(৩৮:১৫) এরাও শুধু একটি বিষ্ফোরণের অপেক্ষায় আছে, যার পর আর দ্বিতীয় কোন বিষ্ফোরণ হবে না৷ ১৪
(৩৮:১৬) আর এরা বলে, হে আমাদের রব! হিসেবের দিনের আগেই আমাদের অংশ দ্রুত আমাদের দিয়ে দাও৷ 15
(৩৮:১৭) হে নবী! এরা যে কথা বলে তার ওপর সবর করো ১৬এবং এদের সামনে আমার বান্দা দাউদের কাহিনী বর্ণনা করো, ১৭ যে ছিল বিরাট শক্তিধর, ১৮ প্রত্যেকটি ব্যাপারে ছিল আল্লাহ অভিমুখী৷
(৩৮:১৮) পর্বতমালাকে আমি বিজিত করে রেখেছিলাম তার সাথে, ফলে সকাল সাঁঝে তারা তার সাথে আমার গুণগান, পবিত্রতা ও মহিমা প্রচার করতো৷
(৩৮:১৯) পাখপাখারী সমবেত হতো এবং সবাই তার তাসবীহ অভিমুখী হয়ে যেতো৷১৯
(৩৮:২০) আমি মজবুত করে দিয়েছিলাম তার সালতানাত, তাকে দান করছিলাম হিকমত এবং যোগ্যতা দিয়েছিলাম ফায়সালাকারী কথা বলার৷ ২০
(৩৮:২১) তারপর তোমার কাছে কি পৌঁছছে মামলাকারীদের খবর, যারা দেওয়াল টপকে তার মহলে পৌঁছে গিয়েছিল ? ২১
(৩৮:২২) যখন তারা দাউদের কাছে পৌঁছুলো, তাদেরকে দেখে সে ঘাবড়ে গেলো ২২ তারা বললো, “ভয় পাবেন না, আমরা মামলার দুইপক্ষ৷ আমাদের একপক্ষ অন্য পক্ষের ওপর বাড়াবাড়ি করেছে৷ আপনি আমাদের মধ্যে যথাযথ সত্য সহকারে ফায়সালা করে দিন, বেইনসাফী করবেন না এবং আমাদেরকে সঠিক পথ দেখিয়ে দিন৷
(৩৮:২৩) এ হচ্ছে আমার ভাই, ২৩ এর আছে নিরানব্বইটি দুম্বী এবং আমার মাত্র একটি৷ সে আমাকে বললো, এ একটি দুম্বীও আমাকে দিয়ে দাও এবং কথাবার্তায় সে আমাকে দাবিয়ে নিল৷” ২৪
(৩৮:২৪) দাউদ জবাব দিল, “এ ব্যক্তি নিজের দুম্বীর সাথে তোমার দুম্বী যুক্ত করার দাবী করে অবশ্যই তোমার প্রতি জুলুম করেছে৷ ২৫ আর আসল ব্যাপার হচ্ছে, মিলেমিশে একসাথে বসবাসকারীরা অনেক সময় একে অন্যের প্রতি বাড়াবাড়ি করে থাকে, তবে যারা ঈমান আনে ও সৎকাজ করে একমাত্র তারাই এতে লিপ্ত হয় না এবং এ ধরনের লোক অতি অল্প৷” (একথা বলতে বলতেই) দাউদ বুঝতে পারলো, এ তো আমি আসলে তাকে পরীক্ষা করেছি, কাজেই সে নিজের রবের কাছে ক্ষমা চাইলো, সিজদানত হলো এবং তার দিকে রুজু করলো৷ ২৬
(৩৮:২৫) তখন আমি তার ত্রুটি ক্ষমা করে দিলাম এবং নিশ্চয়ই আমার কাছে তার জন্য রয়েছে নৈকট্যের মর্যাদা ও উত্তম প্রতিদান৷ ২৭
(৩৮:২৬) (আমি তাকে বললাম) “ হে দাউদ! আমি তোমাকে পৃথিবীতে প্রতিনিধি করেছি, কাজেই তুমি জনগণের মধ্যে সত্য সহকারে শাসন কর্তৃত্ব পরিচালনা করো এবং প্রবৃত্তির কামনার অনুসরণ করো না, কারণ তা তোমাকে আল্লাহর পথ থেকে বিপরথগামী করবে৷ যারা আল্লাহর পথ থেকে বিপথগামী হয় অবশ্যই তাদের জন্য রয়েছে কঠোর শাস্তি, যেহেতু তারা বিচার দিবসকে ভুলে গেছে৷” ২৮
১৪. অর্থাৎ আযাবের একটিমাত্র ধাক্কা তাদেরকে খতম করে দেবার জন্য যথেষ্ট হবে, দ্বিতীয় কোন ধাক্কার প্রয়োজন হবে না৷ এ বাক্যের দ্বিতীয় অর্থ হতে পারে , এরপর তারা আর কোন অবকাশ পাবে না ৷ গরুর দুধ দোহন করার সময় এক বাঁট থেকে দুধ টেনে অন্য এক বাঁটে হাত দেবার মাঝখানে প্রথম বাঁটটিতে দুধ নামতে যতটুকু সময় লাগে ততটুকু অবকাশও তারা পাবে না৷
15. অর্থাৎ আল্লাহর আযাবের অবস্থা এইমাত্র বর্ণনা করা হয়েছে এবং অন্যদিকে এ নাদানদের অবস্থা হচ্ছে এই যে, এরা ঠাট্টা করে বলে, তুমি আমাদের যে বিচারদিনের ভয় দেখাচ্ছো তার আসা পর্যন্ত আমাদের ব্যাপারটি মুলতবী করে রেখো না বরং আমাদের হিসেব এখনই চুকিয়ে দাও৷ আমাদের অংশে যা কিছু সর্বনাশ লেখা আছে তা এখনই নিয়ে এসো৷
১৬. ওপরে মক্কার কাফেরদের যেসব কথা বিবৃত হয়েছে এখানে সেদিকে ইংগিত করা হয়েছে৷ অর্থাৎ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্পর্কে তাদের এ প্রলাপোক্তি যে, এ ব্যক্তি যাদুকর ও মিথ্যুক , তাদের এ আপত্তি যে, রসূল নিযুক্ত করার জন্য আল্লাহর কাছে কি কেবলমাত্র এ ব্যক্তিটিই থেকে গিয়েছিল এবং এ দোষারোপ যে, এ তাওহীদের দাওয়াত থেকে এ ব্যক্তির উদ্দেশ্য ধর্মীয় প্রচারণা নয় বরং অন্য কোন দুরভিসন্ধি রয়েছে৷
১৭. এ ব্যাক্যের আর একটি অনুবাদ এও হতে পারে যে , " আমার বান্দা দাউদের কথা স্মরণ করো৷ " প্রথম অনুবাদের দিক দিয়ে অর্থ হচ্ছে , এই যে , এ কাহিনীতে এদের জন্য একটি শিক্ষা রয়েছে৷ আর দ্বিতীয় অনুবাদের দৃষ্টিতে এর অর্থ হচ্ছে , এ কাহিনীর স্মৃতি তোমাদের ধৈর্য ধারণা করতে সাহায্য করবে৷ যেহেতু এ কাহিনী বর্ণনা করার পেছনে উভয় উদ্দেশ্যই রয়েছে তাই এতে এমনসব শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে যেগুলো থেকে উভয়বিধ অর্থ প্রকাশ পায়৷ (হযরত দাউদের ঘটনার ওপর বিস্তারিত আলোচনা এর আগে নিম্নোক্ত স্থানগুলোতে এসে গেছেঃ তাফহীমূল কুরআন , আল বাকারাহ , ২৭৩ ; বনী ইসরাঈল , ৭ ৬৩ ; আলা আম্বিয়া ৭০ - ৭৩ আন নামল ; ১৮-২০ এবং সাবা টীকা সমূহ )
১৮. মূল শব্দাবলী হচ্ছেঃ (আরবী ---------------) " হাতওয়ালা " হাত শব্দটি কেবল আরবী ভাষাতেই নয় অন্যান্য ভাষাতেও শক্তি ও ক্ষমতা অর্থে ব্যবহৃত হয়৷ হযরত দাউদের জন্য যখন তাঁর গুণ হিসেবে বলা হয় তিনি " হাতওয়ালা " ছিলেন তখন অবশ্যই এর অর্থ হবে , তিনি বিপুল শক্তির অধিকারী ছিল৷ জালুতের সাথে সম্মুখ যুদ্ধে তিনি এর প্রকাশ ঘটিয়েছিলেন ৷ সামরিক ও রাজনৈতিক শক্তি৷ এর মাধ্যমে তিনি আশপাশের মুশরিক জাতিরসমূহকে পরাজিত করে একটি শক্তিশালী ইসলামী সালতানাত কায়েম করেছিলেন ৷ নৈতিকশক্তি এর বদৌলতে তিনি শাহী মসনাদে বসেও ফকিরি করে গেছেন সবসময়৷ আল্লাহকে ভয় করেছেন এবং তাঁর নির্ধারিত সীমারেখা মেনে চলেছেন ৷ ইবাদাতের শক্তি৷ এর অবস্থা এই ছিল যে , রাষ্ট্র পরিচালানা শাসন কর্তৃত্ব ও আল্লাহর পথে জিহাদের ব্যস্ততার মধ্যেও বুখারী ও মুসলিমের বর্ণনা অনুযায়ী তিনি হামেশা একদিন পরপর রোজা রেখেছেন এবং প্রতিদিন রাতের এক তৃতীয়াংশ নামাযে অতিবাহিত করতেন৷ ইমাম বুখারী তাঁর ইতিহাস গ্রন্থে হযরত আবু দারদার (রা) বরাত দিয়ে বর্ণনা করেছেন , যখন হযরত দাউদের (আ) কথা আলোচিত হতো , নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলতেন (আরবী ----------------------------) " তিনি ছিলেন সবচেয়ে বেশী ইবাদাতগুযার ব্যক্তি" ৷
১৯. ব্যাখ্যার জন্য দেখুন তাফহীমূল কুরআন , আল আম্বিয়া , ৭১ টীকা ৷
২০. অর্থাৎ তাঁর বক্তব্য জটিল ও অস্পষ্ট হতো না৷ সমগ্র ভাষন শোনা পর শ্রোতা একথা বলতে পারতো না যে তিনি কি বলতে চান তা বোধগম্য নয়৷ বরং তিনি যে বিষয়ে কথা বলতেন তার সমস্ত মূল কথাগুলো পরিস্কার করে তুলে ধরতেন এবং আসল সিদ্ধান্ত প্রত্যাশী বিষয়টি যথাযথভাবে নির্ধারণ করে দিয়ে তার দ্ব্যর্থহীন জবাব দিয়ে দিতেন৷ কোন ব্যক্তি জ্ঞান , বুদ্ধি , প্রজ্ঞা , বিচার - বিবেচনা ও বাকচাতূর্যের উচ্চতম পর্যায়ে অবস্থান না করলে এ যোগ্যতা অর্জন করতে পারে না৷
২১. এখানে হযরত দাউদের কথা যে উদ্দেশ্যে বলা হয়েছে তা আসলে এ কাহিনী শুনানো থেকে শুরু হয়েছে৷ এর আগে তাঁর যে উন্নত গুণাবলীর কথা ভূমিকাস্বরূপ বর্ণনা করা হয়েছে তার উদ্দেশ্য ছিল কেবলমাত্র একথা বলা যে , যাঁর সাথে এ ব্যাপারটি ঘটে গেছে সে দাউদ আলাইহিস সালাম কত বড় মর্যাদার অধিকারী ছিলেন৷
২২. সোজা পথ ব্যবহার না করে হঠাৎ দেয়াল টপকে দেশের শাসনকর্তার মহলের নির্জনকক্ষে দু'জন লোক পৌঁছে গেছে , এটাই ছিল ঘাবড়ে যাওয়ার বা ভয় পাওয়ার কারণ ৷
২৩. ভাই মানে মায়ের পেটের ভাই নয় বরং দীনী এবং জাতীয় ভাই৷
২৪. সামনের আলোচনা ভালোভাবে অনুধাবন করার জন্য একটি কথা অবশ্যই মনে রাখতে হবে৷ অর্থাৎ ফরিয়াদী পক্ষ একথা বলছে না যে , এ ব্যক্তি আমার সে একটি দুম্বীও ছিনিয়ে নিয়েছে এবং নিজের দুম্বীগুলোর মধ্যে তাকে মিশিয়ে দিয়েছে৷ বরং সে বলছে , এ ব্যক্তি আমার কাছে আমার দুম্বী চাইছে এবং কথাবার্তায় আমাকে দাবিয়ে নিয়েছে৷ কারণ সে প্রতাপশালী বিশাল ব্যক্তিত্বের অধিকারী এবং আমি একজন গরীব লোক৷ এর দাবী রদ করার ক্ষমতা আমার নেই৷
২৫. এখানে কারো সন্দেহ করার প্রয়োজন নেই যে , হযরত দাউদ (আ) এক পক্ষের কথা শুনে নিজের সিদ্ধান্ত কেমন করে শুনিয়ে দিলেন৷ আসল কথা হচ্ছে ,বাদীর অভিযোগ শুনে বিবাদী যখন খামুশ হয়ে থাকলো এবং প্রতিবাদে কিছুই বললো না তখন এটি স্বতষ্ফূর্তভাবে তার স্বীকৃতিদানের সমর্থক হয়ে গেলো৷ এ কারণে হযরত দাউদ (আ) স্থির নিশ্চিত হলেন যে , ফরিয়াদী যা বলছে আসল ঘটনাই তাই৷
২৬. এ জায়গায় তেলাওয়াতে সিজদা ওয়াজিব কিনা , এব বিষয়ে মতবিরোধ রয়েছে৷ ইমাম শাফে'ঈ বলেন , এখানে সিজদা ওয়াজিব নয় বরং এ তো একজন নবীর তাওবা ৷ অন্যদিকে ইমাম আবু হানীফা বলেন , ওয়াজিব ৷ এ প্রসংগে মুহাদ্দিসগণ ইবনে আববাস (রা) বলেন , " যেসব আয়াত পাঠ করলে সিজদা ওয়াজিব হয় এটি তার অন্তরভুক্ত নয়৷ কিন্তু আমি এ স্থানে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সিজদা করতে দেখছি৷ " (বুখারী , আবু দাউদ , তিরমিযী , নাসাঈ , মুসনাদে আহমাদ ) সা'দ ইবনে জুবাইর তাঁর কাছ থেকে অন্য যে একটি হাদীস উদ্ধৃত করেছেন তার শব্দাবলী হচ্ছেঃ " সূরা ' সা-দ'-এ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সিজদা করেছেন এবং বলেছেনঃ দাউদ আলাইহিস সালাম তাওবা হিসেবে সিজদা করেছিলেন এবং আমরা শোকরানার সিজদা করি৷ " অর্থাৎ তাঁর তাওবা কবুল হয়েছে এ জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি৷ (নাসাঈ ) তৃতীয় যে হাদীসটি মুজাহিদ তাঁর থেকে বর্ণনা করেছেন তাতে তিনি বলেন , কুরআন মজীদে মহান আল্লাহ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে হুকুম দিয়েছেন ,

আরবী -----------------------------------------------------------------------------

" এরা ছিলেন এমনসব লোক যাদেরকে আল্লাহ সঠিক পথ দেখিয়েছিলেন ৷ কাজেই তুমি এদের পথ অনুসরণ করো ৷"

এখন যেহেতু হযরত দাউদও একজন নবী ছিলেন এবং তিনি এ স্থানে সিজদা করেছিলেন , তাই রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও তাঁকে অনুসরণ করে এ স্থানে সিজদা করেছেন৷ (বুখারী ) এ তিনটি বর্ণনা হচ্ছে হযরত ইবনে আব্বাসের ৷ আর হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রা) বর্ণনা করেছেন , নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একবার খুতবার মধ্যে সূরা সা-দ পড়েন এবং এ আয়াতে এসে পৌঁছলে মিম্বার থেকে নিচে নেমে এসে সিজদা করেন এবং তাঁর সাথে সাথে সমবেত সবাইও সিজদা করে ৷ তারপর দ্বিতীয় আর একবার অনুরূপভাবে তিনি এ সূরাটি পড়েন এবং এ আয়াতটি শুনার সাথে সাথে লোকেরা সিজদা করতে উদ্যত হয়৷ তখন নবী সরীম (সা) বলেন , " এটি একজন নবীর তাওবা কিন্তু আমি দেখছি তোমরা সিজদা করতে প্রস্তুত হয়ে গেছো " ---- একথা বলে তিনি মিম্বার থেকে নেমে আসেন এবং সিজদা করেন৷ সমবেত সবাই ও সিজদা করে ৷ (আবু দাউদ ) এসব হাদীস থেকে যদি ও সিজদা ওয়াজিব হবার চূড়ান্ত ও অভ্রান্ত প্রমাণ পাওয়া যায় না তবুও এতটুকু কথা অবশ্যই প্রামণিত হয় যে , এ স্থানে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অধিকাংশ সময় সিজদা করেছেন এবং সিজদা না করার তুলনায় এখানে সিজদা করাটা অবশ্যই উত্তম ৷ বরং ইবনে আব্বাসের (রা) তৃতীয় যে বর্ণনাটি আমরা ইমাম বুখারীর বরাত দিয়ে উদ্ধৃত করেছি সেটি ওয়াজিব না হওয়ার তুলনায় ওয়াজিব হওয়ার পাল্লার দিকটি ঝুঁকিয়ে দেয়৷

এ আয়াতটি থেকে যে আর একটি বিষয়বস্তু বের হয়ে আসে সেটি হচ্ছেঃ আল্লাহ এখানে (আরবী -------------------) (রুকূ ' তে অবনত হয় ) শব্দ ব্যবহার করেছেন৷ কিন্তু সকল মুফাসসির এ ব্যাপারে একমত হয়েছেন যে , এর অর্থ (আরবী ---------------) (সিজদায় অবনত হয়৷ ) ৷ এ কারণে ইমাম আবু হানীফা (র) ও তাঁর সহযোগীগণ এমত পোষণ করেছেন যে , নামাযে বা নামায ছাড়া অন্য অবস্থায় সিজদায় আয়াত শুনে বা পড়ে সিজদা না করে কোন ব্যক্তি শুধুমাত্র রুকূ ' ও করতে পারে৷ কারণ আল্লাহ নিজেই যখন রুকূ' শব্দ বলে সিজদা অর্থ নিয়েছেন তখন জানা গেলো রুকূ ' সিজদার স্থলাভিষিক্ত হতে পারে৷ শাফেঈ ফকীহগণের মধ্যে ইমাম খাত্তাবীও এ মত পোষণ করেন৷ এ অভিমতটি একটি অভিমত হিসেবে নির্ভুল ও যুক্তিযুক্ত সন্দেহ নেই কিন্তু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং সাহাবায়ে কেরামের কার্যক্রমের মধ্যে আমরা এর কোন নজির দেখি না যে , সিজাদার আয়াত শুনে বা পড়ে সিজদা করার পরিবর্তে তাঁরা রুকূ' করাকেই যথেষ্ট মনে করেছেন৷ কাজেই এ অভিমত কার্যত বাস্তবায়িত একমাত্র তখনই করা উচিত যখন সিজাদ করার ক্ষেত্রে কোন প্রতিবন্ধকতা থাকবে৷ নিয়মিতভাবে এ রকম করা করা সঠিক হবে না৷ নিয়মিত এ রকম করা ইমাম আবু হানীফা ও তাঁর সহযোগীদের উদ্দেশ্যও নয়৷ বরং তাঁরা কেবলমাত্র এর বৈধতার প্রবক্তা৷
২৭. এ থেকে জানা যায়, হযরত দাউদের (আ )ত্রুটি তো অবশ্যই হয়েছিল এবং সেঠি এমন ধরনের ত্রুটি ছিল যার সাথে দুম্বীর মামলার এক ধরনের সাঞ্জস্য ছিল৷ তাই তার ফায়সালা শুনাতে গিয়ে সংগে সংগেই তাঁর মনে চিন্তা জাগে, এর মাধ্যমে আমার পরীক্ষা হচ্ছে৷ কিন্তু এ ত্রুটি এমন মারাত্মক ধরনের ছিল না যা ক্ষমা করা যেতো না অথবা ক্ষমা করা হলেও তাঁকে উন্নত মর্যাদা থেকে দেয়া হতো ৷ আল্লাহ নিজেই এখানে সুম্পষ্ট ভাষায় বলছেন, যখন তিনি সিজদায় পড়ে তাওবা করেন তখন তাঁকে কেবল ক্ষমাই করে দেয়া হয়নি বরং দুনিয়া ও আখোরাতে তিনি যে উন্নত মর্যাদার অধিষ্ঠিত ছিলেন তাতেও ফারাক দেখা দেয়নি৷
২৮. তাওবা কবুল করার ও মর্যাদা বৃদ্ধির সুসংবাদ দেবার সাথে সাথে মহান আল্লাহ সে সময় হযরত দাউদকে (আ ) এ সতর্কবাণী শুনিয়ে দেন৷ এ থেকে একথা আপনা আপনি প্রকাশ হয়ে যায় যে, তিনি যে কাজটি করেছিলেন তাতে প্রবৃত্তির কামনার কিছু দখল ছিল, শাসন ক্ষমতার অসংগত ব্যবহারের সাথেও তার কিছু সম্পর্ক ছিল এবং তা এমন কোন কাজ ছিল যা কোন ন্যায়নিষ্ঠ শাসকের জন্য শোভণীয় ছিল না৷

এখানে এসে আমাদের সামনে তিনটি প্রশ্ন দেখা দেয় ৷ এক , সেটি কি কাজ ছিল ? দুই , আল্লাহ পরিষ্কাভাবে সেটি না বলে এভাবে অন্তরালে রেখে সেদিকে ইংগিত করছেন কেন ? তিন, এ প্রেক্ষাপটে তার উল্লেখ করা হয়েছে কোন সম্পর্কের ভিত্তিতে? যারা বাইবেল (খৃষ্টান ও ইহুদীদের পবিত্র গ্রন্থ) অধ্যয়ন করেছেন তাঁদের কাছে একথা গোপন নেই যে ,এ গ্রন্থ হযরত উদাদের বিরুদ্ধে হিত্তীয় উরিয়ার (Uriah the Hittite) স্ত্রীর সাথে যিনা করার এবং তারপর উরিয়াকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করে তার স্ত্রীকে বিয়ে করার পরিষ্কার অভিযোগ আনা হয়েছে৷ আবার এই সংগে একথাও বলা হয়েছে যে , এ মেয়েটি যে এক ব্যক্তির স্ত্রী হওয়া সত্ত্বেও নিজেকে হযরত উদাদের হাওয়ালা করে দিয়েছিল সে- ই ছিল হযরত সুলাইমান আলাইহিস সালামের মা৷ এ সম্পর্কিত পুরো কাহিনীটি বাইবেলের শামুয়েল- ২ পুস্তয়েল ১১ - ২২ অধ্যায়ে অত্যন্ত বিস্তারিতভাবে উদ্ধৃত হয়েছে৷ কুরআন নাযিল হবার শত শত বছর পূর্বে এগুলো বাইবেলে সন্নিবেশিত হয়েছিল৷ সারা দুনিয়ার ইহদী ও খৃষ্টানদের মধ্য থেকে যে ব্যক্তিই তাদের এ পবিত্র কিতাব পাঠ করতো অথবা এর পাঠ শুনতো সেই এ কাহিনীটি কেবল জানতোই না বরং এটি বিশ্বাসও করতো৷ তাদেরই মাধ্যমে দুনিয়ার এ কাহিনীটি চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে এবং আজ অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌছে গেছে যে , পাশ্চাত্য দেশগুলোতে বনী ইসরাঈল ও ইহুদী ধর্মের ইতিহাস সম্পর্কিত এমন কোন একটি বইও লিখিত হয় না যেখানে হযরত ইহুদীদের বিরুদ্ধে এই দোষারোপের পুনরাবৃত্তি করা হয়না৷ এ বহুল প্রচলিত কাহিনীতে একথাও লিখিত হয়েছেঃ

"পরে সদাপ্রভু দাউদের নিকটে নাথনকে প্রেরণ করিলেন৷ আর তিনি তাঁহার নিকটে আসিয়া তাঁহাকে কহিলেন, --এক নগরে দুইটি লোক ছিল; তাহাদের মধ্যে একজন ধনবান , আর একজন দরিদ্র ৷ ধনবানের অতি বিস্তর মেষাদি পাল ও গোপাল ছিল৷ কিন্তু সেই দরিদ্রের আর কিছুই ছিলনা, কেবল একটি ক্ষুদ্র মেষবৎসা ছিল , সে তাহাকে বাড়িয়া উঠিতেছিল; সে তাহারই খাদ্য খাইত ও তাহারই পাত্রে পান করিত , আর তাহার বক্ষস্থলে শয়ন করিত ও তাহার কন্যার মত ছিল৷ পরে ঐ ধনবানের গৃহে একজন পথিক আসিল, তাহাতে বাটিতে আগত অতিথির জন্য পান করণার্থে সে আপন মেষাদি পাল ও গোপাল হতে কিছু লইতে কাতর হইল, কিন্তু সেই দরিদ্রের মেষবৎসাটি লইয়া, যে অতিথি আসিয়াছিল, তাহার জন্য তাহাই পাক করিল৷ তাহাতে দাউদ সেই ধনবানের প্রতি অতিশয় ক্রোধে প্রজ্জলিত হইয়া উঠিলেন তিনি নাথনকে কহিলেন, জীবন্ত সদাপ্রভুর দিব্য, যে ব্যক্তি সেই কর্ম করিয়াছে, সে মৃত্যুর সন্তান ; সে কিছু দয়া না করিয়া এ কর্ম্ম করিয়াছে, এই জন্য সেই মেষ বৎসার চর্তুগুণ ফিরাইয়া দিবে৷

তখন নাথন দাউদকে কহিলেন , আপনিই সেই ব্যক্তি৷ ইস্রায়েলের ঈশ্বরম সদাপ্রভূ এই কথা কহেন, আমি তোমাকে ইস্রায়েলের উপরে রাজপদে অভিষেক করিয়াছি এবং শৌলের হস্ত হইতে উদ্বার করিয়াছি , আর তোমার প্রভূর বাটী তোমাকে দিয়াছি ও তোমার প্রভূর স্ত্রীগণকে তোমার বক্ষস্থলে দিয়াছি এবং ইস্রায়েলের ও জিহ্‌দার কুল তোমাকে দিয়াছি; আর তাহা যদি অল্প হইত, তবে তোমাকে আরও অমুক অমুক বস্তু দিতাম৷ তুমি কেন সদাপ্রভূর বাক্য তুচ্ছ করিয়া , তাঁহার দৃষ্টিতে যাহা মন্দ তাহাই করিয়াছ? তুমি হিত্তীয় উরিয়কে খড়গ দ্বারা আঘাত করাইয়াছ ও তাহার স্ত্রীকে লইয়া আপনার স্ত্রী করিয়াছ, আম্মোন-সন্তানদের খড়গ দ্বারা উরিয়াকে মারিয়া ফেলিয়াছ৷" (২-শমুয়েল ১২: ১-৯)

এই কাহিনী এবং এর বহুল প্রচারের উপস্থিতিতে কুরআন মজীদে এ সর্ম্পকে কোন বিস্তারিত বর্ণনা দেবার প্রয়োজন ছিল না ৷ এধরনের বিষয়গুলোকে আল্লাহর কিতাবে বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করাও আল্লাহর রীতি নয়৷ তাই এখানে পরদার অন্তরালে রেখে এদিকে ইংগিতও করা হয়েছে এবং এ সংগে একথাও জানিয়ে দেয়া হয়েছে যে, আসল ঘটনা কি ছিল এবং কিতাবধারীরা তাকে কিভাবে ভিন্নরূপ দিয়েছে৷ কুরআন মজীদের উপরোল্লিখিত বর্ণনা থেকে যে আসল ঘটনা পরিষ্কারভাবে বুঝা যায় তা হচ্ছে এইঃ হযরত দাউদ আলাইহিস সাল্লাম উরিয়ার (অথবা এ ব্যক্তির যে নাম থেকে থাকুক ) কাছে নিছক নিজের মনের এ আকাংখা পেশ করেছিলেন যে, সে যেন নিজের স্ত্রীকে তালাক দিয়ে দেয় ৷ আর যেহেতু এ আকাংখা একজন সাধারণ মানুষের পক্ষ থেকে পেশ করা হয়নি বরং একজন মহাপরাক্রমশালী শাসক এবং জবরদস্ত দীনী গৌবর ও মাহাত্মের অধিকারী ব্যক্তিত্বের পক্ষ থেকে প্রজামন্ডলীর একজন সদস্যের সামনে প্রকাশ করা হচ্ছিল, তাই এ ব্যক্তি কোন প্রকার বাহ্যিক বল প্রয়োগ ছাড়াই তা গ্রহণ করে নেবার ব্যাপারে নিজেকে বাধ্য অনুভব করছিল ৷ এ অবস্থায় হযরত দাউদের (আ) আহবানে সাড়া দেবার জন্য তার উদ্যোগ নেবার পূর্বেই জাতির দু'জন সৎলোক অকস্মাৎ হযরত দাউদের কাছে পৌছে গেলেন এবং একটি কাল্পনিক মামলার আকারে এ বিষয়টি তাঁর সামনে পেশ করলেন৷ প্রথমে হযরত দাউদ (আ) মনে করেছিলেন এটি যথাযথই তাঁর সামনে পেশকৃত একটি মামলা৷ কাজেই মামলাটির বিবরণ শুনে তিনি নিজের ফায়সালা শুনিয়ে দিলেন৷ কিন্তু মুখ থেকে ফায়সালার শব্দগুলো বের হবার সাথে সাথেই তাঁর বিবেক তাঁকে সতর্ক করে দিল যে , এট একটি রূপক আকারে তাঁর ও ঐ ব্যক্তির বিষয়ের সাথে মিলে যায় এবং যে কাজটিকে তিনি জুলুম গণ্য করছেন তাঁর ও ঐ ব্যক্তির বিষয়ে তার প্রকাশ ঘটছে৷ এ অনুভূতি মনের মধ্যে সৃষ্টি হবার সাথে সাথেই তিনি আল্লাহর দরবারে সিজদা ও তাওবা করলেন এবং নিজের ঐ কাজটি থেকেও বিরত হলেন৷

বাইবেলে এ ঘটনাটি এহেন কলংকিতরূপে চিত্রিত হলো কেমন করে ? সামান্য চিন্তা ভাবনা করলে একথাটিও বুঝতে পারা যায়৷ মনে হয় , কোন উপায়ে হযরত দাউদ (আ) ঐ ভদ্রমহিলার গুণাবলী জানতে পেরেছিলেন ৷ তাঁর মনে আকাংখা জেগেছিল , এ ধরনের যোগ্যতাসম্পন্না মহিলার পক্ষে একজন সাধারণ অফিসারের স্ত্রী হয়ে থাকার পরিবর্তে রাজরানী হওয়া উচিত৷ এ চিন্তার বশবর্তী হয়ে তিনি তার স্বামীর কাছে এ ইচ্ছা প্রকাশ করেন যে , সে যেন তাকে তালাক দিয়ে দেয়৷ বনী ইসরাঈলী সমাজে এটা কোন নিন্দনীয় বিষয় ছিল না বলেই তিনি এতে কোন প্রকার অনিষ্টকারিতা অনুভব করেননি৷ তাদের সমাজে এটা অত্যন্ত মামুলি ব্যাপার ছিল যে , একজন অন্য একজনের স্ত্রীকে পছন্দ করলে নিসংকোচে তার কাছে আবেদন করতো তোমার স্ত্রীকে আমার জন্য ছেড়ে দাও৷ এ ধরনের আবেদনে কারো মনে খারাপ প্রতিক্রিয়া হতো না৷ বরং অনেক সময় এক বন্ধু অন্য বন্ধুকে খুশী করার জন্য নিজের স্ত্রীকে তালাক দিয়ে দিতো৷ যাতে সে তাকে বিয়ে করতে পারে৷ কিন্তু একথা বলতে গিয়ে হযরত দাউদের মনে এ অনুভূতি জাগেনি যে , একজন সাধারণ লোকের পক্ষ থেকে এ ধরনের ইচ্ছা প্রকাশ করা জুলুম ও বলপ্রয়োগের রূপধারণ না করতে পারে তবে একজন শাসকের পক্ষ থেকে যখন এ ধরনের ইচ্ছা প্রকাশ করা হয় তখন তা বলপ্রয়োগমুক্ত হতে পারে না৷ উল্লেখিত রূপক মোকদ্দমার মাধ্যমে যখন এ দিকে তাঁর দৃষ্টি করা হলো তখন নির্দ্বিধায় তিনি নিজের ইচ্ছা ত্যাগ করলেন ৷ এভাবে একটি কথার উদ্ভব হয়েছিল এবং তা খতমও হয়ে গিয়েছিল৷

কিন্তু পরে কোন এক সময় যখন তাঁর কোন ইচ্ছা ও প্রচেষ্টা ছাড়াই ঐ ভদ্রমহিলার স্বামী এক যুদ্ধে শহীদ হয়ে গেলো এবং হযরত দাউদ (আ) তাকে বিয়ে করে নিলেন তখন ইহুদীদের দুষ্ট মানসিকতা কল্পকাহিনী রচনায় প্রবৃত্ত হলো৷ আর বনী ইসরাঈলীদের একটি দল যখন হযরত সুলাইমানের শত্রু হয়ে গেলো তখন তাদের এ দুষ্ট মানসিকতা দ্রুত কাজ শুরু করে দিল৷ (দেখুন তাফহীমূল কুরআন , সূরা আন নামল , ৫৬ টীকা ) এসব উদ্যোগ ও ঘটনাবলীর প্রভাবাধীনে এ কাহিনী রচনা করা হলো যে , হযরত দাউদ (আ) নাউযুবিল্লাহ তাঁর প্রাসাদের ছাদের ওপর উরিয়ার স্ত্রীকে এমন অবস্থায় দেখে নিয়েছিলেন যখন তিনি উলংগ হয়ে গোসল করছিলেন৷ তিনি তাকে নিজের মহলে ডেকে এনে তার সাথে যিনা করলেন৷ এতে তিনি গর্ভবতী হয়ে পড়লেন৷ তারপর তিনি ব্‌নী আম্মোন এর মোকাবিলায় উরিয়াকে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠিয়ে দিলেন এবং সেনাপতি যোয়াবকে হুকুম দিলেন তাকে যুদ্ধক্ষেত্রে এমন এক জায়গায় নিযুক্ত করতে যেখানে সে নিশ্চিতভাবে নিহত হবে৷ তারপর যখন সে মারা গেলো , তিনি তার স্ত্রীকে বিয়ে করে নিলেন৷ এ মহিলার গর্ভে সুলাইমানের (আলাইহিস সালাম ) জন্ম হলো৷ এসব মিথ্যা অপবাদ জালেমরা তাদের পবিত্র গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করেছে৷ এভাবে বংশ পরস্পরায় এর পাঠের ব্যবস্থা করেছে৷ তারা এসব পড়তে থাকবে এবং নিজেদের দু'জন শ্রেষ্ঠতম ও মহত্তম ব্যক্তিকে লাঞ্ছিত করতে থাকবে৷ হযরত মূসার (আ) পরে এঁরা দু'জনই ছিলেন তাদের সবচেয়ে বড় পথপ্রদর্শক৷

কুরআন ব্যাখ্যাতাগণের একটি দল তো নবী ইসরাঈলের পক্ষ থেকে তাঁদের কাছে এ সম্পর্কিত যেসব কিসসা কাহিনী এসে পৌঁছেছে সেগুলো হুবুহু গ্রহণ করে নিয়েছেন৷ ইসরাঈলী বর্ণনার মধ্য থেকে কেবলমাত্র যে অংশটুকুতে হযরত দাউদের বিরুদ্ধে যিনার অপবাদ দেয়া হয়েছিল এবং যেখানে ভদ্রমহিলার গর্ভবর্তী হয়ে যাবার উল্লেখ ছিল সে অংশটুকু তাঁরা প্রত্যাখ্যান করেছেন৷

তাঁদের উদ্ধৃত বাদবাকি সমস্ত কাহিনী বনী ইসরাঈলের সমাজে যেভাবে প্রসিদ্ধি লাভ করেছিল ঠিক সেভাবেই তাঁদের রচনায় পাওয়া যায়৷ দ্বিতীয় দলটি দম্বীর মোকদ্দমার সাথে সামঞ্জস্য রাখে হযরত দাউদের এমন কোন কর্মতৎপরতার কথা সরাসরি অস্বীকার করেছেন৷ এর পরিবর্তে তাঁরা নিজেদের পক্ষ থেকে এ কাহিনীর এমন সব ব্যাখ্যা দেন যা একেবারেই ভিত্তিহীন, যেগুলোর কোন উৎস নেই এবং কুরআনের পূর্বাপর আলোচ্য বিষয়ের সাথেও যার কোন সম্পর্ক নেই৷ কিন্তু মুফাস্‌সিরদের মধ্যে আবার এমন একটি দলও আছে যারা সঠিক তত্ত্ব পেয়ে গেছেন এবং কুরআনের সুস্পষ্ট ইংগিতগুলো থেকে আসল সত্যটির সন্ধান লাভ করেছেন ৷ দৃষ্টান্ত স্বরূপ কতিপয় উক্তি অনুধাবন করুনঃ

মাসরূক ও সাঈদ ইবনে জুবাইর উভয়েই হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বসের (রা) এ উক্তি উদ্বৃত করেছেন যে, "হযরত দাউদ (আ) সে ভদ্র মহিলার স্বামীর কাছে এ ইচ্ছা প্রকাশ করার চাইতে বেশী কিছু করেননি যে , তোমার স্ত্রীকে আমার জন্য ছেড়ে দাও ৷"(ইবনে জারীর )

আল্লামা যামাখশারী তাঁর কাশ্‌শাফ তাফসীর গ্রন্থে লিখেছেনঃ "আল্লাহ হযরত দাউদ আলাইহিস সালামের কাহিনীটি যে আকারে বর্ণনা করেছেন তা থেকে তো একথাই প্রকাশিত হয় যে , তিনি ঐ ব্যক্তির কাছে কেবলমাত্র এ ইচ্ছা ব্যক্ত করেছিলেন যে, সে তাঁর জন্য যেন তার স্ত্রীকে ত্যাগ করে ৷"

আল্লামা আবূ বকর জাসসাস এ অভিমত ব্যক্ত করেছেন যে, ঐ ভদ্র মহিলা ঐ ব্যক্তির বিবাহিত স্ত্রী ছিল না বরং ছিল কেবলমাত্র তার বাগদত্তা বা তার সাথে তার বিয়ের কথাবার্তা চলছিল ৷ হযরত দাউদ সে ভদ্র মহিলাকে বিয়ের পয়গাম দিলেন৷ এর ফলে আল্লাহর ক্রোধ বর্ষিত হলো৷ কারণ , তিনি তাঁর মু'মিন ভাইয়ের পয়গামের ওপর পয়গাম দিয়েছিলেন৷ অথচ তাঁর গৃহে পূর্ব থেকেই কয়েকজন স্ত্রী ছিল৷ (আহকামূল কুরাআন অন্য কয়েকজন মুফাসসিরও এ অভিমত প্রকাশ করেছেন৷ কিন্তু একথাটি কুরআনের বর্ণনার সাথে পুরোপুরি সামঞ্জস্য রাখে না৷ কুরাআন মজীদে মোকাদ্দমা পেশকারীর মুখ নিসৃত শব্দাবলী হচেছঃ

আরবী -----------------------------------------------------------------------------

" আমার কাছে একটি মাত্র দুম্বী আছে এবং এ ব্যক্তি বলছে , ওটি আমাকে দিয়ে দাও৷ " একথাই হযরত দাউদ (আ) তাঁর ফায়সালায়ও বলেছেনঃ

আরবী ----------------------------------------------------------------------------

" তোমার দুম্বী চেয়ে সে তোমার প্রতি জুলুম করেছে ৷ " এ রূপকটি হযরত দাউদ ও উরিয়ার কাহিনীর সাথে তখনই খাপ খেতে পারে যখন ঐ ভদ্র মহিলা হবে তার স্ত্রী৷ একজনের বিয়ের পয়গামের ওপর যদি অন্য জনের পয়গাম দেবার ব্যাপার হতো তাহলে রূপকটি এভাবে বলা হতোঃ " আমি একটি দুম্বী নিতে চাইছিলাম কিন্তু সে বললো , ওটিও আমার জন্য ছেড়ে দাও৷ "

কাযী আবু বকর ইবনুল আরাবী এ বিষয়টি সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা প্রসংগে লিখেছেনঃ " আসল ঘটনা মাত্র এতটুকুই যে , হযরত দাউদ (আ) তাঁর নিজের লোকদের মধ্য থেকে একজনকে বলেন , তোমার স্ত্রীকে আমার জন্য ছেড়ে দাও এবং গুরুত্ব সহকারে এ দাবী করেন৷ ........................... কুরআন মজীদে একথা বলা হয়নি যে , তাঁর দাবীর কারণে সে ব্যক্তি তার স্ত্রীকে ত্যাগ করে , হযরত দাউদ তারপর সে মহিলাকে বিয়ে করেন এবং তারই গর্ভে হযরত সুলাইমানের জন্ম হয়৷ ......................... সে কথার জন্য ক্রোধ নাযিল হয় সেটি এ ছাড়া আর কিছুই ছিল না যে , তিনি এক মহিলার স্বামীর কাছে এ অভিলাস ব্যক্ত করেন যে , সে যেন তার স্ত্রীকে তাঁর জন্য ছেড়ে দেয়৷ ............ এ কাজটি সামগ্রিকভাবে কোন বৈধ কাজ হলেও নবুওয়াতে মর্যাদা থেকে এটি ছিল অনেক নিম্নতর ব্যাপার৷ এ জন্যই তাঁর ওপর আল্লাহর ক্রোধ নাযিল হয় এবং তাঁকে উপদেশও দেয়া হয়৷ "

এখানে যে প্রেক্ষাপটে এ কাহিনী বর্ণনা করা হয়েছে তার সাথে এ তাফসীরটিই খাপ খেয়ে যায়৷ বক্তব্য পরস্পরা সম্পর্কে চিন্তা - ভাবনা করলে একথা পরিস্কার জানা যায় যে , কুরআন মজীদের এ স্থানে এ ঘটনাটি দু'টি উদ্দেশ্যে বর্ণনা করা হয়েছে প্রথম উদ্দেশ্যটি হচ্ছে , নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সবর করার উপদেশ দেয়া এবং এ উদ্দেশ্যে তাঁকে সম্বোধন করে বলা হয়েছেঃ " এরা তোমার বিরুদ্ধে যা কিছু বলে সে ব্যাপারে সবর করো এবং আমার বান্দা দাউদের কথা স্মরণ করো৷ " অর্থাৎ তোমাকে শুধুমাত্র যাদুকর ও মিথ্যুক বলা হচ্ছে কিন্তু আমার বান্দা দাউদকে তো জালেমরা ব্যভিচার ও হত্যার ষড়যন্ত্র করার অপবাদ পর্যন্ত দিয়েছিল৷ কাজেই এদের কাছ থেকে তোমার যা কিছু শুনতে হয় তা বরদাশত করতে থাকো ৷

দ্বিতীয় উদ্দেশ্যটি হচ্ছে কাফেরদেরকে একথা জানিয়ে দেয়া যে , তোমরা সব রকমের হিসেব নিকেশের শংকামুক্ত হয়ে দুনিয়ায় নানা ধরনের বাড়াবাড়ি করে যেতে থাকো কিন্তু যে আল্লাহর সার্বভৌম কর্তৃত্বের অধীনে তোমরা এসব কাজ করছো তিনি কাউকে ও হিসেব নিকেশ না নিয়ে ছাড়েন না৷ এমনকি যেসব বান্দা তাঁর অত্যন্ত প্রিয় ও ও নৈকট্য লাভকারী হয় তাঁরাও যদি কখনো সামান্যতম ভুল ভ্রান্তি করে বসেন তাহলে বিশ্ব জাহানের সর্বময় কর্তৃত্বের অধিকারী আল্লাহ তাঁদেরকেও কঠিন জবাবদিহির সম্মুখীন করেন৷ এ উদ্দেশ্যে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলা হয়েছে , তাদের সামনে আমার বান্দা দাউদের কাহিনী বর্ণনা করো , যিনি ছিলেন বিচিত্র গুণধর ব্যক্তিত্বের অধিকারী কিন্তু যখন তাঁর দ্বারা একটি অসংগত কাজ সংঘটিত হলো তখন দেখো কিভাবে আমি তাকে তিরস্কার করেছি৷

এ সম্পর্কে আর একটি ভুল ধারণা ও থেকে যায় ৷ এটি দূর করাও জরুরী ৷ রূপকের মাধ্যমে মোকাদ্দমা পেশকারী বলছে , এ ব্যক্তির ৯৯ টি দুম্বী আছে এবং আমার আছে মাত্র একটি দুম্বী আর সেটিই এ ব্যক্তি চাচ্ছে ৷ এ থেকে বাহ্যত এ ধারণা হতে পারে যে , সম্ভবত হযরত দাউরের ৯৯ জন স্ত্রী ছিলেন এবং তিনি আর একজন মহিলাকে বিয়ে করে স্ত্রীদের সংখ্যা একশত পূর্ণ করে চাচ্ছিলেন ৷ কিন্তু আসলে রূপকের প্রত্যেকটি অংশের সাথে হযরত দাউদ ও হিত্তীয় প্রবাদে দশ , বিশ , পঞ্চাশ ইত্যাদি সংখ্যাগুলোর উল্লেখ কেবলমাত্র আধিক্য প্রকাশ করার জন্যই করা হয়ে থাকে সঠিক সংখ্যা উল্লেখ করার জন্য এগুলো বলা হয় না৷ আমরা যখন কাউকে বলি , দশবার তোমাকে বলেছি তবু তুমি আমার কোথায় কান দাওনি তখন এর মানে এ হয় না যে , গুণে গুণে দশবার বলা হয়েছে বরং এর অর্থ হয় , বারবার বলা হয়েছে ৷ এমনি ধরনের ব্যাপার এখানে ঘটেছে৷ রূপকের আকারে পেশকৃত মোকদ্দমার মাধ্যমে সে ব্যক্তি হয়রত দাউদের মধ্যে এ অনুভূতি সৃষ্টি করতে চাচ্ছিলেন যে , আপনার তো কয়েকজন স্ত্রী আছেন এবং তারপরও আপনি অন্য ব্যক্তির স্ত্রীকে বিয়ে করতে চাচ্ছেন ৷ একথাটিই মুফাসসির নিশাপুরী হযরত হাসান বসরী (র) থেকে উদ্ধৃত করেছেন৷ তিনি বলেছেনঃ

আরবী ----------------------------------------------------------------------------

" হযরত দাউদের ৯৯ টি স্ত্রী ছিল না বরং এটি নিছক একটি রূপক "

(এ কাহিনী সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেছি আমার তাফহীমাত গ্রন্থের দ্বিতীয় খন্ডে ৷ আমি এখানে যে ব্যাখ্যার প্রাধান্য দিয়েছি তার সপক্ষে বিস্তারিত দলিল প্রমাণ যারা জানতে চান তারা উক্ত গ্রন্থের ২৯ থেকে ৪৪ পৃষ্ঠা পর্যন্ত পড়ুন৷ )