(৪২:১০) তোমাদের ১৩ মধ্যে যে ব্যাপারেই মতানৈক্য হোকনা কেন তার ফয়সালা করা আল্লাহর কাজ৷১৪ সেই আল্লাহই আমার ১৫ রব, আমি তাঁর ওপরেই ভরসা করেছি এবং তাঁর কাছেই আমি ফিরে যাই৷১৬
(৪২:১১) আসমান ও যমীনের স্রষ্টা, যিনি তোমাদের আপন প্রজাতি থেকে তোমাদের জোড়া সৃষ্টি করেছেন, অনুরূপ অন্যান্য জীবজন্তুর ও (তাদের নিজ প্রজাতি থেকে ) জোড়া বানিয়েছেন এবং এই নিয়মে তিনি তোমাদের প্রজন্মের বিস্তার ঘটান৷ বিশ্বজাহানের কোন কিছুই তাঁর সদৃশ নয়৷১৭ তিনি সব কিছু শোনেন ও দেখেন৷১৮
(৪২:১২) আসমান ও যমীনের ভান্ডারসমূহের চাবি তাঁরই হাতে, যাকে ইচ্ছা অঢেল রিযিক দান করেন এবং যাকে ইচ্ছা মেপে দেন৷ তিনি সব কিছু জানেন৷১৯
(৪২:১৩) তিনি তোমাদের জন্য দীনের সেই সব নিয়ম-কানুন নির্ধারিত করেছেন যার নির্দেশ তিনি নূহকে দিয়েছিলেন এবং ( হে মুহাম্মাদ) যা এখন আমি তোমার কাছে ওহীর মাধ্যমে পাঠিয়েছি৷ আর যার আদেশ দিয়েছিলাম আমি ইবরাহীম (আ) মূসা (আ) ও ঈসা (আ)৷ তার সাথে তাগিদ করেছিলাম এই বলে যে, এ দীনকে কায়েম করো এবং এ ব্যাপারে পরস্পর ভিন্ন হয়ো না৷২০ (হে মুহাম্মাদ) এই কথাটিই এসব মুশরিকের কাছে অত্যন্ত অপছন্দনীয় যার দিকে তুমি তাদের আহবান জানাচ্ছো৷ আল্লাহ যাকে ইচ্ছা আপন করে নেন এবং তিনি তাদেরকেই নিজের কাছে আসার পথ দেখান যারা তাঁর প্রতি রুজু করে৷২১
(৪২:১৪) মানুষের কাছে যখন জ্ঞান এসে গিয়েছিল তারপরই তাদের মধ্যে বিভেদ দেখা দিয়েছে৷২২ আর তা হওয়ার কারণ তারা একে অপরের বিরুদ্ধে বাড়াবাড়ি করতে চাচ্ছিলো৷২৩ একটি নিদিষ্ট সময় পর্যন্ত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত মূলতবী রাখা হবে একথা যদি তোমর রব পূর্বেই ঘোষণা না করতেন তাহলে তাদের বিবাদের চুড়ান্ত ফায়সালা করে দেয়া হতো৷২৪ প্রকৃত ব্যাপার হচ্ছে, পূর্ববর্তীদের পরে যাদের কিতাবের উত্তরাধিকারী করা হয়েছে তারা সে ব্যাপারে বড় অস্বস্তিকর সন্দেহের মধ্যে পড়ে আছে৷২৫
(৪২:১৫) যেহেতু এরূপ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে, তাই হে মুহাম্মাদ এখন তুমি সেই দীনের দিকেই আহবান জানাও এবং যেভাবে তুমি আদিষ্ট হয়েছো সেভাবে দৃঢ়তার সাথে তা আঁকড়ে ধরো এবং এসব লোকের ইচ্ছা আকাংখার অনুসরণ করো না৷২৬ এদের বলে দাও, আল্লাহ যে কিতাব নাযিল করেছেন আমি তার ওপর ঈমান এনেছি৷২৭ আমাকে আদেশ দেয়া হয়েছে যেন তোমাদের মধ্যে ইনসাফ করি৷২৮ আল্লাহই আমাদেরও রব এবং তোমাদেরও রব তিনিই৷ আমাদের কাজকর্ম আমাদের জন্য আর তোমাদের কাজকর্ম তোমাদের জন্য৷২৯ আমাদের ও তোমাদের মাঝে কোন বিবাদ নেই৷৩০ একদিন আল্লাহ আমাদের সবাইকে একত্রিত করবেন৷ তাঁর কাছেই সবাইকে যেতে হবে৷”
(৪২:১৬) আল্লাহর আহবানে সাড়া দান করার পরে যারা (সাড়া দানকারীদের সাথে) আল্লাহর দীনের ব্যাপারে বিবাদ করে ৩১ আল্লাহর কাছে তাদের যুক্তি ও আপত্তি বাতিল৷ তাদের ওপর আল্লাহর গযব, আর তাদের জন্য রয়েছে কঠিন আযাব৷
(৪২:১৭) এই কিতাব ও মিযান যথাযথভাবে আল্লাহই নাযিল করেছেন৷৩২ তুমি তো জান না, চূড়ান্ত ফায়সালার সময় হয়তো অতি নিকটবর্তী হয়ে পড়েছে৷৩৩
(৪২:১৮) যারা তা আসবে বলে বিশ্বাস করে না তারাই তার জন্য তাড়াহুড়া করে ৷ কিন্তু যারা তা বিশ্বাস করে তারা তাকে ভয় করে৷ তারা জানে, অবশ্যই তা আসবে৷ ভাল করে শুনে নাও, যারা সেই সময়ের আগমনের ব্যাপারে সন্দেহ সৃষ্টি করার জন্য বিতর্ক করে তারা গোমরাহীর মধ্যে বহুদূর অগ্রসর হয়েছে৷
(৪২:১৯) আল্লাহ তাঁর বান্দাদের প্রতি অত্যন্ত দয়াবান৷৩৪ যাকে যা ইচ্ছা তাই দান করেন৷ ৩৫ তিনি মহা শক্তিমান ও মহা পরাক্রমশালী৷৩৬
১৩. এই গোটা অনুচ্ছেদটি যদিও আল্লাহর পক্ষ থেকে ওহীর মাধ্যমে বলা হয়েছে, কিন্তু বক্তা এখানে আল্লাহ নন, আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম৷ মহান আল্লাহ যেন তাঁর নবীকে নির্দেশ দিচ্ছেন, তুমি একথা ঘোষণা করো৷ কুরআন মজীদে এ ধরনের বিষয়বস্তু কোথাও (আরবী : .....) (হে নবী, তুমি বলো ) শব্দ দ্বারা শুরু হয় এবং কোথাও তা ছাড়াই শুরু হয়৷ সে ক্ষেত্রে কথার ভঙ্গিই বলে দেয়, এখানে বক্তা আল্লাহ নন, আল্লাহর রসূল৷ কোন কোন স্থানে তো আল্লাহর বাণীর বক্তা থাকেন ঈমানদারগণ৷ এর উদাহরণ সূরা ফাতেহা, কিংবা ফেরেশতাগণ৷ যেমন সূরা মারয়ামের ৬৪ থেকে ৬৫ আয়াত৷
১৪. এটা আল্লাহর বিশ্ব জাহানের অধিপতি এবং সত্যিকার অভিভাবক হওয়ার স্বভাবিক ও যৌক্তিক দাবী৷ রাজত্ব ও অভিভাবকত্ব যখন তাঁরই তখন শাসকও অনিবার্যরূপে তিনিই এবং মানুষের পারস্পরিক ঝগড়া-বিবাদ ও মতানৈক্যের ফায়সালা করাও তাঁরই কাজ৷ যারা এ বিষয়টিকে আখেরাতের জন্য নির্দিষ্ট বলে মনে করে তারা ভুল করে৷ আল্লাহর এই সার্বভৌম মর্যাদা যে এই দুনিয়ার জন্য নয়, শুধু মৃত্যুর পরের জীবনের জন্য তার কোন প্রমাণ নেই৷ একইভাবে যারা তাঁকে শুধু এই দুনিয়ার আকীদা-বিশ্বাস এবং কতিপয় ধর্মীয় বিষয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ মনে করে তারাও ভুল করে৷ কুরআন মজীদের ভাষা ব্যাপক অর্থব্যঞ্জক৷ তাতে সব রকম বিবাদ ও মতানৈক্যের ক্ষেত্রে তা একমাত্র আল্লাহকেই ফায়সালা করার প্রকৃত অধিকারী বলে পরিষ্কার ও সুনিশ্চিতভাবে আখ্যায়িত করছে৷ সেই অনুসারে আল্লাহ যেমন আখিরাতের ( আরবী :.........) (প্রতিদান দিবসের মালিক ) তেমনি এই পৃথিবীরও (আরবীঃ ..............) (সব শাসকের চাইতে বড় শাসক)৷ আকীদাগত মতানৈক্যের ক্ষেত্রে হক কোনটি আর বাতিল কোনটি সে বিষয়ের ফায়সালা যেমন তিনিই করবেন তেমনি আইনগত ক্ষেত্রেও তিনিই ফায়সালা করবেন মানুষের জন্য কোনটি পবিত্র আর কোনটি অপবিত্র, কোনটি বৈধ ও হালাল আর কোনটি হারাম ও মাকরুহ? নৈতিকতার ক্ষেত্রে অন্যায় ও অশোভন কি আর ন্যায় শোভনীয় কি? পারস্পরিক লেনদেনের ক্ষেত্রে কোনটি কার প্রাপ্য আর কোনটি প্রাপ্য নয়? জীবনাচার, সভ্যতা, রাজনীতি এবং অর্থনীতির ক্ষেত্রে কোন পন্থা ও পদ্ধতি বৈধ আর কোনটি ভুল ও অবৈধ তাঁর সবই তিনি স্থির করবেন৷ এর ওপর ভিত্তি করেই তো আইনের মূলনীতি হিসেবে কুরআন মজীদে একথা বিধিবদ্ধ করে দেয়া হয়েছে যে,

আরবী : ...........................................................................

(যদি কোন ব্যাপারে তোমরা বিবাদে জড়িয়ে পড়ো তাহলে সেটিকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের কাছে ফিরিয়ে দাও )

আরবী : ...........................................................................

(আল্লাহ ও তাঁর রসূল যখন কোন ব্যাপারে ফায়সালা করে দেন তখন মু'মিন পুরুষ ও মু'মিন নারীর জন্য সে ব্যাপারে কোন ইখতিয়া থাকে না )এবং

আরবী : ...........................................................................

(তোমাদের রবের পক্ষ থেকে তোমাদের কাছে যা নাযিল করা হয়েছে তার অনুসরণ করো এবং তাঁকে ছাড়া অন্য কাউকে অভিভাবক হিসেবে গ্রহণ করো না৷)

তাছাড়া যে প্রসঙ্গে এ আয়াত এসেছে তার মধ্যেও এটি আরো একটি অর্থ প্রকাশ করছে৷ সেটি হচ্ছে আল্লাহ শুধু মতবিরোধসমূহের মীমাংসা করার আইনগত অধিকারীই নন, যা মানা আর না মানার ওপর ব্যক্তির কাফের বা মু'মিন হওয়া নির্ভরশীল৷ বরং প্রকৃতপক্ষে কার্যত তিনিই হক ও বাতিলের ফায়সালা করছেন, যে কারণে বাতিল ও তার পূজারীরা শেষ পর্যন্ত ধ্বংস হয় এবং হক ও তার অনুসারীরা সফলকাম হয়৷ পৃথিবীর মানুষ যে ফায়সালা কার্যকর হওয়ার ক্ষেত্রে বিলম্ব হচ্ছে বলে যতই মনে করুক না কেন তাতে কিছু আসে যায় না৷ পরবর্তী ২৪ আয়াতেও এ বিষয়টি বর্ণিত হয়েছে এবং এর আগেও কুরআন মজীদের কতিপয় স্থানে আলোচিত হয়েছে৷ (দেখুন, তাফহীমূল কুরআন, সূরা আর রা'দ, টীকা ৩৪-৬০; সূরা ইবরাহীম, টীকা ২৬-৩৪; সূরা বনী ইসরাঈল, টীকা ১০০; সূরা আম্বিয়া ১৫, ১৮-৪৪, ৪৬)
১৫. অর্থাৎ যিনি মতবিরোধসমূহের ফায়সালাকারী আসল শাসক৷
১৬. এ দু'টি ক্রিয়াপদ৷ এর একটি অতীতকাল সূচক শব্দ দ্বারা প্রকাশ করা হয়েছে এবং অপরটি বর্তমান ও ভবিষ্যতকাল সূচক শব্দ দ্বারা প্রকাশ করা হয়েছে : আমি তাঁর ওপরেই ভরসা করেছি৷ "অর্থাৎ একবার আমি চিরদিনের জন্য চূড়ান্ত সিন্ধান্ত গ্রহণ করেছি যে, মৃত্যু পর্যন্ত আমাকে তাঁরই সাহায্য, তাঁরই দিক নির্দেশনা, তাঁরই আশ্রয় ও সংরক্ষণ এবং তাঁরই সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করতে হবে৷ অতপর বর্তমান ও ভবিষ্যত সূচক ক্রিয়াপদটিতে বলা হয়েছে : আমি তাঁর কাছেই ফিরে যাই৷" অর্থাৎ আমার জীবনে যা-ই ঘটে সে ব্যাপারে আমি আল্লাহর কাছেই ফিরে যাই৷ কোন বিপদাপদ, দুঃখ -কষ্ট বা অসুবিধার সম্মুখীন হলে আর কারো মুখাপেক্ষী না হয়ে তাঁর কাছে সাহায্য প্রর্থনা করি৷ কোন বিপদ আপতিত হলে তাঁর আশ্রয় তালাশ করি এবং তাঁর নিরাপত্তার ওপর নির্ভর করি৷ কোন সমস্যা দেখা দিলে তাঁর কাছে দিক নির্দেশনা চাই এবং তারই শিক্ষা ও নির্দেশনামায় সে সমস্যার সমাধান ও সিদ্ধান্ত অনুসন্ধান করি৷ আর কোন বিবাদের মুখোমুখি হলে তাঁরই দিকে চেয়ে থাকি৷ কেননা, তিনিই তার চূড়ান্ত ফায়সালা করবেন৷ আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি এ বিষয়ে তিনি যে ফায়সালা করবেন সেটিই হবে সঠিক ও ন্যায়সংগত৷
১৭. মূল আয়াতে ব্যবহৃত হয়েছে (আরবীঃ................) " কোন জিনিসই তাঁর মত জিনিসের অনুরূপও নয়৷" তাফসীরকার ও ভাষাবিদদের কেউ বলেন : এ বাক্যাংশে (আরবী .:............) শব্দটির কাফ বর্নটি (সামঞ্জস্যের অর্থ প্রকাশক হরফ) সংযোজন বাকধারা হিসেবে করা হয়েছে৷ বক্তব্যকে জোরালো করাই এর উদ্দেশ্য হয়ে থাকে এবং আরবে এ ধরনের বর্ণনাভঙ্গি প্রচলিত৷ যেমন : কবি বলেন : (আরবী :...................)অন্য আরেকজন কবি বলেছেন : (আরবী :...............) অপর কিছু সংখ্যক লোকের মত হলো : "তাঁর মত কেউ নেই" বলার চেয়ে তাঁর মত জিনিসের অনুরূপও কেউ নেই বলার মধ্যে অতিশয়তার অর্থ আছে৷ অর্থাৎ আল্লাহর মত তো দূরের কথা ৷অসম্ভব হলেও যদি আল্লাহর সদৃশ কোন বস্তু আছে বলে ধরে নেয়া যায়, তাহলে সেই সদৃশের অনুরূপ কোন জিনিসও থাকতো না৷
১৮. অর্থাৎ একই সাথে গোটা বিশ্ব জাহানের সবারই কথা শুনছেন এবং সব কিছুই দেখছেন৷
১৯. শুধু একমাত্র আল্লাহই কেন প্রকৃত অভিভাবক, তাঁর ওপর নির্ভর করাই যুক্তিযুক্ত ও সঠিক কেন এবং কেন শুধু তার কাছে ফিরে যেতে হবে, এগুলোই তার যুক্তি৷(ব্যাখ্যার জন্য দেখুন, তাফহীমূল কুরআন, সূরা আন নামল, টীকা ৭৩-৮৩; সূরা আর রূম টীকা ২৫-৩১)
২০. প্রথম আয়াতে যে কথাটি বলা হয়েছিলো এখানে সেই কথাটিই আরো বেশী পরিষ্কার করে বলা হয়েছে৷ এখানে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে যে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোন নতুন ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা নন৷ নবী-রসূলদের মধ্যে কেউই কোন নতুন ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন না৷ প্রথম থেকেই সমস্ত নবী-রসূল আল্লাহর পক্ষ থেকে একই দীন পেশ করে আসছেন৷ মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলইহি ওয়া সাল্লামও সেই একই দীন পেশ করছেন৷ এ প্রসঙ্গে সর্বপ্রথম হযরত নূহের নাম উল্লেখ করা হয়েছে৷ মহাপ্লাবনের পর তিনিই ছিলেন বর্তমান মানব গোষ্ঠীর সর্বপ্রথম পয়গস্বর৷ তারপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নাম উল্লেখ করা হয়েছে, যিনি শেষ নবী৷ তারপর হযরত ইবরাহীমের (আ) নাম উল্লেখ করা হয়েছে, আরবের লোকেরা যাঁকে তাদের নেতা বলে মানতো৷ সর্বশেষে হযরত মুসা এবং ঈসার কথা বলা হয়েছে যাদের সাথে ইহুদী ও খৃস্টানরা তাদের ধর্মকে সম্পর্কিত করে থাকে৷ এর উদ্দেশ্য এ নয় যে, শুধু এই পাঁচজন নবীকেই উক্ত দীনের হিদায়াত দান করা হয়েছিলো৷ বরং একথা বলে দেয়াই এর উদ্দেশ্য যে , পৃথিবীতে যত নবী-রসূলই আগমন করেছেন তাঁরা সবাই একই দীন নিয়ে এসেছেন৷ নমুনা হিসেবে এমন পাঁচজন মহান নবীর নাম উল্লেখ করা হয়েছে যাঁদের মাধ্যমে দুনিয়ার মানুষ সুবিখ্যাত আসমানী শরীয়তসমূহ লাভ করেছে৷

যেহেতু এ আয়াতটি দীন ও দীনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে আলোকপাত করেছে৷ তাই সে বিষয়ে ভালোভাবে চিন্তা-ভাবনা করে তাকে বুঝে নেয়া আবশ্যক :

বলা হয়েছে (আরবী : ...............) "তোমাদের জন্য নির্ধরিত করেছেন৷" (আরবী :...........)শব্দের আভিধানিক অর্থ রাস্তা তৈরী করা এবং এর পারিভাষিক অর্থ পদ্ধতি, বিধি ও নিয়ম-কানুন রচনা করা৷ এই পারিভাষিক অর্থ অনুসারে আরবী ভাষায় (আরবী : ...........) শব্দটি আইন প্রণয়ন ............... এবং ............. শব্দটি আইন এবং ............ শব্দটি আইন প্রণেতার সমার্থক বলে মনে করা হয়৷ আল্লাহই বিশ্ব জাহানের সব কিছুর মালিক, তিনিই মানুষের প্রকৃত অভিভাবক এবং মানুষের মধ্যে যে বিষয়েই মতভেদ হোক না কেন তার ফায়সালা করা তাঁরই কাজ৷ কুরআন মজীদের বিভিন্ন স্থানে এ ধরনের যেসব মৌলিক সত্য বর্ণিত হয়েছে তারই স্বাভাবিক ও যৌক্তিক পরিণতি হচ্ছেআল্লাহর এই আইন রচনা৷ এখন মৌলিকভাবে যেহেতু আল্লাহই মালিক, অভিভাবক ও শাসক, তাই মানুষের জন্য আইন ও বিধি রচনার এবং মানুষকে এই আইন ও বিধি দেয়ার অনিবার্য অধিকার তাঁরই৷ আর এভাবে তিনি তাঁর দায়িত্ব পালন করেছেন৷

পরে বলা হয়েছে .............. 'দীন' থেকে শাহ ওয়ালী উল্লাহ দেহলবী এর অনুবাদ করেছেন আইন থেকে৷ অর্থাৎ আল্লাহ শরীয়ত নির্ধারণ করেছেন আইনের পর্যায়ভুক্ত৷ আমরা ইতিপূর্বে সূরা যুমারে ৩ নং টীকায় ......... শব্দের যে ব্যাখ্যা করেছি তা যদি সামনে থাকে তাহলে একথা বুঝতে কোন অসুবিধা হওয়ার কথা নয় যে, দীন অর্থই কারো নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব মেনে নিয়ে তার আদেশ-নিষেধের আনুগত্য করা৷ এ শব্দটি যখন পন্থা বা পদ্ধতি অর্থে ব্যবহার করা হয় তখন তার অর্থ হয় এমন পদ্ধতি যাকে ব্যক্তি অবশ্য অনুসরনীয় পদ্ধতি এবং তার যার নির্ধারণকারীকে অবশ্য অনুসরণযোগ্য বলে মেনে চলে৷ এ কারণে আল্লাহর নির্ধারিত এই পদ্ধতিকে দীনের বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন আইন বলার পরিষ্কার অর্থ হলো এটা শুধু সুপারিশ (Recomendation) ও ওয়াজ-নসীহতের মর্যাদা সম্পন্ন নয়৷ বরং তা বান্দার জন্য তার মালিকের অবশ্য অনুসরনীয় আইন, যার অনুসরণ না করার অর্থ বিদ্রোহ করা৷ যে ব্যক্তি তা অনুসরণ করে না সে প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর আধিপত্য, সার্বভৌমত্ব এবং দাসত্ব অস্বীকার করে৷

এর পরে বলা হয়েছে, দীনের বৈশিষ্ট্য মন্ডিত এ আইনই সেই আইন যার নির্দেশ দেয়া হয়েছিলো নূহ , ইবরাহীম ও মূসা আলাইহিমুস সালামকে এবং এখন মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সে নির্দেশই দান করা হয়েছে৷ এ বাণী থেকে কয়েকটি বিষয় প্রতিভাত হয়৷ এক -আল্লাহ এ বিধানকে সরাসরি সব মানুষের কাছে পাঠাননি, রবং মাঝে মধ্যে যখনই তিনি প্রয়োজন মনে করেছেন এক ব্যক্তিকে তাঁর রসূল মনোনীত করে এ বিধান তার কাছে সোপর্দ করেছেন৷ দুই-প্রথম থেকেই এ বিধান এক ও অভিন্ন৷ এমন নয় যে, কোন জাতির জন্য কোন একটি দীন নির্দিষ্ট করা হয়েছে এবং অন্য সময় অপর এক জাতির জন্য তা থেকে ভিন্ন ও বিপরীত কোন দীন পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে৷ আল্লাহর পক্ষ থেকে একাধিক দীন আসেনি৷ বরং যখনই এসেছে এই একটি মাত্র দীনই এসেছে৷ তিন-আল্লাহর আধিপত্য ও সার্বভৌমত্ব মানার সাথে সাথে যাদের মাধ্যমে এ বিধান পাঠানো হয়েছে তাদের রিসালাত মানা এবং যে অহীর দ্বারা এ বিধান বর্ণনা করা হয়েছে তা মেনে নেয়া এ দীনেরই অবিচ্ছেদ্য অংশ ৷ জ্ঞান-বুদ্ধি ও যুক্তির দাবীও তাই৷ কারণ, যতক্ষণ পর্যন্ত তা আল্লাহর তরফ থেকে বিশ্বাসযোগ্য হওয়া সম্পর্কে ব্যক্তি নিশ্চিত না হবে ততক্ষণ সে এই আনুগত্য করতেই পারে না৷

অতপর বলা হয়েছে, এসব নবী-রসূলদেরকে দীনকে বৈশিষ্ট্য মন্ডিত এই বিধান দেয়ার সাথে তাগিদসহ এ নির্দেশও দেয়া হয়েছিলো যে, ............. শাহ ওয়ালী উল্লাহ দেহলবী এ আয়াতাংশের অনুবাদ করেছেন, "দীনকে কায়েম করো" আর শাহ রফিউদ্দিন ও শাহ আবদুল কাদের অনুবাদ করেছেন, "দীনকে কায়েম রাখো" এই দু'টি অনুবাদই সঠিক৷ আরবী ................. শব্দের অর্থ কায়েম করা ও কায়েম রাখা উভয়ই৷ নবী-রসূলগণ আলাইহিমুস সালাম এ দু'টি কাজ করতেই আদিষ্ট ছিলেন৷ তাঁদের প্রথম দায়িত্ব ও কর্তব্য ছিল, যেখানে এই দীন কায়েম নেই সেখানে তা কায়েম করা৷ আর দ্বিতীয় দায়িত্ব ও কর্তব্য ছিল যেখানে তা কায়েম হবে কিংবা পূর্ব থেকেই কায়েম আছে সেখানে তা কায়েম রাখা৷ একথা সুস্পষ্ট যে কোন জিনিসকে কায়েম রাখার প্রশ্ন তখনই আসে যখন তা কায়েম থাকে৷ অন্যথায় প্রথমে তা কায়েম করতে হবে, তারপর তা যাতে কায়েম থাকে সে জন্য ক্রমাগত প্রচেষ্টা চালাতে হবে৷

এই পর্যায়ে আমাদের সামনে দু'টি প্রশ্ন দেখা দেয়৷ একটি হলো, দীন কায়েম করার অর্থ কি? অপরটি হলো, দীন অর্থই বা কি যা কায়েম করার এবং কায়েম রাখার আদেশ দেয়া হয়েছে? এ দু'টি বিষয়ও ভালভাবে বুঝে নেয়া দরকার৷

কায়েম করা কথটি যখন কোন বস্তুগত বা দেহধারী জিনিসের জন্য ব্যবহৃত হয় তখন তার অর্থ হয় উপবিষ্টকে উঠানো৷ যেমন কোন মানুষ বা জন্তুকে উঠানো৷ কিংবা পড়ে থাকা জিনিসকে উঠিয়ে দাঁড় করানো৷ যেমন বাঁশ বা কোন থাম তুলে দাঁড় করানো অথবা কোন জিনিসের বিক্ষিপ্ত অংশগুলোকে একত্র করে সমুন্নত করা৷ যেমন : কোন খালি জায়গায় বিল্ডিং নির্মাণ করা৷ কিন্তু যা বস্তুগত জিনিস নয়, অবস্তুগত জিনিস তার জন্য যখন কায়েম করা শব্দটা ব্যবহার করা হয় তখন তার অর্থ শুধু সেই জিনিসের প্রচার করাই নয়, বরং তা যথাযথভাবে কার্যে পরিণত করা , তার প্রচলন ঘটানো এবং কার্যত চালু করা৷ উদাহরন স্বরূপ যখন আমরা বলি, অমুক ব্যক্তি তার রাজত্ব কায়েম করেছে তখন তার অর্থ এ হয় না যে, সে তার রাজত্বের দিকে আহবান জানিয়েছে৷ বরং তার অর্থ হয়, সে দেশের লোকদেরকে নিজের অনুগত করে নিয়েছে এবং সরকারের সকল বিভাগে এমন সংগঠন ও শৃংখলা প্রতিষ্ঠা করেছে যে, দেশের সমস্ত ব্যবস্থাপনা তার নির্দেশ অনুসারে চলতে শুরু করেছে৷ অনুরূপ যখন আমরা বলি, দেশে আদালত কায়েম আছে তখন তার অর্থ হয় ইনসাফ করার জন্য বিচারক নিয়োজিত আছেন৷ তিনি মোকদ্দমা সমূহের শুনানি করছেন এবং ফায়সালা দিচ্ছেন৷ একথার এ অর্থ কখনো হয় না যে, ন্যায় বিচার ও ইনসাফের গুণাবলী ও বৈশিষ্ট্যর বর্ণনা খুব ভালভাবে করা হচ্ছে এবং মানুষ তা সমর্থন করছে৷ অনুরূপভাবে কুরআন মজীদে যখন নির্দেশ দেয়া হয়, নামায কায়েম করো তখন তার অর্থ কুরআন মজীদের দাওয়াত ও তাবলগি নয়, বরং তার অর্থ হয় নামাযের সমস্ত শর্তবলী পূরণ করে শুধু নিজে আদায় করা না বরং এমন ব্যবস্থা করা যেন ঈমানদারদের মধ্যে তা নিয়মিত প্রচলিত হয়৷ মসজিদের ব্যবস্থা থাকে, গুরুত্বের সাথে জুমআ ও জামা'য়াত ব্যবস্থা হয়, সময়মত আযান দেয়া হয়, ইমাম ও খতিব নির্দিষ্ট থাকে এবং মানুষের মধ্যে সময়মত মসজিদে আসা ও নামায আদায় করার অভ্যাস সৃষ্টি হয়৷ এই ব্যাখ্যার পরে একথা বুঝতে কষ্ট হবার কথা নয় যে, নবী-রসূল আলাইহিমুস সালামদের যখন এই দীন কায়েম করার ও রাখার যে নির্দেশ দেয়া হয়েছিলো, তার অর্থ শুধু এতটুকুই ছিল না যে, তাঁরা নিজেরাই কেবল এ দীনের বিধান মেনে চলবেন এবং অন্যদের কাছে তার তাবলীগ বা প্রচার করবেন , যাতে মানুষ তার সত্যতা মেনে নেয়৷ বরং তার অর্থ এটিও যে মানুষ যখন তা মেনে নেবে তখন আরো অগ্রসর হয়ে তাদের মাঝে পুরো দীনের প্রচলন ঘটাবেন, যাতে সে অনুসারে কাজ আরম্ভ হতে এবং চলতে থাকে৷ এ ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই যে দাওয়াত ও তাবলীগ এ কাজের অতি আবশ্যিক প্রাথমিক স্তর৷ এই স্তর ছাড়া দ্বিতীয় স্তর আসতেই পারে না৷ কিন্তু প্রত্যেক বিবেক-বুদ্ধি সম্পন্ন ব্যক্তিই বুঝতে পারবেন এই নির্দেশের ,মধ্যে দীনের দাওয়াত ও তাবলিগকে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বানানো হয়নি, দীনকে কায়েম করা ও কায়েম রাখাকেই উদ্দেশ্য বানানো হয়েছে৷ দাওয়াত ও তাবলীগ অবশ্যই এ উদ্দেশ্য সাধনের মাধ্যম, কিন্তু মূল উ‌দ্দেশ্য ও লক্ষ্য নয়৷ নবী-রসূলদের মিশনের একমাত্র উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য দাওয়াত ও তাবলীগ করো একথা বলা একেবারেই অবান্তর৷

এখন দ্বিতীয় প্রশ্নটি দেখুন৷ কেউ কেউ দেখলেন, যে দীন কায়েম করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে তা সমানভাবে সমস্ত নবী-রসূলের দীন৷ কিন্তু তাদের সবার শরীয়ত ছিল ভিন্ন ভিন্ন ৷ যেমন আল্লাহ কুরআন মজীদে বলেছেন (আরবী : ........................)"আমি তোমাদের প্রত্যেক উম্মতের জন্য স্বতন্ত্র শরীয়তের এবং একটি পদ্ধতি নির্ধারিত করে দিয়েছি" ৷ তাই তারা ধরে নিয়েছে যে, এ দীন অর্থ নিশ্চয়ই আদেশ-নিষেধ ও বিধি-বিধান নয়, এর অর্থ শুধু তাওহীদ, আখেরাত, কিতাব ও নবুওয়াতকে মানা এবং আল্লাহর ইবাদাত করা৷ কিংবা বড় জোর তার মধ্যে শরীয়তের সেই সব বড় বড় নৈতিক নীতিমালাও অন্তর্ভুক্ত যা সমস্ত দীনের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য৷

কিন্তু এটি একটি অপরিপক্ক মত৷ শুধু বাহিক্যভাবে দীনের ঐক্য ও শরীয়তসমূহের বিভিন্নতা দেখে এ মত পোষণ করা হয়েছে৷ এটি এমন একটি বিপ্‌জ্জনক মত যে যদি তা সংশোধন করা না হয় তাহলে তা অগ্রসর হয়ে দীন ও শরীয়তের মধ্যে এমন একটি পার্থক্যের সূচনা করবে যার মধ্যে জড়িয়ে সেন্ট পল শরীয়ত বিহীন দীনের মতবাদ পেশ করেছিলেন৷ কারণ , শরীয়ত যখন দীন থেকে স্বতন্ত্র একটি জিনিস আর নির্দেশ দেয়া হয়েছে শুধু দীন কায়েমের জন্য, শরীয়ত কায়েমের জন্য নয় তখন মুসলমানরাও খৃস্টানদের মত অবশ্যই শরীয়তকে গুরুত্বহীন ও তার প্রতিষ্ঠাকে সরাসরি উদ্দেশ্য মনে না করে উপেক্ষা করবে এবং দীনের শুধু ঈমান সম্পকিত বিষয়গুলো ও বড় বড় নৈতিক নীতিসমূহ নিয়েই বসে থাকবে৷ এভাবে অনুমানের ওপর নির্ভর করে (আরবী ............) এর অর্থ নিরূপণ করার পরিবর্তে কেনই বা আমরা আল্লাহর কিতাব থেকেই একথা জেনে নিচ্ছি না যে, যে দীন কায়েম করার নির্দেশ এখানে দান করা হয়েছে তার অর্থ কি শুধু ঈমান সম্পর্কিত বিষয়সমূহ এবং কতিপয় বড় বড় নৈতিক মূলনীতি না শরীয়তের অন্যান্য আদেশ নিষেধও? কুরান মজীদ বিশ্লেষণ করলে আমরা দেখি কুরআন মজীদে যেসব জিনিসকে দীনের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে তার মধ্যে নিম্নোক্ত জিনিসগুলোও আছে :

এক : ..............................................................................

"তাদেরকে এ ছাড়া আর কোন নির্দেশ দেয়া হয়নি যে, তারা একনিষ্ঠ চিত্তে দীনকে আল্লাহর জন্য নির্দিষ্ট করে কেবল তাঁরই ইবাদত করবে, নামায কায়েম করবে এবং যাকাত দেবে এটাই সঠিক দীন৷"

এ আয়াত থেকে জানা যায়, নামায এবং রোযা এই দীনের অন্তর্ভুক্ত৷ অথচ নামায ও রোযার আহকাম বিভিন্ন শরীয়তে বিভিন্ন রকম ছিল ৷ পূর্ববর্তী শরীয়তসমূহে বর্তমানের মত নামাযের এই একই নিয়ম-কানুন, একই খুঁটি-নাটি বিষয়, একই সমান রাকআত, একই কিবলা, একই সময় এবং এই একই বিধি-বিধান ছিল একথা কেউ বলতে পারে না৷ অনুরূপ যাকাত সম্পর্কেও কেউ এ দাবী করতে পারে না যে, সমস্ত শরীয়তে বর্তমানের ন্যায় যাকাতের এই একই হিসাব, একই হার এবং আদায় ও বন্টনের এই একই বিধিনিষেধ ছিল৷ কিন্তু শরীয়তের ভিন্নতা সত্ত্বেও আল্লাহ এ দুটি জিনিসকে দীনের মধ্যে গণ্য করেছেন৷

আরবী : ...........................................................................

" তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে মৃত জন্তু , রক্ত , শূকরের গোশত, আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো নামে যবেহকৃত জন্তু , দমবন্দ হয়ে, আঘাত প্রাপ্ত হয়ে, ওপর থেকে পড়ে কিংবা ধাক্কা খেয়ে মরা জন্তু অথবা যে জন্তুকে কোন হিংস্র প্রাণী ক্ষতবিক্ষত করেছে কিন্তু তোমরা তাকে জীবিত পেয়ে যবেহ করেছো কিংবা যে জন্তুকে কোন আস্তানায় জবেহ করা হয়েছে ৷ তাছাড়া লটারীর মাধ্যমে নিজের ভাগ্য সম্পর্কে অবহিত হতে চাওয়াকেও তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে৷ এসবই গুনাহর কাজ৷ আজ কাফেররা তোমাদের দীন সম্পর্কে নিরাশ হয়ে গেয়েছে৷ তাই তোমরা তাদেরকে ভয় করো না, আমাকে ভয় করো৷ আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দীনকে পূর্ণতা দান করলাম৷"

এ থেকে জানা গেল যে, শরীয়তের এসব হুকুম আহকামও দীনের মধ্যে শামিল৷

তিন : আরবী..................................................................

" তোমরা তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করো যারা আল্লাহ ও আখেরাত দিবসে বিশ্বাস করে না, আর আল্লাহ ও তাঁর রসূল যা কিছু হারাম করেছেন তা হারাম করে না এবং সত্য দীনকে নিজের দীন হিসেবে গ্রহণ করে না৷"

এ থেকে জানা যায়, আল্লাহ ও আখেরাতের প্রতি ঈমান পোষণ করা এবং আল্লাহ ও তাঁর রসূল যেসব আদেশ-নিষেধ দিয়েছেন তা মানা ও তার অনুগত্য করাও দীন৷

চার : ..............................................................................

" ব্যভিচারী নারী ও পুরুষ উভয়কে একশটি করে বেত্রাঘাত করো৷ যদি তোমরা আল্লাহ ও আখেরাতের প্রতি ঈমান পোষণ করো তাহলে দীনের ব্যাপারে তাদের প্রতি মায়া-মমতা ও আবেগ যেন তোমাদেরকে পেয়ে না বসে৷"

আরবী : ...........................................................................

"বাদশার দীন অনুসারে ইউসুফ তার ভাইকে পাকড়াও করতে পারতো না৷"

এ থেকে জানা গেলো, ফৌজদারী আইনসমূহও দীনের মধ্যে শামিল৷ ব্যক্তি যদি আল্লাহর দেয়া ফৌজদারী আইন অনুসারে চলে তাহলে সে আল্লাহর দীনের অনুসারী আর যদি বাদশার দীন অনুসারে চলে তাহলে বাদশাহর দীনের অনুসারী৷

এ চারটি উদাহরণই এমন যেখানে শরীয়তের আদেশ-নিষেধ ও বিধি-বিধানকে সুস্পষ্ট ভাষায় দীন বলা হয়েছে৷ কিন্তু গভীর মনোযোগ সহকারে দেখলে বুঝা যায়, আরো যেসব গোনাহর কারণে আল্লাহ জাহান্নামের ভয় দেখিয়েছেন (যেমন ব্যভিচার, সুদখোরী, মু'মিন বান্দাকে হত্যা, ইয়াতীমের সম্পদ আত্নসাৎ, অন্যায়ভাবে মানুষের অর্থ নেয়া ইত্যাদি) যেসব অপরাধকে আল্লাহর শাস্তির কারণ বলে উল্লেখ করা হয়েছে (যেমন : লূতের কওমের মত পাপাচার এবং পারস্পরিক লেনদেনে শু'আইব আলাইহিস সালামের কওমের মত আচরণ) তার পথ রুদ্ধ করার কাজও অবশ্যই দীন হিসেবে গণ্য হওয়া উচিত৷ কারণ, দীন যদি জাহান্নাম ও আল্লাহর আযাব থেকে রক্ষা করার জন্য না এসে থাকে তাহলে আর কিসের জন্য এসেছে৷ অনুরূপ শরীয়তের যেসব আদেশ-নিষেধ লংঘনকে চিরস্থায়ী জাহান্নাম বাসের কারণ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে সেই সব আদেশ নিষেধ ও দীনের অংশ হওয়া উচিত৷ যেমন উত্তরাধিকারের বিধি-বিধান বর্ণনা করার পর বলা হয়েছে :

আরবী : ...........................................................................

" যে আল্লাহ ও তাঁর রসূলের অবাধ্য হবে এবং আল্লাহর সীমাসমূহ লংঘন করবে আল্লাহ তাকে দোযখে নিক্ষেপ করবেন৷ সেখানে সে চিরদিন থাকবে৷ তার জন্য রয়েছে লাঞ্ছনাকর আযাব৷"

অনুরূপ আল্লাহ যেসব জিনিসের হারাম হওয়ার কথা কঠোর ভাষায় অকাট্যভাবে বর্ণনা করেছেন , যেমন : মা, বোন ও মেয়ের সাথে বিয়ে, মদ্যপান , চুরি , জুয়া এবং মিথ্যা সাক্ষদান৷ এসব জিনিসের হারাম হওয়ার নির্দেশকে যদি "ইকামাতে দীন" বা দীন প্রতিষ্ঠার মধ্যে গণ্য করা না হয় তাহলে তার অর্থ দাঁড়ায় এই যে, আল্লাহ কিছু অপ্রয়োজনীয় আদেশ-নিষেধও দিয়েছেন যার বাস্তবায়ন তাঁর উদ্দেশ্য নয়৷ অনুরূপ আল্লাহ যেসব কাজ ফরয করেছেন, যেমন : রোযা হজ্জ-তাও দীন প্রতিষ্ঠার পর্যায় থেকে এই অজুহাতে বাদ দেয়া যায় না যে, রমযানের ৩০ রোযা পূর্ববতী শরীয়ত সমূহে ছিল না এবং কা'বায় হজ্জ করা কেবল সেই শরীয়তেই ছিল যা ইবরাহীমের (আ) বংশধারার ইসমাঈলী শাখাকে দেয়া হয়েছিলো৷

প্রকৃতপক্ষে সমস্ত ভুল বুঝাবুঝি সৃষ্টির কারণ হলো, ভিন্ন উদ্দেশ্যে (আরবী : ..........) (আমি তোমাদের প্রত্যেক উম্মতের জন্য একটি শরীয়ত ও পদ্ধতি নির্ধারণ করে দিয়েছি) আয়াতের এ অর্থ করা যে যেহেতু প্রত্যেক উম্মতের জন্য শরীয়হ ছিল ভিন্ন কিন্তু কায়েম করতে বলা হয়েছে দীনকে যা সমানভাবে সব নবী-রসূলের দীন ছিল , তাই দীন কায়েমের নির্দেশর মধ্যে শরীয়ত অন্তর্ভুক্ত নয়৷ অথচ এ আয়াতের অর্থ ও উদ্দেশ্য এর সম্পূর্ণ বিপরীত৷ সূরা মায়েদার যে স্থানে এ আয়াতটি আছে তার পূর্বাপর অর্থাৎ ৪১ আয়াত থেকে ৫০ আয়াত পর্যন্ত যদি কেউ মনযোগ সহকারে পাঠ করে তাহলে সে জানতে পারবে আয়াতের সঠিক অর্থ হচ্ছে, আল্লাহ যে নবীর উম্মতকে যে শরীয়ত দিয়েছিলেন সেটিই ছিল তাদের জন্য দীন এবং সেই নবীর নবুওয়াত কালে সেটিই কায়েম করা কাম্য ও উদ্দেশ্য ছিল৷ এখন যেহেতু হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নবুওয়াতের যুগ, তাই উম্মতে মুহাম্মাদীকে যে শরীয়ত দান করা হয়েছে এ যুগের জন্য সেটিই দীন এবং সেটিকে প্রতিষ্ঠিত করাই দীনকে প্রতিষ্ঠিত করা৷ এরপর থাকে ঐ সব শরীয়তের পরস্পর ভিন্নতা৷ এ ভিন্নতার তাৎপর্য এ নয় যে, আল্লাহর প্রেরিত শরীয়তসমূহ পরস্পর বিরোধী ছিল৷ বরং এর সঠিক তাৎপর্য হলো, অবস্থা ও পরিবেশ পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে ঐ সব শরীয়তের খুটিনাটি বিষয়ে কিছু পার্থক্য ছিল৷ উদাহরণ স্বরূপ নামায ও রোযার কথাই ধরুন৷ সকল শরীয়তেই নামায কায়েম ফরয ছিল কিন্তু সব শরীয়তের কিবলা এক ছিল না৷ তাছাড়া নামাযের সময়, রাকআতের সংখ্যা এবং বিভিন্ন অংশে কিছুটা পার্থক্য ছিল৷ অনুরূপ রোযা সব শরীয়তেই ফরয ছিল৷ কিন্তু রমযানের ৩০ রোযা অন্যান্য শরীয়তে ছিল না৷ এ থেকে এরূপ সিদ্ধান্ত গ্রহণ ঠিক নয় যে, নামায ও রোযা 'ইকামাতে দীন' বা দীন প্রতিষ্ঠার নির্দেশের অন্তর্ভুক্ত ঠিকই, কিন্তু নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে নামায পড়া এবং নির্দিষ্ট কোন সময়ে রোযা রাখা ইকামতে দীনের নির্দেশ বহির্ভূত৷ বরং এর সঠিক অর্থ হলো, প্রত্যেক নবীর উম্মতের জন্য তৎকালীন শরীয়তে নামায ও রোযা আদায়ের জন্য যে নিয়ম-পদ্ধতি নির্ধারণ করা হয়েছিলো সেই সময়ে সেই পদ্ধতি অনুসারে নামায পড়া ও রোযা রাখাই ছিল দীন কায়েম করা৷ বর্তমানেও এসব ইবাদতের জন্য শরীয়তে মুহাম্মাদীতে যে নিয়ম-পদ্ধতি দেয়া হয়েছে সে মোতাবেক এসব ইবাদত বন্দেগী করা 'ইকামাতে দীন'৷ এ দু'টি দৃষ্টান্তের ভিত্তিতে শরীয়তের অন্যসব আদেশ-নিষেধও বিচার করুন৷

যে ব্যক্তি চোখ খুলে কুরআন মজীদ পড়বে সে স্পষ্ট দেখতে পাবে যে, এ গ্রন্থ তার অনুসারীদেরকে কুফরী ও কাফেরদের আজ্ঞাধীন ধরে নিয়ে বিজিতের অবস্থানে থেকে ধর্মীয় জীবন যাপন করার কর্মসূচী দিচ্ছে না, বরং প্রকাশ্যে নিজের শাসন ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চাচ্ছে, চিন্তাগত, নৈতিক, সাংস্কৃতিক এবং আইনগত ও রাজনৈতিক ভাবে বিজয়ী করার লক্ষ্যে জীবনপাত করার জন্য অনুসারীদের কাছে দাবী করছে এবং তাদেরকে মানব জীবনের সংস্কার ও সংশোধনের এমন একটি কর্মসূচী দিচ্ছে যার একটা বৃহদাংশ কেবল তখনই বাস্তব রূপ লাভ করতে পারে যদি সরকারের ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব ঈমানদারদের হাতে থাকে৷ এ কিতাব তার নাযিল করার উদ্দেশ্য বর্ণনা করে বলে :

আরবী : ...........................................................................

" হে নবী, আমি ন্যায় ও সত্যসহ তোমার কাছে এই কিতাব নাযিল করেছি যাতে আল্লাহ তোমাকে যে আলো দেখিয়েছেন তার সাহায্যে তুমি মানুষের মধ্যে ফায়সালা করো৷"

এই কিতাবে যাকাত আদায় ও বন্টনের যে নির্দেশাবলী দেয়া হয়েছে সে জন্য তা সুস্পষ্টভাবে এমন একটি সরকারের ধারণা পেশ করেছে যে, একটি নির্দিষ্ট নিয়মানুসারে যাকাত আদায় করে হকদারদের কাছে পৌঁছানোর দায়িত্ব নেবে ( আত তাওবা ৬০ ও ১০৩ আয়াত)৷ এই কিতাবে সুদ বন্ধ করার যে আদেশ দেয়া হয়েছে এবং সুদখোরী চালু রাখার কাজে তৎপর লোকদের বিরুদ্ধে যে যুদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে৷ (আল বাকারা ২৭৫-২৭৯ আয়াত) তা কেবল তখনই বাস্তব রূপ লাভ করতে পারে যখন দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা সম্পূর্ন রূপে ঈমানদারদের হাতে থাকবে ৷ এই কিতাব হত্যাকারীর থেকে কিসাস গ্রহণের নির্দেশ (আল বাকারা ১৭৮ আয়াত), চুরির জন্য হাত কাটার নির্দেশ (আল মায়েদা ৩৮ আয়াত) এবং ব্যভিচার ও ব্যভিচারের অপবাদ আরোপে জন্য হদ জারী করার নির্দেশ একথা দরে নিয়ে দেয়া হয়নি যে, এসব আদেশ মান্যকারীদেরকে কাফেরদের পুলিশ ও বিচারালয়ের অধীন থাকতে হবে৷ এই কিতাবে কাফেরদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের নির্দেশ (আল বাকারা -১৯০-২১৬ আয়াত) একথা মনে করে দেয়া হয়নি যে, এ দীনের অনুসারীরা কাফের সরকারের বাহিনীতে সৈন্য ভর্তি করে এ নির্দেশ পালন করবে৷ এ কিতাবে আহলে কিতাবদের নিকট থেকে জিযিয়া আদায়ের নির্দেশ ( আত তাওবা ২৯ আয়াত) একথা ধরে নিয়ে দেয়া হয়নি যে, মুসলমানরা কাফেরদের অধীন থেকে তাদের থেকে জিযিয়া আদায় করে এবং তাদের রক্ষার দায়িত্ব নেবে৷ এ ব্যাপারটি সূরাসমূহের পর্যন্তই সীমাবদ্ধ নয়৷ দৃষ্টিশক্তির অধিকারীরা মক্কায় অবতীর্ণ সূরাসমূহের মধ্যে স্পষ্টতই দেখতে পারেন, প্রথম থেকেই যে পরিকল্পনা ছিল তা ছিলো দীনের বিজয় ও কর্তৃত্ব স্থাপন, কুফরী সরকারের অধীনে দীন ও দীনের অনুসারীদের জিম্মি হয়ে থাকা নয়৷ উদাহরণ স্বরূপ দেখুন , তাফহীমূল কুরআন, সূরা বণী-ইসরাইল,আয়াত ৭৬ ও ৮০; সূরা কাসাস, আয়াত ৮৫-৮৬; সূরা রূম, আয়াত ১- থেকে ৬; সূরা আস সাফফাত, আয়াত ১৭১ থেকে ১৭৯, (টীকা ৯৩-৯৪) এবং সূরা সোয়াদ, ভূমিকা ও ১১ আয়াত ১২ টীকা সহ৷

ব্যাখার এই ভ্রান্তি যে জিনিসটির সাথে সবচেয়ে বেশী সাংঘর্ষিক তা হচ্ছে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিজের বিরাট কাজ৷ যা তিনি ২৩ বছরের রিসালাত যুগে সমাধা করেছেন৷ তিনি তাবলীগ ও তলোয়ার উভয়টির সাহায্যেই যে গোটা আরবকে বশীভূত করেছিলেন এবং বিস্তারিত শরীয়ত বা বিধি বিধানসহ এমন একটি পূর্ণাঙ্গ রাষ্টীয় আদর্শ কায়েম করেছিলেন যা আকীদা -বিশ্বাস ও ইবাদাত থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত কর্মকান্ডে, সামাজিক চরিত্র,সভ্যতা ও সংস্কৃতি,অর্থনীতি ও সমাজনীতি, রাজনীতি ও ন্যায় বিচার এবং যুদ্ধ ও সন্ধিসহ জীবনের সমস্ত দিক ও বিভাগে পরিব্যাপ্ত ছিল তা কে না জানে? এ আয়াত অনুসারে নসী (সা)সহ সমস্ত নবী রসূলকে ইকামাতে দীনের যে নির্দেশ দেয়া হয়েছিলো নবীর (সা) এসব কাজকে যদি তার ব্যাখ্যা বলে গ্রহণ করা না হয় তাহলে তার কেবল দু'টি অর্থই হতে পারে ৷ হয় নবীর (সা)বিরুদ্ধে এই অভিযোগ আরোপ করতে হবে (মা' আযাল্লাহ) যে, তিনি আদিষ্ট হয়েছিলেন শুধু ঈমান ও নৈতিক চরিত্র সম্পর্কিত বড় বড় মূলনীতিসমূহের তাবলীগ ও দাওয়াতের জন্য কিন্তু তা লংঘন করে তিনি নিজের পক্ষ থেকেই একটি সরকার কায়েম করেছিলেন, যা অন্যসব নবী-রসূলদের শরীয়ত সমূহের সাধারণ নীতিমালা থেকে ভিন্ন ও ছিল অতিরিক্ত ও ছিল৷ নয়তো আল্লাহর বিরুদ্ধে এই অভিযোগ আরোপ করতে হবে যে, তিনি সূরা শূরায় উপরোক্ত ঘোষণা দেয়ার পর নিজেই তার কথা থেকে সরে পড়েছেন এবং নিজের নবীর নিকট থেকে ঐ সূরায় ঘোষিত ''ইকামাতে দীনের '' চেয়ে কিছুটা বেশী এবং ভিন্ন ধরনের কাজই শুধু নেননি, বরং উক্ত দিয়েছেন যে , আরবী ......... (আজ আমি তোমাদের দীনকে পূর্ণতা দান করলাম) নাউযুবিল্লাহি মিন যালিকা৷ এ দুটি অবস্থা ছাড়া তৃতীয় এমন কোন অবস্থা যদি থাকে যে ক্ষেত্রে ইকামাতে দীনের এই ব্যাখ্যাও বহাল থাকে এবং আল্লাহ কিংবা তাঁর রসূলের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগও না আসে তাহলে আমরা অবশ্যই তা জানতে চাইবো৷

দীন প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দেয়ার পর আল্লাহ এ আয়াতে সর্বশেষ যে কথা বলেছেন তা হচ্ছে আরবী ............. " দীনে বিভেদ সৃষ্টি করো না" কিংবা "তাতে পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ো না"৷ দীনে বিভেদের অর্থ ব্যক্তির নিজের পক্ষ থেকে এমন কোন অভিনব বিষয় সৃষ্টি করা এবং তা মানা বা না মানার ওপর কুফর ও ঈমান নির্ভর করে বলে পীড়াপীড়ি করা এবং মান্যকারীদের নিয়ে অমান্যকারীদের থেকে আলাদা হয়ে যাওয়া, অথচ দীনের মধ্যে তার কোন গ্রহণযোগ্যতা নেই৷ এই অভিনব বিষয়টি কয়েকটি ধরনের হতে পারে৷ দীনের মধ্যে যে জিনিস নেই তা এনে শামিল করা হতে পারে৷ দীনের অকাট্য উক্তিসমূহের বিকৃত প্রায় ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়ে অদ্ভুত আকীদা-বিশ্বাস এবং অভিনব আচার-অনুষ্ঠান আবিষ্কার করা হতে পারে৷ আবার দীনের উক্তি ও বক্তব্যসমূহ রদবদল করে তা বিকৃত করা , যেমন যা গুরুত্বপূর্ণ তাকে গুরুত্বহীন বানিয়ে দেয়া এবং যা একেবারেই মোবাহ পর্যায়ভুক্ত তাকে ফরয ও ওয়াজিব এমনকি আরো অগ্রসর হয়ে ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ বানিয়ে দেয়া৷ এ ধরনের আচরনের কারণেই নবী-রসূল আলাইহিমুস সালামদের উম্মতদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি হয়েছে৷ অতপর এসব ছোট ছোট দলের অনুসৃত পথই ক্রমান্বয়ে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ধর্মের রূপ পরিগ্রহ করেছে যার অনুসারীদের মধ্যে বর্তমানে এই ধারণাটুকু পর্যন্তও বর্তমান নেই যে, এক সময় তাদের মূল ছিল একই৷ দীনের আদেশ-নিষেধ বুঝার এবং অকাট্য উক্তিসমূহ নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করে মাসয়ালা উদ্ভাবন করার ক্ষেত্রে জ্ঞানী ও পন্ডিতদের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই যে মতভেদ সৃষ্টি হয় এবং আল্লাহর কিতাবের ভাষায় মধ্যে আভিধানিক, বাগধারা ও ব্যাকারণের নিয়ম অনুসারে যার অবকাশ আছে সেই বৈধ ও যুক্তিসংগত মতভেদের সাথে এই বিবাদের কোন সম্পর্ক নেই ৷এই বিষয় সম্পর্কে আরো বিস্তারিত জানার জন্য দেখুন, তাফহীমূল কুরআন, সূরা বাকারা, আয়াত ২১৩, টীকা ২৩০; সূরা আল ইমরান, আয়াত ১৯, টীকা ১৬ ও ১৭, আয়াত ৫১, টীকা ৪৮; সূরা আন নিসা, আয়াত ১৭১, টীকা ২১১ থেকে ২১৬; আল মায়েদা আয়াত ৭৭, টীকা ১০১, আল আন'আম, আয়াত ১৫৯, টীকা ১৪১; সূরা আন নাহল, আয়াত ১১৮ থেকে ১২৪, টীকা১৭৭ থেকে১২১;সূরা আল আম্বিয়া, আয়াত ৯২-৯৩, টীকা ৯১, আল হাজ্জ, আয়াত ৬৭-৬৯, টীকা ১১৬, ১১৭; আল মু'মিনুন, আয়াত ৫১ থেকে ৫৬, টীকা ৪৫ থেকে ৪৯; সূরা আল কাসাস, আয়াত ৫৩ ও ৫৪, টীকা ৭৩; সূরা আর রূম, আয়াত ৩২ থেকে ৩৫, টীকা ৫১ থেকে ৫৪৷
২১. ইতিপূর্বে ৮ ও ৯ আয়াতে যা বলা হয়েছে এবং ১১ টীকায় আমরা তার যে ব্যাখ্যা করেছি এখানে আবার তার পুনরাবৃত্তি করা হয়েছে৷ এখানে একথাটা বলার উদ্দেশ্য হচ্ছে, তোমরা এসব লোকদেরকে দীনর সুস্পষ্ট রাজপথ দেখিয়ে দিচ্ছো আর এ নির্বোধরা এই নিয়ামতকে মূল্য দেয়ার পরিবর্তে অসন্তষ্টি প্রকাশ করছে৷ কিন্তু এদের মধ্যে এদেরই কওমের এমন সব লোক আছে যারা আল্লাহর দিকে ফিরে আসছে এবং আল্লাহও বেছে বেছে তাদেরকে নিজের দিকে নিয়ে আসছেন৷ কারা এ নিয়ামত লাভ করে এবং কারা এর প্রতি খাপপা হয় তা নিজ নিজ ভাগ্যের ব্যাপার৷ তবে আল্লাহ অন্ধভাবে কোন কিছু বণ্টন করেন না৷ যে তাঁর দিকে অগ্রসর হয় তিনি কেবল তাকেই নিজের দিকে টানেন৷ দূরে পলায়নপর লোকদের পেছনে দৌড়ানো আল্লাহর কাজ নয়৷
২২. অর্থাৎ বিভেদের কারণ এ ছিল না যে, আল্লাহ নবী-রসূল পাঠাননি এবং কিতাবও নাযিল করেননি, তাই সঠিক পথ না জানার কারণে মানুষ নিজেদের জন্য আলাদা আলাদা ধর্ম, চিন্তা গোষ্ঠী ও জীবন আদর্শ আবিষ্কার করে নিয়েছে৷ বরং তাদের মধ্যে এই বিভেদ সৃষ্টি হয়েছে আল্লাহর পক্ষ থেকে জ্ঞান আসার পর৷ তাই সে জন্য আল্লাহ দায়ী নন, বরং সেই সব লোক নিজেরাই দায়ী যারা দীনের সুস্পষ্ট নীতিমালা এবং শরীয়তের সুস্পষ্ট বিধি-নিষেধ থেকে দূরে সরে গিয়ে নতুন নতুন ধর্ম ও পথ বানিয়ে নিয়েছে৷
২৩. অর্থাৎ কোন প্রকার সদিচ্ছা এই মতভেদ সৃষ্টির চালিকা শক্তি ছিল না৷ এটা ছিল তোমাদের অভিনব ধারণা প্রকাশের আকাংখা ৷ নিজের নাম ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার চিন্তা, পারস্পরিক জিদ ও একগুয়েমি, একে অপরকে পরাস্ত করার প্রচেষ্টা এবং সম্পদ ও মর্যাদা অর্জন প্রচেষ্টার ফল৷ ধূর্ত ও উচ্চাভিলাসী লোকগুলো দেখলো, আল্লাহর বান্দারা যদি সোজাসুজি আল্লাহর দীন অনুসরণ করতে থাকে তাহলে একজনই মাত্র খোদা হবেন মানুষ যার সামনে মাথা নত করবে, একজন রসূল হবেন মানুষ নেতা ও পথপ্রদর্শক হিসেবে যাকে মেনে চলবে, একখানা কিতাব থাকবে যেখান থেকে মানুষ পথনিদের্শনা লাভ করবে এবং একটি পরিরচ্ছন্ন ও সুস্পষ্ট আকীদা-বিশ্বাস ও নির্ভেজাল বিধান থাকবে মানুষ যা অনুসরণ করতে থাকবে৷ এই ব্যবস্থায় তাদের নিজেদের জন্য কোন বিশেষ মর্যাদ থাকতে পারে না যে কারণে তাদের পৌরহিত্য চলবে, লোকজন তাদের পাশে ভিড় জমাবে তাদের সামনে মাথা নত করবে এবং পকেটও শূন্য করবে৷ এটাই সেই মূল কারণ যা নতুন নতুন আকীদা ও দর্শন, নতুন নতুন ইবাদত-পদ্ধতি ও ধর্মীয় অনুষ্ঠান এবং নতুন নতুন জীবনাদর্শ উদ্ভাবনের উৎসাহ যুগিয়েছে এবং আল্লাহর বান্দাদের একটি বড় অংশকে দীনের সুস্পষ্ট রাজপথ থেকে সরিয়ে বিভিন্ন পথে বিক্ষিপ্ত করে দিয়েছে৷ তারপর এ বিক্ষিপ্ততা এসব দল-উপদলের পারস্পরিক বিতর্ক ও বিবাদ এবং ধর্মীয়, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কলহের কারণে চরম তিক্ততায় পর্যবসিত হয়েছে৷ এমনকি এ থেকে এমন রক্তপাতও ঘটেছে যে জন্য মানবেতিহাস রক্ত রঞ্জিত হয়ে চলেছে৷
২৪. অর্থাৎ যারা গোমরাহী উদ্ভাবন করার এবং জেনে বুঝে তা অনুসরণ করার অপরাধে অপরাধী ছিল তাদেরকে দুনিয়াতেই আযাব দিয়ে ধ্বংস করে দেয়া হতো এবং শুধু সঠিক পথ অনুসরণকারীদের বাঁচিয়ে রাখা হতো যার মাধ্যমে কে ন্যায় ও সত্যের অনুসারী আর কে বাতিলের অনুসারী তা সুস্পষ্ট হয়ে যেতো৷ কিন্তু আল্লাহ এই চূড়ান্ত ফায়সালা কিয়ামত পর্যন্ত সময়ের জন্য মূলতবী করে রেখেছেন৷ কারণ, পৃথিবীতে এ ফয়সালা করে দেয়ার পর মানব জাতির পরীক্ষা অর্থহীন হয়ে যেতো৷
২৫. অর্থাৎ প্রত্যেক নবী এবং তাঁর নিকট অনুসারীদের যুগ অতিবাহিত হওয়ার পর আল্লাহর কিতাব পরবর্তী বংশধরদের কাছে পৌছলে তারা দৃঢ় বিশ্বাস ও আস্থার সাথে তা গ্রহণ করেনি, বরং তারা সে সম্পর্কে বড় সন্দেহ সংশয় এবং মানসিক দ্বিধাদ্বন্দ্বের শিকার হয়েছে৷ তাদের এ পরিস্থিতি শিকার হওয়া অনেকগুলো কারণ ছিল৷ তাওরাত ও ইনজীলে ঐসব পরিস্থিতি সম্পর্কে যেসব বিষয় বর্ণিত হয়েছে তা অধ্যায়নের মাধ্যমে আমরা অতি সহজেই সেই সব কারণ অনুধাবন করতে পারি ৷ র্র্পূববর্তী প্রজন্মের লোকেরা এ দুটি গ্রন্থকে তার মূল অবস্থায় মূল রচনাশৈলী ও ভাষায় সংরক্ষিত করে পরবর্তী প্রজন্মের লোকদের কাছে পৌঁছায়নি৷ তার মধ্যে আল্লাহর বাণীর সাথে ব্যাখ্যা, ইতিহাস এবং জনশ্রুতিমূলক ঐতিহ্য ও ফিকাহবিদদের উদ্ভাবিত খুঁটিনাটি বিষয়সমূহের আকারে মানুষের কথাও মিশিয়ে একাকার করে দিয়েছে৷ এ দুটি গ্রন্থের অনুবাদের এত অধিক মাত্রায় প্রচলন করেছে যে, মূল গ্রন্থ হারিয়ে গিয়েছে এবং কেবল তার অনুবাদই টিকে আছে৷ এর ঐতিহসিক প্রমাণসমূহকেও এমনভাবে ধবংস করে ফেলেছে যে, এখন আর কেউই পুরো নিশ্চয়তার সাথে বলতে পারে না তার কাছে যে কিতাব আছে পৃথিবীবাসী সেটিই হযরত মূসা বা হযরত ঈসার মাধ্যমে লাভ করেছিলো৷ তাছাড়া মাঝে মধ্যে তাদের ধর্মীয় পন্ডিতরা ধর্ম , অধিবিদ্যা, দর্শন, আইন, পদার্থবিদ্যা, মনস্তত্ব এবং সমাজবিজ্ঞানের এমন সব আলোচনা করেছেন এবং চিন্তাদর্শ গড়ে তুলেছেন যার গোলকধাঁধাঁ পড়ে মানুষের জন্য এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ কঠিন হয়ে পড়েছে যে, আঁকাবাঁকা এসব পথের মধ্যে ন্যায় ও সত্যের রাজপথ কোনটি৷ আল্লাহর কিতাব যেহেতু মূল ও নির্ভরযোগ্য অবস্থায় বর্তমান ছিল না তাই মানুষ নির্ভরযোগ্য এমন কোন প্রমাণের স্মরণাপন্ন হতেও পারতো না যা বাতিল থেকে হককে আলাদা করার ব্যাপারে তাদের সাহায্য করতে পারতো৷
২৬. অর্থাৎ তাদেরকে সন্তষ্টি করার জন্য এই দীনের মধ্যে কোন রদবদল ও হ্রাস-বৃদ্ধি করবে না৷ "কিছু নাও এবং কিছু দাও" এই নীতের ভিত্তিতে এই পথভ্রষ্ট লোকদের সাথে কোন আপোষ করো না৷ শুধু কোন না কোন ভাবে ইসলামের গন্ডির মধ্যে এসে যাক, এ লোভের বশবর্তী হয়ে এদের কুসংস্কার ও গোঁড়ামি এবং জাহেলী আচার-আচরণের জন্য দীনের মধ্যে কোন অবকাশ সৃষ্টি করো না৷ আল্লাহ তাঁর দীনকে যেভাবে নাযিল করেছেন কেউ মানতে চাইলে সেই খাঁটি ও মূল দীনকে যেন সরাসরি মেনে নেয়৷ অন্যথায় যে জাহান্নামে হুমড়ি খেয়ে পড়তে চায় পড়ুক৷ মানুষের ইচ্ছানুসারে আল্লাহর দীনের পরিবর্তন সাধন করা যায় না৷ মানুষ যদি নিজের কল্যাণ চায় তাহলে যেন নিজেকেই পরিবর্তন করে দীন অনুসারে গড়ে নেয়৷
২৭. অন্য কথায় আমি সেই বিভেদ সৃষ্টিকারী লোকদের মত নই যারা আল্লাহর প্রেরিত কোন কোন কিতাব মানে আবার কোন কোন কিতাব মানে না ৷ আমি আল্লাহ প্রেরিত প্রতিটি কিতাবই মানি৷
২৮. এই ব্যাপকার্থক আয়াতাংশের কয়েকটি অর্থ হয় : একটি অর্থ হচ্ছে, আমি এসব দলাদলি থেকে দূরে থেকে নিরপেক্ষ ন্যায় নিষ্ঠা অবলম্বনের জন্য আদিষ্ট৷ কোন দলের স্বার্থে এবং দলের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্ব করা আমার কাজ নয়৷ সব মানুষের সাথে আমার সমান সম্পর্ক৷ আর সে সম্পর্ক হচ্ছে ন্যায় বিচার ও ইনসাফের সম্পর্ক ৷ যার যে বিষয়টি ন্যায় ও সত্য সে যত দূরেরই হোক না কেন আমি তার সহযোগী৷ আর যার যে বিষয়টি ন্যায়ও সত্যের পরিপন্থী সে আমার ঘনিষ্ঠ আত্মীয় হলেও আমি তার বিরোধী৷

দ্বিতীয় অর্থ হচ্ছে, আমি তোমাদের সামনে যে সত্য পেশ করার জন্য আদিষ্ট তাতে কারো জন্য কোন বৈষম্য নেই, বরং তা সবার জন্য সমান৷ তাতে নিজের ও পরের, বড়র ও ছোটর, গরীবের ও ধনীর, উচ্চের ও নীচের ভিন্ন ভিন্ন সত্য নেই৷ যা সত্য তা সবার জন্য সত্য৷ যা গোনাহ তা সবার জন্য গোনাহ৷ যা হারাম তা সবার জন্য হারাম এবং যা অপরাধ তা সবার জন্য অপরাধ৷ এই নির্ভেজাল বিধানে আমার নিজের জন্যও কোন ব্যতিক্রম নেই৷

তৃতীয় অর্থ হচ্ছে, আমি পৃথিবীতে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য আদিষ্ট৷ মানুষের মধ্যে ইনসাফ কায়েম করা এবং তোমাদের জীবনে ও তোমাদের সমাজে যে ভারসাম্যহীনতা ও বে ইনসাফী রয়েছে তার ধ্বংস সাধনের দায়িত্ব আমাকে দেয়া হয়েছে৷

এ তিনটি অর্থ ছাড়া এ বাক্যাংশের আরো একটি অর্থ আছে যা পবিত্র মক্কায় প্রকাশ পায়নি কিন্তু হিজরতের পরে তা প্রকাশ পায়৷ সেটি হচ্ছে, আমি আল্লাহর পক্ষ থেকে নিয়োগ প্রাপ্ত বিচারক৷ তোমাদের মধ্যে ইনসাফ করা আমার দায়িত্ব৷
২৯. আমাদের প্রত্যেকেই তার নিজ নিজ কাজের জন্য দায়ী এবং জবাবদিহিকারী৷ তোমরা নেক কাজ করলে তার সুফল আমি ভোগ করবো না, তোমরাই তা ভোগ করবে৷ অনুরূপ আমি খারাপ কাজ করলে সে জন্য তোমাদের পাকড়াও করা হবে না, আমাকেই তার পরিণাম ভোগ করতে হবে৷ একথাটিই ইতিপূর্বে সূরা বাকারা ১৩৯ আয়াত, সূরা ইউনূসের ৪১ আয়াত, সূরা হূদের ৩৫ আয়াত এবং সূরা কাসাসের ৫৫ আয়াতে বলা হয়েছে৷ দেখুন তাফহীমূল কুরাআন,সূরা বাকারা, টীকা ১৩৯, সূরা ইউনুস টীকা ৪৯, সূরা হূদ, টীকা - ৩৯ সূরা আল কাসাস, আয়াত ৫৫, টীকা৭৯৷
৩০. অর্থাৎ যুক্তিসঙ্গত দলীল প্রমাণ দিয়ে কথা বুঝানোর যে দায়িত্ব আমার ছিল তা আমি পালন করেছি৷ এখন অযথা ঝগড়া বিবাদ করে লাভ কি? তোমরা ঝগড়া বিবাদ করলেও আমি তা করতে প্রস্তুত নই৷
৩১. সেই সময় প্রতিদিনই মক্কায় যে পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েচ্ছিলো এখানে সেই পরিস্থিতির দিকে ইংগিত করা হয়েছে৷ লোকেরা কারো সম্পর্কে যখনই জানতে পারতো যে সে মুসলমান হয়েছে তখনই মরিয়া হয়ে তার পেছনে লেগে যেতো৷ দীর্ঘদিন পর্যন্ত তাকে কোনঠাসা করে রাখতো৷ না বাড়ীতে তাকে আরাম থাকতে দেয়া হতো, না মহল্লায় না জাতি গোষ্ঠীর মধ্যে৷ সে যেখানেই যেতো সেখানেই অশেষ ও বিরামহীন এক বিতর্ক শুরু হতো৷ এর উদ্দেশ্য হতো, জাহেলিয়াত বর্জন করে যে ব্যক্তি তার গন্ডীর বাইরে বের হয়ে গেছে সে যে কোনভাবেই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহচর্য ছেড়ে আবার সেদিকে ফিরে আসুক৷
৩২. এখানে মীযান অর্থ আল্লাহর শরীয়ত, দাড়িপাল্লার মত ওজন করে ভুল ও শুদ্ধ, হক ও বাতিল, জুলুম ও ন্যায়বিচার এবং সত্য ও অসত্যের পার্থক্য স্পষ্ট করে দেয়৷ ওপরে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মুখ দিয়ে বলানো হয়েছে যে,

আরবী : ...........................................................................

( তোমাদের মধ্যে ইনসাফ করার জন্য আমাকে আদেশ দেয়া হয়েছে৷ এখানে বলা হয়েছে যে, এই পবিত্র কিতাব সহকারে সেই 'মিযান' এসে গেছে যার সাহায্যে এই ইনসাফ কায়েম করা যাবে৷
৩৩. অর্থাৎ যার সংশোধন হওয়ার সে যেন অবিলম্বে সংশেধিত হয়ে যায়৷ চূড়ান্ত ফায়সালার সময় দূরে মনে করে পাশ কাটিয়ে যাওয়া উচিত নয়৷ একটি নিশ্বাস সম্পর্কেও কেউ নিশ্চয়তার সাথে একথা বলতে পারে না যে, তার পরে শ্বাস গ্রহণের সুযোগ তার অবশ্যই হবে৷ প্রতিবার শ্বাস গ্রহণই শেষবারের মত শ্বাস গ্রহণ হতে পারে৷
৩৪. মূল আয়াতে (আরবী : .................) শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে, যার সঠিক ও পূরা অর্থ "দয়ালু " শব্দ দ্বারা প্রকাশ পায় না৷ এ শব্দটির মধ্যে দুটি অর্থ আছে৷ একটি অর্থ হচ্ছে, আল্লাহ তাঁর বান্দার প্রতি অত্যন্ত স্নেহ, মায়া ও বদান্যতা প্রবণ ৷ দ্বিতীয় অর্থ হচ্ছে, তিনি অত্যন্ত সুক্ষদর্শিতার সাথে তার এমন ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র প্রয়োজনের প্রতিও লক্ষ্য রাখেন যেখানে কারো দৃষ্টি যায় না৷ সে প্রয়োজনগুলো তিনি এমনভাবে পূরণ করেন যে বান্দা নিজেও উপলব্ধি করতে পারে না কে কখন তার কোন প্রয়োজন পূরন করেছে৷ তাছাড়া এখানে বান্দা অর্থ শুধু ঈমানদারেরাই নয়, বরং সমস্ত বান্দা৷ আল্লাহর এই দয়া ও মেহেরবানী তাঁর সব বান্দার জন্য সমান৷
৩৫. অর্থাৎ তাঁর এই নির্বিশেষ মেহেরবানীর দাবি এ নয় যে, সব বান্দাকেই সব কিছু সমানভাবে দেয়া হবে৷ যদিও সবাইকে তিনি তাঁর নিজের ভান্ডার থেকেই দিচ্ছেন৷ কিন্তু সেই দান একই প্রকৃতির নয়৷ একজনকে দিয়েছেন একটি জিনিস আরেকজনকে অন্য একটি জিনিস৷ একজনকে একটি জিনিস প্রচুর পরিমাণে দিয়ে থাকেন অপর একজনকে অন্য কোন জিনিস অঢেল দান করেছেন৷
৩৬. অর্থাৎ তাঁর দান ও পুরস্কারের এই ব্যবস্থা নিজের শক্তিতেই চলছে৷ কারো ক্ষমতা নেই তা পরিবর্তন করতে পারে বা জোরপূর্বক তাঁর নিকট থেকে কিছু নিতে পারে কিংবা কাউকে দান করার ব্যাপারে তাকে বিরত রাখতে পারে৷