(৪০:১) হা-মীম৷
(৪০:২) এ কিতাব আল্লাহর পক্ষ থেকে নাযিলকৃত যিনি মহাপরাক্রমশালী, সবকিছু সম্পর্কে অতিশয় জ্ঞাত,
(৪০:৩) গোনাহ মাফকারী, তাওবা কবুলকারী, কঠোর শাস্তিদাতা এবং অত্যন্ত দয়ালু৷ তিনি ছাড়া আর কোন উপাস্য নেই৷ সবাইকে তাঁর কাছে ফিরে যেতে হবে৷
(৪০:৪) আল্লাহ আয়াতসমূহ নিয়ে কেবল সে সবলোকই বিতর্ক সৃষ্টি করে যারা কুফরী করেছে এরপরও দুনিয়ার বিভিন্ন দেশে তাদের চলাফেরা যেন তোমাদেরকে প্রতারিত না করে৷
(৪০:৫) এর পূর্বে নূহের (আ) কওম অস্বীকার করেছে এবং তাদের পরে আরো বহু দল ও গোষ্ঠী এ কাজ করেছে৷ প্রত্যেক উম্মত তার রসূলকে পাকড়াও করার জন্য সিদ্ধান্ত নিয়েছে৷ তারা সবাই বাতিলের হাতিয়ারের সাহায্যে হককে অবদমিত করার চেষ্টা করেছে৷ কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমি তাদেরকে পাকড়াও করেছি৷ দেখে নাও, কত কঠিন ছিল আমার শাস্তি৷
(৪০:৬) অনুরূপ যারা কুফরী করেছে তাদের জন্য তোমার রবের এ সিদ্ধান্তও অবধারিত হয়ে গিয়েছে যে, তারা জাহান্নামের বাসিন্দা হবে৷
(৪০:৭) আল্লাহর আরশের ধারক ফেরেশতাগণ এবং যারা আরশের চারপাশে হাজির থাকে তারা সবাই প্রশংসাসহ তাদের রবের পবিত্রতা বর্ণনা করে৷ তাঁর প্রতি ঈমান পোষণ করে এবং ঈমানদারদের জন্য দোয়া করে৷ তারা বলেঃ হে আমাদের রব, তুমি তোমার রহমত ও জ্ঞান দ্বারা সবকিছু পরিবেষ্টন করে আছো৷ তাই মাফ করে দাও এবং দোযখের আগুন থেকে রক্ষা করো যারা তাওবা করেছে এবং তোমার পথ অনুসরণ করছে তাদেরকে৷
(৪০:৮) হে আমাদের রব উপরন্তু তাদেরকে তোমার প্রতিশ্রুত ১০ চিরস্থায়ী জান্নাতে প্রবেশ করিয়ে দাও৷ আর তাদের বাপ মা, স্ত্রী ও সন্তানদের মধ্যে যারা সৎকর্মশীল (তাদেরকেও সেখানে তাদের সাথে পৌঁছিয়ে দাও)৷ ১১ তুমি নিসন্দেহে সর্বশক্তিমান ও মহাকৌশলী৷
(৪০:৯) আর তাদেরকে মন্দ কাজসমূহ থেকে রক্ষা করো৷ ১২ কিয়ামতের দিন তুমি যাকে মন্দ ও অকল্যাণসমূহ ১৩ থেকে রক্ষা করেছো তার প্রতি তুমি বড় করুণা করেছো৷ এটাই বড় সফলতা৷
১. এটা বক্তব্যের ভূমিকা ৷ এর মাধ্যমে পূর্বাহ্নেই শ্রোতাদেরকে এ মর্মে সাবধান করে দেয়া হয়েছে যে , তাদের সামনে যে বাণী পেশ করা হচ্ছে তা কোন সাধারণ সত্তার বাণী নয় , বরং তা নাযিল হয়েছে , এমন আল্লাহর পক্ষ থেকে যিনি এসব গুণাবলীর অধিকারী৷ এরপর এরেক পর এক আল্লাহর তা'আলার কতিপয় গুণ বর্ণনা করা হয়েছে৷ যা পরবর্তী বিষয়বস্তুর সাথে গভীরভাবে সম্পর্কিত :

প্রথম গুণটি হচ্ছে তিনি পরাক্রমশালী বা সর্বমক্তিমান অর্থাৎ সবার ওপরে বিজয়ী৷ কারো ব্যাপারে তিনি যে সিদ্ধান্তই গ্রহণ করেন তা নিশ্চিতভাবেই কার্যকরী হয়৷ তাঁর বিরুদ্ধে লড়াই করে কেউ বিজয়ী হতে পারে না৷ কিংবা কেউ তাঁর পাকড়াও থেকেও বাঁচতে পারে না৷ তাই তাঁর নির্দেশ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে কেউ যদি সফলতার আশা করে এবং তাঁর রসূলের বিরোধিতা করে তাঁকে পরাভূত ও অবদমিত দেখানোর আশা করে , তাহলে তা তার নিজের বোকামী ছাড়া আর কিছুই নয়৷ এ ধরনের আশা কখনো পূরণ হতে পারে না৷

দ্বিতীয় গুণটি হচ্ছে , তিনি সবকিছু জানেন৷ অর্থাৎ তিনি অনুমান ও ধারণার ভিত্তিতে কোন কথা বলেন না , বরং তিনি প্রতিটি বস্তু সম্পর্কেই সরাসরি জ্ঞানের অধিকারী৷ এ জন্য অনুভূতি ও ইন্দ্রিয় বহির্ভূত বিষয়ে তিনি যেসব তথ্য দিচ্ছেন কেবল সেগুলোই সঠিক হতে পারে এবং তা না মানার অর্থ হচ্ছে অযথা অজ্ঞতার অনুসরণ করা৷ একইভাবে তিনি জানেন কোন জিনিসে মানুষের উন্নতি এবং তার কল্যাণের জন্য কোন নীতিমালা , আইন কানুন ও বিধি নিষেধ আবশ্যক৷ তাঁর প্রতিটি শিক্ষা সঠিক কৌশল ও জ্ঞান ভিত্তিক যার মধ্যে ভুল ভ্রান্তির কোন সম্ভাবনা নেই৷ অতএব , তাঁর পথনির্দেশনা গ্রহণ না করার অর্থ হচ্ছে , ব্যক্তি নিজেই তার ধ্বংসের পথে চলতে চায়৷ তাছাড়া মানুষের কোন গতিবিধি তাঁর নিকট গোপন থাকতে পারে না৷ এমনকি মনের যে নিয়ত ও ইচছা মানুষের সমস্ত কাজ কর্মের মূল চালিকাশক্তি তাও তিনি জানেন৷ তাই কোন অজুহাত বা বাহানা দেখিয়ে মানুষ তাঁর শাস্তি থেকে রক্ষা পেতে পারে না৷

তৃতীয় গুন হচ্ছে , " গোনাহ মাফকারী ও তাওবা কবুলকারী " এটা তাঁর আশা ও উৎসাহ দানকারী গুণ৷ এ গুণটি বর্ণনা করর উদ্দেশ্য হচ্ছে যারা এখনো পর্যন্ত বিদ্রোহ করে চলেছে তারা যেন নিরাশ না হয় বরং একথা ভেবে নিজেদের আচরণ পুনর্বিবেচনা করে যে , এখনো যদি তারা এ আচরণ থেকে বিরত হয় তাহলে আল্লাহর রহমত লাভ করতে পারে৷ এখানে একথা বুঝে নিতে হবে যে , গোনাহ মাফ করা আর তাওবা কবুল করা একই বিষয়ের দু'টি শিরোনাম মোটেই নয়৷ অনেক সময় তাওবা ছাড়াই আল্লাহ তা'আলা গোনাহ মাফ করতে থাকেন৷ উদাহরণ স্বরূপ এক ব্যক্তি ভুল ত্রুটিও করে আবার নেকীর কাজও করে এবং তার নেকীর কাজ গোনাহ মাফ হওয়ার কারণ হয়ে যায় , চাই ঐ সব ভুল - ত্রুটির জন্য তার তাওবা করার ও ক্ষমা প্রার্থনা করার সুযোগ হোক বা না হোক ৷ এমনকি সে যদি তা ভুলে গিয়ে থাকে তাও৷ অনুরূপভাবে পৃথিবীতে কোন ব্যক্তির ওপর যত দুঃখ - কষ্ট , বিপদাপদ , রোগ ব্যাধি এবং নানা রকম দুশ্চিন্তা ও মর্মপীড়াদায়ক বিপদাপদই আসে তা সবাই তার গোনাহ ও ভুল ত্রুটির কাফফরা হয়ে যায়৷ এ কারণে গোনাহ মাফ করার কথা তাওবা কবুল করার কথা থেকে আলাদাভাবে উল্লেখ করা হয়েছে৷ কিন্তু মনে রাখতে হবে , তাওবা ছাড়াই গোনাহ মাফ লাভের এ সুযোগ কেবল ঈমানদারদের জন্যই আছে৷ আর ঈমানদারদের মধ্যেও কেবল তারাই এ সুযোগ লাভ করবে যারা বিদ্রোহ করার মানসিকতা থেকে মুক্ত এবং যাদের দ্বারা মানুবক দুর্বলতার কারণে গোনাহর কাজ সংঘটিত হয়েছে , অহংকার ও বার বার গোনাহ করার কারণে নয়৷

চতুর্থ গুণ হচ্ছে , তিনি কঠিন শাস্তিদাতা৷ এ গুণটি উল্লেখ করে মানুষকে এ মর্মে সতর্ক করে দেয়া হয়েছে যে , বন্দেগী ও দাসত্বের পথ অনুসরণকারীদের জন্য আল্লাহ তা'আলা যতটা দয়াবান , বিদ্রোহ ও অবাধ্যতার আচরণকারীদের জন্য তিনি ঠিক ততটাই কঠোর৷ যেসব সীমা পর্যন্ত তিনি ভুল ত্রুটি ক্ষমা ও উপেক্ষা করেন , যখন কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠি সে সীমাসমূহ লংঘন করে তখন তারা তাঁর শাস্তির যোগ্য হয়ে যায় ৷ আর তাঁর শাস্তি এমন ভয়াবহ যে , কোন নির্বোধ মানুষই কেবল তা সহ্য করার মত বলে মনে করতে পারে৷

পঞ্চম গুণ হচ্ছে , তিনি অত্যন্ত দয়ালু অর্থাৎ দানশীল , অভাবশূন্য এবং উদার ও অকৃপণ৷ সমস্ত সৃষ্টিকূলের ওপর প্রতিমুহূর্তে তাঁর নিয়ামত ও অনুগ্রহরাজি ব্যাপকভাবে বর্ষিত হচ্ছে ৷ বান্দা যা কিছু লাভ করছে তা তাঁর দয়া ও অনুগ্রহেই লাভ করছে৷

এ পাঁচটি গুণ বর্ণনা করা পর অত্যন্ত খোলাখুলিভাবে দু'টি সত্য বর্ণনা করা হয়েছে৷ একটি হচ্ছে , মানুষ আর যত মিথ্যা উপাস্যই বানিয়ে রাখুক না কেন প্রকৃত উপাস্য একমাত্র তিনি ৷ অপরটি হচ্ছে , অবশেষে সবাইকে আল্লাহর কাছেই ফিরে যেতে হবে ৷ মানুষের কৃতকর্মসমূহের হিসেব গ্রহণকারী এবং সে অনুসারে পুরস্কার বা শাস্তি দানের সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী আর কোন উপাস্য নেই৷ অতএব , কেউ যদি তাঁকে বাদ দিয়ে অন্যদের উপাস্য বানিয়ে নেয় তাহলে তার এ নির্বুদ্ধিতার ফল সে নিজেই ভোগ করবে৷
২. বিতর্ক সৃষ্টি করার অর্থ বাক চাতুরী করা , ত্রুটি বের করা , আবোল - তাবোল আপত্তি উত্থাপন করা , পুর্বাপর প্রসঙ্গ থেকে বিচ্ছিন্ন করে কোন একটা শব্দ বা বাক্যাংশ নিয়ে তা থেকে নানা রকম বিষয় বের করে তার ওপর সন্দেহ -সংশয় ও অপবাদের ইমারত নির্মাণ করা৷ বাক্যের প্রকৃত উদ্দেশ্য উপেক্ষা করে তার বিভ্রান্তিকর অর্থ করা যাতে ব্যক্তি নিজেও কথা বুঝতে না পারে এবং অন্যদেরকেও বুঝতে না দেয়৷ মতানৈক্য ও বিরোধ করার এ পন্থা কেবল তারাই গ্রহণ করে , যাদের মতানৈক্য ও মতবিরোধ অসদোদ্দেশ্য প্রণোদিত৷ সৎ নিয়তে বিরোধকারী বিতর্কে লিপ্ত হলেও বিষয়টি সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার উদ্দেশ্যেই এবং প্রকৃত আলোচ্য বিষয় সম্পর্কে আলোচনা করে বিষয়টি সম্পর্কে তার নিজের দৃষ্টিকোণ সঠিক না বিপক্ষের দৃষ্টিকোণ সঠিক তা নিশ্চিত করতে চায় ৷ এ ধরনের বিতর্ক হয় সত্যকে জানার জন্য , কাউকে হেয়প্রতিপন্ন করার জন্য নয়৷ পক্ষান্তরে অসৎ উদ্দেশ্য প্রণোদিত বিপক্ষের লক্ষ তা বুঝা বা বুঝানো নয় বরং সে বিপক্ষকে পরাস্ত ও উত্যক্ত করতে চায়৷ অপরের কথা কোনভাবেই চলতে দেয়া যাবে না সে এ উদ্দেশেই বিতর্কে লিপ্ত হয়৷ এ কারণে সে কখনো মূল প্রশ্নের মুখোমুখি হয় না , বরং সবসময় একথা সে কথা বলে পাশ কাটিয়ে যেতে চায়৷
৩. এখানে " কুফর " শব্দটি দুটি অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে৷ এক , নিয়ামতের অস্বীকৃতি অর্থে , দুই , ন্যায় ও সত্যের অস্বীকৃতি অর্থে৷ প্রথম অর্থ অনুসারে এ বাক্যাংশের মানে হচ্ছে , আল্লাহর আয়াতসমূহ অর্থাৎ বাণী বা আদেশ নিষেধসমূহের বিরুদ্ধে এ কর্মপন্থা কেবল সেসব লোকেরাই গ্রহণ করে যারা তাঁর অনুগ্রহরাজি ভুলে গিয়েছে এবং এ অনুভূতি হারিয়ে ফেলেছে যে তাঁরই নিয়ামতের সাহায্যে তারা পালিত হচ্ছে ৷ দ্বিতীয় অর্থ অনুসারে এ বাক্যাংশের মানে হচ্ছে যারা ন্যায় ও সত্য থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে এবং না মানার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে কেবল তারাই এ কর্মপন্থা গ্রহণ করে থাকে৷ পূর্বাপর বিষয় বিবেচনা করলে এ বিষয়টি পুরোপুরি স্পষ্ট হয়ে যায় যে , এ ক্ষেত্রে কুফরীতে লিপ্ত ব্যক্তি বলতে যারা মুসলমান নয় এমন সব ব্যক্তি মাত্রকেই বুঝনো হয়নি৷ কেননা , যেসব অমুসলিম ইসলামকে বুঝার উদ্দেশ্য সৎ নিয়তে বিতর্ক করে এবং যে কথা বুঝতে তার কষ্ট হচ্ছে তার বুঝার জন্য ব্যাখ্যা পাওয়ার চেষ্টা করে , ইসলাম গ্রহণ করার পূর্ব পর্যন্ত পারিভাষিক অর্থে তারা কাফের বটে , কিন্তু সাথে সাথে একথাও সত্য যে , এ আয়াতে যে জিনিসটির নিন্দা করা হয়েছে তাদের ক্ষেত্রে তা প্রযোজ্য নয়৷
৪. আয়াতের প্রথমাংশ ও দ্বিতীয়াংশের মধ্যে একটা শূন্যতা আছে যা বুঝে নেয়ার দায়িত্ব শ্রোতাদের মন মগজ ও চিন্তা ভাবনার ওপর ছেড়ে দেয়া হয়েছে৷ কথার ধরন থেকে আপনা আপনি এ ইংগিত পাওয়া যায় যে , যারা আল্লাহর আয়াত বা আদেশ নিষেধের বিরুদ্ধে বিতর্কে লিপ্ত হওয়ার কর্মপন্থা গ্রহণ করে , তারা শাস্তি থেকে কখনো রক্ষা পেতে পারে না৷ তাদের দুর্ভাগ্যের পালা একদিন না একদিন অবশ্যই আসবে৷ এ মুহূর্তে যদিও তোমরা দেখছো যে , তারা এসব কিছু করেও আল্লাহর দুনিয়ায় নিশ্চিন্তে বুকটান করে ঘুরে বেড়াচ্ছে , তাদের জম - জমাট কারবার চলছে , জাঁক জমকের সাথে তাদের কর্তৃত্ব ও শাসন চলছে এবং খুব ভোগ ও আরাম আয়েশের মধ্যে ডুবে আছে , তবুও এ ধোঁকায় পড়ো না যে , তারা আল্লাহর পাকড়াও থেকে বেঁচে গিয়েছে৷ কিংবা আল্লাহর আদেশ নিষেধের বিরুদ্ধে লড়াই কোন খেল তামাশার বিষয় যা তামাশা হিসেবে খেলা যেতে পারে এবং এ খেলার খেলোয়াড়দেরকে এর মন্দ ফলাফল কখনো ভোগ করতে হবে না৷ প্রকৃতপক্ষে এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে তাদের দেয়া অবকাশ৷ এ অবকাশকে অন্যায়ভাবে কাজে লাগিয়ে যারা যতটা অপকর্ম করে তাদের জাহাজ ততটা পূর্ণ হয়ে নিমজ্জিত হয়৷
৫. অর্থাৎ দুনিয়াতে তাদের ওপর যে আযাব এসেছে তা তাদের জন্য নির্ধারিত চূড়ান্ত আযাব ছিল না৷ আল্লাহ তা'আলা তাদের জন্য এ ফায়সালাও করে দিয়েছেন যে , তাদেরকে জাহান্নামে যেতে হবে৷ এ আয়াতের আরেকটি অর্থ এও হতে পারে যে , যেভাবে অতীত জাহিসমূহের দুর্ভাগ্য এসেছে , এখন যারা কুফরী করছে অনুরূপভাবে তাদের জন্যও আল্লাহর স্থির সিদ্ধান্ত এই যে , তাদেরকেও জাহান্নামে যেতে হবে৷
৬. নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সংগীদেরকে সান্ত্বনা দেয়ার জন্য একথা বলা হয়েছে৷ তারা সে সময় মক্কার কাফেরদের বিদ্রূপ , কটূভাষণ ও অত্যাচার এবং তাদের সামনে নিজেদের অসহায়ত্ব দেখে দেখে ভগ্ন হৃদয় হয়ে পড়ছিলো৷ তাই বলা হয়েছে , এসব নীচু ও হীন লোকদের কথায় তোমরা মন খারাপ করছো কেন ? তোমরা এমন মর্যাদার অধিকারী যে , আল্লাহর আরশের ধারক ফেরেশতারা এবং আরশের চারপাশে অবস্থানরত ফেরেশতারা পর্যন্ত তোমাদের সহযোগী তারা তোমাদের জন্য মহান আল্লাহর কাছে সুপারিশ করছে৷ সাধারণ ফেরেশতাদের কথা না বলে আল্লাহর আরশের ধারক ও তার চারপাশে অবস্থানকারী ফেরেশতাদের কথা উল্লেখ করা হয়েছে এ ধারণা দেয়ার জন্য যে , মহান আল্লাহর বিশাল সাম্রাজ্যের কর্মচারীরা তো বটেই , তাঁর ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে অবস্থানরত যেসব ফেরেশতা ঐ সাম্রাজ্যের স্তম্ভ স্বরূপ এবং বিশ্ব জাহানের শাসন কর্তার কাছে যারা নৈকট্য লাখ করেছে তারা পর্যন্ত তোমাদের প্রতি গভীর আগ্রহ ও সমবেদনা পোষণ করে৷ আরো বলা হয়েছে যে , এসব ফেরেশতা আল্লাহর প্রতি ঈমান পোষণ এবং ঈমানদারদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে৷ একথা দ্বারা প্রকাশ পায় যে , ঈমানের বন্ধনই প্রকৃত বন্ধন যা আসমান ও যমীনবাসীদেরকে পরস্পর একই সূত্রে গেঁথে দিয়েছে৷ এ সম্পর্কের কারণেই আরশের পাশে অবস্থানকারী ফেরেশতাদের তাদের মতই আল্লাহ তা'আলার প্রতি ঈমান পোষণকারী মাটির মানুষের সম্পর্কে আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে৷ আল্লাহর প্রতি ফেরেশতাদের ঈমান গ্রহণ করেছে ৷ বরং এর অর্থ হচ্ছে , তারা এক ও লা-শারীক আল্লাহর ক্ষমতা ও কর্তৃত্বকেই স্বীকার করে নিয়েছে৷ এমন আর কোন সত্তা নেই যে তাদের আদেশ দান করে আর তারা ও তার আনুগত্য করে চলে৷ ঈমান গ্রহণকারী মানুষ যখন এ পথই গ্রহণ করলো তখন এত বড় জাতিগত পার্থক্য ও স্থানগত দূরত্ব সত্ত্বেও তাদের এবং ফেরেশতাদের মধ্যে একই দৃষ্টিভঙ্গিগত দৃঢ় সম্পর্ক গড়ে উঠেছে৷
৭. অর্থাৎ তোমার বান্দার দুর্বলতা , বিচ্যুতি ও ভুল ত্রুটি তোমার অজানা নয়৷ নিসন্দেহে তুমি সবকিছু জানো৷ কিন্তু তোমার জ্ঞানের মত তোমার রহমতও ব্যাপক ও বিস্তৃত৷ তাই তাদের ত্রুটি-বিচ্যুতি জানা সত্ত্বেও এই অসহায়দের ক্ষমা করে দাও৷ আরেকটি অর্থ এও হতে পারে যে , তোমার জ্ঞানানুসারে যাদের সম্পর্কে তুমি জান যে , তারা সরল মনে ' তাওবা ' করেছে এবং প্রকৃতপক্ষে তোমার পথ অবলম্বন করেছে , দয়া ও রহমত দিয়ে তাদের সবাইকে ক্ষমা করে দাও৷
৮. ক্ষমা করা ও দোযখের আযাব থেকে রক্ষা করা যদিও পরস্পর ওতপ্রোতভাবে জড়িত এবং এর একটি কথা বলার পর বাহ্যত অপর কথাটি বলার কোন প্রয়োজন থাকে না৷ তবে এ বাচনভঙ্গি দ্বারা মূলত ঈমনদারদের প্রতি ফেরেশতাদের গভীর আগ্রহ প্রকাশ পায় ৷ প্রচলিত নিয়ম হচ্ছে , কোন ব্যাপারে কারো মন যদি আকৃষ্ট হয় সে যখন শাসকের কাছে আবেদন জানানোর সুযোগ লাভ করে তখন একই আবেদনকে সে বার বার নানাভাবে মিনতি করে পেশ করতে থাকে৷ এ ক্ষেত্রে একটি কথা একবার মাত্র পেশ করে সে তৃপ্তি ও সান্ত্বনা পায় না৷
৯. অর্থাৎ অবাধ্যতা পরিত্যাগ করেছে , বিদ্রোহ থেকে বিরত হয়েছে এবং আনুগত্য গ্রহণ করে তোমার নিজের নির্দেশিত জীবন পথে চলতে শুরু করেছে৷
১০. একথাটির মধ্যেও সেই মিনতি ভরা আবেদনের সুস্পষ্ট ছাপ বিদ্যমান ৷ যার প্রতি আমরা ওপরে ৮ নং টীকায় ইংগিত দিয়েছি৷ একথা সুস্পষ্ট যে , ক্ষমা করা এবং দোযখ থেকে রক্ষা করা দ্বারা জান্নাতে প্রবেশ করার অর্থও আপনা আপনিই এবং অনিবার্যভাবেই প্রকাশ পায় ৷ তাছাড়া আল্লাহ তা'আলা নিজে ইমানদারদেরকে যে জান্নাতের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন মু'মিনদেরকে সেটি দেয়ার জন্য দোয়া করা বাহ্যত অপ্রয়োজনীয় বলে মনে হয় কিন্তু ফেরেশতাদের মনে ঈমানদারদের জন্য কল্যাণকামিতার এতটা আবেগ বিদ্যমান যে , তারা নিজেদের পক্ষ থেকে তাদের জন্য একাধারে কল্যাণ কামনা করে দোয়া করে যাচ্ছে৷ অথচ তারা জানে , আল্লাহ তাদের প্রতি এসব অনুগ্রহ অবশ্যই করবেন৷
১১. অর্থাৎ তাদের চক্ষু শীতল করার জন্য তাদের মা-বাপ ,স্ত্রী এবং সন্তান - সন্ততিদেরও তাদের সাথে একত্রিত করে দেবেন৷ জান্নাতে ঈমানদারদেরকে যেসব নিয়ামত দান করা হবে তার বর্ণনা প্রসংগে আল্লাহর তা'আলা নিজেও একথা বলেছেন ৷ দেখুন , সূরা রা'দ , আয়াত ২৩ এবং সূরা তূর , আয়াত ২১ ৷ সূরা তূরের আয়াতে এ কথাও স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে , কেউ যদি জান্নাতে উচ্চ মর্যাদার অধিকারী হয় এবং তার মা , বাবা ও সন্তান সন্ততি অনুরূপ মর্যাদার লাভ না করে তাহলে তাকে উচ্চ মর্যাদা থেকে নাযিয়ে তাদের সাথে মিলিত করার পরিবর্তে আল্লাহ তা'আলা তার বাবা - মা ও সন্তান সন্ততিকেই উচ্চ মর্যাদা দিয়ে তার পর্যায়ে উন্নীত করবেন৷
১২. (আরবী ---------) (মন্দ কাজসমূহ ) তিনটি ভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হয়৷ এখানে তিনটি অর্থই প্রযোজ্য৷ এক , ভুল আকীদা - বিশ্বাস , বিকৃত নৈতিক চরিত্র এবং মন্দ কাজ কর্ম ৷ দুই গোমরাহী ও মন্দ কাজের পরিণাম৷ তিন , বিপদাপদ ও দুঃখ কষ্ট ----- তা এ পৃথিবীর হোক , আলমে বারযাখ বা মৃত্যুর পরের জীবনের হোক কিংবা কিয়ামতের দিনের হোক৷ ফেরেশতাদের দোয়ার লক্ষ হলো , যেসব জিনিস তাদের জন্য অকল্যাণকর সেরূপ প্রতিটি জিনিস থেকে তাদের রক্ষা করো৷
১৩. কিয়ামতের দিনের অকল্যাণ অর্থ হাশরের ময়দানের ভয়াবহতা ছাড়া ও অন্যান্য আরাম আয়েশ ও সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হওয়া , হিসেবে নিকেশের কঠোরতা সমস্ত সৃষ্টির সামনে জীবনের গোপন বিষয়সমূহ প্রকাশ হয়ে যাওয়ার লাঞ্ছনা ও অপমান এবং সেখানে অপরাধীরা আর যেসব লাঞ্ছনা ও কষ্টের সম্মুখীন হবে তাও৷