(৪৩:১) হা-মীম৷
(৪৩:২) এই সুস্পষ্ট কিতাবের শপথ৷
(৪৩:৩) আমি একে আরবী ভাষার কুরআন বানিয়েছি যাতে তোমরা তা বুঝতে পারো৷
(৪৩:৪) প্রকৃতপক্ষে এটা মূল কিতাবে লিপিবদ্ধ আছে যা আমার কাছে অত্যন্ত উচুঁ মর্যাদা সম্পন্ন ও জ্ঞানে ভরা কিতাব৷
(৪৩:৫) তোমরা সীমালংঘনকারী, শুধু এ কারণে কি আমি তোমাদের প্রতি অসন্তুষ্ট হয়ে উপদেশমূলক শিক্ষা পাঠানো পরিত্যাগ করবো?
(৪৩:৬) পূর্ববর্তী জাতিসমূহের মধ্যেও আমি বার বার নবী পাঠিয়েছি৷
(৪৩:৭) এমন কখনো ঘটেনি যে তাদের কাছে কোন নবী এসেছে৷ কিন্তু তাকে বিদ্রুপ করা হয়নি৷
(৪৩:৮) যারা এদের চাইতে বহুগুনে শক্তিশালী ছিল তাদেরকে আমি ধ্বংস করে দিয়েছি ৷ পূর্ববর্তী জাতিসমূহের উদাহরণ অতীত হয়ে গিয়েছে৷
(৪৩:৯) তোমরা যদি এসব লোকদের জিজ্ঞেস করো, যমীন ও আসমান কে সৃস্টি করেছে, তাহলে এরা নিজেরাই বলবে, ঐগুলো সেই মহাপরাক্রমশালী ও মহাজ্ঞানী সত্তা সৃষ্টি করেছেন৷
(৪৩:১০) তিনিই তো সৃষ্টি করেছেন যিনি পৃথিবীকে তোমাদের জন্য দোলনা বানিয়েছেন এবং সেখানে তোমাদের জন্য রাস্তা তৈরী করে দিয়েছেন৷ যাতে তোমাদের গন্তব্যস্থলের পথ খুজেঁ পাও৷
(৪৩:১১) যিনি আসমান থেকে একটি বিশেষ পরিমানে পানি বর্ষণ করেছেন ১০ এবং তার সাহায্যে মৃত ভূমিকে জীবিত করে তুলেছেন৷ তোমাদের এভাবেই একদিন মাটির ভেতর থেকে বের করে আনা হবে৷১১
(৪৩:১২) তিনিই সেই মহান সত্তা যিনি সমস্ত জোড়া সৃষ্টি করেছেন৷১২ যিনি তোমাদের জন্য নৌকা - জাহাজ এবং জীব -জন্তুকে সওয়ারি বানিয়েছেন যাতে তোমরা তার পিঠে আরোহণ করো
(৪৩:১৩) এবং পিঠের ওপর বসার সময় তোমাদের রবের ইহসান স্মরন করে বলোঃ পবিত্র সেই সত্তা যিনি আমাদের জন্য এসব জিনিসকে অনুগত করে দিয়েছেন৷ তা না হলে এদের আয়ত্বে আনার শক্তি আমাদের ছিল না৷ ১৩
(৪৩:১৪) এক দিন আমাদের রবের কাছে আমাদের ফিরে যেতে হবে৷১৪
(৪৩:১৫) (এসব কিছু জানা এবং মানার পরেও) এসব লোক তার বান্দাদের মধ্য থেকেই কোন কোন বান্দাকে তার অংশ বানিয়ে দিয়েছে৷১৫ প্রকৃত সত্য এই যে, মানুষ সুস্পষ্ট অকৃতজ্ঞ৷
১. যে বিষয়টির জন্য কুরআন মজীদের শপথ করা হয়েছে তা হচ্ছে এ গ্রন্থের রচয়িতা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নন, "আমি"৷ আর শপথ করার জন্য কুরআনের যে বৈশিষ্টটি বেছে নেয়া হয়েছে তা হচ্ছে, 'কিতাবুম মুবীন'৷ কুরআন যে আল্লাহর বাণী এ বৈশিষ্টের জন্য কুরআনেরই শপথ করা স্বতই এ অর্থ প্রকাশ করে যে, হে লোকজন, এই সুস্পষ্ট কিতাব তোমাদের সামনে বিদ্যমান৷ চোখ মেলে তা দেখো; এর সুস্পষ্ট দ্ব্যর্থহীন বিষয়বস্তু, এর ভাষা, এর সাহিত্য, এর সত্য ও মিথ্যার মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য সূচনাকার শিক্ষা, সব কিছুই এ সত্যের সাক্ষ্য পেশ করছে যে, আল্লাহ ছাড়া এর রচয়িতা আর কেউ হতে পারে না৷ অতপর বলা হয়েছে, 'আমি একে আরবী ভাষার কুরআন বানিয়েছি যাতে তোমরা তা উপলদ্ধি করো৷ এর দু'টি অর্থ হতে পারে৷ এক- এ কুরআন অন্য কোন ভাষায় নয়, বরং তোমাদের নিজেদের ভাষায় রচিত হয়েছে৷ তাই এর যাচাই বাছাই এবং মর্যাদা ও মূল্য নির্ণয় করতে তোমাদের কোন কষ্ট হওয়ার কথা নয়৷ এটা যদি আরবী ছাড়া অন্য কোন ভাষায় হতো তাহলে এই বলে তোমরা ওজর পেশ করতে পারতে যে, এটা আল্লাহর বাণী কিনা তা আমরা কিভাবে পরখ করবো৷ কারণ, এ বাণী বুঝতেই আমরা অক্ষম৷ কিন্তু আরবী ভাষার এই কুরআন সম্পর্কে তোমরা এ যুক্তি কি করে পেশ করবে? এর প্রতিটি শব্দ তোমাদের কাছে পরিষ্কার৷ ভাষা ও বিষয়বস্তু উভয়দিক থেকে এর প্রতিটি বাক্য তোমাদের কাছে সুস্পষ্ট৷ এটা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কিংবা অন্য কোন আরবী ভাষাভাষীর বাণী হতে পারে কিনা তা নিজেরা বিচার করে দেখো৷ এই বাণীর দ্বিতীয় অর্থটি হচ্ছে, আমি এই কিতাবের ভাষা আরবী রেখেছি এই জন্য যে, আমি আরব জাতিকে সম্বোধন করে কথা বলছি৷ আর তারা কেবল আরবী ভাষায় কুরআনই বুঝতে সক্ষম৷ আরবী ভাষায় কুরআন নাযিল করার এই সুস্পষ্ট যুক্তিসঙ্গত কারণ উপেক্ষা করে শুধু মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মাতৃভাষা আরবী হওয়ার কারণে একে আল্লাহর বাণী না বলে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাণী বলে যারা আখ্যায়িত করে তারা বড়ই জুলুম করে৷ (এই দ্বিতীয় অর্থটি বুঝার জন্য দেখুন, তাফহীমুল কুরআন, সূরা হা-মীম আস সাজদার ৪৪ আয়াত ৫৪ নং টীকা সহ)৷
২. আরবী------অর্থ------আরবী-----অর্থাৎ সেই কিতাব যেখান থেকে সমস্ত নবী-রসূলদের প্রতি নাযিলকৃত কিতাবসমূহও গৃহীত হয়েছে৷ সূরা ওয়াকিয়ায় এ কিতাবকেই --আরবী-- (গোপন ও সুরক্ষিত কিতাব) বলা হয়েছে এবং সূরা বুরুজে এ জন্য 'লওহে মাহফুজ' শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে৷ অর্থৎ এমন ফলক যার লেখা মুছে যেতে পারে না এবং যা সবরকম প্রক্ষেপন ও হস্তক্ষেপ থেকে মুক্ত৷ কুরআন সম্পর্কে ----আরবী------এ লিপিবদ্ধ আছে একথা বলে একটি অতিব গুরুত্বপূর্ণ সত্য সম্পর্কে সতর্ক করে দেয়া হয়েছে৷ আল্লাহর পক্ষ থেকে বিভিন্ন যুগে বিভিন্ন দেশ ও জাতিকে হিদায়াতের জন্য নবী -রসূলদের কাছে বিভিন্ন ভাষায় কিতাব নাযিল করা হয়েছে৷ কিন্তু সব কিতাবে একই আকীদা -বিশ্বাসের প্রতি দাওয়াত দেয়া হয়েছে, একই সত্যকে ন্যায় ও সত্য বলা হয়েছে, ভাল ও মন্দের একই মানদণ্ড পেশ করা হয়েছে নৈতিকতা ও সভ্যতার একই নীতি বর্ণনা করা হয়েছে এবং এসব কিতাব যে দীন পেশ করেছে তা সবদিক দিয়ে একই দীন৷ কারণ, এ দীনের মূল ও উৎস এক, শুধু ভাষা ও বর্ণনা ভংগি ভিন্ন৷ একই অর্থ যা আল্লাহর কাছে একটি মূল গ্রন্থে লিপিবদ্ধ আছে৷ যখনই প্রয়োজন দেখা দিয়েছে তিনি কোন নবী পাঠিয়েছেন এবং পরিবেশ ও অবস্থা অনুসারে সেই অর্থ একটি বিশেষ বাক্যে ও বিশেষ ভাষায় পাঠিয়ে দিয়েছেন৷ ধরা যাক, আল্লাহ যদি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আরব ছাড়া অন্য কোন জাতির মধ্যে পয়দা করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতেন তাহলে তিনি এই কুরআনকে সেই জাতির ভাষায় মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর নাযিল করতেন৷ সেই জাতি এবং দেশের পরিবেশ পরিস্থিতি অনুসারেই তাতে বক্তব্য পেশ করা হতো৷ বাক্যসমূহ ভিন্ন ধাঁচের হতো ভাষাও ভিন্ন হতো, কিন্তু শিক্ষা ও নির্দেশনা মৌলিকভাবে এটাই থাকতো৷ সেটাও এই কুরআনের মতই কুরআন হতো, যদিও আরবী কুরআন হতো না ৷ সূরা শুআরাতে এই এ বিষয়টিই এভাবে বলা হয়েছেঃ

-----------------------------------আরবী

"এটা রব্বূল আলামীরে নাযিলকৃত কিতাব......... পরিষ্কার আরবী ভাষায়৷ আর এটি পূর্ববর্তী লোকদের কিতাবসমূহেও বিদ্যমান৷" (ব্যাখ্যার জন্য দেখুন, তাফহীমূল কুরআন, সূরা শু'আরা, টীকা ১১৯-১২১)
৩. এ আয়াতাংশের সম্পর্ক ----আরবী------ও-----আরবী----- উভয়ের সাথে৷ অর্থাৎ এটি এক দিকে কুরআনের পরিচয় এবং অন্যদিকে উম্মূল কিতাবেরও পরিচয় যেখান থেকে কুরআন গৃহীত বা উদ্ধৃত হয়েছে ৷কুরআনের এই পরিচিত দানের মাধ্যমে মন-মগজে একথাই বদ্ধমূল করে দেয়া উদ্দেশ্য যে, কেউ যদি তার অজ্ঞতার কারণে এ কিতাবের মূল্যে ও মর্যাদা উপলব্দি না করে এবং এর জ্ঞান গর্ভ শিক্ষা দ্বারা উপকৃত না হয় তাহলে সেটা তার নিজের দুর্ভাগ্য৷ কেউ যদি এর মর্যাদা খাটো করার প্রয়াস পায় এবং এর বক্তব্যের মধ্যে ত্রুটি অন্বেষণ করে তাহলে সেটা তার নিজের হীনমন্যতা৷ কেউ একে মর্যাদা না দিলেই এটা মূল্যহীন হতে পারে না এবং কেউ গোপন করতে চাইলেই এর জ্ঞান ও যুক্তি গোপন হতে পারে না৷ এটা স্বস্থানে একটি উচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন কিতাব যাকে এর অতুলনীয় শিক্ষা, মু'জিযাপূর্ণ বাগ্মিতা, নিষ্কলুষ জ্ঞান এবং এর রচিয়তার আকাশচুম্বী ব্যক্তিত্ব উচ্চে তুলে ধরেছে৷ তাই কেউ এর অবমূল্যায়ণ করলে তা কি করে মূল্যহীন হতে পারে৷ পরে ৪৪ আয়াতে কুরাইশদের বিশেষভাবে এবং আরববাসীদের সাধারণভাবে বলা হয়েছে যে, এভাবে তোমরা যে কিতাবের বিরোধিতা করছো তার নাযিল হওয়াটা তোমাদের মর্যাদা লাভের একটি বড় সুযোগ এনে দিয়েছে ৷ তোমরা যদি এই সুযোগ হাতছাড়া করো তাহলে তোমাদের আল্লাহর কাছে কঠোর জবাবদিহি করতে হবে৷ (দেখুন, টীকা ৩৯)
৪. মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নবুওয়াত ঘোষণার সময় থেকে এ আয়াতগুলো নাযিল হওয়া পর্যন্ত বিগত কয়েক বছরে যেসব ঘটনা সংঘটিত হয়েছে তার পুরো কাহিনী এই আয়াতাংশে একত্রে বিবৃত করা হয়েছে৷ আয়াতাংশটি আমাদের সামনে এই চিত্রই ফুটিয়ে তোলে যে, একটি জাতি শত শত বছর ধরে চরম অজ্ঞতা, অধপতন ও দুরবস্থার মধ্যে নিমজ্জিত৷ আল্লাহর পক্ষ থেকে হঠাৎ তার ওপর করুনার দৃষ্টি পড়ছে৷ তিনি তাদের মধ্যে একজন সর্বশ্রেষ্ট নেতার জন্ম দিচ্ছেন এবং তাদেরকে অজ্ঞতার অন্ধকার থেকে উদ্ধার করার জন্য তার নিজের বাণী পাঠাচ্ছেন৷ যাতে তারা অলসতা ঝেড়ে জেগে ওঠে, জাহেলী কুসংস্কারের আবর্ত থেকে বেরিয়ে আসে এবং পরম সত্য সম্পর্কে অবহিত হয়ে জীবনে চলার সটিক পথ অবলম্বন করে৷ কিন্তু সেই জাতির নির্বোধ লোকেরা এবং তার স্বার্থপর গোত্রপতিরা সেই নেতার বিরুদ্ধে উঠে পড়ে লাগছে এবং তাকে ব্যর্থ করে দেয়ার জন্য সর্বশক্তি নিয়োগ করছে৷ যতই বছরের পর বছর অতিক্রান্ত হচ্ছে তাদের দুষ্কর্ম ততই বেড়ে যাচ্ছে৷ এমনকি তারা তাকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছে৷ ঠিক এই পরিস্থিতিতে বলা হচ্ছে, তোমাদের এই অযোগ্যতার কারণে কি আমি তোমাদের সংস্কার ও সংশোধনের প্রচেষ্টা পরিত্যাগ করবো? উপদেশ দানের এই ধারাবাহিকতা বন্ধ করবো? এবং শত শত বছর ধরে তোমরা যে অধপতনের মধ্যে পড়ে আছ সেই অধপতনের মধ্যেই পড়ে থাকতে দেব? তোমাদের কাছে আমার রহমতের দাবি কি এটাই হওয়া উচত? তোমরা কি কখনো ভেবে দেখেছো, আল্লাহর অনুগ্রহ প্রত্যাখ্যান করা এবং ন্যায় ও সত্য সামনে এসে যাওয়ার পর বাতিলকে আঁকড়ে থাকা তোমাদের কেমন পরিণতির সম্মুখীন করবে?
৫. অর্থাৎ এই নিরর্থক ও অযৌক্তিক কাজকর্ম যদি নবী এবং কিতাব প্রেরণের পথে প্রতিবন্ধক হতো তাহলে কোন জাতির কাছে কোন নবী আসতো না এবং কোন কিতাবও পাঠানো হতো না৷
৬. অর্থাৎ বিশিষ্ট লোকদের অযৌক্তিক আচরনের ফলে গোটা মানব জাতিকে নবুওয়াত ও কিতাবের পথ নির্দেশনা থেকে বঞ্চিত করা হবে এমন ঘটনা কখনো ঘটেনি৷ বরং সর্বদাই এর ফলাফল দাঁড়িয়েছে এই যে, যারাই বাতিল পরস্তির নেশায় এবং নিজেদের শক্তির গর্বে উম্মত্ত হয়ে নবী-রসূলদের বিদ্রুপ ও হেয় প্রতিপন্ন করা থেকে বিরত হয়নি, শেষ পর্যন্ত তাদেরকে ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে৷ তখন যে শক্তির বলে এই কুরাইশদের ছোট ছোট এসব নেতা ঔদ্ধত্য প্রকাশ করছে৷ তাদের চেয়ে হাজার গুণ অধিক শক্তির অধিকারীদেরকে মশামাছির ন্যায় পিষে ফেলা হয়েছে৷
৭. অন্যান্য স্থানে তো পৃথিবীকে বিছানা বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে৷ কিন্তু এখানে তার পরিবর্তে দোলনা শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে৷ অর্থাৎ একটি শিশু যেভাবে তার দোলনার মধ্যে আরামে শুয়ে থাকে মহাশূন্যে ভাসমান এই বিশাল গ্রহকে তোমাদের জণ্য তেমনি আরামের জায়গা বানিয়ে দিয়েছেন৷ এটি তার অক্ষের ওপর প্রতি ঘন্টায় এক হাজার মাইল গতিতে ঘুরছে এবং প্রতি ঘন্টায় ৬৬,৬০০ মাইল গতিতে ছুটে চলছে৷এর অভ্যন্তরে রয়েছে এমন আগুন যা পাথরকেও গলিয়ে দেয় এবং আগ্নেয় গিরির আকারে লাভা উদগীরণ করে কখনো কখনো তোমাদেরও তার ভয়াবহতা টের পাইয়ে দেয়৷ কিন্তু এসব সত্ত্বেও তোমাদের স্রষ্টা তাকে এতটা সুশান্ত বানিয়ে দিয়েছেন যে, তোমরা আরামে তার ওপর ঘুমাও অথচ ঝাকুনি পর্যন্ত অনুভব করো না৷ তোমরা তার ওপরে বসবাস করো কিন্তু অনুভব পর্যন্ত করতে পার না এটি মহাশূন্যে ঝুলন্ত গ্রহ আর তোমরা তাতে পা ওপরে ও মাথা নীচের দিকে দিয়ে ঝুলছো৷ তোমরা এর পিঠের ওপরে আরামে ও নিরাপদে চলাফেরা করছো অথচ এ ধারণা পর্যন্ত তোমাদের নেই যে, তোমরা বন্দুকের গুলীর চেয়ে দ্রুতগতি সম্পন্ন গাড়ীতে সওয়ার হয়ে আছো৷ বিনা দ্বিধায় তাকে খনন করছো, তা বুক চিরছো এবং নানাভাবে তার পেট থেকে রিযিক হাসিল করছো অথচ কখনো কখনো ভূমিকম্পের আকারে তার অতি সাধারন কম্পনও তোমাদের জানিয়ে দেয় এটা কত ভয়ংকর দৈত্য যাকে আল্লাহ তোমাদের জন্য অনুগত করে রেখেছেন (আরো ব্যাখ্যার জন্য দেখূন, তাফহীমূল কুরআন, আন নামল, টীকা ৭৪-৭৫)
৮. ভূ-পৃষ্ঠে পাহাড়ের মাঝে গিরিপথ এবং পাহাড়ী ও সমতল ভূমি অঞ্চলে নদী হচ্ছে সেই সব প্রাকৃতিক পথ যা আল্লাহ তৈরী করেছেন৷ এসব পথ ধরেই মানুষ পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েছে৷ পর্বত শ্রেনীকে যদি কোন ফাঁক ছাড়া একেবারে নিশ্ছিদ্র প্রাচীরের মত করে দাঁড় করানো হতো এবং ভূ-পৃষ্ঠের কোথাও কোন সমুদ্র, নদী-নালা না থাকতো তাহলে মানুষ যেখানে জন্ম গ্রহণ করেছিলো সেখানেই আবদ্ধ হয়ে পড়তো৷ আল্লাহ আরো অনুগ্রহ করেছেন এই যে, তিনি গোটা ভূ-ভাগকে একই রকম করে সৃষ্টি করেননি, বরং তাতে নানা রকমের এমন সব পার্থক্য সূচক চিহ্ন (Land marks) রেখে দিয়েছেন যার সাহায্যে মানুষ বিভিন্ন এলাকা চিনতে পারে এবং এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলের পার্থক্য উপলদ্ধি করতে পারে৷ এটা আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায় যার সাহায্যে পৃথিবীতে মানুষের চলাচল সহজ সাধ্য হয়েছে৷ মানুষের যখন বিশাল কোন মরুভূমিতে যাওয়ার সুযোগ হয়, যেখানে মাইলের পর মাইল এলাকায় কোন পার্থক্যসূচক চিহ্ন থাকে না৷ এবং মানুষ বুঝতে পারে না সে কোথা থেকে কোথায় এসে পৌঁছেছে এবং সামনে কোন দিকে যেতে হবে তখন সে এই নিয়ামতের মর্যাদা বুঝতে পারে৷
৯. এ আয়াতাংশ একই সাথে দুটি অর্থ প্রকাশ করছে৷ একটি হচ্ছে, এসব প্রাকৃতিক রাস্তা ও রাস্তার চিহ্নসমূহের সাহয্যে তোমরা তোমাদের পথ চিনে নিতে পার এবং যেখানে যেতে চাও সেখানে পৌছতে পার৷ আরেকটি অর্থ হচ্ছে, মহিমান্বিত আল্লাহর এসব কারিগরি দেখে হিদায়াত লাভ করতে পার৷ প্রকৃত সত্য লাভ করতে পার এবং বুঝতে পার যে, পৃথিবীতে আপনা থেকেই এ ব্যবস্থা হয়ে যায়নি, বহু সংখ্যক খোদা মিলেও এ ব্যবস্থা করেনি, বরং মহাজ্ঞানী এক পালনকর্তা আছেন যিনি তার বান্দাদের প্রয়োজনের প্রতি লক্ষ্য রেখে পাহাড় ও সমতল ভূমীতে এসব রাস্তা বানিয়েছেন এবং পৃথিবীর একেকটি অঞ্চলকে অসংখ্য পন্থায় ভিন্ন ভিন্ন আকৃতি দান করেছেন যার সাহায্যে মানুষ এক অঞ্চলকে আরেক অঞ্চল থেকে আলাদা করে চিনতে পারে৷
১০. অর্থাৎ প্রত্যেক অঞ্চলের জন্য বৃষ্টির একটা গড় পরিমাণ নির্ধারণ করেছেন যা দীর্ঘকাল প্রতি বছর একই ভাবে চলতে থাকে৷ এ ক্ষেত্রে এমন কোন অনিয়ম নেই যে কখনো বছরে দুই ইঞ্চি বৃষ্টিপাত হবে আবার কখনো দুইশ ইঞ্চি হবে৷ তাছাড়াও তিনি বিভিন্ন মওসুমের বিভিন্ন সময়ে বৃষ্টিকে বিক্ষিপ্ত করে এমনভাবে বর্ষণ করেন সাধারণত তা ব্যাপক মাত্রায় ভূমির উৎপাদন ক্ষমতার জন্য উপকারী হয়৷ এটাও তার জ্ঞান ও কৌশলেরই অংশ যে, তিনি ভূ-পৃষ্ঠের কিছু অংশকে প্রায় পুরোপুরিই বৃষ্টি থেকে বঞ্চিত করে পানি ও লতাগুল্ম শূণ্য মরুভূমি বানিয়ে দিয়েছেন এবং অপর কিছু অঞ্চলে কখনো দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি করেন আবার কখনো ঝড়ো হাওয়াসহ বৃষ্টি বর্ষণ করেন, যাতে ব্যক্তি বুঝতে পারে যে, পৃথিবীর বিভিন্ন বসতি এলাকার জন্য বৃষ্টিপাত ও তা নিয়মিত হওয়া কত বড় নিয়ামত৷ তাছাড়া একথাও যেন তার স্মরণ থাকে যে, এই ব্যবস্থা অন্য কোন শক্তির নির্দেশনা মোতাবেক চলছে যার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কোন কিছুই কার্যকরী হয় না৷ একটি দেশে বৃষ্টিপাতের যে সাধারণ গড় তা পরিবর্তন কিংবা পৃথিবীর ব্যাপক এলাকায় তারবণ্টন হারে কোন পার্থক্য সৃষ্টি করা, অথবা কোন আগমনোদ্যত তুফানকে রোধ করতে পারা বা কোন বিমুখ বৃষ্টিকে খাতির তোয়াজ করে নিজ দেশের দিকে টেনে আনা এবং বর্ষনে বাধ্য করার সাধ্য কারোর নেই৷ আরো ব্যাখ্যার জন্য দেখ্যন, তাফহীমূল কুরআন , সূরা আল হিজর, আয়াত ১৯ থেকে ২২ টীকাসহ, আল মু'মিনূন, টীকা ১৭, ১৮)৷
১১. এখানে পানির সাহয্যে ভূমির উৎপাদন ক্ষমতা সৃষ্টিকে এক সাথে দুটি জিনিসের প্রমান হিসেবে পেশ করা হয়েছে৷ এক-এ কাজটি যিনি এক মাত্র আল্লাহ তাঁর জ্ঞান ও কুদরত দ্বারা হচ্ছে৷ আল্লাহর এই সার্বভৌম কর্তৃত্বে অন্য কেহ তার শরীক নয়৷ দুই- মৃত্যুর পরে পুনরায় জীবন হতে পারে এবং হবে৷ (আরো ব্যাখ্যার জন্য দেখুন, তাফহীমূল কুরআন, আন নাহল, টীকা৫৩ (ক); আল হাজ্জ, টীকা ৭৯; আন নামল টীকা৭৩; আর রূম ; টীকা ২৫,৩৪ ও ৩৫; সূরা ফাতের,টীকা ১৯, সূরা ইয়াসীন, টীকা ২৯)৷
১২. জোড়া অর্থ শুধু মানব জাতির নারী ও পুরুষ এবং জীব জন্তু ও উদ্ভিদরাজীর নারী-পুরুষে জোড়াই বুঝানো হয়নি, বরং আল্লাহর সৃষ্ট আরো অসংখ্য জিনিসের জোড়া সৃষ্টির বিষয়ও বুঝানো হয়েছে যাদের পারস্পরিক সংমিশ্রনে পৃথিবীতে নতুন নতুন জিনিসের উৎপত্তি হয়৷ যেমনঃ উপাদানসমূহের মধ্যে কোনটি কোনটির সাথে খাপ খায় এবং কোনটি কোনটির সাথে খাপ খায় না৷ যেগুলো পরস্পর সংযোজন ও সংমিশ্রন ঘটে সেগুলোর মিশ্রনে নানা রকম বস্তুর উদ্ভব ঘটছে৷ যেমন বিদ্যুৎ শক্তির মধ্যে ইতিবাচক ও নেতিবাচক বিদ্যুৎ একটি আরেকটির জোড়া৷ এ দুটির পারস্পরিক আকর্ষণ পৃথিবীতে বিস্ময়কর ও অদ্ভূত সব ক্রিয়াকান্ডের কারণ হচ্ছে৷ এটি এবং এ ধরনের আরো অগনিত জোড়া যা আল্লাহ নানা ধরনের সৃষ্টির মধ্যে পয়দা করেছেন, এদের আকৃতি কাঠামো, এদের পারস্পরিক যোগ্যতা, এদের পারস্পরিক আচররে বিচিত্র রূপ এবং এদের মন এ সাক্ষ্য না দিয়ে পারবে না যে, এ গোটা বিশ্ব কারখানা কোন একজন মহাপরাক্রমশালী মহাজ্ঞানবান কারিগরের তৈরী এবং তারই ব্যবস্থাপনায় এটি চলছে৷ এর মধ্যে একাধিক খোদার অধিকার থাকার কোন সম্ভাবনাই নেই৷
১৩. অর্থাৎ পৃথিবীর সমস্ত সৃষ্টির মধ্যে আল্লাহ শুধু মানুষ নৌকা ও জাহাজ চালনা এবং সওয়ারীর জন্য সওয়ারী জন্তু ব্যবহার করার ক্ষমতা দিয়েছেন৷ কিন্তু সে ক্ষমতা তিনি এ জন্য দেননি যে, মানুষ খাদ্যের বস্তার মত এগুলোর পিঠে চেপে বসবে এবং যিনি এগুলো সৃষ্টি করেছেন তিনি কে তা চিন্তা করবে না৷ অনুরূপ তিনি আমদের জন্য বিশাল সমুদ্রে জাহাজ চালনা সম্ভব করেছেন এবং অসংখ্য রকমের জীব-জন্তুর মধ্যে এমন কিছু জীব-জন্তু সৃষ্টি করেছেন যেগুলো আমাদের চেয়ে অনেক বেশী শক্তিশালী হওয়া সত্ত্বেও আমাদের অধীন হয়ে থাকে৷ আমরা তাদের পিঠে আরোহণ করে যে দিকে ইচ্ছা নিয়ে যাই৷ তিনি আমাদের এ ক্ষমতা দান করেছেন তিনি কে তা একবারও ভেবে দেখবো না সে জন্য তিনি এসব দেননি৷ এসব নিয়ামত থেকে উপকৃত হওয়া কিন্তু নিয়ামতদাতাকে ভুলে যাওয়া মৃত হৃদয় -মন ও অনুভুতিহীন বিবেক বুদ্ধির আলামত৷ একটি জীবন্ত ও তীক্ষ্ণ অনুভূতি প্রবণ মন ও বিবেক সম্পন্ন মানুষ যখনই এসব সওয়াররি পিঠে আরোহণ করবে তখনই তার হৃদয়- মন নিয়ামতের উপলদ্ধি ও কৃতজ্ঞতার আবেগে ভরে উঠবে৷ সে বলে উঠবে, পবিত্র সেই মহান সত্তা যিনি আমর জন্য এসব জিনিস অনুগত করে দিয়েছেন৷ পবিত্র এই অর্থে যে, তার সত্তার গুণাবলী ও ক্ষমতা ইখতিয়ারে অন্য কেউ শরীক নয়৷ নিজের খোদায়ীর ক্রিয়াকান্ড চালাতে তিনি অক্ষম তাই অন্যান্য সহায্যকারী খোদার প্রয়োজন পড়ে-এই দুর্বলতা থেকে তিনি মুক্ত৷ এসব নিয়ামতের কৃতজ্ঞতা প্রকাশের ক্ষেত্রে তার সাথে অন্য কাউকে শরীক করবো, এ অবস্থা থেকেও তিনি পবিত্র৷

সওয়ারী পিঠে বসার সময় রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি সাল্লামের মুখ থেকে যেসব কথা উচ্চারিত হতো সেগুলোই এ আয়াতের উদ্দেশ্য ও অভিপ্রায়ের সর্বোত্তম বাস্তব ব্যাখ্যা৷ হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা) বলেন, সফরে রওয়ানা হওয়ার সময় নবী (সা) যখন সওয়ারীতে বসতেন তখন তিনবার আল্লাহু আকবর বলতেন৷ তারপর এই আয়াতটি পড়ার এই বলে দোয়া করতেন:

------------------------------------আরবী

"হে আল্লাহ, আমি তোমার কাছে প্রার্থনা করছি, আমার এই সফরে আমাকে নেকী, তাকওয়া এবং এমন কাজ করার তাওফীক দান করো যা তোমার পছন্দ৷ হে আল্লাহ, আমার জন্য সফরকে সহজ এবং দীর্ঘ পথকে সংকুচিত করে দাও৷ হে আল্লাহ তুমিই আমার সফরের সাথী ও আমার অবর্তমানে আমার পরিবার পরিজনের রক্ষক৷ হে আল্লাহ, সফরে আমাদের সংগী হও এবং আমাদের অনুপস্থিতিতে পরিবার পরিজনের তত্বাবধান করো৷ "

হযরত আলী বলেনঃ একবার রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিসমিল্লাহ বলে রিকাবে পা রাখলেন এবং সওয়ার হওয়ার পর বললেন : -----------আরবী------------------ তার পর তিনবার আল্লাহু আকবার বললেন এবং তারপর বললেন:

------------আরবী------------ "তুমি অতি পবিত্র৷ তুমি ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই৷ আমি নিজের প্রতি জুলুম করেছি৷ আমাকে ক্ষমা করে দাও৷"

এরপর তিনি হেসে ফেললেন৷ আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রসূল, আপনি কি কারণে হাসলেন৷ তিনি বললেন, বান্দা ----আরবী------ (হে রব আমাকে ক্ষমা করে দাও৷) বললে আল্লাহর কাছে তা বড়ই পছন্দনীয় হয়৷ তিনি বলেন: আমার এই বান্দা জানে যে, আমি ছাড়া রক্ষাকারী আর কেউ নেই৷ (আহমদ, আবু দাউদ, তিরমিযী, নাসায়ী প্রভৃতি৷)

আবু মিজলায নামক এক ব্যক্তি বর্ণনা করেন, 'একবার আমি সওয়ারী জন্তুর পিঠে উঠে৷ ------আরবী------- আয়াতটি পড়লাম ৷ হযরত হাসান রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন: তোমাদের কি এরূপ করতে বলা হয়েছে৷ আমি বললাম : তা হলে আমরা কি বলবো? তিনি বললেন: এভাবে বলোঃ সেই আল্লাহর শোকর যিনি আমাদের ইলামের হিদায়াত দান করেছেন৷ তার শোকর যে, তিনি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পাঠিয়ে আমাদের প্রতি অনুগ্রহ করেছেন৷ তার শোকর যে, তিনি তার মাখলুকের জন্য সৃষ্ট সর্বোত্তম উম্মতের মধ্যে শামিল করেছেন৷ তারপর এ আয়াত পাঠ করো ( ইবনে জাররি , আহকামূল কুরআন -জাসসাস)৷
১৪. অর্থাৎ প্রতিটি সফরে যাওয়ার সময় স্মরণ করো যে, সামনে আরো একটি বড় সফর আছে এবং সেটিই শেষ সফর৷ তাছাড়া প্রত্যেকটি সওয়ারী ব্যবহার করার ক্ষেত্রে এ সম্ভাবনাও যেহেতু থাকে যে, হয়তো বা কোন দুর্ঘটনা এ সফরকেই তার শেষ সফর বানিয়ে দেবে৷ তাই উত্তম হচ্ছে, প্রত্যেকবারই সে তার রবের কাছে ফিরে যাওয়ার বিষয়টিকে স্মরণ করে যাত্রা করবে৷ যাতে মরতে হলেও একেবারে অবচেতনার মৃত্যু যেন না হয়৷ এখানে কিছুক্ষণ থেমে এই শিক্ষার নৈতিক ফলাফল ও কিছুটা অনুমান করুন৷ আপনি কি কল্পনা করতে পারেন যে, ব্যক্তি কোন সওয়ারীতে আরোহনের সময় জেনে বুঝে পূর্ণ অনুভুতির সাথে এভাবে আল্লাহকে এবং তার কাছে নিজের ফিরে যাওয়া ও জবাবদিহি করার কথা স্মরণ করে যাত্রা করে সে কি অগ্রসর হয়ে কোন পাপাচার অথবা জুলুম নির্যাতনে জড়িত হবে? কোন চরিত্রহীনার সাথে সাক্ষাতের জন্য, কিংবা কোন ক্লাবে মদ্য পান বা জুয়াখেলার উদ্দেশ্যে যাওয়ার সময়ও কি কোন মানুষের মুখ থেকে একথা উচ্চারিত হতে পারে অথবা সে তা ভাবতে পারে? কোন শাসক কিংবা কোন সরকারী কর্মচারী অথবা ব্যবসায়ী যে মনে মনে এসব কথা ভেবে এবং মুখে উচ্চারণ করে বাড়ী থেকে বের হলো সেকি তার গন্তব্যস্থলে পৌঁছে মানুষের হক নষ্ট করতে পারে? কোন সৈনিক নিরপরাধ মানুষের রক্তপাত ঘটানো এবং দুর্বলদের স্বাধীনতা নস্যাত করার উদ্দেশ্যে যাত্রার সময়ও কি তার বিমানে আরোহণ কিংবা ট্যাংককে পা রাখতে গিয়ে মুখে একথা উচ্চারণ করতে পারে? যদি না পারে, তাহলে এই একটি মাত্র জিনিস গোনাহর কাজের প্রতিটি তৎপরতায় বাধা সৃষ্টি করার জন্য যথেষ্ট৷
১৫. অংশ বানিয়ে দেয়ার অর্থ আল্লাহর কোন বান্দাকে তার সন্তান ঘোষণা করা৷ কেননা সন্তান অনিবার্যরূপেই পিতার স্বগোত্রীয় এবং তার অস্তিত্বের একটি অংশ৷ তাই কোন ব্যক্তিকে আল্লাহর কন্যা বা পুত্র বলার অর্থ এই যে, তাকে আল্লাহর অস্তিত্ব ও সত্তায় শরীক করা হচ্ছে৷ এছাড়াও কোন সৃষ্টিকে আল্লাহর অংশ বানানোর আরেকটি রূপ হচ্ছে, যেসব গুণাবলী ও ক্ষমতা ইখতিয়ার শুধু আল্লাহর জন্য নির্দিষ্ট সেই সব গুনাবলী ও ক্ষমতা -ইখতিয়ারে তাকেও শরীক করা এবং এই ধারনার বশবর্তী হয়ে তার কাছে প্রার্থনা করা, কিংবা তার সামনে ইবাদত বন্দেগীর অনুষ্ঠানাদি সম্পন্ন করা, অথবা তার ঘোষিত হালার ও হারামকে অবশ্য পালনীয় শরীয়ত মনে করে নেয়া৷ কারণ, ব্যক্তি এ ক্ষেত্রে 'উলুহিয়াত' ও 'রবুবিয়াত' কে আল্লাহ এবং বান্দার মধ্যে ভাগ করে দেয় এবং তার একটা অংশ বান্দার হাতে তুলে দেয়৷