(৪:১১৬) আল্লাহ ১৪৪ কেবলমাত্র শিরকের গোনাহ মাফ করবে না৷ এ ছাড়া আর যাবতীয় গোনাহ তিনি যাকে ইচ্ছা মাফ করে দেন৷ যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে আর কাউকে শরীক করে, সে গোমরাহীম মধ্যে অনেক দূর এগিয়ে গেছে৷
(৪:১১৭) এ ধরনের লোকেরা আল্লাহকে বাদ দিয়ে দেবীর পূজা করে৷ তারা সেই বিদ্রোহী শয়তানের পূজা করে,১৪৫
(৪:১১৮) যাকে আল্লাহ অভিশপ্ত করেছেন৷ (তারা সেই শয়তানের আনুগত্য করছে) যে আল্লাহকে বলেছিল, আমি তোমার বান্দাদের থেকে একটি নির্দিষ্ট অংশ নিয়েই ছাড়বো৷১৪৬
(৪:১১৯) আমি তাদেরকে পথভ্রষ্ট করবো৷ তাদেরকে আশার ছলনায় বিভ্রান্ত করবো৷ আমি তাদেরকে হুকুম করবো এবং আমার হুকুমে তারা পশুর কান ছিঁড়বেই ৷১৪৭ আমি তাদেরকে হুকুম করবো এবং আমার হুকুমে তারা আল্লাহর সৃষ্টি আকৃতিতে রদবদল করে ছাড়বেই৷১৪৮ যে ব্যক্তি আল্লাহকে বাদ দিয়ে এই শয়তানকে বন্ধু ও অভিভাবক বানিয়েছে সে সুস্পষ্ট ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন৷
(৪:১২০) সে তাদের কাছে ওয়াদা করে এবং তাদেরকে নানা প্রকার আশা দেয়, ১৪৯ কিন্তু শয়তানের সমস্ত ওয়াদা প্রতারণা ছাড়া আর কিছুই নয়৷
(৪:১২১) এ সব লোকের আবাস হচ্ছে জাহান্নাম ৷ সেখান থেকে নিষ্কৃতির কোন পথ তারা পাবে না৷
(৪:১২২) আর যারা ঈমান আনবে ও সৎকাজ করবে তাদেরকে আমি এমন সব বাগিচায় প্রবেশ করাবো যার নিম্নদেশ দিয়ে ঝরণাধারা প্রবাহিত হতে থাকবে এবং তারা সেখানে থাকবে চিরস্থায়ীভাবে৷ এটি আল্লাহর সাচ্চা ওয়াদা৷ আর আল্লাহর চাইতে বেশী সত্যবাদী আর কে হতে পারে ?
(৪:১২৩) চূড়ান্ত পরিণতি না তোমাদের আশা-আকাংখার ওপর নির্ভর করছে, না আহলি কিতাবদের আশা- আকাংখার ওপর ৷ অসৎকাজ যে করবে সে তার ফল ভোগ করবে এবং আল্লাহর মোকাবিলায় সে নিজের কোন সমর্থক ও সাহায্যকারী পাবে না৷
(৪:১২৪) আর যে ব্যক্তি কোন সৎকাজ করবে, সে পুরুষ বা নারী যেই হোক না কেন, তবে যদি সে মুমিন হয়, তাহলে এই ধরনের লোকেরাই জান্নাতে প্রবেশ করবে এবং তাদের এক অণুপরিমাণ অধিকারও হরণ করা হবে না৷
(৪:১২৫) সেই ব্যক্তির চাইতে ভালো আর কার জীবনধারা হতে পারে, যে আল্লাহর সামনে আনুগত্যের শির নত করে দিয়েছে, সৎনীতি অবলম্বন করেছে এবং একনিষ্ট হয়ে ইবরাহীমের পদ্ধতি অনুসরণ করেছে ? সেই ইবরাহীমের পদ্ধতি যাকে আল্লাহ নিজের বন্ধু বানিয়ে নিয়েছিলেন৷
(৪:১২৬) আসমান ও যমীনের মধ্যে যা কিছু আছে সবই আল্লাহর ৷১৫০ আর আল্লাহ সবকিছুকে পরিবেষ্টন করে রয়েছেন৷১৫১
১৪৪. এই রুকূ'তে ওপরের প্রসংগের জের টেনে বলা হয়েছেঃ নিজের জাহেলিয়াতের স্রোতে ভেসে এ ব্যক্তি যে পথে পাড়ি জামিয়েছে সেটি কোন্‌ ধরনের পথ এবং সৎলোকদের দল থেকে আলাদা হয়ে যাদের সাথে সে জোট বেঁধেছে তারা কেমন লোক৷
১৪৫. শয়তানকে কেউ আনুষ্ঠানিকভাবে পূজা অর্চনা করে না বা তাকে সরাসরি আল্লাহর মর্যাদায় অভিসিক্ত করে না৷ এ অর্থে কেউ শয়তানকে মাবুদ বানায় না, একথা ঠিক৷ তবে নিজের প্রবৃত্তি, ইচ্ছা আশা-আকাংখা ও চিন্তা –ভাবনার লাগাম শয়তানের হাতে তুলে দিয়ে যেদিকে সে চালায় সেদিকে চলা এবং এমনভাবে চলা যেন সে শয়তানের বান্দা এবং শয়তান তার প্রভু—এটাইতো শয়তানকে মাবুদ বানাবার একটি পদ্ধতি ৷ এ থেকে জানা যায়, বিনা বাক্য ব্যয়ে, নির্দেশ মেনে চলা এবং অন্ধভাবে কারো হুকুম পালন করার নামই ‌‌‌‌‌'ইবাদত৷' আর যে ব্যক্তি এভাবে কারো আনুগত্য করে সে আসলে তার ইবাদাত করে৷
১৪৬. অর্থাৎ তাদের সময়, পরিশ্রম, প্রচেষ্টা,শক্তি ও যোগ্যতা এবং তাদের সন্তান ও ধন-সম্পদ থেকে নিজের একটি অংশ নিয়ে নেবো৷ তাদের এমনভাবে প্ররোচিত করবো যার ফলে তারা এ সবের একটি বিরাট অংশ আমার পথে ব্যয় করবে৷
১৪৭. আরববাসীদের বহুতর কুসংস্কারের মধ্যে একটির দিকে এখানে ইশারা করা হয়েছে৷ তাদের নিয়ম ছিল, উটনী পাঁচটি বা দশটি বাচ্চা প্রসব করার পর তার কান চিরে তাকে তারা নিজেদের দেবতার নামে ছেড়ে দিতো এবং তাকে কোন কাজে ব্যবহার করা হারাম মনে করতো৷ এভাবে যে উটের ঔরশে দশটি বাচ্চা জন্ম নিতো তাকেও দেবতার নামে উৎসর্গ করা হতো৷ পশুর কান চিরে দেয়া দেবতার নামে উৎসর্গ করার আলামত হিসেবে বিবেচিত হতো৷
১৪৮. আল্লাহর সৃষ্টি-আকৃতিতে রদবদল করার অর্থ বস্তুর সৃষ্টিকালীন কাঠামো ও আকার-আকৃতির পরিবর্তন নয়৷ এ অর্থ গ্রহণ করলে তো সমগ্র মানব সভ্যতা-সংস্কৃতি শয়তানের অবৈধ হস্তক্ষেপের ফসল গণ্য হবে৷ কারণ আল্লাহর সৃষ্ট বস্তুতে মানুষের হস্তক্ষেপের নামই হচ্ছে সভ্যতা ও সংস্কৃতি৷ আসলে এখানে যে রদবদলকে শয়তানী কাজ বলা হয়েছে সেটি হচ্ছে, কোন বস্তুকে আল্লাহ যে কাজের জন্য সৃষ্টি করেননি তাকে সেই কাজে লাগানো এবং যে কাজের জন্য সৃষ্টি করেছেন সে কাজে না লাগানো৷ অন্যকথায় বলা যায়, মানুষ নিজের ও বস্তুর প্রকৃতির বিরুদ্ধে যেসব কাজ করে এবং প্রকৃতির প্রকৃত উদ্দেশ্য উপেক্ষা করে যেসব পন্থা অবলম্বন করে তা সবই এই আয়াতের প্রেক্ষিতে শয়তানের বিভ্রান্তিকর আন্দোলনের ফসল৷ যেমন লূত জাতির কাজ, জন্ম শাসন, বৈরাগ্যবাদ, ব্রহ্মচর্য, নারী-পুরুষের বন্ধাকরণ, পুরুষদেরকে খোজা বানানো, মেয়েদের ওপর প্রকৃতি যে দায়িত্ব অর্পণ করেছে সে দায়িত্ব সম্পাদন করা থেকে তাদেরকে সরিয়ে রাখা এবং সমাজ-সংস্কৃতির এমনসব বিভাগে তাদের টেনে আনা যেগুলোর জন্য পুরুষদেরকে সৃষ্টি করা হয়েছে৷ এসব কাজ এবং শয়তানের শাগরিদরা দুনিয়ায় এ ধরনের আরো যেসব অসংখ্য কাজ করে বেড়াচ্ছে সেগুলো৷ আসলে এই অর্থ প্রকাশ করছে যে, তারা বিশ্ব-জাহানের স্রষ্টার নির্ধারিত বিধি-বিধান ভুল মনে করে এবং তার মধ্যে সংস্কার সাধন করতে চায়৷
১৪৯. শয়তানের সমস্ত কারবারটাই চলে মৌখিক ওয়াদা ও আশা-ভরসা দেবার ভিত্তিতে৷ সে ব্যক্তিগত বা সমষ্টিক পর্যায়ে যখন মানুষকে কোন ভুল পথে পরিচালনা করতে চায়, তার সামনে এক আকাশকুসুম রচনা করে৷ কাউকে ব্যক্তিগত আনন্দ উপভোগ এ সাফল্যলাভের আশায় উদ্বেল করে তোলে৷ কাউকে জাতীয় উন্নতি ও অগ্রগতির আশ্বাস দেয়৷ কাউকে মানবজাতির কল্যাণ ও শ্রীবৃদ্ধির নিশ্চয়তা বিধান করে৷ কাউকে সত্যের কাছে পৌঁছে গেছে বলে মানসিক সান্ত্বনা দান করে৷ কারো মনে এই ধারণা বদ্ধমূল করে যে, আল্লাহ বা আখেরাত বলে কিছুই নেই, মরে যাওয়ার পর সবাইকে মাটিতে মিশে যেতে হবে৷ কাউকে আশ্বাস দেয়, আখেরাত বলে যদি কিছু থেকেও থাকে তাহলে উমুক হুজুরের বদৌলতে, উমুকের দোয়ার তোফায়েলে সেখানকার ধর-পাকড় থেকে নিষ্কৃতি পাওয়া যাবে৷ মোটকথা যাকে যে ধরনের আশার ছলনায় ভুলানো যায় তাকে সেভাবে নিজের প্রতারণা জালে ফাঁসাবার চেষ্টা করে৷
১৫০. অর্থাৎ আল্লাহর সামনে আনুগত্যের মাথা নত করে দেয়া এবং আত্মম্ভরিতা ও স্বেচ্ছাচারিতা থেকে বিরত থাকা প্রকৃত সত্যের সাথে যথার্থ সামঞ্জস্যশীল হবার কারণে সর্বোত্তম পদ্ধতি হিসেবে বিবেচিত৷ আল্লাহ যখন পৃথিবী, আকাশ ও এর মধ্যকার যাবতীয় বস্তুর মালিক তখন তার আনুগত্য ও বন্দেগী করতে প্রস্তুত হওয়া এবং বিদ্রোহী মনোভাব পরিহার করাই হচ্ছে মানুষের জন্য সঠিক পন্থা৷
১৫১. অর্থাৎ মানুষ যদি আল্লাহর সামনে আনুগত্যের মাথা নত করে এবং আল্লাহর বিরুদ্ধে বিদ্রোহমূলক আচরণ থেকে বিরত না হয় তাহলে আল্লাহর পাকড়াও থেকে নিজেকে রক্ষা করে সে কোথাও পালিয়ে যেতে পারে না৷ আল্লাহর অসীম ক্ষমতা ও কুদরাত চারদিক থেকে তাকে বেষ্টন করে আছে৷