(৫০:১) ক্বাফ, মহিমান্বিত কল্যাণময় কুরআনের শপথ৷
(৫০:২) তারা বরং বিস্মিত হয়েছে এ জন্য যে, তোমাদের কাছে তাদের মধ্য থেকেই একজন সতর্ককারী এসেছে৷ এরপর অস্বীকারকারীরা বলতে শুরু করলো এটা তো বড় আশ্চর্যজনক কথা,
(৫০:৩) আমরা যখন মরে যাব এবং মাটিতে মিশে যাব (তখন কি আমাদের উঠানো হবে) ? এ প্রত্যাবর্তন তো যুক্তি-বুদ্ধি বিরোধী৷
(৫০:৪) অথচ মাটি তার দেহের যা কিছু খেয়ে ফেলে তা সবই আমার জানা৷ আমার কাছে একখানা কিতাব আছে৷ তাতে সবকিছু সংরক্ষিত আছে৷
(৫০:৫) এসব লোকেরা তো এমন যে, যখনই তাদের কাছে সত্য এসেছে, তখনই তারা তাকে মিথ্যা মনে করেছে৷ এ কারণেই তারা এখন দ্বিধা-দ্বন্দ্বের মধ্যে পড়ে আছে৷
(৫০:৬) আচ্ছা, এরা কি কখনো এদের মাথার ওপরের আসনের দিকে তাকায়নি ? আমি কিভাবে তা তৈরী করেছি এবং সজ্জিত করেছি৷ তাতে কোথাও কোন ফাটল নেই৷
(৫০:৭) ভূপৃ‌ষ্ঠকে আমি বিছিয়ে দিয়েছি, তাতে পাহাড় স্থাপন করেছি এবং তার মধ্যে সব রকম সুদৃশ্য উদ্ভিদরাজি উৎপন্ন করেছি৷
(৫০:৮) এসব জিনিসের সবগুলোই দৃষ্টি উন্মুক্তকারী এবং শিক্ষাদানকারী ঐ সব বান্দার জন্য যারা সত্যের দিকে প্রত্যাবর্তন করে৷
(৫০:৯) আমি আসমান থেকে বরকতপূর্ণ পানি নাযিল করেছি৷ অতপর তা দ্বারা বাগান ও খাদ্য শস্য উৎপন্ন করেছি৷
(৫০:১০) তাছাড়া থরে থরে সজ্জিত ফলভর্তি ফাঁদি বিশিষ্ট দীর্ঘ সুউচ্চ খেজুর গাছ৷
(৫০:১১) এটা হচ্ছে বান্দাহদেরকে রিযিক দেয়ার ব্যবস্থা৷ এ পানি দ্বারা আমি মৃত ভূমিকে জীবন দান করি৷১০ (মৃতু মানুষের মাটি থেকে) বেরিয়ে আসাও এভাবেই হবে৷ ১১
(৫০:১২) এদের আগে নূহের কওম, আসহাবুর রাস, ১২ সামূদ,
(৫০:১৩) আদ, ফেরাউন, ১৩ লূতের ভাই
(৫০:১৪) আইকবাসী এবং তুব্বা কওমের ১৪ লোকেরাও অস্বীকার করছিল৷ ১৫ প্রত্যেকেই রসূলদের অস্বীকার করেছিল ১৬ এবং পরিণামে আমার শাস্তির প্রতিশ্রুতি তাদের জন্য কার্যকর হয়েছে৷ ১৭
(৫০:১৫) আমি কি প্রথমবার সৃষ্টি করতে অক্ষম ছিলাম ? আসলে নতুন করে সৃষ্টির ব্যাপারে এসব লোক সন্দেহে নিপতিত হয়ে আছে৷ ১৮
১. ( ) শব্দ আরবী ভাষায় দু'টি অর্থে ব্যবহৃত হয় ৷ এক, উচ্চ পদের অধিকারী, শ্রেষ্ঠ মহান এবং সম্মান ও মর্যাদার অধিকারী ৷ দুই, দয়ালু, অধিক দানশীল এবং অতি মাত্রায় উপকারকারী ৷ কুরআনের জন্য এ শব্দটি দুটি অর্থেই ব্যবহৃত করা হয়েছে ৷ কুরআন মহান এ দিন দিয়ে যে, তার মোকাবিলায় দুনিয়ার আর কোন গ্রন্থই পেশ করা যেতে পারে না ৷ ভাষা ও সাহিত্যিক মূল্যবোধের বিচারেও তা মু'জিযা আবার শিক্ষা ও জ্ঞানের বিচারেও তা মু'জিযা ৷ কুরআন যে সময় নাযিল হয়েছিল সে সময়েও মানুষ কুরআনের বাণীর মত বাণী বানিয়ে পেশ করতে অক্ষম ছিল এবং আজও অক্ষম ৷ তার কোন কথা কখনো কোন যুগে ভুল প্রমাণ করা যায়নি এবং যাবেও না ৷ বাতিল না পারে সমানে থেকে এর মোকাবিলা করতে না পারে পেছন দিক থেকে আক্রমণ করে পরাজিত করতে ৷ কুরআন অধিক দাতা এ দিক দিয়ে যে, মানুষ তার থেকে যত বেশী পথ-নির্দেশনা পাওয়ার চেষ্টা করে সে তাকে ততটাই পথনির্দেশনা দান করে এবং যত বেশী তা অনুসরণ করবে, দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণ সে ততই বেশী লাভ করতে থাকে ৷ এর উপরকার ও কল্যাণের এমন কোন সীমা নেই যেখানে পৌছে মানুষ এর মুখাপেক্ষী না হয়েও পারে কিংবা যেখানে পৌছার পর এর উপকারিতা শেষ হয়ে যায় ৷
২. এ আয়াতাংশটি অলংকারময় ভাষার একটি অতি উত্তম নমুনা ৷ অনেক বড় একটি বিষয়কে এতে কয়েকটি সংক্ষিপ্ত শব্দের সাহায্যে প্রকাশ করা হয়েছে ৷ যে ব্যাপারে কুরআনের শপথ করা হয়েছে তা বর্ণনা করা হয়নি ৷ এ বিষয়টি উল্লেখ করার পরিবর্তে মাঝে একটি সুক্ষ্ম শূন্যতা রেখে পরবর্তী কথা 'আসলে' বা 'বরং'শব্দ দিয়ে আরম্ভ করা হয়েছে ৷ কেউ যদি একটু চিন্তা-ভাবনা করে এবং যে পটভূমিতে একথা বলা হয়েছে সেদিকেও খেয়াল রাখে তাহলে শপথ ও 'বরং'শব্দের মাঝে যে শূন্যতা রেখে দেয়া হয়েছে তার বিষয়বস্তু তা কি সে জানতে পারবে ৷ এখানে মূলত যে ব্যাপারে শপথ করা হয়েছে তাহচ্ছে, মক্কাবাসীরা কোন যুক্তিসংগত কারণে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের রিসালাত মানতে অস্বীকার করেনি বরং একেবারেই একটি অযৌক্তিক কারণে অস্বীকার করছে ৷ অর্থাৎ তাদের স্বজাতির একজন মানুষ এবং তাদের নিজেদের কওমের এক ব্যক্তির আল্লাহর পক্ষ থেকে সতর্ককারী হয়ে আসা তাদের কাছে অতি আশ্চর্যজনক ব্যাপার ৷ অথচ, বিস্ময়ের ব্যাপার হতে পারতো যদি আল্লাহ তাঁর বান্দাদের কল্যাণ অকল্যাণ সম্পর্কে বেপরোয়া হয়ে তাদের সাবধান করার কোন ব্যবস্থা না করতেন, কিংবা মানুষকে সাবধান করার জন্য মানুষ ছাড়া অন্য কিছুকে পাঠাতেন অথবা আরবদের সাবধান করার জন্য কোন চীনাকে পাঠিয়ে দিতেন ৷ তাই অস্বীকৃতির এ কারণ একেবারেই অযৌক্তিক ৷ সুস্থ বিবেক-বুদ্ধি সম্পন্ন একজন মানুষ নিশ্চিতভাবেই একথা মানতে বাধ্য যে, বান্দাদেরকে হিদায়াতের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে অবশ্যই ব্যবস্থা হওয়া উচিত এবং সেটা হবে এভাবে যে, যাদের মধ্যে সাবধানকারীকে পাঠানো হয়েছে তাদেরই একজন হবে ৷ এখন প্রশ্ন হচ্ছে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামই কি সেই ব্যক্তি যাকে আল্লাহ এ কাজের জন্য পাঠিয়েছেন? এ বিষয়টি মীমাংসার জন্য আর কোন সাক্ষের প্রয়োজন নেই, যে মহান ও শ্রেষ্ঠ কল্যাণময় কুরআন তিনি পেশ করেছেন সেটিই তার প্রমাণ হিসেবে যথেষ্ট ৷ এ ব্যাখ্যা থেকে জানা যায় যে, এ আয়াতে কুরআনের শপথ করা হয়েছে একথা বুঝানোর জন্য যে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সত্যিই আল্লাহর রসূল এবং তাঁর রিসালাত সম্পর্কে কাফেরদের বিস্ময় অহেতুক ৷ কুরআনের "মাজীদ"হওয়াকে এ দাবীর প্রমাণ হিসেবে পেশ করা হয়েছে ৷
৩. এটা ছিল তাদের দ্বিতীয় বিস্ময় ৷ তাদের প্রথম ও প্রকৃত বিস্ময় মৃত্যুর পরের জীবন সম্পর্কে ছিল না, বরং তা ছিল এ বিষয়ে যে, তাদের নিজেদের কওমের এক ব্যক্তি দাবী করে বসেছে যে, তিনি আল্লাহর পক্ষ থেকে তাদেরকে সাবধান করার জন্য এসেছেন ৷ তাছাড়া তারা আরো বিস্মিত হয়েছে যে কারণে যে, তিনি যে বিষয়ে তাদেরকে সাবধান করছিলেন তা হচ্ছে, সমস্ত মানুষকে মৃত্যুর পরে পুনরায় জীবিত করা হবে, তাদেরকে একত্রিত করে আল্লাহর আদালতে হাজির করা হবে এবং সেখানে তাদের সমস্ত কাজ-কর্ম হিসেব নিকেশের পর পুরস্কার ও শাস্তি দেয়া হবে ৷
৪. অর্থাৎ একথা যদি তাদের বিবেক-বুদ্ধিতে না ধরে তাহলে তা তাদের বিবেক-বুদ্ধির সংকীর্ণতা ৷ তাদের বিবেক-বুদ্ধির সংকীর্ণতার কারণে আল্লাহর জ্ঞানও কুদরতও সংকীর্ণ হতে হবে তা নয় ৷ এরা মনে করে, সৃষ্টির সূচনাকালে থেকে কিয়ামত পর্যন্ত মৃত্যুবরণকারী অসংখ্য মানুষের দেহের বিভিন্ন অংশ যা মাটিতে মিশে গিয়েছে এবং ভবিষ্যতেও বিক্ষিপ্ত হয়ে মিশে যাবে তা একত্রিত করা কোন ক্রমেই সম্ভব নয় ৷ কিন্তু প্রকৃত ব্যাপার হচ্ছে ঐ সব দেহাংশের একেকটি যেখানে যে অবস্থায় আছে আল্লাহ তা'আলা তা সরাসরি জানেন, তাছাড়া আল্লাহর দফতরে তার পূর্ণাংগ রেকর্ডও সংরক্ষণ করা হচ্ছে ৷ একটি ক্ষুদ্র অণুও তা থেকে বাদ পড়েছে না ৷ যখন আল্লাহর নির্দেশ হবে সেই মুহূর্তেই তাঁর ফেরেশতারা উক্ত রেকর্ড দেখে একেকটি অণুকে খুঁজে বের করবে এবং সমস্ত মানুষ যে দেহ নিয়ে দুনিয়াতে কাজ করেছিল সেই দেহ তারা পুনরায় বানিয়ে দেবে ৷ আখেরাতের জীবন যে কেবল দুনিয়ার জীবনের মত দৈহিক জীবন হবে তাই নয় বরং দুনিয়াতে মানুষের যে দেহ ছিল আখেরাতেও প্রত্যেক মানুষের হুবহু সে একই দেহ হবে ৷ কুরআন মজীদের যেসব আয়াতে একথা স্পষ্ট করে বলা হয়েছে এ আয়াতটিও তার একটি ৷ যদি ব্যাপাটি তা না হতো তাহলে কাফেরদের কথার জবাবে একথা বলা একেবারেই অর্থহীন হতো যে, মাটি তোমাদের দেহের যা কিছু খেয়ে ফেলে তা সবই আমার জানা আছে এবং তার প্রতিটি অণু-পরমাণুর রেকর্ড আমার কাছে সংরক্ষিত আছে ৷ ( আরো ব্যাখ্যার জন্য দেখুন, তাফহীমুল কুরআন, সূরা, হা-মীম, আস সাজদা, টীকা২৫)
৫. এ সংক্ষিপ্ত বাক্যাংশটিতে একটি অতি বড় বিষয় বর্ণনা করা হয়েছে ৷ এর অর্থ তারা শুধু বিস্ময় প্রকাশ করা এবং বিবেক -বুদ্ধি বিরোধী ঠাওরানোকেই যথেষ্ট মনে করেনি ৷ বরং যে সময় মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সত্যের দাওয়াত পেশ করেছেন সে সময় তারা কোন চিন্তা-ভাবনা ছাড়াই তাকে নির্জলা মিথ্যা বলে আখ্যায়িত করেছে ৷ অবশ্যম্ভাবীরূপে তার যে ফল হওয়ার ছিল এবং হয়েছে তা হচ্ছে, এ দাওয়াত এবং এ দাওয়াত পেশকারী রসূলের ব্যাপারে এরা কখনো স্থির ভূমিকা গ্রহণ করতে পারেনি ৷ কখনো তাকে কবি বলে, কখনো বলে গণক কিংবা পাগল ৷ কখনো বলে সে যাদুকর আবার কখনো বলে কেউ তাঁর ওপর যাদু করেছে ৷ কখনো বলে নিজের বড়ত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য সে এ বাণী নিজে বানিয়ে এনেছে আবার কখনো অপবাধ আরোপ করে যে, অন্যকিছু লোক তার পৃষ্ঠপোষকতা করছে ৷ তারাই তাকে এসব কথা বানিয়ে দেয় ৷ এসব পরস্পর বিরোধী কথাই প্রকাশ করে যে, তারা নিজেদের দৃষ্টিভংগী সম্পর্কেই পুরোপুরি দ্বিধান্বিত ৷ যদি তারা তাড়াহুড়ো করে একেবারে প্রথমেই নবীকে অস্বীকার না করতো এবং কোন রকম চিন্তা-ভাবনা না করে আগেভাগেই একটি সিদ্ধান্ত দেয়ার পূর্বে ধীরস্থিরভাবে একথা ভেবে দেখতো যে , এ কে এ দাওয়াত পেশ করছে, কি কথা বলছে এবং তার দাওয়াতের স্বপক্ষে দলীল-প্রমাণ পেশ করছে তাহলে তারা কখনো এ দ্বিধা-দ্বন্দ্বের মধ্যে পড়তো না ৷ এ বিষয়টি স্পষ্ট যে, তাদের কাছে ঐ ব্যক্তি অপরিচিত কেউ ছিল না ৷ সে অন্য কোনখান থেকে আকস্মিকভাবে উড়ে এসে জুড়ে বসেনি ৷ সে তাদের স্বজাতিরই একজন সদস্য ছিল ৷ তাদের জানা শোনা লোক ছিল ৷ তারা তাঁর চরিত্র ও কর্ম যোগ্যতা সম্পর্কে অনবহিত ছিল না ৷ এমন একজন মানুষের পক্ষ থেকে যখন একটি কথা পেশ করা হয়েছিল তখন সাথে সাথে তা গ্রহণ না করলেও শোনামাত্রই তা প্রত্যাখ্যাত হওয়ার মতও ছিল না ৷ তাছাড়া সেটি যুক্তি-প্রমাণহীন কথাও ছিল না ৷ সে তার পক্ষে দলীল -প্রমাণ পেশ করেছিলো ৷ তার প্রমাণাদি কতখানি যুক্তিসংগত তা খোলা কান দিয়ে শোনা এবং পক্ষপাতহীনভাবে যাঁচাই বাছাই করে দেখা উচিত ছিল ৷ কিন্তু এ নীতি গ্রহণ করার পরিবর্তে যখন তারা জিদের বশবর্তী হয়ে প্রথম পর্যায়েই তাকে অস্বীকার করে বসলো তখন তার ফল হলো এই যে, সত্য পর্যন্ত পৌছার একটি দরজা তারা নিজেরাই বন্ধ করে দিল ৷ এবং চিরদিকে উদভ্রান্তের মত ঘুরে বেড়ানোর অনেক দরজা খুলে নিল ৷ এখন তারা নিজেদের প্রাথমিক ভুলকে যুক্তিসিদ্ধ করার পর পরস্পর বিরোধী আরো অনেক কথা গড়তে পারে ৷ কিন্তু তিনি সত্য নবীও হতে পারেন এবং তার পেশকৃত কথা সত্যও হতে পারে এ একটি কথা চিন্তা করে দেখার জন্যও তারা প্রস্তুত নয় ৷
৬. উপরোল্লেখিত পাঁচটি আয়াতে মক্কার কাফেরদের ভূমিকার অযৌক্তিকতা স্পষ্ট করে দেয়ার পর মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আখেরাতের যে খবর দিয়েছেন তার সত্যতার প্রমাণাদি কি তা বলা হচ্ছে ৷ এখানে একথাটি ভালভাবে বুঝে নেয়া প্রয়োজন যে, কাফেররা যে দু'টি বিষয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছিলো তার মধ্যে একটি অর্থাৎ মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহিওয়া সাল্লামের নবুওয়াতের সত্যতা সম্পর্কে প্রারম্ভেই দুটি প্রমাণ পেশ করা হয়ছে ৷ প্রথম প্রমাণটি হলো, তিনি তোমাদের সামনে কুরআন মজীদ পেশ করেছেন যা তাঁর নবী হওয়ার খোলাখুলি প্রমাণ ৷ দ্বিতীয় প্রমাণ হচ্ছে তিনি তোমাদের নিজদের স্বজাতি ও জ্ঞাতি গোষ্ঠীর লোক ৷ তিনি হঠাৎ আসমান থেকে কিংবা অন্য কোন অঞ্চল থেকে এসে হাজির হননি যে, তিনি নির্ভরযোগ্য ব্যক্তি কিনা আর এ কুরআন তাঁর নিজের রচিত কথা হতে পারে কিনা তা তাঁর জীবন, চরিত্র ও কর্ম যাঁচাই-বাছাই করে বিশ্লেষণ করা কঠিন ৷ অতএব তার নবুওয়াত দাবী সম্পর্কে তোমাদের বিস্ময় অনর্থক ৷ এ যুক্তি প্রমাণ সবিস্তরে পেশ করার পরিবর্তে সংক্ষিপ্ত দুটি ইংগিত আকারে বর্ণনা করা হয়েছে ৷ কেননা, মুহাম্মাদ ( সা) যে সময় মক্কায় দাঁড়িয়ে নিজে সেসব লোকদের কুরআন শুনাচ্ছিলেন যারা তাঁর শৈশব থেকে শুরু করে যৌবন এবং পৌঢ়ত্ব পর্যন্ত তার গোটা জীবন দেখেছিল , সে সময়ের প্রতিটি ব্যক্তির কাছে যেসব ইংগিতের বিস্তারিত পরিবেশ ও পটভূমি আপন থেকেই সুস্পষ্ট ছিল ৷ তাই তাঁর বর্ণনা বাদ দিয়ে দ্বিতীয় যে জিনিসটিকে ঐ সব লোক আদ্ভুত ও বিবেক-বুদ্ধির পরিপন্থী বলছে তার সত্যতার বিস্তারিত যুক্তি প্রমাণ পেশ করা হচ্ছে ৷
৮. অর্থাৎ এ বিস্ময়কর বিস্তৃতি সত্ত্বেও এ বিশাল ও জাঁকজমকপূর্ণ বিশ্ব ব্যবস্থা এমন সুশৃংখল ও মজবুত এবং তার বন্ধন এমন অটুট যে, তাতে কোথাও কোন চিড় বা ফাটল এবং কোথাও গিয়ে এর ধারাবাহিকতা ছিন্ন হয় না ৷ একটি উদাহরণের সাহায্যে এ বিষয়টি ভালভাবে বুঝা যেতে পারে, আধুনিক যুগের বেতার সংকেত ভিত্তিক জ্যোতির্বিজ্ঞান -গবেষকগণ একটি ছায়াপথ পর্যবক্ষেণ করেছেন যাকে যাকে তার উৎস ৩গ ২৯৫ ( Source 3c 295) নামে আখ্যায়িত করে থাকেন ৷ উক্ত ছায়াপথ সম্পর্কে তাদের ধারণা হচ্ছে, বর্তমানে আমাদের কাছে তার যে আলো এসে পৌছেছে তার চারশ'কোটি বছরেরও বেশী সময় পূর্বে সেখান থেকে রওয়ানা হয়ে থাকবে ৷ এত দূর থেকে এমব আলোক রশ্মির পৃথিবী পর্যন্ত পৌছা কি করে সম্ভব হতো যদি পৃথিবী এবং উক্ত ছায়াপথের মাঝে বিশ্ব ব্যবস্থার ধারাবাহিকতার কোথাও ছিন্ন থাকতো এবং বন্ধনে ফাটল থাকতো ৷ আল্লাহ তা'আলা এ সত্যের দিকে ইংগিত করে প্রকৃতপক্ষে মানুষের সামনে এ প্রশ্নই রেখেছেন যে , আমার সৃষ্ট বিশ্ব-জাহানের এ ব্যবস্থাপনায় যখন তোমরা একটি সামান্য ছিদ্রও দেখিয়ে দিতে পারো না তখন তোমাদের মগজে আমার দূর্বলতা এ ধারণা কোথা থেকে আসে যে, তোমাদের পরীক্ষা দেয়ার সুযোগ শেষ হয়ে যাওয়ার পর হিসেব-নিকেশ নেয়ার জন্য আমি তোমাদের জীবিত করে আমার সামনে হাজির করতে চাইলে তা করতে পারবো না ৷ এটা শুধু আখেরাতের সম্ভবনার প্রমাণই নয় বরং তাওহীদেরও প্রমাণ ৷ চারশত কোটি আলোক বর্ষের ( Light Year) দূরত্ব থেকে এসব আলোক রশ্মির পৃথিবী পর্যন্ত পৌছা এবং এখানে মানুষের তৈরী যন্ত্রপাতিতে ধরা পড়া খোলাখুলি একথা প্রমাণ করে যে, ঐ ছায়াপথ থেকে পৃথিবী পর্যন্ত গোটা সৃষ্টিজগত একই বস্তুর তৈরী , তার মধ্যে একই রকম শক্তিসমূহ কর্মতৎপরতা রয়েছে এবং কোন প্রকার পার্থক্য ও ভিন্নতা ছাড়া তা একই রকম নিয়ম-কানুন অনুসারে কাজ করছে ৷ তা না হলে এসব আলোক রশ্মি এ পৃথিবী পর্যন্ত পৌছতে সক্ষম হতো না এবং পৃথিবী ও তার পরিবেশে ক্রিয়াশীল নিয়ম -কানুন সম্পর্কে অর্জিত জ্ঞানের ভিত্তিতে মানুষ যেসব যন্ত্রপাতি তৈরী করেছে তাতেও ধরা পড়তো না ৷ এতে প্রমাণিত হয়, একই আল্লাহ গোটা এ বিশ্ব-জাহানের স্রষ্টা, মালিক, শাসক ও ব্যবস্থাপক ৷
৭. এখানে আসমান বলতে পুরো উর্ধজগতকে বুঝানো হয়েছে ৷ যা মানুষ রাত-দিন তার মাথার ওপর ছেয়ে থাকতে দেখে ৷ যেখানে দিনের বেলা সূর্য দীপ্তি ছড়ায়, রাতের বেলা চাঁদ এবং অসংখ্য তারকারাজি উজ্জল হয়ে দেখা দেয় ৷ মানুষ যদি এগুলোকে খালি চোখেই দেখে তাহলেও সে বিস্মায়বিস্ট হয়ে পড়ে ৷ আর দূরবীন লাগিয়ে দেখলে এমন একটি বিশাল সুবিস্তৃত সৃষ্টিজগত তার সামনে ভেসে ওঠে যার কোন সীমা পরিসীমা নেই ৷ কোথাও শুরু এবং কোথাও শেষ হয়েছে বুঝা যাবে না ৷ আমাদের পৃথিবীর চেয়ে লক্ষ লক্ষ গুণ বড় বিশালকার গ্রহসমূহ এর মধ্যে বলের মত ঘুরপাক খাচ্ছে ৷ আমাদের সূর্যের চেয়ে হাজার হাজার গুণ অধিক উজ্জল তারকা তার মধ্যে জ্বলজ্বল করে জ্বলছে ৷ আমাদের এ সৌরজগত তার একটি মাত্র ছায়াপথের এক কোণে পড়ে আছে ৷ এ একটি মাত্র ছায়াপথে আমাদের সূর্যের মত কমপক্ষে আরো ৩ শত কোটি তারকা ( স্থির বস্তু) বিদ্যমান এবং মানুষের পর্যবেক্ষণ এ পর্যন্ত এরূপ দশ লাখ ছায়াপথের সন্ধান দিচ্ছে ৷ এ লক্ষ লক্ষ ছায়াপথের আমাদের সর্বাপেক্ষা নিকটবর্তী প্রতিবেশী ছায়াপথটি এত দূরে অবস্থিত যে, তার আলো সেকেণ্ডে এক লাখ ছিয়াশি হাজার মাইল গতিতে অগ্রসর হয়ে দশ লাখ বছরে আমাদের পৃথিবী পর্যন্ত পৌছে ৷ এটা হচ্ছে সৃষ্টিজগতের সেই অংশের বিস্তৃতির অবস্থা যা এ পর্যন্ত মানুষের জ্ঞান ও পর্যবেক্ষণে ধরা পড়েছে ৷ আল্লাহর কর্তৃত্ব কত ব্যাপাক ও বিস্তৃত তার কোন অনুমান আমরা করতে পারি না ৷ হতে পারে, সমুদ্রের তুলনায় এক বিন্দু পানি যতটুকু মানুষের জানা সৃষ্টিজগত গোটা সৃষ্টিজগতের অনুপাতর ততটুকুও নয় ৷ যে আল্লাহ এ বিশাল সৃষ্টিজগতেকে অস্তিত্ব দান করেছেন, ভুপৃষ্ঠের ধীরগতি ও বাকশক্তি সম্পন্ন মানুষ নামে অবহিত অতি ক্ষুদ্র জীব যদি সেই আল্লাহ সম্পর্কে মত প্রকাশ করে যে, মৃত্যুর পর তিনি তাকে পুনরায় জীবিত করতে পররবেন না তাহলে সেটা তার নিজের জ্ঞান-বুদ্ধির সংকির্ণতা মাত্র ৷ তাতে বিশ্ব-জাহানের সৃষ্টিকর্তার ক্ষমতা কি করে সীমিত হতে পারে!
৯. ব্যাখ্যার জন্য দেখুন, তাফহীমুল কুরআন, আন নাহল, টীকা ১২, ১৩, ও ১৪;আন নামল, টীকা ৭৩ ৭৪; আয যুখরুফ, টীকা ৭ ৷
১০. ব্যাখ্যার জন্য দেখুন, তাফহীমুল কুরআন, আন নামল, টীকা ৭৩, ৭৪, ৮১; আর রূম, টীকা ২৫, ৩৩, ৩৫; ইয়াসীন, টীকা ২৯ ৷
১১. যুক্তি হচ্ছে, যে আল্লাহ এ পৃথিবী -গ্রহটিকে জীবন্ত সৃষ্টির বসবাসের জন্য উপযুক্ত স্থান বানিয়েছেন, যিনি পৃথিবীর প্রাণহীন মাটিকে আসমানের প্রাণহীন পানির সাথে মিশিয়ে এত উচ্চ পর্যায়ের উদ্ভিদ জীবন সৃষ্টি করেছেন যা তোমরা তোমাদের বাগান ও শস্যক্ষেত রূপে শ্যামলিমায় ভরে উঠতে দেখছো এবং যিনি এ উদ্ভিদরাজিকে মানুষ ও জীব-জন্তু সবার জন্য রিযিকের মাধ্যম বানিয়ে দিয়েছেন, তাঁর সম্পর্কে তোমাদের এ ধারণা যে, মৃত্যুর পর তিনি পুনরায় সৃষ্টি করতে সক্ষম নন! এটি নিরেট নির্বুদ্ধিতামূলক ধারণা ছাড়া আর কিছুই নয় ৷ তোমরা নিজের চোখে অহরহ দেখছো , একটি এলাকা একেবারে শুষ্ক ও প্রাণহীন পড়ে আছে, সৃষ্টির একটি বিন্দু পড়া মাত্রই তার ভেতর থেকে অকস্মাত জীবনের ঝর্ণাধারা ফুটে বের হয়, যুগ যুগ ধরে মৃত শিকড়সমূহ হঠাৎ জীবন ফিরে পায় এবং মাটির গভীর অভ্যন্তর ভাগ থেকে নানা রকম কীট ও পোকামাকড় বেড়িয়ে এসে নর্তন কুর্দন শুরু করে দেয় ৷ মৃত্যুর পরে জীবন যে আবার অসম্ভব নয় এটা তারই স্পষ্ট প্রমাণ ৷ তোমাদের এ স্পষ্ট পর্যবেক্ষণকে যখন তোমরা মিথ্যা বলতে পার না তখন তোমরা একথা কি করে মিথ্যা সাব্যস্ত করতে চায় যে, আল্লাহ তা'আলা যখন চাইবেন তখন তোমরা নিজেরাও ঠিক তেমনি মাটির ভেতর থেকে বেরিয়ে আসবে যেমনভাবে উদ্ভিদরাজির অঙ্কুর বেরিয়ে আসে ৷ এ প্রসংগে এ কথা উল্লেখ করা যেতে পারে যে আবর ভুখণ্ডের বহু অঞ্চল এমন যেখানে কোন কোন সময় পাঁচ বছর পর্যন্ত বৃষ্টি হয় না ৷ এমনকি কখনো কখনো তার চেয়েও বেশী সময় চলে যায় কিন্তু আসমান থেকে একবিন্দু বৃষ্টিও ঝরে না ৷ উত্তপ্ত মরুভূমিতে এত দীর্ঘ সময় পর্যন্ত ঘাসের মূল এবং কীপপতঙ্গ ও পোকামাকড়ের জীবিত থাকা কল্পনাতীত ৷ তা সত্ত্বেও কোন সময় যখন সেখানে সামান্য বৃষ্টিও হয় তখন ঘাস ফুটে বের হয় এবং কীট -পতঙ্গ ও পোকা মাকড় জীবন লাভ করে ৷ সুতরাং এতে দীর্ঘস্থায়ী অনাবৃস্টির অভিজ্ঞতা যাদের নেই তাদের তুলনায় আরবের লোকেরা আরো ভালভাবে এ যুক্তি উপলব্ধী করতে সক্ষম ৷
১২. এর আগে সূরা ফুরকানর ৩৮ আয়াতে 'আসহাবের রাসসের' আলোচনা করা হয়েছে ৷ এখানে দ্বিতীয় বারের মত তাদের উল্লেখ করা হচ্ছে ৷ তবে উভয় স্থানেই নবীদের অস্বীকারকারী জাতিসমূহের সাথে কেবল মাত্র তাদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে ৷ তাদের কোন বিস্তারিত ঘটনা বর্ণনা করা হয়নি ৷ আরবের কিংবদন্তীতে আর রাস নামে দুটি স্থান সুপরিচিত ৷ একটি নাজদে এবং দ্বিতীয়টি উত্তর হিজাযে ৷ এর মধ্যে নাজদের আর রাস অধিক পরিচিত এবং জাহেলী যুগের কাব্য গাঁথায় এর উল্লেখই বেশী পাওয়া যায় ৷ অসহাবুর রাস এ দুটি স্থানের কোনটির অধিবাসী ছিল তা এখন নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন ৷ কোন বর্ণনাতেই তাদের কাহিনীর নির্ভরযোগ্য বিশাদ বিবরণ পাওয়া যায় না ৷ বড় জোর এতটুকু সঠিকভাবে বলা যেতে পারে যে, তারা ছিল এমন এক জাতি যারা তাদের নবীকে কূপের মধ্যে নিক্ষেপ করেছিল ৷ তবে তাদের বিষয়ে কুরআন মজীদে শুধু ইংগিত দিয়েই ক্ষান্ত থাকা হয়েছে ৷ এতে বুঝা যায়, কুরআন নাযিলের সময় আরবরা ব্যাপকভাবে তাদের কাহিনী সম্পর্কে অবহিত ছিল ৷ কিন্তু পরবর্তী কালে এসব বর্ণনা ও কাহিনী ইতিহাসে সংরক্ষিত হতে পারেনি ৷
১৩. "ফেরাউনের কওম" বলার পরিবর্তে শুধু নাম উল্লেখ করা হয়েছে ৷ কারণ সে তার জাতির ঘাড়ে এমনভাবে চেপে বসেছিল যে, তার সামনে তার জাতির কোন স্বাধীন বক্তব্য ও দৃঢ়তা অবশিষ্ট ছিল না ৷ সে যে গোমরাহীর দিকেই অগ্রসর হতো তার জাতিও তার পেছনে ছুটে চলতো ৷ তাই একটা ঐ ব্যক্তিকে গোটা জাতির গোমরাহীর জন্য দায়ী করা হয়েছে ৷ যেখানে জাতির মতামত ও কর্মের স্বাধীনতা আছে সেখানে তার কাজ-কর্মের দায়-দায়িত্ব সে জাতি নিজেই বহন করে ৷ আর যেখানে এক ব্যক্তির একনায়কত্ব জাতিকে অসহায় করে রাখে সেখানেই সেই এক ব্যক্তিই গোটা জাতির অপরাধের বোঝা নিজের মাথায় তুলে নেয় ৷ এর অর্থ অবশ্য এই নয় যে, এ বোঝা এক ব্যক্তির ঘাড়ে উত্তোলিত হওয়ার পর জাতি তার দায় -দায়িত্ব থেকে পুরোপুরি অব্যহতি পেয়ে যায় ৷ না, সে ক্ষেত্রে নিজের ঘাড়ে এক ব্যক্তিকে এভাবে চেপে বসতে দিয়েছে কেন, সেই নৈতিক দুর্বলতার দায়িত্ব জাতির ওপর অবশ্য বর্তায় ৷ সূরা যুখরূফের ৫৪ আয়াতে এ বিষয়টির প্রতিই ইংগিত দেয়া হয়েছে ৷

-----------------------------------------

"ফেরাউন তার জাতিকে গুরুত্বহীন মনে করে নিয়েছে এবং তারাও তার আনুগত্য করেছে ৷ প্রকৃতপক্ষে তারা ছিল ফাসেক ৷ "

ব্যাখ্যার জন্য দেখুন, তাফহীমুল কুরআন সূরা, যুখরূফের ব্যাখ্যা, টীকা৫) ৷
১৪. ব্যাখ্যার জন্য দেখুন তাফহীমুল কুরআন, সূরা সাবার ব্যাখ্যা, টীকা ৩৭;সূরা দুখান, টীকা ৩২ ৷
১৫. অর্থাৎ তারা সবাই তাদের রসূলের রিসালাতের অস্বীকার করেছে এবং মৃত্যুর পরে তাদেরকে পুনরায় জীবিত করে উঠানো হবে তাঁদের দেয়া এ খবরও অস্বীকার করেছে ৷
১৬. যদিও প্রত্যেক জাতি কেবল তাদের কাছে প্রেরিত রসূলকেই অস্বীকার করেছিল ৷ কিন্তু তারা যেহেতু এমন একটি খবরকে অস্বীকার করেছিল যা সমস্ত রসূল সর্বসম্মতভাবে পেশ করেছিলেন ৷ তাই একজন রসূলকে অস্বীকার করা প্রকৃতপক্ষে সমস্ত রসূলকেই অস্বীকার করার নামান্তর ৷ তাছাড়া এসব জাতির প্রত্যেকে কেবল তাদের কাছে আগমনকারী রসূলের রিসালাত অস্বীকার করেনি, বরং আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে মানুষের হিদায়াতের জন্য কোন মানুষ যে আদিষ্ট হয়ে আসতে পারে একথা মানতে তারা আদৌ প্রস্তুত ছিল না ৷ সুতরাং তারা ছিল মূলত রিসালাতেরই অস্বীকারকারী এবং তাদের কারো অপরাধই শুধুমাত্র একজন রসূলের অস্বীকৃতির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না ৷
১৭. এটা আখেরাতের সপক্ষে ঐতিহাসিক প্রমাণ উপস্থাপন ৷ এর পূর্বের ৬টি আয়াতে আখেরাতের সম্ভাবনার প্রমাণ পেশ করা হয়েছে ৷ আর এ আয়াতে পেশ করা হয়েছে আখেরাতের বাস্তবের প্রমাণ ৷ সমস্ত নবী আলাইহিমুস সালাম আখেরাত সম্পর্কিত যে আকীদা পেশ করেছেন তা যে সম্পূর্ণ সত্য ও বাস্তব তার প্রমাণ হিসেবে এ আয়াতে আরব ও তার আশেপাশের জাতিসমূহের ঐতিহাসিক পরিণতিকে পেশ করা হয়েছে ৷ কারণ যে জাতিই তা অস্বীকার করেছে সে জাতিই চরম নৈতিক বিকৃতির শিকার হয়েছে ৷ এমনকি পরিশেষে আল্লাহর আযাব এসে তাদেরকে পৃথিবী থেকে একেবারেই নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছে ৷ আখেরাতের অস্বীকৃতির সাথে নৈতিক বিকৃতির এ অনিবার্যতা যা ইতিহাসের আবর্তনের সাথে সাথে একের পর এক পরিলক্ষিত হয়-একথা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, এ দুনিয়ায় মানুষকে প্রকৃতপক্ষে দায়িত্বহীন ও কৃতকর্মের জবাবদিহি মুক্ত করে ছেড়ে দেয়া হয়নি, বরং কার্যকাল শেষ হওয়ার পর তাকে তার সমস্ত কাজ-কর্মের জবাব দিতে হবে ৷ একারণে যখনই সে নিজেকে দায়িত্বমুক্ত মনে করে দুনিয়ায় কাজ করে তখনই তার গোটা জীবন ধ্বংসের পথে অগ্রসর হয় ৷ যখন কোন কাজের ক্রমাগতভাবে খারাপ ফলাফল দেখা দিতে থাকে তখন তা অকাট্যভাবে প্রমাণ করে যে, কাজটি বাস্তবতার পরিপন্থী ৷
১৮. এটা আখোতের সপক্ষে যৌক্তিক প্রমাণ ৷ যে ব্যক্তি আল্লাহকে অস্বীকার করে না এবং সুশৃখল ও সুবিন্যস্ত এ বিশ্ব-জাহানে মানুষের সৃষ্টিকে নিছক একটি আকস্মিক ঘটনা হিসেবে আখ্যায়িত করার মত নির্বুদ্ধিতা যাকে পেয়ে বসেনি তার পক্ষে একথা স্বীকার না করে উপায় নেই যে, আল্লাহ তা'আলাই আমাদেরকে এবং পুরো এ বিশ্ব-জাহানের সৃষ্টি করেছেন ৷ আমরা যে দুনিয়ায় জীবিতাবস্থায় বর্তমান এবং দুনিয়া ও আসমানের এসব কাজ-কারবার যে আমাদের চোখের সামনেই চলছে, এটা স্বতই প্রমাণ করছে যে, আল্লাহ আমাদেরকে এবং এ বিশ্ব-জাহানকে সৃষ্টি করতে অক্ষম ছিলেন না ৷ তা সত্ত্বেও কেউ যদি বলে যে, কিয়ামত সংঘটিত করার পর সেই আল্লাহই আরেকটি জগত সৃষ্টি করতে পারবেন না এবং মৃত্যুর পর তিনি পুনরায় আমাদের সৃষ্টি করতে পারবেন না তাহলে সে একটি যুক্তি বিরোধী কথাই বলে ৷ আল্লাহ অক্ষম হলে প্রথমবারই তিনি সৃষ্টি করতে অক্ষম থাকতেন ৷ তিনি যখন প্রথমবার সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছেন এবং সেই সৃষ্টিকর্মের বদৌলতেই আমরা অস্তিত্ব লাভ করেছি তখন নিজের সৃষ্ট বস্তুকে ধ্বংস করে তা পুনরায় সৃষ্টি করতে তিনি অপরাগ হবেন কেন? এর কি যুক্তিসংগত কারণ থাকতে পারে?