(৪১:৯) হে নবী, এদের বলো , তোমরা কী সেই আল্লাহর সাথে কুফরী করছো এবং অন্যদেরকে তাঁর সাথে শরীক করছো যিনি দুদিনে পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন ? তিনিই বিশ্ব জাহানের সবার রব৷
(৪১:১০) তিনি (পৃথিবীকে অস্তিত্ব দানের পর) ওপর থেকে তার ওপর পাহাড় স্থাপন করেছেন এবং তাতে বরকত দান করেছেন৷ ১১ আর তার মধ্যে সব প্রার্থীর জন্য প্রত্যেকের চাহিদা ও প্রয়োজন অনুসারে সঠিক পরিমাপে খাদ্য সরবরাহ করেছেন৷১২ এসব কাজ চার দিনে হয়েছে৷১৩
(৪১:১১) তার পর তিনি আসমানের দিকে মনোনিবেশ করেছেন যা সেই সময় কেবল ধূয়া ছিল৷১৪ তিনি আসমান ও যমীনকে বললেন : ইচ্ছায় হোক বা অনিচ্ছায় হোক তোমরা অস্তিত্ব ধারন করো৷ উভয়ে বললো : আমরা অনুগতদের মতই অস্তিত্ব গ্রহণ করলাম৷১৫
(৪১:১২) তারপর তিনি দু’দিনের মধ্যে সাত আসমান বানালেন এবং প্রত্যেক আসমানে তিনি তাঁর বিধান অহী করলেন৷ আর পৃথিবীর আসমানকে আমি উজ্জ্বল প্রদীপ দিয়ে সজ্জিত করলাম এবং ভালভাবে সুরক্ষিত করে দিলাম৷ ১৬ এসবই এক মহা পরাক্রমশালী জ্ঞানী সত্তার পরিকল্পনা৷
(৪১:১৩) এখন যদি এরা মুখ ফিরিয়ে নেয় ১৭ তাহলে এদের বলে দাও আদ ও সামূদের ওপর যে ধরনের আযাব নাযিল হয়েছিলো আমি তোমাদেরকে অকস্মাত সেই রূপ আযাব আসার ব্যাপারে সাবধান করছি৷
(৪১:১৪) সামনে ও পেছনে সব দিক থেকে যখন তাদের কাছে আল্লাহর রসূল এলো ১৮ এবং তাদেরকে বুঝালো আল্লাহ ছাড়া আর কারো দাসত্ব করো না তখন তারা বললো : আমাদের রব ইচ্ছা করলে ফেরেশতা পাঠাতে পারতেন ৷ সুতরাং তোমাদেরকে যে জন্য পাঠানো হয়েছে আমরা তা মানি না৷১৯
(৪১:১৫) তাদের অবস্থা ছিল এই যে, পৃথিবীতে তারা অন্যায়ভাবে নিজেদেরকে বড় মনে করে বসেছিলো এবং বলতে শুরু করেছিল : আমাদের চেয়ে অধিক শক্তিশালী আর কে আছে ? তারা একথা বুঝলোনা যে, যে আল্লাহ তাদেরকে সৃষ্টি করেছেন , তিনি তাদের অপেক্ষা অধিক শক্তিশালী৷ তারা আমার আয়াতসমূহকে অস্বীকারই করে চললো৷
(৪১:১৬) অবশেষে আমি কতিপয় অমঙ্গলকর দিনে তাদের ওপর প্রবল ঝড়ো বাতাস পাঠালাম ২০ যেন পার্থিব জীবনেই তাদেরকে অপমান ও লাঞ্ছনাকর আযাবের মজা চাখাতে পারি৷২১ আখেরাতের আযাব তো এর চেয়েও অধিক অপমানকর৷ সেখানে কেউ তাদের সাহায্যকারী থাকবে না৷
(৪১:১৭) আর আমি সামূদের সামনে সত্য পথ পেশ করেছিলাম কিন্তু তারা পথ দেখার চেয়ে অন্ধ হয়ে থাকা পছন্দ করলো৷ অবশেষে তাদের কৃতকর্মের কারণে তাদের ওপর লাঞ্ছনাকর আযাব ঝাঁপিয়ে পড়লো ৷
(৪১:১৮) যারা ঈমান এনেছিল এবং গোমরাহী ও দুষ্কৃতি থেকে দূরে অবস্থান করতো ২২ আমি তাদেরকে রক্ষা করলাম৷
১১. পৃথিবীর বরকতসমূহ অর্থ অঢেল ও সীমা সংখ্যাহীন উপকরণ যা কোটি কোটি বছর ধরে ক্রমাগত পৃথিবীর অভ্যন্তর থেকে বেরিছে আসছে এবং শুধু অণুবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যেই দেখা যায় এমন ক্ষুদ্র কীট থেকে শুরু করে মানুষের উন্নত সভ্যতার দৈনন্দিন চাহিদা সমূহ পূরণ করছে৷ এর মধ্যে সবচেয়ে বড় বরকত হচ্ছে বাতাস ও পানি৷ কারণ, পানির বদৌলতেই ভূ-পৃষ্ঠে উদ্ভিদ, জীবকূল ও মানুষের জীবন সম্ভব হয়েছে৷
১২. মূল আয়াতের বাক্য হচ্ছে ( আরবী ) এ আয়াতাংশের ব্যাখ্যায় মুফাসসিরগণ কতিপয় স্বতন্ত্র মতামত পেশ করেছেন৷ কিছু সংখ্যক মুফাসসিরগন এর অর্থ বর্ণনা করেছেন : "পৃথিবীতে প্রার্থীদের সঠিক হিসাব অনুসারে তাদের সমুদয় রিযিক পুরা চার দিনে রাখা হয়েছে৷" অর্থাৎ পুরো চার দিনে রাখা হয়েছে এর কম বা বেশী নয়৷

ইবনে আব্বাস (রা) , কাতাদা ও সুদ্দী এর অর্থ করেন : "পৃথিবীতে তার রিযিকসমূহ চার দিনে রাখা হয়েছে৷ জিজ্ঞেসকারীদের জবাব সম্পূর্ণ হয়েছে৷" অর্থাৎ কেউ যদি জিজ্ঞেসা করে, এ কাজ কতদিনে সম্পন্ন হয়েছে তার পূর্ণাঙ্গ জবাব হচ্ছে চার দিনে সম্পন্ন হয়েছে৷ ইবনে যায়েদ এর বর্ণনা করেন : "প্রার্থীদের জন্য পৃথিবীতে চার দিনের মধ্যে তাদের রিযিকসমূহ সঠিক পরিমাণে প্রতেকের চাহিদা ও প্রয়োজন অনুসারে রেখেছেন ৷"

ভাষার ব্যাকরণগত নিয়ম অনুসারে আয়াতের বাক্যাংশে এ তিনটি অর্থই গ্রহণ করার অবকাশ আছে ৷ তবে আমাদের মতে প্রথরোক্ত অর্থ দুটিতে গুণগত কোন বিয়ষ নেই৷ স্থানকাল অনুসারে বিচার করলে এ কথা এমনকি গুরুত্ব বহন করে যে, কাজটি চার দিনের এক ঘন্টা করে বা বেশীতে নয় বরং পূর্ণ চার দিনে সম্পন্ন হয়েছে৷ আল্লাহর কুদরত, রবুবিয়াত ও হিকমতে কি অপূর্ণতা ছিল যা পূরণ করার জন্য এ ব্যাখ্যার প্রয়োজন হবে ? আয়াতের পূর্বের ও পরের বিষয়ের মধ্যে কোথাও এমন কোন ইংগিত নেই যা দ্বারা বুঝা যায় তখন কোন জিজ্ঞেসকারী এ প্রশ্ন করেছিলো যে এসব কাজ কতদিনে সম্পন্ন হয়েছিলো যার জবাব দিতে এ আয়াত নাযিল হয়েছিলো৷ এসব কারণে আমরা অনুবাদের মধ্যে তুলনীয় অর্থটি গ্রহণ করেছি৷ আমাদের মতে আয়াতের সঠিক অর্থ হচ্ছে, সৃষ্টির সূচনাকাল থেকে কিয়ামত পর্যন্ত যত প্রকারের যত মাখলুক আল্লাহ সৃষ্টি করবেন তাদের প্রত্যেকের সঠিক চাহিদা ও প্রয়োজন অনুসারে খাদ্যের সব সরঞ্জাম হিসাব করে তিনি পৃথিবীর বুকে রেখে দিয়েছেন৷ স্থল ভাগে ও পানিতে অসংখ্য প্রকারের উদ্ভিদ রয়েছে৷ এদের প্রতিটি শ্রেণীর খাদ্য সংক্রান্ত প্রয়োজন অন্য সব শ্রেণী থেকে ভিন্ন৷ আল্লাহ বায়ুমন্ডল , স্থল ও পানিতে অসংখ্য প্রজাতির জীবজন্ত সৃষ্টি করেছেন এবং প্রতিটি প্রজাতিরই স্বতন্ত্র ধরনের খাদ্য প্রয়োজন৷ তাছাড়া এসব প্রজাতি থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের সৃষ্টি মানুষ৷ মানুষের খাদ্যের প্রয়োজন শুধু দেহের লালন ও পরিপুষ্টি সাধনের জন্যই নয়, তার রুচির পরিতৃপ্তির জন্যও নানা রকম খাদ্যের প্রয়োজন ৷ আল্লাহ ছাড়া আর কার পক্ষে জানা সম্ভব ছিল মাটির তৈরী এই গ্রহটির ওপরে জীবনের উৎপত্তি থেকে শুরু করে তার পরিসমাপ্তি পর্যন্ত কোন কোন শ্রেণীর সৃষ্টিকুল কত সংখ্যায় কোথায় কোথায় এবং কোন কোন সময় অস্তিত্ব লাভ করবে এবং তাদের প্রতিপালনের জন্য কোন প্রকারের খাদ্য কত পরিমাণে দরকার হবে৷ নিজের সৃষ্টি পরিকল্পনা করেছিলেন অনুরূপভাবে তাদের চাহিদা পূরণের জন্য খাদ্য সরবরাহেরও পূর্ণ ব্যবস্থা করেছেন৷

বর্তমান যুগে যেসব লোক মার্কসীয় সমাজতন্ত্রিক চিন্তার ইসলামী সংস্করণ কুরআনী নেজামে রবুবিয়াতের নামে বের করেছেন তারা ( আরবী )এর অনুবাদ করেন "সমস্ত প্রার্থীর জন্য সমান" আর এর ওপর যুক্তি প্রমাণের প্রাসাদ নির্মাণ করেন এই বলে যে, আল্লাহ পৃথিবীতে সব মানুষের জন্য সমপরিমাণে খাদ্যের ব্যবস্থা করেছেন৷ কাজেই আয়াতের উদ্দেশ্য পূরণার্থে এমন একটি রাষ্ট্র ব্যবস্থার প্রয়োজন যা সবাইকে খাদ্যের সমান রেশন সরবরাহ করবে৷ কারণ, এই কুরআন যে সাম্য দাবী করে ব্যক্তি মালিকানা ব্যবস্থায় তা কায়েম হতে পারে না৷ কিন্তু কুরআনের দ্বারা নিজেদের মতবাদসমূহের খেদমত করানোর অতি আগ্রহে তারা এ কথা ভুলে যান যে (আরবী) বা প্রার্থী বলে এ আয়াতে যাদের কথা উল্লেখ করা হয়েছে তাদের মধ্যে শুধু মানুষ নয় বিভিন্ন শ্রেণীর অন্যান্য সৃষ্টিও রয়েছে, জীবন ধারণের জন্য যাদের খাদ্যের প্রয়োজন৷ আল্লাহ কি প্রকৃতই এসব সৃষ্টির সধ্যে কিংবা তাদের এক একটি শ্রেণীর সবার মধ্যে জীবনোপকরণের ক্ষেত্রে সাম্যের ব্যবস্থা রেখেছেন৷ প্রকৃতির গোটা ব্যবস্থাপনায় কোথাও কি আপনি সমানভাবে খাদ্য বন্টনের ব্যবস্থা দেখতে পান ? প্রকৃত ব্যাপার যদি তা না হয়ে থাকে তাহলে তার অর্থ হচ্ছে, উদ্ভিদ এবং জীবজগতের মধ্যে, যেখানে মানুষের পরিচালিত রাষ্ট্রিয় ব্যবস্থাপনা নেই, বরং আল্লাহর রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা সরাসরি রিযিক বন্টনের ব্যবস্থা করেছে সেখানে আল্লাহ নিজেই এই "কুরআনী বিধান" লংঘন করেছেন-এমনকি (নাউযুবিল্লাহ) বে-ইনসাফী করেছেন ? তারা এ কথাও ভুলে যায়, মানুষ যে সব জীবজন্তু পালন করে এবং যাদের খাদ্য যোগানোর দায়িত্ব মানুষেরই তারাও (আরবী) এর অন্তর্ভূক্ত৷ যেমন : ভেড়া, বকরী,গরু, মোষ, ঘোড়া, গাধা, খচ্চর ও উট প্রভৃতি৷ সব প্রার্থীকে সমান খাদ্য দিতে হবে এটাই যদি কুরবানী বিধান হয় এবং এ বিধান চালু করার জন্য "নেজাম রবুবিয়াত" পরিচালনাকারী একটি রাষ্ট্রেও প্রয়োজন থাকে তাহলে সেই রাষ্ট্র কি মানুষ এবং এসব জীবজন্তও মধ্যেও আর্থিক সাম্য প্রতিষ্ঠিত করবে ?
১৩. এ স্থানের ব্যাখ্যায় সাধারণভাবে মুফাসসিদেরকে একটি জটিলতার সম্মুখীন হতে হয়েছে৷ জটিলতাটি হচ্ছে, যদি পৃথিবী সৃষ্টির দুই দিন এবং সেখানে পাহাড় স্থাপন, বরকত দান এবং খাদ্যোপকরণ সৃষ্টির জন্য চার দিন ধরা হয় সে ক্ষেত্রে পরে আসমান সৃষ্টির জন্য যে দুই দিনের কথা বলা হয়েছে সেই দুই দিনসহ মোট আট দিন হয়৷ কিন্তু আল্লাহ কুরআন মাজীদের বেশ কিছু জায়গায় সুস্পষ্টভাবে বলেছেন যে, পৃথিবী ও আসমান সর্বমোট ছয় দিনে সৃষ্টি করা হয়েছে ( উদাহরণ স্বরূপ দেখুন , তাফহীমুল কুরআন-সূরা আল আরাফ ৫৪, সূরা ইউনুস ৩, সূরা হুদ৭ এবং সূরা আল ফুরকান ৫৯আয়াত সমূহ৷) এ কারণে প্রায় সমস্ত মুফাসসিরই বলেন : এই চার দিন পৃথিবী সৃষ্টির দু'দিন সহ৷ অর্থাৎ পৃথিবী সৃষ্টির দু' দিন এবং উপরে যেসব জিনিসের উল্লেখ করা হয়েছে পৃথিবীতে সেসব জিনিস সৃষ্টির জন্য আরো দু'দিন৷ এভাবে মোট চার দিনে পৃথিবী তার সব রকম উপায় উপকরণসহ পরিপূর্ণতা লাভ করেছে৷ কিন্তু একদিকে এটা কুরআন মজীদের বাহ্যিক বক্তব্যের পরিপন্থী আর মূলত যে জটিলতা থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য এই ব্যাখ্যার প্রয়োজন অনুভূত হয়েছে তা একান্তই কাল্পনিক৷ যে দু দিনে সামগ্রিকভাবে গোটা বিশ্ব জাহান সৃষ্টি করা হয়েছে মূলত পৃথিবী সৃষ্টির দু দিন তা থেকে ভিন্ন নয়৷ পরবর্তী আয়াত সাত আসমান নির্মাণ করেছেন৷ এই সাত আসমান বলে বুঝানো হয়েছে গোটা বিশ্ব জাহান , আমাদের এই পৃথিবীও যার একটা অংশ৷ তারপর যখন বিশ্ব জাহানের অন্যান্য অসংখ্য তারকা ও গ্রহের মত এই পৃথিবীও উক্ত দু'দিনে একটি গ্রহের আকৃতি ধারণ করলো৷ তখন আল্লাহ সেটিকে জীবকুলের জন্য প্রস্তুত করতে শুরু করলেন এবং চার দিনের মধ্যে সেখানে সেই সব উপকরণ সৃষ্টি করলেন পূর্বোক্ত আয়াতে যার উল্লেখ করা হয়েছে৷ এ চার দিনে অন্যান্য তারকা ও গ্রহের কি উন্নয়ন সাধন হয়েছে আল্লাহ এখানে তা উল্লেখ করেননি ৷ কারণ যে যুগে কুরআন নাযিল হয়েছিলো সেই যুগের মানুষ তো দূরের কথা এ যুগের মানুষও সে সব তথ্য হজম করার সামর্থ রাখে না৷
১৪. এখানে তিনটি বিষয় স্পষ্ট করে দেয়া প্রয়োজন৷ এক, এখানে আসমান অর্থ সমগ্র বিশ্ব জাহান৷ পরবর্তী আয়াতাংশ থেকে তা সুস্পষ্ট বুঝা যায়৷ অন্য কথায় আসমানের দিকে মনোনিবেশ করার অর্থ হচ্ছে আল্লাহ বিশ্ব জাহান সৃষ্টির দিকে মনোনিবেশ করলেন৷

দুই , বিশ্ব জাহানকে আকৃতি দানের পূর্বে তা আকৃতিহীন ইতস্তত বিক্ষিপ্ত গো ধূলির মত মহাশূন্যে বস্তুর প্রাথমিক অবস্থায় ছড়ানো ছিল৷ ধোঁয়া বলতে বস্তুর এই প্রাথমিক অবস্থাকে বুঝানো হয়েছে৷ বর্তমান যুগের বৈজ্ঞানিকগন এ জিনিসকেই নীহারিকা বলে ব্যাখ্যা করেন৷ বিশ্ব জাহান সৃষ্টির প্রারম্ভিক পর্যায় সম্পর্কে তাদের ধ্যান-ধারণাও হচ্ছে, যে বস্তু থেকে বিশ্ব জাহান সৃষ্টি হয়েছে সৃষ্টির পূর্বে তা এই ধোঁয়া অথবা নীহারিকার আকারে ছড়ানো ছিল৷

তিন, "তারপর তিনি আসমানের দিকে মনোনিবেশ করলেন" বাক্য দ্বারা একথা বুঝা ঠিক নয় যে, প্রথমে তিনি পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন তারপর তার ওপরে পাহাড় স্থাপন, বরকত দান এবং খাদ্য উপকরণ সরবরাহের কাজ সম্পন্ন করেছেন৷ এসব করার পর তিনি বিশ্ব জাহান সৃষ্টির প্রতি মনোনিবেশ করেছেন৷ পরবর্তী বাক্যাংশ "তিনি আসমান ও যমীনকে বললেন : তোমরা অসিত্ব ধারণ করো৷ উভয়ে বললো, আমরা অনুগতদের মতই অস্বিত্ব গ্রহণ করলাম" এই ভুল ধারণা নিরসন করে দেয়া এ থেকে এ কথা স্পষ্ট হয়ে যায় যে, এটি এবং পরবর্তী আয়াতসমূহে সেই সময়ের কথা বলা হচ্ছে যখন আসমান ও যমীন কিছুই ছিল না, বরং বিশ্ব জাহান সৃষ্টির সূচনা করা হচ্ছিলো শুধু (আরবী ) তারপর, অতপর বা পরে শব্দটিকে এ বিষয়ের প্রমাণ হিসেবে পেশ করা যায় না যে আসমান সৃষ্টির পূর্বেই পৃথিবী সৃষ্টি করা হয়ে ছিলো৷ (আরবী) শব্দটি যে অনিবার্যরূপে সময়-ক্রম বুঝতে ব্যবহৃত হয় না বর্ণনা -ক্রম বুঝতেও ব্যবহৃত হয় কুরআন মজীদে তার বেশ কিছু উদাহরণ বিদ্যমান৷ ( দেখুন, তাফহীমূল কুরআন, সূরা যুমার, ঢীকা নম্বর ১২)

কুরআন মজীদের ভাষ্য অনুসারে প্রথমে যমীন না আসমান সৃষ্টি হয়েছে প্রাচীন যুগের মুফাসসিরদের মধ্যে এ নিয়ে দীর্ঘদিন পর্যন্ত বিতর্ক চলেছে একদল এ আয়াত এবং সূরা বাকারার ২৯আয়াতের মাধ্যমে যুক্তি পেশ করেন যে পৃথিবীই প্রথমে সৃষ্টি হয়েছে৷ অপর দল সূরা নাযিয়াতের ২৭ থেকে ৩৩ পর্যন্ত আয়াত হতে দলীল পেশ করে বলেন , আসমান প্রথমে সৃষ্টি হয়েছে৷ কেননা, সেখানে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে আসমানের পরে যমীন সৃষ্টি হয়েছে৷ হবে প্রকৃত ব্যাপার এইযে, পদার্থ বিজ্ঞান বা জ্যোতিবিদ্যা শেখানোর জন্য কুরআন মজীদের কোথাও বিশ্ব জাহান সৃষ্টির বিষয় উল্লেখ করা হয়নি, বরং তাওহীদ ও আখেরাতের আকীদার প্রতি ঈমানের দাওয়াত দিতে গিয়ে আরো অসংখ্য নিদর্শনের মত যমীন ও আসমানের সৃষ্টি বিষয়টিও চিন্ত-ভাবনা করে দেখার জন্য পেশ করা হয়েছে৷ এ উদ্দেশ্যে আসমান ও যমীন সৃষ্টির সময়-ক্রম বর্ণনা করে যমীন আগে সৃষ্টি হয়েছে না আসমান আগে সৃষ্টি হয়েছে তার উল্লেখ একেবারেই অপ্রয়োজনীয় ছিল৷ দুটি বস্তুর মধ্যে এটি বা সেটি যেটি প্রথমে সৃষ্টি হয়ে থাকুক সর্ববস্থায় দুটিই আল্লাহর একমাত্র ইলাহ হওয়ার প্রমাণ৷ তা এ কথাও প্রমাণ করে যে, তাদের সৃষ্টিকর্তা এ সমগ্র কারখানা কোন খেলোয়াড়ের খেলনা হিসেবে সৃষ্টি করেননি৷ এ কারণেই কুরআন কোন জায়গায় পৃথিবী সৃষ্টির কথা প্রথমে উল্লেখ করে আবার কোন জায়গায় প্রথমে উল্লেখ করে আসমান সৃষ্টির কথা যে ক্ষেত্রে আল্লাহর মহত্ব এবং তাঁর কুদরতের পূর্ণতার ধারণা দেয়া উদ্দেশ্য হয় সে ক্ষেত্রে সাধারণত আসমানের উল্লেখ প্রথমে করেন৷ কারণ, সুদূরবর্তী আসমান চিরদিনই মানুষের মনের ওপর বিরাট প্রভাব বিস্তার করে আছে৷
১৫. আল্লাহ এ আয়াতাংশে তাঁর সৃষ্টি পদ্ধতির অবস্থা এমন ভঙ্গিতে বর্ণনা করেছেন যার মাধ্যমে আল্লাহর সৃষ্টি ও মানবীয় সৃষ্টি ক্ষমতার পার্থক্য পুরোপুরি স্পষ্ট হয়ে যায়৷ মানুষ যখন কোন জিনিস বানাতে চায় তখন প্রথমেই নিজের মন-মগজে তার একটা নকশা ফুটিয়ে তোলে এবং সে জন্য পরে প্রয়োজনীয় উপকরণ সংগ্রহ করে৷ তারপর ঐ সব উপকরনের বাধা সফল হয় এবং কাংখিত বস্তু পরিকল্পিত নকশা অনুসারে ঠিকমত তৈরী হয় না৷ আবার কখনো ব্যক্তির প্রচেষ্টা প্রবল হয় এবং সে উপকরণ সমূহকে কাংখিত রূপদানে সফল হয়ে যায়৷ উদাহরণ স্বরূপ কোন দর্জি একটি জামা তৈরী করতে চায় ৷ এ জন্য সে প্রথমে তার মন-মগজে জামার নকশা ও আকৃতি কল্পনা করে৷ তারপর কাপড় সংগ্রহ করে নিজের পরিকল্পিত জামার নকশা অনুসারে কাপড় কাটতে ও সেলাই করতে চেষ্টা করে এবং এই চেষ্টার সময় তাকে উপর্যুপরি কাপড়ের প্রতিবন্ধকতার মোকাবিলা করতে হয়৷ এমনকি এ ক্ষেত্রে কখনো দর্জির প্রচেষ্টা সফল হয় এবং সে কাপড়কে তার পরিকল্পিত নকশায় রূপদান করে৷ এবার আল্লাহর সৃষ্টি পদ্ধতির দিকে লক্ষ্য করুন৷ বিশ্ব জাহান সৃষ্টির উপকরণ ধূঁয়ার আকারে ছড়িয়ে ছিলো৷ বিশ্ব জাহানের বর্তমান যে রূপ আল্লাহ তাকে সেই রূপ দিতে চাইলেন৷ এ উদ্দেশ্যে তাকে বসে বসে কোন মানুষ কারিগরের মত পৃথিবী, চাঁদ, সূর্য এবং অন্যান্য তারকা ও গ্রহ-উপগ্রহ বানাতে হয়নি ৷ বরং তাঁর পরিকল্পনায় বিশ্ব জাহানের যে নকশা ছিল সে অনুসারে তাকে অস্তিত্ব গ্রহণ করতে চাচ্ছিলেন ঐ সব উপকরণ যেন সেই আকৃতি ধারণ করে সেই নির্দেশ দান করলেন৷ আল্লাহর আদেশের পথে প্রতিবন্ধক হওয়ার ক্ষমতা ঐ সব উপকরণের ছিল না ৷ ঐ উপকরণ সমূহকে বিশ্ব জাহানের আকৃতি দান করতে আল্লাহকে কোন পরিশ্রম করতে ও প্রচেষ্টা চালাতে হয়নি৷ একদিকে আদেশ হয়েছে আরেকদিকে ঐ সব উপকরণ সংকুচিত ও একত্রিত হয়ে অনুগতদের মত প্রভুর পরিকল্পিত নকশা অনুযায়ী তৈরী হতে শুরু করেছে এবং ৪৮ ঘন্টায় পৃথিবীসহ সমস্ত বিশ্ব জাহান সম্পূর্ণরূপে প্রস্তুত হয়ে গিয়েছে৷ আল্লাহর সৃষ্টি পদ্ধতির এই অবস্থাকে কুরআন মজীদের আরো কতিপয় স্থানে এভাবে বর্ণনা করা হয়েছে ৷ আল্লাহ যখন কোন কাজ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন তখন শুধু এই নির্দেশ দেন, 'হয়ে যাও' আর তখনি তা হয়ে যায়৷ ( দেখুন তাফহীমূল কুরআন , আল বাকারা, টীকা ১১৫: আল ইমরান , টীকা ৪৪ ও ৫৩; আন নাহল, টীকা ৩৫ ও ৩৬; মারয়াম, টীকা ২২; ইয়াসীন, আয়াত ৮২এবং আল মু'মিন, আয়াত ৬৮)৷
১৬. এসব আয়াত বুঝার জন্য তাফহীমূল কুরআনের নিম্ন বর্ণিত স্থান সমুহ অধ্যায়ন করা সহায়ক হবে : আল বাকারা , টীকা ৩৪; আর রা'আদ, টীকা ২; আল-হিজর, টীকা ৮ থেকে ১২; আল আম্বিয়া , টীকা ৩৪ ও ৩৫ ; আল-মু'মিনুন, টীকা ১৫;ইয়াসীন, টীকা ৩৭ এবং আস সাফফাত, টীকা ৫ ও ৬৷
১৭. অর্থাৎ যিনি এই পৃথিবী ও সারা বিশ্ব জাহান সৃষ্টি করেছেন তিনি একাই আল্লাহ ও উপাস্য এ কথা মানে না এবং বাস্তবে যারা তাঁর সৃষ্টি ও দাস তাদেরকে উপাস্য বানাবার এবং আল্লাহর সত্তা, গুণাবলী, অধিকার ও ক্ষমতা-ইখতিয়ারে শরীক করার জন্য জিদ করে যেতে থাকে৷
১৮. এ আয়াতাংশের কয়েকটি অর্থ হতে পারে৷ এক, তাদের কাছে একের পর এক রসূল এসেছেন৷ দুই, রসূলগণ সব উপায় তাদের বুঝানোর চেষ্টা করেছেন এবং তাদেরকে সঠিক পথে পরিচালনার জন্য কোন উপায় ও পন্থা গ্রহণ করতেই কসুর করেননি৷ তিন, তাদের নিজ দেশেও তাদের কাছে রসূল এসেছেন এবং তাদের আশেপাশের দেশসমূহেও রসূল এসেছেন৷
১৯. অর্থাৎ আল্লাহ যদি আমাদের এ ধর্ম পছন্দ না করতেন এবং এ ধর্ম থেকে বিরত রাখার জন্য আমাদের কাছে কোন রসূল পাঠাতে চাইতেন তাহলে ফেরেশতা পাঠাতেন ৷ তোমরা যেহেতু ফেরেশতা নও, বরং আমাদের মত মানুষ৷ তাই তোমাদেরকে আল্লাহ পাঠিয়েছেন৷ আমরা এ কথা মানতে প্রস্তুত নই আর তোমরা যে দীন পেশ করছো আমরা আমাদের ধর্ম পরিত্যাগ করে তা গ্রহণ করি এ উদ্দেশ্যে আল্লাহ তোমাদের পাঠিয়েছেন আমরা একথা মানতেও প্রস্তুত নই৷ " যে উদ্দেশ্যে তোমাদের পাঠানো হয়েছে" তা আমরা মানি না-কাফেরদের এ উক্তি ছিল তীব্র কটাক্ষ৷ এর অর্থ এ নয় যে, তারা সেটাকে আল্লাহর প্রেরিত বলে জানতো কিন্তু তা সত্ত্বেও তা মানতে অস্বীকৃতি জানাতো৷ বরং ফেরাউন হযরত মূসা সম্পর্কে তার সভাসদদেরকে যে ধরনের বিদ্রুপাত্মক উক্তি করেছিলো এটাও সে ধরনের বিদ্রুপাত্মক বর্ণনাভঙ্গি৷ ফেরাউন তার সভাসদদের বলেছিলো :

আরবী : ...........................................................................

"যে রসূল সাহেবকে তোমাদের কাছে পাঠানো হয়েছে তাকে তো বদ্ধ পাগল বলে মনে হয়৷" ( আরো ব্যাখ্যার জন্য দেখুন , তাফহীমুল কুরআন, সূরা ইয়াসীন, টীকা ১১ )
২০. অমঙ্গলকর দিনের অর্থ এ নয় যে, দিনগুলোর মধ্যেই অমঙ্গল নিহিত ছিল৷ আর আদ জাতির ওপর এই অমঙ্গলকর দিন এসেছিলো বলেই যে আযাব এসেছিল তাও ঠিক নয়৷ এর অর্থ যদি তাই হতো এবং ঐ দিনগুলোই অমঙ্গলকর হতো তাহলে দূরের ও কাছের সব কওমের ওপরই আযাব আসতো৷ তাই এর সঠিক অর্থ হচ্ছে যেহেতু সেই দিনগুলোতে ঐ কওমের ওপর আল্লাহর আযাব নাযিল হয়েছিলো তাই আদ কওমের জন্য অমঙ্গলজনক হওয়ার প্রমাণ পেশ করা ঠিক নয়৷

প্রচন্ড ঝড়ো বাতাস বুঝাতে (আরবী : ) শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে৷ এর অর্থ বর্ণনার ক্ষেত্রে ভাষাবিদদের মতানৈক্য আছে৷ কেউ কেউ বলেন : এর অর্থ মারাত্নক 'লু' প্রবাহ; কেউ কেউ বলেন. এর অর্থ প্রচন্ড ঠান্ডা বাতাস এবং কারো কারো মতে এর অর্থ এমন বাতাস যা প্রবাহিত হওয়ার সময় প্রচন্ড শব্দ সৃষ্টি হয়৷ তবে এ অর্থে সবাই একমত যে, শব্দটি প্রচন্ড ঝড়ো হাওয়ার জন্য ব্যবহৃত হয়৷

কুরআন মাজীদের অন্যান্য স্থানে এ আযাব সম্পর্কে যেসব বিস্তারিত বর্ণনা আছে তা হচ্ছে, এ বাতাস উপর্যুপরি সাত দিন এবং আট রাত পর্যন্ত প্রবাহিত হয়েছিলো ৷ এর প্রচন্ডতায় মানুষ পড়ে গিয়ে এমনভাবে মৃত্যুবরণ করে এবং মরে মরে পড়ে থাকে যেমন খেজুরের ফাঁপা কান্ড পড়ে থাকে ( আল-হাককাহ, আয়াত ৭)৷ এ বাতাস যে জিনিসের ওপর দিয়েই প্রবাহিত হয়েছে তাকেই জরাজীর্ণ করে ফেলেছে ( আয যারিয়াত, আয়াত ৪২) যে সময় এ বাতাস এগিয়ে আসছিলো তখন আদ জাতির লোকেরা এই ভেবে আনন্দে মেতে উঠেছিলো যে, মেঘ চারদিক থেকে ঘিরে আসছে৷ এখন বৃষ্টি হবে এবং তাদের আশা পূর্ণ হবে৷ কিন্তু তা এমনভাবে আসলো যে গোটা এলাকাই ধ্বংস করে রেখে গেল ( আল আহকাফ, আয়াত ২৪ ও ২৫)৷
২১. যে অহংকার ও গর্বের কারণে তারা পৃথিবীতে বড় সেজে বসেছিলো এবং বুক ঠুকে বলতো : আমাদের চাইতে অধিক শক্তিশালী আর কে আছে অপমান ও লাঞ্ছনাকর এ আযাব ছিল সেই অহংকার ও গর্বের জবাব৷ আল্লাহ এমন ভাবে তাদেরকে লাঞ্ছিত করলেন যে, তাদের জনপদের একটি বড় অংশকে ধ্বংস করে দিলেন, তাদের সভ্যতাকে নিশ্চিহ্ন করে ফেললেন এবং যে ক্ষুদ্র অংশটি অবশিষ্ট রইলো তারা পৃথিবীর সেই সব জাতির হাতেই লাঞ্ছিত ও অপমানিত হলো যাদের কাছে একদিন তারা শক্তির বড়াই করতো৷ আদ জাতির বিস্তারিত কাহিনীর জন্য দেখুন, তাফহীমুল কুরআন আল আ'রাফ, টীকা ৫১ থেকে ৫৩;হুদ , টীকা ৫৪ থেকে ৬৬; আল মু'মিনূন , টীকা ৩৪ থেকে ৩৭; আশ-শু'আরা, টীকা ৮৮ থেকে ৯৪; আল আনকাবূত, টীকা ৬৫)৷
২২. সামূদ জাতির বিস্তারিত কাহিনী জানার জন্য দেখুন, তাফহীমূল কুরআন, আল আ'রাফ, টীকা ৫৭ থেকে ৫৯; হূদ, ৬৯ থেকে ৭৪; আল হিজর, ৪২ থেকে ৪৬; বনী ইসরাইল, টীকা ৬৮; আশ শুআরা, টীকা ৯৫ থেকে ১০৬; আন নামল, টীকা ৫৮ থেকে ৬৬৷