(৪৭:২০) যারা ঈমান আনায়ন করেছে তারা বলছিলো, এমন কোন সূরা কেন নাযিল করা হয় না (যাতে যুদ্ধের নির্দেশ থাকবে) ? কিন্তু যখন সুস্পষ্ট নির্দেশ সম্বলিত সূরা নাযিল করা হলো এবং তার মধ্যে যুদ্ধের কথা বলা হলো তখন তোমরা দেখলে, যাদের মনে রোগ ছিল তারা তোমার প্রতি সে ব্যক্তির মত তাকাচ্ছে যার ওপর মৃত্যু চেয়ে বসেছে৷ ৩২ তাদের এ অবস্থার জন্য আফসোস৷
(৪৭:২১) (তাদের মুখে) আনুগত্যের প্রতিশ্রুতি এবং ভাল ভাল কথা৷ কিন্তু যখন অলংঘনীয় নির্দেশ দেয়া হলো তখন যদি তারা আল্লাহর সাথে কৃত নিজেদের অঙ্গীকারের ব্যাপারে সত্যবাদী প্রমাণিত হতো তাহলে তা তাদের জন্যই কল্যাণকর হতো৷
(৪৭:২২) এখন তোমাদের থেকে এ ছাড়া অন্য কিছুর কি আশা করা যায় যে, তোমরা যদি ইসলাম থেকে ফিরে যাও ৩৩ তাহলে পৃথিবীতে ফাসাদ সৃষ্টি করবে এবং একে অপরের গলা কাটবে ? ৩৪
(৪৭:২৩) আল্লাহ তা’আলা এসব লোকের ওপর লা’নত করেছেন এবং তাদেরকে অন্ধ ও বধির বানিয়ে দিয়েছেন৷
(৪৭:২৪) তারা কি কুরআন নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করেনি, নাকি তাদের মনের ওপর তালা লাগানো আছে ? ৩৫
(৪৭:২৫) প্রকৃত ব্যাপার হলো, হিদায়াত সুস্পষ্ট হওয়ার পরও যারা তা থেকে ফিরে গেল শয়তান তাদের জন্য এরূপ আচরণ সহজ বানিয়ে দিয়েছে এবং মিথ্যা আশাবাদকে দীর্ঘায়িত করে রেখেছেন৷
(৪৭:২৬) এ কারণেই তারা আল্লাহর নাযিলকৃত দীনকে যারা পছন্দ করে না তাদের বলেছে, কিছু ব্যাপারে আমরা তোমাদের অনুসরণ করবো৷ ৩৬ আল্লাহ তাদের এ সলা-পরামর্শ ভাল করেই জানেন৷
(৪৭:২৭) সে সময় কি অবস্থা হবে যখন ফেরেশতারা তাদের রূহ কবজ করবে এবং তাদের মুখ ও ফিটের ওপর আঘাত করতে করতে নিয়ে যাবে৷ ৩৭ এসব হওয়ার কারণ হচ্ছে,
(৪৭:২৮) তারা এমন পন্থার অনুসরণ করেছে যা আল্লাহর অসন্তুষ্টি উৎপাদন করে এবং তাঁর সন্তুষ্টির পথ অনুসরণ করা পছন্দ করেনি৷ এ কারণে তিনি তাদের সব কাজ-কর্ম নষ্ট করে দিয়েছেন৷৩৮
৩২. অর্থাৎ সে সময় মুসলমানরা যে পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে দিন কাটাচ্ছিলো এবং ইসলাম ও মুসলমানদের সাথে কাফেরদের যে আচরণ ছিল তার কারণে যুদ্ধের নির্দেশ আসার পূর্বেই মুসলমানদের সাধারণ মতামত ছিল এই যে, এখন আমাদের যুদ্ধের অনুমতি পাওয়া উচিত ৷ তারা ব্যাকুল চিত্তে আল্লাহর নির্দেশের জন্য অপেক্ষা করেছিলো এবং বার বার জানতে চাচ্ছিলো যে, এ জালেমদের বিরুদ্ধে তাদেরকে লড়াই করার অনুমতি দেয়া হচ্ছে না কেন?কিন্তু যারা মুনাফিকীর আবরণে মুসলমানদের দলে শামিল হয়েছিল ৷ তাদের অবস্থা ছিল মু'মিনদের অবস্থা থেকে ভিন্ন ৷ তারা তাদের প্রাণ ও অর্থ-সম্পদকে আল্লাহ ও তাঁর দীনের চেয়ে অনেক বেশী প্রিয় মনে করতো এবং সে ক্ষেত্রে কোন রকম বিপদের ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত ছিল না ৷ যুদ্ধের নির্দেশ আসা মাত্রই তাদেরকে এবং খাঁটি ঈমানদারদেরকে বাছাই করে পরস্পর থেকে আলাদা করে দিন ৷ এ দির্দেশ না আসা পর্যন্ত তাদের ও ঈমানদারদের মধ্যে বাহ্যিক কোন পার্থক্য দেখা যেতো না ৷ তারা এবং এরা উভয়েই নামায পড়তো ৷ রোযা রাখতেও তাদের কোন দ্বিধা-সংকোচ ছিল না ৷ ঠাণ্ডা প্রকৃতির ইসলাম তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য ছিল ৷ কিন্তু যখন ইসলামের জন্য জীবন বাজি রাখার সময় আসলো তখন তাদের মুনাফিকী প্রকাশ হয়ে পড়লো এবং ঈমানের লোক দেখানো যে মুখোশ তারা পরেছিল তা খুলে পড়লো ৷ তাদের এ অবস্থা সূরা নিসায় এভাবে বর্ণনা করা হয়েছেঃ "তোমরা কি সে লোকদের দেখেছো যাদের বলা হয়েছিলো, নিজের হাতকে সংযত রাখো, নাযাম কায়েম করো , এবং যাকাত দাও ৷ এখন তাদেরকে যখন যুদ্ধের নির্দেশ দেয়া হয়েছে তখন তাদের এক দলের অবস্থা এই যে, মানুষকে এমন ভয় পাচ্ছে যে, ভয় আল্লাহকে করা উচিত ৷ বরং তার চেয়ে বেশী ভয় পাচ্ছে ৷ তারা বলছেঃ হে আল্লাহ! আমাদেরকে যুদ্ধের এ নির্দেশ কেন দিলে? আমাদেরকে আরো কিছু অবকাশ দিলে না কেন? ( আয়াত ৭৭) ৷
৩৩. মূল কথাটি হলো ( ) ৷ এ বাক্যাংশের একটি অনুবাদ আমরা ওপরে করেছি ৷ এর দ্বিতীয় অনুবাদ হচ্ছে, "যদি তোমরা মানুষের শাসক হয়ে যাও" ৷
৩৪. একথাটির একটি অর্থ হলো মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং ঈমানদারগণ যে মহান সংস্কারমূলক বিপ্লবের জন্য চেষ্টা -সাধনা করেছেন এ সময় তোমরা যদি ইসলামের প্রতিরক্ষার ব্যাপারে টালবাহানা করো এবং সে মহান সংস্কারমূলক বিপ্লবের জন্য প্রাণ ও সম্পদের বাজি ধরা থেকে মুখ ফিরিয়ে নাও তাহলে শেষ পর্যন্ত তার পরিণাম এ ছাড়া আর কি হতে পারে যে, তোমরা আবার সেই জাহেলী জীবন ব্যবস্থার দিকে ফিরে যাবে যার ব্যবস্থাধীনে তোমরা শত শত বছর ধরে একে অপরের গলা কেটেছো, নিজেদের সন্তানদের পর্যন্ত জীবন্ত দাফন করেছো এবং আল্লাহর দুনিয়াকে জুলুম ও ফাসাদে ভরে তুলেছো ৷ দ্বিতীয় অর্থ হচ্ছে তোমাদের জীবনাচার ও কর্মকাণ্ডের অবস্থা যখন এই যে, যে দীনের প্রতি ঈমান পোষনের কথা তোমরা স্বীকার করেছিলে তার জন্য তোমাদের মধ্য কোন আন্তরিকতা ও বিশ্বস্ততা নেই এবং তার জন্য কোন প্রকার ত্যাগ স্বীকার করতেও তোমরা প্রস্তুত নও ৷ তাহলে এ নৈতিক অবস্থার মধ্যে আল্লাহ তা'আলা যদি তোমাদেরকে ক্ষমতা দান করেন এবং পার্থিব সব কাজ-কর্মের দায়-দায়িত্ব তোমদের ওপর অর্পিত হয় তাহলে জুলুম -ফাসাদ এবং ভ্রাতৃঘাতি কাজ ছাড়া তোমাদের থেকে আর কি আশা করা যেতে পারে? এ আয়াতটি একথাও স্পষ্ট করে দেয় যে, আয়াত ইসলামে 'আত্মীয়তার বন্ধন'ছিন্ন করা হারাম ৷ অপরদিকে ইতিবাচক পন্থায় কুরআন মজীদের কয়েকটি স্থানে আত্মীয়-স্বজনের সাথে উত্তম ব্যবহারের বড় নেকীর কাজ বলে গণ্য করা হয়েছে এবং আত্মীয়তা সম্পর্ক রক্ষার নির্দেশ দেয়া হয়েছে ৷ উদাহরণস্বরূপ দেখুন, আল বাকারা, ৮৩, ১৭৭; আন নিসা, ৮-৩৬;আন নাহল, ৯০; বনী ইসরাঈল, ২৬ এবং আন নূর, ২২ আয়াত ৷ ( ) শব্দটি আরবী ভাষায় রূপক অর্থে নৈকট্য ও আত্মীয়তা বুঝাতে ব্যবহৃত হয় ৷ কোন ব্যক্তির দূর ও নিকট সম্পর্কীয় সব আত্মীয়ই তার ( ) তাদের যার সাথে যত নিকট আত্মীয়তা সম্পর্ক তার অধিকার তত বেশী এবং তার সাথে আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা তত বড় গোনাহ ৷ অত্মীয়তা রক্ষা করার অর্থ হলো, আত্মীয়ের উপকার করার যতটুকু সামর্থ ব্যক্তির আছে, তা করতে দ্বিধা না করা ৷ আর আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করার অর্থ হচ্ছে, ব্যক্তির তার সাথে খারাপ ব্যবহার বা আচরণ করা, অথবা যে উপকার করা তার পক্ষে সম্ভব তা না করে পাশ কাটিয়ে চলা ৷ হযরত উমর ( রা) এ আয়াত থেকে প্রমাণ প্রশ করে "উম্মে ওয়ালাদ" বা সন্তানদের মা ক্রীতদাসকে বিক্রি করা হারাম ঘোষণা করেছিলেন এবং সাহাবা কিরামের সবাই এতে ঐকমত্য প্রকাশ করেছিলেন ৷ হাকেম মুসতাদরিক গ্রন্থে হযরত বুরাইদা থেকে একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন যে, একদিন তিনি হযরত উমরের ( রা) মজলিসে বসেছিলেন ৷ হঠাৎ মহল্লার মধ্যে চেঁচামেচি শুরু হলো ৷ জিজ্ঞেস করে জানা গেল যে, এক ক্রীতদাসীকে বিক্রি করা হচ্ছে তাই তাঁর মেয়ে কাঁদছে ৷ হযরত উমর ( রা) সে মুহূর্তেই আনসার ও মুহাজিরদের একত্র করে তাদের জিজ্ঞেস করলেন , হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে জীবন ব্যবস্থা দিয়েছেন তার মধ্যে আত্মীয়তা বা রক্ত সম্পর্ক ছিন্ন করার কোন বৈধতা কি আপনারা পেয়েছেন? সবাই জবাব দিলেন, 'না' ৷ হযরত উমর ( রা) বললেনঃ তাহলে এটা কেমন কথা যে, আপনাদের এ সমাজেই মাকে তার মেয়ে থেকে বিচ্ছিন্ন করা হচ্ছে?এ চেয়ে বড় আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্নের কাজ আর কি হতে পারে?তারপর তিনি এ আয়াতটি তেলাওয়াত করলেন ৷ সবাই বললো ত্রুটি রোধ করার জন্য আপনার মতে যে ব্যবস্থা উপযুক্ত মনে করেন তাই গ্রহণ করুন ৷ সুতরাং হযরত উমর ( রা) গোটা ইসলামী অঞ্চলে এই সাধারণ নির্দেশ জারী করে দিলেন যে, যে দাসীর গর্ভে তার মালিকের ঔরসজাত সন্তান জন্ম গ্রহণ করেছে তাকে বিক্রি করা যাবে না ৷ কারণ, এটা আত্মীয়তা বা রক্তের বন্ধন ছিন্ন করা ৷ সুতরাং এ কাজ হালাল নয় ৷
৩৫. অর্থাৎ হয় এসব লোক কুরআন মজীদ সম্পর্কে চিন্তা -ভাবনা ও গবেষণা করে না ৷ কিংবা চিন্তা-ভাবনা করার চেষ্টা করে কিন্তু তার শিক্ষা এবং অর্থ ও তাৎপর্য তাদের মনের গভীরে প্রবেশ করে না ৷ কেননা, তাদের হৃদয় -মনে তালা লাগানো আছে ৷ বলা হয়েছে, "মনের ওপরে তাদের তালা লাগানো আছে" একথাটির অর্থ হচ্ছে, তাদের মনে এমন তালা লাগানো আছে যা ন্যায় ও সত্যকে চিনে না এমন লোকেদের জন্যই নির্দিষ্ট ৷
৩৬. অর্থাৎ ঈমান গ্রহন করে মুসলমানদের দলে শামিল হয়ে যাওয়া সত্ত্বেও ভিতরে ভিতরে তারা ইসলামের শত্রুদের সাথে ষড়যন্ত্র করে এসেছে এবং তাদের প্রতিশ্রুতি দিয়ে এসেছে যে, কিছু কিছু ব্যাপারে আমারা তোমাদের সাহায্য সহযোগিতা করবো ৷
৩৭. অর্থাৎ পৃথিবীতে তারা এ কর্মপন্থা অবলম্বন করেছে এজন্য যাতে নিজেদের স্বার্থ সংরক্ষণ করতে পারে এবং কুফর ও ইসলামের যুদ্ধের বিপদ থেকে নিজেদের রক্ষা করতে পারে ৷ কিন্তু মৃত্যুর পরে আল্লাহর পাকড়াও থেকে কোথায় গিয়ে রক্ষা পাবে? সে সময় তাদের কোন কৌশলই তাদেরকে ফেরেশতাদের মারের হাত থেকে রক্ষা করতে পারবে না ৷ যেসব আয়াত দ্বারা স্পষ্টভাবে 'বরযখ'অর্থাৎ কবরের আযাব প্রমাণিত হয় এটি তার একটি ৷ এ আয়াত থেকে পরিস্কার জানা যায় যে, মৃত্যুর সময় থেকেই কাফের ও মুনাফিকদের আযাব শুরু হয়ে যায় ৷ কিয়ামতের তাদের মোকাদ্দামার ফায়সালা হওয়ার পর যে শাস্তি দেয়া হবে এ আযাব তা থেকে ভিন্ন জিনিস ৷ আরো ব্যাখ্যার জন্য দেখুন আন নিসা, ৯৭ আয়াত;আয়ল আনআম, ৯৩-৯৪;আল আনফাল, ৫০; আন নাহল, ২৮-৩২;আল মু'মিনূন ৷ ৯৯-১০০; ইয়াসীন, ২৬-২৭এবং টীকা ২২-২৩ এবং আল মু'মিন, ৪৬, টীকা ৬২সহ ৷
৩৮. কাজ-কর্ম সেসব কাজ যা তারা মুসলমান সেজে করেছে ৷ তাদের নামায, রোযা, যাকাত , মোটকথা সেসব ইবাদাত-বন্দেগী ও নেকীর কাজসমূহ যা বাহ্যিকভাবে নেকীর কাজ বলে গণ্য হতো ৷ এসব নষ্ট হয়ে যাওয়ার কারণ হচ্ছে তারা মুসলামন হয়েও আল্লাহ, তার দীন এবং ইসলামী মিল্লাতের সাথে আন্তরিকতা ও বিশ্বস্ততার আচরণ করেনি বরং শুধু নিজের প্রার্থিব স্বার্থের জন্য দীনের দুশমনদের সাথে ষড়যন্ত্র পাকিয়েছে এবং আল্লাহর পথে জিহাদের সুযোগ আসা মাত্রই নিজেকে বিপদ থেকে রক্ষা করার চিন্তায় ব্যস্ত হয়ে পড়েছে ৷ কুফর ও ইসলামের যুদ্ধে যে ব্যক্তির সমবেদনা ইসলাম ও মুসলমানদের পক্ষে নয় ৷ কিংবা কুফরী ব্যবস্থা ও কাফেরদের পক্ষে আল্লাহর কাছে তার কোন আমল গ্রহণযোগ্য হওয়া তো দূরের কথা তার ঈমানই আদৌ গ্রহণযোগ্য নয় ৷