভিন্ন কথা ও বক্তব্য ৷ প্রথম ক্ষেত্রে এ বাণীর অর্থ দাঁড়ায় এই যে, কৃতকর্মের প্রতিদান অবশ্যই সামনে আসবে , যদিও তোমরা সে প্রতিদান প্রাপ্তি সম্পর্কে নানা রকমের ভিন্ন ভিন্ন আকীদা পোষণ করে থাকো ৷ তবে তা মেনে নিতে কেবল সেই ব্যক্তিই বিদ্রোহ করে যে ন্যায় ও সত্য বিমুখ ৷ দ্বিতীয় ক্ষেত্রে এ বাণীর অর্থ দাঁড়ায় এই নানা রকমের বক্তব্য ও মতামত দেখে কেবল সেই ব্যক্তিই বিভ্রান্ত হয় যে ন্যায় ও সত্যের প্রতি বিমুখ ৷
৮. এ বাক্যটি দ্বারা কুরআন মজীদ মানুষকে একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ সত্য সম্পর্কে সাবধান করছে ৷ পার্থিব জীবনের ছোট ছোট ক্ষেত্রে অনুমান ও ধারণার ভিত্তিতে কোন পরিমাপ ও মূল্যায়ণ করা কিছুটা চলতে পারে যদিও তা জ্ঞানের বিকল্প হতে পারে না ৷ কিন্তু গোটা জীবনের কৃতকর্মের জন্য কারো কাছে জবাবদিহি করতে হবে কিনা এবং যদি করতে হয় তাহলে কার কাছে কখন জবাবদিহি আমাদেরকে করতে হবে? সেই জবাবদিহিতে আমাদের সফলতা ও ব্যর্থতার ফলাফল কি হবে? এটা এমন কোন প্রশ্ন নয় যে, এ সম্পর্কে মানুষ শুধু অনুমান ও ধারণা অনুসারে একটা কিছু ঠিক করে নেবে এবং জুয়ার বাজি ধরার মত নিজের জীবনরূপ পূঁজির সবটাই বাজি ধরে বসবে ৷ কারণ, এ অনুমান যদি ভ্রান্ত হয় তাহলে তার অর্থ হবে, ব্যক্তি নিজেকেই নিজে ধ্বংস করে ফেললো ৷ তাছাড়া মানুষ যেসব বিষয়ে শুধু অনুমান ও ধারণার ভিত্তিতে সঠিক সিদ্ধান্তে পৌছতে পারে এটি আদৌ সে ধরনের নয় ৷ কারণ, যা মানুষের ধরা -ছোঁয়ার গণ্ডির মধ্যে কেবল সেসব ক্ষেত্রেই অনুমান চলতে পারে ৷ কিন্তু এটা এমন একটা বিষয় যার কোন কিছুই ধরা-ছোঁয়ার গন্ডিভুক্ত নয় ৷ তাই এর কোন অনুমান ভিত্তিক মূল্যায়ণ সঠিক হতে পারে না ৷ এখন প্রশ্ন থাকে তাহলে অনুভূতি ও উপলব্ধির বাইরে এসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সঠিক উপায় কি? কুরআন মজীদের বিভিন্ন জায়গায় এ প্রশ্নের যে জবাব দেয়া হয়েছে এবং এ সূরা থেকেও এ জওয়াবেরই ইংগিত পাওয়া যায় যে, মানুষ নিজে সরাসরি ন্যায় ও সত্য পর্যন্ত পৌছতে পারে না ৷ আল্লাহ তাঁর নবীর মাধ্যমে ন্যায় ও সত্যের জ্ঞান দান করে থাকেন ৷ এ জ্ঞানের সত্যতা সম্পর্কে মানুষ তার নিজের সন্তুষ্টি বিধান করতে পারে এভাবে যে, যমীন, আসমান ও তার নিজের মধ্যে যে অসংখ্য নিদর্শন বিদ্যমান তা গভীর দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করে নিরপেক্ষভাবে ভেবে দেখবে যে, নবী যা বলছেন এসব নিদর্শন কি সেই সত্যই প্রমাণ করছে , না এ বিষয়ে অন্যরা যেসব ভিন্ন ভিন্ন মতামত পেশ করেছে সেগুলোকেই সমর্থন করছে? আল্লাহ ও আখেরাত সম্পর্কে জ্ঞানগত বিশ্লেষণের এটিই একমাত্র পন্থা যা কুরআন বর্ণনা করা হয়েছে ৷ এ পন্থা যদি বাদ দিয়ে যে ব্যক্তিই নিজে আন্দাজ-অনুমান অনুসারে চলেছে সে -ই ধ্বংস হয়েছে ৷
৯. অর্থাৎ তারা জানে না যে, নিজেদের এ ভুল মূল্যায়ণের কারণে তারা কোন পরিণামের দিকে অগ্রসর হচ্ছে ৷ কেউ এভাবে মূল্যায়ণ করে যে পথই অবলম্বন করেছে তা তাকে সোজা ধ্বংসের গহবরে নিয়ে গেছে ৷ যে ব্যক্তি আখেরাত অস্বীকার করে সে কোন প্রকার জবাবদিহির জন্য আদৌ প্রস্তুতি গ্রহণ করছে না, এবং এ চিন্তায় মগ্ন আছে যে, মৃত্যুর পরে আর কোন জীবন হবে না ৷ কিন্তু সেই সময়টি আকস্মিকভাবে এসে হাজির হবে যখন তার আশা -আকাংখা ও চিন্তা-ভাবনার সম্পূর্ণ বিপরীত আরেকটি জীবনে তার চোখ খুলবে এবং সে জানতে পারবে যে, এখানে তাকে এক এক করে প্রতিটি কাজের জন্য জবাবদিহি করতে হবে ৷ যে ব্যক্তি এ বিশ্বাসের ভিত্তিতে গোটা জীবন অতিবাহিত করেছে যে, মৃত্যুর পর পুনরায় এ দুনিয়ায় ফিরে আসবো, সে মৃত্যুর সাথে সাথে জানতে পারবে যে, এখন ফিরে যাওয়ার সব দরজা বন্ধ ৷ নতুন কোন কাজের দ্বারা অতীত জীবনের কাজের ক্ষতিপূরণের কোন সুযোগই আর এখন নেই এবং সামনে আরো একটি জীবন আছে সেখানে চিরদিনের জন্য তাকে নিজের পার্থিব জীবনের কর্মফল দেখতে ও ভোগ করতে হবে ৷ যে ব্যক্তি এ আশায় নিজের জীবনকে ধ্বংস করে ফেলে যে, যদি নফস এবং তার প্রবৃত্তিসমূহকে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে ফেলী তাহলে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার মাধ্যমে আমি দৈহিক আযাব থেকে রক্ষা পেয়ে যাবো ৷ কিন্তু মৃত্যুর দরজা পার হওয়া মাত্রই সে দেখতে পাবে সামনে ধবংস নেই আছে শুধু চিরস্থায়ী জীবন ও অস্তিত্ব ৷ আর তাকে এখন এ বিষয়ে জবাবদিহি করতে হবে যে, তোমাকে জীবন ও অস্তিত্বের নিয়ামত কি এ জন্যই দেখা হয়েছিলো যে, তুমি তাকে গড়ার ও সুসজ্জিত করার পরিবর্তে ধ্বংস করার জন্য নিজের সমস্ত শ্রম ব্যয় করবে? অনুরূপ যে ব্যক্তি তথাকথিত কোন ঈশ্বর পুত্রের কাফ্ফারা হওয়ার কিংবা কোন বুযর্গ ব্যক্তির শাফায়াতকারী হওয়ার ভারসায় সারা জীবন আল্লাহর নাফরমানী করতে থাকলো আল্লাহর সামনে হাজির হওয়া মাত্র সে জানতে পারবে যে, এখানে না কেউ কারো কাফ্ফারা আদায়কারী আছে, না কারো এমন শক্তি আছে যে নিজের শক্তিতে অথবা নিজে কারো ভালবাসায় ধন্য হওয়ার কারণে কাউকে আল্লাহর শাস্তি থেকে রক্ষা করতে পারবে ৷ অতএব, অনুমান ভিত্তিক এসব আকীদা-বিশ্বাস প্রকৃতপক্ষে এক আফিম, যার নেশায় এসব লোক বুঁদ হয়ে আছে ৷ তারা জানে না আল্লাহ ও নবী-রসূল প্রদত্ত সঠিক জ্ঞানকে উপেক্ষা করে এরা মুর্খতার মধ্যে নিমগ্ন আছে তা তাদেরকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে ৷
১০. প্রতিদান দিবস কবে আসবে কাফেরদের এ প্রশ্ন আসলে প্রকৃত তথা জানার জন্য ছিল না, বরং তা ছিল -বিদ্রুপ ও হাসি ঠাট্রার উদ্দেশ্যে ৷ তাই তাদেরকে এ ভঙ্গিতে জবাব দেয়া হয়েছে ৷ এটা ঠিক সেরূপ যখন আপনি কোন ব্যক্তিকে দুষ্কর্ম থেকে বিরত থাকার জন্য উপদেশ দিতে গিয়ে বললেন, একদিন এ আচরণের খারাপ পরিণতি দেখতে পাবে ৷ কিন্তু সে বিদ্রুপ করে আপনাকে জিজ্ঞেস করছেঃ জনাব, কবে আসবে সেদিন? সুতরাং একথা স্পষ্ট যে, "খারাপ পরিণতি কবে আসবে" তার এ প্রশ্ন সেই খারাপ পরিণতি আসার তারিখ জানার জন্য নয় ৷ বরং আপনার উপদেশকে বিদ্রুপ করার জন্য ৷ সুতরাং এর সঠিক জবাব হবে এই যে, তা সেদিন আসবে যেদিন তোমার দুর্ভাগ্য আসবে ৷ এখানে একথাটিও ভালভাবে বুঝে নেয়া দরকার যে, আখেরাত অস্বীকারকারী কোন ব্যক্তি যদি ভদ্রতা ও যুক্তি সহকারে বিতর্ক করে তাহলে সে এর স্বপক্ষে ও বিপক্ষে যুক্তি দিয়ে কথা বলতে পারে ৷ কিন্তু তার মস্তিষ্কে খারাপ না হলে সে এ প্রশ্ন কখনো করতে পারে না যে, আখেরাত কোন তারিখে সংঘটিত হবে তা বলো ৷ তার পক্ষ থেকে যখনই এ ধরনের প্রশ্ন আসবে, বিদ্রুপ ও হাসি -তামাশা হিসেবেই আসবে ৷ তাই আখেরাত সংঘটিত হওয়া না হওয়ার তারিখ বলে দেয়াতে মূল বিষয়ের ওপর কোন প্রভাবই পড়েনা ৷ কেউ এ কারণে আখেরাত অস্বীকার করে না যে, তা সংঘটিত হওয়ার সন, মাস এবং দিন বলে দেয়া হয়নি ৷ আবার তা অমুক সন, অমুক মাস, ও অমুক তারিখ সংঘটিত হবে তা শুনে কেউ তা মেনে নিতে পারে না ৷ তারিখ নির্দিষ্ট করে বলে দেয়া আদৌ কোন প্রমাণ নয় যে, তা কোন অস্বীকারকারীকে স্বীকার করে নিতে আগ্রহী করে তুলবে ৷ কারণ এরপরে এ প্রশ্নও দেখা দেয় যে, ঐ দিনটি আসার আগে কিভাবে বিশ্বাস করা যায় যে, সেদিন সত্যি সত্যিই তা সংঘটিত হবে ৷
১১. এখানে 'ফিতনা' শব্দটি দুটি অর্থ প্রকাশ করেছে ৷ একটি অর্থ হচ্ছে, নিজের এ আযাবের স্বাদ গ্রহণ করো ৷ অপর অর্থটি হচ্ছে , তোমরা পৃথিবীতে যে বিভ্রান্তির ধুম্রজাল সৃষ্টি করে রেখেছিলে তার স্বাদ গ্রহন করো ৷ আরবী ভাষায় এ শব্দটির এ দুটি অর্থ গ্রহণের সমান অবকাশ আছে ৷
১২. "তাহলে প্রতিদানের সেদিনটি কবে আসবে" কাফেরদের এ প্রশ্নে এ অর্থও বহন করেছিলো যে, তা আসতে বিলম্ব হচ্ছে কেন? আমরা যখন তা অস্বীকার করছি এবং তার অস্বীকৃতির শাস্তি আমাদের জন্য অনিবার্য হয়ে পড়েছে তখন তা আসছে না কেন? এ কারণে তারা যখন জাহান্নামের আগুনে দগ্ধভূত হতে থাকবে তখন বলা হবে , এটি সেই জিনিস যা তোমরা দ্রুত কামনা করেছিলে ৷ এ আয়াতাংশ থেকে স্বতই এ অর্থ প্রকাশ পায় যে, এটা নিছক আল্লাহর করুণা ছিল যে, তোমাদের অবাধ্যতা প্রকাশের সাথে সাথে তিনি তোমাদেরকে পাকড়াও করেননি ৷ বরং তোমাদেরকে ভেবে-চিন্তে দেখার, বুঝার এবং নিজেকে সামলে নেয়ার জন্য তিনি দীর্ঘ অবকাশ দিয়ে এসেছেন ৷ কিন্তু তোমরা এমন নির্বোদ যে, সে অবকাশ থেকে উপকৃত হওয়ার পরিবর্তে সে সময়টি যেন দ্রুত নিয়ে আসা হয় সেই দাবী করে এসেছো ৷ এখন দেখে নাও, যে জিনিসের দ্রুত আগমন কামনা করেছিলে তা কেমন জিনিস ৷
১৩. এখানে 'মুত্তাকী' শব্দটি সুষ্পষ্টভাবে প্রকাশ করেছে যে, এর অর্থ সেসব লোক যারা আল্লাহর কিতাব এবং তাঁর রসূলের দেয়া খবরের প্রতি বিশ্বাস করে আখেরাতকে মেনে নিয়েছে এবং আখেরাতের জীবনের সফলতার জন্য তাদেরকে যে আচরণ করতে বলা হয়েছিলো তারা তাই করেছিলো এবং যে আচরণ ও নীতি সম্পর্কে বলে দেয়া হয়েছিলো যে, তা আল্লাহর আযাবের মধ্যে নিমজ্জিত করে তা বর্জন করেছিলো ৷
১৪. যদিও আয়াতের মূল বাক্যাংশ হচ্ছে ( ) এবং যার শাব্দিক অনুবাদ শুধু এই যে, "তাদের রব যা দিবেন তা তারা নিতে থাকবে" ৷ কিন্তু এ ক্ষেত্রে নেয়ার অর্থ শুধু নেয় নয়, বরং সানন্দচিত্তে নেয়া ৷ যেন কোন দানশীল ব্যক্তি কিছু লোককে হাতে তুলে পুরস্কার দিচ্ছেন আর তারা লাফালাফি করে তা নিচ্ছে ৷ কোন ব্যক্তিকে যখন তার পছন্দের জিনিস দেয়া যায় সে মুহুর্তে নেয়ার মধ্যে আপনা থেকেই সানন্দে নেয়ার অর্থ সৃষ্টি হয়ে যায় ৷ কুরআন মজীদে একস্থানে বলা হয়েছেঃ

----------------

"মানুষ কি জানে না, আল্লাহই তো বান্দার তাওবা কবুল করেন এবং তাদের সাদকা গ্রহণ করেন" ৷ ( তাওবা ১০৪)

এখানে সাদকা গ্রহণ করার অর্থ তা শুধু নেয়া নয়, বরং সন্তুষ্ট হয়ে তা গ্রহণ করা ৷
১৫. মুফাস্সিদের এক দল এ আয়াতের যে অর্থ গ্রহণ করেছেন তা হচ্ছে তারা শুধু শুয়ে শুয়ে সারারাত কাটিয়ে দিত এবং রাতের প্রারম্ভে মধ্যভাগে বা শেষভাগে কম হোক বা বেশী হোক কিছু সময় জেগে আল্লাহর ইবাদাত করে কাটাতো না, এমন খুব কমই ঘটতো ৷ হযরত ইবনে আব্বাস , আনাস ইবনে মালেক, মুহাম্মাদ আল বাকের, মাতরাফ ইবনে আবদুল্লাহ , আবুল আলিয়া, মুজাহিদ, কাতাদা, রাবী' ইবনে আনাস প্রমুখ থেকে সামান্য শাব্দিক তারতাম্য সহ এ তাফসীরই বর্ণিত হয়েছে ৷ দ্বিতীয় দল এর অর্থ বর্ণনা করেছেন এই যে, তারা রাতের বেশীর ভাগ সময়ই মহান আল্লাহর ইবাদতে কাটাতেন এবং অল্প সময় ঘুমাতেন ৷ এটা হযরত হাসান বাসরী , আহনাফ ইবনে কায়েস এবং ইবনে শিহাব যুহরীর বক্তব্য ৷ পরবর্তীকালের মুফাস্সির ও অনুবাদকগণ এ ব্যাখ্যাকেই অগ্রাধিকার দিয়েছেন ৷ কারণ, আয়াতের শব্দসমূহ এবং তার প্রয়োগের ক্ষেত্র বিবেচনায় এ ব্যাখ্যই অধিক সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে হয় ৷ সুতরাং অনুবাদেও আমরা এই অর্থ গ্রহণ করেছি ৷
১৬. অর্থাৎ যারা তাদের রাতসমূহ পাপ-পঙ্কিলত ও অশ্লীল কাজ-কর্মে ডুবে থেকে কাটায় এবং তারপরও মাগফিরাত প্রার্থনা করার চিন্তাটুকু পর্যন্ত তাদের মনে জাগে না এরা তাদের শ্রেনীভুক্ত ছিল না ৷ পক্ষান্তরে এদের অবস্থা ছিল এই যে, তারা রাতের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ আল্লাহর ইবাদতে ব্যয় করতো এবং এরপরও রাতের শেষাংশে আপন প্রভুর কাছে এই বলে ক্ষমা প্রার্থনা করতো যে, তোমার যতটুকু ইবাদত বন্দেগী করা আমাদের কর্তব্য ছিল তা করতে আমাদের ক্রুটি হয়েছে ৷ ( ) কথাটির মধ্যে এ বিষয়েও একটি ইংগিত আছে যে, তাদের জন্য এ আচরণই শোভনীয় ছিল ৷ তারাই ছিল আল্লাহর দাসত্বের এরূপ পরাকষ্ঠা দেখবার যোগ্য যে আল্লাহর বন্দেগীতে জীবনপাতও করবে এবং ত সত্ত্বেও এ জন্য কোন রকম গর্বিত হওয়া এবং নিজের নেক কাজের জন্য অহংকার করার পরিবর্তে নিজের ক্রুটি-বিচুতি ক্ষমার জন্য বিনীতভাবে প্রার্থনা করবে ৷ যারা গোনাহ করার পরও বুকটান করে চলে সে নির্লজ্জ পাপীদের আচরণ এরূপ হতে পারতো না ৷
১৭. অন্য কথায় একদিকে তারা এভাবে তাদের প্রভুর অধিকর স্বীকার ও আদায় করতো , অন্যদিকে আল্লাহর বান্দাদের সাথে তাদের আচরণই ছিল এই ৷ কম হোক বা বেশী হোক আল্লাহ তাদের যা কিছুই দান করেছিলেন তাতে তারা কেবল নিজেদের এবং নিজেদের সন্তান-সন্তুতির অধিকার আছে বলে মনে করতো না বরং তাদের মধ্যে এ অনুভূতিও ছিল যে, যারা তাদের সাহায্যের মুখাপেক্ষী এমন প্রত্যেক আল্লাহর বান্দার তাদের সম্পদে অধিকার আছে ৷ আল্লাহর বান্দাদের সাহায্য তারা দান -খয়রাত হিসেবে করতো না ৷ তাই তারা তাদের কৃতজ্ঞতা প্রকাশের প্রত্যাশী ছিল না কিংবা তাদেরকে নিজেদের অনুগ্রহের পাত্র মনে করতো না ৷ একে তারা তাদের অধিকার মনে করতো এবং নিজেদের কর্তব্য মনে করে পালন করতো ৷ তাছাড়া যারা প্রার্থী হয়ে তাদের কাছে এসে সাহায্যের জন্য হাত পাততো শুধু এসব লোকের মধ্যেই তাদের সমাজ সেবা সীমাবদ্ধ ছিল না ৷ বরং যার সম্পর্কেই তারা জানতে পারতো যে, সে তার রুটি রুজি অর্জন করা থেকে বঞ্চিত হয়ে পড়েছে তাকেই সাহায্য করার জন্য তারা অস্থির হয়ে পড়তো ৷ যে ইয়াতীম শিশু অসহায় হয়ে পড়েছে, যে বিধবার কোন আশ্রয় নেই, যে অক্ষম ব্যক্তি নিজের রুজি-রোজগারের জন্য চেষ্টা-সাধনা করতে পারে না, যে ব্যক্তি বেকার ও কর্মহীন হয়ে পড়েছে কিংবা যার উপার্জন প্রয়োজন পূরণে যথেষ্ট হচ্ছে না, যে ব্যক্তি কোন দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে এবং নিজে নিজের ক্ষতিপূরণে সক্ষম নয়, মোট কথা এমন অভাবী যে কোন ব্যক্তির অবস্থা তার গোচরীভূত হয়েছে সে তার সাহায্য লাভের অধিকার স্বীকার করেছে ৷ সে তাকে সাহায্য করতে এগিয়ে গেছে ৷

এ তিনটি বিশেষ গুণের কারণে আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে মুক্তাকী' ও মুহসিন'বলে আখ্যায়িত করে বলেছেন, এ গুণাবলীই তাদেকে জান্নাতলাভের অধিকারী বানিয়েছে ৷

প্রথম গুণটি হচ্ছে, তারা আখেরাতের প্রতি ঈমান পোষণ করেছেন এবং এমন প্রতিটি আচরণ বর্জন করেছেন আল্লাহ ও তাঁর রসূল যাকে আখেরাতের জীবনের জন্য ধ্বংসাত্মক বলে বর্ণনা করেছিলেন ৷ দ্বিতীয় গুণটি হচ্ছে, তারা নিজেদের জীবনপাত করে আল্লাহর বন্দেগীর হক আদায় করেছেন এবং সে জন্য অহংকার প্রকাশ করার পরিবর্তে ক্ষমা প্রার্থনাই করেছেন ৷ তৃতীয় গুণটি হলো, তারা আল্লাহর বান্দাদের সেবা ইহসান মনে করে করেননি , বরং তাদের অধিকার ও নিজেদের কর্তব্য মনে করে করেছেন ৷

এখানে একথাটিও জেনে নেয়া দরকার যে, ঈমানদারদের অর্থ-সম্পদে প্রার্থী ও বঞ্চিতদের যে অধিকারের কথা এখানে উল্লেখ করা হয়েছে তার অর্থ যাকাত নয় যা শরীয়াতের নির্দেশ অনুসারে তাদের ওপর ফরয করে দেয়া হয়েছে ৷ যাকাত আদায় করার পরও আর্থিক সংগিত সম্পন্ন একজন ঈমানদার তার অর্থ-সম্পদে অন্যদের যে অধিকার আছে বলে উপলব্দি করে এবং শরীয়াত বাধ্যমূলক না করে থাকলেও সে মনের একান্ত আগ্রহ সহকারে তা আদায় করে; এখানে সে অধিকারের কথা বলা হয়েছে ৷ ইবনে আব্বাস মুজাহিদ এবং যায়েদ ইবনে আসলাম প্রমুখ মনীষীগণ এ আয়াতটির এ অর্থই বর্ণনা করেছেন ৷ প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর এ বাণীটির সারকথা হলো, একজন মুত্তাকী ও পরোপকারী মানুষ কখনো এরূপ ভ্রান্ত ধারণায় নিমজ্জিত হয় না যে, তার সম্পদে আল্লাহ ও তাঁর বান্দার যে অধিকর ছিল যাকাত আদায় করে সে তা থেকে পুরোপুরি অব্যহতি লাভ করেছে ৷ ভুখা, নাংগা, ও বিপদগ্রস্ত প্রতিটি মানুষকেই সাধ্যমত সাহায্য করে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তা সে স্বীকার করে ৷ আল্লাহর মুত্তাকী ও মুহসিন বান্দা তার সাধ্যমত পরোপকারমূলক কাজ করতে সর্বদা মনে প্রাণে প্রস্তুত থাকে এবং পৃথিবীতে নেক কাজ করার যে সুযোগই সে লাভ করে তা হাতছাড়া হতে দেয় না ৷ সে কখনো এরূপ চিন্তা-ভাবনা করে না যে, যে নেক কাজ করা তার জন্য ফরয করে দেয়া হয়েছিলো তা সে সম্পাদন করেছে, এখন আর কোন নেক কাজ সে কেন করবে?

যে ব্যক্তি নেক কাজের মূল্য বুঝতে পেরেছে সে তা বোঝা মনে করে বরদাশত করেনা, বরং নিজের লাভজনক ব্যবসায় মনে করে আরো অধিক উপার্জনের জন্য লালায়িত হয়ে পড়ে ৷
১৮. নিদর্শন অর্থ সেসব নিদর্শন যা আখেরাতের সম্ভাবনা এবং তার অবশ্যম্ভাবিতা ও অনিবার্যতার সাক্ষ দিচ্ছে ৷ পৃথিবীর অস্তিত্ব এবং তার গঠন ও আকার -আকৃতি সূর্য থেকে তাকে একটি নির্দিষ্ট দূরত্বে এবং বিশেষ কোণে স্থাপন, তার ওপর উষ্ণতা ও আলোর ব্যবস্থা করা, সেখানে বিভিন্ন মুওসূম ঋতুর আগমন, প্রস্থান, তার ওপর বাতাস ও পানি সরবরাহ করা, তার অভ্যন্তর ভাগে নানা রকমের অগণিত সম্পদের ভাণ্ডার সরবরাহ করা, তার উপরিভাগ একটি উর্বর আরবণ দিয়ে মুড়ে দেয়া এবং তার পৃষ্ঠদেশে ভিন্ন ভিন্ন রকমের অসংখ্য ও অগনিত উদ্ভিতরাজি উৎপন্ন করে দেয়া, তাতে স্থল , জল ও বায়ুতে বিচরণকারী জীবজন্তু ও কীট-পতঙ্গের অসংখ্য প্রজাতির বংশধারা চালু করা, প্রত্যেক প্রজাতির জীবন ধারণের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ ও উপযুক্ত খাদ্যে ব্যবস্থা করা সেখানে মানুষকে অস্তিত্ব দানের পূর্বে এমন সব উপায়-উপকরণের ব্যবস্থা করা যা ইতিহাসের প্রতিটি পর্যায়ে কেবল তার দৈনন্দিন প্রয়োজনই পূরণ নয় বরং তার তাহযীব তামাদ্দুনে ক্রমবিবর্তনের ক্ষেত্রে সহযোগিতাও করতে থাকবে , এসব এবং এ ধরনের এত অগণিত নিদর্শনাদি আছে যে, চাক্ষুষ্মান ব্যক্তি পৃথিবী ও এর পরিমণ্ডলে যে দিকেই দৃষ্টিপাত করে তা তার মনকে আকৃষ্ট করতে থাকে ৷ যে ব্যক্তি তার বিবেক-বুদ্ধির দরজা বন্ধ করে দিয়েছে, কোনক্রমেই বিশ্বাস করতে চায় না, তার কথা ভিন্ন ৷ সে এর মধ্যে আর সবকিছুই দেখতে পাবে ৷ কিন্তু দেখবে না শুধু সত্যের প্রতি ইংগিত প্রদানকারী কোন নিদর্শন ৷ তবে যার হৃদয়-মন সংকির্ণতা ও পক্ষপাত মুক্ত এবং সত্যের জন্য অবারিত ও উন্মুক্ত সে এসব জিনিস দেখে কখনো এ ধারণা পোষণ করবে না যে, এসবই কয়েকশ' কোটি বছর পূর্বে বিশ্ব-জাহানে সংঘটিত একটি আকস্মিক মহা বিষ্ফোরণের ফল ৷ বরং এসব দেখে তার দৃঢ় বিশ্বাস জন্মাবে যে, এ চরম উন্নত মানের এ বৈজ্ঞানিক কীর্তি মহা শক্তিমান ও মহাজ্ঞানী এক আল্লাহরই সৃষ্টি ৷ যে আল্লাহ এ পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন , তিনি যেমন মৃত্যুর পরে পুনরায় মানুষকে সৃষ্টি করতে অক্ষম হতে পারেন না, তেমনি এমন নির্বোধ হতে পারেন না যে, তার পৃথিবীতে বুদ্ধি-বিবেক ও উপলব্ধির অধিকারী একটি সৃষ্টিকে স্বাধীনতা ও এখতিয়ার দিয়ে লাগামহীন বলদের মত ছেড়ে দিবেন ৷ স্বাধীনতাও ইখতিয়ারের অধিকারী হওয়ার স্বতষ্ফূর্ত ও অনিবার্য দাবী হলো জবাবদিহি ৷ জবাবদিহির ব্যবস্থা না থাকলে স্বাধীনতা ও এখতিয়ার যুক্তি ও ইনসাফের পরিপন্থী হবে ৷ আর অসীম শক্তির বিদ্যমানতা স্বভাবতই একথা প্রমাণ করে যে, পৃথিবীতে মানবজাতির কাজ শেষ হওয়ার পর সে যেখনেই মরে পড়ে থাকুক না কেন যখন ইচ্ছা তার মহাশক্তিধর স্রষ্টা জবাবদিহির জন্য সমস্ত মানুষকে পৃথিবীর প্রতিটি কোণ থেকে পুনরুজ্জীবিত করে আনতে সক্ষম ৷
১৯. অর্থাৎ বাইরে দেখারও প্রয়োজন নেই ৷ শুধু নিজের মধ্যে দেখলেই তুমি এ সত্য প্রমাণকারী অসংখ্য নিদর্শন দেখতে পাবে ৷ কিভাবে একটি অণুবীক্ষণিক কীট এবং অনুরূপ একটি অণুবীক্ষণিক ডিম্বকে মিলিয়ে একত্রিত করে মাতৃদেহের একটি নিভৃত কোণে তোমাদের সৃষ্টির সূচনা করা হয়েছিল ৷ অন্ধকার সেই নিভৃত কোণে কিভাবে লালন পালন করে তোমাদেরকে ক্রমান্বয়ে বড় করা হয়েছে ৷ কিভাবে তোমাদেরকে অনুপম আকৃতি ও কাঠামোর দেহ এবং বিস্ময়কর কর্মশক্তি সম্পন্ন প্রাণ শক্তি দেয়া হয়েছে ৷ কিভাবে তোমাদের দেহাবয়বের পূর্ণতা প্রাপ্তি মাত্রই তাকে মাতৃগর্ভের সংকির্ণ ও অন্ধকার জগত থেকে বের করে এ বিশাল ও বিস্তৃত জগতে এমন সময় আনা হয়েছে যখন তোমাদের মধ্যে অত্যন্ত শক্তিশালী একটি স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র স্থাপিত হয়েছে ৷ এ যন্ত্র তোমাদের জন্ম থেকে যৌবন ও বার্ধক্য পর্যন্ত শ্বাস গ্রহণ করা, খাদ্য পরিপাক করা, রক্ত তৈরী করা শিরা উপশিরায় প্রবাহিত করা, মল নির্গমন করা, দেহের ক্ষয়িত বা ধ্বংসপ্রাপ্ত অংশসমূহ আবার নির্মাণ করা ভিতর থেকে উদ্ভুত কিংবা বাইরে থেকে আগমনকারী বিপদাপদ-সমূহের প্রতিরোধ করা, ক্ষয়ক্ষতি পূরণ করা এমনকি পরিশ্রান্ত হওয়ার পর আরামের জন্য শুইয়ে দেয়ার কাজ পর্যন্ত আপনা থেকেই সম্পন্ন করে যাচ্ছে ৷ জীবনের এ মৌলিক প্রয়োজনসমূহ পূরণের জন্য তোমাদের মনোযোগ ও চেষ্টা-সাধনার সামন্যতম অংশও ব্যয়িত হয় না ৷ তোমাদের মাথার খুলির মধ্যে একটা বিস্ময়কর মস্তিস্ক বসিয়ে দেয়া হয়েছে যার জটিল ভাঁজে ভাঁজে জ্ঞান-বুদ্ধির , চিন্তা-ভাবনা, কল্পনা, উপলব্ধি, ন্যায়-অন্যায় বোধ, ইচ্ছা , স্মৃতিশক্তি, আকাংখা , অনুভুতি, আবেগ, ঝোঁক ও প্রবণতা এবং আরো অনেক শক্তির এক বিশাল ভাণ্ডার কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে আছে ৷ তোমাদেরকে জ্ঞান অর্জন করার অনেক মাধ্যম দেয়া হয়েছে যা চোখ, নাক, কান এবং গোটা দেহের স্নায়ুতন্ত্রীর সাহায্যে তোমাদেরকে সব রকমের সংবাদ পৌছিয়ে থাকে ৷ তোমাদেরকে ভাষা এবং বাকশক্তি দেয়া হয়েছে যার সাহায্যে তোমরা নিজের মনের ভাব প্রকাশ করতে পার ৷ সর্বোপরি তোমাদের সত্তার এ গোটা সাম্রজ্যের ওপর তোমার আমিত্ব বা অহংকে নেতা বানিয়ে বসিয়ে দেয়া হযেছে যাতে সবগুলো শক্তি কাজে লাগিয়ে মতামত গঠন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পার যে, কোন পথে তোমাদের সময়, শ্রম ও চেষ্টা-সাধনা ব্যয় করতে হবে, কোনটি বর্জন করতে হবে এবং কোনটি গ্রহণ করতে হবে, কোন বস্তুকে নিজের জীবনের উদ্দেশ্য ও লক্ষ বানাতে হবে এবং কোনটিকে নয় ৷

একটু লক্ষ করো এরূপ একটি সত্তা বানিয়ে তোমাদেরকে যখন পৃথিবীতে আনা হলো তখনই তোমাদের সত্তার লালন-পালন , প্রবৃদ্ধি উন্নতি ও পূর্ণতা সাধনের জন্য কত সাজ-সরঞ্জাম এখানে প্রস্তুত পেয়েছো ৷ এসব সাজ-সরঞ্জামের বদৌলতে জীবনের একটি পর্যায়ে পৌছে তোমরা নিজেদের ক্ষমতা ইখতিয়ার কাজে লাগানোর উপযুক্ত হয়েছো ৷

এসব ক্ষমতা ইখতিয়ার কাজে লাগানোর জন্য পৃথিবীতে তোমাদেরকে নানা উপায়-উপরকণ দেয়া হয়েছে, সুযোগ দেয়া হয়েছে , বহু জিনিসের ওপর তোমাদের কর্তৃত্ব করার ক্ষমতা দেয়া হয়েছে ৷ বহু মানুষের সাথে তোমরা নানা ধরনের আচরণ করেছো ৷ তোমাদের সামনে কুফরী ও ঈমান, পাপাচার ও আনুগত্য , জুলুম ও ইনসাফ, নেকী ও কুকর্ম এবং হক ও বাতিলের সমস্ত পথ খোলা ছিল ৷ এসব পথের প্রত্যেকটির দিকে আহবানকারী এবং প্রত্যেকটির দিকে নিয়ে যাওয়ার মত কার্যকারণসমূহ বিদ্যমান ছিল ৷ তোমাদের মধ্যে যে-ই যেপথ বেছে নিয়েছে নিজের দায়িত্বেই বেছে নিয়েছে ৷ কারণ, সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাছাই করার ক্ষমতা তার মধ্যে পূর্ব থেকেই দেয়া হয়েছিলো ৷ প্রত্যেকের নিজের পছন্দ অনুসারে তার নিয়ত ও ইচ্ছাকে বাস্তবে রূপায়িত করার যে সুযোগ সে লাভ করেছে তা কাজে লাগিয়ে কেউ সৎকর্মশীল হয়েছে এবং কেউ দুষ্কর্মশীল হয়েছে ৷ কেউ কুফরী, শিরক ও নাস্তিকতার পথ গ্রহণ করেছে ৷ কেউ তার প্রবৃত্তিকে অবৈধ আকাংখা চরিতার্থ করা থেকে বিরত রেখেছে আর কেউ প্রবৃত্তির দাসত্ব করতে গিয়ে সবকিছু করে বসেছে ৷ কেউ জুলুম করেছে আর কেউ জুলুম বরদাশত করেছে ৷ কেউ অধিকার দিয়েছে আর কেউ অধিকার নস্যাত করেছে ৷ কেউ মৃত্যু পর্যন্ত পৃথিবীতে কল্যাণের কাজ করেছে আবার কেউ জীবনের শেষ মুহুর্তে পর্যন্ত কুকর্ম করেছে ৷ কেউ ন্যায়কে সমুন্নত করার জন্য জীবনপাত করেছে ৷ আবার কেউ বাতিলকে সমুন্নত করার জন্য ন্যায়ের অনুসারীদের ওপর জুলুম চালিয়ে গেছে ৷

এমন কোন ব্যক্তি যার বিবেকের চোখে একেবারেই অন্ধ হয়ে যায়নি সে কি একথা বলতে পারে যে, এ ধরনের একটি সত্তা আকস্মিকভাবে পৃথিবীতে অস্তিত্ব লাভ করেছে? এর পেছনে কোন যুক্তি ও পরিকল্পনা কার্যকর নেই? তার হাতে পৃথিবীতে যেসব কর্মকাণ্ড সংঘটিত হচ্ছে তা সবই ফলাফল এবং উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যহীনভাবে শেষ হয়ে যাবে? কোন ভাল কাজের ভাল ফল এবং কোন মন্দ কাজের মন্দ ফল নেই? কোন জুলুমের কোন প্রতিকার এবং কোন জালেমের কোন জবাবদিহি নেই? যুক্তিবুদ্ধির ধার ধারে না এমন লোকই কেবল এ ধরনের কথা বলতে পারে ৷ কিংবা বলতে পারে এমন লোক যে আগে থেকেই শপথ করে বসে আছে যে, মানব সৃষ্টির পেছনে যত বড় বৈজ্ঞানিক লক্ষ থাকার কথা বলা হোক, তা অস্বীকার করতেই হবে ৷ কিন্তু গোঁড়ামী ও সংকীর্ণতামুক্ত একজন লোকের পক্ষে একথা না মেনে উপায় নেই যে, মানুষকে যেভাবে যেসব ক্ষমতা ও যোগ্যতা দিয়ে পৃথিবীতে সৃষ্টি করা হয়েছে এবং যে মর্যাদা তাকে এখানে দেয়া হয়েছে তা নিশ্চিতভাবেই একটি অত্যন্ত বিজ্ঞানসম্মত পরিকল্পনা ৷ যে আল্লাহ এমন পরিকল্পনা করতে পারেন তার বিচক্ষণতা অনিবার্যরূপে দাবী করে যে, মানুষকে তার কাজ-কর্মের জন্য জবাবদিহি করতে হবে ৷ আর সেই আল্লাহর শক্তি -সমর্থ সম্পর্কে এ ধারণা পোষন করা মোটেই ঠিক নয় যে, তিনি যে মানুষকে অণুবিক্ষণ যন্ত্রে দেখার মত একটি কোষ থেকে সৃষ্টি করে এ পর্যায়ে পৌছিয়েছেন তাকে তিনি পুনরায় অস্তিত্ব দান করতে পারবেন না ৷
২০. এখানে আসমান অর্থ উর্ধজগত ৷ মানুষকে পৃথিবীতে বেঁচে থাকার এবং কাজ করার জন্য যা কিছু দেয়া হয় রিযিক অর্থে তার সবকিছুই বুঝায় ৷ আর সমস্ত আসমানী কিতাব ও এ কুরআন কিয়াতম হাশর ও পুরনুত্থান , হিসেব-নিকেশ, ও জবাবদিহি, পুরস্কার ও শাস্তি এবং জান্নাত ও জাহান্নামের যে প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে ( ) বলে সেসবকেই বুঝানো হয়েছে ৷ আল্লাহর এ বাণীর অর্থ হচ্ছে দুনিয়ায় তোমাদের কাকে কি দিতে হবে তার ফায়সালা উর্ধজগত থেকেই হয় ৷ তাছাড়া জবাবদিহি ও কর্মফল দেয়ার জন্য কখন তলব করা হবে সে ফায়সালাও সেখান থেকেই হবে ৷