(৫:৮৭) হে ঈমানদারগণ ! আল্লাহ তোমাদের জন্য যেসব পবিত্র জিনিস হালাল করেছেন সেগুলো হারাম করে নিয়ো না৷ ১০৪ আর সীমালংঘন করো না৷ ১০৫ সীমা-লংঘনকরীদেরকে আল্লহ ভীষণভাবে অপছন্দ করেন৷
(৫:৮৮) আল্লাহ তোমাদের যে হালাল ও পবিত্র রিযিক দিয়েছেন তা থেকে পানাহার করো এবং সে আল্লাহর নাফরমানী থেকে দূরে থাকো যার ওপর তোমরা ঈমান এনেছো৷
(৫:৮৯) তোমরা যে সমস্ত অর্থহীন কসম খেয়ে ফেলো৷ সে সবের জন্য আল্লাহ তোমাদের পাকড়াও করেন না৷ কিন্তু তোমরা জেনে বুঝে যেসব কসম খাও সেগুলোর ওপর তিনি অবশ্যি তোমাদের জিজ্ঞাসাবাদ করবেন৷ ( এ ধরনের কসম ভেঙে ফেলার) কাফ্‌ফারা হচ্ছে, দশ জন মিসকিনকে এমন মধ্যম পর্যায়ের আহার দান করো যা তোমরা নিজেদের সন্তানদের খেতে দাও অথবা তাদেরকে কাপড় পরাও বা একটি গোলামকে মুক্ত করে দাও৷ আর যে ব্যক্তি এর সামর্থ রাখে না সে যেন তিন দিন রোযা রাখে৷ এ হচ্ছে তোমাদের কসমের কাফ্‌ফারা যখন তোমরা কসম খেয়ে তা ভেঙে ফেলো৷ ১০৬ তোমাদের কসমসমূহ সংরক্ষণ করো৷ ১০৭ এভাবে আল্লাহ নিজের বিধান তোমাদের জন্য সুস্পষ্ট করেন, হয়তো তোমরা কৃতজ্ঞাতা প্রকাশ করবে৷
(৫:৯০) হে ঈমানদারগণ ! এ মদ, জুয়া, মূর্তি পূজার বেদী ও ভাগ্য নির্ণায়ক শরসমূহ ১০৮ এ সমস্তই হচ্ছে ঘৃণ্য শয়তানী কার্যকালাপ ৷ এগুলো থেকে দূরে থাকো, আশা করা যায় তোমরা সফলতা লাভ করবে৷১০৯
(৫:৯১) শয়তান তো চায় মদ ও জুয়ার মাধ্যমে তোমাদের মধ্যে শত্রুতা ও হিংসা-বিদ্বেষ সৃষ্টি করতে এবং আল্লাহর স্মরণ ও নামায থেকে তোমাদের বিরত রাখতে৷ তাহলে তোমরা কি এসব থেকে বিরত থাকবে ?
(৫:৯২) আল্লাহ ও তাঁর রসূলের কথা মেনে চলো এবং (নিষিদ্ধ কাজ থেকে ) বিরত থাকো৷ কিন্তু যদি তোমরা আদেশ অমান্য করো, তাহলে জেনে রাখো, আমার রসূলের প্রতি শুধুমাত্র সুস্পষ্টভাবে নির্দেশ পৌঁছিয়ে দেবারই দায়িত্ব ছিল৷
(৫:৯৩) যারা ঈমান এনেছে ও সৎকাজ করেছে, তারা পূর্বে যা কিছু পানাহার করেছিল সে জন্য তাদেরকে কোন জবাবদিহি করতে হবে না, তবে এ জন্য শর্ত হচ্ছে, তাদেরকে অবশ্যি ভবিষ্যতে যেসব জিনিস হারাম করা হয়েছে সেগুলো থেকে দূরে থাকতে হবে, ঈমানের ওপর অবিচল থাকতে হবে এবং ভাল কাজ করতে হবে তারপর যে যে জিনিস থেকে বিরত রাখা হয় তা থেকে তাদের বিরত থাকতে হবে এবং আল্লাহর যেসব হুকুম নাযিল হয় সেগুলো মেনে চলতে হবে৷ অতপর আল্লাহভীতি সহকারে সদাচরণ অবলম্বন করতে হবে৷ আল্লাহ সদাচারীদের ভালবাসেন৷
(৫:৯৪) হে ঈমানদারগণ ! আল্লাহ এমন শিরকের মাধ্যমে তোমাদের কঠিন পরীক্ষার মধ্যে নিক্ষেপ করবেন যা হবে একেবারে হাত ও বর্শার নাগালের মধ্যে, তোমাদের মধ্য থেকে কে তাঁকে না দেখেও ভয় করে, তা দেখার জন্য ৷ কাজেই এ সর্তকবাণীর পর যে ব্যক্তি আল্লাহর নির্ধারিত সীমালংঘন করলো তার জন্য রয়েছে যন্ত্রনাদায়ক শাস্তি৷
(৫:৯৫) হে ঈমানদারগণ ! ইহরাম বাঁধা অবস্থায় শিকার করো না৷ ১১০ আর তোমাদের কেউ যদি জেনে বুঝে এমনটি করে বসে, তাহলে যে প্রাণীটি সে মেরেছে গৃহপালিত প্রাণীর মধ্য থেকে তারই সমপর্যায়ের একটি প্রাণী তাকে নয্‌রানা দিতে হবে, যার ফায়সালা করবে তোমাদের মধ্য থেকে দুজন ন্যায়নিষ্ঠ ব্যক্তি৷ আর এ নযরানা কাবা ঘরে পৌঁছাতে হবে৷ অথবা এ গুনাহের কাফ্‌ফারা হিসেবে কয়েক জন মিসকীনকে খাবার খাওয়াতে হবে৷ অথবা সে অনুপাতে রোযা রাখতে হবে, ১১১ যাতে সে নিজের কৃতকর্মের ফল ভোগ করে৷ পূর্বে যা কিছু হয়ে গেছে সেসব আল্লাহ মাফ করে দিয়েছেন৷ কিন্তু এখন যদি কেউ সে কাজের পুনরাবৃত্তি করে তাহলে আল্লাহ তার বদলা নেবেন৷ আল্লাহ সবার ওপর বিজয়ী এবং তিনি বদ্‌লা নেবার ক্ষমতা রাখেন৷
(৫:৯৬) তোমাদের জন্য সমুদ্রের শিকার এবং তা খাওয়া হালাল করে দেয়া হয়েছে৷১১২ যেখানে তোমরা অবস্থান করবে সেখানে তা খেতে পারো এবং কাফেলার জন্য পাথেয় হিসেবে নিয়ে যেতেও পার৷ তবে যতক্ষণ তোমরা ইহরাম বাঁধা অবস্থায় থাকো ততক্ষণ তোমাদের জন্য স্থলভাগের শিকার হারাম করে দেয়া হয়েছে৷ কাজেই আল্লাহর নাফরমানী করা থেকে দূরে থাকো৷ তোমাদের সবাইকে ঘেরাও করে তাঁর সামনে হাযির করা হবে৷
(৫:৯৭) আল্লাহ পবিত্র কাবা ঘরকে মানুষের জন্য (সমাজ জীবন) প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে পরিণত করেছেন আর হারাম মাস, কুরবানীর পশু ও গলায় মালা পরা পশুগুলোকেও ( এ কাজে সহায়ক বানিয়ে দিয়েছেন)১১৩ যাতে তোমরা জানতে পারো যে, আল্লাহ আকাশ ও পৃথিবীর সমস্ত জানেন এবং তিনি সব জিনিসের জ্ঞান রাখেন৷ ১১৪
(৫:৯৮) জেনে রাখো, আল্লাহ শাস্তি দানের ব্যাপারে যেমন কঠোর তেমনি তিনি ক্ষমাশীল ও করুণাময়ও ৷
১০৪. এ আয়াতে দু'টি কথা বলা হয়েছে ৷ এক, তোমরা নিজেরাই কোন জিনিস হালাল ও হারাম গণ্য করার অধিকারী হয়ে বসো না ৷ আল্লাহ যেটি হালাল করেছেন সেটি হালাল এবং আল্লাহ যেটি হারাম করেছেন সেটি হারাম ৷ নিজেদের ক্ষমতা বলে তোমরা নিজেরা যদি কোন হালালকে হারাম করে ফেলো তাহলে আল্লাহর আইনের পরিবর্তে তোমরা নফসের ও প্রবৃত্তির আইনের অনুগত গণ্য হবে ৷ দুই, খৃষ্টীয় সন্যাসী, হিন্দু যোগী, বৌদ্ধ ভিক্ষু ও ইশরাকী তাসাউফ পন্থীদের মতো বৈরাগ্য, সংসার বিমুখতা ও দনিয়ার বৈধ স্বাধ আস্বাদন পরিহার করার পদ্ধতি অবলম্বন করো না ৷ ধর্মীয় মানসিকতার অধিকারী সৎস্বভাব সম্পন্ন লোকদের মধ্যে সাধারণভাবে এ প্রবণতা দেখা গেছে যে, শরীর ও প্রবৃত্তির অধিকার আদায় ও চাহিদা পূরণ করাকে তারা আধ্যাত্মিক উন্নতির অন্তরায় মনে করে থাকেন ৷ তাদের ধারণা, নিজেকে কষ্টের মধ্যে নিক্ষেপ করা, নিজের প্রবৃত্তিকে পার্থিব ভোগ ও আনন্দ থেকে বঞ্চিত করা এবং দুনিয়ার জীবন যাপনের বিভিন্ন উপায়-উপকরণের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করা মূলত একটি মহৎ কাজ এবং এ ছাড়া আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা যেতে পারে না ৷ সাহাবায়ে কেরামদের মধ্যেও কেউ কেউ এ মানসিকতার অধিকারী ছিলেন ৷ একবার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জানতে পারলেন, কোন কোন সাহাবী অংগীকার করেছেনঃ তারা সর্বক্ষণ রোযা রাখবেন, রাতে বিছানায় ঘুমাবেন না বরং সারা রাত জেগে ইবাদাত করবেন, গোশত, তেল, চর্বি, ঘি, ইত্যাদি ব্যবহার করবেন না, নারীদের সাথে সম্পর্ক রাখবেন না ৷ একথা শুনে তিনি একটি ভাষণ দিলেন ৷ তিনি বললেনঃ "আমাকে এ ধরনের কাজ করার হুকুম দেয়া হয়নি ৷ তোমাদের প্রবৃত্তিরও তোমাদের ওপর অধিকার আছে ৷ রোযা রাখো আবার পানাহারও করো ৷ রাতে জেগে ইবাদাত করো আবার নিদ্রাও যাও ৷ আমাকে দেখো ৷ আমি ঘুমাই আবার রাত জেগে ইবাদাতও করি ৷ রোযা রাখি আবার কখনো রাখিও না ৷ গোশতও খাই আবার ঘিও খাই ৷ কাজেই যে ব্যক্তি আমার রীতিনীতি পছন্দ করে না সে আমার অন্তরভুক্ত নয় ৷" তারপর আবার বললেনঃ "লোকদের কি হয়ে গেছে,তারা নারী, ভাল খাবার , সুগন্ধি, নিদ্রা ও দুনিয়ার স্বাদ আনন্দ নিজেদের জন্য হারাম করে নিয়েছে? আমি তোমাদের পাদ্রী ও সংসারত্যাগী হয়ে যাবার শিক্ষা দেইনি ৷ আমি যে দীনের প্রচলন করেছি তাতে নারী ও গোশত থেকে দূরে থাকার কোন অবকাশ নেই এবং সেখানে সংসার ত্যাগ করে বৈরাগ্যবাদী জীবন যাপনেরও কোন সুযোগ নেই আত্মসংযমের জন্য আমার এখানে আছে রোযা ৷ সংসারত্যাগী জীবনের সমস্ত ফায়দা এখানে লাভ করা হয় জিহাদের মাধ্যমে ৷ আল্লাহর বন্দেগী করো ৷ তার সাথে কাউকে শরীক করো না ৷ হজ্জ ও উমরাহ করো ৷ নামায কায়েম করো, যাকাত দাও ও রমযানের রোযা রাখো ৷ তোমাদের আগে যারা ধ্বংস হয়েছে তারা এ জন্য ধ্বংস হয়েছে যে, তারা নিজেদের ওপর কঠোরতা আরোপ করেছিল ৷ আর যখন তারা নিজেরা নিজেদের ওপর কঠোরতা আরোপ করলো তখন আল্লাহও তাদের ওপর কঠোরতা আরোপ করলেন ৷ তোমরা গীর্জায় ও খানকাহে যাদেরকে দেখছো এরা হচ্ছে তাদেরই অবশিষ্ট উত্তরসূরী ৷" এ প্রসঙ্গে কোন কোন রেওয়ায়াত থেকে এতদূরও জানা যায় যে, একজন সাহাবীর ব্যাপারে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জানতে পারলেন, তিনি দীর্ঘদিন থেকে নিজের স্ত্রী সান্নিধ্য যাচ্ছেন না এবং রাত দিন ইবাদাতে মশগুল থাকছেন ৷ তিনি তাকে ডেকে হুকুম দিলেন, এখনি তোমার স্ত্রীর কাছে যাও ৷ সাহাবী জবাব দিলেন, আমি রোযা রেখেছি ৷ জাবাব দিলেন, রোযা ভেঙ্গে ফেলো এবং স্ত্রীর কাছে যাও ৷ হযরত উমরের আমলে জনৈকা মহিলা অভিযোগ করলেন, আমার স্বামী সারাদিন রোযা রাখেন, রাতে ইবাদাত করেন এবং আমার সাথে কোন সম্পর্ক রাখেন না ৷ হযরত উমর (রা) তার মামলার নিষ্পত্তির জন্য প্রখ্যাত তাবেঈ বুযর্গ কা'ব ইবনে সাওরুল আযদিকে নিযুক্ত করলেন ৷ তিনি ফায়সালা দিলেন, এ মহিলার স্বামী তিন রাত ইচ্ছামতো ইবাদাত করতে পারেন কিন্তু চতুর্থ রাতে অবশ্যি তারা স্ত্রীর অধিকার প্রতিষ্ঠিত করতে হবে ৷
১০৫. সীমালংঘন করার অর্থ অত্যন্ত ব্যাপক ৷ হালালকে হারাম করা এবং আল্লাহর নির্ধারিত পাক-পবিত্র জিনিসগুলো থেকে এমনভাবে দূরে সরে থাকা যেন সেগুলো নাপাক, এটাও এক ধরনের বাড়াবাড়ি ৷ তারপর পাক পবিত্র জিনিসগুলো অযথা ও অপ্রয়োজনে ব্যয় করা, অপচয় ও অপব্যয় করা এবং প্রয়োজনের তুলনায় বেশী ও প্রচুর পরিমাণে ব্যয় করাও এক ধরনের বাড়াবাড়ি ৷ আবার হালালের সীমা পেরিয়ে হারামের সীমানায় প্রবেশ করাও বাড়াবাড়ি ৷ এ তিনটি কাজই আল্লাহর কাছে অপছন্দনীয় ৷
১০৬. যেহেতু কোন কোন লোক হালাল জিনিসগুলো নিজেদের ওপর হারাম করে নেবার কসম খেয়েছিল তাই এ প্রসংগে আল্লাহ এ কসমের বিধানও বর্ণনা করে দিয়েছেন ৷ সে বিধান হচ্ছে নিম্নরূপঃ যদি কোন ব্যক্তির মুখ থেকে অনিচ্ছকৃতভাবে কসম শব্দ বের হয়ে গিয়ে থাকে তাহলে তা পূর্ণ করার তেমন কোন প্রয়োজন নেই ৷ কারণ এ ধরনের কসমের জন্য পাকড়াও করা হবে না ৷ আর যদি কেউ জেনে বুঝে কসম খেয়ে থাকে...... সে যেন তা ভেঙে ফেলে এবং এ জন্য কাফফারা আদায় করে ৷ কারণ যে ব্যক্তি কোন গুনাহের কাজ করার কসম খেয়ে বসে তার নিজের কসম পূর্ণ করা উচিত নয় ৷ (দেখুন, সূরা বাকারা, টীকা ২৪৩, ২৪৪ ৷ এ ছাড়া কাফ্‌ফরার ব্যাখ্যার জন্য দেখুন সূরা আন নিসা, টীকা ১২৫)
১০৭. কসম সংরক্ষণ করার কয়েকটি অর্থ হয় ৷ এক, কসমকে সঠিক ক্ষেত্রে ব্যবহার করতে হবে ৷ আজেবাজে অর্থহীণ কথায় ও গুনাহের কাজে কসম খাওয়া যাবে না ৷ দুই, কোন বিষয় কসম খেলে সেটা মনে রাখতে হবে, নিজের ঘাফলতির করণে তা ভুলে গিয়ে তার বিরুদ্ধাচরণ করা যাবে না ৷ তিন, কোন সঠিক বিষয়ে জেনে বুঝে ইচ্ছাকৃতভাবে কসম খেলে তা অবশ্যি পূর্ণ করতে হবে ৷ এ ক্ষেত্রে তার বিরুদ্ধাচরণ করা হলে অবশ্যি কাফফারা আদায় করতে হবে ৷
১০৮. মূর্তি পূজার বেদী ও ভাগ্য নির্ণায়ক শরের ব্যাখ্যার জন্য সূরা মায়েদার ১২ ও ১৪ টীকা দেখুন ৷ এ প্রসংগে জুয়ার ব্যাখ্যাও ১৪ টীকায় পাওয়া যাবে ৷ যদিও ভাগ্য নির্ণায়ক শর(আযলাম) স্বভাবতই এক ধরনের জুয়া তুবও তাদের উভয়ের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে ৷ পার্থক্যটি হচ্ছে আরবী ভাষায় 'আযলাম' বলা হয় এমন ধরনের ফাল গ্রহণ ও শর নিক্ষেপ করাকে যার সাথে মুশরিকী আকীদা-বিশ্বাস ও কুসংস্কার জড়িত থাকে আর 'মাইসির'(জুয়া) শব্দটি এমন সব খেলা ও কাজের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয় যেখানে আকস্মিক ঘটনাকে অর্থোপার্জন, ভাগ্য পরীক্ষা এবং অর্থ ও দ্রব্যসামগ্রী বন্টনের মাধ্যমে পরিণত করা হয় ৷
১০৯. এ আয়াতে চারটি জিনিস চূড়ান্তভাবে হারাম ঘোষণা করা হয়েছে ৷ এক, মদ ৷ দুই, জুয়া ৷ তিন, এমন সব জায়গা যেগুলোকে আল্লাহ ছাড়া আর কারোর ইবাদাত করার অথবা আল্লাহ ছাড়া আর কারো জন্য কুরবানী করার ও নজরানা দেবার জন্য নির্দিষ্ট করা হয়েছে ৷ চার, ভাগ্য নির্ণায়ক শর ৷ শেষের তিনটি ব্যাখ্যা ইতিপূর্বে করা হয়েছে ৷ মদ সম্পর্কে বিস্তারিত বিধান নীচে দেয়া হলোঃ

মদ হারাম হওয়া প্রসংগে ইতিপূর্বে আরো দু'টি নির্দেশ এসেছিল ৷ সে দু'টি আলোচিত হয়েছে সূরা বাকারার ২১৯ আয়াতে এবং সূরা আন নিসার ৪৩ আয়াতে ৷ এরপর এ তৃতীয় নির্দেশটি আসার আগে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর এক ভাষণে লোকদেরকে সতর্ক করে দিয়ে বলেনঃ মহান আল্লাহ মদ অত্যন্ত অপছন্দ করেন ৷ মদ চিরতরে হারাম হয়ে যাবার নিদেশ জারি হওয়া মোটেই বিচিত্র নয় ৷ কাজেই যাদের কাছে মদ আছে তাদের তা বিক্রি করে দেয়া উচিত ৷ এর কিছুদিন পর এ আয়াত নাযিল হয় ৷ এবার তিনি ঘোষণা করেন, এখন যাদের কাছে মদ আছে তারা তা পান করতে পারবে না এবং বিক্রিও করতে পারবে না বরং তা নষ্ট করে দিতে হবে ৷ কাজেই তখনই মদীনার সমস্ত গলিতে মদ ঢেলে দেয়া হয় ৷ অনেকে জিজ্ঞেস করেন, এগুলো ফেলে না দিয়ে আমরা ইহুদীদেরকে তোহফা হিসেবে দিই না কেন? জবাবে নবী করী (স) বলেন, "যিনি একে হারাম করেছেন তিনি একে তোহফা হিসেবে দিতেও নিষেধ করেছেন ৷" কেউ কেউ জিজ্ঞেস করেন, আমরা মদকে সিকায় পরিবর্তিত করে দিই না কেন? তিনি এটিও নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন এবং নির্দেশ দেনঃ "না, ওগুলো ঢেলে দাও ৷" এক ব্যক্তি অত্যন্ত জোর দিয়ে জিজ্ঞেস করেন, ওষুধ হিসেবে ব্যবহারের নিশ্চয়ই অনুমতি আছে? জবাব দেনঃ "না, এটা ওষুধ নয় বরং রোগ ৷" আর একজন আরয করেন, "হে আল্লাহর রসূল! আমরা এমন এক এলাকার অধিবাসী যেখানে শীত অত্যন্ত বেশী এবং আমাদের পরিশ্রমও অনেক বেশী করতে হবে ৷ আমরা মদের সাহায্যে ক্লান্তি ও শীতের মোকাবিলা করি ৷ তিনি জিজ্ঞেস করেন, তোমরা যা পান করো তা কি নেশা সৃষ্টি করে? লোকটি ইতিবাচক জবাব দেন ৷ তখন তিনি বলেন, তাহলে তা থেকে দূরে থাকো ৷ লোকটি তবুও বলেন, কিন্তু এটা তো আমাদের এলাকার লোকেরা মানবে না ৷ জবাব দেন, "তারা না মানলে তাদের সাথে যুদ্ধ করো ৷"

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা) রেওয়ায়াত করেছেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেনঃ

--------------------------------------------------------------------------

"আল্লাহ লানত বর্ষণ করেছেন (১) মদের ওপর, (২) মদ পানকারীর ওপর, (৩) মদ পরিবেশনকারীর ওপর, (৪) মদ বিক্রতার ওপর, (৫) মদ ক্রয়কারীর ওপর, (৬) মদ উৎপাদন ও শোধনকারীর ওপর, (৭) মদ উৎপাদন ও শোধনের ব্যবস্থাপকের ওপর, (৮) মদ বহনকারীর ওপর এবং (৯) মদ যার কাছে বহন করে নিয়ে যাওয়া হয় তার ওপর ৷"

অন্য একটি হাদীসে বলা হয়েছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এমন দস্তরখানে আহার করতে নিষেধ করেছেন যেখানে মদ পান করা হচ্ছে ৷ প্রথম দিকে তিনি যেসব পাত্রে মদ তৈরী ও পান করা হতো সেগুলোর ব্যবহারও নিষিদ্ধ করে দেন ৷ পরে মদ হারাম হবার হুকুমটি পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেলে তিনি পাত্রগুলো ব্যবহার করার অনুমতি দেন ৷

'খামর' শব্দটি আরবীতে মূলত আংগুর থেকে তৈরী মদের জন্য ব্যবহৃত হতো পরোক্ষ অর্থে গম , যব, কিসমিস, খেজুর ও মধু থেকে উৎপাদিত মদকেও খামর বলা হতো ৷ কিন্তু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর এ নির্দেশকে নেশা সৃষ্টিকারী প্রত্যেকটি জিনিসের ওপর ব্যাপ্ত করে দিয়েছেন ৷ তিনি হাদীসে স্পষ্ট বলেছেনঃ (আরবী) "প্রত্যেকটি নেশা সৃষ্টিকারী জিনিস মদ ও এবং প্রত্যেকটি নেশা সৃষ্টিকারী বস্তু হারাম ৷" তিনি আরো বলেছেনঃ

---------------------------------------------------------------------------------------

" যে কোন পানীয় নেশা সৃষ্টি করলে তাহা হারাম ৷"

তিনি আরো বলেনঃ (আরবী) " আর আমি প্রত্যেকটি নেশা সৃষ্টিকারী জিনিস ব্যবহার করতে নিষেধ করছি ৷"

হযরত উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু জুমার কুতবায় মদের সংজ্ঞা এভাবে দেনঃ (আরবী) "মদ বলতে এমন সব জিনিসকে বুঝায় যা বুদ্ধিকে বিকৃত করে ফেলে ৷"

এ ছাড়াও নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামা ও মূলনীতি বর্ণনা করেছেনঃ(আরবী) "যে জিনিসের বেশী পরিমাণ নেশা সৃষ্টি করে তার সামান্য পরিণামও হারাম ৷" তিনি আরো বলেছেনঃ

------------------------------------------------------------------------------------

"যে জিনিসের বড় এক পাত্র পরিমাণ পান করলে নেশা হয় তা ক্ষুদ্র পরিমাণ পান করাও হারাম ৷"

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুগে মদ পানকারীর জন্য বিশেষ কোন শাস্তি নির্ধারিত ছিল না ৷ যে ব্যক্তিকে এ অপরাধে গ্রেফতার করে নিয়ে আসা হতো তাকে কিল থাপ্প্‌ড়, জুতা, লাথি গিঁট বাঁধা পাকানো কাপড় ও খেজুরের ছড়া দিয়ে পিটানো হতো ৷ রসূলের আমলে এ অপরাধে বড় জোর চল্লিশ ঘা মারা হতো ৷ হযরত আবু বকরের (রা) আমলে ৪০ ঘা বেত্রাঘাত করা হতো ৷ হযরত উমরের (রা) আমলেও শুরুতে ৪০ ঘা বেত মারার হতো ৷ কিন্তু যখন তিনি দেখলেন লোকেরা এ অপরাধ অনুষ্ঠান থেকে বিরত থাকছে না তখন তিনি সাহাবায়ে কেরামের সাথে পরামর্শক্রমে এ অপরাধের দণ্ড হিসেবে ৮০ টি বেত্রাঘাত নির্ধারণ করেন ৷ ইমাম মালেক, আবু হানীফা এবং একটি বর্ণনা অনুযায়ী ইমাম শাফেঈও এ শাস্তিকেই মদ পানের দণ্ড হিসেবে গণ্য করেছেন ৷ কিন্তু ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল এবং অন্য একটি বর্ণনা অনুযায়ী ইমাম শাফেঈ ৪০ বেত্রাঘাতকেই এর শাস্তি হিসেবে মেনে নিয়েছেন ৷ হযরত আলীও (রা) এটিই পছন্দ করেছেন ৷

শরীয়াতের দৃষ্টিতে মদের প্রতি নিষেধাজ্ঞার এ বিধানটিকে শক্তি প্রয়োগ করে প্রতিষ্ঠিত করা ইসলামী রাষ্ট্রের কর্তব্যের অন্তরভুক্ত ৷ হযরত উমরের শাসনামলে নবী মাকীফের রুয়াইশিদ নামক এক ব্যক্তির একটি দোকান পুড়িয়ে দেয়া হয় ৷ কারণ সে লুকিয়ে লুকিয়ে মদ বিক্রি করতো ৷ আর একবার হযরত উমরের হুকুমে পুরো একটি গ্রাম জ্বালিয়ে দেয়া হয় ৷ কারণ সেই গ্রামে গোপনে মদ উৎপাদন ও চোলাই করা হতো এবং মদ বেচাকেনার কারবারও সেখানে চলতো ৷
১১০. ইহরাম বাঁধা অবস্থায় নিজে শিকার করা বা অন্যকে শিকারে সাহায্য করা উভয়টি নিষিদ্ধ ৷ এ ছাড়াও ইহরাম বাঁধা (মুহরিম) ব্যক্তির জন্য কোন শিকার করে আনা হলে তাও তার জন্য খাওয়া জায়েয নয় ৷ তবে কোন ব্যক্তি নিজে যদি নিজের জন্য শিকার করে থাকে এবং সেখান থেকে মুহরিমকে তোহফা হিসেবে কিছু দিয়ে দেয় তাহলে তা খাওয়ায় কোন ক্ষতি নেই ৷ হিংস্র পশু এ বিধানের আওতার বাইরে ৷ সাপ, বিচ্ছু, পাগলা কুকুর এবং মানুষের ক্ষতি করে এমন সব পশু ইহরাম অবস্থায় মারা যেতে পারে ৷
১১১. কোন ধরনের পশু হত্যা করলে কতজন মিসকীনকে খাওয়াতে হবে বা ক'টি রোযা রাখতে হবে, এর ফায়সালাও করবেন দু'জন ন্যায়নিষ্ঠ ব্যক্তি ৷
১১২. যেহেতু সামুদ্রিক সফরে অনেক সময় পাথেয় শেষ হয়ে যায় এবং আহার সংগ্রহের জন্য জলজ প্রাণী শিকার করা ছাড়া আর কোন পথ থাকে না, তাই সামুদ্রিক শিকার হালাল করা হয়েছে ৷
১১৩. আরবে কাবা ঘরের মর্যাদা কেবলমাত্র একটি ইবাদতগৃহ হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত ছিল না বরং নিজের কেন্দ্রীয় অবস্থান ও পবিত্রতম ভাবমূর্তির কারণে এরই ওপর সারা দেশের অর্থনৈতিক ও তামাদ্দুনিক জীবনধারায় নির্ভরশীল ছিল ৷ হজ্জ ও উমরাহর জন্য সারাদেশ কাবা ঘরের দিকে ধাবিত হতো ৷ হজ্জ উপলক্ষে এ সম্মিলনের কারণে বিশৃংখল ও বিক্ষিপ্ত আরবদের মধ্যে একটি ঐক্য সূত্র সৃষ্টি হতো ৷ বিভিন্ন অঞ্চল ও গোত্রের লোকেরা নিজেদের মধ্যে তামাদ্দুনিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত করতো ৷ কাব্য সম্মেলন ও কবিতা প্রতিযোগিতার ফলে তাদের ভাষা ও সাহির্তের উন্নতি সাধিত হতো ৷ বাণিজ্যিক লেনদেনের ফলে সারাদেশের অর্থনৈতিক প্রয়োজন পূর্ণ হতো ৷ হারাম মাসগুলোর কারণে আরবরা বছরের এক-তৃতীয়াংশ সময় লাভ করতো শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য ৷ এ সময় তাদের কাফেলা দেশের এক প্রান্ত থেকে আর এক প্রান্ত পর্যন্ত অবাধে চলাফেরা করতো ৷ কুরবানীর পশু ও বিচিত্র বর্ণের ঝলমলে মালা জড়ানো পশু দলের উপস্থিতিও তাদের এ চলাফেরায় বিরাট সাহায্য যোগাতো ৷ কারণ মানত ও নযরানার আলামত হিসেবে যেসব পশুর গলায় ঝলমলে মালা শোভা পেতো তাদের দেখে ভক্তিতে আরবদের মাথা নত হয়ে আসতো ৷ এ সময় কোন লুটেরা আরব গোত্র তাদের ওপর আক্রমণ চালাবার দুঃসাহস করতো না ৷
১১৪. অর্থাৎ এ ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে চিন্তা করলে তোমরা নিজেরাই তোমাদের দেশের অর্থনৈতিক ও তামাদ্দুনিক জীবনে এর একটি সুস্পষ্ট প্রমাণ পেয়ে যাবে যে, আল্লাহ তাঁর নিজের সৃষ্টির কল্যাণ ও প্রয়োজন সম্পর্কে কত গভীর জ্ঞানের অধিকারী এবং নিজের এক একটি বিধানের সাহায্যে তিনি মানব জীবনের বিভিন্ন বিভাগতে কত ব্যাপকভাবে উপকৃত করছেন ৷ মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আবির্ভাবের পূর্বে অশান্তি ও অরাজকতার মধ্য দিতে যে শত শত বছর অতিবাহিত হয়েছে, সে সময় তোমরা নিজেরাই নিজেদের স্বার্থ ও প্রয়োজন সম্পর্কে অবগত ছিলে না ৷ তখন তোমরা নিজেদের ধ্বংস সাধনের নেশায় উন্মাদ হয়ে গিয়েছিল ৷ কিন্তু আল্লাহ তোমাদের প্রয়োজন জানতেন ৷ তিনি শুধুমাত্র কাবাঘরকে তোমাদের কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে দিয়ে তোমাদের জন্য এমন ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন যার ফলে তোমাদের জাতীয় জীবন সুরক্ষিত হয়ে গিয়েছিল ৷ অন্যান্য অসংখ্য বিষয় বাদ দিয়ে যদি শুধুমাত্র এ একটি বিষয়ের প্রতি দৃষ্টিপাত করো তাহলে তোমাদের নিশ্চিত বিশ্বাস জন্মাবে যে, আল্লাহ তোমাদের যে বিধান দিয়েছেন তার আনুগত্য করার মধ্যেই তোমাদের কল্যাণ নিহিত রয়েছে ৷ এর মধ্যে তোমাদের জন্য এমন সব কল্যাণ রয়েছে যেগুলো উপলব্ধি করার ক্ষমতা তোমাদের নেই এবং নিজেদের হাজারো চেষ্টা সাধনা দ্বারাও সেগুলোকে বাস্তবে রূপায়িত করা তোমাদের পক্ষে সম্ভব নয় ৷