(৪:৪৩) হে ঈমানদারগণ ! তোমরা নেশাগ্রস্ত অবস্থায় নামাজের কাছে যেয়ো না৷ ৬৫ নামায সেই সময় পড়া উচিত যখন তোমরা যা বলছো তা জানতে পারো৷ ৬৬ অনুরূপভাবে অপবিত্র অবস্থায়ও ৬৭ গোসল না করা পর্যন্ত নামাযের কাছে যেয়ো না ৷ তবে যদি পথ অতিক্রমকারী হও, ৬৮ তাহলে অবশ্যি স্বতন্ত্র কথা৷ আর যদি কখনো তোমরা অসুস্থ হয়ে পড়ো, সফরে থাকো বা তোমাদের কেউ মলমূত্র ত্যাগ করে আসে অথবা তোমরা নারী সম্ভোগ করে থাকো ৬৯ এবং এরপর পানি না পাও, তাহলে পাক –পবিত্র মাটির সাহায্য গ্রহণ করো এবং তা নিজেদের চেহারা ও হাতের ওপর বুলাও ৷ ৭০ নিসন্দেহে আল্লাহ কোমলতা অবলম্বনকারী ও ক্ষমাশীল৷
(৪:৪৪) তুমি কি তাদেরকেও দেখছো, যাদেরকে কিতাবের জ্ঞানের কিছু অংশ দেয়া হয়েছে ? ৭১ তারা নিজেদের গোমরাহীর খরিদ্দার বনে গেছে এবং কামনা করেছে যেন তোমরাও পথ ভুল করে বসো৷
(৪:৪৫) আল্লাহ তোমাদের শক্রদের ভালো করেই জানেন এবং তোমাদের সাহায্য-সমর্থনের জন্য আল্লাহ-ই যথেষ্ট৷
(৪:৪৬) যারা ইহুদী হয়ে গেছে, ৭২ তাদের মধ্যে এমন কিছু লোক আছে যারা শব্দকে তার স্থান থেকে ফিরিয়ে দেয় ৭৩ এবং সত্য দীনের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ প্রকাশের জন্য নিজেদের জিহ্বা কুঞ্চিত করে বলে, “আমরা শুনলাম” এবং “আমরা অমান্য করলাম” ৭৪ আর “শোনে না শোনার মতো” ৭৫ এবং বলে “রাঈনা” ৷ ৭৬ অথচ তারা যদি বলতো, “আমরা শুনলাম ও মেনে নিলাম” এবং “শোন” ও “আমাদের প্রতি লক্ষ্য করো” তাহলে এটা তাদেরই জন্য ভালো হতো এবং এটাই হতো অধিকতর সততার পরিচায়ক৷ কিন্তু তাদের বাতিল পরস্তির কারণে তাদের ওপর আল্লাহর অভিশাপ পড়েছে৷ তাই তারা খুব কমই ঈমান এনে থাকে৷
(৪:৪৭) হে কিতাবধারীগণ ! সেই কিতাবটি মেনে নাও যেটি আমি এখন নাযিল করেছি এবং যেটি তোমাদের কাছে আগে থেকে মওজুদ ৭৭ কিতাবের সত্যতা প্রমাণ করে ও তার প্রতি সমর্থন জানায়৷ আর আমি চেহারা বিকৃত করে পেছন দিকে ফিরিয়ে দেবার অথবা শনিবার-ওয়ালাদের মতো তাদেরকে অভিশপ্ত করার আগে ৭৮ এর প্রতি ঈমান আনো৷ আর মনে রাখো, আল্লাহর নির্দেশ প্রতিপালিত হয়েই থাকে৷
(৪:৪৮) আল্লাহ অবশ্যি শিরককে মাফ করেন না৷ ৭৯ এ ছাড়া অন্যান্য যত গোনাহর হোক না কেন তিনি যাকে ইচ্ছা মাফ করে দেন৷ ৮০ যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে আর কাউকে শরীক করেছে সেতো এক বিরাট মিথ্যা রচনা করেছে এবং কঠিন গোনাহের কাজ করেছে৷
(৪:৪৯) তুমি কি তাদেরকেও দেখেছো, যারা নিজেদের আত্মশুদ্ধি ও আত্মপবিত্রতার বড়াই করে বেড়ায় ? অথচ শুদ্ধি ও পবিত্রতা আল্লাহ যাকে চান তাকে দেন৷ আর (তারা যে শুদ্ধি ও পবিত্রতা লাভ করে না সেটা আসলে) তাদের ওপর বিন্দুমাত্রও জুলুম করা হয় না৷
(৪:৫০) আচ্ছা, দেখো তো, এর আল্লাহর বিরুদ্ধে মিথ্যা রচনা করতে একটুও কুণ্ঠিত হয় না৷ এদের স্পষ্ট গোনাহগার হবার ব্যাপারে এই একটি গোনাহই যথেষ্ট৷
৬৫. এটি মদ সম্পর্কে দ্বিতীয় নির্দেশ৷ প্রথম নির্দেশটি সূরা বাকারার ২১৯ আয়াতে দেয়া হয়েছে৷ সেখানে কেবল একথা বলেই শেষ করা হয়েছিল যে, মদ খারাপ জিনিস৷ আল্লাহ এটি পছন্দ করেন না৷ একথা বলার পর মুসলমানদের একটি দল মদ পরিহার করেছিল৷ কিন্তু তখনো অনেক লোক আগের মতোই মদ পান করে চলছিল৷ এমনকি অনেক সময় নেশায় মাতাল অবস্থায় তারা নামাযে শামিল হয়ে যেতো এবং নামাযে পড়ার তা ছাড়া অন্য কিছু পড়ে ফেলতো৷ সম্ভবত চতুর্থ হিজরীর গোড়ার দিকে এই দ্বিতীয় নির্দেশটি নাযিল হয়৷ এখানে নেশাগ্রস্ত অবস্থায় নামায পড়তে নিষেধ করা হয়েছে লোকদের ওপর এর ব্যাপক প্রভাব পড়ে৷ তারা নিজেদের মদপানের সময় বদলে ফেলে৷ যখন নেশা থাকা অবস্থায় নামাযের সময় হয়ে যাবার আশংকা থাকতো তখন তারা মদপান থেকে বিরত থাকতো৷ এর কিছুকাল পরে মদপানের বিরুদ্ধে চরম নিষেধজ্ঞা আসে৷ মদপান হারাম হবার এ নির্দেশটি এসেছে সূরা মায়েদার ৯০-৯১ আয়াতে৷ এখানে একথাও প্রণিধানযোগ্য যে, আয়াতে, 'সুফর' এবং 'নেশা' শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে৷ তাই এ নির্দেশটি কেবল মদের সাথে সংশ্লিষ্ট ছিল না বরং প্রত্যেটি নেশা সৃষ্টিকারী বস্তুর সাথেই এর সম্পর্ক৷ এ নির্দেশটি আজো পুরোপুরি কার্যকর৷ একদিকে নেশাকর বস্তু ব্যবহার করা হারাম এবং অন্যদিকে নেশাগ্রস্ত অবস্থায় নামায পড়া দ্বিগুণ এবং আরো অনেক বড়ো গোনাহ৷
৬৬. এ জন্যই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নির্দেশ দিয়েছেন, যখন ব্যক্তির ওপর ঘুমের আক্রমণ হয় এবং নামায পড়তে গিয়ে সে বারবার তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে তখন তার নামায রেখে ঘুমিয়ে পড়া দরকার৷ কোন কোন লোক এই আয়াত থেকে এই মর্মে প্রমাণ পেশ করেছেন যে, যে ব্যক্তি নামাযে পঠিত আরবী ইবারতের অর্থ বোঝে না তার নামায হবে না৷ কিন্তু এটা আসলে একটা অযথা কাঠিন্য ছাড়া আর কিছুই নয়৷ কুরআনের শব্দাবলীও এর সমর্থন করে না৷ কুরআনে 'হাত্তা তাফ্‌কাহু' বা 'হাত্তা তাফহামু মা তাকূলূন' (অর্থাৎ যতক্ষণ তোমরা যা বলো তা তোমরা হৃদয়ংগম না করো অথবা বুঝতে না পারো) বলা হয় নি৷ বরং বলা হয়েছে, 'হাত্তা তা'লামূ মা তাকূলূন'৷ অর্থাৎ নামাযে এক ব্যক্তিকে এতটুকুন সজাগ থাকতে হবে যে, সে নিজের মুখে কি কথা বলছে, তা তাকে অবশ্যি জানতে হবে৷ সে নামায পড়তে দাঁড়িয়ে যেন গজল গাইতে শুরু না করে দেয়৷
৬৭. কুরআনে উল্লেখিত মূল শব্দ হচ্ছে, 'জুনুবান'৷ এর মানে হচ্ছে, দূর হয়ে যাওয়া, দূরত্ব ও সম্পর্কহীনতা৷ এ থেকে 'আজনবী' (অপরিচিত) শব্দটি বের হয়েছে৷ শরীয়াতের পরিভাষায় জুনুব বা জানাবাত অর্থ হচ্ছে, যৌন প্রয়োজন পূর্ণ করার এবং স্বপ্নের মধ্যে বীর্যপাত হবার ফলে যে, 'নাজাসাত' বা নাপাকী সৃষ্টি হয়৷ কারণ এর ফলে মানুষ তাহারাত বা পবিত্রতা শূন্য হয়ে পড়ে৷
৬৮. ফকীহ ও মুফাস্‌সিরগণের একটি দল এই আয়াতের অর্থ এভাবে গ্রহণ করেছেন যে, জুনুব (নাপাক) অবস্থায় মসজিদে না যাওয়া উচিত৷ তবে কোন কাজে মসজিদের মধ্য দিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন দেখা দিলে যেতে পারে৷ আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ, আনাস ইবনে মালিক, হাসান বসরী, ইবরাহীম নাখঈ প্রমুখ ফকীহগণ এই মত অবলম্বন করেছেন৷ অন্য এক দলের মতে এর অর্থ হচ্ছে সফল৷ অর্থাৎ যদি কেউ সফরে থাকে এবং এ অবস্থায় সে জুনুবী হয়ে পড়ে তাহলে তায়াম্মুম করতে পারে৷ আর মসজিদের ব্যাপারে তাদের মত হচ্ছে এই যে, জুনুবীর জন্য অযু করে মসজিদে বসে থাকা জায়েয৷ এই মত অবলম্বন করেছেন হযরত আলী, ইবনে আব্বাস, সাঈদ ইবনে জুবাইর এবং অন্যান্য কতিপয় ফকীহ৷ যদিও এ ব্যাপারে প্রায় সবাই একমত যে, কোন ব্যক্তি যদি সফল অবস্থায় জুনুবী হয়ে পড়ে এবং তার পক্ষে গোসল করা সম্ভবপর না হয়, তাহলে সে তায়াম্মুম করে নামায পড়তে পারে৷ কিন্তু প্রথম দলটি এ বিষয়টি গ্রহণ করে হাদীস থেকে আর দ্বিতীয় দলটি এর ভিত্তি রাখেন কুরআনের উপরোল্লিখিত আয়াতের ওপর৷
৬৯. এখানে কুরআনের মূল শব্দ হচ্ছে 'লামাস'৷ 'লামাস' অর্থ ম্পর্শ করা৷ ফকীহগণ এই 'স্পর্শ করা' শব্দটির অর্থ গ্রহণের ব্যাপারে মতবিরোধ করেছেন৷ হযরত আলী, ইবনে আব্বাস, আবু মূসা আশআরী, উবাই ইবনে কা'ব, সাইদ ইবনে জুবাইর, হাসান বসরী এবং বিভিন্ন ইমামদের মতে এর অর্থ হচ্ছে সহবাস৷ ইমাম আবু হানীফা, তাঁর শাগরিদবৃন্দ ও ইমাম সুফিয়ান সওরীও এই মতটি অবলম্বন করছেন৷ এর বিপরীত মত গ্রহণ করেছেন আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ ও আবদুল্লাহ ইবনে উমর৷ এ ছাড়াও কোন কোন রেওয়ায়াত থেকে জানা যায়, হযরত উমর ইবনে খাত্তাবেরও এই অভিমত ছিল৷ অর্থাৎ তিনি এর অর্থ কেবল মাত্র 'স্পর্শ করা' বা 'হাত লাগানো' নিয়েছেন৷ ইমাম শাফেঈও এ মতটি গ্রহণ করেছেন৷ আবার কোন কোন ইমাম মাঝামাঝি পথও অবলম্বন করেছেন৷ যেমন ইমাম মালেকের মতে, যদি নারী বা পুরুষ পরস্পরকে স্পর্শ করে যৌন আবেগ সহকারে, তাহলে তাদের অযু ভেঙে যাবে এবং নামাযের জন্য নতুন করে অযু করতে হবে৷ কিন্তু যৌন আবেগের তাড়না ছাড়াই যদি তাদের দেহ পরস্পরকে স্পর্শ করে তাহলে এতে কোন ক্ষতি নেই৷
৭০. এই নির্দেশটির বিস্তারিত অবস্থা হচ্ছে এই যে, যদি কোন ব্যক্তি অযুবিহীন অবস্থায় থাকে অথবা তার গোসলের প্রয়োজন হয় এবং পানি না পাওয়া যায়, তাহলে সে তায়াম্মুম করে নামায পড়তে পারে৷ যদি সে অসুস্থ হয় এবং গোসল বা অযু করলে তার জন্য ক্ষতির আশংকা থাকে, তাহলে পানি থাকা সত্ত্বেও সে তায়াম্মুমের অনুমতির সুযোগ গ্রহণ করতে পারে৷

তায়াম্মুম অর্থ হচ্ছে, ইচ্ছা বা সংকল্প করা৷ অর্থাৎ যদি পানি না পাওয়া যায় অথবা পাওয়া গেলেও তার ব্যবহার সম্ভব না হয়, তাহলে পাক-পবিত্র মাটি ব্যবহা করার সংকল্প করা৷

তায়াম্মুমের পদ্ধতির ব্যাপারে ফকীহদের মধ্যে মতবিরোধ আছে৷ একটি দলের মতে এর পদ্ধতি হচ্ছে, একবার মাটির ওপর দুই হাত ঘসে নিয়ে মুখ মণ্ডলের ওপর বুলিয়ে নিতে হবে৷ দ্বিতীয়বার দুই হাত ঘসে নিয়ে তা দুই হাতের কুনই পর্যন্ত বুলিয়ে নিতে হবে৷ এটিই ইমাম আবু হানীফা, ইমাম শাফেঈ, ইমাম মালেক এবং অধিকাংশ ফকীহের মাযহাব৷ আর সাহাবা ও তাবেঈদের মধ্যে থেকে হযরত আলী, আবদুল্লাহ ইবনে উমর, হাসান বসরী, শা'বী সালেম ইবনে আবদুল্লাহ এবং আরো অনেকে এই মত পোষন করতেন৷ দ্বিতীয় দলের মতে, মাটিতে কেবলমাত্র একবার হাত ঘসে নেয়াই যথেষ্ট, সেই হাত মুখমণ্ডলের ওপর বুলানো যাবে এবং তারপর কব্জি পর্যন্ত দুই হাতের ওপরও বুলানো যাবে৷ কনুই পর্যন্ত বুলাবার প্রয়োজন হবে না৷ এটি আতা, মাকহূল, আওযাঈ ও আহমাদ ইবনে হাম্বল প্রমুখ ফকীহগণের মাযহাব৷ সাধারণত আহলে হাদীসগণও এই মতের প্রবক্তা৷

তায়াম্মুমের জন্য মাটিতে হাত ঘসা অপরিহার্য নয়৷ যে জায়গার ওপর ধূলো পড়ে আছে এবং শুকনো মাটি সম্বলিত যেকোনো জায়গায় হাত ঘসে নেয়া এবং জন্য যথেষ্ট বিবেচিত হবে৷

অনেক প্রশ্ন করেন, এভাবে মাটিতে হাত ঘসে সেই হাত চেহারা ও হাতের ওপর বুলালে তাহারাত তথা পাক-পবিত্রতা অর্জিত হয় কিভাবে?কিন্তু আসলে এটি মানুষের মধ্যে তাহারাতের অনুভূতি এবং নামাযের মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত রাখার একটি গুরুত্বপূর্ণ মনস্তাত্বিক কৌশল বিশেষ৷ এতে যে লাভটুকু অর্জিত হয় তা হচ্ছেঃ দীর্ঘদিন পর্যন্ত পানি ব্যবহার সমর্থ না হলেও মানুষের মধ্যে তাহারাতের অনুভূতি জাগ্রত থাকবে৷ শরীয়াত পাক-পবিত্রতার যে আইন প্রবর্তণ করেছে সে বরাবর তা মেনে চলবে৷ তার মন থেকে নামায পড়ার যোগ্য হবার অবস্থা ও নামায পড়ার যোগ্য না হবার অবস্থায় মধ্যকার পার্থক্যবোধ কখনো বিলুপ্ত হবে না৷
৭১. আহ্‌লি কিতাবদের আলেম সমাজ সম্পর্কে কুরআন অনেক ক্ষেত্রে এ বক্তব্য পেশ করেছে যে, "তাদেরকে কিতাবের জ্ঞানের কিছু অংশ দেয়া হয়েছে"৷ এর কারণ হচ্ছে এই যে, প্রথমত তারা আল্লাহর কিতাবের একটি অংশ হারিয়ে ফেলেছিল৷ তারপর আল্লাহর কিতাবের যা কিছু তাদের কাছে ছিল তার প্রাণসত্তা এবং তার উদ্দেশ্য ও মূল বক্তব্য বিষয়ও তাদের কাছে অপরিচিত হয়ে উঠেছিল৷ তাদের সমস্ত আগ্রহ কেন্দ্রীভূত হয়ে গিয়েছিল শাব্দিক বিতর্ক, বিধান ও নির্দেশাবলীর খুঁটিনাটি আলোচনা এবং আকীদা-বিশ্বাসের দার্শনিক জটিলতার মধ্যে৷ এ কারণেই তারা দীনের তাৎপর্য ও সারবস্তুর সাথে অপরিচিত ছিল৷ তাদের মধ্যে যথার্থ দীনদারীর চিহ্নমাত্রও ছিল না৷ অথচ আদেরকে ধর্মীয় আলেম ও জাতির নেতা বলা হতো৷
৭২. 'যারা ইহুদী' না বলে বলেছেন, 'যারা ইহুদী হয়েছে'৷ এর কারণ প্রথম তারাও মুসলমানই ছিল, যেমন প্রত্যেক নবীর উম্মাত আসলে মুসলমান হয়৷ কিন্তু পরে তারা কেবলমাত্র ইহুদী হয়েই রয়ে গেছে৷
৭৩. এর তিনটি অর্থ হয়৷ এক, তারা আল্লাহর কিতাবের শব্দের মধ্যে হেরফের করে দেয়৷ দুই, তারা নিজেদের মনগড়া ব্যাখ্যার সাহায্যে কিতাবের আয়াতের অর্থের মধ্যে বিরাট পরিবর্তন আনে৷ তিন, তারা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তাঁর অনুসারীদের সাহচর্যে এসে তাদের কথা শোনে এবং সেখান থেকে ফিরে গিয়ে লোকদের সামনে তাঁদের সম্পর্কে বানোয়াট কথা বলে৷ একটি কথা একভাবে বলা হয় এবং তারা নিজেদের শয়তানী মনোবৃত্তি ও দুষ্টবুদ্ধির দ্বারা পরিচালিত হয়ে তাকে ভিন্নরূপ দিয়ে লোকদের সামনে এনে হাজির করে৷ এভাবে তারা নবী ও তাঁর অনুসারীদের দুর্নাম করে এবং তাদের বিরুদ্ধে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে সাধারণ মানুষকে ইসলামী দাওয়াতা থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে চেয়েছে৷
৭৪. অর্থাৎ তাদেরকে আল্লাহর বিধান শুনানো হলে তারা উচ্চৈস্বরে বলে ওঠে, "সামে'না" (আমরা শুনেছি) এবং নীচু স্বরে বলে, "আসাইনা" (আমরা অমান্য করলাম)৷ অথবা তারা "আতা'য়না" (আমরা আনুগত্য করলাম) শব্দটি এমনভাবে নিজেদের কণ্ঠ বাঁকিয়ে ওলটপালট করে উচ্চারণ করে যার ফলে তা "আসাইনা" (আমরা অমান্যকরলাম) হয়ে যায়৷
৭৫. অর্থাৎ কথাবার্তার মাঝখানে যখন তারা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কোন কথা বলতে চায় তখন বলে, "ইস্‌মা" (শুনুন)৷ আবার সাথে সাথেই বলে ওঠে, "গাইরা মুসমাঈন"৷ এই "গাইরা মুসমাঈন" শব্দের দুই অর্থ হতে পারে৷ এর একটি অর্থ হতে পারেঃ আপনি এমনি একজন সম্মানিত বুযর্গ, যাকে তার ইচ্ছা বিরোধী কোন কথা শুনানো যেতে পারে না৷ এর দ্বিতীয় অর্থ হতে পারেঃ তোমাকে কেউ কিছু শুনাবে এমন যোগ্যতা তোমার নেই৷ এর আর একটি অর্থ হচ্ছে, আল্লাহ করুন তুমি যেন বধির হয়ে যাও৷
৭৬. এর ব্যাখ্যার জন্য সূরা বাকারার ১০৮ টীকা দেখুন৷
৭৭. এর ব্যাখ্যার জন্য দেখুন সূরা আলে ইমরানের ২ টীকা৷
৭৮. সূরা বাকারার ৮২ ও ৮৩ টীকা দেখুন৷
৭৯. একথা বলার কারণ হচ্ছে, এই যে, আহ্‌লি কিতাবগণ নবী ও আসমানী কিতাবের অনুসৃতির দাবী করলেও তারা শিরকের মধ্যে ডুবে গিয়েছিল৷
৮০. এর অর্থ এ নয় যে, মানুষ কেবলমাত্র শিরক করবে না এবং বাদবাকি গোনাহ এন্তার করে যেতে থাকবে প্রাণ খুলে৷ বরং এ থেকে একথা বুঝানো হয়েছে যে, শিরকের গোনাহকে তারা মামুলি গোনাহ মনে করে এসেছে৷ অথচ এটিই সবচেয়ে বড় গোনাহ৷ এমন কি অন্য সমস্ত গোনাহ মাফ হতে পারে কিন্তু এই গোনাহটি মাফ করা হবে না৷ ইহুদী আলেমরা শরীয়াতের ছোট ছোট বিধি-নিষেধ পালনের ওপর বড় বেশী গুরুত্ব দিতেন৷ বরং তাদের সমস্ত সময় এসব ছোটখাটো বিধানের পর্যালোচনা ও যাচাই বাছাইয়ে অতিবাহিত হতো৷ তাদের ফকীহগণ এই খুঁটিনাটি বিধানগুলো বের করেছিলেন ইজতিহাদের মাধ্যমে৷ কিন্তু তাদের চোখে শিরক ছিল একটি হালকা ও ছোট গোনাহ৷ তাই এই গোনাহটির হাত থেকে বাঁচার জন্য তারা কোন প্রকার চিন্তার ও প্রচেষ্টা চালাননি৷ নিজেদের জাতিকে মুশরিকী কার্যকলাপ থেকে বাঁচাবার জন্য কোন উদ্যোগও তারা নেননি৷ মুশরিকদের সাথে বন্ধুত্ব এবং তাদের সাহায্য সহযোগিতাও তাদের কাছে ক্ষতিকর মনে হয়নি৷