(৪৩:১৬) আল্লাহ কি তার সৃষ্টির মধ্যে থেকে নিজের জন্য কন্যা বেছে নিয়েছেন এবং তোমাদের পুত্র সন্তান দিয়ে পুরস্কৃত করেছেন৷
(৪৩:১৭) অথচ অবস্থা এই যে, এসব লোক সেই দয়াময় আল্লাহর সাথে যে ধরনের সন্তানকে সম্পর্কিত করে এদের নিজেদের কাউকে যদি সেই সন্তানের জন্মলাভের সুসংবাদ দেয়া হয় তাহলে তার মুখমন্ডলে কালিমা ছেয়ে যায় এবং মন দু:খ ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে৷১৬
(৪৩:১৮) আল্লাহর ভাগে কি সেই সব সন্তান যারা অলঙ্কারাদির মধ্যে বেড়ে ওঠে এবং বিতর্ক ও যুক্তি পেশের ক্ষেত্রে নিজের লক্ষ্য পুরোপুরি সুস্পষ্ট করতেও পারে না৷১৭
(৪৩:১৯) এরা ফেরেশতাদেরকে - যারা দয়াময় আল্লাহর খাস বান্দা৷১৮ স্ত্রীলোক গন্য করেছে৷ এরা কি তাদের দৈহিক গঠন দেখেছে? ১৯ এদের সাক্ষ্য লিপিবদ্ধ করে নেয়া হবে এবং সে জন্য এদেরকে জবাবদিহি করতে হবে৷
(৪৩:২০) এরা বলে:“দয়াময় আল্লাহ যদি চাইতেন (যে আমরা তাদের ইবাদত না করি) তাহলে আমরা কখনো পূজা করতাম না ৷ ২০ এ বিষয়ে প্রকৃত সত্য এরা আদৌ জানে না, কেবলই অনুমানে কথা বলে৷
(৪৩:২১) আমি কি এর আগে এদেরকে কোন কিতাব দিয়েছিলাম (নিজেদের এই ফেরেশতা পূজার সপক্ষে) এরা যার সনদ নিজেদের কাছে সংরক্ষন করছে? ২১
(৪৩:২২) তা নয়, বরং এরা বলে, আমরা আমাদের বাপ-দাদাকে একটি পন্থার ওপর পেয়েছি, আমরা তাদেরই পদাঙ্ক অনুসরন করে করছি৷২২
(৪৩:২৩) এভাবে তোমার পূর্বে আমি যে জনপদেই কোন সতর্ককারীকে পাঠিয়েছি, তাদের স্বচ্ছল লোকেরা একথাই বলেছে, আমরা আমাদের বাপ দাদাদেরকে একটি পন্থার করতে দেখেছি৷ আমরাও তাদেরই পদাঙ্ক অনুসরন করছি৷২৩
(৪৩:২৪) প্রত্যেক নবীই তাদের বলেছেন, তোমরা তোমাদের বাপ দাদাদের যে পথে চলতে দেখেছো আমি যদি তোমাদের তার চেয়ে অধিক সঠিক রাস্তা বলে দেই তাহলেও কি তোমরা সেই পথেই চলতে থাকবে? তারা সব রসূলকে এই জবাবই দিয়েছে, যে দীনের দিকে আহবান জানানোর জণ্য তুমি প্রেরিত হয়েছো, আমরা তা অস্বীকার করি৷
(৪৩:২৫) শেষ পর্যন্ত আমি তাদেরকে মার দিয়েছি এবং দেখে নাও, অস্বীকারকারীদের পরিণাম কি হয়েছে৷
১৬. এখানে আরবের মুশরিকদের বক্তব্যের অযৌক্তিকতাকে একবারে উলংগ করে দেয়া হয়েছে৷ তারা বলতো: ফেরেশতারা আল্লাহর মেয়ে৷ তারা মেয়েদের আকৃতি দিয়ে ফেরেশতাদের মূর্তি বানিয়ে রেখেছিলো৷ এগুলোই ছিলো তাদের দেবী৷ তাদের পূজা করা হতো৷ এ কারণে আল্লাহ বলছেন: প্রথমত, যমীন ও আসমানের স্রষ্টা আল্লাহ৷ তিনিই তোমাদের জন্য এ যমীনকে দোলনা বানিয়েছেন৷ তিনিই আসমান থেকে পানি বর্ষণ করেন এবং তোমাদের উপকারার্থে তিনিই এসব জীব-জন্তু সৃষ্টি করেছেন, একথা জানা এবং মানা সত্ত্বেও তোমরা তার সাথে অন্যদের উপাস্য বানিয়ে নিয়েছো৷ অথচ তোমরা যাদের উপাস্য বানাচ্ছো তারা আল্লাহ নয় , বান্দা৷ এ ছাড়াও আরো সর্বনাশ করেছে এভাবে যে, কোন কোন বান্দাকে শুধু গুণাবলীতে নয়, আল্লাহর আপন সত্তায়ও শরীক করে ফেলেছে এবং এই আকীদা তৈরী করে নিয়েছে যে, তারা আল্লাহর সন্তান৷ তোমরা এ পর্যন্ত এসবই থেমে থাকোনি, বরং আল্লাহর জন্য এমন সন্তান স্থির করেছো যাকে তোমরা নিজেদের জন্য অপমান ও লাঞ্চনা মনে করো৷ কন্যা সন্তান জন্মলাভ করলে তোমাদের মুখ কালো হয়ে যায়৷ বড় দুঃখভারাক্রান্ত মনে তা মেনে নাও৷ এমন কি কোন কোন সময় জীবিত কন্যা সন্তনকে মাটিতে পুতে ফেলো৷ এ ধরনের সন্তান রেখেছো আল্লাহর ভাগে৷ আর তোমাদের কাছে যে পুত্র সন্তান অহংকারের বস্তু তা তোমাদের জন্য নির্দিষ্ট হয়ে গিয়েছে? এরপরও তোমরা দাবী করো, 'আমরা আল্লাহকে মেনে চলি'৷
১৭. অন্য কথায় যারা কোমল, নাজুক ও দুর্বল সন্তান তাদের রেখেছো আল্লাহর অংশে৷ আর যারা বুক টান করে ময়দানে ঝাপিয়ে পড়ার মত সন্তান তাদের রেখেছো নিজের অংশে৷এ আয়াত থেকে নারীদের গহনা ও অলংকারাদি ব্যবহারের বৈধতা প্রমানিত হয়৷ কারণ আল্লাহ তাদের জণ্য গহনা ও অলংকারকে একটি প্রকৃতিগত জিনিস বলে আখ্যায়িত করেছেন৷ হাদীসসমূহ থেকেও একথাটিই প্রমানিত হয়৷ ইমাম আহমদ, আবু দাউদ ও নাসায়ী হযরত আলী থেকে বর্ণনা করেছেন যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এক হাতে রেশম ও অপর হাতে স্বর্ণ নিয়ে বললেনঃ এ দুটি জিনিসকে পোশাক হিসেবে ব্যবহার করা আমার উম্মতের পুরুষদের জন্য হারাম৷ তিরমিযী ও নাসায়ী হযরত আবু মূসা আশআরীর বর্ণনা উদ্ধৃত করেছেন যে, নবী (সা) বলেছেনঃ রেশম ও স্বর্ণের ব্যবহার আমার উম্মতের নারীদের জন্য হালাল এবং পুরুষেদের জন্য হারাম করা হয়েছে৷ আল্লামা আবু বকর জাসসাস আহকামূল কুরআন গ্রন্থে এ মাসয়ালা সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে নীচের বর্ণনাসমূহ উদ্ধৃত করেছেন৷

হযরত আবু মূসা আশআরী বর্ণনা করেছেন, নবী (সা) বলেছেনঃ

------------------------------------আরবী

"রেশমী কাপড় এবং স্বর্ণের অলংকার পরিধান আমার উম্মতের পুরুষদের জন্য হারাম এবং নারীদের জণ্য হালাল৷"

হযরত আমর ইবনে আস বর্ণনা করেছেন, একবার দুজন মহিলা নবীর (সা) খেদমতে হাজির হলো৷ তারা স্বর্নের গহনা পরিহিত ছিল৷ তিনি তাদের বললেনঃ এর কারণে আল্লাহ তোমাদের আগুনের চুড়ি পরিধান করান তা কি তোমরা চাও? তারা বললো, না৷ নবী (সা) বললেন, তাহলে এগুলোর হক আদায় করো অর্থাৎ এর যাকাত দাও৷

হযরত আয়শার উক্তি হচ্ছে, যাকাত আদায় করা হলে অলংকার পরিধানে কোন দোষ নেই৷

হযরত উমর (রা) হযরত আবু মূসা আশআরীকে লিখেছিলেন তোমার শাসন কর্তৃত্বাধীন অঞ্চলে যেসব মুসলিম মহিলা আছে তাদেরকে তাদের অলংকারাদির যাকাত দেবার নির্দেশ দাও৷

আমর ইবনে দীনারের বরাত দিয়ে ইমাম আবু হানিফা বর্ণনা করেছেন যে, হযরত আয়েশা তার বোনদের এবং হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা) তার মেয়েদেরকে স্বর্নের অলংকার পরিয়েছিলেন৷

এসব বর্ণনা উদ্ধৃত করার পর আল্লামা জাসসাস লিখছেন: নারীদের জণ্য স্বর্ণ ও রেশম হালাল হওয়ার সপক্ষে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যেসব হাদীস আছে সেগুলো নাজায়েয হওয়া সম্পর্কিত হাদীসসমূহ থেকে অধিক মশহুর ও সুস্পষ্ট৷ উপরোল্লেখিত আয়াতও জায়েয হওয়াই প্রমাণ করছে৷ তাছাড়া নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং সাহাবাদের যুগ থেকে আমাদের যুগ (অর্থাৎ চতুর্দশ শতাব্দীর শেষ যুগ) পর্যন্ত গোটা উম্মতের কার্যধারাও তাই আছে৷ এ ব্যাপারে কেউ কোন আপত্তি উত্থাপন করেনি৷ এ ধরনের মাসয়ালা সম্পর্কে "আখবারে আহাদের" ভিত্তিতে কোন আপত্তি গ্রহণ করা যেতে পারে না৷
১৮. অর্থাৎ পুরুষ বা নারী কোনটাই নয়৷ বক্তব্যের ধরন থেকে আপনা আপনি এ অর্থ প্রকাশ পাচ্ছে৷
১৯. আরেকটি অনুবাদ এও হতে পারে, "এরা কি তাদের সৃষ্টির সময় উপস্থিত ছিল?"
২০. নিজেদের গোমরাহীর ব্যাপারে এটা ছিল তাদের "তাকদীর" থেকে প্রশান পেশ৷ এটা অন্যায়কারীদের চিরকালীন অভ্যাস৷ তাদের যুক্তি ছিল এই যে, আল্লাহ আমাদের করতে দিয়েছেন বলেই তো ফেরেশতাদের ইবাদত করা আমদের পক্ষে সম্ভব হয়েছে ৷ তিনি যদি না চাইতেন তাহলে আমরা কি করে এ কাজ করতে পারতাম? তাছাড়া দীর্ঘদিন থেকে আমাদের এখানে এ কাজ হচ্ছে, কিন্তু আল্লাহর পক্ষ থেকে সে জন্য কোন আযাব নাযিল হয়নি৷ এর অর্থ, আমাদের এ কাজে আল্লাহর কাছে অপছন্দনীয় নয়৷
২১. অর্থাৎ নিজেদের অজ্ঞতার কারণে এসব লোক মনে করে পৃথিবীতে যা হচ্ছে তা যেহেতু আল্লাহর অনুমোদনের অধীনে হচ্ছে, তাই এতে আল্লাহর সম্মতি বা স্বীকৃতি আছে৷ অথচ এ ধরনের যুক্তি যদি সঠিক হয় তাহলে পৃথিবীতে তো শুধু শিরকই হচ্ছে না , চুরি, ডাকাতি, খুন , ব্যভিচার, ঘুষ, প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ এবং এ ধরনের আরো অসংখ্য অপরাধও সংঘটিত হচ্ছে যেগুলোকে কোন ব্যক্তি নেকী ও কল্যাণ মনে করে না৷ তাছাড়া এ ধরনের যুক্তি প্রমানের ভিত্তিতে কি একথাও বলা যাবে যে, এ কাজ সবই হালল ও পবিত্র৷ কারণ, আল্লাহ তার পৃথিবীতে এসব কাজ হতে দিচ্ছেন ৷ আর তিনি যখন এসব হতে দিচ্ছেন তখন অবশ্যই তিনি এসব পছন্দ করেন? পৃথিবীতে যেসব ঘটনা ঘটছে সেগুলো আল্লাহর পছন্দ অপছন্দ জানার মধ্যম নয় ৷ বরং এ মাধ্যম হচ্ছে আল্লাহর কিতাব, যা তার রসূলের মাধ্যমে আসে৷ আল্লাহ কোন ধরনের আকীদা - বিশ্বাস, কাজকর্ম ও চরিত্র পছন্দ করেন এবং কোন ধরনের পছন্দ করেন না তা এই কিতাবে তিনি নেজেই বলে দিয়েছেন৷ অতএব, এসব লোকের কাছে কুরআনের পূর্বে আগত এমন কোন কিতাব যদি বর্তমান থাকে যেখানে আল্লাহ বলেছেন, আমর সাথে ফেরেশতারাও তোমাদের উপাস্য, তাদের ইবাদত করাও তোমাদের উচিত, তাহলে এরা তার প্রমাণ দিক৷(আরো ব্যাখ্যার জন্য দেখুন, তাফহীমূল কুরআন, সূরা আল আন'আম, টীকা ৭১,৭৯,৮০,১১০,১২২,১২৫;আল আ'রাফ, টীকা১৬; ইউনুস টীকা ১০১; হূদ, টীকা ১১৬; আর রা'দ টীকা ৪৫; আন নাহাল, টীকা ১০,৩১,৯৪; আয যুমার, টীকা ২০; আশ শূরা, টীকা ১১) ৷
২২. অর্থাৎ আল্লাহর কিতাবের কোন সনদ তাদের কাছে নেই৷ শুধু এই সনদই আছে যে বাপ দাদা থেকে এরূপই হয়ে আসছে৷ তাই তাদের অন্ধ অনুসরন করতে গিয়ে ফেরেশতাদের দেবী বানিয়ে নিয়েছে৷
২৩. এটি অত্যন্ত গভীরভাবে ভেবে দেখার বিষয় যে, প্রত্যেক যুগে জাতির সচ্ছল শ্রেণীর লোকেরাই শুধু নবী-রসূলদের বিরুদ্ধে বাপ-দাদার অন্ধ অনুকরনের ঝান্ডাবাহী কেন হয়েছে? ন্যায় ও সত্যের বিরোধিতায় এরাই অগ্রগামী হয়েছে, এরাই প্রতিষ্ঠিত জাহেলিয়াতকে টিকিয়ে রাখার প্রচেষ্টায় তৎপর থেকেছে এবং জনগনকে বিভ্রান্ত ও উত্তেজিত করে নবী -রসূলদের বিরুদ্ধে ফিতনা সৃষ্টি এরাই করে এসেছে এর কারণ কি? এর মূল কারণ ছিল দুটি৷ একটি হচ্ছে, সুখী ও সচ্ছল শ্রেণী আপন স্বার্থ উদ্ধার ও তা ভোগ করার নেশায় এমনই ডুবে থাকে যে, তাদের মতে তারা হক ও বাতিলের এই অপ্রাসংগিক বিতর্কে মাথা ঘামানোর জন্য প্রস্তুত থাকে না৷ তাদের আরাম প্রিয়তা এবং বুদ্ধিবৃত্তিক বিলাসিতা দীনের ব্যাপারে তাদেরকে অত্যন্ত নির্লিপ্ত ও নিষ্পৃহ এবং সাথে সাথে কার্যত রক্ষনশীল বানিয়ে দেয় যাতে প্রতিষ্ঠিত যে অবস্থা পূর্ব থেকেই চলে আসছে হক হোক বা বাতলি হোক তাই যেন হুবহু প্রতিষ্ঠিত থাকে এবং কোন নতুন আদর্শ সম্পর্কে চিন্তা করার কষ্ট না করতে হয়৷ অপরটি হচ্ছে, প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থার সাথে তাদের স্বার্থ ওতপ্রোতোভাবে জড়িত থাকে৷ নবী-রসূল আলাইহিমুস সালামদের পেশকৃত আদর্শ দেখে প্রথম দৃষ্টিতেই তারা বুঝে নেয় যে, এটা প্রতিষ্ঠিত হলে তাদের মাতব্বরির পার্টও চুকিয়ে দেবে এবং তাদের হারামখুরী ও হারাম কর্ম করার স্বাধীনতা থাকবে না৷ (আরো ব্যাখ্যার জন্য দেখুন, তাফহীমূল কুরআন, আল আন'আম টীকা ৯১; আল আ'রাফ, টীকা ৪৬, ৫৩, ৫৮, ৭৪, ৮৮, ৯২;হূদ টীকা ৩১, ৩২, ৪১; বাণী ইসরাঈল, টীকা ৮১; আল মু'মিনুন, টীকা ২৬,২৭, ৩৫, ৫৯; সূরা সাবা, আয়াত ৩৪, টীকা ৫৪)৷