(৪৪:৩০) এভাবে আমি বন্দি বনী ইসরাঈলদের কঠিন অপমানজনক আযাব, ফেরাউন ২৬ থেকে নাযাত দিয়েছিলাম৷
(৪৪:৩১) সীমালংঘনকারীদের মধ্যে সে ছিল প্রকৃতই উচ্চ পর্যায়ের লোক৷২৭
(৪৪:৩২) তাদের অবস্থা জেনে শুনেই আমি দুনিয়ার অন্য সব জাতির ওপর তাদের অগ্রাধিকার দিয়েছিলাম৷২৮
(৪৪:৩৩) তাদেরকে এমন সব নিদর্শন দেখিয়েছিলাম যার মধ্যে সুস্পষ্ট পরীক্ষা ছিল৷২৯
(৪৪:৩৪) এরা বলে : আমাদের প্রথম মৃত্যু ছাড়া আর কিছুই নেই৷
(৪৪:৩৫) এরপর আমাদের পুনরায় আর উঠানো হবে না৷৩০
(৪৪:৩৬) “যদি তুমি সত্যবাদী হয়ে থাকো তাহলে আমাদের বাপ-দাদাদের জীবিত করে আনো”৷ ৩১
(৪৪:৩৭) ‘এরাই উত্তম না তুব্বা’ কওম ৩২ এবং তাদের পূর্ববর্তী লোকেরা? আমি তাদের ধ্বংস করেছিলাম৷ কারণ তারা অপরাধী হয়ে গিয়েছিলো৷৩৩
(৪৪:৩৮) আমি এ আসমান ও যমীন এবং এর কাছের সমস্ত জিনিস খেলাচ্ছলে তৈরি করিনি৷
(৪৪:৩৯) এসবই আমি যথাযথ উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করেছি৷ কিন্তু অধিকাংশ লোকই জানে না৷ ৩৪
(৪৪:৪০) এদের সবার পুনরুজ্জীবনের জন্য নির্ধারিত সময়টিই এদের ফায়সালার দিন৷৩৫
(৪৪:৪১) সেটি এমন দিন যেদিন কোন নিকটতম প্রিয়জনও ৩৬ কোন নিকটতম প্রিয়জনের কাজে আসবে না
(৪৪:৪২) এবং আল্লাহ যাকে রহমত দান করবেন সে ছাড়া তারা কোথাও থেকে কোন সাহায্য লাভ করবে না৷ তিনি মহাপরাক্রমশালী ও অত্যন্ত দয়াবান৷৩৭
২৬. অর্থাৎ তাদের জন্য ফেরাউন নিজেই লাঞ্ছনাকর আযাব৷ অন্য সব আযাব ছিল এই মূর্তিমান আযাবের শাখা-প্রশাখা৷
২৭. এর মধ্যে কুরাইশ গোত্রের কাফের নেতাদেরকে সুক্ষ্মভাবে বিদ্রূপ করা হয়েছে৷ অর্থাৎ দাসত্বের সীমালংঘনকারীদের মধ্যে তোমরা কি এমন মর্যাদার অধিকারী? অতি বড় বিদ্রোহি তো ছিল সে যে তৎকালীন পৃথিবীর সবচাইতে বড় সাম্রাজ্যের সিংহাসনে খোদায়ীর দাবী নিয়ে বসেছিলো৷ তাকেই যখন খড়কুটোর মত ভাসিয়ে দেয়া হয়েছে সেখানে তোমাদের এমন কি অস্তিত্ব আছে যে আল্লাহর আয়াতের সামনে টিকে থাকবে ?
২৮. অর্থাৎ বনী ঈসরাইলদের গুনাবলী ও দুর্বলতা উভয় দিকই আল্লাহর জানা ছিল৷ তিনি না দেখে শুনে অন্ধভাবে তাদেরকে বাছাই করেননি৷ সেই সময় পৃথিবীতে যত জাতি ছিল তাদের মধ্য থেকে তিনি এই জাতিকে যখন তাঁর বার্তাবাহক এবং তাওহীদের দাওয়াতের ঝাণ্ডাবাহী বানানোর জন্য মনোনীত করলেন তখন তা করেছিলেন এ জন্য যে, তাঁর জ্ঞানে তৎকালীন জাতিসমূহের মধ্যে এরাই তার উপযুক্ত ছিল৷
২৯. ব্যাখ্যার জন্য দেখুন, তাফহীমুল কুরআন, আল বাকারা, টীকা ৬৪ থেকে ৮৫; আন নিসা, টীকা ১৮২ থেকে ১৯৯; আল মায়েদা, টীকা ৪২ থেকে ৪৭; আল আ'রাফ, টীকা ৯৭ থেকে ১১৩; ত্বাহা, টীকা ৫৬ থেকে ৭৪৷
৩০. অর্থাৎ প্রথমবার মরার পরই আমরা নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবো৷ তারপর আর কোন জীবন নেই৷ 'প্রথম মৃত্যু' কথা দ্বারা একথা বুজায় না যে, এরপর আরো মৃত্যু আছে৷ আমরা যখন বলি, অমুক ব্যক্তির প্রথম সন্তান জন্ম নিয়েছে তখন একথা সত্য হওয়ার জন্য জরুরী নয় যে, এরপর অবশ্যই তার দ্বিতীয় সন্তান জন্ম নেবে৷ একথার অর্থ হচ্ছে, এর পূর্বে তার কোন সন্তান হয়নি৷
৩১. তাদের যুক্তি ছিল এই যে, মৃত্যুর পর আমরা কখনো কাউকে পুনরায় জীবিত হতে দেখিনি৷ তাই আমরা দৃঢ় বিশ্বাস পোষণ করি মৃত্যুর পরে আর কোন জীবন হবে না৷ তোমর যদি দাবী করো, মৃত্যুর পর আরেকটি জীবন হবে তাহলে আমাদের বাপ-দাদাদের কবর থেকে উঠিয়ে আন যাতে মৃত্যুর পরের জীবন সম্পর্কে আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস জন্মে৷ তোমরা যদি তা না করো তাহলে আমরা মনে করবো তোমাদের দাবী ভিত্তিহীন৷ তাদের মতে এটা যেন মৃত্যুর পরের জীবনকে অস্বীকার করার মজবুত প্রমাণ৷ অথচ এটি একেবারেই নিরর্থক কথা৷ কে তাদেরকে একথা বলেছে যে, মৃত ব্যক্তি জীবিত হয়ে আবার এই দুনিয়াতেই ফিরে আসবে? নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বা অন্য কোন মুসলমান কবে এ দাবী করেছিল যে, আমরা মৃতদের জীবিত করতে পারি?
৩২. হিময়ার গোত্রের বাদশাহদের উপাধি ছিল তুব্বা যেমন পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের বাদশাহদের উপাধি ছিল কিসরা, কায়সার, ফেরাউন প্রভৃতি৷ তুব্বা কওম সাবা কওমের একটি শাখার সাথে সম্পর্কিত ছিল৷ খৃস্টপূর্ব ১১৫ সনে এরা সাবা দেশটি দখল করে এবং ৩০০ খৃষ্টাব্দ পর্যন্ত তা শাসন করে৷ শত শত বছর ধরে আরবে এদের শ্রেষ্ঠত্বের কাহিনী সবার মুখে মুখে ছিল (বিস্তারিত জানার জন্য দেখুন, তাফহীমুল কুরআন, সূরা সাবা, টীকা ৩৭)৷
৩৩. এটা কাফেরদের আপত্তির প্রথম জবাব৷ এ জবাবের সারকথা হচ্ছে, আখেরাত অস্বীকৃতি এমনই জিনিস যা কোন ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা জাতিকে অপরাধী না বানিয়ে চাড়ে না৷ নৈতিক চরিত্র ধ্বংস হয়ে যাওয়া এর অনিবার্য ফল৷ মানবেতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যে জাতিই জীবন সম্পর্কে এই মতবাদ গ্রহণ করেছে পরিণামে সে ধ্বংস হয়ে গেছে৷ এখন বাকি থাকে এই প্রশ্নটির ব্যাখ্যা যে, এরাই উত্তম না তুব্বা কওম এবং তাদের পূর্ববর্তী লোকেরা? এর অর্থ হচ্ছে তুব্বা কওম তার পূর্বের সাবা ও ফেরাউনের কওম এবং আরো অন্য কওম যে সুখ-স্বাচ্ছন্দ এবং গৌরব ও শান-শওকত অর্জন করেছিলো মক্কার এই কাফেররা তার ধারে কাছেও পৌছতে পারেনি৷ কিন্তু এই বস্তুগত সুখ-স্বাচ্ছন্দ এবং পার্থিব গৌরব ও জাঁকজমক নৈতিক অধপতনের ভায়াবহ পরিনাম থেকে কবে তাদের রক্ষা করতে পেরেছিলো যে, তারা নিজেদের সামান্য পুঁজি এবং উপায়-উপকরনের জোরে তা থেকে রক্ষা পাবে? (আরো ব্যাখ্যার জন্য দেখুন, তাফহীমুল কুরআন, সূরা সাবা, টীকা ২৫ ও ৩৬)৷
৩৪. এটা তাদের আপত্তির দ্বিতীয় জবাব৷ এর সারমর্ম হচ্ছে, যে ব্যক্তিই মৃত্যুর পরের জীবন এবং আখেরাতের প্রতিদান ও শাস্তিকে অস্বীকার করে প্রকৃতপক্ষে সে এই বিশ্ব সংসারকে খেলনা এবং তার স্রষ্টাকে নির্বোধ শিশু মনে করে৷ তাই সে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছে যে, মানুষ এই পৃথিবীতে সব কিছু করে একদিন এমনি মাটিতে মিশে যাবে এবং তার ভাল বা মন্দ কাজের কোন ফলাফল দেখা দেবে না৷ অথচ এই বিশ্ব জাহান কোন খেলোয়াড়ের সৃষ্টি নয়, এক মহাজ্ঞানী স্রষ্টার সৃষ্টি৷ মহাজ্ঞানী সত্তা কোন অর্থহীন কাজ করবেন তা আশা করা যায় না৷ আখেরাত অস্বীকৃতির জবাবে কুরআনের বেশ কয়েকটি স্থানে এই যুক্তি পেশ করা হয়েছে এবং আমরা তার বিস্তারিত ব্যাখ্যাও পেশ করেছি (দেখুন, তাফহীমূল কুরআন, আল আনয়াম, টীকা ৪৬; ইউনুস, টীকা ১০ ও ১১; আল আম্বিয়া, টীকা ১৬ ও ১৭; আল মু'মিনুন, টীকা ১০১ ও ১০২; আর রূম, টীকা ৪ থেকে ১০)৷
৩৫. এটা তাদের এই দাবীর জবাব যে, যদি তুমি সত্যবাদী হয়ে থাকো তাহলে আমাদের বাপ-দাদাদের জীবিত করে আনো৷ অর্থাৎ মৃত্যুর পরের জীবন কোন তামাশা নয় যে, যেখানেই কেউ তা অস্বীকার করবে তখনি কবরস্থান থেকে একজন মৃতকে জীবিত করে তাদের সামনে এনে হাজির করা হবে৷ বিশ্ব জাহানের রব এ জন্য একটি সময় বেঁধে দিয়েছেন৷ সেই সময় তিনি পূর্ববর্তী ও পরবর্তীকালের সবাইকে পুনরায় জীবিত করে তাঁর আদালতে সমবেত করবেন এবং তাদের মোকদ্দমার রায় ঘোষণা করবেন৷ তোমরা বিশ্বাস করলে তোমাদের নিজেদেরই কল্যাণ হবে৷ কারণ, এভাবে সময় থাকতেই সতর্ক হয়ে ঐ আদালতে সফলকাম হওয়ার প্রস্তুতি নিতে পারবে৷ বিশ্বাস না করলে নিজেদেরই ক্ষতি করবে৷ কারণ সে ক্ষেত্রে এই ভুলের মধ্যেই জীবন অতিবাহিত করবে যে ভাল-মন্দ যাই আছে এই দুনিয়া পর্যন্তই তা সীমাবদ্ধ৷ মৃত্যুর পর কোন আদালত হবে না যেখানে আমাদের ভাল অথবা মন্দ কাজকর্মের স্থায়ী কোন ফল থাকতে পারে৷
৩৬. মূল আয়াতে আরবী .... শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে৷ আরবী ভাষায় এ শব্দটি এমন ব্যক্তির ক্ষেত্রে বলা হয়, যে কোন সম্পর্কের কারণে অন্য কোন ব্যক্তিকে সহযোগিতা করে৷ সেই সম্পর্ক আত্মীয়তার সম্পর্ক হোক কিংবা বন্ধুত্বের সম্পর্ক হোক অথবা অন্য কোন প্রকারের সম্পর্ক হোক তা দেখার বিষয় নয়৷
৩৭. ফায়সালার দিন যে আদালত কায়েম হবে তা কেমন প্রকৃতির হবে সে কথা এই আয়াতাংশ গুলোতে বলা হয়েছে৷ সেদিন কারো সাহায্য-সহযোগিতা কোন অপরাধীকে রক্ষা করতে কিংবা তার শাস্তি হ্রাস করতে পারবে না৷ নিরংকুশ ক্ষমতা ও ইখতিয়ার সত্যিকার সে বিচারকের হাতে থাকবে যার সিদ্ধান্ত কার্যকরী হওয়া রোধ করার শক্তি কারো নেই এবং যার সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করার ক্ষমতাও কারো নেই৷ তিনি দয়াপরবশ হয়ে কাকে শাস্তি দিবেন না আর কাকে কম শাস্তি দিবেন এটা সম্পুর্ণরূপে তাঁর নিজের বিচার-বিবেচনার ওপর নির্ভর করবে৷ ইনসাফ করার ক্ষেত্রে তিনি দয়ামায়াহীনতা নয় বরং দয়া ও করুনা প্রদর্শন করেন এবং এটাই তার নীতি৷ কিন্তু যার মোকদ্দমায় যে ফায়সালাই তিনি করবেন তা সর্বাবস্থায় অবিকল কার্যকর হবে৷ আল্লাহর আদালতের এই অবস্থা বর্ণনা করার পর যারা ঐ আদালতে অপরাধী প্রমাণিত হবে তাদের পরিনাম কি হবে এবং যাদের সম্পর্কে প্রমাণিত হবে, তারা পৃথিবীতে আল্লাহকে ভয় করে তার অবাধ্যতা থেকে বিরত থেকেছে তাদেরকে কি কি পুরস্কারে ভূষিত করা হবে ছোট ছোট কয়েকটি বাক্যে তা বলা হয়েছে৷