(৩৮:৪১) আর স্মরণ করো আমার বান্দা আইয়ূবের কথা ৪১ যখন সে তার রবকে ডাকলো এই বলে যে, শয়তান আমাকে কঠিন যন্ত্রণা ও কষ্টের মধ্যে ফেলে দিয়েছে৷ ৪২
(৩৮:৪২) (আমি তাকে হুকুম দিলাম) তোমার পা দিয়ে ভূমিতে আঘাত করো, এ হচ্ছে ঠাণ্ডা পানি গোসল করার জন্য এবং পান করার জন্য৷ ৪৩
(৩৮:৪৩) আমি তাকে ফিরিয়ে দিলাম তার পরিবার পরিজন এবং সেই সাথে তাদের মতো আরো, ৪৪ নিজের পক্ষ থেকে রহমতস্বরূপ এবং বুদ্ধি ও চিন্তাশীলদের জন্য শিক্ষণীয় হিসেবে৷ ৪৫
(৩৮:৪৪) (আর আমি তাকে বললাম) এক আমি ঝাড়- নাও এবং তা দিয়ে আঘাত করো এবং নিজের কসম ভংগ করো না৷ ৪৬আমি তাকে সবরকারী পেয়েছি, উত্তম বান্দা ছিল সে, নিজের রবের অভিমুখী৷ ৪৭
(৩৮:৪৫) আর আমার বান্দা ইবরাহীম, ইসহাক ও ইয়াকূবের কথা স্মরণ করো৷ তারা ছিল বড়ই কর্মশক্তির অধিকারী ও বিচক্ষণ ৪৮
(৩৮:৪৬) আমি একটি নির্ভেজাল গুণের ভিত্তিতে তাদেরকে নির্বাচিত করেছিলাম এবং তা ছিল পরলোকের স্মরণ৷৪৯
(৩৮:৪৭) নিশ্চিতভাবে আমার কাছে তারা বিশিষ্ট সৎলোক হিসেবে গণ্য৷
(৩৮:৪৮) আর ইসমাঈল, আল ইয়াসা’ ৫০ ও যুল কিফ্‌ল-এর ৫১ কথা স্মরণ করা৷ এরা সবাই সৎলোকদের অন্তরভূক্ত ছিল৷
(৩৮:৪৯) এ ছিল একটি স্মরণ৷ (এখন শোনো) মুত্তাকীদের জন্য নিশ্চিতভাবেই রয়েছে উত্তম আবাস্ত
(৩৮:৫০) চিরন্তন জান্নাত, যার দরোজাগুলো খোলা থাকবে তাদের জন্য৷ ৫৩
(৩৮:৫১) সেখানে তারা বসে থাকবে হেলান দিয়ে, বহুবিধ ফলমূল ও পানীয়ের ফরমাশ করতে থাকবে৷
(৩৮:৫২) এবং তাদের কাছে থাকবে লজ্জাবতী কম বয়সী স্ত্রীরা৷৫২
(৩৮:৫৩) এসব এমন জিনিস যেগুলো হিসেবের দিন দেবার জন্য তোমাদের কাছে অংগীকার করা হচ্ছে৷
(৩৮:৫৪) এ হচ্ছে আমার রিযিক, যা কখনো শেষ হবে না৷
(৩৮:৫৫) এতো হচ্ছে মুত্তাকীদের পরিণাম আর বিদ্রোহীদের জন্য রয়েছে নিকৃষ্টতম আবাস
(৩৮:৫৬) জাহান্নাম, যেখানে তারা দগ্ধীভূত হবে, সেটি বড়ই খারাপ আবাস৷
(৩৮:৫৭) এ হচ্ছে তাদের জন্য, কাজেই তারা স্বাদ আস্বাদন করুক ফুটন্ত পানির, পুঁজের ৫৪
(৩৮:৫৮) ও এ ধরনের অন্যান্য তিক্ততার৷
(৩৮:৫৯) (নিজেদের অনুসারীদের জাহান্নামের দিকে আসতে দেখে তারা পরস্পর বলাবলি করবে) “এ একটি বাহিনী তোমাদের কাছে ঢুকে চলে আসছে, এদের জন্য কোন স্বাগত সম্ভাষণ নেই, এরা আগুনে ঝলসিত হবে৷”
(৩৮:৬০) তারা তাদেরকে জবাব দেবে, “না, বরং তোমরাই ঝলসিত হচ্ছো, কোন অভিনন্দন নেই তোমাদের জন্য তোমরাই তো আমাদের পূর্বে এ পরিণাম এনেছো, কেমন নিকৃষ্ট এ আবাস!”
(৩৮:৬১) তারপর তারা বলবে, “হে আমাদের রব! যে ব্যক্তি আমাদের এ পরিণতিতে পৌঁছুবার ব্যবস্থা করেছে তাকে দোজখে দ্বিগুণ শাস্তি দাও৷”
(৩৮:৬২) আর তারা পরস্পর বলাবলি করবে, কি ব্যাপার, আমরা তাদেরকে কোথাও দেখছি না, যাদেরকে আমরা দুনিয়ায় খারাপ মনে করতাম? ৫৫
(৩৮:৬৩) আমরা কি অযথা তাদেরকে বিদ্রূপের পাত্র বানিয়ে নিয়েছিলাম অথবা তারা কোথাও দৃষ্টি অগোচরে আছে?”
(৩৮:৬৪) অবশ্যই একথা সত্য, দোজখবাসীদের মধ্যে এসব বিবাদ হবে৷
৪১. এ নিয়ে চতুর্থবার হযরত আইয়ুবের কথা কুরআন মজিদে আলোচিত হয়েছে৷ এর আগে সূরা নিসার ১৬৩ , সূরা আন'আমের ৮৪ ও সূরা আম্বিয়ার ৮৩ - ৮৪ আয়াতে এ সম্পর্কিত আলোচনা এসেছে৷ ইতিপূর্বে সূরা আম্বিয়ার ব্যাখ্যায় আমি তাঁর অবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেছি৷ (তাফহীমূল কুরআন , আল আম্বিয়া , ৭৬ - ৭৯ টীকা )
৪২. এর অর্থ এ নয় যে , শয়তান আমাকে রোগগ্রন্ত করে দিয়েছে এবং আমাকে বিপদের মধ্যে ফেলে দিয়েছে বরং এর সঠিক অর্থ হচ্ছে , রোগের প্রচণ্ডতা , ধন - সম্পদের বিনাশ এবং আত্মীয় - স্বজনদের মুখ ফিরিয়ে নেবার কারণে আমি যে কষ্ট ও যন্ত্রণার মধ্যে নিক্ষিপ্ত হয়েছি তার চেয়ে বড় কষ্ট ও যন্ত্রণা আমার জন্য এই যে , শয়তান তার প্ররোচনার মাধ্যমে আমাকে বিপদগ্রস্ত করছে৷ এ অবস্থায় সে আমাকে আমার রব থেকে হতাশ করার চেষ্টা করে , আমাকে আমার রবের প্রতি অকৃতজ্ঞ করতে চায় এবং আমি যাতে অধৈর্য হয়ে উঠি সে প্রচেষ্টায় রত থাকে৷ হযরত আইয়ূবের ফরিয়াদের এ অর্থটি দু'টি কারণে আমাদের কাছে প্রাধান্য লাভ যোগ্য৷ এক , কুরআন মজীদের দৃষ্টিতে আল্লাহ শয়তানকে কেবলমাত্র প্ররোচণা দেবার ক্ষমতাই দিয়েছেন৷ আল্লাহর বন্দেগীকারীদেরকে রোগগ্রস্ত করে এবং তাদেরক শারীরিক যন্ত্রণা দিয়ে বন্দেগীর পথ থেকে সরে যেতে বাধ্য করার ক্ষমতা তাদেরকে দেননি ৷ দুই , সূরা আম্বিয়ায় যেখানে হযরত আইয়ূব আল্লাহর কাছে তাঁর রোগের ব্যাপারে অভিযোগ পেশ করছেন সেখানে তিনি শয়তানের কোন কথা বলেন না৷ রবং তিনি কেবল বলেন ,

আরবী --------------------------------------------------------------------------

" আমি রোগগ্রস্ত হয়ে পড়েছি এবং তুমি পরম করুণাময়৷ "
৪৩. অর্থাৎ আল্লাহ হুকুমে মাটিতে পায়ের আঘাত করতেই একটি পানির ঝরণা প্রবাহিত হলো৷ এর পানি পান করা এবং এ পানিতে গোসল করা ছিল হযরত আইয়ূবের জন্য তাঁর রোগের চিকিৎসা ৷ সম্ভবত হযরত আইয়ূব কোন কঠিন চর্মরোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন৷ বাইবেল ও একথাই বলে যে , তাঁর সারা শরীর ফোড়ায় ভরে গিয়েছিল৷
৪৪. হাদীস থেকে জানা যায় , এ রোগে আক্রান্ত হবার পর হযরত আইয়ূবের স্ত্রী ছাড়া আর সবাই তাঁর সঙ্গ ত্যাগ করেছিল এমন কি সন্তানরাও তাঁর দিকে থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল৷ এ দিকে ইংগিত করেই আল্লাহ বলছেন , যখন আমি তার রোগ নিরাময় করলাম , সমস্ত পরিবারবর্গ তাঁর কাছে ফিরে এলো এবং তারপর আমি তাঁকে আরো সন্তান দান করলাম৷
৪৫. অর্থাৎ একজন বুদ্ধিমানের জন্য এর মধ্যে এ শিক্ষা রয়েছে যে , ভালো অবস্থায় আল্লাহকে ভুলে গিয়ে তার বিদ্রোহী হওয়া উচিত নয় এবং খারাপ অবস্থায় তার আল্লাহ থেকে নিরাশ হওয়াও উচিত নয়৷ তাকদীরেরর ভালমন্দ সরাসরি এক ও লাশরীক আল্লাহর ক্ষমতার আওতাধীন৷ তিনি চাইলে মানুষের সবচেয়ে ভাল অবস্থাকে সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় পরিবর্তিত করে দিতে পারেন আবার চাইলে সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় মধ্য দিয়ে তাকে সবচেয়ে ভাল অবস্থায় পৌঁছিয়ে দিতে পারেন৷ তাই বুদ্ধিমান ব্যক্তির সকল অবস্থায় তাঁর ওপর ভরসা এবং তাঁর প্রতি পুরোপুরি নির্ভর করা উচিত ৷
৪৬. এ শব্দগুলো নিয়ে চিন্তা ভাবনা করলে একথা পরিস্কার হয়ে যায় যে , হযরত আইয়ূব (আ) রুগ্ন অবস্থায় নারাজ হয়ে কাউকে মারার কসম খেয়েছিলেন ৷ (কথিত আছে , স্ত্রীকে মারার কসম খেয়েছিলেন ) আর এ কসম খাওয়ার সময় তিনি একথাও বলেছিলেন যে , তোমাকে এতো ঘা দোররা মারবো ৷ আল্লাহ যখন তাঁকে সুস্থতা দান করলেন এবং যে রোগগ্রস্ত অবস্থায় ক্রুদ্ধ হয়ে তিনি এ কসম খেয়েছিলেন এ ক্রোধ স্তিমিত হয়ে গেলো তখন তিনি একথা মনে করে অস্থির হয়ে পড়লেন যে কসম পুরা করতে গেলে অযথা একজন নিরপরাধকে মানতে হয় এবং কসম ভেঙে ফেললেও গোনাহগার হতে হয়৷ এ উভয় সংকট থেকে আল্লাহ তাঁকে উদ্ধার করলেন ৷ আল্লাহ তাঁকে হুকুম দিলেন , একটি ঝাড়ু নাও তাতে তুমি যে , পরিমাণ কোড়া মারার কসম খেয়েছিলে সে পরিমাণ কাঠি থাকবে এবং সে ঝাড়- দিয়ে কথিত অপরাধীকে একবার আঘাত করো এর ফলে তোমার কসমও পুরা হয়ে যাবে এবং সেও অযথা কষ্টভোগ করবে না৷

কোন কোন ফকীহ ও রেওয়ায়াতটিকে একমাত্র হযরত আইয়ূবের জন্য নির্ধারিত মনে করেন৷ আবার কতিপয় ফকীহের মতে অন্য লোকেরাও এ সুবিধাদান থেকে লাভবান হতে পারে৷ প্রথম অভিমতটি উদ্ধৃত করেছেন ইবনে আসাকির হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা) থেকে এবং আবু বকর জাসসাস মুজাহিদ থেকে ৷ ইমাম মালেকেরও অভিমত এটিই ৷ ইমাম আবু হানীফা , ইমাম আবু ইউসুফ , ইমাম মুহাম্মাদ , ইমাম যুফার ও ইমাম শাফেঈ দ্বিতীয় অভিমতটি অবলম্বন করেছেন ৷ তাঁরা বলেন , কোন ব্যক্তি যদি তার খাদেমকে দশ ঘা কোড়া মারার কসম খেয়ে বসে এবং পরে দশটি কোড়া মিলিয়ে তাকে এমনভঅবে কেবলমাত্র একটি আঘাত করে যার ফলে কোড়াগুলোর প্রত্যেকটি কিছু অংশ তার গায়ে ছুঁড়ে যায় তাহলে তার কসম পুরো হয়ে যাবে৷

বিভিন্ন হাদীস থেকে জানা যায় , নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বেশী রোগগ্রস্ত বা দুর্বল হবার কারণে যে যিনাকারী একশো দোরবার আঘাত সহ্য করার ক্ষমতা রাখতো না তার বিরুদ্ধে দণ্ডবিধি প্রয়োগ করার ব্যাপারে এ আয়াতে বিবৃত পদ্ধতি অবলম্বন করেছেন৷ আল্লামা আবু বকর জাসসাস হযরত সাঈদ ইবনে সা'দ ইবনে উবাদাহ থেকে বর্ণনা করেছেন যে , বনী সা 'য়েদে এক ব্যক্তি যিনা করে৷ সে এমন রুগ্ন ছিল যে , তাকে অস্থি - চর্মসার বলা যেতো ৷ এ কারণে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হুকুম দিলেনঃ

আরবী -------------------------------------------------------------------------

" খেজুরের একটি ডাল , নাও , যার একশোটি শাখা রয়েছে এবং তা দিয়ে একবার এ ব্যাক্তিকে আঘাত করো৷ " (আহকামূল কুরআন )

মুসনাদে আহমাদ , আবু দাউদ , নাসাঈ ইবনে মাজাহ , তাবারানী , আবদুল রাজ্জাক ও অন্যান্য হাদীস গ্রন্থসমূহেও এ সমর্থক কতিপয় হাদীস উদ্ধৃত হয়েছে ৷ সেগুলোর মাধ্যমে একথা চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয় যে , নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রোগী ও দুর্বলের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধি প্রয়োগ করার ক্ষেত্রে এ পদ্ধতিই অবলম্বন করেছিলেন ৷ তবে ফকীহগণ এ ক্ষেত্রে শর্ত আরোপ করেছেন যে , প্রত্যেকটি শাখা বা পাতার কিছু না কিছু অংশ অপরাধীর গায়ে অবশ্যই লাগা উচিত এবং একটি আঘাতই যথেষ্ট হলেও অপরাধীকে তা যেন কোন না কোন পর্যায়ে আহত করে৷ অর্থাৎ কেবল স্পর্শ করা যথেষ্ট নয় বরং আঘাত অবশ্যই করতে হবে৷

এখানে এ প্রশ্ন দেখা দেয় যে , যদি কোন ব্যক্তি কোন বিষয়ে কসম খেয়ে বসে এবং পরে জানা যায় যে , সে বিষয়টি অসংগত , তাহলে তার কি করা উচিত৷ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রত্যেকে এ ব্যাপারে হাদীস বর্ণিত হয়েছে৷ তিনি বলেছেন , এ অবস্থায় মানুষের পক্ষে যা ভালো , তাই করা উচিত এবং এটিই তার কাফফারা অন্য একটি হাদীসে বলা হয়েছে , এ অসংগত কাজের পরিবর্তে মানুষের ভাল কাজ করা এবং নিজের কসমের কাফফারা আদায় করে দেয়া উচিত ৷ এ আয়াতটি এ দ্বিতীয় হাদীসটিকে সমর্থন করে৷ কারণ একটি অসংগত কাজ না করাই যদি কসমের কাফফরা হতো তাহলে আল্লাহ আইয়ুবকে একথা বলতেন না যে , তুমি একটি ঝাড়- দিয়ে আঘাত করে নিজের কসম পুরা করে নাও৷ বরং বলতেন , তুমি এমন অসংগত কাজ করো না এবং এটা না করাই তোমার কসমের কাফফরা ৷ (আরো বিস্তারিত জানার জন্য দেখুন তাফহীমূল কুরআন , আন নূর , ২০ টীকা )

এ আয়াত থেকে একথাও জানা যায় যে, কোন ব্যক্তি কোন বিষয়ে কসম খেলে সংগে সংগেই তা পুরা করা অপরিহার্য হয় না৷ হযরত আইয়ূব রোগগ্রস্ত অবস্থায় কসম খেয়েছিলেন এবং তা পূর্ণ করেন পুরোপুরি সুস্থ হবার পর এবং সুস্থ হবার পরও তাও সংগে সংগেই পুরা করেননি৷

কেউ কেউ এ আয়াতকে শরয়ী বাহানবাবাজীর সপক্ষে যুক্তি হিসেবে দাঁড় করিয়েছেন ৷ সন্দেহ নেই , হযরত আইয়ুবকে যা করতে বলা হয়েছিল তা একটি বাহানা ও ফন্দি এ ছিল কিন্তু তা কোন ফরয থেকে বাঁচার জন্য করতে বলা হয়নি বরং বলা হয়েছিল একটি খারাপ কাজ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য৷ কাজেই শরীয়াতে একমাত্র এমন বাহানা ও ফন্দি জায়েয যা মানুষের নিজের সত্তা থেকে অথবা অন্য কোন ব্যক্তি থেকে জুলুম , গোনাহ ও অসৎ প্রবণতা দূর করার জন্য করা হয়ে থাকে৷ নয়তো হারামকে হালাল বা বাতিল অথবা সৎকাজ থেকে রেহাই পাবার জন্য বাহানাবাজি করা বা ফন্দি আঁটা গোনাহর উপরি গোনাহ৷ বরং এর সূত্র গিয়ে কুফরীর সাথে মেলে ৷

কারণ এসব অপবিত্র উদ্দেশ্যে যে ব্যক্তি বাহানা করে বসে যেন অন্য কথায় আল্লাহকে ধোঁকা দিতে চায়৷ যেমন যে ব্যক্তি যাকাত দেয়া থেকে রেহাই পাবার জন্য বছর শেষ হবার আগে নিজেই সম্পদ অন্য কারো কাছে স্থানান্তর করে সে নিছক একটি ফরয থেকেই পালায়ন করে না বরং সে একথাও মনে করে যে , আল্লাহ তার এ প্রকাশ্য কাজ দেখে প্রতারিত হবে এবং তাকে ফরযের আওতাভুক্ত মনে করবে না৷ এ ধরনের ' হীলা ' বা বাহানার বিষয়সমূহ যেসব ফকীহ তাদের কিতাবের অন্তরভুক্ত করেছেন , শরীয়াতের বিধান থেকে পৃষ্ঠ প্রদর্শন করার জন্য এসব বাহানাবাজীর আশ্রয় নিতে উদ্বুদ্ধ করা তাঁদের উদ্দেশ্য নয় বরং তাদের উদ্দেশ্য হচ্ছে , যদি কোন ব্যাক্তি গোনাহকে আইনের রূপ দান করে গা বাঁচিয়ে বের হয়ে আসে , তাহলে কাযী বা শাসক তাকে পাকড়াও করতে পারেন না৷ তার শাস্তির ভার আল্লাহর হাতে সোপর্দ হয়ে যায় ৷
৪৭. এ প্রেক্ষাপটে একথা বলার জন্য হযরত আইয়ূবের কথা বলা হয়েছে যে , আল্লাহর নেক বান্দারা যখন বিপদের ও কঠিন সংকটের মুখোমুখি হন তখন তাঁরা তাঁদের রবের কাছে অভিযোগ করেন না বরং ধৈর্য সহকারে তাঁর চাপিয়ে দেয়া পরীক্ষাকে মেনে নেন এবং তাতে উত্তীর্ণ হবার জন্য তাঁর কাছেই সাহায্য চান৷ কিছুকাল আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়ার পর যদি বিপদ অপসারিত না হয় তাহলে তাঁর থেকে নিরাশ হয়ে অন্যদের দরবারে হাত পাতবেন , এমন পদ্ধতি তাঁরা অবলম্বন করেন না৷ বরং তারা ভাল করেই জানেন , যা কিছু পাওয়ার আল্লাহর কাছ থেকেই পাওয়া যাবে ৷ তাই বিপদের ধারা যতই দীর্ঘ হোক না কেন তারা তাঁরই করুণা প্রার্থী হন৷ এ জন্য তারা এমন দান ও করুণা লাভে ধন্য হন যার দৃষ্টান্ত হযরত আইয়ূবের জীবনে পাওয়া যায়৷ এমনকি যদি তারা কখনো অস্থির হয়ে কোন প্রকার নৈতিক দ্বিধা দন্দ্বের শিকার হয়ে পড়েন তাহলেও আল্লাহ তাদেরকে দুষ্কৃতিমুক্ত করার জন্য একটি পথ বের করে দেন যেমন হযরত আইয়ূবের জন্য বের করে দিয়েছিলেন৷
৪৮. মূলে বলা হয়েছেঃ (আরবী ----------------------- ) (হস্তধারী ও দৃষ্টিধারীগণ ইতিপূর্বে যেমন আমরা বলেছি , হাত মানে শক্তি ও সামর্থ ৷ আর এ নবীগণকে শক্তি ও সামর্থে অধিকারী বলার অর্থ হচ্ছে , তাঁরা অত্যন্ত সক্রিয় ও কর্মশক্তির অধিকারী ছিলেন৷ তাঁরা আল্লাহর আনুগত্যকারী ও গোনাহ থেকে সংরক্ষিত থাকার প্রচণ্ড শক্তির অধিকারী ছিলেন৷ দুনিয়ায় আল্লাহর কালেমা বুলন্দ করার জন্য তাঁরা বিরাট প্রচেষ্টা ছিলেন দুনিয়ায় তাঁরা চোখ বন্ধ করে চলতেন না৷ বরং চোখ খুলে জ্ঞান ও তাত্বিক পর্যবেক্ষণের পূর্ণ আলোকে সঠিক সোজা পথ দেখে চলতেন ৷ এ শব্দগুলোর মধ্যে এ দিকে একটি সূক্ষ্ম ইংগিত করা হয়েছে যে , দুষ্কৃতিকারী ও পথভ্রষ্টরা আসলে হাত ও চোখ উভয়টি থেকে বঞ্চিত ৷ আসলে যারা আল্লাহর পথে কাজ করে তারাই হস্তধারী এবং যারা সত্যের আলো ও মিথ্যার অন্ধকারের মধ্যে পার্থক্য করে তারাই দৃষ্টির অধিকারী৷
৪৯. অর্থাৎ তাঁদের যাবতীয় সাফল্যের মূল কারণ ছিল এই যে , তাঁদের মধ্যে বৈষয়িক স্বার্থলাভের আকাংখা ও বৈষয়িক স্বার্থপূজার সামান্যতম গন্ধও ছিল না৷ তাঁদের সমস্ত চিন্তা ও প্রচেষ্টা ছিল আখেরাতের জন্য৷ তাঁরা নিজেরাও আখেরাতের কথা স্মরণ করতেন এবং অন্যদেরকেও স্মরণ করিয়ে দিতেন৷ তাই আল্লাহ তাঁদেরকে দু'টি মর্যাদা দান করেছেন৷ বৈষয়িক স্বার্থ চিন্তায় ব্যাপৃত লোকদের ভাগ্যে কখনো এটা ঘটেনি৷ এ প্রসংগে এ সূক্ষ্ম বিষয়টিও দৃষ্টি সমক্ষে থাকা উচিত যে , এখানে আল্লাহ আখেরাতের জন্য কেবলমাত্র " আদদার " (সেই ঘর বা আসল ঘর ) শব্দ ব্যবহার করেছেন ৷ এর মাধ্যমে এখানে এ সত্যটি বুঝানোই উদ্দেশ্য যে , এ দুনিয়া আদতে মানুষের ঘর নয় বরং এটি নিছক একটি অতিক্রম করার জায়গা এবং একটি মুসাফিরখানা মাত্র ৷ এখান থেকে মানুষের সুসজ্জিত কারার চিন্তা করে সে-ই দুরদৃষ্টির অধিকারী এবং আল্লাহর কাছে তাকে অবশষ্যই পছন্দনীয় মানুষ হওয়া উচিত৷ অন্যদিকে যে ব্যক্তি এ মুসাফিরখানায় নিজের সামান্য কয়েক দিনের অবস্থানস্থলকে সুসজ্জিত করার জন্য এমনসব কাজ করে যার ফলে আখেরাতের আসল ঘর তার জন্য বিরাণ হয়ে যায় , তার বুদ্ধি ভ্রষ্ট হয়ে গেছে এবং স্বাভাবিকভাবেই এমন ব্যক্তিকে আল্লাহ পছন্দ করতে পারেন না৷
৫০. কুরআন মজীদে মাত্র দু' জায়গায় তাঁর কথা বলা হয়েছে৷ সূরা আল আন'আমের ৮৬ আয়াতে এবং এ জায়গায় ৷ উভয় জায়াগায় কোন বিস্তারিত আলোচনা করা হয়নি৷ বরং কেবলমাত্র নবীদের কথা বর্ণনা প্রসংগে তাঁর নাম নেয়া হয়েছে৷ তিনি ছিলেন বনী ইসরাঈলের নেতৃস্থানীয় নবীদের একজন ৷ জর্দান নবীর উপকূলে আবেল মেহুলা (Abel Meholen ) এর অধিবাসী ছিলেন৷ ইহুদী ও খৃস্টানরা তাঁকে ইলীশার (Elisha) নামে স্মরণ করে ৷ হযরত ইলিয়াস আলাইহিস সালাম যে সময় সিনাই উপদ্বীপে আশ্রয় নিয়েছিলেন তখন কয়েকটি বিশেষ কাজে তাঁকে সিরিয়ায় ও ফিলিস্তিনে ফিরে যাওয়ার হুকুম দেয়া হয়েছিল৷ এর মধ্যে একটি কাজ ছিল হযরত আল ইয়াসা'কে তার স্থলাভিষিক্ত করার জন্য প্রস্তুত করতে হবে৷ এ হুকুম অনুযায়ী হযরত ইলিয়াস তাঁর জনবসতিতে গিয়ে পৌছুলেন৷ তিনি দেখলেন , বারো জোড়া গরু সামনে নিয়ে হযরত আল ইয়াসা ' জমিতে চাষ দিচ্ছেন এবং তিনি বারোতম জোড়ার সাথে আছেন৷হযরত ইলিয়াস তাঁর পাশ দিয়ে যাবার সময় তাঁর ওপর নিজের চাঁদর নিক্ষেপ করলেন এবং তিনি তৎক্ষণাত ক্ষেতখামার ছেড়ে দিয়ে তাঁর সাথে চলে এলেন৷ (রাজাবলি ১৯: ১৫ - ২১ ) প্রায় দশ বারো বছর তিনি তাঁর প্রশিক্ষণের অধীনে থাকলেন ৷ তারপর আল্লাহ তাঁকে উঠিয়ে নেবার পর তিনি হযরত ইলিয়াসের স্থলে নিযুক্তি লাভ করলেন৷ (২- রাজাবলিঃ ২ ) বাইবেলের ২- রাজাবলি পুস্তকের ২ থেকে ১৩ অধ্যায় পর্যন্ত তাঁর সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে৷ তা থেকে জানা যায় , উত্তর ফিলিস্তিনের ইসরাঈলী সালাতানাত যখন শিরক ও মূর্তি পূজা এবং নৈতিক অপবিত্রতায় ডুবে যেতে থাকলো তখন শেষ পর্যন্ত তিনি নিমশির পৌত্র যিহোশাফটের পুত্র যেহুকে রাজ পরিবারের বিরুদ্ধে দাঁড় করালেন৷ এ রাজ পরিবারের মাধ্যমেই ইসরাঈলে এসব দুষ্কৃতি বিস্তার লাভ করেছিল৷ যেহু কেবল বা' আলপূজাই বন্ধ করলো না বরং এ দুষ্কৃতিকারী পরিবারের প্রত্যেককে হত্যা করলো , একটি শিশুকেও জীবিত ছাড়লো না৷ কিন্তু ইসরাঈলের শিরায় উপশিরায় যে দৃষ্কৃতি অনুপ্রবেশ করেছিল এ সংস্কার বিপ্লব তাকে পুরোপুরি নির্মূল করতে পারলো না৷ হযরত আল আয়াসা 'আর মৃত্যুর পর তার ঝড়ের বেগে অগ্রসর হলো৷ এমনকি এরপর সামোরিয়দের ওপর আসিরীয়রা একের পর এক হামলা শুরু করে দিল৷ (আরো বেশী জানার জন্য দেখুন তাফহীমূল কুরআন , নবী ইসরাঈল , ৭ এবং সাফফাত , ৭০ - ৭১ টীকা ৷)
৫১. হযরত যুল কিফল এর উল্লেখও কুরআনে দু' জায়গায়ই এসেছে৷ সূরা আল আম্বিয়ায় এবং এখানে৷ এ সম্পর্কে আমার অনুসন্ধালব্ধ আলোচনা আমি সূরা আল আম্বিয়াতেই করে এসেছি৷ (দেখুন তাফহীমূল কুরআন , সুরা আল আম্বিয়া , ৮১ টীকা ৷ )
৫৩. সমবয়সী স্ত্রী অর্থ এও হতে পারে যে তারা পরস্পর সমান বয়সের হবে আবার এও হতে পারে যে , তারা নিজেদের স্বামীদের সমান বয়সের হবে৷
৫২. মূলে বলা হয়েছেঃ (আরবী ---------------------) এর কয়েকটি অর্থ হতে পারে৷ এক , এসব জান্নাতে তারা দ্বিধাহীনভাবে ও নিশ্চিন্তে ঘোরাফেরা করবে এবং কোথাও তাদের কোন প্রকার বাধার সম্মুখীন হতে হবে না৷ দুই , জান্নাতের দরোজা খোলার জন্য তাদের কোন প্রচেষ্টা চালাবার দরকার হবে না বরং শুধুমাত্র তাদের মনে ইচ্ছা জাগার সাথে সাথেই তা খুলে যাবে ৷ তিন , জান্নাতের ব্যবস্থাপনায় যেসব ফেরেশতা নিযুক্ত থাকবে তারা জান্নাতের অধিবাসীদেরকে দেখতেই তাদের জন্য দরোজা খুলে দেবে৷ এ তৃতীয় বিষয়বস্তুটি কুরআনের এক জায়গায় বেশী স্পষ্টভাষায় বর্ণনা করা হয়েছে৷

আরবী -------------------------------------------------------------------------

" এমনকি যখন তারা সেখানে পৌঁছুবে এবং তার দরোজা আগে থেকেই খোলা থাকবে , তখন জান্নাতের ব্যবস্থাপকরা তাদেরকে বলবে , ' সালামুন আলাইকুম , শুভ আগমন' চিরকালের জন্য এর মধ্যে প্রবেশ করুন" ৷ (আয যুমার, ৭৩)
৫৪. মূলে (আরবী -----------------) শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে৷ আভিধানিকরা এর কয়েকটি অর্থ বর্ণনা করেছেন৷ এর একটি অর্থ হচ্ছে , শরীর থেকে বের হয়ে আসা রক্ত , পুঁজ ইত্যাদি জাতীয় নোংরা তরল পদার্থ এবং চোখের পানিও এ অন্তরভুক্ত ৷ দ্বিতীয় অর্থ হচ্ছে , অত্যন্ত ও চরম ঠাণ্ডা জিনিস ৷ তৃতীয় অর্থ হচ্ছে , চরম দুর্গন্দযুক্ত পচা জিনিস৷ কিন্তু প্রথম অর্থেই এ শব্দাটির সাধারণ ব্যবহার হয় , যদিও বাকি দু'টি অর্থও আভিধানিক দিক দিয়ে নির্ভুল ৷
৫৫. এখানে এমন মু'মিনদের কথা বলা হয়েছে , যাদেরকে এ কাফেররা দুনিয়ায় খারাপ ভাবতো৷ এর অর্থ হচ্ছে , তারা অবাক হয়ে চারদিকে দেখতে থাকবে৷ ভাবতে থাকবে , এ জাহান্নামে তো আমরা ও আমাদের নেতারা সবাই আছি কিন্তু দুনিয়ায় আমরা যাদের দুর্নাম গাইতাম এবং আল্লাহ , রসূল , আখেরাতের কথা বলার কারণে আমাদের মজলিসে যাদেরকে বিদ্রূপ করা হতো তাদের নাম নিশানাও তো এখানে কোথাও দেখা যাচ্ছে না৷