(৩৭:৭৫) (ইতিপূর্বে) ৩৯ নূহ আমাকে ডেকেছিল, ৪০ তাহলে দেখো, আমি ছিলাম কত ভালো জওয়াবদাতা৷
(৩৭:৭৬) আমি তাকে ও তার পরিবারবর্গকে উদ্ধার করি ভয়াবহ যন্ত্রণা থেকে, ৪১
(৩৭:৭৭) শুধু তার বংশধরদেরকেই টিকিয়ে রাখি ৪২
(৩৭:৭৮) এবং পরবর্তী বংশধরদের মধ্যে তারই প্রশংসা ছেড়ে দেই ৷
(৩৭:৭৯) সমগ্র বিশ্ববাসীর মধ্যে নূহের প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক৷ ৪৩
(৩৭:৮০) সৎকর্মশীলদেরকে আমি এমনই প্রতিদান দিয়ে থাকি৷
(৩৭:৮১) আসলে সে ছিল আমার মু’মিন বান্দাদের অন্তরভূক্ত৷
(৩৭:৮২) তারপর অন্যদলেকে আমি ডুবিয়ে দেই৷
(৩৭:৮৩) আর নূহের পথের অনুসারী ছিল ইবরাহীম৷
(৩৭:৮৪) যখন সে তার রবের সামনে হাজির হয় “বিশুদ্ধ চিত্ত” নিয়ে৷ ৪৪
(৩৭:৮৫) যখন বলে সে তার পিতা ও তার জাতিকে ৪৫ “এগুলো কি জিনিস যার ইবাদাত তোমরা করছো?
(৩৭:৮৬) আল্লাহকে বাদ দিয়ে কি তোমরা মিথ্যা বানোয়াট মাবুদ চাও ?
(৩৭:৮৭) সমস্ত বিশ্ব-জগতের রব আল্লাহ সম্পর্কে তোমাদের ধারণা কি?” ৪৬
(৩৭:৮৮) তারপর ৪৭ সে তারকাদের দিকে একবার তাকালো ৪৮
(৩৭:৮৯) এবং বললো, আমি অসুস্থ৷ ৪৯
(৩৭:৯০) কাজেই তারা তাকে ত্যাগ করে চলে গেলো৷ ৫০
(৩৭:৯১) তাদের পেছনে সে চুপিচুপি তাদের দেবতাদের মন্দিরে ঢুকে পড়লো এবং বললো, “আপনারা খাচ্ছেন না কেন?” ৫১
(৩৭:৯২) কি হলো আপনাদের, কথা বলছেন না কেন ?”
(৩৭:৯৩) এরপর সে তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লো এবং ডান হাত দিয়ে খুব আঘাত করলো৷
(৩৭:৯৪) (ফিরে এসে) তারা দৌড়ে তার কাছে এলো৷ ৫২
(৩৭:৯৫) সে বললো, “তোমরা কি নিজেদেরই খোদাই করা জিনিসের পূজা করো?
(৩৭:৯৬) অথচ আল্লাহই তোমাদেরকেও সৃষ্টি করেছেন এবং তোমরা যে জিনিসগুলো তৈরি করো তাদেরকেও৷”
(৩৭:৯৭) তারা পরস্পর বললো, “এর জন্য একটি অগ্নিকুণ্ডু তৈরি করো এবং একে জ্বলন্ত আগুনের মধ্যে ফেলে দাও৷”
(৩৭:৯৮) তারা তার বিরুদ্ধে একটি পদক্ষেপ নিতে চেয়েছিল কিন্তু আমি তাদেরকে হেয়প্রতিপন্ন করেছি৷ ৫৩
(৩৭:৯৯) ইবরাহীম বললো, ৫৪ “আমি আমার রবের দিকে যাচ্ছি, ৫৫ তিনিই আমাকে পথ দেখাবেন৷
(৩৭:১০০) হে পরওয়ারদিগার! আমাকে একটি সৎকর্মশীল পুত্র সন্তান দাও৷” ৫৬
(৩৭:১০১) এ দোয়ার জবাবে) আমি তাকে একটি ধৈর্যশীল পুত্রের সুসংবাদ দিলাম৷ ৫৭
(৩৭:১০২) সে পুত্র যখন তার সাথে কাজকর্ম করার বয়সে পৌঁছুলো তখন (একদিন ইবরাহীম তাকে বললো, “ হে পুত্র! আমি স্বপ্নে দেখি তোমাকে আমি যাবেহ করছি, ৫৮ এখন তুমি বল তুমি কি মনে কর?” ৫৯ সে বললো, “ হে আব্বাজান! আপনাকে যা হুকুম দেয়া হচ্ছে ৬০ তা করে ফেলুন, আপনি আমাকে ইনশাআল্লাহ সবরকারীই পাবেন৷”
(৩৭:১০৩) শেষ পর্যন্ত যখন এরা দু’জন আনুগত্যের শির নত করে দিল এবং ইবরাহীম পুত্রকে উপুড় করে শুইয়ে দিল৷ ৬১
(৩৭:১০৪) এবং আমি আওয়াজ দিলাম, ৬২ “ হে ইবরাহীম!
(৩৭:১০৫) তুমি স্বপ্নকে সত্য করে দেখিয়ে দিয়েছো৷ ৬৩ আমি সৎকর্মকারীদেরকে এভাবেই পুরস্কৃত করে থাকি৷ ৬৪
(৩৭:১০৬) নিশ্চিতভাবেই এটি ছিল একটি প্রকাশ পরীক্ষা৷” ৬৫
(৩৭:১০৭) একটি বড় কুরবানীর বিনিময়ে আমি এ শিশুটিকে ছাড়িয়ে নিলাম ৬৬
(৩৭:১০৮) এবং পরবর্তী বংশধরদের মধ্যে চিরকালের জন্য তার প্রশংসা রেখে দিলাম৷
(৩৭:১০৯) শান্তি বর্ষিত হোক ইবরাহীমের প্রতি৷
(৩৭:১১০) আমি সৎকর্মকারীদেরকে এভাবেই পুরস্কৃত করে থাকি৷
(৩৭:১১১) নিশ্চিতভাবেই সে ছিল আমার মুসলিম বান্দাদের অন্তরভুক্ত৷
(৩৭:১১২) আর আমি তাকে ইসহাকের সুসংবাদ দিলাম, সে ছিল সৎকর্মশীলদের মধ্য থেকে একজন নবী৷
(৩৭:১১৩) বরকত দিলাম তাকে ও ইসহাককে, ৬৭ এখন এ দু’জনের বংশধরদের মধ্য থেকে কতক সৎকর্মকারী আবার কতক নিজেদের প্রতি সুস্পষ্ট জুলুমকারী৷ ৬৮
৩৯. এ বিষয়বস্তটির সম্পর্ক রয়েছে পেছনের রুকূ'র শেষ বাক্যগুলোর সাথে সেগুলোর ওপর চিন্তা - ভাবনা করলে এ কাহিনীটি এখানে কেন শুনানো হচ্ছে তা বুঝা যায়৷
৪০. এখানে হযরত নূহ আলাইহিস সালামের ফরিয়াদের কথা বলা হয়েছে৷ দীর্ঘকাল নিজের কওমকে সত্য দীনের দাওয়াত দেবার পর শেষ হতাশ হয়ে তিনি মহান আল্লাহর কাছে এ ফরিয়াদ করেছিলেন ৷ সূরা কামারে এ ফরিয়াদের শব্দগুলো নিম্নোক্তভাবে এসেছে (আরবী --------------------------------) " সে তার রবকে ডেকে বললো , আমি পরাজিত হয়ে গেছি , তুমি আমাকে সাহায্য করো ৷ " (আল কামার , ১০ আয়াত )
৪১. অর্থাৎ একটি চরিত্রহীন ও জালেম জাতির ক্রমাগত বিরোধিতার কারণে তিনিই যে ভয়াবহ যন্ত্রণা , ক্লেশ ও কষ্টের সম্মুখীন হচ্ছিলেন৷ এর মধ্যে এ বিষয়টির প্রতিও একটি সূক্ষ্ম ইংগিত রযেছে যে , নূহ আলাইহিস সালাম ও তাঁর সাথিদেরকে যেভাবে সেই মহাক্লেশ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে , ঠিক তেমনি শেষ পর্যন্ত আমি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তাঁর সংগী - সাথিদেরকেও মক্কাবাসীরা যে মহাক্লেশের মধ্যে নিক্ষেপ করেছে তা থেকে উদ্ধার করবো৷
৪২. এর দু'টি অর্থ হতে পারে৷ এক , যারা হযতর নূহের বিরোধিতা করছিল তাদের বংশধারা দুনিয়ার বুক থেকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়া হয়েছে এবং হযরত নূহেরই বংশধারাকে টিকিয়ে রাখা হয়েছে৷ দুই , সমস্ত মানব বংশধারাকে খতম করে দেয়া হয়েছে এবং সামনের দিকে কেবলমাত্র নূহ আলাইহিস সালামের সন্তানদের মাধ্যমে এ দুনিয়ার জনবসতিকে বিস্তৃতি দান করা হয়েছে ৷ সাধারণভাবে মুফসসিরগণ এ দ্বিতীয় অর্থটিই গ্রহণ করেছেন৷ কিন্তু কুরআন মজীদের শব্দবলী এ অর্থটির ব্যাপারে সুস্পষ্ট নয়৷ আসল ব্যাপারটা কি তা আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না৷
৪৩. অর্থাৎ আজ সারা দুনিয়ায় হযতর নূহের দুর্নাম করার কেউ নেই৷ নূহের প্লাবনের পর থেকে আজ পর্যন্ত হাজার হাজার বছর ধরে দুনিয়াবাসীরা তাঁর সুনামই করে চলেছে৷
৪৪. রবের সামনে হাজির হওয়ার অর্থ হচ্ছে ,তাঁর দিকে রুজু হওয়া এবং সবার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে একমাত্র তাঁর দিকে মুখ করা৷ আর বিশুদ্ধ চিত্ত (আরবী --------) মানে হচ্ছে " সঠিক ও নিষ্কলূষ অন্তরকরণ "৷ অর্থাৎ সব রকমের বিশ্বাসগত ও নৈতিক ত্রুটিমুক্ত অন্তর৷ যেখানে কুফরী ও শিরক এবং সন্দেহ - সংশয়ের লেশ মাত্রও নেই ৷ যার মধ্যে নাফরমানী ও বিদ্রোহের কোন সামান্যতম অনুভূতিও পাওয়া যায় না৷ যার মধ্যে কোন প্রকান প্যাঁচ ও জটিলতা নেই৷যা সব ধরনের অসৎ প্রবণতা ও অপবিত্র কামনা - বাসনার সম্পূর্ণ প্রভাবমুক্ত ৷ যার মধ্যে কারো বিরুদ্ধে হিংসা , বিদ্বেষ ও অকল্যাণ কামনা পাওয়া যায় না এবং যার নিয়তে কোনপ্রকার ত্রুটি ও কৃত্রিমতা নেই৷
৪৫. হযরত ইবরাহীমের (আ) এ ঘটনা সম্পর্কে বিস্তারিত জানার জন্য দেখুন তাফহীমুল কুরআন , আল আন' আম , ৫০ - ৫৫ , মারয়াম , ২৬ - ২৭ ; আল আম্বিয়া , ৫১-৬৬ ; আশ শূ'আরা , ৫০ -৬৪ এবং আল ' আনকাবূত , ২৫- ৪৮ টীকা ৷
৪৬. অর্থাৎ আল্লাহকে তোমরা কী মনে কেরছো ? তোমরা কি মনে করো , এসব কাঠ - পাথরের তৈরি দেবতারা তাঁর দেবতারা তাঁর সমজাতীয় হতে পারে ? অথবা এরা তাঁর গুণাবলী ও ক্ষমতায় শরীক হতে পারে আর তোমরা কি এ বিভ্রান্ত চিন্তারও শিকার হয়েছো যে , তাঁর সাথে এত বড় গোস্তাখী করার পর তোমরা তাঁর পাকড়াও থেকে রেহাই পেয়ে যাবে ?
৪৭. এখন একটি বিশেষ ঘটনার কথা বলা হচ্ছে ৷ এ সম্পর্কিত বিস্তরিত আলোচনা এসেছে সূরা আল আম্বিয়া , ৫১ - ৭৩ এবং আল ' আনকাবূতে , ১৬ - ২৭ আয়াতে৷
৪৮. ইবনে আবি হাতেম প্রসিদ্ধ তাবে'ঈ মুফাসসির কাতাদাহর এ উক্তি উদ্ধৃত করেছেন যে , আরবরা (আরবী ---------------) (সে তারকাদের দিকে তাকালো ) শব্দাবলী প্রবাদ বাক্য হিসেবে ব্যবহার করে তার সে অর্থ গ্রহণ করে তা হচ্ছে এই যে , সে ভাবনা চিন্তা করলো অথবা সে চিন্তা করতে লাগলো৷ আল্লামা ইবনে কাসীর এ উক্তিটিকেই প্রাধান্য দিয়েছেন৷ এমনিতেই ও প্রায়ই দেখা যায় , যখন কোন ব্যক্তির সামনে চিন্তার কোন বিষয় আসে তখন সে আকাশের দিকে অথবা ওপরের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে তারপর ভেবে - চিন্তে জবাব দেয়৷
৪৯. হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম তাঁর জীবনে তিনটে মিথ্যা বলেছিলেন বলে যে কথা বলা হয়ে থাকে এটি তার একটি ৷ অথচ একথাটিকে মিথ্যা বা বাস্তব বিরোধী বলার জন্য প্রথমে কোন উপায়ে একথা জানা উচিত যে , সে সময় হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালামের কোন প্রকারের কোন কষ্ট ও অসুস্থতা ছিল না এবং তিনি নিছক বাহানা করে একথা বলেছিলেন ৷ যদি এর কোন প্রমাণ না থেকে থাকে , তাহলে অযথা কিসের ভিত্তিতে একে মিথ্যা গণ্য করা হবে৷ এ বিষয়টি সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা আমি তাফহীমূল কুরাআন সূরা আল আম্বিয়া , ৬০ টীকায় করেছি এবং আরো কিছু আলোচনা রাসায়েল ও মাসায়েল ২ খণ্ডের ২০ - ২৪ পৃষ্ঠার এসে গেছে৷
৫০. আসল ব্যাপার কি ছিল তা এ বাক্য নিজেই প্রকাশ করছে৷ মনে হচ্ছে সম্প্রদায়ের লোকেরা কোন জাতীয় মেলায় যাচ্ছিল৷ হযরত ইবরাহীমের পরিবারের লোকেরা তাঁকেও সংগে যেতে অনুরোধ করে থাকবে ৷ তিনি আমার শরীর খারাপ , আমি যেতে পারবো না , বলে ওযর পেশ করে দিয়ে থাকবেন৷ এখন যদি একথাটা একেবারে অসত্য বা বাস্তব বিরোধী হতো , তাহলে ঘরের লোকেরা তাঁকে বলতো , শরীর - স্বাস্থ্য তো ভালোই আছে দেখতে পাচ্ছি তাহলে আবর খামখা বাহানা করছো কেন ? কিন্তু যখন তারা এ ওপর গ্রহণ করে তাঁকে পেছনে রেখে চলে গেলো তখন এ থেকে স্বতষ্ফূর্তভাবে একথা প্রকাশ পায় যে , নিশ্চয়ই হযরত ইবরাহীম সে সময় সর্দি , কাশি অথবা এ ধরনের কোন সাধারণ রোগে ভুগছিলেন , যার ফলে পরিবারের লোকেরা তাঁকে রেখে চলে যেতে রাজি হয়ে যায়৷
৫১. এ থেকে পরিস্কর জানা যায় , মন্দিরে মূর্তিদের সামনে বিভিন্ন প্রকার খাবার জিনিস রাখা হয়েছিল৷
৫২. খানে ঘটনা সংক্ষেপে বর্ণনা করে দেয়া হয়েছে৷ সূরা আল আম্বিয়ায় এর যে বিস্তারিত আলোচনা এসেছে তাতে বলা হয়েছে , যখন তারা ফিরে এসে তাদের মন্দিরে সমস্ত মূর্তি ভেঙে পড়ে আছে দেখলো তখন চারদিকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করলো৷ কিছু লোক বললো , ইবরাহীম নামের এক যুবক মূর্তি পূজার বিরুদ্ধে নানান কথা বলে বেড়ায় ৷ একথায় জামায়েতের লোকেরা বললো তাকে ধরে আনো ৷ সে অনুসারে একটি দল দৌড়ে তাঁর কাছে এলো এবং তাঁকে সমবেত জনতার সামনে হাজির করলো৷
৫৩. সূরা আল আম্বিয়ার ৬৯ আয়াতের শব্দাবলী হচ্ছে

আরবী -----------------------------------------------------------------------------

" আমি বললাম , হে আগুন ! শীতল হয়ে যাও এবং নিরাপদ হয়ে যাও ইবরাহীমের জন্য৷ "

সূরা আল আনকাবূতের ২৪ আয়াতে বলা হয়েছেঃ (আরবী --------------------------) (তারপর আল্লাহ থাকে আগুন থেকে উদ্ধার করলেন ) এ থেকে প্রমান হয় , তারা হযরত ইবরাহীমকে (আ) আগুনে নিক্ষেপ করেছিলেন এবং তারপর আল্লাহ তাঁকে তা থেকে সম্পূর্ণ সূস্থ ও অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করেন৷ " তারা তাঁর বিরুদ্ধে একটি পদক্ষেপ নিতে চাচ্ছিল কিন্তু আমি তাদেরকে হেয় প্রতিপন্ন করেছি " আয়াতের এ শব্দগুলোকে এ অর্থে গ্রহণ করা যেতে পারে না যে , তারা হযরত ইবরাহীমকে আগুনে নিক্ষেপ করতে চেয়েছিল , কিন্তু পারেনি৷ বরং ওপরে উল্লেখিত আয়াতের সাথে মিলিয়ে দেখলে তার এ অর্থটিই পরিষ্কার হয়ে ওঠে যে, তারা তাঁকে আগুনে নিক্ষেপ করে মেরে ফেলতে চাচ্ছিল কিন্তু তা করতে পারেনি৷ অলৌকিকভাবে বেঁচে যাবার ফলে হযরত ইবরাহীমের (আ ) শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ হয়ে গেলো এবং মুশরিকদেরকে আল্লাহ হেয় প্রতিপন্ন করলেন৷ এ ঘটনাটি বর্ণনা করার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে কুরাইশদেরকে এ সতর্ক করে দেয়া যে , তোমরা যে ইবরাহীম আলাইহিস সালামের সন্তান হবার গর্ব করে থাকো তাঁর নীতি তা ছিল না যা তোমরা অবলম্বন করেছো বরং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সালাম যে নীতি অবলম্বন করেছেন সেটিই ছিল তাঁর নীতি৷ এখন যদি তোমরা তাকে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য এমন ধরনের চক্রান্ত করো যা হযরত ইবরাহীমের জাতি তাঁর বিরুদ্ধে করেছিল , তাহলে শেষ পর্যন্ত তোমরাই হেয় প্রতিপন্ন হবে৷ মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে হেয় - প্রতিপন্ন করার ক্ষমতা তোমাদের নেই৷
৫৪. আগুন থেকে সুস্থ শরীরে স্বাচ্ছন্দে বেরিয়ে আসার পর যখন হযরত ইবরাহীম (আ) দেশ থেকে বের হয়ে যাবার ফায়সালা করলেন তখন চলার সময় একথাগুলো বলেন ৷
৫৫. এর অর্থ হচ্ছে , আমি আল্লাহর জন্য বের হয়ে পড়ছি৷ কারণ আমি আল্লাহর হয়ে গেছি , তাই আমার জাতি আমার শত্রু হয়ে গেছে৷ নয়তো আমার ও তার মধ্যে কোন দুনিয়াবী ঝগড়া ছিল না এবং এর ভিত্তিতে আমাকে স্বদেশ ত্যাগ করতে হচ্ছে না৷ তাছাড়া দুনিয়ায় আমার যাবার মতো কোন ঠিকানা নেই৷ সমগ্র দেহ-প্রাণকে তাকদীরের হাতে ছেড়ে দিয়ে একমাত্র আল্লাহর ভরসায় বের হয়ে পড়ছি৷ যেদিকে তিনি নিয়ে যাবেন সেদিকেই চলে যাবো৷
৫৬. এ দোয়া থেকে স্বতষ্ফূর্তভাবে একথা জানা যায় যে , হযরত ইবরাহীম সে সময় সন্তানহীন ছিলেন৷ কুরআন মজীদের অন্যান্য স্থানে যে অবস্থা বর্ণনা করা হয়েছে তা থেকে জানা যায় , তিনি কেবলমাত্র নিজের এক স্ত্রী ও এক ভাতিজাকে (হযরত লূত ) সাথে নিয়ে দেশ থেকে বের হয়ে পড়েছিলেন৷ সে সময় স্বাভাবিকভাবেই তাঁর মনে এ কামনার উদ্ভব হয়ে থাকবে যে , আল্লাহ যেন তাঁকে একটি সৎকর্মশীল সন্তান দান করেন , যে এ প্রবাস জীবনে তাঁর দুঃখ লাঘব করতে সাহায্য করবে৷
৫৭. দোয়া করতে করতেই সুসংবাদ দেয়া হয়েছে , এ থেকে একথা মনে করার কোন কারণ নেই৷ কুরআন মজীদেরই অন্য স্থানে হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালামের এ উক্তি উদ্ধৃত হয়েছেঃ

আরবী ----------------------------------------------------------------------------

" আল্লাহর শোকর , তিনি আমাকে বৃদ্ধ বয়সে ইসমাইল ও ইসহাক দান করেছেন৷ (ইবরাহীম , ৩৯ )

এ থেকে প্রমাণ হয় , হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালামের দেয়া এবং এ সুসংবাদের মধ্যে বহু বছরের ব্যবধান ছিল৷ বাইবেল বর্ণনা করছে , হযরত ইসমাঈলের (আ ) জন্মের সময় হযরত ইবরাহীমের (আ) বয়স ছিল ৮৬ বছর ৷ (আদি পুস্তক ১৬: ১৬) অন্যদিকে হযরত ইসহাকের জন্মের সময় তাঁর বয়স ছিল একশত বছর (৫: ২১ )
৫৮. একথা মনে রাখতে হবে , হযরত ইবরাহীম (আ ) স্বপ্ন দেখেননি যে , তিনি পুত্রকে যবেহ করে ফেলেছেন৷ বরং তিনি দেখেছিলেন , তিনি তাকে যবেহ করছেন৷ যদিও তিনি তখন স্বপ্নের এ অর্থই নিয়েছিলেন যে , তিনি পুত্রকে যবেহ করবেন৷ এ কারণে তিনি ঠাণ্ডা মাথায় পুত্রকে কুরবানী করে দেবার জন্য একেবারেই তৈরি হয়ে গিয়েছিলেন৷ কিন্তু স্বপ্ন দেখাবার মধ্যে মহান আল্লাহ যে সূক্ষ্ম বিষয় সামনে রেখেছিলেন তা সামনের ১০৫ আয়াতে তিনি নিজেই সুম্পষ্ট করে দিয়েছিল৷
৫৯. পুত্রকে একথা জিজ্ঞেস করার এ অর্থ ছিল না যে, তুমি রাজি হয়ে গেলে আল্লাহর হুকুম তামিল করবো অন্যথায় করবো না৷ বরং হযরত ইবরাহীম আসলে দেখতে চাচ্ছিলেন , তিনি যে সৎ সন্তানের জন্য দোয়া করেছিলেন সে যথার্থই কতটুকু সৎ ৷ যদি সে নিজে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের লক্ষে প্রাণ উৎসর্গ করতে প্রস্তুত থাকে , তাহলে এর অর্থ হয় দোয়া পুরোপুরি কবুল হয়েছে এবং পুত্র নিছক শারীরিক দিক দিয়েই তাঁর সন্তান নয় বরং নৈতিক ও আধ্যাত্মিক দিক দিয়েও তাঁর সুসন্তান৷
৬০. এ শব্দগুলো পরিস্কার জানিয়ে দিচ্ছে , নবী - পিতার স্বপ্নকে পুত্র নিছক স্বপ্ন নয় বরং আল্লাহর হুকুম মনে করেছিলেন ৷ এখন যদি যথাযর্থই এটি আল্লাহর হুকুম না হতো তাহলে অবশ্যই আল্লাহ পরিস্কারভাবে বা ইংগিতে মাধ্যমে বলে দিতেন যে , ইবরাহীম পুত্র ভুলে একে হুকুম মনে করে নিয়েছে৷ কিন্তু পূর্বাপর আলোচনায় এর কোন ইংগিত নেই৷ এ কারণে নবীদের স্বপ্ন নিছক স্বপ্ন নয় বরং তাও হয় এক ধরনের অহী , মুসলমানরা এ বিশ্বাস পোষণ করে৷ একথা সুস্পষ্ট , যে কথার মাধ্যমে এতবড় একটি নিয়ম আল্লাহর শরীয়াতের অন্তরভুক্ত হতে পারে তা যদি সত্য ভিত্তিক না হতো বরং নিছক একটি বিভ্রান্তি হতো তাহলে আল্লাহ তার প্রতিবাদ করতেন না , এটা হতো একটি অসম্ভব ব্যাপার৷ কুরআনকে যারা আল্লাহর কালাম বলে মানে তাদের পক্ষে আল্লাহর এ ধরনের ভুল হয়ে যেতে পারে একথা মেনে নেয়া একেবারেই অসম্ভব ৷
৬১. অর্থাৎ হযরত ইবরাহীম (আ) যবেহ করার জন্য পুত্রকে চিৎ করে শোয়ননি বরং উপুড় করে শুইয়ে দিয়েছেন , যাতে যবেহ করার সময় পুত্রের মুখ দেখে কোন প্রকার স্নেহ মমতার বসে তাঁর হাত কেঁপে না যায়৷ তাই তিনি নিচের দিক থেকে হাত রেখে ছুরি চালাতে চাচ্ছিলেন৷
৬২. ব্যাকরণবিদদের একটি দল বলেন , এখানে " এবং " শব্দটি " তখন" অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে৷ অর্থাৎ বাক্যটি হবে --- " যখন এরা দু'জনে আনুগত্যের শির নত করে দিল এবং ইবরাহীম পুত্রকে উপুড় করে শুইয়ে দিল তখন আমি আওয়াজ দিলাম৷" কিন্তু অন্য একটি দল বলেন , এখানে " যখন " শব্দটির জওয়াব উহ্য রয়ে গেছে এবং তাকে শ্রোতার মনের কল্পনার ওপর ছেড়ে দেয়া হয়েছে৷ কারণ কথা এত বড় ছিল যে , তাকে শব্দের মাধ্যমে বর্ণনা করার পরিবর্তে কল্পনারই জন্য ছেড়ে দেয়া বেশী সংগত ছিল৷ আল্লাহ যখন দেখে থাকবেন বুড়ো বাপ তার বুড়ো বয়সের আকাংখায় চেয়ে পাওয়া পুত্রকে নিছক তাঁর সন্তুষ্টিলাভের জন্য কুরবানী করে দিতে প্রস্তুত হয়ে গেছেন এবং পুত্রও নিজের গলায় ছুরি চালিয়ে দিতে রাজি হয়ে গেছে , তখন এ দৃশ্য দেখে রহমতের দরিয়া কেমন নাজানি উথলে উঠে থাকবে এবং দুই বাঁধনহারা হয়ে গিয়ে থাকবে , তা কেবল কল্পনাই করা যেতে পারে৷ কথায় তার অবস্থা যতই বর্ণনা করা হোক না কেন তা ব্যক্ত করা কোনক্রমেই সম্ভব নয়৷ বরং বর্ণনায় তার আসল দৃশ্যের অতি অল্পই ফুটে উঠবে৷
৬৩. অর্থাৎ তুমি পুত্রকে যবেহ করে দিয়েছো এবং তার প্রাণবায়ু বের হয়ে গেছে , এটা তো আমি তোমাকে দেখাইনি৷ বরং আমি দেখিয়েছিলাম , তুমি যবেহ করছো৷ তুমি সে স্বপ্নকে সত্য করে দেখিয়ে দিলে৷ কাজেই এখন তোমার সন্তানের প্রাণবায়ূ বের করে নেয়া আমার লক্ষ নয়৷ আসল উদ্দেশ্য যা কিছু তা তোমার সংকল্প , উদ্যোগ ও প্রস্তুতিতেই সফল হয়ে গেছে৷
৬৪. অর্থাৎ যারা সংকর্মের পথ অবলম্বন করে তাদেরকে আমি খামখা কষ্টের মধ্যে ফেলে দেবার এবং দুঃখ ও ক্লেশের মুখোমুখি করার জন্য পরীক্ষার সম্মুখীন করি না৷ বরং তাদের উন্নত গুণাবলী বিকশিত করার এবং তাদেরক উচ্চ মর্যাদা দান করার জন্যই তাদেরকে পরীক্ষার মুখোমুখি করি৷ তারপর পরীক্ষার খাতিরে তাদেরকে যে সংকট সাগরে নিক্ষেপ করি তা থেকে নিরাপদে উদ্ধারও করি৷ তাই দেখো , পুত্রের কুরবানীর জন্য তোমার উদ্যোগ প্রবণতা ও প্রস্তুতিই এমন মর্যাদা দানের জন্য যথেষ্ট হয়ে গেছে , যা আমার সন্তুষ্টি লাভের জন্য যথার্থই পুত্র উৎসর্গকারী লাভ করতে পারতো৷ এভাবে আমি তোমার পুত্রের প্রাণ ও রক্ষা করলাম এবং তোমাকের এ উচ্চ মর্যাদাও দান করলাম৷
৬৫. অর্থাৎ তোমার হাতে তোমার পুত্রকে যবেহ করা উদ্দেশ্য ছিল না৷ বরং দুনিয়ার কোন জিনিসকে তুমি আমার মোকাবিলায় বেশী প্রিয় মনে করো কিনা , সে পরীক্ষা নেয়াই ছিল আসল উদ্দেশ্য৷
৬৬. " বড় কুরবানী " বলতে বাইবেল ও ইসলামী বর্ণনা অনুসারে একটি ভেড়া ৷ সে সময় আল্লাহর ফেরেশতা হযরত ইবরাহীমের সামনে এটি পেশ করেন পুত্রের পরিবর্তে একে যবেহ করার জন্য ৷ একে "বড় কুরবানী " বলার কারণ হচ্ছে এই যে , এটি ইবরাহীমের ন্যায় আল্লাহর বিশ্বস্ত বান্দার জন্য ইবরাহীম পুত্রের ন্যায় ধৈর্যশীল ও প্রাণ উৎসর্গকারী পুত্রের প্রাণের বিনিময়ে ছিল এবং আল্লাহ একে একটি নজীর বিহীন কুরবানীর নিয়ত পুরা করার অসিলায় পরিণত করেছিলেন৷ এ ছাড়াও একে " বড় কুরবানী " গণ্য করার আর একটি বড় কারণ দিয়েছেন যে , এ তারিখে সারা দুনিয়ায় সমস্ত মু'মিন পশু কুরবানী করবে এবং বিশ্বস্ততা ও প্রাণ উসৎর্গকারী এ মহান ঘটনার স্মৃতি পুনরুজ্জীবিত করতে থাকবে৷
৬৭. এখানে এসে আমাদের সামনে এ প্রশ্ন দেখা দেয় যে , হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম তাঁর যে পুত্রকে কুরবানী করতে উদ্যত হয়েছিলেন এবং যিনি স্বতর্ষ্ফূভাবে নিজেকে এ কুরবানীর জন্য পেশ করে দিয়েছিলেন তিনি কে ছিলেন ? সর্বপ্রথম এ প্রশ্নের জবাব আমাদের সামনে আসছে বাইবেল থেকেঃ

" ঈশ্বর ইব্রাহীমের পরীক্ষা করিলেন৷ তিনি তাঁহাকে কহিলেন , হে ইব্রাহিম .................... তুমি আপন পুত্রকে , তোমার অদ্বিতীয় পুত্রকে , যাহাকে তুমি ভালবাস , সেই ইসহাককে লইয়া মোরিয়া দেশে যাও এবং তথাকার যে এক পর্বতের কথা আমি তোমাকে বলিব , তাহার উপর তাহাকে হোমার্থে বলিদান কর৷ " (আদিপুস্তক ২২: ১- ২ )

এ বর্ণনায় একদিকে বলা হচ্ছে , আল্লাহ হযরত ইসহাকের কুরবানী চেয়েছিলেন আবার অন্যদিকে একথা বলা হচ্ছে , তিনি একমাত্র পুত্র ছিলেন ৷ অথচ বাইবেলের নিজেরই অন্যান্য বর্ণনা থেকে চূড়ান্তভাবে প্রমাণ হয় যে , হযরত ইসহাক একমাত্র পুত্র ছিলেন না৷ তাই বাইবেলের নিম্নোক্ত বিস্তারিত বক্তব্যটি একবার দেখুনঃ

" আব্রামের স্ত্রী সারী নিঃসন্তান ছিলেন, এবং হাগার নামে তার এক মিস্রীয় দাসী ছিল৷ তাহতে সারী আব্রামকে কহিলেন দেখ সদাপ্রভূ আমাকে সন্ধ্যা করিয়াছেন , বিনয় করি , তুমি আমার দাসীর কাছে গমন কর , কি জানি ইহা দ্বারা আমি পুত্রবতী হইতে পারিব৷ তখন আব্রাম সারীর বাক্যে সম্মত হইলেন ৷ এইরূপে কানান দেশে আব্রাম দশ বৎসর বাস করিলে পর আব্রামের স্ত্রী সারী আপন দাসী মিস্রীয় হাগারকে লইয়া আপন স্বামী আব্রামের সহিত বিবাহ দিলেন৷ পরে আব্রাম হাগারের কাছে গমন করিলে সে গর্ভবতী হইল৷ " (আদি পুস্তক ১৬: ১-৪ )

"সদাপ্রভূর দতূ তাহাকে আরও কহিলেন , দেখ , তোমার গর্ভ হইয়াছে , তুমি পুত্র প্রসব করিবে , ও তাহার নাম ইশ্মায়েল [ ঈশ্বর শুনেন ] রাখিবে৷" (আদিপুস্তক ১৬: ১১ )

" আব্রামের ছেয়াশী বৎসর বয়সে হাগার আব্রামের নিমিত্তে ইশ্মায়েলকে প্রসব করিল ৷"(১৬:১৬ )

" আর ঈশ্বর আব্রাহামকে কহিলেন ,তুমি তোমার স্ত্রী সারীকে আর সারী বলিয়া ডাকিওনা, তাহার নাম সারা [রানী ] হইল .............. তাহা হইতে এক পুত্রও তোমাকে দিব ; .............. তুমি তাহার নাম ইস্‌হাক [হাস্য ] রাখিবে ,............ আগামী বৎসরের এই ঋতুতে সারা তোমার নিমিত্তে যাহাকে প্রসব করিবে , ........... পরে আব্রাহাম আপনপুত্র ইশ্মায়েলকে ও ............... গৃহে যত পুরুষ ছিল , সেই সকলকে লইয়া ঈশ্বরের আজ্ঞানুসারে সেই তাহাদের লিঙ্গাগ্রচর্ম ছেদন করিলেন৷ আব্রাহামের লিঙ্গাগ্রের ত্বক ছেদন কালে তাঁহার বয়স নিরানব্বই বৎসর ৷ আর তাঁহার পুত্র ইশ্মায়েলের লিঙ্গাগ্রের ত্বক ছেদন কালে তাহার বয়স তের বৎসর ৷ " (আদি পুস্তক ১৭:১৫ - ২৫ )

" আব্রাহামের একশত বৎসর বয়সে তাঁহার পুত্র ইসহাকের জন্ম হয়৷" (আদি পুস্তক ২১:৫)

এ থেকে বাইবেলের বর্ণনার বৈপরীত্য পরিষ্কার সামনে এসে যায়৷ একথা সুস্পষ্ট , ১৪ বছর পর্যন্ত হযরত ইসমাঈল (আ ) হযরত ইবরাহীমের (আ ) একমাত্র সন্তান ছিলেন৷ এখন যদি একমাত্র পুত্রের কুরবানী চাওয়া হয়ে থাকে তাহলে তা হযরত ইসহাকের নয় বরং ইসমাঈলের কুরবানী ছিল ৷ কারণ তিনিই ছিলেন একমাত্র সন্তান ৷ আর যদি হযরত ইসহাকের কুরবানী চাওয়া হয়ে থাকে তাহলে আবার একথা বলা ঠিক নয় যে , একমাত্র সন্তানের কুরবানী চাওয়া হয়েছিল৷

এরপর আমরা ইসলামী বর্ণনাগুলোর প্রসংগে আসতে পারি৷ সেখানে দেখি ভীষণ মতবিরোধ৷ মুফাসসিরগণ সাহাবা ও তাবেঈগণের যে বর্ণনা উদ্ধৃত করেছন তাতে একটি দলের উক্তি এভাবে বর্ণিত হয়েছে যে , তিনি ছিলেন হযরত ইবরাহীমের পুত্র হযরত ইসহাক৷ এ দলে রয়েছেন মনীষীগণঃ

হযরত উমর (রা) , হযরত আলী (রা) , হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা) , হযরত আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিব (রা) , হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা) , হযরত আবু হুরাইরাহ (রা) , কতাদাহ , ইকরামাহ , হাসান বাসরী , সাঈদ ইবনে জুবাইর , মুজাহিদ , শা'বী , মাসরূক মাকহূল , যুহরী , আতা , মুকাতিল , সুদ্দী , কা'ব আহবার , যায়েদ ইবনে আসলাম এবং আরো অনেকে৷

দ্বিতীয় দলটি বলেন , তিনি ছিলেন হযরত ইসমাঈল৷ এ দলে রয়েছেন নিম্নোক্ত মনীষীগণঃ

হযরত আবু বকর (রা) , হযরত আলী (রা) , হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা) ,হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা) , হযরত আবু হুরাইরাহ (রা) , হযরত মু'আবীয়াহ (রা) ইকরামাহ , মুজাহিদ , ইউসুফ ইবনে মেহরান , হাসান বাসরী , মুহাম্মাদ ইবনে কা'ব আল কুরযী , শা'বী , সাঈদ ইবনুল মুসাইয়াব , দ্বাহহাক , মুহাম্মাদ ইবনে আলী ইবনে হুসাইন (মুহাম্মাদ আল বাকের ) ' রাবী ' ইবনে আনাস , আহমাদ ইবনে হামবল এবং আরো অনেকে৷

এ দু'টি তালিকা পর্যলোচনা করলে দেখা যাবে এর মধ্যে অনেকগুলো নাম উভয় তালিকায় পাওয়া যাচ্ছে৷ অর্থাৎ একজন মনীষী বিভিন্ন সময় দু'টি ভিন্ন উক্তি করেছেন ৷ যেমন হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা) থেকে ইকরামাহ এ উক্তি উদ্ধৃত করেছেন যে , তিনি ছিলেন হযরত ইবরাহীমের পুত্র হযরত ইসহাক৷ কিন্তু তাঁরই থেকে আতা ইবনে আবী রাবাহ একথা উদ্ধৃত করেছেনঃ (আরবী ------------------------------------------------------------) (ইহুদীদের দাবী হচ্ছে , তিনি ছিলেন হযরত ইসহাক কিন্তু ইহুদীরা মিথ্যা বলেছে ) অনুরূপভাবে হযরত হাসান বাসরী থেকে একটি বর্ণনায় বলা হয়েছে , তিনি হযরত ইসহাকের কুরবানীর প্রবক্তা ছিলেন কিন্তু আমর ইবনে উবাইদ বলেন , হাসান বাসরীর এ ব্যাপারে কোন সন্দেহ ছিল না যে , হযরত ইবরাহীমের (আ) যে পুত্রকে যবেহ করার হুকুম হয়েছিল তিনি ছিলেন হযরত ইসমাইল আলাইহিস সালাম৷

এ বর্ণনার বিভিন্নার ফলে মুসলিম আলেমণের একটি দল পূর্ণ নিশ্চয়তা সহকারে হযরত ইসহাকের পক্ষে রায় দিয়েছেন৷ যেমন ইবনে জারীর ও কাযী ঈয়ায৷ অনেকে চূড়ান্তভাবে এ মত প্রকাশ করেছেন যে , হযরত ইসমাঈলকেই যবেহ করার ব্যবস্থা করা হয়েছিল৷ যেমন ইবনে কাসীর ৷ আবার কেউ কেউ সংশয়াপন্ন ৷ যেমন জালালুদ্দীন সুয়ূতী৷ কিন্তু গবেষণা ও অনুসন্ধানের দৃষ্টিতে বিচার করলে একথা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয় যে হযরত ইসমাঈলকেই যবেহ করার ব্যবস্থা করা হয়েছিল৷ এর সপক্ষে নিম্নোক্ত যুক্তি রয়েছেঃ

একঃ ওপরে কুরআন মজীদের এ বর্ণনা উদ্ধৃত হয়েছে যে , স্বদেশ থেকে হিজরাত করার সময় হযরত ইবরাহীম (আ) একটি সৎকমশীল পুত্রের জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করেছিলেন৷ এর জবাবে আল্লাহ তাঁর একটি ধৈর্যশীল সন্তানের সুসংবাদ দিয়েছিলেন৷ বক্তব্যের অন্তরনিহিত অর্থ পরিস্কার একথা জানিয়ে দিচ্ছে যে , এ দোয়া ঠিক তখন করা হয়েছিল যখন তিনি ছিলেন সন্তানহীন৷ আর যে সন্তানের সুসংবাদ দেয়া হয়েছিল সেটি ছিল তাঁর প্রথম সন্তান৷ তারপর কুরআনের বক্তব্যের ধারাবহিক বর্ণনা থেকে একথাও প্রকাশ হয় যে , সে শিশুটিই যখন পিতার সাথে দৌড় ঝাঁপ করার যোগ্য হয়ে গেলো তখন তাকে যবেহ করার ইশারা করা হলো৷ এখন একথা চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত যে , হযরত ইবরাহীমের (আ) প্রথম সন্তান ছিলেন হযরত ইসমাঈল ৷ হযরত ইসহাক প্রথম সন্তান ছিলেন না কুরআনে হযরত ইবরাহীমের সন্তানের ধারাবাহিকতার বর্ণনা এভাবে দেয়া হয়েছেঃ

আরবী ------------------------------------------------------------------------------

দুইঃ কুরআন মজীদে যেখানে হযরত ইসহাকের সুসংবাদ দেয়া হয়েছে সেখানে তাঁর জন্য " গোলামুন আলীমন " (জ্ঞানবান বালক ) শব্দ ব্যবহার করা হয়েছেঃ

আরবী --------------------------------------------------------------------------------

কিন্তু এখানে যে সন্তানটির সুসংবাদ দেয়া হয়েছে তার জন্য " গোলামুন হালীমুন " (ধৈর্যশীল বালক ) শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে৷ এ থেকে প্রমাণিত হয় , দুই পুত্রের দু'টি পৃথক বৈশিষ্ট ছিল এবং যবেহ করার হুকুমটি জ্ঞানবান সন্তানের জন্য ছিল না , ছিল ধৈর্যশীল সন্তানের জন্য৷

তিনঃ কুরআন মজীদে হযরত ইসহাকের সুসংবাদ দেবার সাথে সাথেই এ সুসংবাদও দেয়া হয়েছিল যে , তাঁর গৃহে ইয়াকুবের মতো পুত্র সন্তান জন্ম নেবেঃ

আরবী --------------------------------------------------------------------------------

এখন একথা পরিস্কার যে , সন্তান জন্মের খবর দেবার সাথে সাথেই তার ওখানে একটি সুযোগ্য পুত্রসন্তানের জন্মের ও খবর দেয়া হয়ে গিয়ে থাকে , তার ব্যাপারে যদি হযরত ইবরাহীমকে এ স্বপ্ন দেখানো হয় যে , তিনি তাকে যবেহ করছেন , তাহলে হযরত ইবরাহীম কখনো একথা বুঝতে পারতেন না যে , তাঁর এ পুত্রকে কুরবানী করে দেবার ইংগিত করা হচ্ছে ৷ আল্লামা ইবনে জারীর এ যুক্তিটির জবাবে বলেন , সম্ভবত এ স্বপ্নটি হযরত ইবরাহীমকে এমন এক সময় দেখানো হয় যখন হযরত ইসহাকের গৃহে হযরত ইয়াকুবের জন্ম হয়ে গেছে৷

কিন্তু আসলে এটি ঐ যুক্তির একটি অত্যন্ত দুর্বল জবাব৷ কুরআন মজীদের শব্দ হচ্ছেঃ " যখন ছেলেটি বাপের সাথে দৌড় ঝাঁপ করার যোগ্য হয়ে গেলো" ঠিক এ সময়ই এ স্বপ্নটি দেখানো হয়েছিল৷ যে ব্যক্তি মুক্ত মনে এ শব্দগুলো পড়বে তার সমানে ভেসে উঠবে আট দশ বছরের একটি ছেলের ছবি৷ কোন জোয়ান ব্যক্তি যিনি সন্তানের পিতা তাঁর সম্পর্কে একথা বলা হয়েছে বলে কেউ কল্পনা ও করতে পারবে না৷

চারঃ কুরআনে আল্লাহ সমস্ত কাহিনী বর্ণণা করার পর শেষে বলছেন , " আমি তাকে ইসহাকের সুসংবাদ দিয়েছি , সৎকর্মশীলদের মধ্য থেকে একজন নবী৷ " এ থেকে পরিস্কার জানা যায় , যে পুত্রকে যবেহ করার ইংগিত দেয়া হয়েছিল , এটি সে পুত্র নয়৷ বরং পূর্বে অন্য কোন পুত্রের সুসংবাদ দেয়া হয়৷ তারপর যখন সে পিতার সাথে দৌড়াদৌড়ি ও চলাফেরা করার যোগ্যতা অর্জন করে তখনই তাকে যবেহ করার হুকুম হয়৷ তারপর যখন হযরত ইবরাহীম এ পরীক্ষায় সফলকাম হয়ে যান তখন তাঁকে আর এক সন্তান অর্থাৎ ইসহাক আলাইহিস সালামের জন্মের সুসংবাদ দেয়া হয়৷ ঘটনার এ বিন্যাস চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দান করে যে , যে পুত্রটিকে যবেহ করার হুকুম হয়েছিল তিনি হযরত ইসহাক ছিলেন না৷ বরং তাঁর কয়েক বছর আগে সে পুত্রের জন্ম হয়েছিল৷ আল্লামা ইবনে জারীর এ সুস্পষ্ট যুক্তিটি এ বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন যে , প্রথমে কেবলমাত্র হযরত ইসহাকের জন্মের সুসংবাদ দেয়া হয়েছিল , তারপর যখন তিনি আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য কুরবানী করতে প্রস্তুত হয়ে গেলেন তখন তাঁর নবী হওয়ার সুসংবাদ দেয়া হলো কিন্তু এটি তার প্রথম জবাবটি থেকেও দুর্বলতার৷ সত্যই যদি ব্যাপার এটাই হতো , তাহলে আল্লাহ এভাবে বলতেন নাঃ " আমি তাকে ইসহাকের সুসংবাদ দেই , সৎকর্মশীলদের মধ্য থেকে একজন নবী৷ " বরং তিনি বলতেন , আমি তাকে এ এ সুসংবাদ দেই যে , তোমার এ পুত্র একজন নবী হবেন সৎকর্মশীলদের মধ্য থেকে ৷

পাঁচঃ নির্ভরযোগ্য বর্ণনা থেকে প্রমাণিত যে , হযরত ইসমাঈলের বিনিময়ে যে ভেড়াটি যবেহ করা হয়েছিল তার শিং কা'বা ঘরে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে যুবাইরের (রা ) যামানা পর্যন্ত সংরক্ষিত ছিল৷ পরবর্তীতে হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফ যখন হরম শরীফে ইবনে যুবাইরকে (রা) অবরোধ করে এবং কা'বা ঘর ভেঙে ফেলে তখন এ শিংও নষ্ট হয়ে যায়৷ ইবনে আববাস ও আমের শা'বী উভয়ই এ মর্মে সাক্ষ দেন যে , তারা নিজেরা কা'বাঘরে এ শিং দেখেছিলেন (ইবনে কাসীর ) এ দ্বারা প্রামাণিত হয় যে , কুরবানীর এ ঘটনা সিরিয়ায় নয় , মক্কা মু'আযযমায় সংঘটিত হয়েছিল৷ এবং হযরত ইসমাঈলের সাথেই ঘটেছিল৷ তাইতো হযরত ইবরাহীম ও ইসমাঈলের নির্মিত কা'বাঘরে তার স্মৃতিচিহ্ন সংরক্ষিত রাখা হয়েছিল৷

ছয়ঃ শত শত বছর থেকে আরবীয় বর্ণনাসমূহে ও কিংবদন্তীতে একথা সংরক্ষিত ছিল যে , কুরবানীর এ ঘটনা ঘটেছিল মিনায়৷ আর এটা শুধুমাত্র কিংবদন্তীই ছিল না বরং সে সময় থেকে নিয়ে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যামানা পর্যন্ত হজ্জের কর্মকাণ্ডের মধ্যে এ কাজটিও নিয়মিতভাবে শামিল হয়ে আসছিল যে এ মিনা নামক স্থানে যেখানে হযরত ইবরাহীম কুরবানী করেছিলেন প্রত্যেক ব্যক্তি সেখানে গিয়ে পশু কুরবানী করতো৷ তারপর যখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আগম হলো তখন তিনিও এ পদ্ধতি অব্যাহত রাখেন৷ এমন কি আজো হজ্জের সময় যিলহজ্জের দশ তারিখে মিনায় কুরবানী করা হয়৷ সাড়ে চার হাজার বছরের এ অবিচ্ছিন্ন কার্যক্রম একথার অনস্বীকার্য প্রমাণ পেশ করে যে , হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালামের এ কুরবানীর উত্তরাধিকারী ছিল বনী ইসমাঈল , বনী ইসহাক নয়৷ হযরত ইসহাকের বংশে এ ধরনের কোন রেওয়াজ কোন দিন জারি থাকেনি , যাতে সমস্ত জাতির একসাথে কুরবানী করতো এবং তাকে হযরত ইবরাহীমের কুরবানীর স্মৃতি বলা হতো৷

" প্রকৃত ব্যাপার তো আল্লাহই জানেন৷ তবে বাহ্যত মনে হয় , এ সমস্ত উক্ত (হযরত ইসহাকের আল্লাহর জন্য কুরবানী হবার পক্ষে যেগুলো বলা হয়েছে ) কা'ব আহবার থেকে উদ্ধৃত হয়েছে৷ তিনি যখন হযরত উমরের (রা) আমলে মুসলমান হন তখন মাঝে মধ্যে ইহুদী ও খৃষ্টানদের প্রাচীর কিতাবসমূহের বাণী তাঁদেরকে পড়ে শুনাতেন এবং হযরত উমর (রা) সেসব শুনতেন৷ এ কারণে অন্য লোকেরাও তাঁর কথা শুনতে শুরু করে এবং তিনি যেসব ভালো মন্দ বর্ণনা করতেন সেগুলো তারা বর্ণনা করতে শুরু করে৷ অথচ এ উম্মতের জন্য তাঁর এ তথ্য সম্ভারের মধ্য থেকে কোন জিনিসেরই প্রয়োজন ছিল না৷ "

মুহাম্মাদ ইবনে কা'ব কুরাযীর একটি রেওয়ায়াত এ প্রশ্নটির ওপর আরো কিছুটা আলোকপাত করে৷ তিনি বর্ণনা করেন , একবার আমার উপস্থিতিতে হযরত উমর ইবনে আবদুল আযীযের (র ) সামনে এ প্রশ্ন উত্থাপিত হয় যে , আল্লাহর জন্যে যবেহ করা হয়েছিল কাকে , হযরত ইসহাককে না হযরত ইসমাঈলকে ? সে সময় এমন এক ব্যক্তিও মজলিসে হাজির ছিলেন যিনি পূর্বে ইহুদী আলেমদের অন্তরভুক্ত ছিলেন এবং পরে সাচ্চা দিলে মুসলমান হয়েছিলেন ৷ তিনি বলেন , " হে আমীরুল মু'মেনীন ! আল্লাহর কসম , তিনি ইসমাঈল ছিলেন৷ ইহুদীরা একথা জানে কিন্তু আরবদের প্রতি হিংসাবশত তারা দাবী করে যে , হযরত ইসহাককে আল্লাহর জন্য যবেহ করার ব্যবস্থা করা হয়েছিল৷ (ইবনে জারীর ) এ দু'টি কথাকে মিলিয়ে দেখলে জানা যায় , আসলে এটা ছিল ইহুদী প্রচারণার প্রভাব এবং মুসলমানদের মধ্যে এ প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছিল৷ আর মুসলমানরা যেহেতু তাত্বিক বিষয়ে সবসময় বিদ্বেষ ও স্বার্থপ্রীতি মুক্ত থেকেছে তাই তাদের অনেকেই প্রাচীর সহীফাগুলোর বরাত দিয়ে ঐতিহাসিক বর্ণনার ছদ্মবরণে ইহুদীরা যেসব বর্ণনা পেশ করতো সেগুলোকে নিছক একটি তাত্বিক সত্য মনে করে গ্রহণ করে নেয় এবং একথা চিন্তা করেনি যে , এর মধ্যে তত্বের পরিবর্তে বিদ্বেষ ও স্বার্থপ্রীতি সক্রিয় রয়েছে৷
৬৮. যে উদ্দেশ্য হযরত ইবরাহীমের কুরবনীর কাহিনী এখানে বর্ণনা করা হয়েছে এ বাক্যটি তার সমগ্র আবয়বের ওপর আলোকপাত করে৷ হযরত ইবরাহীমের দুই পুত্রের বংশ থেকে দুটি সুবিশাল জাতির সৃষ্টির হয়৷ একটি বনী ইসরাঈল জাতি৷ তাদের মধ্যে জন্ম হয় দুনিয়ার দু'টি বড় ধর্মমত (ইহুদীবাদ ও খৃষ্টবাদ ) তারা পৃথিবীর অনেক বড় ও বিস্তৃত অংশকে নিজেদের অনুসারী করে৷ দ্বিতীয়টি বনী ইসমাঈল জাতি ৷ কুরআন নাযিলের সময় তারা ছিল সমগ্র আরববাসীর নেতা ও অনুসরণযোগ্য৷ সে সময় মক্কা মু'আযযমার কুরাইশ গোত্র তাদের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মর্যাদার অধিকারী ছিল৷ ইবরাহীমী বংশধারার এ দু'টি শাখা যে উন্নতি , বিস্তৃতি ও খ্যাতি অর্জন করে তা সম্ভব হয় হযরত ইবরাহীম ও তাঁর দুই মহান মর্যাদা সম্পন্ন পুত্রের সাথে তাদের রক্ত সম্পর্কের কারণে৷ নয়তো দেখা যায় , দুনিয়ায় এমন কত শত পরিবারের উদ্ভব হয়েছে এবং কালক্রমে অপরিচিতর গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে ৷ এখন মহান আল্লাহ এ পরিবারের ইতিহাসের সবচেয়ে স্বর্ণোজ্জ্বল কর্মকাণ্ড বর্ণনা করার পর এ উভয় দলকে এ অনুভূতি দান করেছেন যে , তোমরা দুনিয়ায় যা কিছু মর্যাদা লাভ করছো , এসবের মূলে রয়েছে তোমাদের বাপ দাদা ইবরাহীম , ইসমাঈল ও ইসহাক আলাইহিমুস সালাম প্রতিষ্ঠিত আল্লাহর আনুগত্য , নিঃস্বার্থ আন্তরিকতা ও আল্লাহর হুকুমের জন্য উৎসর্গিত প্রাণের গৌরবোজ্জ্বল ঐতিহ্য ৷ তিনি তাদেরকে বলেন , আমি তাদেরকে যে বরকত ও সমৃদ্ধি দান করেছিলাম এবং নিজের দয়া ও অনুগ্রহের যে বারিধারা তাদের প্রতি বর্ষণ করেছিলাম তা চোখ বন্ধ করে বর্ষণ করিনি৷ আমি সহসাই কোন কারণ ছাড়াই এক ব্যক্তি ও তাঁর দুই পুত্রকে বাছাই করে তাদের প্রতি অনুগ্রহ ও দাক্ষিণ্যের ঝরণাধারা প্রবাহিত করিনি৷ বরং তাঁরা নিজেদের প্রকৃত মালিক ও প্রভুর প্রতি আনুগত্য ও বিশ্বস্ততার কিছু প্রমান পেশ করেছিলেন এবং তারই ভিত্তিতে এসব অনুগ্রহের হকদার হয়েছিলেন৷ এখন তোমরা নিছক তাদের আওলাদ ও অহংকারের ভিত্তিতে সেসব অনুগ্রহ ও নিয়ামতের হকদার হতে পারো না৷ আমি তো অবশ্যই দেখবো , তোমাদের মধ্যে কে সৎকর্মশীল এবং কে জালেম ও পাপাচারী৷ তারপর যে যেমনটি হবে তার সাথে ঠিক তেমনি ধরনেরই ব্যবহার করা হবে৷