(৫:২০) স্মরণ করো যখন মূসা তার জাতিকে বলেছিল, হে আমার সম্প্রদায়ের লোকেরা ! তোমরা আল্লাহর সেই নিয়ামতের কথা মনে করো, যা তিনি তোমাদের দান করেছিলেন৷ তিনি তোমাদের মধ্যে বহু নবীর জন্ম দিয়েছেন, তোমাদেরকে শাসকে পরিণত করেছেন এবং তোমাদেরকে এমন সব জিনিস দিয়েছেন, যা দুনিয়ায় আর কাউকে দেননি৷৪২
(৫:২১) হে আমার সম্প্রদায়ের লোকেরা ! সেই পবিত্র ভূখণ্ডে প্রবেশ করো, যা আল্লাহ তোমাদের জন্য লিখে দিয়েছেন৷ ৪৩ পিছনে হটো না৷ পিছনে হটলে তোমরা ব্যর্থ ও ক্ষতিগ্রস্ত হবে৷ ৪৪
(৫:২২) তারা জবাব দিল, হে মূসা ! সেখানে একটা অতীব দুর্ধর্ষ জাতি বাস করে৷ তারা সেখান থেকে বের হয়ে না যাওয়া পর্যন্ত আমরা কখনই সেখানে যাবো না৷ হাঁ, যদি তারা বের হয়ে যায় তাহলে আমরা সেখানে প্রবেশ করতে প্রস্তুত আছি৷
(৫:২৩) ঐ ভীরু লোকদের মধ্যে দুজন এমন লোকও ছিল ৪৫ যাদের প্রতি আল্লাহ তাঁর অনুগ্রহ বর্ষণ করেছিলেন৷ তারা বললো, এ শক্তিশালী লোকদের মোকাবিলা করে দরজার মধ্যে ঢুকে পড়ো৷ ভেতরে প্রবেশ করলে তোমরাই জয়ী হবে৷ আর যদি তোমরা মুমিন হয়ে থাকো তাহলে আল্লাহর ওপর নির্ভর করো৷
(৫:২৪) কিন্তু তারা আবার সেই একই কথা বললোঃ হে মূসা ! যতক্ষণ তারা সেখানে অবস্থান করবে আমরা ততক্ষণ কোনক্রমেই সেখানে যাবো না৷ কাজেই তুমি ও তোমার রব, তোমরা দুজনে সেখানে যাও এবং লড়াই করো, আমরা তো এখানে বসেই রইলাম ৷
(৫:২৫) একথায় মূসা বললো, হে আমার রব ! আমার ও আমার ভাই ছাড়া আর কারোর ওপর আমার কোন ইখতিয়ার নেই৷ কাজেই তুমি এ নাফরমান লোকদের থেকে আমাকে আলাদা করে দাও ৷
(৫:২৬) আল্লাহ জবাব দিলেনঃ ঠিক আছে, তাহলে ৷ ঐ দেশটি চল্লিশ বছর পর্যন্ত তাদের জন্য হারাম৷ তারা পৃথিবীতে উদ্‌ভ্রান্তের মতো ঘুরে বেড়াবে, ৪৬ এ নাফরমানদের প্রতি কখনো সহানুভূতি ও সমবেদনা প্রকাশ করো না৷ ৪৭
৪২. এখানে বনী ইসরাঈলের অতীত গৌরবের প্রতি ইংগিত করা হয়েছে৷ হযরত মূসা আলাইহিস সালামের বহু পূর্বে কোন এক সময়ে তারা এ গৌরবের অধিকারী ছিল৷ একদিকে তাদের মধ্যে জন্ম নিয়েছিলেন হযরত ইবরাহীম, হযরত ইসহাক, হযরত ইয়াকুব ও হযরত ইউসুফের মতো নবী ও রসূলগণ এবং অন্যদিকে তারা হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামের আমলে ও তার পরবর্তী কালে মিসরে ব্যাপক শাসন কর্তৃত্বের অধিকারী হয়েছিল৷ দীর্ঘকাল পর্যন্ত তারাই ছিল তৎকালীন সভ্য জগতের সবচেয়ে প্রতাপশালী শাসক শক্তি এবং মিসর ও তার আশপাশের দেশে তাদেরই মুদ্রা প্রচলিত ছিল৷ সাধারণত ঐতিহাসিকগণ বনী ইসরাঈলের উত্থানের ইতিহাস শুরু করেন হযরত মূসার (আ) আমল থেকে৷ কিন্তু কুরআন এখানে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করছে যে, বনী ইসরাঈলের উত্থানের আসল যুগটি ছিল হযরত মূসার পূর্বে এবং হযরত মূসা নিজেই তার জাতির সামনে তাদের এ গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস তুলে ধরেছিলেন৷
৪৩. এখানে ফিলিস্তিনের কথা বলা হয়েছে৷ এ দেশটি হযরত –ইবরাহীম, হযরত ইসহাক ও হযরত ইয়াকুবের আবাসভূমি ছিল৷ বনী ইসরাঈল মিসর থেকে বের হয়ে এলে আল্লাহ তাদের জন্য এ দেশটি নির্দিষ্ট করেন এবং সামনে অগ্রসর হয়ে এ দেশটি জয় করার নির্দেশ দেন৷
৪৪. হযরত মূসা তাঁর জাতিকে নিয়ে মিসর থেকে বের হবার প্রায় দু'বছর পর যখন তাদের সাথে ফারানের মরু অঞ্চলে তাঁবু খাটিয়ে অবস্থান করছিলেন তখনই এ ভাষণটি দেন৷ এ মরু অঞ্চলটি উত্তরে ও ফিলিস্তিনের দক্ষিণ সীমান্ত সংশ্লিষ্ট সাইনা উপদ্বীপে অবস্থিত৷
৪৫. 'ভীরু লোকদের মধ্য থেকে দু'জন বললো'-এ বাক্যাংশটির দু'টি অর্থ হতে পারে৷ এক, যারা শক্তিশালীদেকে ভয় করছিল তাদের মধ্য থেকে দু'জন বলে উঠলো৷ দুই, যারা আল্লাহকে ভয় করতো তাদের মধ্য থেকে দু'জন বলে উঠলো৷
৪৬. এ ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ রাইবেলের গণনা পুস্তক, দ্বিতীয় বিবরণ ও যিহোশূয় পুস্তকে পাওয়া যাবে৷ এর সংক্ষিপ্ত সার হচ্ছেঃ হযরত মূসা ফিলিস্তিনের অবস্থা জানার জন্য ফারান থেকে বনী ইসরাঈলের ১২ জন সরদারকে ফিলিস্তিন সফরে পাঠান৷ তারা ৪০ দিন সফর করার পর সেখান থেকে ফিরে আসেন৷ জাতির এক সাধারণ সমাবেশে তারা জানান যে, ফিলিস্তিন তো খাদ্য ও অন্যান্য ভোগ্য সামগ্রীর প্রাচুর্যে ভরা এক সুখী সমৃদ্ধ দেশ, এতে সন্দেহ নেই৷ ''কিন্তু সেখানকার অধিবাসীরা অত্যন্ত শক্তিশালী-----তাদের ওপর আক্রমণ করার ক্ষমতা আমাদের নেই-----সেখানে আমরা যত লোক দেখেছি তারা সবাই বড়ই দীর্ঘদেহী৷ সেখানে আমরা বনী ইনাককেও দেখেছি৷ তারা মহাপরাত্রুমশালী ও দূর্ধর্ষ৷ তরা বংশ পরস্পরায় পরাক্রমশালী৷ আর আমরা তো নিজেদের দৃষ্টিতেই ফড়িংয়ের মতো ছিলাম এবং তাদের দৃষ্টিতেও৷''---- এ বর্ণনা শুনে সবাই সমস্বরে বলে উঠেঃ ''হায়, যদি আমরা মিসরেই মরে যেতাম! হায়, যদি এ মরুর বুকেই আমরা মরে যেতাম ! আল্লাহ কেন আমাদের ঐ দেশে নিয়ে গিয়ে তরবারির সাহায্যে হত্যা করাতে চায়? এরপর আমাদের স্ত্রী ও ছেলেমেয়েরা তো লুটের মালে পরিণত হবে৷ আমাদের জন্য মিসরে ফিরে যাওয়াই কি মংগলজনক হবে না ?'' তারপর তারা পরস্পর বলাবলি করতে থাকে এসো আমরা কাউকে নিজেদের সরদার বানিয়ে নিই এবং মিসরে ফিরে যাই৷ একথা শুনে ফিলিস্তিনে যাদেরকে পাঠানো হয়েছিল সেই বারোজন সরদারদের মধ্য থেকে দু'জন-ইউশা ও কালেব উঠে দাঁড়ান ৷ তারা এ ভীরুতা ও কাপুরুষতার জন্য জাতিকে তিরস্কার করেন৷ কালেব বলেন, ''চলো, আমরা অতর্কিতে আক্রমণ করে সে দেশটি দখল করে নিই৷ কারণ সে দেশটি পরিচালনা করার যোগ্যতা আমাদের আছে৷ তারপর তারা দু'জন এক বাক্যে বলে ওঠেন, ''যদি আল্লাহ আমাদের প্রতি সন্তুষ্ট থাকেন তাহলে তিনি অবশ্যি আমাদের সে দেশে পৌঁছাবেন৷ ----তবে তোমরা যেন আল্লাহর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ না করো এবং সে ভয় পেয়ো না৷ কিন্তু জাতি ভীত না হও৷ ‍‍‍‍‍‍'''আমাদের সাথে আল্লাহ আছেন, কাজেই ওদের ভয় পেয়ো না৷ কিন্তু জাতি তার জবাব দিল একথা বলে, ''ওদেরকে পাথর মেরে হত্যা করো৷ অবশেষে আল্লাহর ক্রোধের আগুন জ্বলে উঠলো এবং তিনি ফয়সালা করলেন, এখন ইউশা ও কালেব ছাড়া এ জাতির বয়স্ক পুরুষদের মধ্য থেকে আর কেউ সে ভূখণ্ডে প্রবেশ করতে পারবে না৷ এ জাতি চল্লিশ বছর পর্যন্ত গৃহহীন অবস্থায় ঘুরে বেড়াতে থাকবে৷ অবশেষে যখন এদের মধ্যকার বিশ বছরের থেকে শুরু করে তার ওপরের বয়সের সমস্ত লোক মরে যাবে এবং নবীন বংশধররা যৌবনে প্রবেশ করবে তখনি এদেরকে ফিলিস্তিন জয় করার সুযোগ দেয়া হবে৷ এ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বনী ইসরাঈলের ফারান মরুভূমি থেকে পূর্ব জর্দানে পৌছাতে পৌছাতে ৩৮ বছর লেগে যায়৷ যেসব লোক যুব বয়সে মিসর থেকে বের হয়েছিল তারা সবাই এ সময়ের মধ্যে মারা যায়৷ পূর্ব জর্দান জয় করার পর হযরত মূসারও ইন্তিকাল হয়৷ এরপর হযরত ইউশা ইবনে নূনের খিলাফত আমলে বনী ইসরাঈল ফিলিস্তিন জয় করতে সমর্থ হয়৷
৪৭. বর্ণনার ধারাবাহিকতার প্রতি দৃষ্টি রেখে চিন্তা করলে এখানে এ ঘটনার বরাত দেবার উদ্দেশ্য পরিষ্কার বুঝতে পারা যায়৷ গল্পচ্ছলে একথা বর্ণনা করে বনী ইসরাঈলকে আসলে একথা বুঝানো হচ্ছে যে, মূসার সময় অবাধ্যতা, সত্য থেকে বিচ্যুতি ও কাপুরুষতার কাজ করে তোমরা যে শাস্তি পেয়েছিলে এখন মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহিস ওয়া সাল্লামের দাওয়াতের বিরুদ্ধে বিদ্রোহাত্মক নীতি অবলম্বন করলে তার চেয়ে অনেক বেশী শাস্তি ভোগ করবে৷