(৪৩:৫৭) আর যেই মাত্র ইবনে মারয়ামের উদাহরণ দেয়া হলো তোমার কওম হৈ চৈ শুরু করে দিলো
(৪৩:৫৮) এবং বলতে শুরু করলো : আমাদের উপাস্য উৎকৃষ্ট না সে? ৫২ তারা শুধু বিতর্ক সৃষ্টির জন্য তোমার সামনে এ উদাহরণ পেশ করেছে৷ সত্য কথা হলো, এরা মানুষই কলহ প্রিয়৷
(৪৩:৫৯) ইবনে মারয়াম আমার বান্দা ছাড়া আর কিছুই ছিল না৷ আমি তাকে নিয়ামত দান করেছিলাম এবং বনী ইসরাঈলদের জন্য আমার অসীম ক্ষমতার একটি নমুনা বানিয়েছিলাম৷৫৩
(৪৩:৬০) আমি চাইলে তোমাদের পরিবর্তে ফেরেশতা সৃষ্টি করে দিতে পারি ৫৪ যারা পৃথিবীতে তোমাদের স্থলাভিষিক্ত হবে৷
(৪৩:৬১) আর প্রকৃতপক্ষে সে তো কিয়ামতের একটি নিদর্শন৷৫৫ অতএব সে ব্যাপারে তোমরা সন্দেহ পোষণ করো না এবং আমার কথা মেনে নাও৷ এটাই সরল-সোজা পথ৷
(৪৩:৬২) শয়তান যেন তা থেকে তোমাদের বিরত না রাখে৷ ৫৬ সে তো তোমাদের প্রকাশ্য দুশমন৷
(৪৩:৬৩) ঈসা যখন সুস্পষ্ট নিদর্শনসমূহ নিয়ে এসেছিলো, বলেছিলো আমি তোমাদের কাছে হিকমত নিয়ে এসেছি যে, তোমরা যেসব বিষয়ে মতানৈক্য পোষণ করছো তার কিছু বিষয়ের তাৎপর্য প্রকাশ করবো৷ অতএব, তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং আমার আনুগত্য করো৷
(৪৩:৬৪) প্রকৃত সত্য এই যে, আল্লাহই আমার ও তোমাদের রব৷ তারই ইবাদত করো৷ এটাই সরল-সোজা পথ৷৫৭
(৪৩:৬৫) কিন্তু (তার এই সুস্পষ্ট শিক্ষা সত্ত্বেও) বিভিন্ন দল ও গোষ্ঠী পরস্পর মত পার্থক্য করলো৷ ৫৮ যারা জুলুম করেছে তাদের জন্য রয়েছে কষ্টদায়ক দিনের আযাব৷
(৪৩:৬৬) এখন এসব লোকেরা কি শুধু এ জন্যই অপেক্ষমান যে অকস্মাত এদের ওপর কিয়ামত এসে যাক এবং এরা আদৌ টের না পাক?
(৪৩:৬৭) যখন যে দিনটি আসবে তখন মুত্তাকীরা ছাড়া অবশিষ্ট সব বন্ধুই একে অপরের দুশমন হয়ে যাবে৷ ৫৯
৫২. ইতিপূর্বে এ সূরার ৪৫ আয়াতে বলা হয়েছে তোমাদের পূর্বে সে রসূলগণ অতিক্রান্ত হয়েছেন তাদের সবাইকে জিজ্ঞেস করে দেখো আমি বন্দেগী করার জন্য রহমান আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে উপাস্য মনোনীত করেছি কিনা? মক্কাবাসীদের সামনে যখন এ বক্তব্য পেশ করা হচ্ছিলো তখন এক ব্যক্তি হাদীসসমূহে যার নাম উল্লেখ করা হয়েছে আবদুল্লাহ ইবনুয যিবা'রা আপত্তি উথাপন করে বললো : "কেন খৃস্টানরা মারয়ামের পুত্র ঈসাকে খোদার পুত্র মনে করে তার ইবাদত করে কিনা? তাহলে আমাদের উপাস্যেও দোষ কি"? এতে কাফেরদের সমাবেশে হাসির রোল পড়ে গেল এবং শ্লোগান শুরু হলো, এবার আচ্ছা মত জব্দ হয়েছে, ঠিকমত ধরা হয়েছে৷ এখন এর জবাব দাও৷ কিন্তু তাদের এই বাচালতার কারণে বক্তব্যের ধারাবাহিকতা ক্ষুন্ন না করে প্রথমে তা পূর্ণ করা হয়েছে এবং তারপর আপত্তিকারীর প্রশ্নের জবাব দেয়া হয়েছে৷ (প্রকাশ থাকে যে, তাফসীর গ্রন্থসমূহে এ ঘটনা বিভিন্ন সূত্রে বর্ণনা করা হয়েছে৷ ঐ সব সূত্র সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা করার পর আমরা ওপরে যা বর্ণনা করেছি সেটিই আমাদের মতে ঘটনার সঠিক রূপ বলে প্রতিভাত হয়েছে)৷
৫৩. অসীম ক্ষমতার নমুনা বানানোর অর্থ হযরত ঈসাকে বিনা বাপে সৃষ্টি করা এবং তাঁকে এমন মু'জিযা দান করা যা না তার পূর্বে কাউকে দেয়া হয়েছিলো না পরে৷ তিনি মাটি দিয়ে পাখি তৈরি করে তাতে ফু দিতেন আর অমনি তা জীবন্ত পাখি হয়ে যেতো৷ তিনি জন্মান্ধকে দৃস্টিশক্তি দান করতেন এবং কুষ্ঠ রোগীকে সুস্থ করতেন৷ এমনকি মৃত মানুষকে পর্যন্ত জীবিত করতেন৷ আল্লাহর বাণীর তাঃপর্য হচ্ছে, শুধু অসাধারণ জন্ম এবং এসব বড় বড় মুজযার কারণে তাকে আল্লাহর দাসত্বেও উর্ধে মনে করা এবং আল্লাহর পুত্র বলে আখ্যায়িত করে তার উপাসনা করা নিতান্তই ভ্রান্তি৷ একজন বান্দা হওয়ার চেয়ে অধিক কোন মর্যাদা তার ছিল না৷ আমি তাকে আমার নিয়ামতসমূহ দিয়ে অভিসিক্ত করে আমার অসীম ক্ষমতার নমুনা বানিয়ে দিয়েছিলাম৷ (বিস্তারিত ব্যাখ্যার জন্য দেখুন, তাফহীমুল কুরআন, সূরা আল ইমরান, টীকা ৪২ থেকে ৪৪; আন নিসা, ১৯০; আল মায়েদা, টীকা ৪০,৪৬ ও ১২৭; মারয়াম, টীকা ১৫ থেকে ২২; আল আম্বিয়া, টীকা ৮৮ থেকে ৯০; আল মুমিনূন, টীকা ৪৩)৷
৫৪. আরেকটি অনুবাদ হতে পারে তোমাদের কোন কোন লোককে ফেরেশতা বানিয়ে দেবো৷
৫৫. এ আয়াতাংশের অনুবাদ এও হতে পারে যে তিনি কিয়ামত সম্পর্কে জ্ঞানের একটি মাধ্যম৷ এখানে এই মর্মে একটি প্রশ্ন দেখা দেয় যে, 'সে' শব্দ দ্বারা কি জিনিস বুঝানো হয়েছে? হযরত হাসান বাসারী এবং সাঈদ ইবনে জুবায়েরের মতে এর অর্থ 'কুরআন মজীদ'৷ অর্থাৎ কিয়ামত আসবে কুরআন মজীদ থেকে মানুষ তা জানতে পারে৷ কিন্তু এ ব্যাখ্যা পূর্বাপর প্রসঙ্গেও সাথে একেবারেই সম্পর্কহীন৷ কথার মধ্যে এমন কোন ইংগিত বর্তমান নেই যার ভিত্তিতে বলা যাবে যে এখানে কুরআনের প্রতি ইংগিত করা হয়েছে ৷ অন্য সব তাফসীরকারগন প্রায় সর্বসম্মতভাবে এ মত পোষন করেন যে, এর অর্থ হযরত ঈসা ইবনে মারয়াম এবং পূর্ব প্রসঙ্গের মধ্যে এটাই সঠিক৷ এরপর প্রশ্ন আসে, তাকে কোন অর্থে কিয়ামতের নিদর্শন অথবা কিয়ামত সম্পর্কিত জ্ঞানের মাধ্যম বলা হয়েছে? ইবনে আব্বাস, মুজাহিদ, ইকরিমা, কাতাদা, সুদ্দী, দাহহাক, আবুল আলিয়া ও আবু মালেক বলেন, এর অর্থ হয়রত ঈসা আলাইহিস সালামের দ্বিতীয় আগমন, যে সম্পর্কে বহু হাদীসে বলা হয়েছে৷ এ ক্ষেত্রে আয়াতের অর্থ হচ্ছে, তিনি দ্বিতীয় বার যখন পৃথিবীতে আগমন করবেন তখন বুঝা যাবে কিয়ামত নিকটবর্তী হয়েছে৷ কিন্তু এসব সম্মানিত ব্যক্তিবর্গের মহাসম্মান সত্ত্বেও একথা মেনে নেয়া কঠিন যে, এ আয়াতে হযরত ঈসার পুনরাগমণকে কিয়ামতের নিদর্শন অথবা সে সম্পর্কে জ্ঞান লাভের মাধ্যম বলা হয়েছে৷ কেননা, পরের বাক্যই এ অর্থ গ্রহণের পথে প্রতিবন্ধক৷ তার পুনরাগমন কিয়ামত সম্পর্কিত জ্ঞানের মাধমে শুধু তাদের জন্য হতে পারে যারা সেই যুগে বর্তমান থাকবে অথবা সেই যুগের পরে জন্ম লাভ করবে৷ মক্কার কাফেরদের জন্য তিনি কিভাবে কিয়ামত সম্পর্কিত জ্ঞানের মাধ্যম হতে পারেন যার কারণে তাদেরকে সম্বোধন করে একথা বলা সঠিক হবে যে, 'অতএব তোমরা সে ব্যাপারে সন্দেহ পোষণ করো না'৷ অতএব, অন্য কয়েকজন মুফাসসির এ আয়াতের যে ব্যাখ্যা পেশ করেছেন আমাদের মতে সেটিই সঠিক ব্যাখ্যা৷ তাদের মতে এখানে হযরত ঈসার বিনা বাপে জন্ম লাভ, মাটি দিয়ে জীবন্ত পাখি তৈরী করা এবং মৃতকে জীবিত করাকে কিয়ামতের সম্ভাবনার একটি প্রমাণ হিসাবে আখ্যায়িত করা হয়েছে৷ আল্লাহর বাণীর তাৎপর্য এই যে, যে আল্লাহ বিনা বাপে সন্তান সৃষ্টি করতে পারেন এবং যে আল্লাহর এবং বান্দা মাটির একটি কাঠামোর মধ্যে জীবন সঞ্চার করতে ও মৃতদের জীবিত করতে পারেন তিনি মৃত্যুর পর তোমাদের ও সমস্ত মানুষকে পুনরায় জীবিত করবেন তা তোমরা অসম্ভব মনে করো কেন?
৫৬. অর্থাৎ কিয়ামতের প্রতি বিশ্বাস পোষণ করা থেকে যেন বিরত না রাখে৷
৫৭. অর্থাৎ ঈসা আলাইহিস সালাম একথা কখনো বলেননি যে, আমি আল্লাহ অথবা আল্লাহর পুত্র৷ তোমরা আমার উপাসনা করো৷ অন্য সব নবী-রাসূল যে দাওয়াত দিয়েছিলেন এবং এখন মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তোমাদের যে দাওয়াত দিয়েছেন এবং এখন মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তোমাদের যে দাওয়াত দিচ্ছেন তার দাওয়াত তাই ছিল৷ (ব্যাখ্যার জন্য দেখুন, তাফহীমুল কুরআন, সূরা আল ইমরান, টীকা ৪৫ থেকে ৪৮; আন নিসা, টীকা ২১৩,২১৭ ও ২১৮; আল মায়েদা, টীকা ১০০,১৩০; মারয়াম, টীকা ২১ থেকে ২৩) ৷
৫৮. অর্থাৎ একটি গোষ্ঠী তাকে অস্বীকার করলে বিরোধিতায় এতদূর অগ্রসর হলো যে, তার প্রতি অবৈধভাবে জন্মলাভ করার অপবাদ আরোপ করলো এবং নিজেদের ধারনায় তাকে শূলি বিদ্ধ করে তবেই ক্ষান্ত হলো৷ আরেকটি গোষ্ঠী তাকে মেনে নিয়ে ভক্তি শ্রদ্ধার ক্ষেত্রে লাগামহীন বাড়াবাড়ি করে তাকে আল্লাহ বানিয়ে ছাড়লো এবং একজন মানুষের আল্লাহ হওয়ার বিষয়টি তাদের জন্য এমন জটিলতা সৃষ্টি করলো যার সমাধান করতে করতে তাদের মধ্যে অসংখ্য ছোট ছোট দলের সৃষ্টি হলো৷ (ব্যাখ্যার জন্য দেখুন, তাফহীমুল কুরআন, সূরা আন নিসা, টীকা ২১১ থেকে ২১৬; আল মায়েদা, টীকা ৩৯,৪০,১০১, ও ১৩০)৷
৫৯. অন্য কথায় কেবল সেই সব বন্ধুত্ব টিকে থাকবে যা পৃথিবীতে নেকী ও আল্লাভীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত৷ অন্য সব বন্ধুত্ব শত্রুতায় রূপান্তরিত হবে৷ আজ যারা গোমরাহী জুলুম-অত্যাচার এবং গোনাহর কাজে একে অপরের বন্ধু ও সহযোগী কাল কিয়ামতের দিন তারাই একে অপরের প্রতি দোষারোপ করবে এবং নিজেকে রক্ষার প্রচেষ্টায় ব্যস্ত হয়ে পড়বে৷ এ বিষয়টি কুরআন মজীদের বিভিন্ন জায়গায় বারবার বলা হয়েছে৷ যাতে প্রত্যেকটি মানুষ এই পৃথিবীতেই ভালভাবে ভেবেচিন্তে দেখতে সক্ষম হয় যে, কোন প্রকৃতির লোকদের বন্ধু হওয়া তাদের জন্য কল্যাণকর এবং কোন প্রকৃতির লোকদের বন্ধু হওয়া ধ্বংসাত্মক৷