(৪:১৩৫) হে ঈমানদারগণ ! ইনসাফের পতাকাবাহী ১৬৪ ও আল্লাহর সাক্ষী হয়ে যাও,১৬৫ তোমাদের ইনসাফ ও সাক্ষ তোমাদের নিজেদের ব্যক্তিসত্তার অথবা তোমাদের বাপ-মা ও আত্মীয়-স্বজনদের বিরুদ্ধে গেলেও৷ উভয় পক্ষ ধনী বা অভাবী যাই হোক না কেন আল্লাহ তাদের চাইতে অনেক বেশী কল্যাণকামী ৷ কাজেই নিজেদের কামনার বশবর্তী হয়ে ইনসাফ থেকে বিরত থেকো না৷ আর যদি তোমরা পেঁচালো কথা বলো অথবা সত্যতাকে পাশ কাটিয়ে চলো, তাহলে জেনে রাখো, তোমরা যা কিছু করছো আল্লাহ তার খবর রাখেন৷
(৪:১৩৬) হে ঈমানদারগণ ! ঈমান আনো ১৬৬ আল্লাহর প্রতি, তাঁর রসূলের প্রতি, আল্লাহ তাঁর রসূলের ওপর যে কিতাব নাযিল করেছেন তার প্রতি এবং পূর্বে তিনি যে কিতাব নাযিল করেছেন তার প্রতি ৷ যে ব্যক্তি আল্লাহ, তাঁর ফেরেশতাবর্গ, তাঁর কিতাবসমূহ, তাঁর রসূলগণ ও পরকালের প্রতি কুফরী করলো ১৬৭ সে পথভ্রষ্ট হয়ে বহুদূর চলে গেলো৷
(৪:১৩৭) অবশ্যি যেসব লোক ঈমান এনেছে তারপর কুফরী করেছে, আবার ঈমান এনেছে আবার কুফরী করেছে, তারপর নিজেদের কুফরীর মধ্যে এগিয়ে যেতে থেকেছে, ১৬৮ আল্লাহ কখনো তাদেরকে মাফ করবেন না এবং কখনো তাদেরকে সত্য-সঠিক পথও দেখাবেন না৷
(৪:১৩৮) আর যেসব মুনাফিক ঈমানদারদেরকে বাদ দিয়ে কাফেরদেরকে বন্ধু বানায় তাদের জন্য যন্ত্রনাদায়ক শাস্তি প্রস্তুত রয়েছে এ সুসংবাদটি তাদেরকে জানিয়ে দাও৷
(৪:১৩৯) এরা কি মর্যাদা লাভের সন্ধানে তাদের কাছে যায়? ১৬৯ অথচ সমস্ত মর্যাদা একমাত্র আল্লাহর জন্য নির্ধারিত ৷
(৪:১৪০) আল্লাহ এই কিতাবে তোমাদের পূর্বেই হুকুম দিয়েছেন, যেখানে তোমরা আল্লাহর আয়াতের বিরুদ্ধে কুফরী কথা বলতে ও তার প্রতি বিদ্রূপবাণ নিক্ষেপ করতে শুনবে সেখানে বসবে না, যতক্ষন না লোকেরা অন্য প্রসংগে ফিরে আসে৷ অন্যথায় তোমরাও তাদের মতো হবে৷১৭০ নিশ্চিতভাবে জেনে রাখো, আল্লাহ মুনাফিক ও কাফেরদেরকে জাহান্নামে একই জায়গায় একত্র করবেন ৷
(৪:১৪১) এই মুনাফিকরা তোমাদের ব্যাপারে অপেক্ষা করছে৷ তারা দেখছে পানি কোন্‌ দিকে গড়ায়৷ যদি আল্লাহর পক্ষ থেকে তোমাদের বিজয় সূচিত হয় তাহলে তারা এসে বলবে, আমরা কি তোমাদের সাথে ছিলাম না ? আর যদি কাফেরদের পাল্লা ভারী থাকে তাহলে তাদেরকে বলবে, আমরা কি তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে সক্ষম ছিলাম না? এরপরও আমরা মুসলমানদের হাত থেকে তোমাদেরকে রক্ষা করেছি৷১৭১ কাজেই কিয়ামতের দিন তোমাদের ও তাদের ব্যাপারে ফায়সালা আল্লাহই করে দেবেন৷ আর (এই ফায়সালায়) আল্লাহ কাফেরদের জন্য মুসলমানদের ওপর বিজয় লাভ করার কোন পথই রাখেননি৷
১৬৪. আল্লাহ কেবল এতটুকু বলেই ক্ষান্ত হননি যে, তোমরা ইনসাফের দৃষ্টিভংগী অবলম্বন করো এবং ইনসাফের পথে চলো বরং বলেছেন তোমরা ইনসাফের পতাকাবাহী হয়ে যাও৷ কেবল ইনসাফ করাই তোমাদের কাজ হবে না বরং ইনসাফের ঝাণ্ডা নিয়ে এগিয়ে চলাই হবে তোমাদের কাজ৷ জুলুম খতম করে তার জায়গায় আদল ও সুবিচার প্রতিষ্ঠিত করতে তোমাদের দৃঢ় সংকল্প হতে হবে৷ আদল ও ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য যে সহায়ক শক্তির প্রয়োজন মু'মিন হিসেবে তোমাদের যোগান দিতে হবে সেই সহায়ক শক্তি৷
১৬৫. অর্থাৎ তোমাদের সাক্ষ একমাত্র আল্লাহর জন্য হওয়া উচিত৷ এতে কারো প্রতি দরদ ও সহানভূতির কোন প্রশ্ন থাকবে না৷ কোন ব্যক্তিগত স্বার্থ বা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো সন্তুষ্টি অর্জন তোমাদের লক্ষ হবে না৷
১৬৬. যারা পূর্বেই ঈমান এনেছে তাদেরকে আবার বলা, 'তোমরা ইমান আনো'-কথাটা আপাত দৃষ্টিতে অদ্ভুত মনে হয়৷ কিন্তু আসলে এখানে 'ঈমান' শব্দটি দু'টি আলাদা আলাদা অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে৷ ঈমান আনার একটি অর্থ হচ্ছে অস্বীকৃতির পরিবর্তে স্বীকৃতির পথ অবলম্বন করা৷ অস্বীকারকারীদের থেকে আলাদা হয়ে স্বীকৃতিদানকারীদের দলে শামিল হয়ে যাওয়া৷ এর দ্বিতীয় অর্থ হচ্ছে: কোন জিনিসকে সাচ্চা দিলে, সরল অন্ত:করণে এবং পূর্ণ দায়িত্ব সচেতনতা সহকারে মেনে নেয়া৷ নিজের চিন্তা, রুচি, পছন্দ , দৃষ্টিভংগী, মনোভাব, চাল-চলন এবং নিজের বন্ধুতা, শত্রুতা ও প্রচেষ্টা-সংগ্রামের সকল ক্ষেত্রকে সে যে আকীদার ওপর ঈমান এনেছে পুরোপুরি সেই অনুযায়ী ঢেলে সাজানো৷ প্রথম অর্থের দিক দিয়ে যেসব মুসলমান স্বীকারকারীদের অন্তরভূক্ত হয় এ আয়াতে তাদেরকেই সম্বোধন করা হয়েছে৷ তাদের কাছে দাবী করা হয়েছে৷ দ্বিতীয় অর্থটির প্রেক্ষিতে তোমরা সাচ্চা মু'মিনে পরিণত হও৷
১৬৭. কুফরী করারও দু'টি অর্থ হয়৷ এর একটি অর্থ হচ্ছে,সুস্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন ভাষায় অস্বীকার করা৷ দ্বিতীয় অর্থ হচ্ছে, মুখে মেনে নেয়া কিন্তু মনে মনে অস্বীকার করা৷ অথবা নিজের মনোভাবের মাধ্যমে একথা প্রমাণ করা যে, সে যে জিনিসটি মেনে নেয়ার দাবী করছে আসল সেটিকে মানে না৷ এখানে কুফরী শব্দটি এই দু'ইট অর্থেই ব্যবহৃত হয়েছে৷ ইসলামের এই বুনিয়াদী আকীদাগুলোর ব্যাপারে উপরোল্লিখিত দুই ধরনের কুফরীর মধ্য থেকে যে কোনটি অবলম্বন করা হবে তার ফল হবে কেবল হক থেকে দূরে সরে যাওয়া এবং বাতিলের পথে নিষ্ফল প্রয়াসে মাথা খুঁড়ে মরা৷ এ বিষয়টি সম্পর্কে মানুষকে সতর্ক করে দেয়াই এই আয়াতটির উদ্দেশ্য৷
১৬৮. এখানে সেইসব লোকের কথা বলা হয়েছে যারা দ্বীনকে নিছক একটি হাল্‌কা প্রমোদ ও চিত্তবিনোদন হিসেবে গ্রহণ করে৷ যারা দ্বীনকে একটি খেল‌‌‌না বানিয়ে নিজেদের কল্পনা ও কামনার রশি দিয়ে ইচ্ছেমতো তাকে ঘোরাতে থাকে তাদের কথাই এখানে আলোচিত হয়েছে৷ চিন্তার জগতে একটা আলোড়ন উঠলো আর অমনি মুসলমান হয়ে গেলো ৷ তারপর আর একটা আলোড়ন উঠলো আর অমনি কাফের হয়ে গেলো৷ অথবা যখন দেখা গেলো মুসলমান হয়ে গেলে বৈয়ষিক স্বার্থ হাসিল করা যাবে তখন মুসলমান হয়ে গেলো৷ আবার যখন স্বার্থের খুঁটি ঘুরে গেলো তখন তার পদসেবা করার জন্য নির্দ্বিধায় সেদিকে চলে গেলো৷ এ ধরনের লোকদের জন্য আল্লাহর কাছে মাগফেরাত বা হিদায়াত কিছুই নেই৷ ''তারপর নিজেদের কুফরীর মধ্যে তারা এগিয়ে যেতেই থাকলো"- এখানে একথা বলার অর্থ হচ্ছে: কোন ব্যক্তি কেবল কাফের হয়ে গিয়েই ক্ষান্ত হয় না৷ বরং এরপর সে অন্য লোকদেরকেও ইসলাম থেকে বিচ্যুত করার চেষ্টা করে৷ ইসলামের বিরুদ্ধে গোপন চক্রান্ত করে এবং প্রকাশ্যে নানা কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে থাকে৷ কুফরীরর শির উন্নত করার এবং তার মোকাবিলায় আল্লাহর দ্বীনের ঝাণ্ডা ধূলায় লুণ্ঠিত করার জন্য নিজের সর্বশক্তি নিয়োগ করে প্রচেষ্টা ও সংগ্রাম চালায়৷ এটিকেই বলে কুফরীতে আরো উন্নতি হওয়া, কুফরী আরো বেড়ে যাওয়া এবং একটি অপরাধের পর আর একটি অপরাধ তারপর আর একটি অপরাধ-এভাবে অপরাধের ফিরিস্তি ক্রমাগত বেড়ে যাওয়া৷ পরিণামে এ শাস্তিও নিছক কুফরী থেকে অনেক বেশী হতে হবে৷
১৬৯. এখানে মূল আয়াতে 'ইজ্জত' শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে৷ আরবী ভাষায় 'ইজ্জত' শব্দের অর্থ অত্যন্ত ব্যাপক৷ সাধারণত ইজ্জত শব্দটি বললে মান, মর্যাদা, সম্মান ইত্যাদি বুঝানো হয়; কিন্তু আরবীতে 'ইজ্জত' শব্দের অর্থ হচ্ছে, কোন ব্যক্তির মর্যাদা এতই উন্নত ও সংরক্ষিত হয়ে যাওয়া যার ফলে কেউ তার কোন ক্ষতি করতে পারে না৷ অন্য কথায় 'ইজ্জত' শব্দটির অর্থে বলা যায়, যে মর্যাদা বিনষ্ট করার ক্ষমতা কারো নেই৷
১৭০. অর্থাৎ এক ব্যক্তি মুসলিম হবার দাবী করা সত্ত্বেও যদি কাফেরদের এমন সব বৈঠকে-সমাবেশে-আলোচনায় শরীক হয় যেখানে আল্লাহর আয়াতের বিরুদ্ধে কুফরী বাক্য উচ্চারিত হয় এবং সে ঠাণ্ডা মাথায় নিশ্চত মনে আল্লাহ ও রসূলের বিরুদ্ধে লোকদের বিদ্রূপাত্মক উক্তি ও সমালোচনা শুনতে থাকে, তাহলে তার ও ঐ কাফেরদের মধ্যে কোন পার্থক্য থাকে না৷ (এই আয়াতে যে হুকুমের কথা উল্লেখ করা হয়েছে তা সূরা আনআমারে ৬৮ আয়াতে বর্ণিত হয়েছে)৷
১৭১. এটিই প্রত্যেক যুগের মুনাফিকদের বৈশিষ্ট৷ মৌখিক স্বীকারোক্তি ও ইসলামের গণ্ডীর মধ্যে নামমাত্র প্রবেশের মাধ্যমে মুসলমান হিসেবে যতটুকু স্বার্থ ভোগ করা যায় তা তারা ভোগ করে৷ আবার অন্যদিকে কাফের হিসেবে যে স্বার্থটুকু ভোগ করা সম্ভব তা ভোগ করার জন্য তারা কাফেরদের সাথে যোগ দেয়৷ তারা সর্বোতভাবে কাফেরদের বিশ্বাসভাজন হবার চেষ্টা করে৷ তাদেরকে বলে: আমরা মোটেই ''গোঁড়া ও বিদ্বেষপরায়ণ" মুসলমান নই৷ মুসলমাদের সাথে আমাদের অবশ্যি নামের সম্পর্ক আছে কিন্তু আমাদের মানসিক ঝোক, আগ্রহ ও বিশ্বস্ততা রয়েছে তোমাদের প্রতি৷ চিন্তা –ভাবনা, আচার-ব্যবহার, রুচি-প্রকৃতি ইত্যাদি সবদিক দিয়ে তোমাদের সাথে আমাদের গভীর মিল৷ তাছাড়া ইসলাম ও কুফরীর সংঘর্ষে আমরা তোমাদের পক্ষই অবলম্বন করবো৷