(৪৪:১) হা-মীম৷
(৪৪:২) এই সুস্পষ্ট কিতাবের শপথ,
(৪৪:৩) আমি এটি এক বরকত ও কল্যাণময় রাতে নাযিল করেছি৷ কারণ, আমি মানুষকে সতর্ক করতে চেয়েছিলাম৷
(৪৪:৪) এটা ছিল সেই রাত যে রাতে আমার নির্দেশে প্রতিটি বিষয়ে বিজ্ঞোচিত ফায়সালা দেয়া হয়ে থাকে৷
(৪৪:৫) আমি একজন রসূল পাঠাতে যাচ্ছিলাম, তোমার রবের রহমত স্বরূপ৷
(৪৪:৬) নিশ্চয় তিনি সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞানী৷
(৪৪:৭) তিনি আসমান ও যমীনের মাঝখানের প্রতিটি জিনিসের রব, যদি তোমরা সত্যিই দৃঢ় বিশ্বাস পোষণকারী হও৷
(৪৪:৮) তিনি ছাড়া কোন উপাস্য নেই৷ তিনিই জীবন দান করেন এবং মৃত্যু ঘটান৷ তোমাদের রব ও তোমাদের পূর্ববর্তীদের রব যারা অতীত হয়ে গিয়েছেন৷
(৪৪:৯) ( কিন্তু বাস্তবে এসব লোকের দৃঢ় বিশ্বাস নেই) বরং তারা নিজেদের সন্দেহের মধ্যে পড়ে খেলছে৷১০
(৪৪:১০) বেশ তো! সেই দিনের জন্য অপেক্ষা করো, যে দিন আসমান পরিষ্কার ধোঁয়া নিয়ে আসবে
(৪৪:১১) এবং তা মানুষকে আচ্ছন্ন করে ফেলবে৷ এটা কষ্টদায়ক শাস্তি৷
(৪৪:১২) (এখন এরা বলে) হে প্রভু, আমাদের ওপর থেকে আযাব সরিয়ে দাও৷ আমরা ঈমান আনবো৷
(৪৪:১৩) কোথায় এদের গাফলতি দূর হচ্ছে? এদের অবস্থা তো এই যে, এদের কাছে ‘রসূলে মুবীন’ এসেছেন৷ ১১
(৪৪:১৪) তা সত্ত্বেও এরা তার প্রতি ভ্রুক্ষেপ করেনি এবং বলেছে : এতো শিখিয়ে নেয়া পাগল৷ ১২
(৪৪:১৫) আমি আযাব কিছুটা সরিয়ে নিচ্ছি৷ এরপরও তোমরা যা আগে করছিলে তাই করবে৷
(৪৪:১৬) যেদিন আমি বড় আঘাত করবো, সেদিন আমি তোমাদের থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ করবো৷১৩
(৪৪:১৭) আমি এর আগে ফেরাউনের কওমকেও এই পরীক্ষায় ফেলেছিলাম ৷তাদের কাছে একজন সম্ভ্রান্ত রসূল এসেছিলেন৷১৪
(৪৪:১৮) তিনি বললেন :১৫ আল্লাহর বান্দাদেরকে আমার কাছে সোপর্দ করো৷ ১৬ আমি তোমাদের জন্য একজন বিশ্বস্ত রসূল৷ ১৭
(৪৪:১৯) আল্লাহর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করো না৷ আমি তোমাদের কাছে (আমার নিযুক্তির) স্পষ্ট সনদ পেশ করছি৷১৮
(৪৪:২০) তোমরা আমার ওপরে হামলা করে বসবে, এ ব্যাপার আমি আমার ও তোমাদের রবে আশ্রয় নিয়েছি৷
(৪৪:২১) তোমরা যদি আমার কথা না মানো, তাহলে আমাকে আঘাত করা থেকে বিরত থাকো৷১৯
(৪৪:২২) অবশেষে তিনি তাঁর রবকে ডেকে বললেন, এসব লোক অপরাধী৷২০
(৪৪:২৩) (জবাব দেয়া হলো) বেশ তাহলে রাতের মধ্যেই আমার বান্দাদের নিয়ে বেরিয়ে পড়ো৷ ২১ তোমাদের পিছু ধাওয়া করা হবে৷২২
(৪৪:২৪) সমুদ্রকে আপন অবস্থায় উন্মুক্ত থাকতে দাও৷ এই পুরো সেনাবাহিনী নিমজ্জিত হবে৷ ২৩
(৪৪:২৫) কত বাগ-বাগিচা, ঝর্ণাধারা,
(৪৪:২৬) ফসল ও জমকালো প্রাসাদ তারা ছেড়ে গিয়েছে৷
(৪৪:২৭) তাদের পিছনে কত ভোগের উপকরণ পড়ে রইলো যা নিয়ে তারা ফুর্তিতে মেতে থাকতো৷
(৪৪:২৮) এই হয়েছে তাদের পরিনাম৷ আমি অন্যদেরকে এসব জিনিসের উত্তরাধিকারী বানিয়ে দিয়েছি৷ ২৪
(৪৪:২৯) অতপর না আসমান তাদের জন্য কেঁদেছে না যমীন ২৫ এবং সামান্যতম অবকাশও তাদের দেয়া হয়নি৷
১. কিতাবুম মুবীন বা সুস্পষ্ট কিতাবের শপথ করার উদ্দেশ্য সূরা যুখরুফের ১ নম্বর টীকায় বর্ণনা করা হয়েছে এখানেও যে বিষয়টির জন্য শপথ করা হয়েছে তা হলো এ কিতাবের রচিয়তা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নন, আমি নিজে৷ তার প্রমাণ অন্য কোথাও অনুসন্ধান করার দরকার নেই, এ কিতাবই তার প্রমাণের জন্য যথেষ্ট৷ এর পর আরো বলা হয়েছে, যে রাতে তা নাযিল করা হয়েছে সে রাত ছিল অত্যন্ত বরকত ও কল্যাণময়৷ অর্থাৎ যেসব নির্বোধ লোকদের নিজেদের ভালমন্দের বোধ পর্যন্ত নেই তারাই এ কিতাবের আগমনে নিজেদের জন্য আকস্মিক বিপদ মনে করছে এবং এর হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য বড়ই চিন্তিত৷ কিন্তু গাফলতির মধ্যে পড়ে থাকা লোকদের সতর্ক করার জন্য আমি যে মুহূর্তে এই কিতাব নাযিল করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি তাদের ও গোটা মানব জাতির জন্য সেই মুহূর্তটি ছিল অত্যন্ত সৌভাগ্যময়৷

কোন কোন মুফাসসির সেই রাত কুরআন নাযিল করার অর্থ গ্রহণ করেছেন এই যে, ঐ রাতে কুরআন নাযিল শুরু হয় আবার কোন কোন মুফাসসির এর অর্থ গ্রহণ করেন, ঐ রাতে সম্পূর্ণ কুরআন 'উম্মুল কিতাব' থেকে স্থানান্তরিত করে অহীর ধারক ফেরেশতাদের কাছে দেয়া হয় এবং পরে তা অবস্থা ও পরিস্থিতি অনুযায়ী প্রয়োজন মত ২৩ বছর ধরে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর নাযিল করা হতে থাকে৷ প্রকৃত অবস্থা কি তা আল্লাহই ভাল জানেন৷

ঐ রাত অর্থ সূরা কদরে যাকে 'লাইলাতুল কদর' বলা হয়েছে৷ সেখানে বলা হয়েছে আরবী............... আর এখানে বলা হয়েছে আরবি...................... তাছাড়া কুরআন মজীদেই একথা বলা হয়েছে যে সেটি ছিল রমযান মাসের একটি রাত ................৷
২. মূল আয়াতে আরবী...................... শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে যার দুটি অর্থ৷ একটি অর্থ হচ্ছে, সেই নির্দেশটি সরাসরি জ্ঞানভিত্তিক হয়ে থাকে৷ তাতে কোন ক্রটি বা অপূর্ণতার সম্ভাবনা নেই৷ অপর অর্থটি হচেছ, সেটি অত্যন্তদৃঢ় ও পাকাপোক্ত সিদ্ধান্ত হয়ে থাকে৷ তা পরিবর্তন করার সাধ্য কারো নেই৷
৩. এ বিষয়টি সূরা কদরে বলা হয়েছে এভাবে :

সেই রাতে ফেরেশতারা ও জিবরাঈল তাদের রবের আদেশে সব রকম নির্দেশ নিয়ে অবতীর্ণ হয়৷

এ থেকে জানা যায়, আল্লাহর রাজকীয় ব্যবস্থাপনায় এটা‌ এমন এক রাত যে রাতে তিনি ব্যক্তি, জাতি এবং দেশসমূহের ভাগ্যের ফায়সালা অনুসারে কাজ করতে থাকে৷ কতিপয় মুফাসসিরের কাছে এ রাতটি শা'বানের পনের তারিখের রাত বলে সন্দেহ হয়েছে তাদের মধ্যে হযরত ইকরিমার নাম সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য৷ কারণ, কোন কোন হাদীসে এ রাত সম্পর্কে এ কথা উল্লেখ আছে যে, এ রাতেই ভাগ্যের ফায়সালা করা হয়৷ কিন্তু ইবনে আব্বাস, ইবনে উমর, মুজাহিদ, কাতাদা, হাসান বাসারী, সাঈদ ইবনে জুবাইর, ইবনে যায়েদ, আবু সালেক, দাহ্‌হাক এবং আরো অনেক মুফাসসির এ ব্যাপারে একমত যে, এটা রমযানের সেই রাত যাকে "লাইলাতুল কদর" বলা হয়েছে৷ কারণ, কুরআন মজীদ নিজেই সুস্পষ্ট করে তা বলছে৷ আর যে ক্ষেত্রে কুরআনের সুস্পষ্ট উক্তি বিদ্যমান সে ক্ষেত্রে 'আখবারে আহাদ'* ধরনের হাদীসের ওপর ভিত্তি করে ভিন্ন কোন সিদ্ধান্ত নেয়া যায় না৷ ইবনের কাসীর বলেন : এক শা'বান থেকে অন্য শা'বান পর্যন্ত ভাগ্যের ফায়সালা হওয়া সম্পর্কে উসমান ইবনে মুহাম্মাদ বর্ণিত যে হাদীস ইমাম যুহরী উদ্ধৃত করেছেন তা একটি 'মুরসাল'** হাদীস৷ কুরআনের সুস্পষ্ট উক্তির বিরুদ্ধে এ ধরনের হাদীস পেশ করা যায় না৷ কাযী আবু বকর ইবনুল আরাবী বলেন : শা'বানের পনের তারিখের রাত সম্পর্কে কোন হাদীসই নির্ভরযোগ্য নয় , না তার ফযীলত সম্পর্কে, না ঐ রাতে ভাগ্যের ফয়সালা হওয়া সম্পর্কে৷ তাই সেদিকে ভ্রুক্ষেপ না করা উচিত৷

(আহকামুল কুরআন)

*আখবারে আহাদ বলতে এমন হাদীস বুঝায় যে হাদীসের বর্ণনা সূত্রের কোনো এক স্তরে বর্ণনাকারী মাত্র একজন থাকে৷ এ বিষয়টি হাদীসের মধ্যে তুলনামূলভাবে কিছুটা দুর্বলতা সঞ্চার করে৷

৪. অর্থাৎ এই কিতাবসহ একজন রসূল পাঠানো শুধু জ্ঞান ও যুক্তির দাবীই ছিল না, আল্লাহর রহমতের দাবীও তাই ছিল৷ কারণ, তিনি রব৷ আর রবুবিয়াত শুধু বান্দার দেহের প্রতিপালন ব্যবস্থা দাবীই করে না, বরং নির্ভুল জ্ঞানানুযায়ী তাদের পথপ্রদর্শন করা, হক ও বাতিলের পার্থক্য সম্পর্কে অবহিত করা এবং অন্ধকারে হাতড়িয়ে বেড়ানোর জন্য ছেড়ে না দেয়ার দাবীও করে৷
৫. এই প্রেক্ষাপটে আল্লাহর এ দুটি গুণ বর্ণনা করার উদ্দেশ্য মানুষকে এ সত্য জানিয়ে দেয়া যে, কেবল তিনিই নির্ভূল জ্ঞান দিতে পারেন কেননা, তিনিই সমস্ত সত্যকে জানেন ৷ একজন মানুষ তো দূরের কথা সমস্ত মানুষ মিলেও যদি নিজেদের জন্য জীবন পদ্ধতি রচনা করে তবুও তার ন্যায়, সত্য ও বাস্তবানুগ হওয়ার কোন গ্যারান্টি নেই৷ কারণ, গোটা মানব জাতি এক সাথে মিলেও একজন আরবী......... (সর্বশ্রোতা ও মহাজ্ঞানী) হয় না৷ একটি সঠিক ও নির্ভূল জীবন পদ্ধতি রচনার জন্য যেসব জ্ঞান সত্য জানা জরুরী তার সবগুলো আয়ত্ব করা তার সাধ্যাতীত৷ এরূপ পূর্ণ জ্ঞান কেবল আল্লাহরই আছে ৷ তিনি সর্বশ্রোতা ও মহাজ্ঞানী ৷ তাই মানুষের জন্য কোনটি হিদায়েত আর কোনটি গোমরাহী, কোনটি হক আর কোনটি বাতিল এবং কোনটি কল্যাণ আর কোনটি অকল্যাণ তা তিনিই বলতে পারেন৷
৬. আরববাসীরা নিজেরাই স্বীকার করতো, আল্লাহই গোটা বিশ্ব জাহান ও তার প্রতিটি জিনিসের রব (মালিক ও পালনকর্তা)৷ তাই তাদের বলা হয়েছে, যদি তোমরা না বুঝে শুনে এবং শুধু মৌখিকভাবে একথা না বলে থাকো , বরং প্রকৃতই যদি তাঁর প্রভুত্বের উপলব্ধি ও মালিক হওয়ার দৃঢ় বিশ্বাস তোমাদের থাকে তাহলে তোমাদের মেনে নেয়া উচিত যে, (১) মানুষের পথপ্রদর্শনের জন্য কিতাব ও রসূল প্রেরণ তাঁর রহমত ও প্রতিপালন গুণের অবিকল দাবী এবং (২) মালিক হওয়ার কারণে এটা তাঁর হক এবং তাঁর মালিকানাধীন হওয়ার কারণে তোমাদের কর্তব্য হলো, তাঁর পক্ষ থেকে যে হিদায়াত আসে তা মেনে চলো এবং যে নির্দেশ আসে তার আনুগত্য করে৷
৭. উপাস্য অর্থ প্রকৃত উপাস্য৷ আর প্রকৃত উপাস্যের হক হচ্ছে তাঁর ইবাদতের (দাসত্ব ও পূজা-অর্চনা) করতে হবে৷
৮. এটাই প্রমাণ করে যে, তিনি ছাড়া কোন উপাস্য নেই এবং থাকতে পারে না৷ অতএব যিনি নিষ্প্রাণ বস্তুর মধ্যে প্রাণ সঞ্চার করে তোমাদের জীবন্ত মানুষ বানিয়েছেন এবং যিনি এ ব্যাপারে পূর্ণ ক্ষমতা ও ইখতিয়ার মালিক যে, যতক্ষণ ইচ্ছা তোমাদের এ জীবনকে টিকিয়ে রাখবেন এবং যখন ইচছা এটা পরিসমাপ্তি ঘটাবেন৷ তোমরা তাঁর দাসত্ব করবে না, কিংবা তাঁর ছাড়া অন্য কারো দাসত্ব করতে শুরু করবে তা সরাসরি বিবেক-বুদ্ধির পরিপন্থী৷
৯. এখানে এ বিষয়ের প্রতি একটি সূক্ষ্ম ইংগিত আছে যে, তোমাদের যে পূর্বসূরীরা তাঁকে বাদ দিয়ে অন্যদের উপাস্য বানিয়েছিল প্রকৃতপক্ষে তাদের রবও তিনিই ছিলেন৷ তারা তাদের প্রকৃত রবকে বাদ দিয়ে অন্যদের দাসত্ব কর ঠিক কাজ করেনি৷ তাই তাদের অন্ধ অনুসরণ করে তোমরা ঠিকই করেছো এবং তাদের কর্মকাণ্ডকে নিজেদের ধর্মের সঠিক হওয়ার যুক্তি-প্রমাণ বলে ধরে নেবে তা ঠিক নয়৷ তাদের কর্তব্য ছিল একমাত্র তাঁরই দাসত্ব করা৷ কারণ তিনিই ছিলেন তাদের রব৷ কিন্তু তারা যদি তা না করে থাকে তা হলে তোমাদের কর্তব্য হচ্ছে, সবার দাসত্ব পরিত্যাগ করে কেবল সেই এক আল্লাহর দাসত্ব করা৷ কারণ, তিনিই তোমাদের রব৷
১০. এই সংক্ষিপ্ত আয়াতাংশের মধ্যে একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ সত্যের প্রতি ইংগিত দেয়া হয়েছে৷ নাস্তিক হোক বা মুশরিক তাদের জীবনে মাঝে মধ্যে এমন কিছু মুহুর্ত আসে যখন ভেতর থেকে তাদের মন বলে ওঠে : তুমি যা বুঝে বসে আছো তার মধ্যে কোথাও না কোথাও অসংগিত বিদ্যমান৷ নাস্তিক আল্লাহকে অস্বীকার করার ব্যাপারে বাহ্যত যতই কঠোর হোক না কেন, কোন না কোন সময় তাদের মন এ সাক্ষ্য অবশ্যই দেয় যে, মাটির একটি পরমাণু থেকে শুরু করে নীহারিকা পুঞ্জ পর্যন্ত এবং একটি তৃনপত্র থেকে শুরু করে মানুষের সৃস্টি পর্যন্ত এই বিস্ময়কর জ্ঞানময় ব্যবস্থা কোন মহাজ্ঞানী স্রস্টা ছাড়া অস্তিত্ব লাভ করতে পারে না৷ অনুরূপ একজন মুশরিক শিরকে যত গভীরেই ডুবে থাক না কেন তার মনও কোন না কোন সময় একথা বলে ওঠে, যাকে আমি উপাস্য বানিয়ে বসে আছি সে আল্লাহ হতে পারে না৷ মনের এই ভেতরের সাক্ষের ফলশ্রুতিতে না পারে তারা আল্লাহর অস্তিত্ব ও তাঁর তাওহীদের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস অর্জন করতে না পারে নাস্তিকতার প্রতি পূর্ণ বিশ্বাস পোষণ ও তা থেকে মানসিক প্রশান্তি লাভ করতে৷ ফলে বাহ্যিকভাবে তারা যত কঠোর ও দৃঢ় বিশ্বাসই প্রদর্শন করুক না কেন তাদের জীবনাদর্শ প্রতিষ্ঠিত হয় সন্দেহের ওপরে৷ এখন প্রশ্ন হলো, এই সন্দেহ তাদের মধ্যে অস্থিরতা সৃষ্টি করে না কেন এবং দৃঢ় বিশ্বাস ও সন্তোষজনক ভিত্তি খুজে পাওয়ার জন্য তারা ধীর ঠাণ্ডা মেজাজে প্রকৃত সত্যে অনুসন্ধান করে না কেন? এ জবাব হলো দীন বা জীবনাদর্শের ব্যাপারে তারা যে জিনিসটি থেকে বঞ্চিত হয় সেটি হচেছ ধীর ও ঠাণ্ডা মেজাজ৷ তাদের দৃষ্টিতে মূল গুরুত্ব লাভ করে শুধু পার্থিব স্বার্থ এবং তার ভোগের উপকরণ৷ এই বস্তুটি অর্জনের চিন্তা তারা তাদের মন-মগজ ও দেহের সমস্ত শক্তি ব্যয় করে ফেলে৷ এরপর থকে জীবনাদর্শের ব্যাপার৷ সেটা তাদের জন্য প্রকৃতপক্ষে একটা খেলা, একটা বিনোদন এবং একটা বুদ্ধিবৃত্তিক বিলাসিতা ছাড়া আর কিছু নয়৷ তাই তারা এ নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করে কয়েক মুহূর্তও ব্যয় করতে পারে না৷ ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদি হলে বিনোদন হিসেবে পালন করা হচ্ছে৷ নিরীশ্বরবাদ ও নাস্তিকতা বিষয়ক বিতর্ক বিনোদন মূলক ভাবে করা হচ্ছে৷ দুনিয়ার বাস্তবতার মধ্যে কার এত অবসর আছে যে বসে একটু ভেবে দেখবে, আমরা ন্যয় ও সত্যের প্রতি বিমুখ নই তো? আর যদি তা হই তাহলে পরিণামই বা কি?
১১. আরবি....... এর দুটি অর্থ৷ এক, তাঁর জীবন, তাঁর নৈতিক চরিত্র এবং তার কাজকর্ম থেকে তার রসূল হওয়া পুরোপুরি স্পষ্ট৷ দুই, তিনি প্রকৃত সত্যকে সুস্পষ্ট করে তুলে ধরতে কোন ত্রুটি করেননি৷
১২. তাদের কথার উদ্দেশ্য হলো, এ বেচারা তো ছিল সাদামাটা মানুষ৷ অন্য কিছু লোক তাকে নেপথ্য থেকে উৎসাহ যোগাচ্ছে৷ তারা আড়ালে থেকে কুরআনের আয়াত রচনা করে একে শিখিয়ে দেয়া৷ আর এ সাধারণ মানুষের কাছে এসে তা বলে ফেলে৷ তারা মজা করে লোক চক্ষুর অন্তরালে বসে থাকে আর এ গালমন্দ শোনে এবং পাথর খায়৷ রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বছরের পর বছর তাদের সামনে ক্রমাগত যেসব প্রমাণ, সদুপদেশ এবং যুক্তিপূর্ণ শিক্ষা পেশ করে ক্লান্ত প্রায় হয়ে পড়ছিলেন এভাবে একটি সস্তা কথা বলে তারা তা উড়িয়ে দিতো৷ কুরআন মজীদের যেসব যুক্তিপূর্ণ কথা বলা হচ্ছিল তারা সেদিকে ভ্রুক্ষেপ করতো না৷ আবার যিনি এসব কথা পেশ করছিলেন তিনি কেমন মর্যাদার লোক তাও দেখতো না৷ তাছাড়া এসব অভিযোগ আরোপের সময়ও ও কথা ভেবে দেখার কষ্টটুকু পর্যন্ত স্বীকার করতো না যে, তারা যা বলছে তা অর্থহীন কথাবার্তা কিনা৷ এটা সর্বজন বিদিত যে নেপথ্যে বসে শেখানোর মত অন্য কোন ব্যক্তি যদি থাকতো তাহলে তা খাদীজা (রা), আবু বকর (রা), আলী (রা) যাযেদ ইবনে হারেসা এবং প্রাথমিক যুগে ইসলাম গ্রহণকারী অন্যন্য মুসলমানদের কাছে কি করে গোপন থাকতো৷ কারণ তাদের চাইতে আর কেউ রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট ও সার্বক্ষনিক সাথী ছিল না৷ কিন্তু তা সত্ত্বেও এসব লোকই নবীর (সা) সর্বাধিক ভক্ত ও অনুরক্ত ছিলেন তারই বা কারণ কি? অথচ নেপথ্যে থেকে অন্য কারোর শেখানোর ওপর ভিত্তি করে নবুওয়াতে কাজ চালানো হয়ে থাকলে এসব লোকই সর্ব প্রথম তার বিরোধিতা করতো৷ (আরো ব্যাখ্যার জন্য দেখুন, তাফহীমুল কুরআন, সূরা আন নাহল, টীকা ১০৭; আল ফুরকান, টীকা ১২)৷
১৩. এ আয়াত দুটির অর্থ বর্ণনায় মুফাসসিরদের মধ্যে মতভেদ হয়েছে এবং এই দুটি মতভেদ সাহাবাদের যুগেও ছিল৷ হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদের (সা) বিখ্যাত শাগরেদ মাসরুক বলেন : একদিন আমরা কুফার মসজিদে প্রবেশ করে দেখলাম এক বক্তা লোকদের সামনে বক্তৃতা করছে৷ সে আরবী................. পাঠ করলো৷ তারপর বলতে লাগল : জানো, সে ধোঁয়া কেমন? কিয়ামতের দিন আসবে এবং কাফের ও মুনাফিকদের অন্ধ ও বধির করে দেবে৷ কিন্তু ঈমানদারদের ওপর তার প্রতিক্রিয়া হবে শুধু এতটুকু যেন সর্দিতে আক্রান্ত হয়েছে৷ তার এই বক্তব্য শুনে আমরা হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদের (সা) কাছে গেলাম এবং তাকে বক্তার এই তাফসীর বর্ণনা করে শুনালাম ৷ হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ শুয়ে ছিলেন ৷ এ তাফসীর শুনে ধড়মড়িয়ে উঠে বসলেন এবং বললেন, কারো যদি জানা না থাকে তাহলে যারা জানে তাদের কাছে জেনে নেয়া উচিত৷ প্রকৃত ব্যাপার হলো, কুরাইশরা যখন ক্রমাগত ইসলাম গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে এবং রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিরোধিতাই করে চলছিলো তখন তিনি এই বলে দোয়া করলেন : হে আল্লাহ, ইউসুফ আলাইহিস সালামের দুভিক্ষের মত দুর্ভিক্ষ দিয়ে আমাকে সাহায্য করো৷ সুতরাং এমন কঠিন দুর্ভিক্ষ দেখা দিল যে, মানুষ হাড়, চামড়া এবং মৃতজন্তু পর্যন্ত খেতে শুরু করলো৷ তখনকার অবস্থা ছিল, যে ব্যক্তিই আসমানের দিকে তাকাতো ক্ষুধার যন্ত্রনায় সে শুধু ধোঁয়াই দেখতে পেতো৷ অবশেষে আবু সুফিয়ান নবীর (সা) কাছে এসে বললো : আপনি তো আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা করার আহবান জানান আপনার কওম ক্ষুধায় মৃত্যুবরণ করছে৷ আল্লাহর কাছে দোয়া করুন, তিনি যেন এ বিপদ দূর করে দেন৷ ‌ এ যুগেই কুরাইশরা বলতে শুরু করেছিলো : হে আল্লাহ! আমাদের ওপর থেকে আযাব দূর করে দাও, আমরা ঈমান আনবো৷ এ আয়াত দুটিতে এ ঘটনারই উল্লেখ করা হয়েছে৷ আর বড় আঘাত অর্থ বদর যুদ্ধের দিন কুরাইশদের যে আঘাত দেয়া হয়েছিলো তাই৷ এ হাদীসটি ইমাম আহমদ, বুখারী, তিরমিযী, নাসায়ী, ইবনে জারীর এবং ইবনে আবী হাতেম কতিপয় সনদে মাসরুক থেকে উদ্ধৃত করেছেন৷ মাসরুক ছাড়া ইবরাহীম নাখায়ী, কাতাদা, আসেম এবং আমেরও বর্ণনা করেছেন যে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা) এ আয়াতটির এ ব্যাখ্যাই বর্ণনা করেছিলেন৷ তাই এ ব্যাপারে আর কোন সন্দেহ থাকে না যে, প্রকৃতপক্ষে এ ব্যাপারে এটিই ছিল তার অভিমত৷ তাবেয়ীদের মধ্যে থেকে মুজাহিদ, কাতাদা, আবুল আলিয়া, মুকাতিল, ইবরাহীম নাখায়ী, দাহহাক, আতায়িতুল আওফী এবং অন্যরাও এ ব্যখ্যার ক্ষেত্রে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদের সাথে ঐকমত্য পোষণ করেছেন৷

অপরদিকে হযরত আলী, ইবনে উমর, উবনে আব্বাস, আবু সাঈদ খুদরী, যায়েদ ইবনে আলী এবং হাসান বাসারীর মত পণ্ডিতবর্গ বলেন : এ আয়াতগুলোতে যে আলোচনা করা হয়েছে তা সবই কিয়ামতের নিকটবর্তী সময়ের ঘটনা৷ আর এতে যে ধোঁয়ার কথা বলা হয়েছে তা সেই সময়েই পৃথিবীর ওপর ছেয়ে যাবে৷ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের থেকে যেসব হাদীস উদ্ধৃত হয়েছে সেই সব হাদীস থেকেও এ ব্যাখ্যা আরো দৃঢ়তা লাভ করে৷ হুযাইফা ইবনে আসীদ আল গিফারী বলেন : একদিন আমরা পরস্পর কিয়ামত সম্পর্কে কথাবার্তা বলছিলাম৷ ইতিমধ্যে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হাজির হলেন এবং বললেন : যতদিন না একের পর এক দশটি আলামত প্রকাশ পাবে ততদিন কিয়ামত হবে না৷ পশ্চিম দিকে সূর্য উদিত হওয়া, ধোঁয়া, দাব্বা বা জন্তু, ইয়াজুজ ও মাজুজের আবির্ভাব, ঈসা ইবনে মারয়ামের অবতীর্ণ হওয়া, ভূমি ধ্বস, পূর্বে, পশ্চিমে ও আরব উপদ্বীপে এবং আদন থেকে আগুনের উৎপত্তি হওয়া যা মানুষকে তাড়া করে নিয়ে যাবে (মুসলিম)৷ ইবনে জারীর ও তাবারনীর উদ্ধৃত আবু মালেক আশআরী বর্ণিত হাদীস এবং ইবনে আবী তাহেম উদ্ধৃত আবু সাঈদ খুদরী বর্ণিত হাদীসও এ বর্ণনা সমর্থন করে৷ এ দুটি হাদীস থেকে জানা যায়, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ধোঁয়াকে কিয়ামতের আলামতের মধ্যে গণ্য করেছেন৷ তাছাড়া নবী (সা) এও বলেছেন যে, যখন ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন করে ফেলবে তখন মু'মিনের ওপর তার প্রতিক্রিয়া হবে সর্দির মত৷ কিন্তু তা কাফেরে প্রতিটি শিরা-উপশিরায় প্রবেশ করবে এবং তার শরীরের প্রতিটি ছিদ্র ও নির্গমন পথ দিয়ে বের হয়ে আসবে৷

পূর্ববর্তী আয়াতগুলো সম্পর্কে গভীরভাবে চিন্তা-ভাবনা করলে এ দুটি ব্যখ্যার গরমিল ও বৈপরিত্য সহজেই দূর হতে পারে৷ হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদের (সা) ব্যাখ্যার ব্যাপারে বলা যায়, নবীর (সা) দোয়ার ফলে মক্কায় কঠিন দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছিলো যার ফলে কাফেরদের বিদ্রূপ ও উপহাসে কিছুটা ভাটা পড়েছিলো এবং দুর্ভিক্ষ দূর করার জন্য তারা নবী (সা) কাছে দোয়ার আবেদন জানিয়েছিলো৷ কুরআন মজীদের বেশ কিছু জায়গায় এ ঘটনার প্রতি ইংগিত দেয়া হয়েছে৷ (দেখুন, তাফহীমুল কুরআন, আল আন'আম ২৯, আল আরাফ ৭৭, ইউনুস ১৪,১৫ ও ২৯ এবং আল মুমিনুন ৭২ টীকা)৷

এই আয়াতগুলোর মাধ্যেমেও যে ঐ পরিস্থিতির প্রতি ইংগিত দেয়া হয়েছে তা স্পষ্ট বুঝা যায়৷ কাফেরদের উক্তি, "হে প্রভু, আমাদের ওপর থেকে এ আযাব সরিয়ে নিন, আমরা ঈমান আনবো৷" আর আল্লাহর এ উক্তি, "কোথায় এদের গাফলতি দূর হচ্ছে? এদের অবস্থা এই যে, এদের কাছে 'রসূলে মুবীন' এসেছেন৷ তা সত্ত্বেও এরা তার প্রতি ভ্রুক্ষেপ করেনি এবং বলেছে : এতো শিখিয়ে নেয়া পাগল"৷ তাছাড়া এই উক্তিও যে, "আমি আযাব কিছুটা সরিয়ে নিচ্ছি৷ এরপরও তোমরা আগে যা করছিলে তাই করবে৷" এ ঘটনাগুলো নবীর (সা) যুগের হলে কেবল সেই পরিস্থিতিতেই এসব কথা খাপ খায়৷ কিয়ামতের নিকটবর্তী সময়ে সংঘটিত হবে এমন ঘটনাবলীর ক্ষেত্রে এসব কথার প্রয়োগ বোধগম্য নয়৷ তাই ইবনে মাসউদের (সা) ব্যাখ্যার এতটুকু অংশ সঠিক বলে মনে হয়৷ কিন্তু ধোঁয়াও সেই যুগেই প্রকাশ পেয়েছিলো এবং প্রকাশ পেয়েছিলো এমনভাবে যে, ক্ষুধার যন্ত্রনা নিয়ে মানুষ যখন আসমানের দিকে তাকাতো তখন শুধু ধোঁয়াই দেখতে পেতো, তার ব্যাখ্যার এই অংশটুকু সঠিক বলে মনে হয় না৷ একথা কুরআন মজীদের বাক্যের সাথেও বাহ্যত খাপ খায় না এবং হাদীসসমূহেরও পরিপন্থী৷ কুরআনে একথা কোথায় বলা হয়েছে যে, আসমান ধোঁয়া নিয়ে এসেছে এবং মানুষের ওপর ছেয়ে গিয়েছে? সেখানে তো বলা হয়েছে, 'বেশ, তাহলে সেই দিনটির অপেক্ষা করো যেদিন আসমান সুস্পষ্ট ধোঁয়া নিয়ে আসবে এবং তা মানুষকে আচ্ছন্ন কর ফেলবে৷ পরবর্তী আয়াতের প্রতি লক্ষ রেখে বিচার করলে এ বাণীর পরিষ্কার অর্থ যা বুঝা যায় তা হচ্ছে, তোমরা যখন উপদেশও মানছো না এবং দুর্ভিক্ষের আকারে যেভাবে তোমাদের সতর্ক করা হলো তাতেও সম্বিত ফিরে পাচ্ছো না, তাহলে কিয়ামতের জন্য অপেক্ষা করো৷ সেই সময় যখন দুর্ভাগ্য ষোলকলায় পূর্ণ হবে তখন তোমরা ঠিকই বুঝতে পারবে হক কি আর বাতিল কি? সুতরাং ধোঁয়া সম্পর্কে সঠিক কথা হলো তা দুর্ভিক্ষকালীন সময়ের জিনিস নয়, বরং তা কিয়ামতের একটি আলামত৷ হাদীস থেকেও একথাই জানা যায়৷ বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, বড় বড় মুফাসসিরদের মধ্যে যারা হযরত ইবনে মাসউদের মত সমর্থন করেছেন তারা পুরো বক্তব্যই সমর্থন করেছেন৷ আবার যারা তা প্রত্যাখ্যান করেছেন তারাও পুরোটাই প্রত্যাখ্যান করে বসেছেন৷ অথচ কুরআনের সংশ্লিষ্ট আয়াত ও হাদীস সম্পর্কে গভীরভাবে চিন্তা করলে এর কোন অংশ ঠিক এবং কোন অংশ ভুল তা পরিষ্কার বুঝা যায়৷
১৪. মূল আয়াতে আরবী...... শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে৷ আরবী............... শব্দটি যখন মানুষের জন্য ব্যবহার করা হয় তখন তার দ্বারা বুঝানো হয় এমন ব্যক্তিকে যে অত্যন্ত ভদ্র ও শিষ্ট আচার-আচরণ এবং অতীব প্রশংসনীয় গুনাবলির অধিকারী৷ সাধারণ গুনাবলী বুঝাতে এ শব্দ ব্যবহৃত হয় না৷
১৫. প্রথমেই একথা বুঝে নেয়া দরকার যে, এখানে হযরত মূসার যেসব উক্তি ও বক্তব্য উদ্ধৃত করা হচ্ছে, তা যুগপৎ একই ধারাবাহিক বক্তব্যের বিভিন্ন অংশ নয়, বরং বছরের পর বছর দীর্ঘ সময় ধরে বিভিন্ন পরিবেশ পরিস্থিতিতে যেসব কথা তিনি ফেরাউন ও তার সভাসদদের বলেছেন তার সারসংক্ষেপ কয়েকটি মাত্র বাক্যে বর্ণনা করা হচ্ছে৷ (বিস্তারিত জানা জন্য দেখুন, তাফহীমুল কুরআন, সূরা আ'রাফ, টীকা ৮৩ থেকে ৯৭; ইউনুস, টীকা ৭২থেকে ৯৩; ত্বাহা, টীকা ১৮ (ক) থেকে ৫২; আশ শু'আরা, টীকা ৭ থেকে ৪৯; আন নামল, টীকা ৮ থেকে ১৭; আল কাসাস, টীকা ৪৬ থেকে ৫৬; আর মু'মিন, আয়াত ২৩ থেকে ৪৬; আয যখরুফ, আয়াত ৪৬ থেকে ৫৬ টীকাসহ)৷
১৬. মূল আয়াতে আরবী............. বলা হয়েছে৷ এ আয়াতাংশের একটি অনুবাদ আমরা ওপরে বর্ণনা করেছি৷ এই অনুবাদ অনুসারে এটা ইতিপূর্বে সূরা আ'রাফ (আয়াত ১৫), সূরা ত্বাহা (৪৭) এবং আশ শুআরায় বনী ইসরাঈলদের আমার সাথে যেতে দাও বলে যে দাবী করা হয়েছে সেই দাবীর সমার্থক৷ আরেকটি 'অনুবাদ' হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস থেকে উদ্ধৃত৷ অনুবাদটি হলো, হে আল্লাহর বান্দারা, আমার হক আদায় করো অর্থাৎ আমার কথা মেনে নাও, আমার প্রতি ঈমান আনো এবং আমার হিদায়াত অনুসরণ করো৷ আল্লাহর পক্ষ থেকে তোমাদের ওপর এটা আমার হক৷ পরের বাক্যাংশ অর্থাৎ "আমি তোমাদের জন্য একজন বিশ্বস্ত রসূল" এই দ্বিতীয় অর্থের সাথে বেশী সামঞ্জস্যপূর্ণ৷
১৭. অর্থাৎ নির্ভরযোগ্য রসূল৷ নিজের পক্ষ থেকে কোন কথা সংযোজন করে বলার মত ব্যক্তিও আমি নই কিংবা নিজের কোন ব্যক্তিগত আকাংখা বা উদ্দেশ্য সিদ্ধির জন্য নিজেই একটি নির্দেশ বা আইন রচনা করে আল্লাহর নামে চালিয়ে দেয়ার মত ব্যক্তিও নই৷ তোমরা আমার ওপর এতটা আস্থা রাখতে পার যে, আমার প্রেরণকারী যা বলেছেন কমবেশী না করে ঠিক ততটুকুই আমি তোমাদের কাছে পৌছিয়ে দেব৷ (প্রকাশ থাকে যে হযরত মূসা সর্বপ্রথম যখন তাঁর দাওয়াত পেশ করেছিলেন তখন এই দুটি কথা বলেছিলেন)৷
১৮. অন্য কথায় এর অর্থ হচ্ছে, তোমরা আমার বিরুদ্ধে যে বিদ্রোহ করছো প্রকৃতপক্ষে তা আল্লাহর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ৷ কারণ, আমার যেসব কথা শুনে তোমরা ক্ষিপ্ত হয়ে উঠছো তা আমার নয়, আল্লাহর কথা৷ আমি তাঁর রসূল হিসেবে এসব কথা বলছি৷ আমি আল্লাহর রসূল কিনা এ ব্যাপারে যদি তোমাদের সন্দেহ হয় তাহলে আমি তোমাদের সামনে আমার আল্লাহর পক্ষ থেকে আদিষ্ট হওয়ার সুস্পষ্ট প্রমাণ পেশ করছি৷ এই প্রমাণ বলতে কোন একটি মাত্র মু'জিযা বুঝানো হয়‌নি বরং ফেরাউনের দরবারের প্রথমবার পৌছার পর থেকে মিসরে অবস্থানের সর্বশেষ সময় পর্যন্ত দীর্ঘদিন ধরে ধারাবাহিকভাবে যেসব মু'জিযা মূসা আলাইহিস সালাম ফেরাউন ও তার কওমকে দেখিয়েছেন তার সবগুলোকে বুঝানো হয়েছে৷ তারা যে প্রমাণটিই অস্বীকার করেছে তিনি পরে তার চেয়েও অধিক সুস্পষ্ট প্রমাণ পেশ করেছেন৷ (ব্যাখ্যার জন্য দেখুন, তাফহীমুল কুরআন, আয যুখরুফ, টীকা নম্বর ৪২ও ৪৩)৷
১৯. এটা সেই সময়ের কথা যখন হযরত মূসার পেশকৃত সমস্ত নিদর্শন দেখা সত্ত্বেও ফেরাউন তার জিদ ও হঠকারিতা বজায় রেখে চলছিলো ৷ কিন্তু মিসরের সাধারণ ও অসাধারণ সব মানুষই প্রতিনিয়ত এসব নির্দশন দ্বারা প্রভাবিত হয়ে পড়ছে দেখে সে অস্থির হয়ে উঠলো ৷ সেই যুগেই প্রথমে সে ভরা দরবারে বক্তৃতা করে যা সূরা যুখরুফের ৫১ থেকে ৫৩ আয়াতে পূর্বেই উল্লেখিত হয়েছে (দেখুন, সূরা যুখরুফের ৪৫ থেকে ৪৯ টীকা )৷ তারপর পায়ের তলা থেকে মাটি সরে যাচ্ছে দেখে শেষ পর্যন্ত সে আল্লাহর রাসূলকে হত্যা করতে মনস্থ করে ৷ ঐ সময় হযরত মূসা (আ) সেই কথাটি বলেছিলেন যা সূরা মু'মিনের ২৭ আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে :

আরবী......................................................

"যে অহংকারী জবাবদিহির দিনের প্রতি ঈমান পোষণ করে না আমি তার থেকে আশ্রয় গ্রহণ করেছি আমার ও তোমাদের যিনি রব, তার কাছে৷"

এখানে হযরত মূসা (আ) তাঁর সেই কথা উল্লেখ করে ফেরাউন ও তার রাজকীয় সভাসদদের বলছেন, দেখো, আমি তোমাদের সমস্ত হামলার মোকাবিলার জন্য ইতিপূর্বেই আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের আশ্রয় চেয়েছি৷ এখন তোমরা আমার কোন ক্ষতি করতে পারবে না৷ তবে যদি তোমরা নিজেদের কল্যাণ কামনা করো তাহলে আমার ওপর হামলা করা থেকে বিরত থাকো৷ আমার কথা মানতে না চাইলে না মানো৷ আমাকে কখানো আঘাত করবে না৷ অন্যথায়, ভয়াবহ পরিণতির সম্মুখীন হবে৷
২০. এটা হযরত মূসা কর্তৃক তাঁর রবের কাছে পেশকৃত সর্বশেষ রিপোর্ট৷ 'এসব লোক অপরাধী' অর্থাৎ এদের অপরাধী হওয়াটা এখন অকাট্যভাবে প্রমানিত হয়ে দিয়েছে৷ এদের প্রতি আনুকূল্য দেখানো এবং এদেরকে সংশোধনের সুযোগ দানে অবকাশ আর নেই৷ এখন জনাবের চূড়ান্ত ফায়সালা দেয়ার সময় এসে গিয়েছে৷
২১. অর্থাৎ সেসব লোকে যারা ঈমান এনেছে৷ তাদের মধ্যে বনী ইসরাঈলও ছিল এবং হযরত ইউসূফের যুগ থেকে হযরত মূসার যুগের আগমন পর্যন্ত মিসরের যেসব কিবতী মুসলমান ছিল তারাও ৷আবার সেসব মিশরীয় লোকও যারা হযরত মূসার নিদর্শনসমূহ দেখে এবং তাঁর দাওয়াত ও তাবলীগে প্রভাবিত হয়ে ইসলাম গ্রহন করেছিলো ৷ (বিস্তারিত জানা জন্য দেখুন, তাফহীমুল কুরআন, সূরা ইউনুস, টীকা ৫৮)৷
২২. এটা হযরত মূসাকে হিজরতের জন্য দেয়া প্রাথমিক নির্দেশ৷ (ব্যাখ্যার জন্য দেখুন, তাফহীমুল কুরআন, সূরা ত্বাহা, টীকা ৫৩; আশ শুআরা টীকা ৩৯ থেকে ৪৭)৷
২৩. এ নির্দেশ দেয়া হয়েছিলো সেই সময় যখন হযরত মূসা তাঁর কাফেলাসহ সমুদ্র পার হয়ে গিয়েছেন এবং তিনি চাচ্ছিলেন সমুদ্রের মধ্য দিয়ে রাস্তা তৈরি হয়ে যাওয়ার আগে তা যেমন ছিল লাঠির আঘাতে পুনরায় তেমন করে দেবেন৷ যাতে মু'জিযার সাহায্যে যে রাস্তা তৈরী হয়েছে ফেরাউন ও তার সৈন্য-সামন্ত সেই রাস্তা ধরে এসে না পড়ে৷ সেই সময় বলা হয়েছিলো, তা যেন না করা হয়৷ সমুদ্রকে ঐভাবেই বিভক্ত থাকতে যাও, যাতে ফেরাউন তার সৈন্য-সামন্ত নিয়ে এই রাস্তায় নেমে আসে৷ তারপর সমুদ্রের পানি ছেড়ে দিয়ে এই গোটা সেনাবাহিনীকে ডুবিয়ে মারা হবে৷
২৪. হযরত হাসান বাসারী বলেন : এর অর্থ বনী ইসরাঈল, যাদেরকে ফেরাউনের কওমের ধ্বংসের পর আল্লাহর মিসরের উত্তরাধিকারী করেছিলেন৷ কাতাদা বলেন : এর অর্থ অন্য জাতির লোক, যারা ফেরাউনের অনুসারীদের ধ্বংস করার পরে মিসরের উত্তরাধিকারী হয়েছিলো৷ কারণ, ইতিহাসে কোথাও উল্লেখ নেই যে, মিসর থেকে বের হওয়ার পর বনী ইসরাঈলরা আর কখনো সেখানে ফিরে গিয়েছিলো এবং সে দেশের কর্তৃত্ব গ্রহণ করেছিলো৷ পরবর্তীকালের মুফাসসিরদের মধ্যেও এই মতভেদ দেখা যায়৷ (বিস্তারিত জানা জন্য দেখুন, তাফহীমুল কুরআন, সূরা আশ শুআরা, টীকা ৪৫)৷
২৫. অর্থাৎ তারা যখন শাসক ছিল তখন তাদের শ্রেষ্ঠত্বে ডঙ্কা বাজতো৷ পৃথবীতে তাদের প্রশংসা গীত প্রতিধ্বনিত হতো৷ তাদের আগে ও পিছে চাটুকারদের ভিড় লেগে থাকতো৷ তাদের এমন ভাবমূর্তি সৃষ্টি করা হতো যেন গোটা জগতই তাদের গুনাবলীর ভক্ত-অনুরক্ত, তাদের দয়া ও করুনার দানে ঋনী এবং পৃথিবীতে তাদের চেয়ে জনপ্রিয় আর কেউ নেই৷ কিন্তু যখন তাদের পতন হলো একটি চোখ থেকেও তাদের জন্য অশ্রুপাত হয়নি বরং সবাই প্রাণ ভরে এমন শ্বাস নিয়েছে যেন তার পাঁজরে বিদ্ধ কাঁটাটি বের হয়ে গিয়েছে৷ একথা সবারই জানা , তারা আল্লাহর বান্দাদের কোন কল্যাণ করেনি যে তারা তার জন্য কাঁদবে৷ আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যও কোন কাজ করেনি যে, আসমান-বাসীরা তাদের ধ্বংসের কারণে আহাজারি করবে৷ আল্লাহর ইচ্ছানুসারে যতদিন তাদেরকে অবকাশ দেয়া হয়েছে তারা পৃথিবীর বুকের ওপর দুর্বলদের অত্যাচার করেছে৷ কিন্তু তাদের অপরাধের মাত্রা সীমালংঘন করলে এমনভাবে ছুঁড়ে ফেলা হয়েছে যেমন ময়লা আবর্জনা ফেলা হয়৷