(৪:১৬৩) হে মুহাম্মাদ ! আমি তোমার কাছে ঠিক তেমনিভাবে অহী পাঠিয়েছি, যেমন নূহ ও তার পরবর্তী নবীদের কাছে পাঠিয়ে ছিলাম ৷ ২০৪ আমি ইবরাহীম, ইসমাঈল, ইসহাক, ইয়াকুব ও ইয়াকুব সন্তানদের কাছে এবং ঈসা, আইয়ুব, ইউনুস, হারুন ও সুলাইমানের কাছে অহী পাঠিয়েছি৷ আমি দাউদকে যবূর দিয়েছি৷ ২০৫
(৪:১৬৪) এর পূর্বে যেসব নবীর কথা তোমাকে বলেছি তাদের কাছেও আমি অহী পাঠিয়েছি এবং যেসব নবীর কথা তোমাকে বলিনি তাদের কাছেও ৷ আমি মূসার সাথে কথা বলেছি ঠিক যেমনভাবে কথা বলা হয়৷ ২০৬
(৪:১৬৫) এই সমস্ত রসূলকে সুসংবাদদাতা ও ভীতি প্রদর্শনকারী বানিয়ে পাঠানো হয়েছিল, ২০৭ যাতে তাদেরকে রসূল বানিয়ে পাঠাবার পর লোকদের কাছে আল্লাহর মোকাবিলায় কোন প্রমাণ না থাকে৷ ২০৮ আর আল্লাহ সর্বাবস্থায়ই প্রবল পরাক্রান্ত ও প্রজ্ঞাময়৷
(৪:১৬৬) ( লোকেরা চাইলে না মানতে পারে) কিন্তু আল্লাহ সাক্ষ দেন, তিনি যা কিছু তোমাদের ওপর নাযিল করেছেন নিজের জ্ঞানের ভিত্তিতে নাযিল করেছেন এবং এর ওপর ফেরেশতারাও সাক্ষী, যদিও আল্লাহর সাক্ষী হওয়াই যথেষ্ট হয়৷
(৪:১৬৭) যারা নিজেরাই এটা মানতে অস্বীকার করে এবং অন্যদেরকে আল্লাহর পথে চলতে বাধা দেয় তারা নিসন্দেহে ভুল পথে অগ্রসর হয়ে সত্য থেকে অনেক দূর চলে গেছে৷
(৪:১৬৮) এভাবে যারা কুফরী ও বিদ্রোহের পথ অবলম্বন করে এবং জুলুম-নিপীড়ন চালায়, আল্লাহ তাদেরকে কখনো মাফ করবেন না
(৪:১৬৯) এবং তাদেরকে জাহান্নামের পথ ছাড়া আর কোন পথ দেখাবেন না, যেখানে তারা চিরকাল অবস্থান করবে৷ আল্লাহর জন্য এটা কোন কঠিন কাজ নয়৷
(৪:১৭০) হে লোকেরা ! এই রসূল তোমাদের কাছে তোমাদের রবের পক্ষ থেকে হক নিয়ে এসেছে৷ কাজেই তোমরা ঈমান আনো তোমাদের জন্যই ভালো৷ আর যদি অস্বীকার করো, তাহলে জেনে রাখো, আকাশ ও পৃথিবীর মধ্যে যা কিছু আছে সবই আল্লাহর ৷ ২০৯ আল্লাহ সবকিছু জানেন এবং তিনি প্রজ্ঞাময়৷ ২১০
(৪:১৭১) হে আহলী কিতাব ! নিজেদের দীনের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করো না ২১১ আর সত্য ছাড়া কোন কথা আল্লাহর সাথে সম্পৃক্ত করো না৷ মারয়াম পুত্র ঈসা মসীহ আল্লাহর একজন রসূল ও একটি ফরমান ২১২ ছাড়া আর কিছুই ছিল না, যা আল্লাহ মারয়ামের দিকে পাঠিয়েছিলেন৷ আর সে একটি রূহ ছিল আল্লাহর পক্ষ থেকে ২১৩ ( যে মারয়ামের গর্ভে শিশুর রূপ ধারণ করেছিল) ৷ কাজেই তোমরা আল্লাহ ও তার রসূলদের প্রতি ঈমান আনো ২১৪ এবং “তিন” বলো না৷ ২১৫ নিবৃত্ত হও, এটা তোমাদের জন্যই ভালো৷ আল্লাহই তো একমাত্র ইলাই৷ কেউ তার পুত্র হবে, তিনি এর অনেক উর্ধে৷ ২১৬ পৃথিবী ও আকাশের সবকিছুই তার মালিকানাধীন ২১৭ এবং সে সবের প্রতিপালক ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য তিনি নিজেই যথেষ্ট৷ ২১৮
২০৪. এখানে যে কথা বলতে চাওয়া হয়েছে তা হচ্ছে এই যে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এমন কোন নতুন জিনিস আনেননি, যা ইতিপূর্বে আর কেউ আনেননি৷ তিনি দাবী করছেন না যে, তিনিই এই প্রথমবার একটি নতুন জিনিস পেশ করছেন৷ বরং পূর্ববর্তী নবীগণ জ্ঞানের যে উৎসটি থেকে হিদায়াত লাভ করেছেন তিনিও হিদায়াত লাভ করেছেন সেই একই উৎস থেকে ৷ দুনিয়ার বিভিন্ন দেশে জন্মগ্রহণকারী৷ পয়গাম্বরগণ হামেশা যা সত্যের বাণী প্রচার করে এসেছেন তিনিও সেই একই সত্য প্রচার করেছেন৷ অহী অর্থ হচ্ছে ইশারা করা, মনের মধ্যে কোন কথা প্রক্ষিপ্ত করা, গোপনভাবে কোন কথা বলা এবং পয়গাম পাঠানো৷
২০৫. বর্তমানে বাইবেলের মধ্যে 'যাবুর' (গীতসংগিতা)) নামে যে অধ্যায়টি পাওয়া যায় তার সবটুকুই দাউদ আলাইহিস সালামের ওপর অবতীর্ণ যাবুর নয়৷ তার মধ্যে অন্যান্য লোকদের বহু কথা মিশিয়ে দেয়া হয়েছে এবং সেগুলোকে তাদের রচয়িতাদের সাথে সংশ্লিষ্ট করা হয়েছে৷ তবে যে সমস্ত বাণীতে (স্তোত্র) একথা সুস্পষ্টভাবে বলে দেয়া হয়েছে যে, সেগুলো হযরত দাউদ আলাইহিস সালামের, সেগুলোর মধ্য যথার্থই সত্য বাণীর উজ্জ্বল আলো অনুভূত হয়৷ অনুরূপভাবে বাইবেলে 'আমসালে সুলাইমান' (হিতোপদেশ) নামে যে অধ্যায়টি রয়েছে, তাতেও ব্যাপক মিশ্রণ পাওয়া যায়৷ তার শেষ দু'টি অনুচ্ছেদ যে পরে সংযোজন করা হয়েছে, এতে কোন সন্দেহ নেই৷ তবুও তার বৃহত্তর অংশ নির্ভুল ও সত্য মনে হয়৷ এই দু'টি অধ্যায়ের সাথে সাথে হযরত 'আইউব' (ইয়োব) আলাইহিস সালামের নামেও আর একটি অধ্যায় বাইবেলের অন্তরভুক্ত হয়েছে৷ কিন্তু তার মধ্যে জ্ঞানের বহু অমূল্য তত্ত্ব থাকা সত্ত্বেও সেটি পড়তে গিয়ে হযরত আইউবের সাথে তার সংশ্লিষ্ট করার ব্যাপারটি সত্য বলে বিশ্বাস করা যায় না৷ কারণ কুরআনেও এই অধ্যায়টির প্রথম দিকে হযরত আইউবের যে মহান সবরের প্রশংসা করা হয়েছে সমগ্র অধ্যায় ঠিক তার উলটো চিত্রই পেশ করা হয়েছে৷ সেখানে বলা হয়েছে, হযরত আইউব তার সমগ্র বিপদকালে আল্লাহর বিরুদ্ধে সর্বক্ষণ অভিযোগ মুখর ছিলেন৷ এমনিক তার সহচর নাকি এই মর্মে তাকে সান্ত্বনা দেবার চেষ্টা করতেন যে, আল্লাহ জালেম নন; কিন্তু তিনি কোনক্রমেই তা মানতে প্রস্তুত হতেন না৷ এসব সহীফা ছাড়াও বনী ইসরাঈলদের নবীদের আরো ১৭ খানি সহীফা বাইবেলে অন্তরভূক্ত হয়েছে৷ এগুলোর বেশীর ভাগ সঠিক বলে মনে হয়৷ বিশেষ করে ইয়াস'ঈয়াহ্ (যিশাইয়), ইয়ারমিয়াহ (যিরমিয়), হাযকী ইন (যিহিস্কেল), অমূস (আমোষ) ও আরো কয়েকটি সহীফার অধিকাংশ স্থান পড়ার পর মানুষের হৃদয় নেচে উঠে৷ এগুলোর মধ্যে খোদায়ী কালামের সুস্পষ্ট মাহাত্ম অনুভূত হয়৷ এগুলোতে শিরকের বিরুদ্ধে জিহাদ, তাওহীদের সপক্ষে শক্তিশালী যুক্তি প্রদান এবং বনী ইসরাঈলের নৈতিক অধপতনের ওপর কড়া সমালোচনা পড়ার সময় একজন সাধারণ পাঠক একথা অনুভব না করে থাকতে পারে না যে, ইঞ্জীলে হযরত ঈসা আলাইহিস সালামের ভাষাণসমূহ এবং কুরআন মজীদ ও এই সহীফাগুলো একই উৎস থেকে উৎসারিত স্রোতধারা ছাড়া আর কিছুই নয়৷
২০৬. অন্যান্য নবীদের ওপর যে পদ্ধতিতে অহী আসতো তা ছিল এই যে, একটি আওয়াজ আসতো অথবা ফেরেশতারা পয়গাম শুনাতেন এবং নবীগণ তা শুনতেন৷ কিন্তু মূসা আলাইহিস সালামের সাথে একটি বিশেষ ব্যবস্থা অবলম্বিত হয়৷ আল্লাহ নিজে তাঁর সাথে কথা বলেন৷ আল্লাহ ও বান্দার মধ্যে এমনভাবে কথাবর্তা হতো যেমন- দু'জন লোক সামনাসামনি কথা বলে থাকে৷ দৃষ্টান্ত স্বরূপ সূরা 'তা-হা'য় উদ্ধৃত কথোপকথনের বরাত দেয়াই যথেষ্ট মনে করি৷ বাইবেলেও হযরত মূসার এই বৈশিষ্ট্যটির উল্লখ এভাবেই করা হয়েছে৷ সেখানে বলা হয়েছে: ''যেমন কোন ব্যক্তি কথা বলে তার বন্ধু সাথে, ঠিক তেমনি খোদাবন্দ মূসার সথে সামনাসামনি কথা বলতেন"৷ (যাত্রা ৩৩:১১)
২০৭. অর্থাৎ তাদের সবার একই কাজ ছিল৷ সে কাজটি ছিল এই যে, যারা আল্লাহর পাঠানো শিক্ষার ওপর ঈমান আনবে এবং সেই মোতাবেক নিজেদের দৃষ্টিভংগী ও কার্যকলাপ সংশোধন করে নেবে তাদের তাঁরা সাফল্য ও সৌভাগ্য লাভের সুখবর শুনিয়ে দেবেন৷ আর যারা ভুল চিন্তা ও কর্মের পথ অবলম্বন করবে তাদেরকে এই ভূল পথ অবলম্বন করার আরাপ পরিণতি সম্পর্কে অবহিত করে দেবেন৷
২০৮. অর্থাৎ এই সমস্ত পয়গম্বর পাঠাবার একটিই মাত্র উদ্দেশ্য ছিল৷ সে উদ্দেশ্যটি ছিল এই যে, আল্লাহ মানব জাতির কাছে নিজের দায়িত্ব পূর্ণ করার প্রমাণ পেশ করতে চাইছিলেন৷ এর ফলে শেষ বিচারেরর দিনে কোন পথভ্রষ্ট অপরাধী তাঁর কাছে এই ওজর পেশ করতে পারবে না যে, সে জানতো না এবং আল্লাহ যথার্থ অবস্থা সম্পর্কে তাকে অবহিত করার জন্য কোন ব্যবস্থা গ্রহন করেননি৷ এই উদ্দেশ্যে আল্লাহ দুনিয়ার বিভিন্ন স্থানে পয়গাম্বর পাঠিয়েছেন এবং কিতাব নাযিল করেছেন৷ এ পয়গাম্বরগণ অসংখ্য লোকের নিকট সত্যের জ্ঞান পৌঁছিয়ে দিয়েছেন৷ তাঁরা দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছেন; কিন্তু এখানে রেখে গেছেন তাঁদের বিভিন্ন কিতাব৷ মানুষকে পথ দেখাবার জন্য অবশ্যি প্রতি যুগে এ কিতাবগুলোর মধ্য থেকে কোন না কোন কিতাব দুনিয়ায় মওজুদ থেকেছে৷ এরপর যদি কোন ব্যক্তি গোমরাহ হয়, তাহলে সেজন্য আল্লাহ ও তাঁর পয়গাম্বরকে অভিযুক্ত করা যেতে পারে না৷ বরং এজন্য ঐ ব্যক্তি নিজেই অভিযুক্ত হবে৷ কারণ তার কাছে পয়গাম পৌঁছে গিয়েছিল কিন্তু সে তা গ্রহণ করেনি৷ অথবা সেইসব লোক অভিযুক্ত হবে যারা সত্য-সঠিক পথ জানতো: কিন্তু আল্লাহর বান্দাদের গোমরাহীতে লিপ্ত দেখেও তাদরেকে সত্য পথের সন্ধান দেয়নি৷
২০৯. অর্থাৎ আসমান ও যমীনের মালিকের নাফরমানী করে তোমরা তার কোন ক্ষতি করতে পারবে না৷ ক্ষতি হলে তোমাদেরই হবে৷
২১০. অর্থাৎ তোমাদের আল্লাহ অজ্ঞ ও বেখবর নন৷ তাঁর সাম্র্যজ্যে বাস করে তোমরা অপরাধমূলক কাজ কারবার করে যেতে থাকবে আর তিনি এর কোন খবর রাখবেন না, এটা কেমন করে হতে পারে৷ তিনি নাদান ও মূর্খও নন৷ তাঁর ফরমান ও হুকুমনামার বিরুদ্ধাচণ করা হবে আর তিনি তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা অবলম্বন করার পদ্ধতিই জানবেন না, এ ধরনের কোন অবস্থা কল্পনাই করা যেতে পারে না৷
২১১. এখানে আহলে কিতাব খৃষ্টানদের বুঝানো হয়েছে এবং 'বাড়াবাড়ি' করা অর্থ হচ্ছে, কোন বিষয়ের সমর্থনে ও সহযোগিতায় সীমা অতিক্রম করে যাওয়া ইহুদীদের অপরাধ ছিল, তারা ঈসা আলাইহিস সালামকে অস্বীকার ও তাঁর বিরোধিতা করার ক্ষেত্রে সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছিল৷ আর খৃষ্টানদের অপরাধ ছিল, তারা ঈসা আলাইহিস সালামের প্রতি ভক্তি, প্রীতি ও শ্রদ্ধা প্রদর্শনের ক্ষেত্রে সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছিল৷
২১২. মূলে 'কালেমা' শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে৷ মারয়ামের প্রতি কালেমা (ফরমান) পাঠাবার অর্থ হচ্ছে এই যে, আল্লাহ তা‌'আলা মারয়াম আলাইহাস সালামের গর্ভাধারকে কোন পুরুষের শুক্রকীটের সহায়তা ছাড়াই গর্ভধারণ করার হুকুম দিলেন৷ ঈসা আলাইহিস সালামের বিনা বাপে জন্মগ্রহণ করার রহস্য সম্পর্কে খৃস্টানদের প্রথমে একথাই বলা হয়েছিল৷ কিন্তু তারা গ্রীক দর্শনের প্রভাবে ভূল পথ অবলম্বন করে৷ ফলে প্রথমে তারা কালেমা শব্দটিকে 'কালাম' বা 'কথা' (Logos)-এর সমার্থক মনে করে৷ তারপর এ কালাম ও কথা থেকে আল্লাহ তা'আলার নিজ সত্তার সাথে সংশ্লিষ্ট কালাম-গুণ অর্থাৎ আল্লাহর কথা বলা বুঝানো হয়েছে৷ অতপর ধারণা করা হয়েছে যে, আল্লাহর সত্তার সাথে সংশ্লিষ্ট এ গুণটি মারয়াম আলাইহাস সালামের উদরে প্রবেশ করে একটি দেহাবয়র ধারণ করে এবং তাই ঈসা মসীহের রূপে আত্মপ্রকাশ করে৷ এভাবে খৃষ্টানদের মধ্যে ঈসা আলাইহিস সালামকে আল্লাহ মনে করার ভ্রান্ত আকীদার উদ্ভব হয়েছে৷ তাদের মদ্যে ভ্রান্ত বিশ্বাস শিকড় গেড়ে বসেছে যেসব, আল্লাহ নিজেই নিজেকে অথবা নিজের চিরন্ত গুনাবলী থেকে 'কালাম' ও 'বাক' গুনকে ঈসার রূপে প্রকাশ করেছেন৷
২১৩. এখানে ঈসা আলাইহিস সালামকে -------------- (আল্লাহর কাছ থেকে আসা রূহ) বলা হয়েছে৷ সূরা আল বাকারায় একথাটিকে নিম্নোক্তভাবে বলা হয়েছে: ------------(আমি পাক রূহের সাহায্যে ঈসাকে সাহায্য করেছি) এই উভয় বাক্যের অর্থ হচ্ছে: আল্লাহ ঈসা আলাইহিস সালামকে পাক রূহ দান করেছিলেন৷ অন্যায় ও পাপাচারের সাথে এই পাক রূহের কোনদিন কোন পরিচয়ই হয়নি৷ আপাদমস্তক সত্য ও সততা এবং উন্নত নৈতিক চরিত্র ছিল এর বৈশিষ্ট৷ খৃষ্টানদের কাছেও হযরত ঈসা আলাইহিস সালামের এই একই পরিচিতি দান করা হয়েছিল৷ কিন্তু তারা এর মধ্যেও বাড়াবাড়ি করেছে৷ --------অর্থাৎ আল্লাহার কাছ থেকে একটি রূহকে তারা বিকৃত করে সরাসরি আল্লাহ বানিয়ে নিয়েছে৷ আর ''রূহুল কুদুস" (Holy Ghost) –কে ধরে নিয়েছে ''আল্লাহর মুকাদ্দাস বা মহাপবিত্র রূহ", যা ঈসার মধ্যে অনুপ্রবেশ করেছিল৷ এভাবে আল্লাহ ও ঈসার সাথে রূহুল কুদুসকে তৃতীয় একজন মাবুদ বানিয়ে নেয়া হয়েছিল৷ এটা ছিল খৃষ্টানদের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাড়াবাড়ি এবং এর ফলে তারা গোমরাহীতে লিপ্ত হয়ে গিয়েছিল৷ মজার ব্যাপার এই যে, মথি লিখিত ইঞ্জীলে আজো এ বাক্যটি লেখা রয়েছে: ফেরেশতারা তাকে (অর্থাৎ ইউসুফ নাজ্জারকে) স্বপ্নে দেখা দিয়ে বললো, ‍'''হে ইউসুফ ইবনে দাউদ! তোমার স্ত্রী মারয়ামকে তোমার কাছে নিয়ে আসতে ভয় পেয়ো না৷ কারণ তার পেটে যে রয়েছে সে রূহুল কুদুসের কুদরাতের সৃষ্টি হয়েছে"৷ (অধ্যায় ১: শ্লোক ২০)
২১৪. অর্থাৎ আল্লাহকে একমাত্র ইলাহ বলে মেনে নাও এবং সমস্ত রসূলদের রিসালাতের স্বীকৃতি দাও৷ ঈসা মসীও (আ) তাঁদেরই মধ্যকার একজন রসূল৷ এটিই ছিল হযরত ঈসা আলাইহিস সালামের আসল শিক্ষা৷ ঈসায়ী সম্প্রদায়ের প্রত্যেক ব্যক্তিকে এই যথার্থ সত্য শিক্ষাটি মেনে নেয়া উচিত৷
২১৫. অর্থাৎ তিন ইলাহের আকীদা তোমাদের মধ্যে তেমন কোন আকৃতিতে বিদ্যমান থাক না কেন তা পরিহার করো৷ আসলে খৃস্টানদরা একই সংগে একত্ববাদ ও ত্রিত্ববাদ উভয়টিই মানে৷ ইঞ্জীলগুলোতে মসহী আলাইহিস সালামের যে সমস্ত সুস্পষ্ট বানী পাওয়া যায় তার ভিত্তিতে কোন একজন খৃষ্টানও একথা অস্বীকার করতে পারবে না যে, আল্লাহ এক এবং তিনি ছাড়া আর দ্বিতীয় কোন ইলাহ নেই৷ তাওহীদ যে দীনের মূলকথা এটা স্বীকার না করে তাদের উপায় নেই ৷ কিন্তু শুরুতেই তাদের মনে এই ভূল ধারণার জন্ম হয়েছিল যে, আল্লাহর কালাম ঈসার রূপে আত্মপ্রকাশ করেছে এবং আল্লাহর রূহ তাঁর মধ্যে অনুপ্রবেশ করেছে৷ এই ভূল ধারণার কারণে তারা সমগ্র বিশ্ব-জাহানের মালিক আল্লাহর সাথে ঈসা মসীহ ও রূহুল কুদুসের (জিব্রীল) খোদায়ীকেও মেনে নেয়াকে অযথা নিজেদের জন্য অপরিহার্য গণ্য করেছেন৷ এভাবে জোরপূর্বক একটি আকীদা নিজেদের ঘাড়ে চাপিয়ে নেবার কারণে একত্ববাদে বিশ্বাসের সাথে সাথে ত্রিত্ববাদে বিশ্বাসের সাথে সাথে একত্ববাদে বিশ্বাসকে কিতাবে একই সংগে মেনে চলা যায়৷ এটা যথার্থই তাদের জন্য রহস্যময় ও জটিল হয়ে উঠেছে৷ প্রায় আঠার শো বছর থেকে খৃষ্টান পণ্ডিতগণ নিজেদের সৃষ্টি এই জটিলতার গ্রন্থী উন্মোচন করার জন্য মাথা ঘামিয়ে চলেছেন৷ এরি বিভিন্ন ব্যাখ্যার ভিত্তিতে বহু দল উপদল গঠিত হয়েছে৷ এরি ভিত্তিতে অন্য দলকে কাফের বলে প্রচার করেছে৷ এই বিবাদের ফলে গীর্জার সংহতি বিনষ্ট হয়েছে৷ এবং বিভিন্ন গীর্জা নিজেদের স্বতন্ত্র অস্তিত্ব ঘোষণা করেছে৷ তাদের আকায়েদ ও যুক্তি শাস্ত্রের সমস্ত শক্তি এরি পেছনে ব্যয়িত হয়েছে৷ অথচ এ জটিল সমস্যাটি আল্লাহ সৃষ্টি করেননি৷ তাঁর প্রেরিত ঈসা মসীহও এ সমস্যাটি সৃষ্টি করেননি৷ আবার আল্লাহকে তিন মেনে নিয়ে তাঁর একত্ববাদের গায়ে কোন আচঁড় না লাগানো কোনক্রমে সম্ভব নয়৷ শুধুমাত্র তাদের বাড়াবাড়ির কারণেই এই জটিল সমস্যাটির উদ্ভব হয়েছে৷ কাজেই বাড়াবাড়ি থেকে বিরত থাকাই এর একমাত্র সমাধান৷ এ জন্য তাদের পরিহার করতে হবে ঈসা মসীহ ও রূহুল কুদুসের ইলাহ ও মাবুদ হবার ধারণা৷ একমাত্র আল্লাহকেই একক ইলাহ হিসেবে মেনে নিতে হবে এবং মসীহকে কেবলমাত্র তার পয়গাম্বর গণ্য করতে হবে, তার খোদায়ীতে তাকে কোন প্রকার শরীক করা যাবে না৷
২১৬. এটি হচ্ছে খৃষ্টানদের চতুর্থ বাড়াবাড়ির প্রতিবাদ৷ বাইবেলের নিউ টেস্টামেন্টের বর্ণনা যদি সঠিক হয়েও থাকে তাহলে তা থেকে (বিশেষ করে প্রথম তিনটি ইঞ্জীল থেকে) বড়জোড় এতটুকুই প্রমাণিত হয় যে, মসীহ আলাইহিস সালাম আল্লাহ ও বান্দার সম্পর্ককে বাপ ও বেটার সম্পর্কের সাথে তুলনা করেছিলেন৷ আর 'বাপ' শব্দটি তিনি আল্লাহর জন্য নিছক উপমা ও রূপক হিসেবে ব্যবহার করেছেন, যাতে এই সম্পর্ক বুঝা যায়৷ আসল অর্থে এটিকে ব্যবহার করেননি৷ এটা কেবলমাত্র ঈসা আলাইহিস সালামের একার বৈশিষ্ট নয়৷ প্রাচীন যুগ থেকে বনী ইসরাঈলরা আল্লাহর জন্য বাপ প্রতিশব্দটি ব্যবহার করে আসছে৷ বাইবেলের ওল্‌ড এটস্টামেন্টে এর অসংখ্য দৃষ্টান্ত পাওয়া যাবে৷ ঈসা আলাইহিস সালাম নিজের কওমের মধ্যে প্রচলিত বাকধারা অনুযায়ী এ শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন৷ তিনি আল্লাহকে কেবলমাত্র নিজের নয় বরং সমস্ত মানুষের বাপ বলতেন৷ কিন্তু খৃষ্টানরা এখানে এসে আবার বাড়াবাড়ি করেছেন৷ তারা মসীহকে আল্লাহর একমাত্র পুত্র গণ্য করেছে৷ এ ক্ষেত্রে তারা যে অদ্ভুত মতবাদ পোষণ করে তার সারনির্যাস হচ্ছে: যেহেতু মসীহ আল্লাহর বহি:প্রকাশ এবং তার কালেমা ও তাঁর রূহের শারীরিক উদ্দেশ্য দুনিয়ায় পাঠিয়েছেন যে, তিনি মানুষের গোনাহের নিজের মাথায় নিয়ে শূলে চড়ে প্রাণ দেবেন এবং নিজের রক্তের বিনিময়ে মানুষের গোনাহের কাফ্‌ফারা আদায় করবেন৷ অথচ মসীহ আলাইহিস সালামের কোন বাণী থেকে তারা এর কোন প্রমাণ পেশ করতে পারেব না৷ এ আকীদাটি তাদের নিজেদের তৈরী করা৷ তারা নিজেদের পয়গাম্বরের মহান ব্যক্তিত্বে প্রভাবিত হয়ে যে বাড়াবাড়ি করেছে এটি তারই ফলশ্রুতি৷ আল্লাহ এখানে কাফ্‌ফারা সম্পকির্ত বিশ্বাসের প্রতিবাদ করেননি৷ কারণ এটা খৃস্টানদের কোন স্বতন্ত্র ও স্থায়ী বিশ্বাস নয়৷ বরং এটা হচ্ছে মসীহকে (আ) আল্লাহর পুত্র গণ্য করার পরিণতি এবং 'যদি মসীহ আল্লাহর একমাত্র পুত্রই হন তাহলে তিনি শূলবিদ্ধ হয়ে লাঞ্ছিতের মৃত্যুবরণ করলেন কেন' এ প্রশ্নের একটি দার্শনিক ও মরমীয় ব্যাখ্যা৷ কাজেই যদি মসীহ আলাইহিস সালামের আল্লাহর পুত্র হবার ধারণার প্রতিবাদ করা হয় এবং তাঁর শূলবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করা সম্পকির্ত ভুল ধারণা দূর করা যায় তাহলে আপনা আপনিই এ বিশ্বাসের প্রতিবাদ হয়ে যায়৷
২১৭. অর্থাৎ পৃথিবী ও আকাশের অস্তিত্ব সম্পন্ন কোন জিনিসের সাথেও আল্লাহর পিতা-পুত্রের সম্পর্ক নেই৷ বরং এ সম্পর্ক হচ্ছে মালিক ও তার মালিকানাধীন বস্তুর৷
২১৮. অর্থাৎ নিজের খোদায়ীর ব্যবস্থাপনা করার জন্য আল্লাহ নিজেই যথেষ্ট৷ তার কারো কাছ থেকে সাহায্য গ্রহণ করার কোন প্রয়োজন নেই৷ কাজেই এ জন্য কাউকে পুত্র বানাবারও তার কোন দরকার নেই৷