(৪৬:২৭) আমি তোমাদের আশে পাশের বহু এলাকার বহু সংখ্যক জনপদ ধ্বংস করেছি৷ আমি আমার আয়াতসমূহ পাঠিয়ে বার বার নানাভাবে তাদের বুঝিয়েছি, হয়তো তারা বিরত হবে৷
(৪৬:২৮) কিন্তু আল্লাহকে বাদ দিয়ে যেসব সত্তাকে কারা আল্লাহর নৈকট্য লাভের মাধ্যম মনে করে উপাস্য বানিয়ে নিয়েছিলো ৩২ তারা কেন তাদেরকে সাহায্য করলো না৷ বরং তার তাদের থেকে উধাও হয়ে গিয়েছিলো৷ এটা ছিল তাদের মিথ্যা এবং মনগড়া আকীদা-বিশ্বাসের পরিনাম, যা তারা গড়ে নিয়েছিলো৷
(৪৬:২৯) (আর সেই ঘটনাও উল্লেখযোগ্য) যখন আমি জিনদের একটি দলকে তোমার কাছে নিয়ে এসেছিলাম, যাতে তারা কুরআন শোনে৷ ৩৩ যখন তারা সেইখানে পৌঁছলো (যেখানে তুমি কুরআন পাঠ করছিলে) তখন পরস্পরকে বললো : চুপ করো৷ যখন তা পাঠ করা শেষ হলো তখন তারা সতর্ককারী হয়ে নিজ কওমের কাছে ফিরে গেল৷
(৪৬:৩০) তারা গিয়ে বললো : হে আমাদের কওমের লোকজন! আমরা এমন কিতাব শুনেছি যা মূসার পরে নাযিল করা হয়েছে৷ যা ইতিপূর্বেকার সমস্ত কিতাবকে সমর্থন করে, ন্যায় ও সঠিক পথপ্রদর্শন করে৷ ৩৪
(৪৬:৩১) হে আমাদের কওমের লোকেরা, আল্লাহর প্রতি আহবানকারীর আহবানে সাড়া দাও এবং তাঁর প্রতি ঈমান আনো৷ আল্লাহ তোমাদের গোনাহ মাফ করবেন এবং কষ্টদায়ক আযাব থেকে রক্ষা করবেন৷৩৫
(৪৬:৩২) আর যে ৩৬ আল্লাহর পক্ষ থেকে আহবানকারীর আহবানে সাড়া দেবে না সে না পৃথিবীতে এমন শক্তি রাখে যে আল্লাহকে নিরূপায় ও অক্ষম করে ফেলতে পারে, না তার এমন কোন সাহায্যকারী ও পৃষ্ঠপোষক আছে যে আল্লাহর হাত থেকে তাকে রক্ষা করতে পারে৷ এসব লোক সুস্পষ্ট গোমরাহীর মধ্যে ডুবে আছে৷
(৪৬:৩৩) যে আল্লাহ এই পৃথিবী ও আসমান সৃষ্টি করেছেন এবং এগুলো সৃষ্টি করতে যিনি পরিশ্রান্ত হননি তিনি অবশ্যই মৃতদের জীবিত করে তুলতে সক্ষম, এসব লোক কি তা বুঝে না? কেন পারবেন না, অবশ্যই তিনি সব কিছু করতে সক্ষম৷
(৪৬:৩৪) যে দিন এসব কাফেরকে আগুনের সামনে হাজির করা হবে সেদিন তাদের জিজ্ঞেস করা হবে, “এটা কি বাস্তব ও সত্য নয়?” এরা বলবে “হাঁ, আমাদের রবের শপথ, (এটা প্রকৃতই সত্য)৷” আল্লাহ বলবেন : “ঠিক আছে, তাহলে তোমরা যে অস্বীকার করেতে পরিণতি হিসেবে এখন আযাবের স্বাদ গ্রহণ করো৷”
(৪৬:৩৫) অতএব , হে নবী, দৃঢ়চেতা রসূলদের মত ধৈর্য ধারণ করো এবং তাদের ব্যাপারে তাড়াহুড়া করো না৷৩৭ এদেরকে এখন যে জিনিসের ভীতি প্রদর্শন করা হচ্ছে যেদিন এরা তা দেখবে সেদিন এদের মনে হবে যেন পৃথিবীতে অল্প কিছুক্ষণের বেশি অবস্থান করেনি৷ কথা পৌছিয়ে দেয়া হয়েছে৷ অবাধ্য লোকেরা ছাড়া কি আর কেউ ধ্বংস হবে?
৩২. অর্থাৎ তারা এই ধারণার বশবর্তী হয়ে ঐ সব সত্তার সাথে ভক্তি শ্রদ্ধার সূচনা করেছিলো যে, এরা আল্লাহর প্রিয় বান্দা৷ এদের অসীলায় আমরা আল্লাহর কাছে পৌছতে পারবো৷ কিন্তু এভাবে অগ্রসর হতে হতে তারা ঐ সব সত্তাকেই উপাস্য বানিয়ে নেয়৷ সাহায্যের জন্য তাদেরকেই ডাকতে থাকে, তাদের কাছেই প্রার্থনা করতে শুরু করে এবং তাদের সম্পর্কে এ বিশ্বাস পোষন করতে থাকে যে, তারাই ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের মালিক, তাদের সাহায্যের আবেদনে তারাই সাড়া দেবে এবং বিপদ থেকে উদ্ধার তারাই করবে৷ তাদেরকে এই গোমরাহী থেকে উদ্ধার করার জন্য আল্লাহ রসূলদের মাধ্যমে তাঁর আয়াত সমূহ পাঠিয়ে নানাভাবে তাদের বুঝানোর চেষ্টা করেছেন৷ কিন্তু তারা এই মিথ্যা খোদাদের দাসত্ব করতে বদ্ধপরিকর থাকে৷ এবং আল্লাহর পরিবর্তে এদেরকেই আঁকড়ে ধরে থাকার ব্যাপারে একগুঁয়েমি করতে থাকে৷ এখন বলো, যখন এই মুশরিক কওমের ওপর তাদের গোমরাহীর কারণে আল্লাহর আযাব আসলো তখন তাদের বিপদ ত্রাণকর্তা ও প্রার্থনা শ্রবনকারী উপাস্যরা কোথায় মরে পড়ে ছিলো? সেই দুর্দিনে তারা তাদেরকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসলো না কেন ?
৩৩. এ আয়াতের ব্যাখ্যা হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসুদ, হযরত যুবায়ের ও হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস এবং হযরত হাসান বাসারী, সাঈদ ইবনে জুবায়ের, যার ইবন্‌ হুবায়েশ, মুজাহিদ, ইকরিমা ও অন্যন্য সম্মানিত ব্যক্তিগণ থেকে যেসব বর্ণনা উদ্ধৃত হয়েছে তা থেকে দেখা যায় তাঁরা সবাই এ ব্যপারে একমত যে, এ আয়াতে জিনদের প্রথম উপস্থিতির যে ঘটনা বর্ণনা করা হয়েছে তা 'নাখলা' উপত্যকায় ঘটেছিলো৷ ইবনে ইসহাক, আবু নু'আইম ইসপাহানী এবং ওয়াকেদীল বর্ণনা অনুসারে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন তায়েফ থেকে নিরাশ হয়ে মক্কায় ফেরার পথে নাখলা প্রান্তরে অবস্থান করেছিলেন এটা তখনকার ঘটনা৷ সেখানে এশা, ফজর কিংবা তাহাজ্জদের নামাযে তিনি কুরআন তিলাওয়াত করছিলেন৷ সেই সময় জিনদের একটি দল সে স্থানে অতিক্রম করছিলো৷ তারা নবীর (সা) কিরায়াত শোনার জন্য থেমে পড়েছিলো৷ এর সাথে সাথে সমস্ত বর্ণনা এ ব্যাপারেও একমত যে, জিনেরা সেই সময় নবীর (সা) সামনে আসেনি, কিংবা তিনিও তাদের আগমন অনুভব করেননি৷ পরে আল্লাহ তাঁকে তাদের আগমনে এবং কুরআন তিলাওয়াত শোনর বিষয় অবহিত করেন৷ যেখানে এ ঘটনা সংঘটিত হয়েছিল সে স্থানটি ছিল --------অথবা --------কারণ এ দুটি স্থানই নাখলা প্রান্তরে অবস্থিত ৷ উভয়ই স্থানেই পানি ও উর্বরতা বিদ্যমান৷তায়েফ থেকে আগমনকারী যদি তাঁবু খাটিয়ে অবস্থান করতে হয় তাহলে এ দুটি স্থানের কোন একটিতে অবস্থান করতে পারে মানচিত্রে স্থান দুটির অবস্থান দেখুন : (নিচে মানচিত্র আছে)
৩৪. এ থেকে জানা যায়, এসব জিন পূর্ব থেকে হযরত মূসা ও আসমানী কিতাবসমূমের প্রতি ঈমান রাখতো৷ কুরআন শোনার পর তারা বুঝতে পারলো পূর্ববর্তী নবী-রসূলগণ যে শিক্ষা দিয়েছেন এটাও সেই শিক্ষা৷ তাই তারা এই কিতাব এবং এর বাহক রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি সাল্লামের ওপর ঈমান আনলো৷
৩৫. নির্ভরযোগ্য হাদীসসমূহ থেকে জানা যায়, এরপর জিনদের প্রতিনিধি দল একের পর এক নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি সাল্লামের কাছে আসতে থাকে এবং তাঁর সাথে তাদের সামনা সামনি সাক্ষাত হতে থাকে৷ এ বিষয়ে হাদীস গ্রন্থ-সমূহ যেসব বর্ণনা উদ্ধৃত হয়েছে তা একত্রিত করলে জানা যায়, হিজরতের পূর্বে মক্কায় এ রকম প্রায় ছয়টি প্রতিনিধি দল এসেছিলো৷

এসব প্রতিনিধি দলের একটি সম্পর্কে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ বলেন : একদিন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সারা রাত মক্কায় অনুপস্থিত ছিলেন৷ আমরা অত্যন্ত উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিলাম এই ভেবে যে, তাঁর ওপর হয়তো আক্রমণ হয়ে থাকবে৷ প্রত্যুষ্যে আমরা তাঁকে হেরা পর্বতের দিক থেকে আসতে দেখলাম৷ জিজ্ঞেস করায় তিনি বললেন : এক জিন আমাকে সংগে করে নিতে এসেছিলো৷ আমি তার সাথে গিয়ে জিনদের একটি দলকে কুরআন শুনিয়েছি (মুসলিম, মুসনাদে আহমদ, তিরমিযী, আবু দাউদ)৷

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদের আরো একটি বর্ণনা হচেছ, মক্কায়, একবার নবী (সা) সাহাবাদের (রা) বললেন : আজ রাতে তোমাদের মধ্য থেকে কে আমার সাথে জিনদের সাথে সাক্ষাতের জন্য যাবে৷ আমি তাঁর সাথে যেতে প্রস্তুত হলাম৷ মক্কার উচ্চভূমি এলাকায় এক স্থানে দাগ কেটে নবী (সা) আমাকে বললেন : এটা অতিক্রম করবে না৷ অতপর তিনি এগিয়ে গেলেন এবং দাঁড়িয়ে কুরআন তিলাওয়াত শুরু করলেন৷ আমি দেখলাম, বহু লোক তাঁকে ঘিরে আছে এবং তারা আমার ও নবীর (সা) মাঝে আড়াল করে আছে (ইবনে জারীর, বায়হাকী, দালায়েলুন নবুওয়াত, আবু নু'আইম ইসপাহানী)৷

আরো একটি ক্ষেত্রেও রাতের বেলা হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে ছিলেন এবং নবী (সা) মক্কার হাজুন নামক স্থানে জিনদের একটি মোকদ্দমায় ফায়সালা করেছিলেন৷ এর বহু বছর পর ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু কুফায় কৃষকদের একটি দলকে দেখে বলেছিলেন : আমি হাজুনে জিনদের যে দলটিকে দেখেছিলাম তারা অনেকটা এই লোকগুলোর মত ছিল (ইবনে জারীর)৷
৩৬. হতে পারে এই বাক্যাংশটি জিনদেরই উক্তির একটি অংশ৷ আবার এও হতে পারে যে, তাদের কথার সাথে আল্লাহর পক্ষ থেকে এটি যোগ করা হয়েছে৷ বক্তব্যের ধরন থেকে দ্বিতীয় মতটি অধিক যুক্তিযুক্ত বলে মনে হয়৷
৩৭. অর্থাৎ তোমাদের পূর্ববর্তী নবী-রসূলগণ যেভাবে বছরের পর বছর ধরে ক্রমাগত ধৈর্য ও অক্লান্ত প্রচেষ্টায় মাধ্যমে তাদের জাতির অসন্তষ্টি, বিরোধিতা, বাধা-বিপত্তি ও নানা রকম উৎপীড়নের মোকাবিলা করেছেন তুমিও সে রকম করো এবং কখনো মনে এরূপ ধারণাকে স্থান দিও না যে, হয় এসব লোক অনতিবিলম্বে ঈমান আনুক, নয়তো আল্লাহ তাদের ওপর আযাব নাযিল করুক৷