(৩৯:৪২) মৃত্যর সময় আল্লাহই রূহসমূহ কবজ করেন আর যে এখনো মরেনি নিদ্রাবস্থায় তার রূহ কবজ করেন৷ ৬০ অতপর যার মৃত্যুর ফায়সালা কার্যকরী হয় তাকে রেখে দেন এবং অন্যদের রূহ একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ফেরত পাঠান৷ যারা চিন্তা-ভাবনা করে তাদের জন্য এর মধ্যে বড় নিদর্শন রয়েছে৷ ৬১
(৩৯:৪৩) এসব লোক কি আল্লাহকে বাদ দিয়ে অন্যদেরকে সুপারিশকারী বানিয়ে রেখেছে?৬২ তাদেরকে বলো, তাদের ক্ষমতা ও ইখতিয়ারে যদি কিছু না থাকে এবং তারা কিছু না বুঝে এমতাবস্থায়ও কি সুপারিশ করবে ?
(৩৯:৪৪) বলো, সুপারিশ সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর ইখতিয়ারাধীন৷ ৬৩ আসমান ও যমীনের বাদশাহীর মালিক তিনিই৷ তোমাদেরকে তারই দিকে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে৷
(৩৯:৪৫) যখন শুধু আল্লাহর কথা বলা হয়, তখন যারা আখিরাতে বিশ্বাস করে না৷ তাদের মন কষ্ট অনুভব করে৷ আর যখন তাকে বাদ দিয়ে অন্যদের কথা বলা হয় তখন তারা আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে ওঠে৷ ৬৪
(৩৯:৪৬) বলো, হে আল্লাহ, আসমান ও যমীনের সৃষ্টিকর্তা, দৃশ্য ও অদৃশ্য সম্পর্কে জ্ঞানের অধিকারী, তোমার বান্দারা যেসব বিষয়ে মতানৈক্য পোষণ করে আসছে তুমিই সে বিষয়ে ফায়সালা করবে৷
(৩৯:৪৭) এসব জালেমদের কাছে যদি পৃথিবীর সমস্ত সম্পদরাজি এবং তাছাড়া আরো অতটা সম্পদও থাকে তাহলে কিয়ামতের ভীষণ আযাব থেকে বাঁচার জন্য তারা মুক্তিপণ হিসেবে সমস্ত সম্পদ দিয়ে দিতে প্রস্তুত হয়ে যাবে৷ সেখানে আল্লাহর পক্ষ থেকে এমন কিছু তাদের সামনে আসবে যা তারা কোন দিন অনুমানও করেনি৷
(৩৯:৪৮) সেখানে তাদের সামনে নিজেদের কৃতকর্মের সমস্ত মন্দ ফলাফল প্রকাশ হয়ে পড়বে৷ আর যে জিনিস সম্পর্কে তারা ঠাট্টা-বিদ্রূপ করতো তা-ই তাদের ওপর চেপে বসবে৷
(৩৯:৪৯) এ মানুষকেই ৬৫ যখন সামান্য মসিবতে পেয়ে বসে তখন সে আমাকে ডাকে৷ কিন্তু আমি যখন নিজের পক্ষ থেকে নিয়ামত দিয়ে তাকে সমৃদ্ধ করি তখন সে বলে ওঠেঃ এসব তো আমি আমার জ্ঞান-বুদ্ধির জোরে লাভ করেছি৷ ৬৬ না, এটা বরং পরীক্ষা৷ কিন্তু তাদের অধিকাংশ লোকই জানে না৷ ৬৭
(৩৯:৫০) তাদের পূর্ববর্তী লোকেরাও একথাই বলেছিলো৷ কিন্তু তারা নিজেদের কর্ম দ্বারা যা অর্জন করেছিল তা তাদের কোন কাজে আসেনি৷ ৬৮ অতপর নিজেদের উপার্জনের মন্দ ফলাফল তারা ভোগ করেছে৷
(৩৯:৫১) এদের মধ্যেও যারা জালেম তারা অচিরেই তাদের উপার্জনের মন্দ ফলাফল ভোগ করবে৷ এরা আমাকে অক্ষম করে দিতে পারবে না৷
(৩৯:৫২) তারা কি জানে না, আল্লাহ যাকে ইচ্ছা তার রিযিক প্রশস্ত করে দেন এবং যাকে ইচ্ছা তার রিযিক সংকীর্ণ করে দেন? ৬৯ এর মধ্যে সেসব লোকের জন্য নিদর্শন রয়েছে যারা ঈমান পোষণ করে৷
৬০. ঘুমন্ত অবস্থায় রূহ কবজ করার অর্থ অনুভূতি ও বোধ , উপলব্ধি ও অনুধাবন এবং ক্ষমতা ও ইচ্ছা নিষ্ক্রিয় করে দেয়া৷ এটা এমন এক অবস্থা যে , " ঘুমন্ত মানুষ ও মৃত মানুষ সমান " এ প্রবাদ বাক্যটি এ ক্ষেত্রে হুবহু খাটে ৷
৬১. একথা দ্বারা আল্লাহ তা'আলা প্রত্যেক মানুষকে এ অনুভূতি দিতে চাচ্ছেন যে , জীবন ও মৃত্যু কিভাবে তাঁর অসীম ক্ষমতার করায়ত্ব্‌ রাতে ঘুমালে সকালে অবশ্যই জীবিত উঠবে এবং নিশ্চয়তা কোন মানুষের জন্যই নেই৷ কেউ - ই জানে না এক মুহূর্তের মধ্যে তার ওপর কি বিপদ আসতে পারে৷ আবার পরবর্তী মুহূর্তটি তার জন্য জীবনের মুহূর্ত না মৃত্যুর মুহূর্ত তাও কেউ জানে না ৷ শয়নে , জাগরনে , ঘরে অবস্থানের সময় কিংবা কোথাও চলাফেরা করার সময় মানব দেহের আভ্যন্তরীণ কোন ত্রুটি অথবা বাইরের অজানা কোন বিপদ আকস্মাত এমন মোড় নিতে পারে যা তার মৃত্যু ঘটাতে পারে৷ যে মানুষ আল্লাহর হাতে এতটা অসহায় সে যদি সেই আল্লাহ সম্পর্কে এতটা অমনোযোগী ও বিদ্রোহী হয় তাহলে সে কত অজ্ঞ৷
৬২. অর্থাৎ এসব লোক নিজের পক্ষ থেকেই ধরে নিয়েছে যে , কিছু সত্তা এমন আছে যারা আল্লাহর দরবারে অত্যন্ত ক্ষমতাধর৷ তাদের সুপারিশ কখনো বিফলে যায় না৷ অথচ তারা যে সুপারিশকারী এ ব্যাপারে না আছে কোন প্রমাণ , না আল্লাহ তা'আলা কখনো বলেছেন যে , আমার দরবারে তাদের এ ধরনের মর্যাদা রয়েছে , না ঐ সব সত্তা ও ব্যক্তিবর্গ দাবী করেছেন যে আমরা নিজেদের ক্ষমতায় তোমাদের সকল প্রয়োজন পূরণ করে দেবো৷ তাদের আরো নির্বুদ্ধিতা এই যে , তারা প্রকৃত মালিককে বাদ দিয়ে সব অনুমানকৃত সুপারিশকারীদেরই সবকিছু মেনে নিয়েছে এবং এদের সকল সবিনয় প্রার্থনা ও আকুতি তাদের জন্যই নিবেদিত ৷
৬৩. অর্থাৎ সুপারিশ গ্রহণ করানোর ক্ষমতা তো দূরের কথা নিজে নিজেই আল্লাহর দরবারে সুপারিশকারী হিসেবে যাবে সে শক্তিও করো নেই৷ যাকে ইচ্ছা সুপারিশের অনুমতি দেয়া ও যাকে ইচ্ছা না দেয়া এবং যার জন্য ইচ্ছা সুপারিশ করতে দেয়া আর যার জন্য ইচ্ছা করতে না দেয়া সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর ইখাতিয়ারে ৷ (শাফা'আত সম্পর্কে ইসলামী আকীদা ও শিরকমূলক আকীদার পার্থক্য বুঝার জন্য নিম্নোদ্বৃত স্থানসমূহে দেখুন৷ তাফহীমূল কুরআন , আল বাকারাহ , টীকা ২৮১ ; আল আন ' আম , টীকা ৩৩ ; ইউনুস টীকা ৫ ও ২৪ ; হূদ , টীকা ৮৪ ও ১০৬ ; আর রা'দ , টীকা ১৯ ; আন নাহল , টীকা ৬৪ , ৬৫ , ৭৯ ; ত্বা -হা , টীকা ৮৫ ও ৮৬ ; আল আম্বিয়া , টীকা ২৭ ; আল হাজ্জ , টীকা ১২৫ আস সাবা , টীকা ৪০ )
৬৪. গোটা পৃথিবীর মুশরেকী রুচি ও ধ্যান -ধারণার অধিকারী প্রায় সব মানুষের মধ্যেই এটি বিদ্যমান৷ এমনকি মুসলমানদের মধ্যেও যে দুর্ভাগাদের এ রোগ পেয়ে বসেছে তারা ও এ দোষ থেকে মুক্ত নয়৷ মুখে বলে আমরা আল্লাহকে মানি৷ কিন্তু অবস্থা এই যে , শুধু আল্লাহর কথা বলুন , দেখবেন তাদের চেহারা বিকৃত হতে শুরু হয়েছে৷ এরা বলে বসবে৷ এ ব্যক্তি নিশ্চয়ই বুযুর্গ ও আওলিয়াদের মানে না৷ সে জন্য শুধু আল্লাহর কথাই আওড়িয়ে যাচ্ছে ৷ কিন্তু যদি আল্লাহ ছাড়া অন্যদের কথাও বলা হয় তাহলে আনন্দে ও প্রফুল্লতায় তাদের চেহারা উজ্জ্বল হয়ে ওঠে ৷ প্রকৃতপক্ষে তাদের আগ্রহ ও ভালবাসা কার প্রতি তা এ কর্মপন্থার মাধ্যমেই পরিস্কার প্রকাশ পায়৷ আল্লামা আলুসী তাফসীরে রূহুল মা'আনীতে এ আয়াতের ব্যাখ্যায় তাঁর নিজের একটি অভিজ্ঞতার বিষয় বর্ণনা করেছেন৷ তিনি বলেন : একদিন আমি দেখালাম , কোন বিপদে পড়ে এক ব্যক্তি সাহায্যের জন্য এক মৃত বুযুর্গকে ডাকছে৷ আমি বললাম হে আল্লাহর বান্দা , আল্লাহকে ডাকো ৷ আল্লাহ বলছেন :

আরবী ------------------------------------------------------------------------------

আমার একথা শুনে সে ভীষণ চটে গেল৷ পরে লোকজন আমাকে বলেছে , সে বলছিলো : এ ব্যক্তি আওলিয়াদের মানে না৷ তাছাড়া কিছু সংখ্যক লোক তাকে একথাও বলতে শুনেছে যে , অলীরা আল্লাহর চাইতে দ্রুত শুনে থাকেন৷
৬৫. অর্থাৎ যার আল্লাহর নাম অপছন্দনীয় এবং একমাত্র আল্লাহর নামে যার চেহারা বিকৃত হতে শুরু করে ৷
৬৬. এ আয়তাংশটির দু'টি অর্থ হতে পারে৷ একটি অর্থ হচ্ছে , আমি যে , এ নিয়ামতের উপযুক্ত তা আল্লাহ জানেন ৷ তাই তিনি আমাকে এসব দিয়েছেন ৷ আমি যদি তার কাছে একজন দুষ্ট ভ্রষ্ট আকীদা এবং দুষ্কর্মশীল মানুষ হতাম তাহলে আমাকে তিনি এসব নিয়ামত কেন দিতেন ? এর আরেকটি অর্থ এও হতে পারে যে , এসব তো আমি আমার যোগ্যতার ভিত্তিতে লাভ করেছি৷
৬৭. কেউ যদি নিয়ামত লাভ করতে থাকে তখন মানুষ তার মূর্খতা ও অজ্ঞতার কারণে মনে করে , সে অনিবার্যরূপে তার যোগ্যতার ভিত্তিতেই তা লাভ করছে আর তা লাভ করাটা আল্লাহর দরবারে তার প্রিয়পাত্র হওয়ার লক্ষণ বা প্রমান ৷ অথচ এখানে যাকেই যা কিছু দেয়া হচ্ছে আল্লাহর পক্ষ থেকে পরীক্ষা হিসেবেই দেয়া হচ্ছে৷ এটা পরীক্ষার উপকরণ , যোগ্যতার পুরস্কার নয়৷ অন্যথায় কি কারণে বহু যোগ্য লোক দুর্ধশাগ্রস্ত এবং বহু অযোগ্য লোক নিয়ামতের প্রাচুর্যে ডুবে আছে ? অনুরূপভাবে এসব পার্থিব নিয়মাত আল্লাহর দরবারে প্রিয়পাত্র হওয়ারও লক্ষণ নয়৷ যে কোন ব্যক্তি দেখবেন , পৃথিবীতে বহু সৎকর্মশীল ব্যক্তি বিপদাপদে ডুবে আছে , অথচ তাদের সৎকর্মশীল হওয়া অস্বীকার করা যায় না৷ আবার বহু দুশ্চরিত্র লোক আরাম আয়েশে জীবন কাটাচ্ছে যাদের কুৎসিত আচরণ ও তৎপরতা সম্পর্কে সবাই অবহিত৷ এখন কোন জ্ঞানবান ব্যক্তি কি একজনের বিপদাপদ এবং আরেকজনের আরাম আয়েশকে একথার প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করতে পারে যে , আল্লাহ সৎকর্মশীল মানুষদের পছন্দ করেন না , দুশ্চরিত্র ও দুষ্কর্মশীল মানুষদের পছন্দ করেন ?
৬৮. অর্থাৎ যখন দুর্ভাগ্যের দিন আসলো তখন তাদের যোগ্যতার দাবী কোন কাজে লাগলো না৷ তাছাড়া একথাও পরিস্কার হয়ে গেল যে , তারা আল্লাহর প্রিয় বান্দা ছিলো না একথা স্পষ্ট যে তাদের এসব উপার্জন যদি যোগ্যতা ও প্রিয়পাত্র হওয়ার কারণে হতো তাহলে দুর্দিন কি করে আসলো ?
৬৯. অর্থাৎ রিযিকের স্বল্পতা ও প্রাচুর্য আল্লাহর আরেকটি বিধানের ওপর নির্ভরশীল৷ সেই বিধানের উদ্দেশ্যও সম্পূর্ণ ভিন্ন৷ রিযিকের বন্টন ব্যক্তির যোগ্যতা কিংবা তার প্রিয়পাত্র বা বিরাগভাজন হওয়ার ওপর আদৌ নির্ভর করে না৷ (এ বিষয়টি বিস্তারিত জানার জন্য দেখুন , তাফহীমূল কুরআন , আত- তাওবা , টীকা ৫৪ , ৭৫ , ৮৯ ; ইউনুস , টীকা ২৩ ; হূদ , টীকা ৩ ও ৩৩ ; আর রা'দ, টীকা ৪২ ; আলা কাহাফ , টীকা ৩৭ ; মারয়াম , টীকা ৪৫ ত্বা-হা , টীকা ১১৩ ও ১১৪ ; আল আম্বিয়া , টীকা ৯৯ ; আলা মু'মিনূন , ভূমিকা এবং টীকা ১ , ৪৯ ও ৫০ ' আশ শু'য়ারা , টীকা ৮১ ও ৮৪ ; আলা কাসাস , টীকা ৯৭ , ৯৮ ও ১০১ ; সাবা টীকা ৫৪ থেকে ৬০ )৷