(৪:১০১) আর যখন তোমরা সফরে বের হও তখন নামায সংক্ষেপ করে নিলে কোন ক্ষতি নেই৷ ১৩২ (বিশেষ করে) যখন তোমাদের আশংকা হয় যে, কাফেররা তোমাদেরকে কষ্ট দেবে৷ ১৩৩ কারণ তারা প্রকাশ্য তোমাদের শত্রুতা করার জন্য উঠে পড়ে লেগেছে৷
(৪:১০২) আর হে নবী ! যখন তুমি মুসলমানদের মধ্যে থাকো এবং (যুদ্ধাবস্থায়) তাদেরকে নামায পড়াবার জন্য দাঁড়াও ১৩৪ তখন তাদের মধ্য থেকে একটি দলের তোমার সাথে দাঁড়িয়ে যাওয়া উচিত ১৩৫ এবং তারা অস্ত্রসস্ত্র সংগে নেবে৷তারপর তারা সিজদা করে নিলে পেছনে চলে যাবে এবং দ্বিতীয় দলটি, যারা এখনো নামায পড়েনি, তারা এসে তোমার সাথে নামায পড়বে৷ আর তারাও সর্তক থাকবে এবং নিজেদের অস্ত্রশস্ত্র বহন করবে৷ ১৩৬ কারণ কাফেররা সুযোগের অপেক্ষায় আছে, তোমরা নিজেদের অস্ত্রশস্ত্র ও জিনিস পত্রের দিক থেকে সামান্য গাফেল হলেই তারা তোমাদের ওপর অকস্মাৎ ঝাঁপিয়ে পড়বে৷ তবে যদি তোমরা বৃষ্টির কারণে কষ্ট অনুভব করো অথবা অসুস্থ থাকো, তাহলে অস্ত্র রেখে দিলে কোন ক্ষতি নেই৷ কিন্তু তবুও সর্তক থাকো৷ নিশ্চিতভাবে জেনে রাখো, আল্লাহ কাফেরদের জন্য লাঞ্ছনাকর আযাবের ব্যবস্থা করে রেখেছেন৷ ১৩৭
(৪:১০৩) তারপর তোমরা নামায শেষ করার পর দাঁড়িয়ে, বসে ও শুয়ে সব অবস্থায় আল্লাহকে স্মরণ করতে থাকো৷ আর মানসিক প্রশান্তি লাভ করার পর পুরো নামায পড়ে নাও৷ আসলে নামায নির্ধারিত সময়ে পড়ার জন্য মুমিনদের ওপর ফরয করা হয়েছে৷
(৪:১০৪) এই দলের ১৩৮ পশ্চাদ্ধাবনে তোমরা দুর্বলতা প্রদর্শন করো না৷ যদি তোমরা যন্ত্রণা ভোগ করে থাকো তাহলে তোমাদের মতো তারাও যন্ত্রণা ভোগ করেছে৷ আর তোমরা আল্লাহর কাছে এমন জিনিস আশা করো, যা তারা আশা করে না৷ ১৩৯ আল্লাহ সবকিছু জানেন, তিনি জ্ঞানী ও বুদ্ধিমান৷
১৩২. যেসব ওয়াক্তে চার রাকআত নামায ফরয সেসব ওয়াক্তে ফরয নামায দুই রাকআত পড়াই হচ্ছে শান্তির সময়ের সফরের কসর৷ আর যুদ্ধের সময়ে কসর করার ব্যাপারে কোন সীমা নির্দিষ্ট নেই৷ যুদ্ধের অবস্থায় যেভাবে সম্ভব নামায পড়ে নিতে হবে৷ জামায়াতে পড়ার সুযোগ থাকলে জামায়াতে পড়ে নিতে হবে৷ অন্যথায় ব্যক্তিগতভাবে একা একা পড়ে নিতে হবে৷ কিবলার দিকে মুখ করে পড়া সম্ভব না হলে যে দিকে মুখ করে পড়া সম্ভব সেদিকে মুখ করে পড়তে হবে৷ সাওয়ারীর পিঠে বসে চলন্ত অবস্থায়ও পড়া যেতে পারে৷ রুকূ' ও সিজদা করা সম্ভব না হলে ইশারায় পড়তে হবে৷ প্রয়োজন হলে নামায পড়া অবস্থায় হাঁটতেও পারে৷ কাপড়ে রক্ত লেগে থাকলেও কোন ক্ষতি নেই৷ এতো সব সহজ ব্যবস্থার পরও যদি অবস্থা এতই বিপদজ্জনক হয়, যার ফলে নামায পড়া সম্ভবপর না হয়ে থাকে, তাহলে বাধ্য হয়ে নামায পিছিয়ে দিতে হবে৷ যেমন খন্দকের যুদ্ধের সময় হয়েছিল৷

সফরে কি কেবল ফরয পড়া হবে, না সুন্নতও পড়া হবে- এ ব্যাপারে মতবিরোধ আছে৷ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে যা কিছু প্রমানিত তা হচ্ছে এই যে, তিনি সফরে ফজরেরর সুন্নাত ও এশার বেতের নিয়মিত পড়তেন কিন্তু অন্যনান ওয়াক্তে কেবল ফরয পড়তেন৷ নিয়মিত সুন্নাত পড়া তাঁর থেকে প্রমাণিত হয়নি৷ তবে নফল নামাযের যখনই সুযোগ পেতেন পড়ে নিতেন৷ এমনকি সাওয়ারীর পিঠে বসেও নফল নামায পড়তেন৷ এজন্যই হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা) লোকদের সফরে ফজর ছাড়া অন্য ওয়াক্তে সুন্নাতগুলো জায়েয গণ্য করেছেন এবং অধিকাংশ উলামা সুন্নত ও নফল পড়া বা না পড়া উভয়টি জায়েয গন্য করেছেন এবং ব্যক্তি ইচ্ছার ওপর তা ছেড়ে দিয়েছেন৷ হানাফী মাযহাবের সর্বজন গৃহীত মতটি হচ্ছে, মুসাফির যখন পথে চলমান অবস্থায় থাকে তখন তার সুন্নাত না পড়াই উত্তম আর যখন কোন স্থানে অবস্থান করতে থাকে এবং সেখানে নিশ্চিন্ত পরিবেশ বিরাজ করে, সে ক্ষেত্রে সুন্নাত পড়াই উত্তম৷

যে সফরে কসর করা যেতে পারে সে সম্পর্কে কোন কোন ইমাম শর্ত আরোপ করেছেন যে, তা হতে হবে ফী সাবীলিল্লাহ- আল্লাহর পথে৷ যেমন জিহাদ, হজ্জ, উমরাই ইসলামী জ্ঞান আহরণ ইত্যাদি৷ ইবনে উমর, ইবনে মাসউদ ও আতা এরি ওপর ফতোয়া দিয়েছেন৷ ইমাম শাফেঈ ও ইমাম আহমাদ বলেন, সফল এমন কোন উদ্দেশ্যে হতে হবে যা শরীয়াতের দৃষ্টিতে জায়েয৷ হারাম ও নাজায়েয উদ্দেশ্য সামনে রেখে যে সফর করা হয় তাতে কসরের অনুমতির সুবিধা ভোগ করার অধিকার কারোর নেই৷ হানাফীদের মতে যে কোন সফরে কসর করা যেতে পারে৷ এক্ষেত্রে সফরের ধরণ সম্পর্কে বলা যায়, তা নিজেই সওয়াব বা আযাবের অধিকারী হতে পারে৷ কিন্তু কসরের অনুমতির ওপর তার কোন প্রভাব পড়ে না৷

কোন কোন ইমাম ''কোন ক্ষতি নেই" (---------------------------) বাক্যটি থেকে এ অর্থ নিয়েছেন যে, সফরে কসর করা জরুরী নয়৷ বরং সফরে কসরের নিছক অনুমতিই দেয়া হয়েছে৷ ব্যক্তি চাইলে এই সুযোগ গ্রহণ করতে পারে আবার চাইলে পুরো নামায পড়তে পারে৷ ইমাম শাফেঈ এ মতটি গ্রহণ করেছেন, যদিও তিনি কসর করাকে উত্তম এবং কসর না আসে উত্তম কাজ ত্যাগ করার অন্তরভুক্ত করেছেন৷ ইমাম আহমাদের মতে কসর করা ওয়াজিব৷ একটি বর্ণনা মতে ইমাম মালিকেরও এই একই মত উদ্ধৃত হয়েছে৷ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হামেশা সফরে কসর করেছেন, এটা হাদীস থেকে প্রমাণিত৷ কোন নির্ভরযোগ্য রেওয়ায়াত থেকে একথা প্রমাণিত হয়নি যে, তিনি সফরে কখনো চার রাকাআত ফরয পড়েছেন৷ ইবনে উমর বলেন: আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, আবু বকর, উমর, ওসমান রাদিআল্ল্লাহু আনহুমের সাথে সফর করেছি৷ আমি কখনো তাদের সফরে কসর না করতে দেখিনি৷ এরি সমর্থনে ইবনে আব্বাস এবং আরো অসংখ্য সাহাবীর নির্ভরযোগ রেওয়ায়াত উদ্ধৃত হয়েছে৷ হযরত উসমান যখন হজ্জের সময় মীনায় চার রাকাআত পড়ালেন তখন সাহাবীগণ তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানালেন৷ হযরত উসমান তখণ এই জবাব দিয়ে লোকদের নিশ্চিন্ত করলেন: আমি মক্কায় বিয়ে করেছি আর যেহেতু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে আমি শুনেছি, যে ব্যক্তি কোন শহরে পারিবারিক জীবন শুরু করে সে যেন সেই শহরের অধিবাসী৷ তাই আমি এখানে কসর করিনি এই রেওয়ায়াতগুলোর বিরুদ্ধে হযরত আয়েশা থেকে এমন দু'টি হাদীস উদ্ধৃত হয়েছে যা থেকে জানা যায় যে, কসর করা বা পূর্ণ নামায পড়া উভয়টিই ঠিক কিন্তু এই রেওয়ায়াতগুলো সনদের দিক দিয়ে দুর্বল হবার সাথে সাথে হযরত আয়েশার (রা) নিজের থেকে প্রমাণিত মতেরও বিরোধী ৷ তবে একথা সত্য যে, সফরে ও অ-সফরের মাঝামাঝি একটি অবস্থা রয়েছে৷ সে অবস্থায় একই অস্থায়ী নিবাসে সুবিধা মতো কখনো কসর করা যেতে পারে আবার কখনো পুরো নামায পড়ে নেয়া যেতে পারে৷ সম্ভবত হযরত আয়েশা (রা) এই অবস্থাটি সম্পর্কে বলেছেন যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সফরে কসর করেছেন আবার পুরো নামাযও পড়েছেন৷ আর কুরআনের এই ''সফরে কসর করলে ক্ষতি নেই" বাক্যটি এ ক্ষেত্রে কোন নতুন কথা নয়৷ ইতিপূর্বে সূরা বাকারার ১৯ রুকু'তেও সাফা ও মারাওয়া পাহাড় দু'টির মাঝখানে 'সাঈ' করার নির্দেশও এই একই ভাষায় দেয়া হয়েছে অথচ এই 'সাঈ' 'মানাসিকে হজ্জ' অর্থাৎ হজ্জএর গুরুত্বপূর্ণ কার্যাবলীর অন্তরভূক্ত এবং ওয়াজিব৷ আসলে এই উভয় স্থানেই লোকদের মনের একটা আশংকা দূর করাই ছিল এর মূল লক্ষ্য৷ সেই আশংকাটি ছিল এই যে, এ ধরনের কাজে কোন গোনাহ হবে নাতো বা এতে সওয়াবে কোন কমতি দেখা দেবে না তো! এ ধরনের আশংকা দূর করার উদ্দেশ্যই এ স্থানে এ বর্ণনাভংগী গ্রহণ করা হয়েছে৷

কি পরিমাণ দূরত্বের সফল হলে তাতে কসর করা যেতে পারে? এ ব্যাপারে ' যাহেরী ফিকাহ'-এর মত হচ্ছে এর কোন পরিমাণ নেই৷ কম বা বেশী যে কোন দূরত্বের সফল হোক না কেন তাতে কসর করা যেতে পারে৷ ইমাম মালিকের মতে ৪৮ মাইল বা এক দিন রাতের কম সময়ের সফরে কসর নেই৷ ইমাম আহমাদও একই মত পোষন করেন৷ ইবনে আব্বাসও (রা) এই মত পোষণ করতেন৷ ইমাম শাফেঈর একটি বিবৃতিতে এ মতের সমর্থন পাওয়া যায়৷ হরত আনাস (রা) ১৫ মাইলের সফরে কসর কায়েয মনে করেন৷ ''একদিনের সফর কসর করার জন্য যথেষ্ট" হযরত উমরের (রা)) এই মত ইমাম আওয়াযী ও ইমাম যুহ্‌রী গ্রহণ করেছেন৷ হাসান বসরী দুই দিন এবং ইমাম আবু ইউসুফ দুই দিনের বেশী দুরত্বের সফরে কসর জায়েয মনে করেন৷ ইমাম আবু হানীফার মতে পায়ে হেঁটে বা উটের পিঠে চড়ে তিন দিন সফল করে যে দুরত্ব অতিক্রম করা যা( অর্থাৎ প্রায় ১৮ ফরসঙ্গ বা ৫৪ মাইল) তাতে কসর করা যেতে পারে৷ ইবনে উমর, ইবনে মাসউদ ও হযরত উসমান রাদি আল্লাহু আনহুম এই মত পোষণ করেন৷

সফরের মাঝখানে কোথাও অবস্থান করলে কতদিন পর্যন্ত কসর করা যেতে পারে-এ ব্যাপারেও ইমামগণ বিভিন্ন মত পোষণ করেন৷ ইমাম আহমাদের মতে যেখানে ৪ দিন অবস্থান করার ইচ্ছা থাকে সেখানে পুরা নামায পড়তে হবে৷ ইমাম মালেক ও ইমাম সাফেঈর মতে যেখানে ৪ দিনের বেশী সময় অবস্থানের নিয়ত করলে পুরা নামায পড়ার হুকুম দিয়েছেন৷ এ অধ্যায়ে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে কোন সুস্পষ্ট বিধান বর্ণিত হয়নি৷ আর যদি কোন স্থানে এক ব্যক্তি বাধ্য হয়ে আটকে পড়ে এবং সবসময় তার খেয়াল থাকে যে, বাধা দূর হলেই সে বাড়ীর দিকে রওয়ানা হবে, তাহলে এমন স্থানে সে অনির্দিষ্ট কালের জন্য কসর করতে থাকবে৷ এ ব্যাপারে সমস্ত উলামায়ে কেরাম একমত৷ সাহাবায়ে কেরামদের থেকে এমন অসংখ্য ঘটনা বর্ণিত হয়েছে, যা থেকে জানা যায়, তাঁরা এ ধরনের অবস্থায় দুই দুই বছর পর্যন্ত অনবরত কসর করেছেন৷ এরি ওপর কিয়াস করে ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল কয়েদীকেও তার সমগ্র ব্যাপী কসর করার অনুমতি দিয়েছেন৷
১৩৩. 'যাহেরী' ও 'খারেজী' ফিকাহর অনুসারীরা এ বাক্যের যে অর্থ গ্রহণ করে থাকে তা হচ্ছে, কসর কেবল যুদ্ধাবস্থার জন্য আর শান্তির অবস্থায় যে সফর করা হয় তাতে কসর করা কুরআন বিরোধী৷ কিন্তু নির্ভরযোগ্য রেওয়ায়াতের মাধ্যমে হাদীস থেকে প্রমাণিত হয়েছে যে, হযরত উমর (রা) এই একই সন্দেহটি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সামনে সামনে পেশ করলে তিনি এর জবাবে বলেন: --------------------------------- অর্থাৎ ''এই নামাযে কসর করার অনুমতিটি আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি পুরস্কার৷আল্লাহ তোমাদের এই পুরস্কার দান করেছেন৷ কাজেই তোমরা এ পুরস্কারটি গ্রহণ করো"৷ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শান্তি ও ভয় উভয় অবস্থায়ই সফরের নামযে কসর করেছেন৷ একথা প্রায় 'মুতাওয়াতির' বা সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য সূত্র পরম্পরায় বর্ণিত হাদীসের মধ্যমে প্রমাণিত সত্য৷ ইবনে আব্বাস (রা) সুস্পষ্ট ভাষায় বলেছেন:

-----------------

অর্থাৎ ''নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদীনা থেকে মক্কার দিকে বের হলেন৷ সে সময় একমাত্র রবুল আলামীন ছাড়া আর কারোর ভয় ছিল না৷ কিন্তু তিনি নামায দুই রাকআত পড়লেন"৷ এজন্য আমি তরজমায় বন্ধনীর মধ্যে ''বিশেষ করে" শব্দটি বাড়িয়ে দিয়েছি৷
১৩৪. ইমাম আবু ইউসুফ ও হাসান বিন যিয়াদ এই শব্দাবলী থেকে এ ধারণা নিয়েছেন যে, "সালাতে খওফে"র (ভয়ের নামায) কেবলমাত্র নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুগের জন্য নির্দিষ্ট ছিল৷ কিন্তু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সম্বোধন করে একটি হুকুম দেয়া হয়েছে আবার সেই হুকুমটিই তাঁর পরে তার স্থলাভিষিক্তদের জন্যও আগের মতই কার্যকর রয়েছে, কুরআন মজীদে এর অসংখ্য দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়৷ কাজেই "সালাতে খওফ"কে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে নির্দিষ্ট করার কোন কারণে নেই৷ এছড়াও অসংখ্যা নেতৃস্থানীয় সাহাবী থেকেও একথা প্রমণাতি হয়েছে যে, তাঁরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পরেও ' সালাতে খওফ' পড়েছেন৷ এ প্রশ্নে কোন সাহাবীর মতবিরোধের উল্লেখ পাওয়া যায়নি৷
১৩৫. শত্রুর আক্রমণের ভয় আছে কিন্তু কার্যত লড়াই হচ্ছে না, এমন অবস্থায় 'সালাতে খওফে'র (ভয়ের নামায) হুকুম দেয়া হয়েছে৷ আর কার্যকত যখন লড়াই চলছে তেমন অবস্থায় হানাফীদের মতে নামায পিছিয়ে দেয়া হবে৷ ইমাম মালেক ও ইমাম সুফিয়ান সওরীর মতে রুকু' ও সিজদা করা সম্ভব না হলে ইশারায় নামায পড়ে নিতে হবে৷ ইমাম শাফেঈর মতে, নামাযের মধ্যেও কিছুটা যুদ্ধ করা যেতে পারে৷ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে প্রমাণিত যে, তিনি খন্দকের যুদ্ধের সময় চার ওয়াক্তের নামায পড়েননি৷ তারপর সুযোগ পেয়েই তরতীব অনুযায়ী চার ওয়াক্তের নামা এক সাথে পড়ে নেন৷ অথচ খন্দকের যুদ্ধের আগেই 'সালাতে খওফে'র হুকুম এসে গিয়েছিল৷
১৩৬. অনেকটা যুদ্ধের অবস্থার ওপর 'সালাত খওফ' পড়ার পদ্ধতি নির্ভর করে৷ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিভিন্ন অবস্থায় পদ্ধতি এ নামায পড়িয়েছেন৷ কাজেই যুদ্ধের অবস্থা বা পরিস্থিতি ঐ পদ্ধতিগুলোর মধ্য থেকে যেটির অনুমতি দেবে তৎকালীন ইসলামী দলের প্রধান সেই পদ্ধতিতেই নামায পড়াবেন৷

এর একটি পদ্ধতি হচ্ছে: সেনাদলের একটি অংশ ইমামের সাথে নামায পড়বে এবং অন্য অংশটি তখন দুশমেনর মোকাবিলা করতে থাকবে৷ যখন এক রাকআত পুরা হয়ে যাবে তখন প্রথম অংশটি সালাম ফিরে চলে যাবে এবং দ্বিতীয় অংশটি এসে ইমামের সাথে দ্বিতীয় রাকআতটি পুরা করবে৷ এভাবে ইমামের দু'রাকআত এবং সৈন্যদের এক রাকআত নামায হবে৷

দ্বিতীয় পদ্ধতিটি হচ্ছে: সেনাদলের এক অংশ ইমামের সাথে এক রাকআত পড়ে চলে যাবে তারপর দ্বিতীয় অংশটি এসে ইমামের পেছনে এক রাকআত পড়বে৷ এরপর উভয় অংশই পালাক্রমে এসে নিজেদের বাকি এক রাকআত একা একা পড়ে নেবে৷ এভাবে উভয় অংশের এক রাকআত পড়া হবে ইমামের পিছনে এবং এক রাকআত হবে ব্যক্তিগত পর্যায়ে৷

এর তৃতীয় পদ্ধতিটি হচ্ছে: ইমামের পেছনে সেনাদলের একটি অংশ দুই রাকআত পড়েব এবং তাশাহ্‌হুদের পর সালাম ফিরে চলে যাবে৷ সেনাদলের দ্বিতীয় অংশ ইমামের সাথে তৃতীয় রাকআতে শরীক হবে এবং তার সাথে আর এক রাকআত করে পড়ে সালাম ফিরবে৷ এভাবে ইমামের চার ও সেনাদলের দুই রাকআত হবে৷

চতুর্থ পদ্ধতিটি হচ্ছে: সেনাদলের এক অংশ ইমামের সাথে এক রাকআত পড়বে এই ইমাম যখন দ্বিতীয় রাকআতের জন্য দাঁড়াবে তখন মুকতাদীরা নিজেরাই একা একা দ্বিতীয় রাকআত তাশাহহুদ সহ পড়ে সালাম ফিরে চলে যাবে৷ তারপর দ্বিতীয় অংশটি এসে এমন অবস্থায় ইমামের সাথে শামিল হবে যে ইমাম তখনো দ্বিতীয় রাকআতে থাকবেন এবং এরা বাকি নামায ইমামের সাথে পড়ার পর এক রাকআত নিজেরা উঠে একা একা পড়ে নেবে৷ এ অবস্থায় ইমামকে দ্বিতীয় রাকআতে দীর্ঘতম কিয়াম করতে হবে৷

ইবনে আব্বাস, জাবির ইবনে আবদুল্লাহু ও মুজাহিদ প্রথম পদ্ধতিটি সম্পর্কে রেওয়ায়াত করেছেন৷ দ্বিতীয় পদ্ধতিটি সম্পর্কে রেওয়ায়াত করেছেন আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ হানাফীগণ এই দ্বিতীয় পদ্ধতিটিকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন৷ তৃতীয় পদ্ধতিটি রেওয়ায়াত করেছেন হাসান বসরী আবু বাকরাহ থেকে৷ আর চতুর্থ পদ্ধতিটিকে সামান্য একটু মতবিরোধ সহকারে ইমাম শাফেঈ ও ইমাম মালেক অগ্রাধিকার দিয়েছেন৷ এর উৎস হচ্ছে সাহ্‌ল ইবনে আবী হাস্‌মার একটি রেওয়ায়াত৷ এগুলো ছাড়া সালাতে খওফের আরো কয়েকটি পদ্ধতি আছে৷ ফিকাহর কিতাবগুলোয় এগুলোর আলোচনা পাওয়া যাবে৷
১৩৭. অর্থাৎ তোমাদের এই যে সতর্কতার হুকুম দেয়া হচ্ছে এটা নিছক একটা পার্থিব কৌশল৷ নয়তো আসলে জয়-পরাজয় তোমাদের কৌশলের ওপর নির্ভর করে না৷ বরং তা নির্ভর করে আল্লাহর ফায়সালার ওপর৷ তাই এই সতর্কতামূলক কৌশল ও পদক্ষেপগুলো কার্যকর করার সময় তোমাদের একথায় বিশ্বাস স্থাপন করতে হবে যে, যারা নিজেদের মুখের ফুঁৎকারে আল্লাহর আলো নিবিয়ে দিতে চাচ্ছে আল্লাহ তাদের লাঞ্ছিত করবেন৷
১৩৮. অর্থাৎ কাফের দল৷ এ দলটি সে সময় ইসলামী দাওয়াত ও ইসলামী শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পথে বাধা ও প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়িয়েছিল৷
১৩৯. অর্থাৎ কাফেররা বাতিলের জন্য যে পরিমান কষ্ট স্বীকার করছে ঈমানদাররা যদি হকের জন্য অন্তত এতটুকু কষ্টও বরদাশ্‌ত করতে না পারে তাহলে তা হবে সত্যিই বিস্ময়কর৷ অথচ কাফেরদের সামনে কেবল দুনিয়া ও তার ক্ষণস্থায়ী স্বার্থ ছাড়া আর কিছুই নেই৷ বিপরীতপক্ষে ঈমানদাররা আকাশ ও পৃথিবীর প্রভু পরওয়ারিদগারের সন্তুষ্টি, নৈকট্য ও তাঁর চিরন্তন পুরস্কার লাভের আকাংখা পোষণ করে আসছে৷