(৩৭:১৩৯) আর অবশ্যই ইউনুস রসূলদের একজন ছিল৷৭৭
(৩৭:১৪০) স্মরণ করো যখন সে একটি বোঝাই নৌকার দিকে পালিয়ে গেলো, ৭৮
(৩৭:১৪১) তারপর লটারীতে অংশগ্রহণ করলো, এবং তাতে হেরে গেলো৷
(৩৭:১৪২) শেষ পর্যন্ত মাছ তাকে গিলে ফেললা এবং সে ছিল ধিকৃত৷ ৭৯
(৩৭:১৪৩) এখন যদি সে তাস্‌বীহকারীদের অন্তরভুক্ত না হতো, ৮০
(৩৭:১৪৪) তাহলে কিয়ামতের দিন পর্যন্ত এ মাছের পেটে থাকতো৷ ৮১
(৩৭:১৪৫) শেষ পর্যন্ত আমি তাকে বড়ই রুগ্ন অবস্থায় একটি তৃণলতাহীণ বিরান প্রান্তরে নিক্ষেপ করলাম ৮২
(৩৭:১৪৬) এবং তার ওপর একটি লতানো গাছ উৎপন্ন করলাম৷ ৮৩
(৩৭:১৪৭) এরপর আমি তাকে এক লাখ বা এরচেয়ে বেশী লোকাদের কাছে পাঠালাম৷ ৮৪
(৩৭:১৪৮) তারা ঈমান আনলো এবং আমি একটি বিশেষ সময় পর্যন্ত তাদেরকে টিকিয়ে রাখলাম৷ ৮৫
(৩৭:১৪৯) তারপর তাদেরকে একটু জিজ্ঞেস করো, ৮৬ (তাদের মন কি একথায় সায় দেয় যে,) তোমাদের রবের জন্য তো হচ্ছে কন্যারা এবং তাদের জন্য পুত্ররা? ৮৭
(৩৭:১৫০) সত্যই কি আমি ফেরেশ্‌তাদেরকে মেয়ে হিসেবে সৃষ্টি করেছি এবং তারা স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করে একথা বলছে ?
(৩৭:১৫১) ভালো করেই শুনে রাখো, আসলে তারা তো মনগড়া কথা বলে যে,
(৩৭:১৫২) আল্লাহর সন্তান আছে এবং যথার্থই তারা মিথ্যাবাদী৷
(৩৭:১৫৩) আল্লাহ কি নিজের জন্য পুত্রের পরিবর্তে কন্যা পছন্দ করেছেন?
(৩৭:১৫৪) তোমাদের কি হয়ে গেছে, কিভাবে ফায়সালা করছো?
(৩৭:১৫৫) তোমরা কি সচেতন হবে না ?
(৩৭:১৫৬) অথবা তোমাদের কাছে তোমাদের এসব কথার স্বপক্ষে কোন পরিষ্কা প্রমাণপত্র আছে ?
(৩৭:১৫৭) তাহলে আনো তোমাদের সে কিতাব, যদি তোমরা সত্যবাদী হও৷ ৮৮
(৩৭:১৫৮) তারা আল্লাহ ও ফেরেশ্‌তাদের ৮৯ মধ্যে আত্মীয় সম্পর্ক স্থাপন করে রেখেছে৷ অথচ ফেরেশ্‌তারা ভালো করেই জানে তাদেরকে অপরাধী হিসেবে উপস্থিত করা হবে৷
(৩৭:১৫৯) (এবং তারা বলে,) “আল্লাহ সেসব দোষ থেকে মুক্ত
(৩৭:১৬০) যেগুলো তাঁর একনিষ্ঠ বান্দারা ছাড়া অন্যেরা তাঁর ওপর আরোপ করে৷
(৩৭:১৬১) কাজেই তোমরা ও তোমাদের এ উপাস্যরা
(৩৭:১৬২) কাউকে আল্লাহ থেকে ফিরিয়ে রাখতে পারবে না,
(৩৭:১৬৩) সে ব্যক্তিকে ছাড়া যে জাহান্নামের প্রজ্জ্বীলত আগুনে প্রবেশকারী হবে৷ ৯০
(৩৭:১৬৪) আর আমাদের অবস্থা তো হচ্ছে এই যে, আমাদের মধ্য থেকে প্রত্যেকের একটি স্থান নির্ধারিত রয়েছে৷ ৯১
(৩৭:১৬৫) এবং আমরা সারিবদ্ধ
(৩৭:১৬৬) খাদেম ও তাসবীহ পাঠকারী৷”
(৩৭:১৬৭) তারা তো আগে বলে বেড়াতো,
(৩৭:১৬৮) হায়! পূর্ববর্তী জাতিরা যে “যিকির” লাভ করেছিল তা যদি আমাদের কাছে থাকতো
(৩৭:১৬৯) তাহলে আমরা হতাম আল্লাহর নির্বাচিত বান্দা৷ ৯২
(৩৭:১৭০) কিন্তু (যখন সে এসে গেছে) তখন তারা তাকে অস্বীকার করেছে৷ এখন শিগ্‌গির তারা (তাদের এ নীতির ফল) জানতে পারবে৷
(৩৭:১৭১) আমার প্রেরিত বান্দাদেরকে আমি আগেই, প্রতিশ্রুতি দিয়েছি যে, অবশ্যই তাদেরকে সাহায্য করা হবে৷
(৩৭:১৭২) অবশ্যই তাদেরকে সাহায্য করা হবে৷
(৩৭:১৭৩) এবং আমার সেনাদলই বিজয়ী হবে৷ ৯৩
(৩৭:১৭৪) কাজেই হে নবী! কিছু সময় পর্যন্ত তাদেরকে তাদের অবস্থার ওপর ছেড়ে দাও৷
(৩৭:১৭৫) এবং দেখতে থাকো, শীঘ্রই তারা নিজেরাও দেখে নেবে৷ ৯৪
(৩৭:১৭৬) তারা কি আমার আযাবের জন্য তাড়াহুড়া করছে ?
(৩৭:১৭৭) যখন তা নেমে আসবে তাদের আঙিনায়, সেদিনটি হবে যাদেরকে সতর্ক করা হয়েছিল তাদের জন্য বড়ই অশুভ৷
(৩৭:১৭৮) ব্যস, তাদেরকে কিছুকালের জন্য ছেড়ে দাও৷
(৩৭:১৭৯) এবং দেখতে থাকো, শিগ্‌গির তারা নিজেরাও দেখে নেবে৷
(৩৭:১৮০) তারা যেসব কথা তৈরি করছে তা থেকে পাক-পবিত্র তোমার রব, তিনি মর্যাদার অধিকারী৷
(৩৭:১৮১) আর সালাম প্রেরিতদের প্রতি
(৩৭:১৮২) এবং সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ রব্বুল আলামীনেরই জন্য৷
৭৭. কুরআন মজীদে এ তৃতীয়বার হযরত ইউনস আলাইহিস সালামের বিষয় আলোচিত হয়েছে৷ এর আগে সূরা ইউনস ও সূরা আম্বিয়ায় তাঁর আলোচনা এসেছে এবং আমি তার ব্যাখ্যা করেছি৷ (দেখুন তাফহীমুল কুরআন সূরা ইউনুস , ৯৮ - ১০০ টীকা এবং সূরা আল আম্বিয়া , ৮২ - ৮৫ টীকা )
৭৮. মূলে (আরবী -----------) শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে৷ আরবী ভাষায় এ শব্দটি কেবলমাত্র তখনই ব্যবহার করা হয় যখন গোলাম তার প্রভুর কাছ থেকে পালিয়ে যায়৷ (আরবী ---------------------) অর্থাৎ " ইবাক অর্থ হচ্ছে প্রভুর কাছ থেকে গোলামের পালিয়ে যাওয়া ৷ " (লিসানুল আরব )
৭৯. এ বাক্যগুলো সম্পর্কে চিন্তা ভাবনা করলে ঘটনার যে চিত্রটি সামনে ভেসে ওঠে তা হচ্ছেঃ

একঃ হযরত ইউনুস যে নৌকায় আরোহণ করেছিলেন তা তার ধারণা ক্ষমতার চাইতে বেশী বোঝাই (Overloaded ) ছিল৷

দুইঃ নৌকায় লটারী অনুষ্ঠিত হয় এবং সম্ভবত এমন সময় হয় যখন সামুদ্রিক সফরে মাঝখানে মনে করা হয় যে , নৌকা তার ধারণ ক্ষমতার বেশী বোঝা বহন করার কারণে সকল যাত্রীর জীবন বিপদের মুখোমুখি হয়ে পড়েছে৷ কাজেই লটারীতে যার নাম উঠবে তাকেই পানিতে নিক্ষেপ করা হবে , এ উদ্দেশ্যে লটারী করা হয়৷

তিনঃ লটারীতে হযরত ইউনুসের নামই ওঠে৷ তাঁকে সমুদ্রে নিক্ষেপ করা হয় এবং একটি মাছ তাঁকে গিলে ফেলে৷

চারঃ হযরত ইউনুসের এ পরীক্ষায় নিক্ষিপ্ত হবার কারণ হচ্ছে এই যে , তিনি নিজে প্রভুর (অর্থাৎ মহান আল্লাহ ) অনুমতি ছাড়াই তাঁর কর্মস্থল থেকে পালিয়ে গিয়েছিলেন৷ " আবাকা " শব্দটি এ অর্থই প্রকাশ করছে , ওপরের ৭৮ টীকায় এ ব্যাখ্যাই করা হয়েছে৷ " মূলীম " শব্দটিও একথাই বলছে৷ মূলীম এমন অপরপাধীকে বলা হয় যে নিজের অপরাধের কারণে নিজেই নিন্দিত হবার হকদার হয়ে গেছে , তাকে নিন্দা করা হোক বা না হোক৷

আরবী ------------------------------------------------------------------------------
৮০. এর দুটি অর্থ হয় এবং দু'টি অর্থই এখানে প্রযোজ্য ৷ একটি অর্থ হচ্ছে , হযরত ইউনুস আলাইহিস সালাম পূর্বেই আল্লাহ থেকে গাফিল লোকদের অন্তরভুক্ত ছিলেন না বরং তিনি তাদের অন্তরবুক্ত ছিলেন আল্লাহর চিরন্তন প্রশংসা , মহিমা ও পবিত্রতা ঘোষণাকারী ৷ দ্বিতীয়টি হচ্ছে , যখন তিনি মাছের পেটে পৌঁছুলেন তখন আল্লাহরই দিকে রুজূ ' করলেন এবং তারই প্রশংসা , মহিমা ও পবিত্রতা ঘোষাণা করতে থাকলেন সূরা আল আম্বিয়ায় বলা হয়েছেঃ

আরবী ------------------------------------------------------------------------------------

" তাই সে অন্ধকারের মধ্যে তিনি ডেকে উঠলেন , তুমি ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই , পাক - পবিত্র তোমার সত্তা , অবশ্যই আমি অপরাধী৷ "
৮১. এর অর্থ এ নয় যে , এ মাছটি কিয়ামত পর্যন্ত বেঁচে থাকতো এবং হযরত ইউনুস (আ ) কিয়ামত পর্যন্ত তার পেটে বেঁচে থাকতেন৷ বরং এর অর্থ হচ্ছে , কিয়ামত পর্যন্ত এ মাছের পেটই তাঁর কবরে পরিণত হতো৷ প্রখ্যাত মুফাসসিরগণ এ আয়াতটির এ অর্থই বর্ণনা করছেন৷
৮২. অর্থাৎ হযরত ইউনুস (আ ) যখন তাঁর অপরাধ স্বীকার করে নিলেন এবং একজন মু'মিন ও ধৈর্যশীল বান্দার ন্যায় তাঁর পবিত্রতা ও মহিমা গাইতে লাগলেন তখন আল্লহর হুকুমে মাছ তাঁকে উপকূলে উদগীরণ করলো৷ উপকূলে ছিল একটি বিরাণ প্রান্তর৷ সেখানে সবুজের কোন চিহ্ন ছিল না এবং এমন কোন জিনিসও ছিল না যা হযরত ইউনুসকে ছায়াদান করতে পারে৷ সেখানে খাদ্যের ও কোন সংস্থান ছিল না৷ এখানে এসে অনেক বুদ্ধি ও যুক্তিবাদের দাবীদারকে একথা বলতে শুনা গেছে যে , মাছের পেটে ঢুকে যাবার পর কোন মানুষের জীবিত বের হয়ে আসা অসম্ভব ৷ কিন্তু বিগত শতকের শেষের দিকে এ তথাকথিত বুদ্ধি ও যুক্তিবাদীতার কেন্দ্র ভূমির (ইংল্যাণ্ড ) উপকূলের সন্নিকটে একটি বিস্ময়কর ঘটনা ঘটে ৷ এ ঘটনাটি তাদের দাবী খণ্ডন করে ৷ " ১৮৯১ সালের আগষ্ট মাসে Star of the East নামক জাহাজে চড়ে কয়েকজন মৎস্য শিকারী তিমি শিকারের উদেশ্যে গভীর সমুদ্রে যায়৷ সেখানে তারা ২০ ফুট লম্বা , ৫ ফুট চওড়া ও ১০০ টন ওজনের একটি বিশাল মাছকে আহত করে ৷ কিন্তু তার সাথে লাড়াই করার সময় জেমস বার্ডলে নামক একজন মৎস্য শিকারীকে তার সাথীদের চোখের সামনেই মাছটি গিলে ফেলে৷ একদিন পরে জাহাজের লোকেরা মাছটিকে মৃত অবস্থায় পায়৷ বহুকষ্টে সেটিকে তারা জাহাজে ওঠায় এবং তারপর দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর তার পেট কাটলে জেমস তার মধ্য থেকে জীবিত বের হয়ে আসে৷ এ ব্যক্তি মাছের পেটে পুরা ৬০ ঘন্টা থাকে৷ " (উর্দূ ডাইজেষ্ট , ফেব্রুয়ারী ১৯৬৪ ) চিন্তায় ব্যাপার হচ্ছে , সাধারণ অবস্থায় প্রাকৃতিকভাবে যদি এমনটি হওয়া সম্ভবপর হয়ে থাকে , তাহেল অস্বাভাবিক অবস্থায় আল্লাহর মু'জিযা হিসেবে এমনটি হওয়া কেমন করে অসম্ভব হতে পারে ?
৮৩. মূলে বলা হয়েছে (আরবী ---------------------) ইয়াকতীন আরবী ভাষায় এমন ধরনের গাছকে বলা হয় যা কোন গুঁড়িয়ে ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না বরং লতার মতো ছড়িয়ে যেতে থাকে ৷ যেমন লাউ , তরমুজ, শশা ইত্যাদি৷ মোটকথা সেখানে আলৌকিকভাবে এমন একটি লতানো গাছ উৎপন্ন করা হয়েছিল যার পাতাগুলো হযতর ইউনুসকে ছায়া দিচ্ছিল এবং ফলগুলো একই সংগে তাঁর জন্য খাদ্য সরবরাহ করছিল এবং পানিরও যোগান দিচ্ছিল৷
৮৪. " এক লাখ বা এর বেশী " বলার মানে এ নয় যে , এর সঠিক সংখ্যার ব্যাপারে আল্লাহর সন্দেহ ছিল৷ বরং এর অর্থ হচ্ছে , যদি কেউ তাদের জনবসতি দেখতো তাহলে সে এ ধারণাই করতো যে , এ শহরের জনসংখ্যা এক লাখের বেশীই হবে কম হবে না৷ সম্ভবত হযরত ইউনুস যে শহরটি ত্যাগ করে পালিয়ে গিয়েছিলেন এটি সেই শহরই হবে ৷ তাঁর চলে যাবার পর সে শহরের লোকেরা আযাব আসতে দেখে যে ঈমান এনেছিল তার অবস্থা ছিল এমন তাওবার মতো যা কবুল করে নিয়ে তাদের ওপর থেকে আযবা হটিয়ে দেয়া হয়েছিল৷ এখন হযরত ইউনুস আলইহিস সালমকে পুনরবার তাদের কাছে পাঠানো হলো , যাতে তারা নবীর প্রতি ঈমান এনে যথারীতি মুসলমান হয়ে যায়৷ এ বিষয়টি বুঝার জন্য সূরা ইউনুসের ৯৮ আয়াতটি সামনে থাকা দরকার৷
৮৫. হযরত ইউনুসের (আ) এ ঘটনা সম্পর্কে আমি সূরা ইউনুস ও সূরা আম্বিয়ার ব্যাখ্যায় যা কিছু লিখেছি সে সম্পর্কে কেউ কেউ আপত্তি উঠিয়েছেন ৷ তাই সংগতভাবেই এখানে অন্যান্য মুফাসসিরগণের উক্তিও উদ্ধৃত করছিঃ

বিখ্যাত মুফাসসির কাতাদা সুরা ইউনুসের ৯৮ আয়াতের ব্যাখ্যার বলেনঃ " এমন কোন জনপদ দেখা যায়নি যার অধিবাসীরা কুফরী করেছে এবং আযাব এসে যাবার পরে ঈমান এনেছে আর তারপর তাদেরকে রেহাই দেয়া হয়েছে৷ একমাত্র ইউনুসের সম্প্রদায় এর ব্যতিক্রম৷ ৷ তারা যখন তাদের নবীর সন্ধান করে তাঁকে না পেয়ে অনুভব করলো আযাব নিকটে এসে গেছে তখন আল্লাহ তাদের মনে তাওবার প্রেরণা সৃষ্টি করলেন ৷ " (ইবনে কাসীর , ২ খণ্ড , ৪৩৩ পৃষ্ঠা )

একই আয়াতে ব্যাখ্যায় আল্লামা আলূসী লিখছেন , এ জাতির কাহিনী হচ্ছেঃ " হযরত ইউনুস আলাইহিস সালাম মসুল এলাকায় নিনেভাসসীদের কাছে আগমন করেছিলেন৷ তারা ছিল কাফের ও মুশরিক ৷ হযরত ইউনুস তাদেরকে এক ও লা শরীক আল্লাহর প্রতি ঈমান আনার ও মূর্তিপূজা পরিত্যাগ করার আহবান জানান৷ তারা তাঁর দাওয়াত প্রত্যাখ্যান কর এবং তাঁর প্রতি মিথ্যা আরোপ করে৷ হযরত ইউনুস তাদেরক জানিয়ে দেন , তৃতীয় দিন আযাব আসবে এবং তৃতীয় দিন আসার আগেই অর্ধ রাতে তিনি জনপদ থেকে বের হয়ে পড়েন৷ তারপর দিনের বেলা যখন এ জাতির মাথার ওপর আযাব পৌঁছে যায় ...................... এবং তাদের বিশ্বাস জন্মে যে , তারা সবাই ধবংস হয়ে যাবে তখন তারা নিজেদের নবীকে খুঁজতে থাকে কিন্তু তাঁকে খুঁজে পায় না৷ শেষ পর্যন্ত তারা সবাই নিজেদের ছেলেমেয়ে , পরিবার , গবাদি পশু নিয়ে খোলা প্রান্তরে বের হয়ে আসে এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান আনে ও তাওবা করে৷ ................................ আল্লাহ তাদের প্রতি করুণা করেন এবং তাদের দোয়া কবুল করেন৷ " (রূহুল মা 'আনী , ১১ খণ্ড , ১৭০ পৃষ্ঠা )

সূরা আম্বিয়ার ৮৭ আয়াতের ব্যাখ্যায় আল্লামা আলূসী লিখেছেনঃ " হযরত ইউনুসের নিজের জাতির প্রতি অসন্তুষ্ট হয়ে বের হয়ে যাওয়া ছিল হিজরাতের কাজ৷ কিন্তু তাঁকে এর হুকুম দেয়া হয়নি৷ " (রুহুল মা'আনী , ১৭ খণ্ড , ৭৭ পৃষ্ঠা ) তারপর তিনি হযরত ইউনুসের দোয়ার বাক্যাংশ (আরবী ------------------------------) এর অর্থ বর্ণনা করেছেন এভাবেঃ " অর্থাৎ আমি অপরাধী ছিলাম৷ নবীদের নিয়মের বাইরে গিয়ে হুকুম আসার আগেই হিজরাত করার ব্যাপারে আমি তাড়াহুড়া করেছিলাম৷ হযরত ইউনুস আলাইহিস সালামের পক্ষ থেকে এটি ছিল তাঁর নিজের গোনাহের স্বীকৃতি এবং তাওবার প্রকাশ , যাতে আল্লাহ তাঁকে বিপদ থেকে উদ্ধার করেন৷ " (রূহুল মা"আনী ১৭ খণ্ড, ৭৮ পৃষ্ঠা )

এ আয়াতাটির টীকায় মওলানা আশরাফ আলী থানবী লিখেছেনঃ " তাঁর নিজের জাতি তাঁর প্রতি ঈমান না আনায় তিনি ক্রুদ্ধ হয়ে চলে যান এবং জাতির ওপর থেকে আযাব হটে যাবার পরও নিজে তাদের কাছে ফিরে আসেননি ৷ আর এ সফরের জন্য আল্লাহর হুকুমের অপেক্ষাও করেননি৷" (বায়ানুল কুরআন )

এ আয়াতের টীকার মওলানা শাব্বির আহমদ উসমানী লিখেছেনঃ " জাতির কার্যকলাপে ক্ষিপ্ত হয়ে ক্রুদ্ধচিত্তে শহর থেকে বের হয়ে যান৷ আল্লাহর হুকুমের অপেক্ষা করেননি এবং প্রতিশ্রুতি দিয়ে যান যে, তিনি দিনের মধ্যে তোমাদের ওপর আযাব নেমে আসবে৷ ............... আরবী .............. ) বলে নিজের অপরাধ স্বীকার করেন এ মর্মে যে, অবশ্যই আমি তাড়াহুড়া করেছি, তোমার হুকুমের অপেক্ষা না করেই জনপদের অধিবাসীদের ত্যাগ করে বের হয়ে পড়ি৷ "

সূরা সা - ফফা‌ - তের ওপরে উল্লেখিত আয়াতের ব্যাখ্যায় ইমাম রাযী লিখেছেনঃ হযরত ইউনুসের অপরাধ ছিল , তাঁর যে জাতি তাঁর প্রতি মিথ্যা আরোপ করেছিল আল্লাহ তাকে ধবংস করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন৷ তিনি মনে করেছিলেন, এ আযাব নির্ঘাত এসে যাবে৷ তাই তিনি সবর করেননি৷ জাতিকে দাওয়াতে দেবার কাজ বাদ দিয়ে বাইরে বের হয়ে গিয়েছিলেন৷ অথচ দাওয়াতের কাজ সবসময় জারী রাখাই ছিল তাঁর দায়িত্ব৷ কারণ আল্লাহ তাদেরকে ধবংস না করার সম্ভাবনা তখনো ছিল৷" (তাফসীরে কবীর, ৭ খণ্ড, ১৬৮ পৃষ্ঠা )

আল্লামা আলুসী (আরবী ..................................... ) সম্পর্কে লিখেছেনঃ " আবাকা এর আসল মানে হচ্ছে , প্রভুর কাছ থেকে দাসের পালিয়ে যাওয়া ৷ যেহেতু হযরত ইউনুস তাঁর রবের অনুমতি ছাড়াই নিজের জাতির কাছ থেকে পলায়ন করেছিলেন তাই তাঁর জন্য এ শব্দটির ব্যবহার সঠিক হয়েছে৷" তারপর সামনের দিকে তিনি আরো লিখেছেনঃ "তৃতীয় দিনে হযরত ইউনুস আল্লাহর অনুমতি ছাড়াই বের হয়ে গেলেন৷ এখন তাঁর জাতি তাঁকে না পেয়ে তাদের বড়দের ছোটদের ও গবাদি পশুগুলো নিয়ে বের হয়ে পড়লো৷ আযাব অবতীর্ণ হবার বিষয়টি তাদের কাছে এসে পৌছেছিল ৷তারা আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি করলো এবং ক্ষমা প্রার্থনা করলো৷ আল্লাহ তাদেরকে মাফ করে দিলেন৷ " (রূহুল মা'আনী , ২৩ খণ্ড, ১০৩ পৃষ্ঠা )

মাওলানা শব্বির আহমদ উসমানী (আরবী ............ ) এ ব্যাখ্যা প্রসংগে লিখেছেনঃ "অভিযোগ এটিই ছিল যে , ইজতিহাদী ভুলের দরুন আল্লাহর হুকুমের অপেক্ষা না করে জনপদ থেকে বের হয়ে পড়েন এবং আযাবের দিন নির্ধারণ করে দেন্‌ "

আবার সূরা আল কলম এর

(আরবী ,,,,,,,,,,,,,,,,,,,, )

আয়াতের টীকার মাওলানা শাব্বির আহমদ উসমানী লিখেছেনঃ " অর্থাৎ মাছের পেটে প্রবেশকারী পয়গম্বরের (হযরত ইউনুস আলাইহিস সালাম ) মতো মিথ্যা আরোপকারীদের ব্যাপারে সংকীর্ণমনতা ও ভাতি - আশংকার প্রকাশ ঘটাবে না৷" " অর্থাৎ জাতির বিরুদ্ধে ক্রোধে ক্ষিপ্ত হয়েছিলেন৷ বিরক্ত হয়ে দ্রুত আযাবের জন্য দোয়া এবং ভবিষ্যদ্বাণী করে বসলেন৷ "

মুফাসসিরগণের এসব বর্ণনা থেকে একথা সুম্পষ্ট হয়ে যায় যে, তিনটি ভুলের কারণে হযরত ইউনুসের (আ ) ওপর অসন্তোষ ও ক্রোধ নেমে আসে ৷ এক, তিনি নিজেই আযাবের দিন নির্দিষ্ট করে দেন ৷ অথচ আল্লাহর পক্ষ থেকে এ ধরনের কোন ঘোষণা হয়নি৷ দুই, সেদিন আসার আগেই হিজরাত করে দেশ থেকে বের হয়ে যান৷ অথচ আল্লাহর হুকুম না আসা পর্যন্ত নবীর নিজ স্থান ত্যাগ করা উচিত নয়৷ তিন, সে জাতির ওপর থেকে আযাব হটে যাওয়ার পর তিনি নিজে তাদের মধ্যে ফিরে যাননি৷
৮৬. এখান থেকে আর একটি বিষয় শুরু হচ্ছে ৷ প্রথম বিষয়টি ১১ আয়াত থেকে শুরু হয়েছিল৷ অর্থাৎ মক্কার কাফেরদের সামনে এ প্রশ্ন রাখা হয়েছিলঃ " তাদেরকে জিজ্ঞেস করো, তাদেরকে সৃষ্টি করা বেশী কঠিন কাজ, না আমি যেগুলো সৃষ্টি করে রেখেছি সেগুলো ? " এখন তাদেরকে সামনে এ দ্বিতীয় প্রশ্ন আনা হচ্ছে ৷ প্রথম প্রশ্নের উদ্দেশ্যে ছিল কাফেরদেরকে তাদের এ ভ্রষ্টতা সম্পর্কে সতর্ক করে দেয়া যে , তারা মৃত্যু পরের জীবন ও শাস্তি - পুরস্কারকে অসম্ভব মনে করতো এবং এ জন্য নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বিদ্রূপ করতো ৷ এখন এ দ্বিতীয় প্রশ্নটি তাদের এ মূর্খতা সম্পর্কে সতর্ক করে দেবার জন্য পেশ করা হচ্ছে যে , তারা বলতো আল্লাহর সন্তান আছে এবং অনুমানের ঘোড়া দাবড়িয়ে যাকে ইচ্ছা তাকেই আল্লাহর সন্তান বলে আখ্যায়িত করতো৷
৮৭. হাদীস থেকে জানা যায় , আরবে কুরাইশ , জুহাইনিয়া , বনী সালেমাহ , খুযা'আহ , নবী য়ুলাহ এবং অন্যান্য গোত্র বিশ্বাস করতো , ফেরেশতারা আল্লাহর কন্যা ৷ কুরআন মজীদের বিভিন্ন স্থানে তাদের এ জাহেলী আকীদার কথা বলা হয়েছে ৷ উদাহরণস্বরূপ দেখুন সূরা আন নিসা , ১১৭ ; আন নাহল , ৫৭ - ৫৮ বনী ইসরাঈল , ৪০ ; আয যুখরুফ , ১৬ - ১৯ এবংআন নাজম , ২১- ২৭ আয়াতসমূহ৷
৮৮. অর্থাৎ ফেরেশতাদেরকে আল্লাহর কন্যা মনে করার জন্য দু'টি বুনিয়াদই হতে পারে৷ এ ধরনের কথা তারা বলতে পারে প্রত্যক্ষ দর্শনের ভিত্তিতে অথবা এ ধরনের দাবী ৷ যারা করে তাদের কাছে আল্লাহ এমন কোন কিতাব থাকতে হবে যাতে আল্লাহ নিজেই ফেরেশতাদেরক নিজের কন্যা বলে উল্লেখ করে থাকবেন৷ এখন এ বিশ্বাসের প্রবক্তারা যদি কোন প্রত্যক্ষ দর্শনের দাবী করতো না পারে এবং এমন কোন কিতাব ও তাদের কাছে না থাকে যাতে একথা বলা হয়েছে , তাহলে নিছক উড়ো কথার ভিক্তিতে একটি দীনী বিশ্বাস প্রতিষ্ঠিত করে নেয়া এবং বিশ্ব - জাহানের মালিকের সাথে সুস্পষ্ট হাস্যকর কথা সম্পৃক্ত করে দেয়ার চাইতে বড় মূর্খতা ও বোকামি আর কী হতে পারে৷
৮৯. মূলে ' মালাইকা'র (ফেরেশতাবৃন্দ ) পরিবর্তে ' আল জিন্নাহ ' (আরবী -------------) শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে৷ কিন্তু কোন কোন শ্রেষ্ঠ তাফসীকারের মতে এখানে ' জিন ' শব্দটি তার আভিধানিক অর্থের (অর্থাৎ গুপ্ত সৃষ্টি৷) প্রেক্ষিতে ' মালাইকা ' তথা ফেরেশতা অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে৷ কারণ ফেরেশতাও আসলে একটি গোপন জীবই ৷ পরবর্তী বিষয়বস্তু এখানে জিন শব্দটি ফেরেশতা অর্থে ব্যবহার করারই দাবী জানায়৷
৯০. এ আয়াতের দ্বিতীয় অনুবাদ এও হতে পারেঃ ' কাজেই তোমরা ও তোমাদের এ ইবাদাত , এর ভিত্তিতে তোমরা কাউকে ফিতনার মধ্যে নিক্ষেপ করতে পারো না কিন্তু একমাত্র তাকে যে .................... ৷ " এ দ্বিতীয় অনুবাদের প্রেক্ষিতে এর অর্থ হবে , হে পথভ্রষ্টের দল৷ এই যে , তোমরা আমাদের পূজা করছো এবং আমাদেরকে আল্লাহর রাব্বুল আলামীনের সন্তান গন্য করছো , এর মাধ্যমে তোমরা আমাদেরকে ফিতানার মধ্যে নিক্ষেপ করতে পারো না৷ এর মাধ্যমে তো কেবলমাত্র এমন নির্বোধই ফিতনার মধ্যে নিক্ষিপ্ত হতে পারে , যে সর্বনাশের মেষ সীমায় পৌঁছে গেছে৷ অন্য কথায় বলা যায় , ফেরেশতারা তাদেরকে বলছেঃ " পাতো এ ফাঁদ অন্য পাখির জন্য৷ "
৯১. অর্থাৎ আল্লাহর সন্তান হওয়া তো দূরের কথা , আমাদের অবস্থা তো হচ্ছে এই যে , আমাদের মধ্যে যার জন্য যে মর্যাদা ও স্থান নির্ধারিত হয়েছে তা থেকে সামান্যতমও এদিক ওদিক করার ক্ষমতা কারো নেই৷
৯২. একই বিষয়বস্তু সূরা ফাতিরের ৪২ আয়াতে আলোচিত হয়েছে৷
৯৩. আল্লাহর সেনাদল বলতে এমন ঈমানদারদেরকে বুঝানো হয়েছে যারা আল্লাহর রসূলের আনুগত্য করে এবং তাঁর সহযোগী হয়৷ তাছাড়া এমন অদৃশ্য শক্তিও এর অন্তরভুক্ত হয় যাদের সাহায্য মহান আল্লাহ সত্যপন্থীদেরকে সাহায্য - সহায়তা দান কের থাকেন৷ এ সাহায্য ও বিজয়ের অর্থ অবশ্যই এ নয় যে , প্রত্যেক যুগে আল্লাহর প্রত্যেক নবী এবং তাঁর প্রত্যেক অনুসারী দল রাজনৈতিক বিজয়ই লাভ করবেন৷ বরং এ বিজয় বহু ধরনের হবে৷ রাজনৈতিক বিজয়ও এর মধ্যে একটি ৷ যেখানে আল্লাহর নবীগণ এ ধরনের প্রাধান্য লাভ করেননি সেখানেও তাঁদের নৈতিক প্রাধান্য প্রমাণিত হয়েই থাকবে৷ যেসব জাতি তাদের কথা মনেনি এবং তাদের দেয়া হিদায়াদের বিরোধী পথ অবলম্বন করেছে তারা শেষ পযন্ত বরবাদই হয়ে গেছে৷ মূর্খতা ও ভ্রষ্টতার যে দর্শনই মানুষ তৈরি করেছে এবং যে বিকৃত জীবনাচরণই জোরপূর্বক প্রচলন করা হয়েছে তা সবই কিছুদিন পর্যন্ত টিকে থাকার পর শেষ পর্যন্ত স্বাভাবিক মৃত্যুবরণ করেছে৷ কিন্তু হাজার হাজার বছর থেকে আল্লাহর নবীগণ যে সত্যগুলোকে প্রকৃত সত্য হিসেবে পেশ করে এসেছেন তার আগেও ছিল অপরিবর্তনীয় এবং আজো অপরিবর্তিত রয়েছে৷ কেউ তাকে স্বস্থান থেকে নড়াতে পারেনি৷
৯৪. অর্থাৎ বেশীদিন যেতে না যেতেই তারা নিজেদের পরাজয় ও তোমার বিজয় স্বচক্ষে দেখে নেবে৷ একথা যেভাবে বলা হয়েছিল ঠিক সেভাবেই সত্য প্রমাণিত হয়েছে৷ এ আয়াতগুলো নাযিল হবার পর বড়জোড় ১৪/১৫ বছর অতিক্রান্ত হয়ে থাকবে মক্কার কাফেররা নিজেদের চোখেই রসূলুল্লাহর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে তাঁর নিজের শহরে বিজয়ীর বেশে প্রবেশ দেখে নিয়েছে এবং তারপর এর কিছুকাল পরেই তারা দেখে নিয়েছে , ইসলাম কেবলমাত্র আরবের ওপরেই নয় বরং বিশাল পারশ্য ও রোমন সাম্রাজ্যের ওপরও বিজয়ী হয়েছে৷