(৪:৯২) কোন মুমিনের কাজ নয় অন্য মুমিনকে হত্যা করা, তবে ভুলবশত হতে পারে৷ ১২০ আর যে ব্যক্তি ভুলবশত কোন মুমিনকে হত্যা করে তার কাফ্‌ফারা হিসেবে একজন মুমিনকে গোলামী থেকে মুক্ত করে দিতে হবে ১২১ এবং নিহত ব্যক্তির ওয়ারিসদেরকে রক্ত মূল্য দিতে হবে ১২২ তবে যদি তারা রক্ত মূল্য মাফ করে দেয় তাহলে স্বতন্ত্র কথা৷ কিন্তু যদি ঐ নিহত মুসলিম ব্যক্তি এমন কোন জাতির অন্তরভুক্ত হয়ে থাকে যাদের সাথে তোমাদের শত্রুতা রয়েছে তাহলে একজন মুমিন গোলামকে মুক্ত করে দেয়াই হবে তার কাফ্‌ফারা ৷ আর যদি সে এমন কোন অমুসলিম জাতির অন্তরভুক্ত হয়ে থাকে যাদের সাথে তোমাদের চুক্তি রয়েছে তাহলে তার ওয়ারিসদেরকে রক্ত মূল্য দিতে হবে এবং একজন মুমিন গোলামকে মুক্ত করে দিতে হবে৷ ১২৩ আর যে ব্যক্তি কোন গোলাম পাবে না তাকে পরপর দুমাস রোযা রাখতে হবে ৷ ১২৪ এটিই হচ্ছে এই গোনাহের ব্যাপারে আল্লাহর কাছে তাওবা করার পদ্ধতি ৷ ১২৫ আর আল্লাহ সর্বজ্ঞ ও জ্ঞানময়৷
(৪:৯৩) আর যে ব্যক্তি জেনে বুঝে মুমিনকে হত্যা করে, তার শাস্তি হচ্ছে জাহান্নাম৷ সেখানে চিরকাল থাকবে৷ তার ওপর আল্লাহর গযব ও তাঁর লানত এবং আল্লাহ তার জন্য কঠিন শাস্তির ব্যবস্থা করে রেখেছেন৷
(৪:৯৪) হে ঈমানদারগণ ! যখন তোমরা আল্লাহর পথে জিহাদ করার জন্য বের হও তখন বন্ধু ও শত্রুর মধ্যে পার্থক্য করো এবং যে ব্যক্তি সালামের মাধ্যমে তোমাদের দিকে এগিয়ে আসে তাকে সংগে সংগেই বলে দিয়ো না যে, তুমি মুমিন নও৷ ১২৬ যদি তোমরা বৈষয়িক স্বার্থলাভ করতে চাও তাহলে আল্লাহর কাছে তোমাদের জন্য অনেক গণীমাতের মাল রয়েছে৷ ইতিপূর্বে তোমরা নিজেরাও তো একই অবস্থায় ছিলে৷ তারপর আল্লাহ তোমাদের প্রতি অনুগ্রহ করেছেন৷ ১২৭ কাজেই তোমরা অনুসন্ধান করে পদক্ষেপ গ্রহণ করো৷ তোমরা যা কিছু করছো সে সম্পর্কে আল্লাহ অবহিত ৷
(৪:৯৫) যেসব মুসলমান কোন প্রকার অক্ষমতা ছাড়াই ঘরে বসে থাকে আর যারা ধন-প্রাণ দিয়ে আল্লাহর পথে জিহাদ করে, তাদের উভয়ের মর্যাদা সমান নয়৷ যারা ঘরে বসে থাকে তাদের তুলনায় জানমাল দিয়ে আল্লাহর পথে জিহাদকারীদের মর্যাদা আল্লাহ বুলন্দ করেছেন৷ যদিও সবার জন্য আল্লাহ কল্যাণ ও নেকীর ওয়াদা করেছেন তবুও তাঁর কাছে মুজাহিদদের কাজের বিনেময়ে বসে থাকা লোকেদের তুলনায় অনেক বেশী৷১২৮
(৪:৯৬) তাদের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে রয়েছে বিরাট মর্যাদা, মাগফেরাত ও রহমত ৷ আর আল্লাহ বড়ই ক্ষমাশীল ও করুণাময়৷
১২০. ওপরে যেসব মুনাফিক মুসলমানদেরকে হত্যা করার অনুমতি দেয়া হয়েছে এখানে তাদের কথা বলা হয়নি৷ বরং এখানে এমন মুসলমানদের কথা বলা হয়েছে যারা দারুল ইসলামের অধিবাসী অথবা দারুল হারব বা দারুল কুফরে অবস্থান করলেও ইসলাম ও মুসলমানদের শত্রুদের তৎপরতায় তাদের অংশগ্রহনের কোন প্রমাণ নেই৷ সে সময় এমন বহু লোকও ছিল যারা ইসলাম গ্রহণ করার পর নিজেদের যথার্থ অক্ষমতার কারণে ইসলামের শত্রু গোত্রদের মধ্যে অবস্থান করছিল৷ অনেক সময় এমন দুঘটনার ঘটে যেতো, মুসলমানরা কোন ইসলাম দুশমন গোত্রের ওপর আক্রমণ চালাতো এবং সেখানে তাদের অজ্ঞতাবশত তাদের হাতে কোন মুসলমান মারা যেতো৷ তাই মহান আল্লাহর এখানে ভুলবশত মুসলমানের হাতে কোন মুসলমানের নিহত হবার বিষয় সম্পর্কিত বিধান বর্ণনা করেছেন৷
১২১. যেহেতু নিহত ব্যক্তি একজন মু'মিন, তাই একজন মু'মিন গোলামকে মুক্ত করে দেয়াই তাকে হত্যা করার কাফ্‌ফারা গণ্য করা হয়েছে৷
১২২. নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রক্ত বিনিময়ের পরিমাণ এক শত উট, দুই শত গরু বা দুই হাজার ছাগল নির্ধারণ করেছেন৷ কোন ব্যক্তি যদি রক্তমূল্য হিসেবে অন্য কিছু দিতে চায় তাহলে এই জিনিসগুলোর বিত্রুয়মূল্য ধরে তার পরিমাণ নির্ণয় করতে হবে৷ যেমন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুগে নগদ মুদ্রায় রক্তমূল্য দানকারীদের জন্য ৮ শত দীনার বা ৮ হাজার দিরহাম নির্ধারিত ছিল৷ হযরত উমর (রা) তাঁর শাসনমলে বলেনঃ উটের দাম এখন বেড়ে গেছে৷ কাজেই এখন স্বর্ণমুদ্রায় এক হাজার দীনার বা রৌপ্যমুদ্রায় ১২ হাজার দিরহাম রক্ত মূল্য হিসেবে আদায় করতে হবে৷ কিন্তু একথা মনে রাখতে হবে যে, রক্তমূল্যের এ পরিমাণটি জেনে বুঝে হত্যা করার জন্য নয় বরং ভুল বশত হত্যা করার জন্য নির্ধারিত হয়েছে৷
১২৩. এই আয়াতটির বিধানসমূহের সংক্ষিপ্তসার নীচে দেওয়া হলঃ

একঃ নিহত ব্যক্তি যদি দারুল ইসলামের অধিবাসী হয় তাহলে তার হত্যাকারীকে রক্তমূল্য দিতে হবে এবং আল্লাহর কাছে নিজের গোনাহমাফীর জন্য একজন গোলামকেও মুক্ত করে দিতে হবে৷

দুইঃ যদি নিহত ব্যক্তি দারুল হারবের বাসিন্দা হয় তাহলে হত্যাকারী কেবলমাত্র গোলাম মুক্ত করে দেবে৷ তাকে কোন রক্তমূল্য দিতে হবে না৷

তিনঃ যদি নিহত ব্যক্তি এমন কোন দারুল কুফরের বাসিন্দা হয় যার সাথে ইসলামী রাষ্ট্রের চুক্তি রয়েছে, তাহলে হত্যাকারী একজন গোলামকে মুক্ত করে দেবে এবং এ ছাড়াও রক্তমূল্যও দান করবে৷ কিন্তু এ ক্ষেত্রে রক্তমূল্যের পরিমাণ তাই হবে, যা সে চুক্তিবদ্ধ জাতির একজন অমুসলিম অধিবাসীকে হত্যা করলে চুক্তি অনুযায়ী দিতে হয়৷
১২৪. অর্থাৎ একাদিক্রমে রোযা রাখতে হবে৷ মাঝখানে ফাঁক যাবে না৷ যদি কোন ব্যক্তি শরঈ ওযর ছাড়াই মাঝখানে একটি রোযাও ছেড়ে দেয় তাহলে তাকে আবার নতুন করে রোযা শুরু করতে হবে৷
১২৫. অর্থাৎ এটা ‌‌‌‌‌'জরিমানা' নয় বরং ‌‌'তাওবা' ও ‌‌'কাফ্‌ফারা'৷ জরিমানা লজ্জা, অনুতাপ ও আত্মসংশোধনের কোন অন্তরনিহিত প্রাণশক্তি কার্যকর থাকে না৷ বরং সাধারণত অত্যন্ত বিরক্তিসহকারে বাধ্য হয়েই জরিমানা আদায় করতে হয় এবং এরপরও ধূমায়িত অসন্তোষ ও তিক্ততার মনোভাব থেকেই যায়৷ বিপরীত পক্ষে মহান আল্লাহ চান, বান্দা এবাদাত-বন্দেগী, সৎকাজ ও অধিকার আদায় করার মাধ্যমে নিজের মন-মানসের ওপর থেকে নিজের ভুলের প্রভাব ধুয়ে মুছে ফেলবে এবং লজ্জা ও অনুতাপ সহকারে আল্লাহর দিকে ফিরে যাবে৷ এভাবে সে কেবল এই গোনাহের ক্ষমা লাভ করবে না বরং এই সংগে ভবিষ্যতের জন্য সে এই ধরনের ভুলের পুনরাবৃত্তি করা থেকেও নিজেকে সংরক্ষিত রাখতে পারবে৷ ' কাফ্‌ফারার' শাব্দিক অর্থ হচ্ছে, ''গোপন বস্তু'' ৷ কোন সৎকাজকে গোনাহের কাফ্‌ফারা গণ্য করার অর্থ হচ্ছে এই যে, এই নেকীটি ঐ গোনাহের ওপর ছেয়ে যায় এবং তাকে ঢেকে ফেলে ৷ যেমন কোন দেয়ালের গায়ে দাগ লেগে গেলে চুনকাম করে দাগ মিটিয়ে দেয়া হয়৷
১২৬. ইসলামের প্রারম্ভিক যুগে 'আসসালামু আলাইকুম' বাক্যটি মুসলমানদের জন্য ৷ ঐতিহ্য ও পরিচিতির প্রকাশ ছিল৷ একজন মুসলমান অন্য একজন মুসলমানকে দেখলে এ বাক্যটি ব্যবহার করতো এই অর্থে, ''আমিও তোমার দলভুক্ত, তোমার বন্ধু ও শুভাকাংখী৷ আমার কাছে তোমার জন্য শাস্তি ও নিরাপত্তা ছাড়া আর কিছুই নেই৷ কাজেই তুমি আমার সাথে শত্রুতা করো না এবং আমার পক্ষ থেকেও তোমার জন্য শত্রুতা ও ক্ষতির কোন আশংকাই নেই৷'' সেনাবাহিনীর মধ্যে যেমন সাংকেতিক শব্দ ( Password) হিসেবে একটি শব্দ নির্দিষ্ট করে দেয়া হয় এবং রাতে এক সেনাবাহিনীর লোক অন্য সেনাবাহিনীর কাছে দিয়ে যাওয়ার সময় এই শব্দ ব্যবহার করে যাতে সে শত্রু সেনাবাহিনীর লোক নয় একথা সুস্পষ্ট হয়ে যায়, ঠিক তেমনি সালাম শব্দটিকেও মুসলমানদের মধ্যে সাংকেতিক শব্দ হিসেবে নির্দিষ্ট করা হয়েছিল৷ বিশেষ করে সেই সময় এই সাংকেতিক শব্দটি ব্যবহারের গুরুত্ব আরো বেশী ছিল এজন্য যে, সে সময় আরবের নওমুসলিম ও কাফেরদের মধ্যে পোশাক, ভাষা বা অন্য কোন জিনিসের ব্যাপারে কোন সুস্পষ্ট পার্থক্য ছিল না৷ ফলে একজন মুসলমানের পক্ষে প্রথম দৃষ্টিতে অন্য একজন মুসলমানকে চিনে নেয়া খুব কঠিন ছিল৷

কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যাপারটা হয়ে দাঁড়াতো আরো জটিল৷ মুসলমানরা যখন কোন শত্রুদলের ওপর আত্রুমণ করতো এবং সেখানের কোন মুসলমান তাদের তরবারীর নীচে এসে যেতো তখন আক্রমণকারী মুসলমানদেরকে সে জানাতে চাইতো, আমি তোমাদের দীনী ভাই৷ একথা জানাবার জন্য সে 'আস্‌সালামু আলাইকুম' বা 'লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ' বলে চীৎকার করে উঠতো৷ কিন্তু মুসলমানরা তাতে সন্দেহ করতো৷ তারা মনে করতো, এ ব্যক্তি কোন কাফের, নিছক নিজের জান বাঁচাবার জন্য সে এই কৌশল অবলম্বন করেছে৷ এজন্য অনেক সময় তার এ ধরনের লোককে হত্যা করে বসতো এবং তার মালমাত্তা গণীমাত হিসেবে লুট করে নিতো৷ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই ধরনের ব্যাপারে প্রতি ক্ষেত্রে অত্যন্ত কঠোরভাবে তিরস্কার ও শাসন করেছেন৷ কিন্তু তবুও এ ধরনের দুর্ঘটনা বারবার ঘটতে থাকে৷ অবশেষে আল্লাহ কুরআন মজীদে এই সমস্যার সমাধান পেশ করেছেন৷

এখানে এই আয়াতের বক্তব্য হচ্ছে, যে ব্যক্তি নিজেকে মুসলমান হিসেবে পেশ করেছে তার ব্যাপারে তোমাদের এ ধরনের হালকাভাবে ফায়সালা করার কোন অধিকার নেই যে, সে নিছক প্রাণ বাঁচাবার জন্য মিথ্যা বলছে৷ সে সত্যবাদীও হতে পারে, মিথ্যাবাদীও হতে পারে ৷ প্রকৃত সত্য তো জানা যাবে অনুসন্ধানের পর৷ অনুসন্ধান ছাড়াই তাকে ছেড়ে দেবার ফলে যদি একজন কাফেরের মিথ্যা বলে প্রাণ বাঁচাবার সম্ভাবনা থাকে, তাহলে তাকে হত্যা করার পরে তোমাদের হাতে একজন নিরপরাধ মু'মিনের মারা পড়ারও সম্ভাবনা থাকে৷ কাজেই ভুলবশত একজন কাফেরকে ছেড়ে দেয়া ভুলবশত মু'মিনকে হত্যা করার চেয়ে অনেক ভালো৷
১২৭. অর্থাৎ তোমাদেরও এমন এক সময় ছিল যখন তোমরা কাফের গোত্রগুলোর মধ্যে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিলে৷ জুলুম নির্যাতনের ভয়ে ইসলামের কথা বাধ্য হয়ে গোপন রাখতে৷ ঈমানের মৌখিক অংগীকার ছাড়া তোমাদের কাছে তার আর কোন প্রমাণ ছিল না ৷ এখন আল্লাহর অনুগ্রহে তোমরা সামাজিক জীবন যাপনের সুবিধে ভোগ করছো৷ তোমরা এখন কাফেরদের মোকাবিলায় ইসলামের ঝাণ্ডা বুলন্দ করার যোগ্যতা লাভ করেছো৷ কাজেই যেসব মুসলমান এখনো প্রথম অবস্থায় আছে তাদের ব্যাপারে কোমল ব্যবহার ও সুবিধাদানের নীতি অবলম্বন না করলে তোমাদেরকে যে অনুগ্রহ করা হয়েছে তার প্রতি যথার্থ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হবে না৷
১২৮. জিহাদের নির্দেশ জারী করার পর যারা টালবাহানা করে বসে থাকে অথবা জিহাদের জন্য সাধারণভাবে ঘোষণা দেবার এবং জিহাদ করা 'ফরযে আইন' হয়ে যাবার পরও যারা লড়াই করতে গড়িমসি করে তাদের কথা বলা হয়নি৷ বরং এমন সব লোকের কথা বল হয়েছে যারা জিহাদ করা যখন 'ফরযে কিফায়া' সে অবস্থায় যুদ্ধের ময়দানে যাবার পরিবর্তে অন্যান্য কাজে ব্যস্ত থাকে৷ প্রথম দু'টি অবস্থায় জিহাদের উদ্দেশ্যে যুদ্ধের ময়দানে যেতে বিরত থাকলে একজন মুসলমান কেবল মুনাফিকই হতে পারে এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে তার জন্য কল্যাণ ও নেকীর কোন ওয়াদা নেই৷ তবে যদি সে কোন যথার্থ অক্ষমতার শিকার হয়ে থাকে তাহলে অবশ্য ভিন্ন কথা৷ বিপরীত পক্ষে শেষোক্ত অবস্থায় ইসলামী জামায়তের সমগ্র সমরশক্তির প্রয়োজন হয় না৷ বরং তার একটি অংশের প্রয়োজন হয়৷এ অবস্থায় যদি ইমামের পক্ষ থেকে এই মর্মে ঘোষণা দেয়া হয় যে, উমুক অভিযানে যারা অংশ গ্রহণ করতে চায় তারা অন্যান্য কল্যাণকর কাজে যারা ব্যস্ত থাকবে তাদের তুলনায় অবশ্যি উত্তম এবং শ্রেষ্ঠ বিবেচিত হবে৷