(৪১:১৯) আর সেই সময়ের কথাও একটু চিন্তা করো যখন আল্লাহর এসব দুশমনকে দোযখের দিকে যাওয়ার জন্য পরিবেষ্টিত করা হবে ৷২৩ তাদের অগ্রবর্তীদেরকে পশ্চাদবতীদের আগমন করা পর্যন্ত থামিয়ে রাখা হবে৷২৪
(৪১:২০) পরে যখন সবাই সেখানে পৌঁছে যাবে তখন তাদের কান, তাদের চোখ এবং তাদের দেহের চামড়া তারা পৃথিবীতে কি করতো সে সম্পর্কে তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবে৷ ২৫
(৪১:২১) তারা তাদের শরীরের চামড়াসমূহকে বলবে, তোমরা আমাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিলে কেন ? তারা জবাব দেবে, সেই আল্লাহই আমাদের বাকশক্তি দান করেছেন যিনি প্রতিটি বস্তুকে বাকশক্তি দান করেছেন৷ ২৬ তিনিই তোমাদেরকে প্রথমবার সৃষ্টি করেছিলেন ৷ আর এখন তোমাদেরকে তাঁর কাছেই ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে৷
(৪১:২২) পৃথিবীতে অপরাধ করার সময় তোমরা গোপন করতে তখন তোমরা চিন্তাও করোনি যে, তোমাদের নিজেদের কান, তোমাদের চোখ এবং তোমাদের দেহের চামড়া কোন সময় তোমাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবে৷ তোমরা তো বরং মনে করেছিলে, তোমাদের বহু সংখ্যক কাজকর্মের খবর আল্লাহও রাখেন না৷
(৪১:২৩) তোমাদের এই ধারণা যা তোমরা তোমাদের রব সম্পর্কে করেছিলে তোমাদের সর্বনাশ করেছে এবং এর বদৌলতেই তোমরা ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছো৷ ২৭
(৪১:২৪) এ অবস্থায় তারা ধৈর্য ধারণ করুক (বা না করুক ) আগুনই হবে তাদের ঠিকানা৷ তারা যদি প্রত্যাবর্তনের সুযোগ চায় তাহলে কোন সুযোগ দেয়া হবে না৷ ২৮
(৪১:২৫) আমি তাদের ওপর এমন সব সঙ্গী চাপিয়ে দিয়েছিলাম যারা তাদেরকে সামনের ও পেছনের প্রতিটি জিনিস সুদৃশ্য করে দেখাতো৷ ২৯ অবশেষে তাদের ওপরও আযাবের সেই সিদ্ধান্ত প্রযোজ্য হলো যা তাদের পূর্ববতী জিন ও মানব দলসমূহের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হয়েছিলো৷ নিশ্চিতভাবেই তারা ক্ষতিগ্রস্ত ছিলো৷
২৩. মূল উদ্দেশ্য একথা বলা যে আল্লাহর আদালতে হাজির হওয়ার জন্য তাদের পরিবেষ্টন করে আনা হবে৷ কিন্তু এ বিষয়টিকেই এ ভাষায় বর্ণনা করা হয়েছে যে, দোযখের দিকে যাওয়ার জন্য পরিবেষ্টন করে আনা হবে৷ কেননা দোযখে যাওয়াই তাদের শেষ পরিণাম৷
২৪. অর্থাৎ এক একটি বংশ ও প্রজন্মের হিসাব-নিকাশ করে একটার পর একটা সিদ্ধান্ত দেয়া হবে তা নয়৷ বরং আগের ও পরের সমস্ত বংশ ও প্রজন্মকে একই সময়ে একত্র করা হবে এবং এক সাথেই তাদের হিসাব-নিকাশ নেয়া হবে৷ কারণ, কোন মানুষ তার জীবনে ভাল মন্দ যে কাজই করুক না কেন তার জীবন শেষ হওয়ার সাথে সাথে তার প্রভাব শেষ হয় না, বরং তার মৃত্যুর পরও দীর্ঘদিন পর্যন্ত চলতে থাকে৷ এ ক্ষেত্রে সৃষ্ট প্রভাবের জন্য সে-ই দায়ী৷ অনুরূপ একটি প্রজন্ম তার সময়ে যা কিছুই করে পরবর্তী প্রজন্ম সমূহের মধ্যে তার প্রভাব শতাব্দীর পর শতাদ্বীধরে চলতে থাকে৷ এই উত্তরাধিকারের জন্য মূলত সে-ই দায়ী হয়৷ ভুল-ত্রুটি নির্ণয় এবং ইনসাফ প্রতিষ্ঠার এই সমস্ত প্রভাব ও ফলাফল পর্যালোচনা করা এবং তার সাক্ষ্য প্রমাণ তুলে ধরা অপরিহার্য৷ এ কারণেই কিয়ামতের দিন প্রজন্মসমূহ একের পর এক আসতে থাকবে এবং তাদেরকে অবস্থান করানো হতে থাকবে৷ যখন আগের ও পরের সবাই এসে একত্রিত হবে তখনি কেবল আদালতের কার্যত্রুম শুরু হবে৷ (আরো ব্যাখ্যার জন্য দেখুন , তাফহীমূল কুরআন, আল আ'রাফ, টীকা ৩০ )৷
২৫. বিভিন্ন হাদীসে এর যে ব্যাখ্যা এসেছে তা হচ্ছে যখন কোন একগুঁয়ে অপরাধী তার অপরাধ সমূহ অস্বীকার করতে থাকবে এবং সমস্ত সাক্ষ্য প্রমাণকেও মিথ্যা বলে আখ্যায়িত করতে তৎপর হবে তখন আল্লাহর আদেশে তার দেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সমূহ এক এক করে সাক্ষ্য দিবে, সে ঐগুলোর সাহায্যে কি কি কাজ আঞ্জাম দিয়েছে৷ হযরত আনাস (রা), হযরত আবু মূসা আশ 'আরী (রা), হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রা) এবং হযরত ইবনে আব্বাস (রা) এ বিষয়টি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেছেন এবং মুসলিম, নাসায়ী, ইবনে জারীর, ইবনে আবী হাতেম প্রমুখ মুহাদ্দিসগণ এসব হাদীস উদ্ধৃত করেছেন৷ (আরো ব্যাখ্যার জন্য দেখুন, তাফহীমুল কুরআন, সূরা ইয়াসীন, টীকা ৫৫)৷ যেসব আয়াত থেকে প্রমাণিত হয়, আখিরাত শুধু একটি আত্মিক জগত হবে না, বরং মানুষকে সেখানে দেহ ও আত্মার সমন্বয়ে পুনরায় ঠিক তেমনি জীবিত করা হবে যেমনটি বর্তমানে তারা এই পৃথিবীতে জীবিত আছে-এ আয়াতটি তারই একটি৷ শুধু তাই নয়, যে দেহ নিয়ে তারা এই পৃথিবীতে আছে ঠিক সেই দেহই তাদের দেয়া হবে৷ যেসব উপাদান, অঙ্গ-প্রতঙ্গ এবং অণু-পরমাণুর (Atoms) সমন্বয়ে এই পৃথিবীতে তাদের দেহ গঠিত কিয়ামতের দিন সেগুলোই একত্রিত করে দেয়া হবে এবং যে দেহে অবস্থান করে সে পৃথিবীতে কাজ করেছিলো পূর্বের সেই দেহ দিয়েই তাকে উঠানো হবে৷ এ কথা সুস্পষ্ট যে, যেসব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের সমন্বয়ে গঠিত দেহ নিয়ে সে পূর্বের জীবনে কোন অপরাধ করেছিলো সেই সব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মধ্যেই যদি সে অবস্থান করে কেবল তখনি সে সেখানে সাক্ষ্য দিতে সক্ষম হবে৷ কুরআন মজীদের নিম্ন বর্ণিত আয়াতগুলোও এ বিষয়ের অকাট্য প্রমাণ৷ বনী ইসরাঈল, আয়াত ৪৯ থেকে ৫১ ও ৯৮; আল মুমিনূন, আয়াত ৩৫ থেকে ৩৮ এবং ৮২ ও ৮৩; আস সিজদা, আয়াত ১০; ইয়াসিন, আয়াত ৬৫, ৭৮ ও ৭৯; আস সাফফাত, আয়াত ১৬ থেকে ১৮; আল ওয়াকিয়া, ৪৭ থেকে ৫০ এবং আন নাযিআত, আয়াত ১০ থেকে ১৪৷
২৬. এ থেকে জানা গেল কিয়ামতের দিন মানব দেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গই শুধু সাক্ষ্য দেবে না, যেসব জিনিসের সামনে মানুষ কোন কাজ করেছিলো তার প্রতিটি জিনিসই কথা বলে উঠবে৷ সূরা যিলযাল এ কথাই বলা হয়েছে :

আরবী.............................................................................

"মাটির গভীরে যেসব ভান্ডার পরিপূর্ণ হয়ে আছে তা সে বের করে দেবে৷ মানুষ বলবে এ কি ব্যাপার সে দিন যমীন তার সব কথা শুনবে (অর্থাৎ মানুষ তার উপরি ভাগে যা যা করেছে তার সব কাহিনী বলে দেবে৷) কারণ, তোমরা রব তাকে বর্ণনা করার আদেশ প্রদান করবেন৷"
২৭. এ আয়াতের ব্যাখ্যায় হযরত হাসান বাসারী (র) খুব সুন্দর কথা বলেছেন৷ তিনি বলেছেন, প্রত্যেকে তার রব সম্পর্কে যে ধারণা পোষণ করে তার আচার-আচারণ সেই ধারণা অনুসারেই নির্ধারিত হয়৷ সৎ কর্মশীল ঈমানদারের আচরণ সঠিক হওয়ার কারণ সে তার রব সম্পর্কে সঠিক ধারণা পোষণ করে৷ আর কাফের, মুনাফিক ফাসেক ও জালেমের আচরণ ভ্রান্ত হওয়ার কারণ হচ্ছে এই যে, রব সম্পর্কে তার ধারণাই ভ্রান্ত হয়ে থাকে৷ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একটি সংক্ষিপ্ত কিন্তু অত্যন্ত ব্যাপক অর্থব্যঞ্জক হাদীসে এ বিষয়টিই তুলে ধরেছেন এভাবে : তোমাদের রব বলেন ---------'আমার বান্দা আমার সম্পর্কে যে ধারণা পোষণ করে আমি তার জন্য সেই ধারণার অনুরূপ৷'
২৮. এ কথার অর্থ হতে পারে, দুনিয়ায় ফিরে আসতে চাইলে আসতে পারে না৷ এ অর্থও হতে পারে যে, দোযখ থেকে বের হতে চাইলে বের হতে পারবে না৷ আবার এও হতে পারে যে, তওবা করতে বা অক্ষমতা প্রকাশ করতে চাইলে তা গ্রহণ করা হবে না৷
২৯. এটা আল্লাহর স্বতন্ত্র ও স্থায়ী বিধান৷ খারাপ নিয়ত ও খারাপ আকাংখা পোষণকারী মানুষকে তিনি কখনো ভাল সংগী যোগান না৷তার ঝোঁক ও আগ্রহ অনুসারে তিনি তাকে খারাপ সঙ্গীই জুটিয়ে দেন৷ সে যতই দুষ্কর্মের নিকৃষ্টতার গহবরে নামতে থাকে ততই জঘন্য থেকে জঘন্যতর মানুষ ও শয়তান তার সহচর, পরামর্শদাতা ও কর্মসহযোগী হতে থাকে৷ কারো কারো উক্তি, অমুক ব্যক্তি নিজে খুব ভালো কিন্তু তার সহযোগী ও বন্ধু-বান্ধব জুটেছে খারাপ, এটা বাস্তবের সম্পূর্ণ পরিপন্থী৷ প্রকৃতির বিধান হলো, প্রতিটি ব্যক্তি নিজে যেমন তার বন্ধু জোটে ঠিক তেমনি৷ একজন সৎ ও নেকমানুষের সাহচর্যে খারাপ মানুষ আসলেও বেশী সময় সে তার সাথে থাকতে পারে না৷অনুরূপ অসৎ উদ্দেশ্যে কর্মরত একজন দুষ্কর্মশীল মানুষের সাথে হঠাৎ সৎ ও সভ্রান্ত মানুষের বন্ধুত্ব হলেও তা বেশী সময় টিকে থাকতে পারে না৷ অসৎ মানুষ প্রকৃতিগত-ভাবে অসৎ মানুষদেরই তার প্রতি আকৃষ্ট করে এবং তার প্রতি অসৎরাই আকৃষ্ট হয়৷ যেমন নোংরা ময়লা আবর্জনা মাছিকে আকৃষ্ট করে এবং মাছি নোংরা ময়লা আবর্জনার প্রতি আকৃষ্ট হয়৷ আর বলা হয়েছে, তারা সামনের ও পেছনের প্রতিটি জিনিস সুদৃশ্য করে দেখাতো৷ এর অর্থ তারা তাদের মধ্যে এ মর্মে দৃঢ় বিশ্বাস জাগিয়ে তুলতো যে, আপনার অতীত মর্যাদা ও গৌরবে ভরা এবং ভবিষ্যতও অত্যন্ত উজ্জ্বল৷ তারা তাদের চোখে এমন চশমা পরিয়ে দিতো যে, তারা চারদিকে কেবল সবুজ শ্যামল শোভাই দেখতে পেতো৷ তারা তাদের বলতো, আপনার সামালোচকরা নির্বোধ৷ আপনি কি কোন ভিন্ন ও বিরল প্রকৃতির কাজ করছেন ? আপনি যা করছেন পৃথিবীতে প্রগতিবাদীরা তো তাই করে থাকে আর ভবিষ্যতে প্রথমত আখেরাত বলে কিছুই নেই, যেখানে আপনাকে নিজের সব কাজকর্মের জবাবদিহি করতে হবে৷ তবে কতিপয় নির্বোধ আখেরাত সংঘটিত হওয়ার যে দাবী করে থাকে তা যদি সংঘটিত হয়ও তাহলে যে আল্লাহ এখানে আপনাকে নিয়ামত রাজি দিয়ে পুরস্কৃত করেছেন সেখানেও তিনি আপনার ওপর পুরস্কার ও সম্মানের বৃষ্টি বর্ষণ করবেন৷ দোযখ আপনার জন্য তৈরী করা হয়নি, তাদের জন্য তৈরী করা হয়েছে যাদেরকে আল্লাহ এখানেও তাঁরা নিয়ামতসমূহ থেকে বঞ্চিত রেখেছেন৷