(৪৬:২১) এদেরকে ‘আদের ভাই (হূদ)- এর কাহিনী কিছুটা শুনাও যখন সে আহক্বাফে তার কওমকে সতর্ক করেছিলো৷ ২৫-এ ধরনের সতর্ককারী পূর্বেও এসেছিলো এবং তার পরেও এসেছে-যে আল্লাহ ছাড়া আর কারো বন্দেগী করো না৷ তোমাদের ব্যাপারে আমার এক বড় ভয়ংকর দিনের আযাবের আশংকা আছে৷
(৪৬:২২) তারা বললোঃ “তুমি কি এ জন্য এসেছো যে, আমাদের প্রতারিত করে আমাদের উপাস্যদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী করে দেবে? ঠিক আছে, তুমি যদি প্রকৃত সত্যবাদী হয়ে থাকো তাহলে আমাদের যে আযাবের ভীতি প্রদর্শন করে থাকো তা নিয়ে এসো৷”
(৪৬:২৩) সে বললো : এ ব্যাপারের জ্ঞান শুধু আল্লাহরই আছে৷২৬ যে পয়গাম দিয়ে আমাকে পাঠানো হয়েছে আমি সেই পয়গাম তোমাদের কাছে পৌছিয়ে দিচ্ছি৷ তবে আমি দেখছি, তোমরা অজ্ঞতা প্রদর্শন করছো৷২৭
(৪৬:২৪) পরে যখন তারা সেই আযাবকে তাদের উপত্যাকার দিকে আসতে দেখলো, বলতে শুরু করলো : এই তো মেঘ, আমাদের ‘ওপর প্রচুর বারিবর্ষণ করবে-না’, ২৮ এটা বরং সেই জিনিস যার জন্য তোমরা হাড়াহুড়া করছিলে৷ এটা প্রচন্ড ঝড়ো বাতাস, যার মধ্যে কষ্টদায়ক আযাব এগিয়ে আসছে৷
(৪৬:২৫) তার রবের নির্দেশে প্রতিটি বস্তুকে ধ্বংস করে ফেলবে৷ অবশেষে তাদের অবস্থা দাঁড়ালো এই সে, তাদের বসবাসের স্থান ছাড়া সেখানে আর কিছুই দৃষ্টিগোচর হতো না৷ এভাবেই আমি অপরাধীদের প্রতিদান দিয়ে থাকি৷ ২৯
(৪৬:২৬) আমি তাদেরকে এমন কিছু দিয়েছিলাম যা তোমাদের দেইনি৷৩০ আমি তাদেরকে কান, চোখ, হৃদয়-মন সব কিছু দিয়েছিলাম৷ কিন্তু না সে কান তাদের কোন কাজে লেগেছে, না চোখ, না হৃদয়-মন৷ কারণ, তারা আল্লাহর আয়াতসমূহ অস্বীকার করতো৷৩১ তারা সেই জিনিসের পাল্লায় পড়ে গেল যা নিয়ে তারা ঠাট্টা-বিদ্রুপ করতো৷
২৫. যেহেতু কুরাইশ নেতারা তাদের শ্রেষ্ঠত্বর ধারণা পোষণ করতো এবং নিজেদের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য ও মোড়লিপনার কারণে আনন্দে আত্মহারা ছিল তাই এখানে তাদেরকে আদ কওমের কাহিনী শুনানো হচ্ছে৷ আরবে আদ জাতি এভাবে পরিচিত ছিল যে, প্রাচীনকালে এই ভূখণ্ডে তারা ছিল সর্বাধিক শক্তিশালি কওম৷

আরবী....শব্দটি আরবী.........শব্দের বহুবচন৷ এর আভিধানিক অর্থ বালুর এমন সব লম্বা লম্বা টিলা যা উচ্চতায় পাহাড়ের সমান নয়৷ পারিভাষিক অর্থে এটা আরব মরুভূমির আরবী.....দক্ষিণ পশ্চিম অংশের নাম, বর্তমানে যেখানে কোন জনবসতি নাই৷ পরের পৃষ্ঠায় মানচিত্রে এর অবস্থান দেখুন :

ইবনে ইসহাকে বর্ণনা অনুসারে আদ কওমের আবাস ভুমি ওমান থেকে ইয়ামান পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল৷ আর কুরআন মজীদ আমাদের বলছে, তাদের আদি বাসস্থান ছিল আল-আহক্বায৷ এখান থেকে বেরিয়ে তারা আশেপাশের দেশসমূহে ছড়িয়ে পড়েছিলো এবং দুর্বল জাতিসমূহকে গ্রাস করে ফেলেছিলো৷ বর্তমান কাল পর্যন্তও দক্ষিণ আরবের অধিবাসীদের মধ্যে একথা ছড়িয়ে আছে যে, এ এলাকাই ছিল আদ জাতির আবাস ভূমি৷ বর্তমানে "মুকাল্লা" শহর থেকে উত্তর দিকে ১২৫ মাইল দূরত্বে হাদ্রামাউতের একটি স্থানে লোকেরা হযরত হুদের (আ) মাযার তৈরী করে রেখেছে৷ সেটি হূদের কবর নামেই বিখ্যাত৷ প্রতি বছর ১৫ই শা'বান সেখানে 'উরস' হয়৷ আরবের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে হাজার হাজার লোক সেখানে সমবেত হয়৷ যদিও ঐতিহাসিকভাবে এ কবরটি হূদের কবর হিসেবে প্রমানিত নয়৷ কিন্তু সেখানে তা নির্মান করা এবং দক্ষিণ আরবের ব্যাপক জনগোষ্ঠীর তার প্রতি আকৃষ্ট হওয়া কম করে হলেও এতটুকু অবশ্যই প্রমাণ করে যে, আঞ্চলিক ঐতিহ্য এই এলাকাকেই আদ জাতির এলাকা বলে চিহ্নিত করে৷ এছাড়া হাদ্রামাউতে এমন কতিপয় ধ্বংসাবশেষ আছে যেগুলোকে আজ পর্যন্ত স্থানীয় অধিবাসিরা আবাসভূমি বলে আখ্যায়িত করে থাকে৷

আহক্বাফ অঞ্চলের বর্তমান অবস্থা দেখে কেউ কল্পনা করতে পারে না যে, এক সময় এখানে জাঁকালো সভ্যতার অধিকারী একটি শক্তিশালী জাতি বাস করতো৷ সম্ভবত হাজার হাজার বছর পূর্বে এটা এক উর্বর অঞ্চল ছিল৷ পরে আবহাওয়ার পরিবর্তন একে মরুভুমিতে পরিণত করেছে৷ বর্তমানে এই এলাকার একটি বিশাল মরুভূমি, যার আভ্যন্তরীণ এলাকায় যাওয়ার সাহসও কারো নেই৷ ১৮৪৩ খৃষ্টাব্দে ব্যাভেরিয়ার একজন সৈনিক এর দক্ষিণ প্রান্ত সীমায় পৌঁছেছিলো৷ তার বক্তব্য হলো : যদি হাদ্রামাউতের উত্তরাঞ্চলের উচ্চ ভূমিতে দাঁড়িয়ে দেখা যায়, তাহলে বিশাল এই মরুপ্রান্তর এক হাজার ফুট নীচুতে দৃষ্টিগোচর হয়৷ এখানে মাঝে মাঝে এমন সাদা ভূমিখণ্ড যেখানে কোন বস্তু পতিত হলে তা বালুকা রাশির নীচে তলিয়ে যেতে থাকে এবং একেবারে পচে খসে যায়৷ আরব বেদুইনরা এ অঞ্চলকে ভীষণ ভয় করে এবং কোন কিছুর বিনিময়েই সেখানে যেতে রাজি হয় না৷ এক পর্যায়ে বেদুইনরা তাকে সেখানে নিয়ে যেতে রাজি না হলে সে একাই সেখানে চলে যায়৷ তার বর্ণনা অনুসারে এখানকার বালু একেবারে মিহিন পাউডারের মত ৷ সে দূর থেকে তার মধ্যে একটি দোলক নিক্ষেপ করলে ৫ মিনিটের মধ্যেই তা তলিয়ে যায় এবং যে রশির সাথে তা বাধাঁ ছিল তার প্রান্ত গলে যায়৷ বিস্তারিত তথ্যের জন্য দেখুন :

-Arabia and th Isles, Harold Ingram, London, 1946

The unveiling of Arabia. R.H.Kirnan, London, 1937.

The Empty Quarter, Phiby, London, 1933.
২৬. অর্থাৎ কবে তোমাদের ওপর আযাব আসবে তা শুধু আল্লাহই জানেন৷ তোমাদের ওপর কবে আযাব নাযিল করতে হবে এবং কতদিন পর্যন্ত তোমাদের অবকাশ দেয়া হবে তার ফায়সালা করা আমার কাজ নয়৷
২৭. অর্থাৎ নিজের নির্বুদ্ধিতার কারণে আমার এই সতর্কীকরনকে তোমরা তামাশার বস্তু বলে মনে করছো এবং খেলার সামগ্রীর মত আযাবের দাবী করে চলেছো৷ আল্লাহর আযাব যে কি ভয়াবহ জিনিস সে ধারণা তোমাদের নেই৷ তোমাদের আচরনের কারণে তা যে তোমাদের কাছে এসে গেছে সে বিষয়েও তোমরা অবগত নও৷
২৮. এখানে এ বিষয়টি সুস্পষ্ট নয় যে, কে তাদেরকে এই জবাব দিয়েছিলো৷ বক্তব্যের ধরন থেকে আপনাআপনি এ ইংগিত পাওয়া যায় যে, সেই সময় বাস্তব পরিস্থিতি তাদেরকে কার্যত যে জবাব দিয়েছিলো এটা ছিল সেই জবাব৷ তারা মনে করেছিলো এটা বৃষ্টির মেঘ, তাদের উপত্যকাসমূহ বর্ষণসিক্ত করার জন্য আসছে৷ কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তা ছিল প্রচণ্ড ঝড়-তুফান, যা তাদেরকে ধ্বংস করার জন্য এগিয়ে আসছিলো৷
২৯. আদ জাতির কাহিনী বিস্তারিত জানার জন্য দেখুন, তাফহীমূল কুরআন সূরা আ"রাফ, টীকা ৫১ থেকে ৫৬; হূদ, টীকা ৫৪ থেকে ৬৫; আল মু'মিনুন, টীকা ৩৪ থেকে ৩৭; আশ শূআরা, টীকা ৮৮ থেকে ৯৪; আল আনকাবূত, টীকা ৬৫; হা-মীম আস সাজদা, টীকা ২০ ও ২১৷
৩০. অর্থাৎ অর্থ, সম্পদ , শক্তি, ক্ষমতা কোন বিষয়েই তোমাদের ও তাদের মধ্যে কোন তুলনা হয় না৷ তোমাদের ক্ষমতার ব্যপ্তি মক্কা শহরের বাইরে কোথাও নেই৷ কিন্তু তারা পৃথিবীর একটি বড় অংশের ওপর আধিপত্য বিস্তার করেছিলো৷
৩১. এই সংক্ষিপ্ত আয়াতাংশে একটি গুরত্বপূর্ণ সত্য বর্ণনা করা হয়েছে৷ আল্লাহর আয়াতসমূহই সেই জিনিস যা মানুষকে প্রকৃত সত্যের সঠিক উপলব্ধি থাকে তাহলে সে চোখ দিয়ে ঠিকমত দেখতে পায়, কান দিয়ে ঠিক মত শুনতে পায় এবং মন ও মস্তিষ্ক দিয়ে চিন্তা করতে ও সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে৷ কিন্তু সে যখন আল্লাহর আয়াতসমূহ মানতে অস্বীকার করে তখন চোখ থাকা সত্ত্বেও ন্যায় ও সত্যকে চেনার মত দৃষ্টি লাভের সৌভাগ্য তার হয় না, কান থাকা সত্ত্বেও প্রতিটি উপদেশ-বাণী শোনার বেলায় সে বধির হয় এবং মন ও মগজের যে নিয়ামত আল্লাহ তাকে দিয়েছেন তা দিয়ে সে উল্টা চিন্তা করে এবং একের পর এক ভ্রান্ত পরিণতির সম্মুখিন হতে থাকে৷ এমন কি তার সমস্ত শক্তি নিজের ধ্বংসসাধনেই ব্যয়িত হতে থাকে৷