(৪২:১) হা মীম,
(৪২:২) আইন সীন ক্বাফ৷
(৪২:৩) মহাপরাক্রমশালী ও জ্ঞানময় আল্লাহ তোমার কাছে ও তোমার পূর্ববর্তীদের (রসূল) কাছে এভাবেই অহী পাঠিয়ে আসছেন৷
(৪২:৪) আসমান ও যমীনে যা আছে সবই তাঁর ৷ তিনি সর্বোন্নত ও মহান৷
(৪২:৫) আসমান ওপর থেকে ফেটে পড়ার উপক্রম হয়৷ ফেরেশতারা প্রশংসাসহ তাদের রবের পবিত্রতা বর্ণনা করছে এবং পৃথিবীবাসীদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে যায়৷ জেনে রাখো, প্রকৃতই আল্লাহ ক্ষমাশীল ও দয়াবান৷
(৪২:৬) যারা তাঁকে বাদ দিয়ে অন্যদেরকে নিজেদের অভিভাবক বানিয়ে নিয়েছে আল্লাহই তাদের তত্বাবধায়ক৷ তুমি তাদের জিম্মাদার নও৷
(৪২:৭) হে নবী, এভাবেই আমি এই আরবী কুরআন অহী করে তোমার কাছে পাঠিয়েছি যাতে তুমি জনপদসমূহের কেন্দ্র (মক্কানগরী) ও তার আশেপাশের অধিবাসীদের সতর্ক করে দাও এবং একত্রিত হওয়ার দিন সম্পর্কে ভয় দেখাও ১০ যার আগমনে কোন সন্দেহ নেই৷ এক দলকে জান্নাতে যেতে হবে এবং অপর দলকে যেতে হবে দোযখে৷
(৪২:৮) আল্লাহ যদি চাইতেন তাহলে এদের সবাইকে এক উম্মতের অন্তর্ভুক্ত করে দিতেন৷ কিন্তু তিনি যাকে ইচ্ছা তাঁর রহমতের মধ্যে শামিল করেন৷ জালেমদের না আছে কোন অভিভাবক না আছে সাহায্যকারী৷১১
(৪২:৯) এরা কি ( এমনই নির্বোধ যে ) তাকে বাদ দিয়ে অন্য অভিভাবক বানিয়ে রেখেছে? অভিভাবক তো একমাত্র আল্লাহ৷ তিনিই মৃতদের জীবিত করেন এবং তিনি সব কিছুর ওপর শক্তিশালী৷১২
১. বক্তব্য শুরু করার এই ভঙ্গি থেকেই বুঝা যায়, সেই সময় পবিত্র মক্কার প্রতিটি মাহফিল ও গ্রাম্য বিপণী, প্রতিটি গলি ও বাজার এবং প্রতিটি বাড়ী ও বিপনীতে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আন্দোলন ও কুরআনের বিষয়বস্তু নিয়ে যে জোর গুজব, কানাঘুষা ও আলোচনা চলছিলো তা-ই ছিল এর পটভূমি৷ লোকেরা বলতো : এ ব্যক্তি কোথা থেকে এসব অভিনব কথা নিয়ে আসছে তা কে জানে৷ এ রকম কথা আমরা কখনো শুনিনি বা হতেও দেখিনি৷ তারা বলতো : বপ-দাদা থেকে যে দীন চলে আসছে, গোটা জাতি যে দীন অনুসরণ করছে, সমগ্র দেশে যে নিয়ম পদ্ধতি শত শত বছর ধরে প্রচলিত আছে এ লোকটি তার সব কিছুকেই ভুল বলে আখ্যায়িত করছে এবং বলছে, আমি যে দীন পেশ করছি সেটিই ঠিক৷ এ এক বিস্ময়কর ব্যাপার৷ তারা বলতো : এ লোকটি যদি এই বলে তার বক্তব্য পেশ করতো যে, বাপ-দাদার ধর্ম এবং প্রচলিত নিয়ম-পদ্ধতির মধ্যে তার দৃষ্টিতে কিছু দোষ-ত্রুটি আছে এবং সে চিন্তা - ভাবনা করে নিজে কিছু নতুন বিষয় বের করেছে তাহলে তা নিয়েও আলোচনা করা যেতো ৷কিন্তু সে বলে, আমি তোমাদের যা শুনাচ্ছি তা আল্লাহর বাণী ৷ একথা কি মেনে নেয়া যায় ৷ আল্লাহ কি তাঁর কাছে আসেন ? না কি সে আল্লাহর কাছে যায়৷ না তার ও আল্লাহর মধ্যে কথাবার্তা হয় ? এসব আলোচনা ও কানাঘুষার জবাবে বাহ্যত রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে উদ্দেশ্য করে কিন্তু মূলত কাফেরদের শুনিয়ে বলা হয়েছে : হাঁ , মহাপরাক্রমশালী ও জ্ঞানময় আল্লাহ অহীর মাধ্যমে এসব কথাই বলছেন এবং পূর্বের সমস্ত নবী-রসূলদের কাছে এসব বিষয় নিয়েই অহী নাযিল হতো ৷

অহীর আভিধানিক অর্থ হচ্ছে, দ্রুত ইংগিত এবং গোপন ইংগিত অর্থাৎ এমন ইংগিত যা অতি দ্রুত এমনভাবে করা হবে যে তা কেবল ইংগিতদাতা এবং যাকে ইংগিত করা হয়েছে সেই জানতে ও বুঝতে পারবে ৷ তাছাড়া অন্য কেউ তা জানতে পারবে না ৷ এ শব্দটিকে পারিভাষিক অর্থে এমন দিক নির্দেশনা বুঝাতে ব্যবহার করা হয়েছে যা আল্লাহর এ বাণীর উদ্দেশ্য হলো, কোন বান্দার কাছে আল্লাহর আসার কিংবা তাঁর কাছে কোন মানুষের যাওয়ার এবং সামনাসামনি কথা বলার কোন প্রশ্নই ওঠে না৷ তিনি মহাপরাক্রমশালী ও জ্ঞানময়৷ মানুষের হিদায়াত ও দিকনির্দেশনার জন্য যখনই তিনি কোন বান্দার সাথে যোগাযোগ করতে চান তখন কোন অসুবিধাই তাঁর ইচ্ছার পথে প্রতিবন্ধক হতে পারে ৷এ কাজের জন্য তিনি তাঁর জ্ঞান দ্বারা অহী পাঠানোর পথ অবলম্বন করেন৷ সূরার শেষ আয়াতগুলোতে এ বিষয়টিরই পুনরাবৃত্তি করা হয়েছে এবং সেখানে বিষয়টি আরো পরিষ্কার করে বলা হয়েছে৷

তাদের ধারণা ছিল এসব হচ্ছে অদ্ভুত ও অভিনব কথা৷ তার জবাবে বলা হয়েছে, এসব অদ্ভুত ও অভিনব কথা নয়৷ বরং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পূর্বে যত নবী-রসূল এসেছেন আল্লাহর পক্ষ থেকে তাদের সকলকেই এসব হিদায়াতই দান করা হতো৷
২. শুধু আল্লাহর প্রশংসার জন্য এই প্রারম্ভিক বাক্যটি বলা হচ্ছে না৷ যে পটভূমিতে এ আয়াত নাযিল হয়েছে এর প্রতিটি শব্দ তার সাথে গভীরভাবে সম্পর্কিত ৷ যারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও কুরআনের বিরুদ্ধে শোরগোল ও কানাঘুষা করছিলো তাদের আপত্তির প্রথম ভিত্তি হলো, নবী (সা) তাওহীদের দাওয়াত দিচ্ছিলেন এতে তারা উৎকর্ণ হয়ে বলতো : যদি শুধুমাত্র আল্লাহ একাই উপাস্য, প্রযোজন পূরণকারী এবং আইনদাতা হন তাহলে আমাদের পূর্ববর্তী মনীষীগণ কোন্‌ মর্যাদার অধিকারী? এর জবাবে বলা হয়েছে, এই গোটা বিশ্ব জাহান আল্লাহর সাম্রাজ্য৷ মালিকের মালিকানায় অন্য কারো খোদায়ী কি করে চলতে পারে? বিশেষ করে যাদের খোদায়ী মানা হয় কিংবা যারা নিজেদের খোদায়ী চালাতে চায়, তারা নিজেরাও তাঁর মালিকানাভুক্ত তারপর হয়েছে তিনি সর্বোন্নত ও মহান৷ তাই কেউ তাঁর সমকক্ষ হতে পারে না এবং তাঁর সত্তা, গুণাবলী, ক্ষমতা, ইখতিয়ার এবং অধিকারের মধ্যে কোনটিতেই অংশীদার হতে পারে না৷
৩. অর্থাৎ কোন সৃষ্টির বংশধারা আল্লাহর সাথে সম্পর্কিত করা এবং তাকে আল্লাহর পুত্র বা কন্যা আখ্যায়িত করা কোন সাধারণ ব্যাপার নয়৷ কাউকে অভাব পূরণকারী ও বিপদ ত্রাণকারী বানিয়ে নেয়া হয়েছে এবং তার কাছে প্রার্থনা করতে আরম্ভ করেছে৷ কাউকে সারা দুনিয়ার সাহায্যকারী মনে করে নেয়া হয়েছে এবং প্রকাশ্যে বলতে শুরু করা হয়েছে যে, আমাদের হযরত সব সময় সব স্থানে সবার কথা শোনেন৷ তিনিই প্রত্যেকের সাহায্যের জন্য হাজির হয়ে তার কাজ উদ্ধার করে দেন৷ কাউকে আদেশ নিষেধ এবং এমনভাবে তার নির্দেশের আনুগত্য করতে শুরু করেছে যেন সে-ই তাদের আল্লাহ৷ এগুলো আল্লাহর বিরুদ্ধে এমন ধৃষ্ঠতা যে এতে আসমান ভেঙে পড়াও অসম্ভব নয়৷ (সূরা মারয়ামের ৮৮ থেকে ৯১ আয়াতে এই একই বিষয় বর্ণনা করা হয়েছে )
৪. অর্থাৎ মানুষের এসব কথা শুনে শুনে ফেরেশতারা এই বলে কানে হাত দেয় যে, আমাদের রব সম্পর্কে এসব কি বাজে বলা হচ্ছে এবং পৃথিবীর এই মাখলুক এ কি ধরনের বিদ্রোহ করেছে ?তারা বলে : সুবহানাল্লাহ ! কে এমন মর্যাদার অধিকারী হতে পারে যে, বিশ্ব জাহানের রবের সাথে 'উলুহিয়াত' ও সার্বভৌম ক্ষতায় শরীক হতে পারে৷ তিনি ছাড়া আমাদের ও সব বান্দার জন্য আর কে পৃষ্ঠপোষক আছে যে তার প্রশংসা গীতি গাইতে হবে এবং কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে হবে৷ তাছাড়া তারা উপলব্ধি করে যে, পৃথিবীতে এটা এমন এক মহা অপরাধ করা হচ্ছে যার কারণে যে কোন সময় আল্লাহর গযব নেমে আসতে পারে৷ তাই তারা পৃথিবীতে বসবাসকারী এই আত্মসংহারী বান্দাদের জন্য বার বার এই বলে দয়া ও করুণার আবেদন জানায় যে, তাদেরকে যেন এখনই শাস্তি দেয়া না হয় এবং সামলে নেয়ার জন্য তাদেরকে আরো কিছুটা সুযোগ দেয়া হয়৷
৫. অর্থাৎ এটা তাঁর উদারতা , দয়া ও ক্ষমাশীলতা যার কল্যাণে কুফর, শিরকও নাস্তিকতা এবং পাপাচার ও চরম জুলুম-নির্যাতনে লিপ্ত ব্যক্তিরাও বছরের পর বছর, এমনকি এ ধরনের পুরো এক একটা সমাজ শত শত বছর পর্যন্ত এক নাগাড়ে অবকাশ পেয়ে থাকে৷ তারা শুধু রিযিকই লাভ করে না, পৃথিবীতে তাদের খ্যতিও ছড়িয়ে পড়ে তাছাড়া পৃথিবীর এমন সব উপকরণ ও সাজসরঞ্জাম দ্বারা তারা অনুগৃহীত হয় যা দেখে নির্বোধ লোকেরা এই ভ্রান্ত ধারণায় পতিত হয় যে, হয়তো এ পৃথিবীর কোন খোদা-ই নেই৷
৬. মূল আয়াতে (আরবী...................) শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে আরবী ভাষায় যার অর্থ অত্যন্ত ব্যাপক৷ বাতিল উপাস্যদের সম্পর্কে পথভ্রষ্ট মানুষদের বিভিন্ন আকীদা-বিশ্বাস এবং ভিন্ন ভিন্ন অনেক কর্মপদ্ধতি আছে৷ কৃরআন মজীদে এগুলোকই ''আল্লাহ ছাড়া অন্যদের অভিভাবক বানানো " বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে৷ কুরআন মজীদে অনুসন্ধান করলে (আরবী : .................) শব্দটির নিম্নবর্ণিত অর্থসমূহ জানা যায় :

এক : মানুষ যার কথামত কাজ করে, যার নির্দেশনা মেনে চলে এবং যার রচিত নিয়ম-পন্থা, রীতিনীতি এবং আইন-কানুন অনুসরণ করে ( আন নিসা, আয়াত ১১৮ থেকে ১২০; আল-আ'রাফ, আয়াত ৩ ও ২৭ থেকে ৩০)৷

দুই : যার দিকনির্দেশনার ওপর মানুষ আস্থা স্থাপন করে এবং মনে করে সে তাকে সঠিক রাস্তা প্রদর্শনকারী এবং ভ্রান্তি থেকে রক্ষাকারী ৷ (আল বাকারা- ২৫৭; বানী ইসরাইল-৯৭; আল কাহাফ-১৭ ও আল জাসিয়া-১৯ আয়াত)৷

তিন : যার সম্পর্কে মানুষ মনে করে, আমি পৃথিবীতে যাই করি না কেন সে আমাকে তার কুফল থেকে রক্ষা করবে৷ এমনকি যদি আল্লাহ থাকেন এবং আখেরাত সংঘটিত হয় তাহলে তার আযাব থেকেও রক্ষা করবেন (আন নিসা-১২৩-১৭৩; আল আন'আম-৫১; আর রা'দ ৩৭; আল আনকাবুত-২২; আল আহযাব-৬৫; আয-যুমার-৩ আয়াত)৷

চার : যার সম্পর্কে মানুষ মনে করে, পৃথিবীতে তিনি অতি প্রাকৃতিক উপায়ে তাকে সাহায্য করেন, বিপদাপদে তাকে রক্ষা করেন৷ রুজি-রোজগার দান করেন, সন্তান দান করেন, ইচ্ছা পূরণ করেন এবং অন্যান্য সব রকম প্রয়োজন পূরণ করেন (হুদ-২০, আর রা'দ-১৬ ও আল আনকাবুত- ৪১ আয়াত)৷

অলী (আরবী :........) শব্দটি কুরআন মজীদের কোন কোন জায়গায় ওপরে বর্ণিত অর্থসমূহের কোন একটি বুঝাতে ব্যবহার করা হয়েছে এবং কোথাও কোথাও সবগুলো অর্থ একত্রেও বুঝানো হয়েছে৷ আলোচ্য আয়াতটি তারই একটি৷ এখানে আল্লাহকে বাদ দিয়ে অন্যদেরকে অলী বা অভিভাবক বানানোর অর্থ ওপরে বর্ণিত চারটি অর্থেই তাদেরকে পৃষ্টপোষক, সহযোগী ও সাহায্যকারী মনে করা৷
৭. আল্লাহই তাদের তত্বাবধায়ক অর্থাৎ তিনি তাদের সমস্ত কাজকর্ম দেখছেন এবং তাদের আমলনামা প্রস্তুত করছেন৷ তাদের কাছে জবাবদিহি চাওয়া ও তাদেরকে পাকড়াও করা তাঁরই কাজ৷ "তুমি তাদের জিম্মাদার নও"৷ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে উদ্দেশ্য করে একথা বলা হয়েছে৷ অর্থাৎ তাদের ভাগ্য তোমার হাতে বুলে দেয়া হয়নি যে, যারা তোমার কথা মানবে না তাদেরকে তুমি জ্বলিয়ে ছাই করে দেবে, কিংবা ক্ষমতাচ্যুত করবে অথবা তছনছ করে ফেলবে৷ একথার অর্থ আবার এও নয় যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজেকে সে রকম মনে করতেন৷ তাই তাঁর ভুল ধারণা বা আত্মবিভ্রম দূর করার জন্য একথা বলা হয়েছে৷ বরং কাফেরদের শুনানোই এর মূল উদ্দেশ্য৷ যদিও বাহ্যিকভাবে নবীকেই (সা) সম্বোধন করা হয়েছে৷ কিন্তু প্রকৃতপক্ষে কাফেরদেরকে একথা বলাই উদ্দেশ্য যে, তোমাদের মধ্যে যারা খোদাপ্রাপ্তি এবং আধ্যাত্মিকতার প্রহসন করে সাধারনত যেভাবে ঘটা করে তা দাবী করে, আল্লাহর নবী তেমন কোন দাবী করেন না৷ জাহেলী সমাজে সাধারণভাবে এ ধারণা প্রচলিত আছে যে, দরবেশ শ্রেণীর লোকেরা এমন প্রতিটি মানুষের ভাগ্য নষ্ট করে দেয় যারা তাদের সাথে বে-আদবী করে৷ এমনকি তাদের মৃত্যুর পরেও কেউ যদি তাদের কবরেরও অবমাননা করে এবং অন্য কিছু না করলেও যদি তাদের মনের মধ্যে কোন খারাপ ধারণার উদয় হয় তাহলেই তাকে ধ্বংস করে দেয়৷ বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে ও ধারণা ঐ সব "দরবেশ মহামান্যরা" নিজেরাই প্রচার করেন এবং যেসব নেককার লোক নিজেরা এ কাজ করেন না কিছু ধূর্ত লোক তাদের হাড্ডিসমূহকে নিজেদের ব্যবসায়ের পুঁজি বানানোর জন্য তাদের সম্পর্কে এ ধারণা প্রচার করতে থাকে যাই হোক মানুষের ভাগ্য গড়া ও ভাংঙ্গার ক্ষমতা ইখতিয়ার থাকাকেই সাধারণ মানুষ রূহানিয়াত ও খোদাপ্রাপ্তির অতি আবশ্যকীয় দিক বলে মনে করেছে৷ প্রতারণার যাদুর এই মুখোশ খুলে দেয়ার জন্য আল্লাহ কাফেরদের শুনিয়ে তাঁর রসূলকে বলছেন, নিসন্দেহে তুমি আমার নবী এবং আমি তোমাকে আমার অহী দিয়ে সম্মানিত করেছি৷ শুধু মানুষকে সঠিক পথ দেখানোই তোমার কাজ৷ তাদের ভাগ্য তোমার হাতে তুলে দেয়া হয়নি৷ তা আমি নিজের হাতেই রেখেছি৷ বান্দার কাজকর্ম বিচার করা এবং তাদেরকে শাস্তি দেয়া বা না দেয়া আমার নিজের দায়িত্ব৷
৮. বক্তব্যের প্রারম্ভে যা বলা হয়েছিলো সে কথার পুনরাবৃত্তি করে আরো জোর দিয়ে বলা হয়েছে৷ আরবী ভাষার কুরআন বলে শ্রোতাদের বুঝানো হয়েছে, এটা অন্য কোন ভাষায় নয় তোমদের নিজেদের ভাষায় নাযিল হয়েছে৷ তোমরা নিজেরাই তা সরাসরি বুঝতে পারো৷ এর বিষয়বস্তু সম্পর্কে গভীরভাবে চিন্ত-ভাবনা করে দেখো, আল্লাহর পক্ষ থেকে ছাড়া এই পাক-পবিত্র ও নিস্বার্থ দিক নির্দেশনা কি আর কারো পক্ষ থেকে হতে পারে?
৯. অর্থাৎ তাদেরকে গাফলতি থেকে জাগিয়ে দাও এবং এই মর্মে সতর্ক করে দাও যে, ধ্যান-ধারণা ও আকীদা-বিশ্বাসের যে গোমরাহী এবং নৈতিকতা ও চরিত্রের যে অকল্যাণ ও ধ্বংসকারিতার মধ্যে তোমরা ডুবে আছ এবং তোমাদের ব্যক্তি ও জাতীয় জীবন যে বিকৃত রীতিমালার ওপর চলছে তার পরিণাম ধবংস ছাড়া কিছু নয়৷
১০. অর্থাৎ তাদেরকে এও বলে দাও যে, এই ধবংস শুধু দুনিয়া পর্যন্তই সীমাবদ্ধ নয়, ভবিষ্যতে এমন দিনও আসবে যখন আল্লাহ সমস্ত মানুষকে একত্রিত করে তাদের হিসাব নিবেন ৷ কোন ব্যক্তি যদি তার গোমরাহী ও দুষ্কর্মের পরিণাম ফল থেকে পৃথিবীতে বেঁচে গিয়েও থাকে তাহলে সেদিন তার বাঁচার কোন উপায় থাকবে না৷ আর সেই ব্যক্তি তো বড়ই দুর্ভাগা যে এখানেও অকল্যাণ লাভ করলো, সেখানেও দুর্ভাগ্যের শিকার হলো৷
১১. এখানে এই বক্তব্যের মধ্যে একথাটি বলার তিনটি উদ্দেশ্য আছে :

প্রথমত-এ কথা বলার উদ্দেশ্য নবী সাল্লাল্লাহু আলাহি ওয়া সাল্লামকে শিক্ষা এবং সান্তনা দান করা৷ এতে নবীকে (সা) বুঝানো হয়েছে, তিনি মক্কার কাফেরদের অজ্ঞতা, গোমরাহী ও বাহ্যিক ভাবে তাদের একগুয়েমী ও হঠকারিতা দেখে যেন বেশী মনোকষ্ট ও দুঃখ না পান৷ মানুষকে ক্ষমতা-ইখতিয়ার ও নির্বাচন করার স্বাধীনতা দেয়াই আল্লাহর ইচ্ছা৷ তারপর যে হিদায়াত চাইবে সে হিদায়াত লাভ করবে৷ আর যে পথভ্রষ্ট হতে চাইবে সে পথভ্রষ্ট হবে৷ সে যেদিকে যেতে চায় সেদিকেই যাবে ৷ আল্লাহর অভিপ্রায় ও বিবেচ্য যদি এটা না হতো তাহলে নবী-রসূল ও কিতাব পাঠানোর প্রয়োজনই বা কি ছিল? সে জন্য মহান আল্লাহর একটি সৃষ্টিসূচক ইংগিতই যথেষ্ট ছিল৷ এভাবে সমস্ত মানুষ ঠিক তেমনি তাঁর আদেশ মেনে চলতো যেমন আদেশ মেনে চলে নদী, পাহাড়, গাছ, মাটি পাথার ও সমস্ত জীবজন্তু৷ (এ উদ্দেশ্যে এ বিষয়টি কুরআন মজীদের অন্যান্য জায়গায়ও বর্ণিত হয়েছে৷ দেখুন, তাফহীমূল কুরআন , সূরা আনআম, আয়াত ৩৫, ৩৬ ও ১০৭ টীকাসহ৷

দ্বিতীয়-আল্লাহ যদি সত্যিই মানুষকে পথ দেখাতে চাইতেন আর মানুষের মধ্যে আকীদা ও কর্মের যে পার্থক্য বিস্তার লাভ করে আছে তা তাঁর পছন্দ না হতো এবং মানুষ ঈমান ও ইসলামের পথ অনুসরণ করুক তাই যদি তাঁর মনঃপুত, তাহলে এই কিতাব ও নবুওয়াতের কি প্রয়োজন ছিল? এ ধরনের দ্বিধা-দ্বন্দ্বে যেসব মানুষ হাবুডুবু খচ্ছিলো এখানে তাদেরকেই সম্বোধন করা হয়েছে৷ তিনি সব মানুষকে মু'মিন ও মুসলিম হিসেবে সৃষ্টি করে এ কাজ সহজেই করতে পারতেন ৷ এই বিভ্রান্তি ও দ্বিধা দ্বন্দ্বের ফলশ্রুতি হিসেবে যুক্তি দেখানো হয় যে, আল্লাহ যখন তা করেননি তখন নিশ্চয়ই তিনি ভিন্ন কোন পথ পছন্দ করেন৷ আমরা যে পথে চলছি সেটিই সেই পথ আর যা কিছু করছি তাঁরই ইচ্ছায় করছি৷ তাই এ ব্যাপারে আপত্তি করার অধিকার করো নেই৷ এই ভ্রান্ত ধারণা দূর করার জন্যও এ বিষয়টি কুরআন মজীদের বিভিন্ন জায়গায় বর্ণনা করা হয়েছে৷ দেখুন তাফহীমূল কুরআন, সূরা আনআম, আয়াত ১১২, ১৩৮, ১৪৮, ১৪৯ টীকাসহ; সূরা নূর এর (তাফহীম) ভূমিকা; ইউনুস আয়াত ৯৯, টীকাসহ; হূদ আয়াত ১১৮টীকাসহ; আন নাহল, আয়াত ৩৬ ও ৩৭ টীকাসহ৷

তৃতীয়ত-এর উদ্দেশ্য দীনের প্রচার ও আল্লাহর সৃষ্টির সংশোধন ও সংস্কারের পথে যেসব বিপদাপদ আসে ঈমানদারদেরকে তার বাস্তবতা ও তাৎপর্য উপলব্ধি করানো৷ যারা আল্লাহর দেয়া বাছাই ও ইচ্ছার স্বাধীনতা এবং তার ভিত্তিতে স্বভাব-চরিত্র ও পন্থা-পদ্ধতির ভিন্ন হওয়ার বাস্তবতা উপলব্ধি করে না তারা কখনো সংস্কার কার্যের মন্থর গতি দেখে নিরাশ হতে থাকে৷ তারা চায় আল্লাহর পক্ষ থেকে এমন কিছু 'কারামত' ও 'মু'জিযা' দেখানো যা দেখামাত্র মানুষের মন পরিবর্তিত হয়ে যাবে৷ আবার কখনো তারা প্রয়োজনের অধিক আবেগ-উত্তেজনার বশে সংস্কারের অবৈধ পন্থা-পদ্ধতি গ্রহণ করার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ে (এ উদ্দেশ্যেও কুরআন মজীদের কয়েকটি জায়গায় এ বিষয়টি বলা হয়েছে৷ দেখুন তাফহীমূল কুরআন, সূরা রা'দ আয়াত ৩১ টীকাসহ; সূরা নাহল, আয়াত ৯০ থেকে ৯৩ টীকাসহ৷)

এ উদ্দেশ্য একটি বড় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এ কয়টি সংক্ষিপ্ত বাক্যে বর্ণনা করা হয়েছে৷ পৃথিবীতে আল্লাহর সত্যিকার প্রতিনিধিত্ব এবং আখেরাতে তার জান্নাত কোন সাধারণ রহমত নয় যা মাটি ও পাথর এবং গাধা ও ঘোড়ার মত মর্যাদার সৃষ্টিকুলকে সাধারণ ভাবে বণ্টন করে দেয়া যায়৷ এটা তো একটা বিশেষ এবং অনেক উচ্চ পর্যায়ের রহমত যার জন্য ফেরেশতাদেরকও উপযুক্ত মনে করা হয়নি৷ এ কারণেই মানুষকে একটি স্বাধীন ক্ষমতা ও ইখতিয়ার সম্পন্ন সৃষ্টির মর্যাদা দিয়ে সৃষ্টি করে আল্লাহ তাঁর পৃথিবীর এসব অঢেল উপায়-উপকরণ তার কর্তৃত্বধীনে দিয়েছেন এবং এসব সাংঘাতিক শক্তিও তাকে দান করেছেন৷ যাতে সে সেই পরীক্ষার মধ্যে দিয়ে এগিয়ে যেতে পারে এবং এতে কামিয়াব হওয়ার পরই কেবল কোন বান্দা তাঁর এই বিশেষ রহমত লাভের উপযুক্ত হতে পারে৷ এ রহম্‌ত আল্লাহর নিজের জিনিস৷ এর ওপর আর কারো ইজারাদারী নেই৷ কেউ তার ব্যক্তিগত অধিকারের ভিত্তিতে তা দাবী করেও নিতে পারে না৷ এমন শক্তিও কারো নেই যে, জোর করেই তা লাভ করতে পারে৷ সে-ই কেবল তা নিতে পারে যে আল্লাহর কাছে তার দাসত্ব পেশ করবে, তাঁকেই নিজের অভিভাবক বানাবে এবং তাঁরই সাথে লেগে থাকবে৷ এ অবস্থায় আল্লাহ তাকে সাহায্য ও দিকনির্দেশনা দান করেন এবং তাকে নিরাপদে এ পরীক্ষা পাস করার তাওফীক দান করেন যাতে সে তাঁর রহমতের মধ্যে প্রবেশ করতে পারে৷ কিন্তু যে জালেম আল্লাহর দিক থেকেই মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং তাঁর পরিবর্তে অন্যদেরকে নিজের অভিভাবক বানিয়ে নেয়, অযথা জোর করে তাঁর অভিভাবক হওয়ার এমন কোন প্রয়োজন আল্লাহর পড়েনি৷ সে অন্য যাদেরকে অভিভাবক বানায় তাদের আদৌ এমন কোন জ্ঞান, শক্তি বা ক্ষমতা-ইখতিয়ার নেই যার ভিত্তিতে অভিভাবকত্বের হক আদায় করে তাকে সফল করিয়ে দিতে পারে৷
১২. অর্থাৎ অভিভাবকত্ব কোন মনগড়া বস্তু নয় যে, আপনি যাকে ইচ্ছা আপনার অভিভাবক বানিয়ে নিবেন আর বাস্তবেও সে আপনার অভিভাবক হয়ে যাবে এবং অভিভাবকত্বের হক আদায় করবে৷ এটা এমন এক বাস্তব জিনিস যা মানুষের আশা আকাংখা অনুসারে হয় না বা পরিবর্তিতও হয় না৷ আপনি মানেন আর না মানেন বাস্তবে যিনি অভিভাবক তিনিই আপনার অভিভাবক৷ আর বাস্তবে যে অভিভাবক নয় আপনি মৃত্যু পর্যন্ত তাকে মানলেও এবং অভিভাবক মনে করলেও সে অভিভাবক নয়৷ এখন প্রশ্ন হচ্ছে, মানুষের প্রকৃত অভিভাবক হতে পারেন তিনি যিনি মৃত্যুকে জীবনে রূপ দেন, যিনি প্রাণহীন বস্তুর মধ্যে জীবন দান করে জীবন্ত মানুষ সৃষ্টি করেছেন, এবং যিনি অভিভাবকত্বের দায়িত্ব পালন করার শক্তি ও ইখতিয়ারের অধিকারী৷ আল্লাহ ছাড়া আর কেউ যদি তেমন থাকে তাহলে তাকে অভিভাবক বানাও৷ আর যদি শুধু আল্লাহই তেমন হয়ে থাকেন তাহলে তাঁকে ছাড়া আর কাউকে অভিভাবক হিসেবে গ্রহণ করা অজ্ঞতা, নিবুদ্ধিতা এবং আত্মহত্যা ছাড়া আর কিছুই নয়৷