(৪১:১) হা-মীম৷
(৪১:২) এটা পরম দয়ালু ও মেহেরবান আল্লাহর পক্ষ থেকে নাযিলকৃত জিনিস৷
(৪১:৩) এটি এমন এক গ্রন্থ যার আয়াতসমূহ সুস্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে৷ আরবী ভাষার কুরআন৷ সেই সব লোকদের জন্য যারা জ্ঞানের অধিকারী,
(৪১:৪) সুসংবাদ দানকারী ও সতর্ককারী৷ কিন্তু তাদের অধিকাংশ লোকই তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে, তারা শুনতেই পায় না৷
(৪১:৫) তারা বলে : তুমি আমাদের যে জিনিসের দিকে আহবান জানাচ্ছো সে জিনিসের ব্যাপারে আমাদের মনের ওপর পর্দা পড়ে আছে, আমাদের কান বধির হয়ে আছে এবং তোমার ও আমাদের মাঝে একটি পর্দা আড়াল করে আছে৷ তুমি তোমার কাজ করতে থাকো আমরাও আমাদের কাজ করে যাবো৷
(৪১:৬) হে নবী, এদের বলে দাও, আমি তো তোমাদের মতই একজন মানুষ৷ আমাকে অহীর মাধ্যমে জানিয়ে দেয়া হয় যে, একজনই মাত্র তোমাদের ইলাহ কাজেই সোজা তাঁর প্রতি নিবিষ্ট হও এবং তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো৷ মুশরিকদের জন্য ধ্বংস ,
(৪১:৭) যারা যাকাত দেয় না৷ এবং আখেরাত অস্বীকার করে৷
(৪১:৮) যারা ঈমান এনেছে এবং নেক কাজ করেছে, নিশ্চিতভাবে তাদের জন্য এমন পুরস্কার রয়েছে যার ধারাবাহিকতা কখনো ছিন্ন হবে না৷১০
১. এটা এই সূরার সংক্ষিপ্ত ভূমিকা ৷ পরবর্তী বক্তব্য সম্পর্কে গভীরভাবে চিন্তা-ভাবনা করলে এ ভূমিকায় আলোচিত বিষয়বস্তুর পরবর্তী বিষয়বস্তুর সাথে যে সাদৃশ্য আছে তা বুঝা যেতে পারে৷

প্রথমে বলা হয়েছে , এ বাণী আল্লাহর পক্ষ থেকে নাযিল হয়েছে৷ অর্থাৎ যতদিন ইচ্ছা তোমরা এ অপপ্রচার চালাতে থাকো যে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজে এ সব কথা রচনা করছেন৷ প্রকৃত ব্যাপার হচ্ছে, এ বাণী বিশ্ব জাহানের রবের পক্ষ থেকে এসেছে৷ তাছাড়া এ কথা বলে শ্রোতাদেরকে এ ব্যাপারে সাবধান করে দেয়া হয়েছে যে, এ বাণী শুনে যদি তোমরা অসন্তুষ্ট হও তাহলে তোমাদের সেই অসন্তষ্টি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিরুদ্ধে নয়, আল্লাহর বিরুদ্ধে ৷ যদি তা প্রত্যাখ্যান করো তাহলে কোন মানুষের কথা করছো না, আল্লাহর নিজের কথা প্রত্যাখ্যান করছো৷ আর যদি তা থেকে মুখ ফিরিয়ে থাকো তাহলে কোন মানুষ থেকে মুখ ফিরাচ্ছো না বরং, খোদা আল্লাহ তায়ালা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছো৷

দ্বিতীয় যে কথাটি বলা হয়েছে তা হচ্ছে এই যে, এ বাণী নাযিলকারী মহান আল্লাহ তাঁর সৃষ্টির প্রতি অত্যন্ত দয়ালু ও মেহেরবান (রাহমান ও রাহীম)৷ এ বাণী নাযিলকারী আল্লাহর আর সব গুণাবলীর পরিবর্তে 'রহমত' গুণটি এ সত্যের প্রতি ইংগিত করে যে, তিনি তাঁর দয়ার দাবী অনুসারে এ বাণী নাযিল করেছেন৷ এর দ্বারা শ্রোতাদেরকে এ মর্মে সাবধান করা হয়েছে যে, কেউ যদি এ বাণীর প্রতি রুষ্ট হয় বা একে প্রত্যাখ্যান করে কিংবা ভ্রুকুঞ্চিত করে তাহলে প্রকৃতপক্ষে সে নিজের সাথেই শত্রুতা করে৷ এটা বিরাট এক নিয়ামত যা আল্লাহ মানুষকে পথ প্রদর্শন এবং তার সাফল্য ও সৌভাগ্যের জন্য সরাসরি নাযিল করেছেন৷ আল্লাহ যদি মানুষের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতেন তাহলে তাদেরকে অন্ধকারে হাতড়িয়ে মরার জন্য পরিত্যাগ করতেন এবং তারা কোন গর্তে গিয়ে পতিত হবে তার কোন পরোয়াই করতেন না৷ কিন্তু সৃষ্টি করা ও খাদ্য সরবরাহ করার সাথে সাথে তার জীবনকে সুন্দর করে গোছানোর জন্য জ্ঞানের আলো দান করাও তিনি তাঁর কর্তব্য বলে মনে করেন এবং সে কারণেই তাঁর এক বান্দার কাছে এ বাণী নাযিল করছেন, এটা তাঁর দয়া ও অনুগ্রহ৷ সুতরাং যে ব্যক্তি এই রহমত দ্বারা উপকৃত হওয়ার পরিবর্তে তার বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য অগ্রসর হয় তার চেয়ে বড় অকৃতজ্ঞ এবং নিজেই নিজের দুশমন আর কে হতে পারে ?

তৃতীয় কথাটি বলা হয়েছে এই যে, এই কিতাবের আয়াত সমূহ অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বর্ণনা করা হয়েছে৷ অর্থাৎ এর কোন কথাই অস্পষ্ট ও জটিল নয়, যার ফলে এ কিতাবের বিষয়বস্তু কারো বোধগম্য হয় না বলে সে তা গ্রহণ করতে অক্ষমতা প্রকাশ করতে পারে না৷ হক ও বাতিল কি, সত্য সঠিক আকীদা-বিশ্বাস ও ভ্রান্ত আকীদা-বিশ্বাস কি, ভাল ও মন্দ নৈতিক চরিত্র কি, সৎ কাজ ও নেক কাজ কি, কোন পথের অনুসরণে মানুষের কল্যাণ এবং কোন পথ অবলম্বনে তার নিজের ক্ষতি এ গ্রন্থে তা পরিষ্কার বলে দেয়া হয়েছে৷ কেউ যদি এরূপ সুস্পষ্ট ও খোলামেলা হিদায়াত প্রত্যাখ্যান করে কিংবা সে দিকে মনযোগ না দেয় তাহলে সে কোন ওজর ও অক্ষমতা পেশ করতে পারে না৷ তার এই আচরণের সুস্পষ্ট অর্থ হচ্ছে সে ভুলকে আঁকড়ে ধরে থাকতে চায়৷

চতুর্থ কথাটি বলা হয়েছে এই যে, এটা আরবী ভাষার কুরআন৷ অর্থাৎ এ কুরআন যদি অন্য কোন ভাষায় নাযিল হতো তাহলে আরবরা অন্তত এ ওজর পেশ করতে পারতো যে, আল্লাহ যে ভাষায় তাঁর কিতাব নাযিল করেছেন আমরা সে ভাষার সাথেই পরিচিত নই৷ কিন্তু এ গ্রন্থ তাদের নিজের ভাষায় নাযিল করা হয়েছে৷ সুতরাং তারা না বুঝার অজুহাত পেশ করা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়৷( এখানে সূরার ৪৪ আয়াতটিও সামনে থাকা দরকার ৷ এ আয়াতে এই বিষয়টিই অন্যভাবে বর্ণনা করা হয়েছে৷ এ ক্ষেত্রে অনারবদের জন্য কুরাআনের দাওয়াত গ্রহণ না করার যে যুক্তিসংগত ওজর বিদ্যমান আমরা ইতিপূর্বে তার জবাব দিয়েছি৷ দেখুন, তাফহীমূল কুরআন, সূরা ইউসুফ, টীকা ৫; রাসায়েল ও মাসায়েল, প্রথম খন্ড, পৃষ্ঠা ১৯ থেকে ২৩)

পঞ্চম কথাটি বলা হয়েছে এই যে, কিতাব তদের জন্য যার জ্ঞানের অধিকারী ৷ অর্থাৎ কেবল জ্ঞানী লোকেরাই এর দ্বারা উপকৃত হতে পারে৷ অজ্ঞ লোকদের কাছে তা ঠিক তেমনি মূল্যহীন যেমন একটি মূল্যবান হীরক খন্ড এমন ব্যক্তির কাছে মূল্যহীন যে সাধারণ পাথর ও হীরক পার্থক্য জানে না৷

ষষ্ঠ কথাটি বলা হয়েছে এই যে, এ কিতাব সু-সংবাদ দানকারী ও ভীতি প্রদর্শনকারী৷ অর্থাৎ এটা শুধু এমন নয় যে, শুধু এক কল্পনাচারিতা , একটি দর্শন এবং একটি আদর্শ রচনা শৈলী পেশ করে, যা মানা না মানায় কোন ক্ষতিবৃদ্ধি নেই৷এ গ্রন্থ বরং চিৎকার করে ডেকে ডেকে গোটা দুনিয়াকে সাবধান করে দিচ্ছে যে, একে মেনে চলার ফলাফল অত্যন্ত শুভ ও মহিমাময় এবং না মানার পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ ও ধ্বংসকর ৷ এ ধরনের গ্রন্থকে কেবল কোন নির্বোধই অবলীলক্রমে উপেক্ষা করতে পারে৷
২. অর্থাৎ আমাদের মন পর্যন্ত তার পৌঁছার কোন পথই খোলা নেই৷
৩. অর্থাৎ এই আন্দোলন আমাদের ও তোমাদের মাঝে বিভেদ সৃষ্টি করে দিয়েছে ৷ তা আমাদের ও তোমাদেরকে পরস্পর বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে৷ এটা এমন এক বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে যা আমাদের ও তোমাদেরকে এক হতে দেয় না৷
৪. এর দুটি অর্থ৷ একটি অর্থ হচ্ছে, তোমার সাথে আমাদের এবং আমাদের সাথে তোমার কোন সংঘাত নেই৷ আরেকটি অর্থ হচ্ছে, তুমি যদি তোমার আন্দোলন থেকে বিরত না হও তাহলে নিজের কাজ করে যেতে থাকো৷ আমরাও তোমার বিরোধিতা পরিত্যাগ করবো না এবং তোমাকে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য আমরা সাধ্যমত সব কিছুই করবো৷
৫. অর্থাৎ তোমরা তোমাদের মনের ওপরের পর্দা উন্মোচন করা, বধির কানকে শ্রবণ শক্তি দান করার এবং যে পর্দা দিয়ে তোমরা নিজেরা আমার ও তোমাদের মধ্যে আড়াল সৃষ্টি করেছো তা সরিয়ে দেয়ার সাধ্য আমার নেই৷ আমিতো মানুষ৷ যে বুঝার জন্য প্রস্তুত আমি কেবল তাকেই বুঝাতে পারি, যে শোনার জন্য প্রস্তুত কেবল তাকেই শোনাতে পারি এবং যে মিলিত হওয়ার জন্য প্রস্তুত কেবল তার সাথেই মিলতে পারি৷
৬. অর্থাৎ তোমরা তোমাদের মনের দুয়ারে পর্দা টাঙ্গিয়ে দাও আর কান বধির করে নাও. প্রকৃত সত্য হলো তোমাদের আল্লাহ অনেক নয়, বরং শুধু মাত্র একজনই৷ আর তোমরা সেই আল্লাহরই বান্দা৷ এটা আমার চিন্তা-ভাবনা ও ধ্যান-ধারণা প্রসূত কোন দর্শন নয় যে, তার সঠিক ও ভ্রান্ত হওয়ার সমান সম্ভবনা রয়েছে৷ আমার কাছে অহী পাঠিয়ে এ সত্য তুলে ধরা হয়েছে, যার ভুল-ত্রুটির লেশমাত্র থাকার সম্ভাবনা নেই৷
৭. অর্থাৎ অন্য কাউকে আল্লাহ হিসেবে গ্রহণ করবে না, অন্য কারো দাসত্ব ও পূজা-অর্চনা করবে না, অন্য কাউকে সাহায্যের জন্য ডাকবে না৷ আর কারো সামনে আনুগত্যের মাথা নত করো না এবং অন্য কারো রীতি ও নিয়ম-কানুনকে অবশ্য অনুসরণীয় বিধান হিসেবে মেনে নিও না৷
৮. আজ পর্যন্ত তোমরা তোমাদের আল্লাহর সাথে যে বিশ্বাস হীনতার কাজ করে এসেছো এবং আল্লাহকে ভুলে যাওয়ার কারণে শিরক , কুফরী, নাফরমানি ও গোনাহ করে এসেছো তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা৷
৯. এখানে 'যাকাত' শব্দের অর্থ কি তা নিয়ে তাফসীরকারদের মধ্যে মতভেদ আছে৷ ইবনে আব্বাস তার উচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন ছাত্র ইকরিমা ও মুজাহিদ বলেন : এখানে 'যাকাত' অর্থ আত্মার সেই পবিত্রতা যা তাওহীদের আকীদা এবং আল্লাহর আনুগত্য দ্বারা অর্জিত হয়৷ এই তাফসীর অনুসারে আয়াতের অনুবাদ হবে, যেসব মুশরিক পবিত্রতা অবলম্বন করে না তাদের জন্য ধ্বংস ৷ তাফসীরকারদের আরেকটি গোষ্ঠী যার মধ্যে কাতাদা, সুদ্দী, হাসান বাসারী, দাহহাক, মুকাতিল ও ইবনুস সাইয়েবের মত তাফসীরকারক আছেন তাঁরা এখানে 'যাকাত' শব্দটিকে অর্থ-সম্পদের যাকাত অর্থ গ্রহণ করেন৷ এ ব্যাখ্যা অনুসারে আয়াতের অর্থ হবে, 'যারা শিরক করে আল্লাহর হক এবং যাকাত না দিয়ে বান্দার হক মারে তাদের জন্য ধ্বংস৷'
১০. মূল আয়াতে (আরবী) কথাটি ব্যবহার করা হয়েছে৷ এ কথাটির আরো দুটি অর্থ আছে৷ একটি অর্থ হচ্ছে তা হবে এমন পুরস্কার যা কখনো হ্রাস পাবে না৷ আরেকটি অর্থ হচ্ছে, তা হবে এমন পুরস্কার যা স্মরণ করিয়ে দেয়া হবে না বা সে জন্য খোঁটা দেয়া হবে না, যেমন কোন কৃপণ হিম্মত করে কোন কিছু দিলেও সে দানের কথা বার বার স্মরণ করিয়ে দেয়৷