(৪০:২৮) এ সময় ফেরাউনের দরবারের এক ব্যক্তি যে তার ঈমান গোপন রেখেছিলো- বললোঃ তোমরা কি এক ব্যক্তিকে শুধু এ কারণে হত্যা করবে যে, সে বলে, আল্লাহ আমার রব? অথচ সে তোমাদের রবের পক্ষ থেকে তোমাদের কাছে সুস্পষ্ট নিদর্শনসমূহ নিয়ে এসেছে৷ ৪৫ সে মিথাবাদী হয়ে থাকলে তার মিথ্যার দায়-দায়িত্ব তারই৷ ৪৬ কিন্তু সে যদি সত্যবাদী হয়ে থাকে তাহলে যেসব ভয়ানক পরিণামের কথা সে বলছে তার কিছুটা তো অবশ্যই তোমাদের ওপর আসবে৷ আল্লাহ কোন সীমালংঘনকারী মিথ্যাবাদী লোককে হিদায়াত দান করেন না৷৪৭
(৪০:২৯) হে আমার কওমের লোকেরা, আজ তোমরা বাদশাহীর অধিকারী এবং ভূ-ভাগের বিজয়ী শক্তি৷ কিন্তু আল্লাহর আযাব যদি আমাদের ওপর এসে পড়ে তাহলে আমাদেরকে সাহায্য করার মত কে আছে ?৪৮ ফেরাউন বললো, আমি যা ভাল মনে করছি সে মতামতই তোমাদের সামনে পেশ করছি৷ আর আমি তোমাদেরকে সঠিক পথের নির্দেশনাই দিচ্ছি৷৪৯
(৪০:৩০) যে ব্যক্তি ঈমান এনেছিলো, বললোঃ হে আমার কওমের লোকেরা, আমার আশংকা হচ্ছে, তোমাদের ওপরও সেদিনের মত দিন এসে না যায়, যা এর আগে বহু দলের ওপর এসেছিলো৷
(৪০:৩১) যেমন দিন এসেছিলো নূহ (আ), আদ, সামূদ এবং তাদের পরবর্তী কওমসমূহের ওপর৷ আর এটা সত্য যে, আল্লাহ তার বান্দাদের ওপর জুলুম করার কোন ইচ্ছা রাখেন না৷ ৫০
(৪০:৩২) হে কওম, আমার ভয় হয়, তোমাদের ওপর ফরিয়াদ ও অনুশোচনা করার দিন না এসে পড়ে,
(৪০:৩৩) যখন তোমরা একে অপরকে ডাকতে থাকবে এবং দৌড়িয়ে পালাতে থাকবে৷ কিন্তু সেখানে আল্লাহর হাত থেকে বাঁচানোর কেউ থাকবে না৷ সত্য কথা হচ্ছে এই যে, আল্লাহ যাকে পথভ্রষ্ট করে দেন তাকে কেউ পথ দেখাতে পারে না৷
(৪০:৩৪) এর আগে ইউসুফ তোমাদের কাছে স্পষ্ট নিদর্শনসূমহ নিয়ে এসেছিলো৷ কিন্তু তোমরা তার আনীত শিক্ষার ব্যাপারে সন্দেহই পোষণ করেছো৷ পরে তার ইন্তিকাল হলে তোমরা বললেঃ এখন আর আল্লাহ কোন রসূল পাঠাবেন না৷৫১ এভাবে ৫২ আল্লাহ তা’আলা সেসব লোকদের গোমরাহীর মধ্যে নিক্ষেপ করেন যারা সীমালংঘনকারী ও সন্দেহ প্রবণ হয়৷
(৪০:৩৫) এবং আল্লাহ আয়াতসমূহের ব্যাপারে ঝগড়া করে৷ অথছ এ ব্যাপারে তাদের কাছে কোন সনদ বা প্রমাণ আসেনি৷ ৫৩ আল্লাহ ও ঈমানদারদের কাছে এ আচরণ অত্যন্ত ক্রোধ উদ্রেককারী৷ এভাবে আল্লাহ প্রত্যেক অহংকারী ও স্বেচ্ছাচারীর মনে মোহর লাগিয়ে দেন৷ ৫৪
(৪০:৩৬) ফেরাউন বললোঃ “ হে হামান, আমার জন্য একটি সুউচ্চ ইমরাত নির্মাণ করো যাতে আমি রাস্তাসমূহ পর্যন্ত পৌঁছতে পারি৷
(৪০:৩৭) অর্থাৎ আসমানের রাস্তা এবং মূসার ইলাহকে উকি দিয়ে দেখতে পারি৷ মূসাকে মিথাবাদী বলেই আমার মনে হয়৷” ৫৫ এভাবে ফেরাউনের জন্য তার কুকর্মসমূহ সুদৃশ্য বানিয়ে দেয়া হয়েছে এবং তার সোজা পথে চলা থামিয়ে দেয়া হয়েছে৷ ফেরাউনের সমস্ত চক্রান্ত (তার নিজের) ধ্বংসের পথেই ব্যয়িত হয়েছে৷
৪৫. অর্থাৎ সে তোমাদেরকে এমন সব সুস্পষ্ট নির্দশন দেখিয়েছে যে , সে যে তোমাদের রবের রসূল তা দিবালোকের পরিস্কার হয়ে গিয়েছে৷ ফেরাউনের সভাসদদের মধ্যকার ঈমানদার ব্যক্তির ইংগিত ছিল সে নিদর্শনসমূহের প্রতি যার বিস্তারিত বিবরণ পূর্বেই বর্ণিত হয়েছে৷ (তাফহীমূল কুরআন , আল আ'রাফ , টীকা ৮৭ , ৮৯, ৯০, ৯১ , এবং ৯৪ থেকে ৯৬ ;বনী ইসরাঈল , টীকা ১১৩ থেকে ১১৬ ; ত্বা-হা , টীকা ২৯ থেকে ৫০ ; আশ শু,আরা টীকা ২৬ থেকে ৩৯ ; আন নামল , টীকা ১৬ ) ৷
৪৬. অর্থাৎ এরূপ সুস্পষ্ট নিদর্শন সত্ত্বেও তোমরা যদি তাকে মিথ্যাবাদী মনে করো , সে ক্ষেত্রেও তোমাদের জন্য উচিত তাকে তার মতো চলতে দেয়া ৷ কারণ , অপর সম্ভাবনা এবং অত্যন্ত জোরদার সম্ভাবনা হচ্ছে , সে সত্যবাদী ৷ আর সে ক্ষেত্রে তাকে হত্যা করে আল্লাহর আযাবে নিক্ষিপ্ত হবে৷ তাই তোমরা যদি তাকে মিথ্যাবাদীও মনে করো তবুও তাকে বাধা দিও না৷ সে যদি আল্লাহর নামে মিথ্যা কথা বলে থাকে তাহলে আল্লাহ নিজেই তার সাথে বুঝা পড়া করবেন৷ এর আগে হযরত মূসা আলাইহিস সালামও প্রায় অনুরূপ কথাই ফেরাউনকে বলেছিলেন :

আরবী ---------------------------------------------------------------------------

" তোমরা যদি কথা না মানো তাহলে আমাকে আমার মত চলতে দাও ৷ "

এখানে এ বিষয় লক্ষ রাখতে হবে যে , ফেরাউনের সভাসদদের মধ্যকার মু'মিন ব্যক্তি তার বক্তব্যের শুরুতে স্পষ্ট করে একথা বলেনি যে , সে হযরত মূসার (আ) প্রতি ঈমান এনেছে ৷‌ প্রথম দিকে সে এমনভাবে তার বক্তব্য পেশ করেছে যাতে মনে হয় সে ফেরাউনের গোষ্ঠীরই একজন লোক এবং তার জাতির কলাণের জন্যই সে এ কথা বলছে৷ কিন্তু যখন সে দেখছে ফেরাউন ও সভাসদরা কোনক্রমেই সঠিক পথ অনুসরণ করতে চাচ্ছে না তখন শেষ মুহূর্তে সে তার ঈমানের গোপনীয়তা প্রকাশ করছে৷ পঞ্চম রুকূ'তে তার বক্তব্য থেকে তা প্রকাশ পাচ্ছে৷
৪৭. এ আয়াতাংশের দু'টি অর্থ সম্ভব ৷ ফেরাউনের সভাসদদের মধ্যকার ঈমান গ্রহণকারী ব্যক্তি হয়তো ইচ্ছা করেই এ দ্ব্যর্থবোধক শব্দটি এ জন্য বলেছিলো যে , তখনো সে তার ধ্যান -ধারণা খোলাখুলি প্রকাশ করতে চাচ্ছিলো না৷ এর একটি তাৎপর্য হচ্ছে , একই ব্যক্তির মধ্যে সত্যবাদিতার মত গুণ এবং মিথ্যা ও অপবাদের মত দোষের সমাবেশ ঘটতে পারে না৷ তোমরা স্পষ্টই দেখতে পাচ্ছো , মূসা (সা) একজন অতীব পবিত্র চরিত্র এবং অত্যন্ত উন্নত স্বভাবের মানুষ৷ তোমাদের মন মগজে একথা কি করে স্থান পায় যে , এক দিকে সে এত বড় মিথ্যাবাদী যে আল্লাহর নাম নিয়ে নবুওয়াতের ভিত্তিহীন দাবী করছে , অন্যদিকে তা সত্ত্বেও আল্লাহ তাকে এরূপ উন্নত স্বভাব চরিত্র দান করেছেন৷ এর আরেকটি তাৎপর্য হচ্ছে , তোমরা যদি সীমালংঘনের মাধ্যমে মূসার (‌আ) প্রাণনাশের জন্য উঠে পড়ে লাগো এবং তার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ এনে তোমাদের দূরভিসন্ধিমূলক পরিকল্পনা বাস্তবায়িত করতে তৎপর হও তাহলে মনে রেখো , আল্লাহ কখনো তোমাদেরকে সফল হতে দেবেন না৷
৪৮. অর্থাৎ আল্লাহর দেয়া এ ক্ষমতা ও প্রতিপত্তিরূপ নিয়ামতের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ না করে নিজেদের জন্য তাঁর গযব ডেকে আনছো কেন ?
৪৯. ফেরাউনের এ জবাব থেকে বুঝা যায় তার দরবারের এ সভাসদ যে মনে মনে ঈমান এনেছে , তা সে তখনো পর্যন্ত জানতে পারেনি৷ এ কারণে সে তার কথায় অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেনি বটে তবে একথা সুস্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে যে , তার মতামত ও চিন্তা ভাবনা শোনার পরও সে নিজের মত পাল্টাতে প্রস্তুত নয়৷
৫০. অর্থাৎ বান্দার সাথে আল্লাহর কোন শত্রুতা নেই যে , তিনি অযথা তাদের ধ্বংস করবেন৷ তিনি তাদের ওপর আযাব কেবল তখনই পাঠান যখন তারা সীমালংঘন করে৷ আর সে সময় তাদের ওপর আযাব তাঁর ন্যায় ও ইনসাফের দাবী হয়ে দাঁড়ায়৷
৫১. অর্থাৎ তোমাদের গোমরাহী এবং সে গোমরাহীর ব্যাপারে তোমাদের হঠকারিতার অবস্থা এই যে , মূসা আলাইহিস সাল্লামের পূর্বে তোমাদের দেশে ইউসুফ আলাইহিস সালাম নবী হয়ে এসেছিলেন৷ তাঁর সম্পর্কে তোমরা নিজেরাও স্বীকার করো যে , তিনি অত্যন্ত উন্নত স্বভাব চরিত্রের অধিকারী ছিলেন , একথা ও তোমরা স্বীকার করো যে সে সময়ে তোমাদের ওপর যে দুর্ভিক্ষ এসেছিলো তৎকালীন বাদাশাহর স্বপ্নের সঠিক ব্যাখ্যা বলে দিতে সাত বছর ব্যাপী সে ভয়ানক দুর্ভিক্ষের ধবংসকারিতা থেকে তিনি তোমাদের রক্ষা করেছিলেন ৷ তোমাদের গোটা জাতি একথাও স্বীকার করে যে , তাঁর শাসনামলের চেয়ে অধিক ন্যায় ও ইনসাফ এবং কল্যাণ ও বরকতের যুগ মিসরে আর কখনো আসেনি৷ কিন্তু তাঁর এসব গুণাবলী জানা ও মানা সত্ত্বেও তোমরা তাঁর জীবদ্দশায় তাঁর ওপর কখনো ঈমান আনো নাই৷ তাঁর মৃত্যু হলে তোমরা বলতে শুরু করলে , তাঁর মত লোক কি আর কখনো জন্ম নিতে পারে ? তোমরা তাঁর গুণাবলী স্বীকার করলেও পরবর্তী কালে ও সেটিকেই যেন তোমরা পরবর্তী সমস্ত নবীকে অস্বীকার করার একটা স্থায়ী বানিয়ে নিয়েছো৷ এর অর্থ , কোন অবস্থায়ই তোমরা হিদায়াত গ্রহণ করবে না৷
৫২. বাহ্যত মনে হয় , ফেরাউনের সভাসদদের মধ্যকার ঈমান গ্রহণকারী ব্যক্তির বক্তব্যের ব্যাখ্যা ও সংযোজনা হিসেবে আল্লাহ তা'আলা পরবর্তী বাক্যগুলো বলেছেন৷
৫৩. অর্থাৎ আল্লাহর পক্ষ থেকে সেসব লোককেই গোমরাহীতে নিক্ষেপ করা হয় যাদের মধ্যে এ তিনটি বৈশিষ্ট রয়েছে ৷ এক , তারা কুকর্মে সীমা লংঘন করে এ‌বং গোনাহ ও পাপাচারে এমনভাবে আসক্ত হয়ে পড়ে যে , নৈতিক চরিত্র সংশোধনের কোন আহবানই গ্রহণ করতে প্রস্তুত হয় না৷ দুই , নবী - রসূলদের (আলাইহিমুস সালাম ) ব্যপারে সন্দেহ - সংশয়ে লিপ্ত থাকা হয় তাদের স্থায়ী আচরণ ৷ আল্লাহর নবী তাদের সামনে যত সুস্পষ্ট নিদর্শনই পেশ করুন না কেন , তারা তাঁর নবুওয়াতের ব্যাপারেও সন্দেহ পোষণ করে ৷ তারা তাওহীদ ও আখেরাত সম্পর্কে তারা যেসব সত্য ও বাস্তবতা পেশ করেছেন তারা সেগুলোকেও সবসময় সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখে থাকে৷ তিন , তারা আল্লাহ কিতাবের বাণীসমূহ সম্পর্কে যুক্তি গ্রাহ্য পন্থায় চিন্তা ভাবনা করার পরিবর্তে কূট তর্কের দ্বারা তার মোকাবিলার চেষ্টা করে৷ তাদের এ কূট তর্কের ভিত্তি কোন জ্ঞানগত যুক্তি বা আসমানী কিতাবরে সনদ নয় বরং প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত তাদের জিদ ও হঠকারিতাই তার একমাত্র ভিত্তি৷ যখন কোন গোষ্ঠীর মধ্যে এ তিনটি দোষ দেখা দেয় আল্লাহ তখন তাদেরকে গোমরাহীর গহবরে নিক্ষেপ করেন৷ দুনিয়ার কোন শক্তিই তাদেরকে সেখান থেকে উদ্ধার করতে পারে না৷
৫৪. অর্থাৎ বিনা কারণে কারো মনে মোহর লাগিয়ে দেয়া হয় না৷ যার মধ্যে অহংকার ও স্বেচ্ছাচারিতা সৃষ্টি হয় লা'নতের এ মোহর কেবল তার মনের ওপরেই লাগানো হয়৷ ' তাকাববুর ' অর্থ ব্যক্তির মিথ্যা অহংকার যার কারণে ন্যায় ও সত্যের সামনে মাথা নত করাকে সে তার মর্যাদার চেয়ে নীচু কাজ বলে মনে করে ৷ স্বেচ্ছাচারিতা অর্থ আল্লাহর সৃষ্টির ওপর জুলুম করা৷ এ জুলুমের অবাধ লাইসেন্স লাভের জন্য ব্যক্তি আল্লাহর শরীয়াতের বাধ্য - বাধকতা মেনে নেয়া থেকে দূরে থাকে৷
৫৫. ফেরউনের সভাসদদের মধ্যকার মু'মিন ব্যক্তির বক্তব্য পেশের সময় ফেরাউন হামানকে সম্বোধন করে একথা কিছুটা এমন ভঙিতে বলছে যেন ঐ মু'মিনের কথাকে আদৌ বিবেচনার যোগ্য বলে মনে করে না৷ তাই অহংকারী ভঙ্গিতে তার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে হামানকে বলছে ? আমার জন্য একটা উঁচু ইমরাত নির্মাণ করো ৷ আমি দেখতে চাই , মূসা যে আল্লাহর কথা বলে সে আল্লাহ কোথায় থাকে৷ (ব্যাখ্যার জন্য দেখুন তাফহীমূল কুর্‌আন , আল কাসাস , টীকা ৫২ থেকে ৫৪ )