(৪২:৩০) তোমাদের ওপর যে মসিবতই এসেছে তা তোমাদের কৃতকর্মের কারনে এসেছে৷ বহু সংখ্যক অপরাধকে তো আল্লাহ ক্ষমা করে দিয়ে থাকেন৷ ৫২
(৪২:৩১) তোমরা তোমাদের আল্লাহকে পৃথিবীতে অচল ও অক্ষম করে দিতে সক্ষম নও এবং আল্লাহ ছাড়া তোমাদের আর কোন সহযোগী ও সাহায্যকারী নেই৷
(৪২:৩২) সমুদ্রের বুকে পাহাড়ের মত দৃশ্যমান এসব জাহজ তার নিদর্শন সমূহের অন্তর্ভুক্ত৷
(৪২:৩৩) আল্লাহ চাইলে বাতাসকে থামিয়ে দেবেন আর তখন সেগুলো সমুদ্রের বুকে নিশ্চল দাঁড়িয়ে যাবে৷ -এর মধ্যে সেই সব লোকদের প্রত্যেকের জন্য বড় বড় নিদর্শন রয়েছে যারা পূর্ন মাত্রায় ধৈর্যশীল ও কৃতজ্ঞ৷ ৫৩
(৪২:৩৪) অথবা তার আরোহীদের বহু সংখ্যক গোনাহ ক্ষমা করেও তাদেরকে কতিপয় কৃতকর্মের অপরাধে ডুবিয়ে দেবেন৷
(৪২:৩৫) আমার নিদর্শনসমূহ নিয়ে যারা বিতর্ক করে সেই সময় তারা জানতে পারবে, তাদের আশ্রয় লাভের কোন জায়গা নেই৷ ৫৪
(৪২:৩৬) যা-ই তোমাদের দেয়া হয়েছে তা কেবল দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী জীবনের উপকরন মাত্র৷৫৫ আর আল্লাহর কাছে যা আছে তা যেমন উত্তম তেমনি চিরস্থায়ী৷৫৬ তা সেই সব লোকের জন্য যারা ঈমান এনেছে এবং তাদের রবের উপর নির্ভর করে, ৫৭
(৪২:৩৭) যারা বড় বড় গোনাহ এবং লজ্জাহীনতার কাজ থেকে বিরত থাকে ৫৮ এবং ক্রোধ উৎপত্তি হলে ক্ষমা করে,৫৯
(৪২:৩৮) যারা তাদের রবের নির্দেশ মেনে চলে, ৬০ নামায কায়েম করে এবং নিজেদের সব কাজ পরস্পর পরামর্শের ভিত্তিতে চালায়,৬১ আমি তাদের যা রিযিক দিয়েছি তা থেকে খরচ করে ৬২
(৪২:৩৯) এবং তাদের বিরুদ্ধে বাড়াবাড়ি করা হলে তার মোকাবিলা করে৷৬৩
(৪২:৪০) খারাপের ৬৪ প্রতিদান সমপর্যায়ের খারাপ৷৬৫ অতপর যে মাফ করে দেয় এবং সংশোধন করে তাকে পুরস্কৃত করা আল্লাহর দায়িত্ব৷ ৬৬ আল্লাহ জালেমদের পছন্দ করেন না৷ ৬৭
(৪২:৪১) যারা জুলুম হওয়ার পরে প্রতিশোধ গ্রহণ করে তাদের তিরস্কার করা যায় না৷
(৪২:৪২) তিরষ্কারের উপযুক্ত তো তারা যারা অন্যদের ওপর জুলুম করে এবং পৃথিবীতে অন্যায় বাড়াবাড়ি করে৷ এসব লোকের জন্য রয়েছে কষ্টদায়ক শাস্তি৷
(৪২:৪৩) তবে যে ধৈর্যের সাথে কাজ করে এবং ক্ষমা প্রদর্শন করে তার সে কাজ মহত্তর সংকল্পদীপ্ত কাজের অন্তর্ভুক্ত৷৬৮
(৪২:৪৪) আল্লাহ নিজেই যাকে গোমরাহীর মধ্যে নিক্ষেপ করেন আল্লাহ ছাড়া তাকে সামলানোর আর কেউ নেই৷৬৯ তোমরা দেখতে পাবে এসব জালেমরা যখন আযাব দেখবে তখন বলবে এখন কি ফিরে যাবারও কোন পথ আছে? ৭০
(৪২:৪৫) তুমি দেখতে পাবে এদের জাহান্নামের সামনে আনা হলে অপমানে আনত হতে থাকবে এবং দৃষ্টির আড়ালে বাঁকা চোখে তাকে দেখতে থাকবে৷৭১ যারা ঈমান এনেছিলো সেই সময় তারা বলবে: প্রকৃতপক্ষে ক্ষতিগ্রস্ত তারাই যারা আজ কিয়ামতের দিন নিজেরাই নিজেদের এবং নিজেদের সংশ্লিষ্টদেরকে ক্ষতির মধ্যে নিক্ষেপ করেছে৷
(৪২:৪৬) সাবধান! জালেমরা চিরস্থায়ী আযাব ভোগ করতে থাকবে এবং তাদের কোন সহযোগী ও অভিভাবক থাকবে না, যারা আল্লাহর মোকাবিলায় তাদের সাহায্য করবে৷ আল্লাহ নিজেই যাকে গোমরাহরি মধ্যে নিক্ষেপ করেন তার বাচাঁর কোন পথ নেই৷
(৪২:৪৭) তোমরা তোমাদের রবের কথায় সাড়া দাও সেই দিনটি আসার আগেই আল্লাহর পক্ষ থেকে যাকে ফিরিয়ে দেয়ার কোন ব্যবস্থা নেই৷৭২ সেই দিন তোমাদের জন্য কোন আশ্রয়স্থল থাকবে না এবং তোমাদের অবস্থা পরিবর্তনের জন্য চেষ্টাকারীও কেউ থাকবে না৷৭৩
(৪২:৪৮) এখন যদি এরা মুখ ফিরিয়ে নেয়, তাহলে হে নবী, আমি তো আপনাকে তাদের জন্য রক্ষক হিসেবে পাঠাইনি৷৭৪ কথা পৌছিয়ে দেয়াই কেবল তোমার দায়িত্ব৷ মানুষের অবস্থা এই যে, যখন আমি তাকে আমার রহমতের স্বাদ আস্বাদন করাই তখন সে তার জন্য গর্বিত হয়ে ওঠে৷ আর যখন তা নিজ হাতে কৃত কোন কিছু মুসিবত আকারে তার ওপর আপতিত হয় তখন সে চরম অকৃতজ্ঞ হয়ে যায়৷৭৫
(৪২:৪৯) যমীন ও আসমানের বাদশাহীর অধিকর্তা আল্লাহ ৭৬ তিনি যা ইচ্ছা সৃষ্টি করেন৷
(৪২:৫০) যাকে ইচ্ছা কন্যা সন্তান দেন, যাকে ইচ্ছা পুত্র সন্তান দেন, যাকে ইচ্ছা পুত্র ও কন্যা উভয়টিই দেন এবং যাকে ইচ্ছা বন্ধ্যা করে দেন৷ তিনি সব কিছু জানেন এবং সবকিছু করতে সক্ষম৷৭৭
(৪২:৫১) কোন ৭৮ মানুষই এ মর্যাদার অধিকারী নয় যে, আল্লাহ তার সাথে সরাসরি কথা বলবেন৷ তিনি কথা বলেন হয় অহীর (ইংগিত) মাধ্যমে,৭৯ অথবা পর্দার আড়াল থেকে,৮০ কিংবা তিনি কোন বার্তাবাহক (ফেরেশতা) পাঠান এবং সে তার হুকুমে তিনি যা চান অহী হিসেবে দেয়৷ ৮১ তিনি সুমহান ও সুবিজ্ঞ৷ ৮২
(৪২:৫২) এভাবেই (হে মুহাম্মাদ), আমি আমার নির্দেশে তোমার কাছে এক রূহকে অহী করেছি৷ ৮৩ তুমি আদৌ জানতে না কিতাব কি এবং ঈমানই বা কি৷৮৪ কিন্তু সেই রূহকে আমি একটি আলো বানিয়ে দিয়েছি যা দিয়ে আমি আমার বান্দাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা পথ দেখিয়ে থাকি৷ নিশ্চিতভাবেই আমি তোমাকে সোজা পথের দিক নির্দেশনা দান করছি৷
(৪২:৫৩) সেই আল্লাহর পথের দিকে যিনি যমীন ও আসমানের সব জিনিসের মালিক৷ সাবধান, সব কিছু আল্লাহর দিকেই ফিরে যায়৷৮৫
৫২. প্রকাশ থাকে যে, এখানে মানুষের সব রকম বিপদাপদের কারণ বর্ণনা করা হচ্ছে না এখানে বক্তব্যের লক্ষ্যে সেই সব লোক যারা সেই সময় পবিত্র মক্কায় কুফর ও নাফরমানিতে লিপ্ত হচ্ছিলো৷ তাদের বলা হচ্ছে, আল্লাহ যদি তোমাদের সমস্ত দোষ-ত্রুটির জন্য পাকড়াও করতেন তাহলে তোমাদেরকে জীবিতই রাখতেন না৷ তবে যে বিপদাপদ তোমাদের ওপর নাযিল হয়েছে (সম্ভবত মক্কার দুর্ভিক্ষের প্রতি ইংগিত দেয়া হয়েছে) তা কেবল সতর্কীকরন হিসেবে দেয়া হয়েছে যাতে তোমদের সম্বিত ফিরে আসে এবং নিজেদের কাজকর্মের পর্যালোচনা করে দেখো যে, তোমার আপন রবের বিরুদ্ধে কি ধরনের আচরণ করেছো৷ একথাও বুঝার চেষ্টা করো, যে আল্লাহর বিরুদ্ধে তোমরা বিদ্রোহ করছো তার কাছে তোমরা কত অসহায়৷ তাছাড়া জেনে রাখো, তোমরা যাদেরকে অভিভাবক ও সহায্যকারী বানিয়ে বসে আছো কিংবা তোমরা যেসব শক্তির ওপর ভরসা করে আছো আল্লাহর পাকড়াও থেকে বাঁচার জন্য তারা কোন কাজে আসবে না৷

আরো সুস্পষ্ট করে তুলে ধরার জন্য এ বিষয়টিও বর্ণনা করা প্রয়োজন যে এ ব্যাপারে খাঁটি মু'মিনের জন্য আল্লাহর বিধান ভিন্ন৷ মু'মিনের ওপর যে দু:খ কষ্ট ও বিপদাপদ আসে তার গোনাহ, ত্রুটি বিচ্যুতি ও দুর্বলতার কাফফারা হতে থাবে৷ সহীহ হাদীসে আছে:

আরবী:---------------------------------------------------------------------------------

"মুসলমান যে দু:খ-কষ্ট, চিন্তা ও দুর্ভাবনা এবং কষ্ট ও অশান্তির সম্মুখীনই হোক না কেন এমন কি একটি কাঁটা বিদ্ধ হলেও আল্লাহ তাকে তার কোন না কোন গোনাহর কাফফারা বনিয়ে দেন৷"

এরপর থাকে এমন সব বিপদাপদের প্রশ্ন যা আল্লাহর পথে তার বাণীকে সমুন্নত করার জন্য কোন ঈমানদারকে বরদাশত করতে হয়, তা কেবল ত্রুটি - বিচ্যুতির কাফফারাই হয় না, আল্লাহর কাছে তার মর্যাদা বৃদ্ধিরও কারণ হয়৷ এসব বিপদাপদ গোনাহর শাস্তি হিসেবে নাযিল হয়ে থাকে এমন ধারণা পোষন করার আদৌ কোন অবকাশ নেই৷
৫৩. ধৈর্যশীল অর্থ এমন ব্যক্তি যে নিজের প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রনে রাখে এবং ভাল মন্দ সব রকম পরিস্থিতিতে বন্দেগীর আচরনের ওপর দৃঢ়পদ থাকে৷ তাদের অবস্থা এমন নয় যে, সুদিন আসলে নিজের সত্তাকে ভুলে আল্লাহর বিরুদ্ধে বিদ্রোহী এবং বান্দাদের জন্য অত্যাচারী হয়ে ওঠে এবং দুর্দিন আসলে মর্যাদাবোধ খুইয়ে বসে এবং যে কোন জঘন্য থেকে জঘন্যতর আচরন করতে থাকে৷ কৃতজ্ঞ বলতে বুঝানো হয়েছে এমন ব্যক্তিকে যাকে তাকদীরে ইলাহী যত উচ্চাসনেই অধিষ্টিত করুক না কেন সে তাকে নিজের কৃতিত্ব নয়, বরং আল্লাহর ইহসান মনে করে এবং যত নিচেই তাকে নিক্ষেপ করা হোক না কেন তার দৃষ্টি নিজের বঞ্চনার পরিবর্তে সেই সব নিয়ামতের ওপর নিবন্ধ থাকে যা অতি করুণ পরিস্থিতির মধ্যেও ব্যক্তি লাভ করে এবং সুখ ও দু:খ উভয় পরিস্থিতিতে তার মুখ ও অন্তর থেকে তার রবের প্রতি কৃতজ্ঞতাই প্রকাশ পেতে থাকে৷
৫৪. কুরাইশদেরকে তাদের বাণিজ্যিক কাজকারবারের উদ্দেশ্যে হাবশা এবং আফ্রিকার উপকূলীয় অঞ্চলের দিকে যেতে হতো৷ এসব সফরে তারা পালের জাহাজ ও নৌকায় লোহিত সাগর পাড়ি দিত যা একটি ভয়ানক সাগর৷ প্রায়ই তা ঝঞ্জা বিক্ষুব্দ থাকে এবং তার পানির নীচে বিপুল সংখ্যক পাহাড় বিদ্যমান৷ বিক্ষুব্ধ সমুদ্রে এসব পাহাড়ের সাথে জাহাজের ধাক্কা খাওয়ার সমূহ সম্ভাবনা থাকে আল্লাহ এখানে সে অবস্থা চিহ্নিত করেছেন নিজেদের ব্যক্তি গত অভিজ্ঞতার আলোকে কুরাইশরা তা ভালভাবে উপলব্ধি করতে পারতো৷
৫৫. অর্থাৎ এটা এমন কোন জিনিস নয় যার জন্য মানুষ গর্বিত হতে পারে৷ কোন মানুষ পৃথিবীতে সর্বাধিক সম্পদ লাভ করলেও স্বল্পতম সময়ের জন্যই লাভ করেছে৷ সে কয়েক বছর মাত্র তা ভোগ করে তারপর সব কিছু ছেড়ে খালি হাতে পৃথিবী থেকে বিদায় হয়ে যায়৷ তাছাড়া সে সম্পদ যত অঢেলই হোক না কেন বাস্তবে তার একটা ক্ষুদ্রতম অংশই ব্যক্তির ব্যবহারে আসে ৷ এ ধরণের সম্পদের কারণে গর্বিত হওয়া এমন কোন মানুষের কাজ নয় যে, নিজের এই অর্থ সম্পদের এবং এই পৃথিবীর প্রকৃত অবস্থা উপলব্ধি করে৷
৫৬. অর্থাৎ সেই সম্পদ গুনগত ও অবস্থাগত দিক দিয়েও উন্নতমানের৷ তাছাড়া তা সাময়িক বা অস্থায়ীও নয়, বরং চিরস্থায়ী ও অবিনশ্বর৷
৫৭. এখানে আল্লাহর প্রতি ভরসাকে ঈমানের অনিবার্য দাবী এবং আখেরাতের সফলতার জন্য একটি জরুরী বৈশিষ্ট্য বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে৷ তাওয়াক্কুল অর্থ হচ্ছে, প্রথমত, আল্লাহর পথনির্দেশনার ওপর ব্যক্তির পূর্ণ আস্থা থাকবে এবং সে মনে করবে, আল্লাহ প্রকৃত সত্য সম্পর্কে যে জ্ঞান, নৈতিক চরিত্রের যে নীতিমালা, হালাল ও হারামের যে সীমারেখা এবং পৃথিবীতে জীবন যাপনের জন্য যেসব নিয়ম -কানুন ও বিধি - বিধান দিয়েছেন তাই সত্য ও সঠিক এবং সেসব মেনে চলার মধ্যেই মানুষের কল্যাণ নিহিত৷ দ্বিতীয়ত, মানুষের নির্ভরতা তার নিজের শক্তি, যোগ্যতা, মাধ্যম ও উপায় উপকরন ব্যবস্থাপনা এবং আল্লাহ ছাড় অন্যদের সাহায্য সহযোগিতার ওপর হবে না৷ তাকে একথা পুরোপুরি মনে রাখতে হবে যে, দুনিয়া ও আখেরাতের প্রতিটি ব্যাপারে তার সাফল্য প্রকৃতপক্ষে নির্ভর করে আল্লাহর তাওফীক ও সাহায্যের ওপর ৷ আর সে আল্লাহর তাওফীক ও সাহায্যের উপযুক্ত কেবল তখনই হতে পারে যখন সে তার সন্তষ্টিকে লক্ষ্য বানিয়ে এবং তার নির্ধারিত সীমারেখাসমূহ মেনে কাজ করবে৷ তৃতীয়ত, ঈমান ও নেক কাজের পথ অবলম্বনকারী এবং বাতিলের পরিবর্তে ন্যায় ও সত্যের জন্য কর্মতৎপর বান্দাদেরকে আল্লাহ যেসব প্রতিশ্রুতি প্রতি আস্থাশীল হয়ে সে সেই সব লাভ, উপকার ও আনন্দকে পদাঘাত করবে যা বাতিলের পথ অনুসরণ করার ক্ষেত্রে লাভ করা যাবে বলে মনে হয় এবং ন্যায় ও সত্যের ওপর দৃঢ়পদ থাকর কারণে যেসব ক্ষতি দু:খ, কষ্ট এবং বঞ্চনা তর ভাগ্যে আসে তা সহ্য করবে৷ ঈমানের সাথে তাওয়াক্কুলের সম্পর্ক কত গভীর তা তাওয়াক্কুল শব্দের অর্থের এই বিশ্লেষণের পর সুস্পষ্ট হয়ে যায় এবং তাওয়াক্কুল ছাড়া যে ঈমান সাদামাটা স্বীকৃতি ও ঘোষণা পর্যন্তই সীমাবদ্ধ তা থেকে সেই গৌরবময় ফলাফল কি করে অর্জিত হতে পারে ঈমান গ্রহন করে তাওয়াক্কুলকারীদের যার প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে৷
৫৮. ব্যখ্যার জন্য দেখুন, তাফহীমুল কুরআন, আন নিসা, টীকা ৫৩,৫৪: আল আনয়াম, টীকা ১৩০-১৩১; আন নাহাল, টীকা ৮৯; তাছাড়া সূরা নাজমের ৩২ আয়াত৷
৫৯. অর্থাৎ তারা রুক্ষ ও ক্রুদ্ধ স্বভাবের হয় না, বরং নম্র স্বভাব ও ধীর মেজাজের মানুষ হয়৷ তাদের স্বভাব প্রতিশোধ পরায়ণ হয় না ৷ তারা আল্লাহর বান্দাদের সাথে ক্ষমার আচরন করে এবং কোন কারণে ক্রোধান্বিত হলেও তা হজম করে এটি মানুষের সর্বোত্তম গুনাবলীর অন্তর্ভুক্ত৷ কুরআন মজীদ একে অত্যন্ত প্রশংসার যোগ্য বলে ঘোষনা করেছে (আল ইমরান, আয়াত ১৩৪) এবং একে রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাফল্যের বড় বড় কারণসমূহের মধ্যে গন্য করা হয়েছে (আল ইমরান, ১৫৯ আয়াত)৷ হাদীসে হযরত আয়েশা (রা:) বর্ণনা করেছেন:

আরবী:---------------------------------------------------------------------------------

"রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম ব্যক্তিগত কারণে কখনো প্রতিশোধ গ্রহন করেননি ৷ তবে আল্লাহর কোন হুরমত বা মর্যাদার অবমাননা করা হলে তিনি শাস্তি বিদান করতেন৷"
৬০. শাব্দিক অনুবাদ হবে "রবের আহবানে সাড়া দেয়৷" অর্থাৎ আল্লাহ যে কাজের জন্যই ডাকেন সে কাজের জন্যই ছুটে যায় এবং যে জিনিসের জন্যই আহবান জানান তা গ্রহন করে৷
৬১. এ বিষয়টিকে এখানে ঈমানদারদের সর্বোত্তম গুনাবলীর মধ্যে গন্য করা হয়েছে এবং সূরা আল ইমরানে (আয়াত ১৫৯) এ জন্য আদেশ করা হয়েছে৷ এ কারণে পরামর্শ ইসলামী জীবন প্রণালীর একটি গুরুত্বপূর্ন স্তম্ভ৷ পরামর্শ ছাড়া সামষ্টিক কাজ পরিচালনা করা শুধু জাহেলী পন্থাই নয়, আল্লাহর নির্ধারিত বিধানের সুস্পষ্ট লংঘন৷ ইসলামে পরামর্শকে এই গুরুত্ব কেন দেয়া হয়েছে? এর কারণসমূহ নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা ভাবনা করলে আমাদের সামনে তিনটি বিষয় পরিস্কার হয়ে যাবে৷

একঃ যে বিষয়টি দুই বা আরো বেশী লোকের স্বার্থের সাথে জড়িত সে ক্ষেত্রে কোন এক ব্যক্তির নিজস্ব মতামতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহন করা এবং সংশিষ্ট অন্য ব্যক্তিদের উপেক্ষা করা জুলুম৷ যৌথ ব্যাপারে কারো যা ইচ্ছা তাই করার অধিকার নেই ৷ ইনসাফের দাবী হচ্ছে, কোন বিষয়ে যত লোকের স্বার্থ জড়িত সে ব্যাপারে তাদের সবার মতামত গ্রহন করতে হবে এবং তাতে যদি বিপুল সংখ্যক লোকের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট থাকে তাহলে তাদের আস্থাভাজন প্রতিনিধিদেরকে পরামর্শের মধ্যে শামিল করতে হবে৷

দুই : যৌথ ব্যাপারে মানুষ স্বেচ্ছাচারিতা করার চেষ্টা করে অন্যদের অধিকার নস্যাত করে নিজে ব্যক্তি স্বার্থ লাভ করার জন্য, অথবা এর কারণ হয় সে নিজেকে বড় একটা কিছু এবং অন্যদের নগন্য মনে করে৷ নৈতিক বিচারে এই দুটি জিনিসই সমপর্যায়ের হীন৷ মু'মিনের মধ্যে এ দুটির কোনটিই পাওয়া যেতে পারে না৷ মু'মিন কখনো স্বার্থপর হয় না৷ তাই সে অন্যদের ওপর হস্তক্ষেপ করে নিজে অন্যায় ফায়দা চাইতে পারে না এবং অহংকারী বা আত্মপ্রশংসিত হতে পারে না যে নিজেকেই শুধু মহাজ্ঞানী ও সবজান্তা মনে করবে৷

তিন: যেসব বিষয় অন্যদের অধিকার ও স্বার্থের সাথে জড়িত সেসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ একটা বড় দায়িত্ব৷ যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে এবং একথা জানে যে এর জন্য তাকে তার রবের কাছে কত কঠিন জবাবদিহি করতে হবে সে কখনো একা এই গুরুভার নিজের কাঁধে উঠিয়ে নেয়ার দু:সাহস করতে পারে না৷ এ ধরনরে দু:সাহস কেবল তারাই করে যারা আল্লাহর ব্যাপারে নির্ভিক এবং আখেরাত সম্পর্কে চিন্তাহীন৷ খোদাভীরু ও আখেরাতের জবাবদিহির অনুভূতি সম্পন্ন লোক কোন যৌথ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সবাইকে কিংবা তাদের নির্ভরযোগ্য প্রতিনিধিদেরকে পরামর্শ গ্রহনের ক্ষেত্রে অবশ্যই শরীক করার চেষ্টা করবে৷ যাতে সর্বাধিক মাত্রায় সঠিক, নিরপেক্ষ এবং ইনসাফ ভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা যায়৷ এ ক্ষেত্রে যদি অজ্ঞাতসারে কোন ত্রুটি হয়েও যায় তাহলে কোন এক ব্যক্তির ঘাড়ে তার দায়দায়িত্ব এসে পড়বে না৷

এ তিনটি কারণ এমন যদি তা নিয়ে মানুষ গভীরভাবে চিন্তা - ভাবনা করে তাহলে অতি সহজেই সে একথা উপলদ্ধি করতে পারবে যে, ইসলাম যে নৈতিক চরিত্রের শিক্ষা দেয় পরামর্শ তার অনিবার্য দাবী এবং তা এড়িয়ে চলা একটি অতি বড় চরিত্রহীনতার কাজ৷ ইসলাম কখানো এ ধরনের কাজের অনুমতি দিতে পারে না৷ ইসলামী জীবন পদ্ধতি সমাজের ছোট বড় প্রতিটি ব্যাপারেই পরামর্শের নীতি কার্যকরী হোক তা চায়৷ পারিবারিক ব্যাপার হলে সে ক্ষেত্রে স্বামী - স্ত্রী পরামর্শ করে কাজ করবে৷ এবং ছেলেমেয়ে বড় হলে তাদেকেও পরামর্শে শরীক করতে হবে৷ খা‌ন্দান বা গোষ্ঠীর ব্যাপার হলে সে ক্ষেত্রে গোষ্ঠীর সমস্ত বুদ্ধিমান ও বয়োপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের মতামত গ্রহণ করতে হবে যদি একটি গোত্র বা জ্ঞাতিগোষ্ঠী কিংবা জনপদের বিষয়াদি হয় এবং তাতে সব মানুষের অংশগ্রহণ সম্ভব না হলে সিদ্ধান্ত গ্রহনের দায়িত্ব এমন পঞ্চায়েত বা সভা পালন করবে যেখানে কোন সর্বসম্মত পন্থা অনুসারে সংশ্লিষ্ট সবার আস্থাভাজন প্রতিনিধিরা শরীক হবে৷ গোটা জাতির ব্যাপার হলে তা পরিচালনার জন্য সবার ইচ্ছানুসারে তাদের নেতা নিযুক্ত হবে জাতীয় বিষয়গুলোকে সে এমন সব ব্যক্তিবর্গের পরামর্শ অনুসারে পরিচালনা করবে জাতি যাদেরকে নির্ভরযোগ্য মনে করে এবং সে ততক্ষণ পর্যন্ত নেতা থাকবে যতক্ষণ জাতি তাকে নেতা বানিয়ে রাখতে চাইবে৷ কোন ঈমানদার ব্যক্তি জোরপূর্বক জাতির নেতা হওয়া বা হয়ে থাকার আকাংখা কিংবা চেষ্টা করতে পারে না৷ প্রথমে জোরপূর্বক জাতির ঘাড়ে চেপে বসা এবং পরে জবরদস্তি করে মানুষের সম্মতি আদায় করা এমন প্রতারনাও সে করতে পারে না৷ তাকে পরামর্শ দানের জন্য মানুষ স্বাধীন ইচ্ছানুসারে নিজেদের মনোনীত প্রতিনিধি নয়, বরং এমন প্রতিনিধি নির্বাচিত করবে যে তার মর্জি মোতাবেক মতামত প্রকাশ করবে, ‌এমন চক্রান্তও সে করতে পারে না এমন আকাংখা কেবল সেই মানুষের মধ্যে সৃষ্টি হতে পারে যার মন অসৎ উদ্দেশ্য দ্বারা কলুষিত৷ এই আকাংখার সাথে ------আরবী------- এর বাহ্যিক কাঠামো নির্মাণ এবং তার বাস্তাব প্রাণসত্তাকে নি:শেষ করে দেয়ার প্রচেষ্টা শুধু সেই ব্যক্তিই চালাতে পারে যে আল্লাহ এবং তাঁর সৃষ্টিকে ধোঁকা দিতে ভয় করে না৷ অথচ না আল্লাহকে ধোঁকা দেয়া সম্ভব না আল্লাহর সৃষ্ট মানুষ এমন অন্ধ হতে পারে যে, প্রকাশ্য দিবালোকে কেউ ডাকাতি করছে আর মানুষ তা দেখে সরল মনে ভাবতে থাকবে যে , সে ডাকাত নয় মানুষের সেবা করছে৷

আরবী------এর নিয়মটি প্রকৃতি ও বৈশিষ্টের দিক দিয়ে পাঁচটি জিনিস দাবী করে:

এক: যৌথ বিষয়সমূহ যাদের অধিকার ও স্বার্থের সাথে সম্পর্কিত তাদের মত প্রকাশের পূর্ন স্বাধীনতা থাকতে হবে এবং কার্যক্ষেত্রে ব্যাপারগুলো কিভাবে পরিচালিত হচ্ছে সে বিষয়ে তাদের অবহিত রাখতে হবে৷ তারা যদি তাদের ব্যাপারগুলোর নেতৃত্বে কোন ত্রুটি, অপরিপক্কতা বা দুর্বলতা দেখায় তাহলে তা তুলে ধরা ও তার প্রতিবাদ করার এবং সংশোধিত হতে না দেখলে পরিচালক ও ব্যবস্থাপকদের পরিবর্তন করার অধিকার থাকতে হবে৷ মানুষের মুখ বন্ধ করে, হাত পা বেঁধে এবং তাদেরকে অনবহিত রেখে তাদের সামস্টিক ব্যাপারসমূহ পরিচালন করা সুস্পষ্ট প্রবঞ্চনা ৷ কেউ ই এ কাজকে ------আরবী------- নীতির অনুসরন বলে মানতে পারে না৷

দুই: যৌথ বিষয় সমূহ পরিচালনার দায়িত্ব যাকেই দেয়া হবে তাকে যেন এ দায়িত্ব সবার স্বাধীন মতামতের ভিত্তিতে দান করা হয়৷ জবরদস্তি ও ভয়ভীতি দ্বারা অর্জিত কিংবা লোভ- লালসা দিয়ে খরিদকৃত অথবা ধোঁকা - প্রতারণা ও চক্রান্তের মাধ্যমে লুন্ঠিত সম্মতি প্রকৃতপক্ষে কোন সম্মতি নয়্‌ ৷ যে সম্ভাব্য সব রকম পন্থা কাজে লাগিয়ে কোন জাতির নেতা হয় সে সত্যিকার নেতা নয়৷ সত্যিকার নতো সেই যাকে মানুষ নিজের পছন্দানুসারে সানন্দ চিত্তে নেতা হিসেবে গ্রহণ করে৷

তিন: নেতাকে পরামর্শ দানের জন্যও এমন সব লোক নিয়োগ করতে হবে যাদের প্রতি জাতির আস্থা আছে৷ এটা সর্বজনবিদিত যে, যারা চাপ সৃষ্টি করে কিংবা অর্থ দ্বারা খরিদ করে অথবা মিথ্যা ও চক্রান্তের সাহায্যে বা মানুষকে বিভ্রান্ত করে প্রতিনিধিত্বের স্থানটি দখল করে তাদেরকে সঠিক অর্থে আস্থাভাজন বলা যায় না৷

চার: পরামর্শদাতাগন নিজেদের জ্ঞান, ঈমান ও বিবেক অনুসারে পরামর্শ দান করবে এবং এভাবে মতামত প্রকাশের ক্ষেত্রে তাদের পূর্ন স্বাধীনতা থাকতে হবে৷ এ দিকগুলে যেখানে থাকবে না, যেখানে পরামর্শদাতা কোন প্রকার লোভ লালসা বা ভীতির কারণে অথবা কোন দালাদলির মারপ্যাঁচের কারণে নিজের জ্ঞান ও বিবেকের বিরুদ্ধে মতামত পেশ করে সেখানে প্রকৃতপক্ষে হবে খিয়ানত ও বিশ্বাসঘাতকতা ---------আররী----------- এর অনুসরণ নয়৷

পাঁচ: পরামর্শদাতাদের ইজমার (সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত) ভিত্তিতে যে পরামর্শ দেয়া হবে, অথবা যে সিদ্ধান্ত তাদের অধিকাংশের সমর্থন লাভ করবে তা মেনে নিতে হবে ৷ কেননা সবার মতামত জানার পরও যদি এক ব্যক্তি অথবা একটি ছোট্র গ্রুপকে স্বেচ্ছাচার চালানোর সুযোগ দেয়া হয় তাহলে পরামর্শ অর্থহীন হয়ে যায়৷ আল্লাহ একথা বলছেন না যে, "তাদের ব্যাপারে তাদের পরামর্শ গ্রহণ করা হয়" বরং বলছেন, 'তাদের কাজকর্ম পারস্পরিক পরামর্শর ভিত্তিতে চলে৷" শুধু পরামর্শ করাতেই এ নির্দেশ পালন করা হয় না৷ তাই পরামর্শের ক্ষেত্রে সর্বসম্মত অথবা সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামতের ভিত্তিতে গৃহতি সিদ্ধান্ত অনুসারে কাজকর্ম পরিচালনা প্রয়োজন ৷

ইসলামের পরামর্শ ভিত্তিক কাজ পরিচালনা নীতির এই ব্যাখ্যার সাথে এই মৌলিক কথাটার প্রতিও লক্ষ্য রাখতে হবে যে, মুসলমানদের পারস্পরিক বিষয় সমূহ পরিচালনায় এই শূরা স্বেচ্ছাচারী এবং সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী নয়, বরং অবশ্যই সেই দীনের বিধি-বিধান দ্বারা সীমাবদ্ধ আল্লাহ নিজেই যার জন্য বিধান রচনা করেছেন৷ সাথে সাথে তা সেই মূল নীতিরও আনুগত্য করতে বাধ্য যাতে বলা হয়েছে "যে ব্যাপারেই তোমাদের মধ্যে মতভেদ হবে তার ফায়সালা করবেন আল্লাহ৷" এবং "তোমাদের মধ্যে যে বিরোধই বাধুক না কেন সে জন্য আল্লাহ ও তার রসূলের কাছে ফিরে যাও৷" এই সাধারন সূত্র অনুসারে মুসলমানরা শারয়ী বিষয়ে শূল ধর্মগ্রন্থের কোন অংশের কি অর্থ এবং কিভাবে তা কার্যকর করা যায় সে বিষয়ে পরামর্শ করতে পারে যাবে তার মূল উদ্দেশ্য পূরণ হয়৷ কিন্তু স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে এ উদ্দেশ্যে কোন পরামর্শ করতে পারে না৷
৬২. এর তিনটি অর্থ :

এক : আমি তাদেরকে যে হালাল রিযিক দান করেছি তা থেকে খরচ করে, নিজের ব্যয়ভার নির্বাহের জন্য হারাম অর্থ-সম্পদের দিকে হাত বাড়ায় না৷

দুই : আমার দেয়া রিযিককে যক্ষের ধনের মত জমা করে রাখে না, বরং খরচ করে৷

তিন : তাদের যে রিযিক দেয়া হয়েছে তা থেকে আল্লাহর পথেও ব্যয় করে, সবটাই নিজের জন্য আঁকড়ে ধরে রাখে না৷

প্রথম অর্থের ভিত্তি হলো, আল্লাহ শুধু হালাল ও পবিত্র রিযিককেই তাঁর দেয়া রিযিক বলে বর্ণনা করেন৷ অপবিত্র ও হারাম পন্থায় উপার্জিত রিযিককে তিনি তাঁর নিজের দেয়া রিযিক বলেন না৷ দ্বিতীয় অর্থের ভিত্তি হলো, আল্লাহ মানুষকে যে রিযিক দান করেন তা খরচ করার জন্য দান করেন, জমিয়ে জমিয়ে সাপের মত পাহারা দিয়ে রাখার জন্য দেন না৷ এবং তৃতীয় অর্থের ভিত্তি হলো, কুরআন মজীদে ব্যয় করা বলতে শুধু নিজের সত্তা ও প্রয়োজন পূরণের জন্য ব্যয় করা বুঝানো হয়নি ৷ এ অর্থের মধ্যে আল্লাহর পথে ব্যয়ও অন্তর্ভুক্ত৷ এ তিনটি কারণে আল্লাহ এখনে খরচ করাকে ঈমানদারদের সর্বোত্তম গুণাবলীর মধ্যে গণ্য করছেন এবং এ জন্য আখেরাতের কল্যাণসমূহ তাদের জন্যই নিদিষ্ট করা হয়েছে৷
৬৩. এটাও ঈমানদারদের একটা সর্বোৎকৃষ্ট গুণ৷ তারা জালেম ও নিষ্ঠুরদের জন্য সহজ শিকার নয়৷ তাদের কোমল স্বভাব এবং ক্ষমাশীলতা দুর্বলতার কারণে নয়৷ তাদের ভিক্ষু ও পাদরীদের মত মিসকীন হয়ে থাকার শিক্ষা দেয়া হয়নি৷ তাদের ভদ্রতার দাবী হচ্ছে বিজয়ী হলে বিজিতের দোষ-ত্রুটি ক্ষমা করে দেয়৷ সক্ষম হলে প্রতিশোধ গ্রহণ না করে মাফ করে এবং অধীনস্ত ও দুর্বল ব্যক্তির দ্বারা কোন ভুল-ত্রুটি সংঘটিত হলে তা উপেক্ষা করে যায়৷ কিন্তু কোন শক্তিশালী ব্যক্তি যদি তার শক্তির অহংকারে তার প্রতি বাড়াবাড়ি করে তাহলে বুক টান করে দাঁড়িয়ে যায় এবং তাকে উচিত শিক্ষা দান করে৷ মু'মিন কখনো জালেমের কাছে হার মানে না এবং অহংকারীর সামনে মাথা নত করে না৷ এ ধরনের লোকদের জন্য তারা বড় কঠিন খাদ্য যা চিবানোর প্রচেষ্টাকারীর মাড়িই ভেঙে দেয়৷
৬৪. এখান থেকে শেষ অনুচ্ছেদ পর্যন্ত গোটা বক্তব্য পূর্ববর্তী আয়াতের ব্যাখ্যা স্বরূপ৷
৬৫. এটা প্রথম নিয়মতান্ত্রিক বিধান, প্রতিশোধ গ্রহনের ক্ষেত্রে যা মনে রাখা দরকার৷ প্রতিশোধ গ্রহনের বৈধ সীমা হচ্ছে কারো প্রতি যতটুকুন অন্যায় করা হয়েছে সে তার প্রতি ঠিক ততটুকুন অন্যায় করবে৷ তার চেয়ে বেশী অন্যায় করার অধিকার তার নেই৷
৬৬. এটা প্রতিশোধ গ্রহনের দ্বিতীয় বিধান৷ এর অর্থ অন্যায়কারী থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ যদিও বৈধ, তবে যেখানে ক্ষমা করে দিলে তা সংশোধনের কারণ হতে পারে সেখানে সংশোধনের উদ্দেশ্যে প্রতিশোধ গ্রহনের পরিবর্তে মাফ করে দেয়া অধিক উত্তম ৷ যেহেতু মানুষ নিজেকে কষ্ট দিয়ে এই ক্ষমা প্রদর্শন করে তাই আল্লাহ বলেন, এর প্রতিদান দেয়া আমার দায়িত্ব৷ কারণ, সত্য পথ থেকে বিচ্যুত মানুষকে সংশোধনের উদ্দেশ্যে তুমি এই তিক্ততা হজম করেছো॥
৬৭. এই সতর্ক বাণীর মধ্যে প্রতিশোধ গ্রহণ সম্পর্কে তৃতীয় আরেকটি বিধানের প্রতি ইংগিত করা হয়েছে৷ সেটি হচ্ছে, অন্যের কৃত জুলুমের প্রতিশোধ গ্রহণ করতে করতে কোন ব্যক্তির নিজেরই জালেম না হয়ে যাওয়া উচিত৷ একটি অন্যায়ের পরিবর্তে তার চেয়ে বড় অন্যায় করে ফেলা বৈধ নয়৷ উদাহরন স্বরূপ: যদি কেউ অপর কাউকে একটি চপেটাঘাত করে তাহলে সে তাকে একটি চপেটাঘাতই করতে পারে, অসংখ্য লাথি ও ঘুষি মারতে পারে না৷ অনুরূপ গোনাহর, প্রতিশোধ গোনাহর কাজের মাধ্যমে নেয়া ঠিক নয় যেমন কোন জালেম যদি কারোর পুত্রকে হত্যা করে তাহলে তার পুত্রকে হত্যা করা জায়েয না৷ কিংবা কোন দুরাচার যদি কারো বোন বা কন্যার সাথে ব্যাভিচার করে তাহলে সেই ব্যক্তির তার বোন বা কন্যার সাথে ব্যভিচার করা হালাল হবে না৷
৬৮. উল্লেখ্য, এ আয়াতগুলোতে ঈমানদারদের যেসব গুনাবলী বর্ণনা করা হয়েছে তা সেই সময় বাস্তবে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তার সাহাবাদের জীবনে বিদ্যমান ছিল এবং ম্‌ক্কার কাফেররা নিজ চোখে তা দেখছিলো প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ এভাবে কাফেরদের বুঝিয়েছেন যে, পৃথিবীর স্বল্প দিনের জীবন যাপনের যে উপায়-উপকরন লাভ করে তোমরা আত্মহারা হয়ে পড়ছো প্রকৃত সম্পদ ঐ সব উপায়- উপকরন নয়৷ বরং কুরআনের পথনির্দেশনা গ্রহণ করে তোমাদের সমাজের এসব ঈমানদার তাদের মধ্যে যে নৈতিক চরিত্র ও গুণাবলী সৃষ্টি করেছে৷ সেগুলোই প্রকৃত সম্পদ৷
৬৯. অর্থাৎ আল্লাহ এসব লোকের হিদায়াতের জন্য কুরআনের মত সর্বশ্রেষ্ঠ কিতাব পাঠিয়েছেন, যা অত্যন্ত যুক্তিসংগত এবং অত্যন্ত কার্যকর ও চিত্তাকর্ষক উপায়ে প্রকৃত সত্যের জ্ঞান দান করছে এবং জীবনের সঠিক পথ বলে দিচ্ছে৷ তাদের পথপ্রদর্শনের জণ্য মুহাম্মাদুর রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মত নবী পাঠিয়েছেন যার চেয়ে শ্রেষ্ঠ জীবন ও চরিত্রের অধিকারী মানুষ তাদের দৃষ্টি কখনো দেখেনি৷ আল্লাহ এই কিতাব ও এই রসূলের শিক্ষা ও প্রশিক্ষনের সুফলসমূহও ঈমান গ্রহণকারীদেরকে তাদের নিজের চোখে দেখিয়ে দিয়েছেন৷ এসব দেখার পর যদি কোন ব্যক্তি হিদায়াত থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় তাহলে আল্লাহ পুনরায় তাকে সেই গোমরাহীর মধ্যে নিক্ষেপ করবেন যেখান থেকে সে বেরিয়ে আসতে আগ্রহী নয়৷ আর আল্লাহই যখন তাকে তার দরজা থেকে ঠেলে সরিয়ে দেন তখন তাকে সঠিক পথে নিয়ে আসার দায়িত্ব কে নিতে পারে?
৭০. অর্থাৎ আজ যখন ফিরে আসার সুযোগ আছে তখন এরা ফিরে আসতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে৷ কিন্তু কাল যখন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়ে যাবে এবং শাস্তির নির্দেশ কার্যকর হবে তখন নিজেদের দুর্ভাগ্য দেখে এরা ফিরে আসার সুযোগ পেতে চাইবে৷
৭১. মানুষের স্বভাব হচ্ছে, কোন ভয়ানক দৃশ্য যখন তার সামনে থাকে এবং সে বুঝতে পারে, চোখের সামনে যা দেখা যাচ্ছে খুব শীঘ্রই সে তার কবলে পড়তে যাচ্ছে তখন প্রথমেই ভয়ের চোটে চোখ বন্ধ করে নেয়৷ এরপরও যদি তার হাত থেকে রেহাই না পায় তখন দেখার চেষ্টা করে বিপদটা কেমন এবং এখনো তার থেকে কত দূরে আছে৷ কিন্তু মাথা উচু করে ভালভাবে দেখার হিম্মত তার থাকে না৷ তাই সে বার বার একটু একটু করে চোখ খুলে বাঁকা দৃষ্টিতে দেখে এবং ভয়ের চোটে আবার চোখ বন্ধ করে নেয়৷ এ আয়াতে জাহান্নামের দিকে অগ্রসরমান লোকদের এই অবস্থাই এখানে চিত্রিত করা হয়েছে৷
৭২. অর্থাৎ না আল্লাহ নিজে তা ফিরাবেন আর না অন্য কারো তা ফিরানোর ক্ষমতা আছে৷
৭৩. মূল আয়াতাংশ হচ্ছে-----আরবী------ এই আয়াতাংশের আরো কয়েকটি অর্থ আছে৷ এক-তোমরা নিজেদের কৃতকর্মের কোনটিকেই অস্বীকার করতে পারবে না৷ দুই-তোমরা পোশাক বদল করে কোথাও লুকাতে পারবে না৷ তিন-তোমাদের সাথে যে আচরণই করা হোক না কেন তোমরা তার কোন প্রতিবাদ এবং তার বিরুদ্ধে কোন প্রকার অসন্তোষ প্রকাশ করতে পারবে না৷ চার- তোমাদেরকে যে পরিস্থিতির মধ্যে নিক্ষেপ করা হয়েছে তোমরা তা পাল্টিয়ে ফেলতে পারবে না৷
৭৪. অর্থাৎ তোমাদের ওপর এ দায়িত্ব অর্পণ করা হয়নি যে, তোমরা অবশ্যই তাদেরকে সঠিক পথে আনবে অন্যথায় তারা সঠিক পথে আসেনি কেন সে জন্য তোমাদের জাবাবদিহি করতে হবে৷
৭৫. মানুষ বলতে এখানে সেই নীচমনা ও অদূরদর্শী মানুষদের বুঝানো হয়েছে পূর্ব থেকেই যাদের আলোচনা চলে আসছে৷ পার্থিব কিছু সম্পদ লাভ করার কারণে যারা গর্বিত হয়ে উঠেছে এবং বুঝিয়ে সঠিক পথে আনার চেষ্টা করা হলে সেদিকে কানই দেয় না কিন্তু নিজেদের কৃতকর্মের কারণেই যদি কোন সময় তাদের দুর্ভাগ্য এসে যায় তাহলে ভাগ্যকে দোষারোপ করতে থাকে৷ আল্লাহ তাদেরকে যেসব নিয়ামত দান করেন তা সবই ভুলে যায় এবং যে অবস্থার মধ্যে সে পতিত হয়েছে তাতে তার নিজের দোষ-ত্রুটি কতটুকু তা বুঝার চেষ্টা করে না! এভাবে না স্বাচ্ছন্দ্য তাদের সংশোধনে কাজে আসে, না দুরাবস্থা তাদেরকে শিক্ষা দিয়ে সঠিক পথে নিয়ে আসতে পারে৷ বক্তব্যের ধারাবাহিকতার প্রতি লক্ষ্য করলে বুঝা যায়, প্রকৃতপক্ষে এটা ছিল পূর্বোক্ত বক্তব্যের স্রোতাদের প্রতি একটি বিদ্রূপ৷ তবে তাদের সম্বোধন করে একথা বলা হয়নি যে, তোমাদের অবস্থা তো এই ৷ বরং বলা হয়েছে, সাধারণত মানুষের মধ্যে এই দুর্বলতা দেখা যায় এবং এটাই তার নষ্টের মূল কারণ৷ এ থেকে ইসলামের প্রচার কৌশলের একটি দিক এই জানা যায় যে, শ্রোতার দুর্বলতার ওপর সরাসরি আঘাত না করা উচিত৷ সাধারনভাবে এসব দুর্বলতার উল্লেখ করা উচিত যাতে সে ক্ষিপ্ত না হয় এবং তার বিবেকবোধ যদি কিঞ্চিত জীবিত থাকে তাহলে ঠান্ডা মাথায় নিজের ত্রুটি উপলদ্ধি করার চেষ্টা করে৷
৭৬. অর্থাৎ যারা কুফর ও শিরকের নির্বুদ্ধিতার ডুবে আছে তারা যদি বুঝানোর পরও না জানতে চায় না মানুক, সত্য যথা স্থানে সত্যই৷ যমীন ও আসমানের বাদশাহী দুনিয়ার তথাকথিত বাদশাহ, স্বৈরাচারী ও নেতাদের হাতে ছেড়ে দেয়া হয়নি৷ কোন নবী, অলী দেবী বা দেবতার তাতে কোন অংশ নেই, আল্লাহ একাই তার মালিক৷ তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহকারী না নিজের শক্তিতে বিজয়ী হতে পারে, না সেই সব সত্তার কেউ এসে তাকে রক্ষা করতে পারে যাদেরকে মানুষ নিজের নির্বুদ্ধিতার কারণে খোদায়ী ক্ষমতা ও এখতিয়ার সমূহের মালিক মনে করে বসে আছে৷
৭৭. এটা আল্লাহর বাদশাহীর নিরংকুশ(Aboslute) হওয়ার একটি সুস্পষ্ট প্রমাণ৷ কোন মানুষ, সে পার্থিব ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের যত বড় অধিকর্তাই সাজুক না কেন, কিংবা তাকে আধ্যাত্মিক ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের যত বড় মালিকই মনে করা হোক না কেন, অন্যদের সন্তান দেওয়ানো তাকে দূরের কথা নিজের জন্য নিজের ইচ্ছানুসারে সন্তান জন্ম দানেও সে কখনো সক্ষম হয়নি৷ আল্লাহ যাকে বন্ধ্যা করে দিয়েছেন সে কোন ওষুধ , কোন চিকিৎসা এবং কোন তাবীজ কবজ দ্বারা সন্তান ওয়ালা হতে পারেনি৷ আল্লাহ যাকে শুধু কন্যা সন্তান দান করেছেন সে কোনভাবেই একটি পুত্র সন্তান লাভ করতে পারেনি এবং আল্লাহ যাকে শুধু পুত্র সন্তানই দিয়েছেন সে কোনভাবেই একটি কন্যা সন্তান লাভ করতে পারেনি৷ এ ক্ষেত্রে সবাই নিদারুণ অসহায় এমনকি সন্তান জন্মের পূর্বে কেউ এতটুকু পর্যন্ত জানতে পারেনি যে মায়ের গর্ভে পুত্র সন্তান বেড়ে উঠছে না কন্যা সন্তান৷ এসব দেখে শুনেও যদি কেউ খোদার খোদায়ীতে সর্বময় কর্তৃত্বের অধিকারী সেজে বসে, কিংবা অন্য কাউকে ক্ষমতা ও ইখতিয়ারে অংশীদার মনে করে তাহলে সেটা তার নিজের অদূরদর্শিতা যার পরিণাম সে নিজেই ভোগ করবে৷ কেউ নিজে নিজেই কোন কিছু বিশ্বাস করে বসলে তাতে প্রকৃত সত্যের সামান্য কোন পরিবর্তন সাধিত হয় না৷
৭৮. বক্তব্যের সূচনা পর্বে যা বলা হয়েছিলো সমাপ্তি পর্যায়েও সেই বিষয়টিই বলা হচ্ছে৷ কথাটা পুরোপুরি বুঝতে হলে এই সূরার প্রথম আয়াত এবং তার টীকা পুনরায় দেখে নিন৷
৭৯. এখানে অহী অর্থ 'ইলকা', ইলহাম, মনের মধ্যে কোন কথা সৃষ্টি করে দেয়া কিংবা স্বপ্নে কিছু দেখিয়ে দেয়া, যেমন হযরত ইবরাহীম ও ইউসুফকে দেখানো হয়েছিলো (ইউসুফ, আয়াত ৪ ও ১০০ এবং আস সাফফাত, ১০২)
৮০. এর সারমর্ম হচ্ছে, বান্দা শব্দ শুনতে পায় কিন্তু শব্দদাতাকে দেখতে পায় না, যেমন হযরত মূসার ক্ষেত্রে ঘটেছিলো৷ তূর পাহাড়ের পাদদেশে একটি বৃক্ষ থেকে হঠাৎ আওয়াজ আসতে শুরু হলো৷ কিন্তু যিনি কথা বললেন তিনি তার দৃষ্টির আড়ালেই থাকলেন (ত্বাহা আয়াত ১১ থেকে ৪৮, আন নামল, আয়াত ৮ থেকে ১২; আল কাসাস, আয়াত ৩০ থেকে ৩৫)
৮১. যে পদ্ধতিতে নবী-রসূলদের কাছে সমস্ত আসমানী কিতাব এসেছে এটা অহী আসার সেই পদ্ধতি৷ কেউ কেউ এ আয়াতাংশের ভুল ব্যাখ্যা করে এর অর্থ করেছেনঃ আল্লাহ রসূল প্রেরণ করেন যিনি তার নির্দেশে সাধারণ লোকদের কাছে তাঁর বাণী পৌছিয়ে দেন৷" কিন্তু কুরআনের ভাষা-----আরবী-------(তারপর সে তাঁর নির্দেশে তিনি যা চান তাই অহী হিসেবে দেয়৷) তাদের এই ব্যাখ্যার ভ্রান্তি সম্পূর্ণ স্পষ্ট করে দেয়৷ সাধারণ মানুষের সামনে নবীদের তাবলীগী কাজকর্মকে "অহী প্রদান" অর্থে না কুরআনের কোথাও আখ্যায়িত করা হয়েছে, না আরবী ভাষায় মানুষের সাথে মানুষের কথাবার্তাকে 'অহী' শব্দ দ্বারা ব্যাখ্যা করার কোন অবকাশ আছে৷ অহীর আভিধানিক অর্থই হচ্ছে গোপন এবং ত্বরিত ইংগিত ৷ নবী-রসূলদের তাবলীগী কাজকর্ম বুঝাতে এই শব্দটির ব্যবহার শুধু এমন ব্যক্তিই করতে পারে যে আরবী ভাষায় একবারেই অজ্ঞ৷
৮২. অর্থাৎ তিনি কোন মানুষের সাথে সামনা -সামনি কথাবার্তা বলার বহু উর্ধে৷ নিজের কোন বান্দার কাছে নির্দেশনা পৌছিয়ে দেয়ার জন্য সামনা সামনি বাক্যালাপ করা ছাড়া আর কোন কৌশল উদ্ভাবন করতে তার জ্ঞান অক্ষম নয়৷
৮৩. "এভাবেই" অর্থ শুধু শেষ পদ্ধতি নয়, বরং ওপরের আয়াতে যে তিনটি পদ্ধতি উল্লেখিত হয়েছে তার সব কটি৷ আর 'রূহ' অর্থ অহী অথবা অহীর মাধ্যমে নবীকে (সা) যে শিক্ষা দান করা হয়েছে সেই শিক্ষা৷ কুরআন ও হাদীস থেকেই একথা প্রমাণিত যে, এই তিনটি পদ্ধতিতেই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে হিদায়াত দান করা হয়েছে:

একঃ হাদীস শরীফে হযরত আয়েশা থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে অহী আসার সূচনা হয়েছিল সত্য স্বপ্নের আকারে (বুখারী ও মুসলিম) ৷ এই ধারা পরবর্তী সময় পর্যন্ত জারি ছিল৷ তাই হাদীসে তার বহু সংখ্যক স্বপ্নের উল্লেখ দেখা যায়৷ যার মাধ্যমে হয় তাকে কোন শিক্ষা দেয়া হয়েছে কিংবা কোন বিষয়ে অবহিত করা হয়েছে৷ তাছাড়া কুরআন মজীদে নবীর (সা) একটি স্বপ্নের সুস্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে (আল ফাতহু, আয়াত-২৭)৷ তাছাড়া কতিপয় হাদীসে একথারও উল্লেখ আছে যে, নবী (সা) বলেছেন, আমার মনে অমুক বিষয়টি সৃষ্টি করে দেয়া হয়েছে, কিংবা আমাকে একথাটি বলা হয়েছে বা আমাকে এই নির্দেশ দান করা হয়েছে অথবা আমাকে এ কাজ করতে নিষেধ করা হয়েছে৷ এ ধরনের সব কিছু অহীর প্রথমোক্ত শ্রেণীর সাথে সম্পর্কিত৷ বেশীর ভাগ হাদীসে কুদসী এই শ্রেণীরই অন্তর্ভুক্ত৷

দুইঃ মে'রাজে নবীকে (সা) দ্বিতীয় প্রকার অহী দ্বারা সম্মানতি করা হয়েছে৷ কতিপয় হাদীসে নবীকে (সা) পাঁচ ওয়াক্ত নামাযের নির্দেশ দেয়া এবং তা নিয়ে তাঁর বার বার দরখাস্ত পেশ করার কথা যেভাবে উল্লেখিত হয়েছে তা থেকে স্পষ্ট বুঝা যায়, সে সময় আল্লাহ এবং তার বান্দা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মধ্যে ঠিক তেমনি কথাবার্তা হয়েছিলো যেমনটি তূর পাহাড়ের পাদদেশে মূসা (আ) ও আল্লাহর মধ্যে হয়েছিলো৷

তিনঃ এরপর থাকে অহীর তৃতীয় শ্রেণী৷ এ ব্যাপারে কুরআন নিজেই সাক্ষ্য দান করে যে, কুরআনকে জিবরাঈল আমীনের মাধ্যমে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে পৌছানো হয়েছে (আল বাকারা ৯৭, আশ শু'আরা ১৯২ থেকে ১৯৫ আয়াত)৷
৮৪. অর্থাৎ নবুওয়াতের মর্যাদায় ভূষিত হওয়ার আগে নবীর (সা) মগজে এ ধারণা পর্যন্তও কোন দিন আসেনি যে, তিনি কোন কিতাব লাভ করতে যাচ্ছেন বা তাঁর লাভ করা উচিত৷ বরং তিনি আসমানী কিতাব এবং তার বিষয়বস্তু সম্পর্কে আদৌ কিছু জানতেন না৷ অনুরূপ আল্লাহর প্রতি তাঁর ঈমান অবশ্যই ছিল৷ কিন্তু মানুষকে আল্লাহ সম্পর্কে কি কি বিষয় মানতে হবে সচেতনভাবে তিনি তার বিস্তারিত কিছুই জানতেন না৷একথাও তাঁর জানা ছিল না যে, এর সাথে ফেরেশতা, নবুওয়াত, আল্লাহর কিতাবসমূহ এবং আখেরাত সম্পর্কে অনেক কিছুই মানা আবশ্যক ৷ এ দুটি ছিল এমনই বিষয় যা মক্কার কাফেরদের কাছেও গোপন ছিল না৷ মক্কার কোন মানুষই এ প্রমাণ দিতে সক্ষম ছিল না যে, হঠাৎ নবুওয়াত ঘোষণার পূর্বে সে কখনো নবীর (সা) মুখে আল্লাহর কিতাবের কথা শুনেছে কিংবা মানুষদের অমুক অমুক বিষয়ের প্রতি ঈমান আনতে হবে এমন কোন কথা শুনেছে৷ একথা সুস্পষ্ট যদি কোন ব্যক্তি পূর্ব থেকেই নবী হওয়ার প্রস্তুতি গ্রহণ করে থাকে তাহলে চল্লিশ বছর পর্যন্ত রাত দিন তার সাথে উঠাবসা করেও কেউ তার মুখ থেকে কিতাব ও ঈমান শব্দ পর্যন্ত শুনবে না৷ অথচ চল্লিশ বছর পর সে ঐ সব বিষয়েই হঠাৎ জোরালো বক্তব্য পেশ করতে শুরু করবে তা কখনো হতে পারে না৷
৮৫. এটা কাফেরদের বিরুদ্ধে উচ্চারিত শেষ সতর্কবাণী৷ এর তাৎপর্য হলো, নবী (সা) বললেন আর তোমরা তা শুনে প্রত্যাখ্যান করলে কথা এখানেই শেষ হয়ে যাবে না৷ পৃথিবীতে যা কিছু ঘটছে তার সবই আল্লাহর সামনে পেশ করা হবে এবং সবশেষে কার কি পরিণাম হবে সে চূড়ান্ত ফায়সালা তার দরবার থেকেই হবে৷