(৩৭:২২) (হুকুম দেয়া হবে) ঘেরাও করে নিয়ে এসো
(৩৭:২৩) সব জালেমকে, ১৪ তাদের সাথিদেরকে ১৫ এবং আল্লাহকে বাদ দিয়ে যেসব মাবুদদের তারা বন্দেগী করতো তাদেরকে ১৬ তারপর তাদের সবাইকে জাহান্নামের পথ দেখিয়ে দাও৷
(৩৭:২৪) আর এদেরকে একটু থামাও, এদেরকে কিছু জিজ্ঞেস করতে হবে৷
(৩৭:২৫) “ তোমাদের কি হয়েছে, এখন কেন পরস্পরকে সাহায্য করো না?
(৩৭:২৬) আরে, আজ তো এরা নিজেরাই নিজেদেরকে (এবং একজন অন্যজনকে) সমর্পণ করে দিয়ে যাচ্ছে৷” ১৭
(৩৭:২৭) এরপর এরা একে অন্যের দিকে ফিরবে এবং পরস্পর বিতর্ক শুরু করে দেবে৷
(৩৭:২৮) (আনুগত্যকারীরা তাদের নেতাদেরকে) বলবে, “ তোমরা তো আমাদের কাছে আসতে সোজা দিক দিয়ে৷” ১৮
(৩৭:২৯) তারা জবাব দেবে, “না, তোমরা নিজেরাই মু’মিন ছিলে না৷
(৩৭:৩০) তোমাদের ওপর আমাদের কোন জোর ছিল না৷ বরং তোমরা নিজেরাই ছিলে বিদ্রোহী৷
(৩৭:৩১) শেষ পর্যন্ত আমরা আমাদের রবের এ ফরমানের হকদার হয়ে গেছি যে, আমরা আযাবের স্বাদ গ্রহণ করবো৷
(৩৭:৩২) কাজেই আমরা তোমাদেরকে বিভ্রান্ত করেছিলাম কারণ আমরা নিজেরাই বিভ্রান্ত ছিলাম৷” ১৯
(৩৭:৩৩) এভাবে তারা সবাই সেদিন শাস্তিতে শরীক হবে৷ ২০
(৩৭:৩৪) আমি অপরাধীদের সাথে এমনটিই করে থাকি৷
(৩৭:৩৫) এরা ছিল এমন সব লোক যখন এদেরকে বলা হতো, “আল্লাহ ছাড়া আর কোন মাবুদ নেই” তখন এরা অহংকার করতো৷
(৩৭:৩৬) এবং বলতো, “আমরা কি একজন উন্মাদ কবির জন্য আমাদের মাবুদদেরকে ত্যাগ করবো?”
(৩৭:৩৭) অথচ সে সত্য নিয়ে এসেছিল এবং রসূলদেরকে সত্য বলে মেনে নিয়েছিল ২১
(৩৭:৩৮) (এখন তাদেরকে বলা হবে) তোমরা নিশ্চিতভাবেই যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির স্বাদ গ্রহণ করবে
(৩৭:৩৯) এবং পৃথিবীতে তোমরা যে সমস্ত কাজ করতে তারই প্রতিদান তোমাদের দেয়া হচ্ছে৷
(৩৭:৪০) কিন্তু আল্লাহর নির্বাচিত বান্দারা (এ অশুভ পরিণাম) মুক্ত হবে৷
(৩৭:৪১) তাদের জন্য রয়েছে জ্ঞাত রিযিক, ২২
(৩৭:৪২) সব রকমের
(৩৭:৪৩) সুস্বাদু জিনিস ২৩ এবং নিয়ামতে পরিপূর্ণ জান্নাত, যেখানে তাদেরকে মর্যাদা সহকারে রাখা হবে৷
(৩৭:৪৪) বসবে তারা আসনে মুখোমুখি৷
(৩৭:৪৫) শরাবের ২৪ ঝরণা ২৫ থেকে পানপাত্র ভরে ভরে তাদেরকে ঘুরে ঘুরে পরিবেশন করা হবে৷ ২৬
(৩৭:৪৬) উজ্জ্বল শরাব, পানকারীদের জন্য হবে সুস্বাদু৷
(৩৭:৪৭) তা তাদের কোন শারীরিক ক্ষতি করবে না এবং তাতে তাদের বুদ্ধিও ভ্রষ্ট হবে না৷ ২৭
(৩৭:৪৮) আর তাদের কাছে থাকবে আনত নয়না ২৮ সুলোচনা নারীগণ, ২৯
(৩৭:৪৯) এমন নাজুক যেমন হয় ডিমের খোসার নিচে লুকানো ঝিল্লি ৷ ৩০
(৩৭:৫০) তারপর তারা একজন অন্যজনের দিকে ফিরে অবস্থা জিজ্ঞেস করবে৷
(৩৭:৫১) তাদের একজন বলবে, “দুনিয়ায় আমার ছিল এক সংগী
(৩৭:৫২) সে আমাকে বলতো, তুমিও কি সত্য বলে মেনে নেবার দলে? ৩১
(৩৭:৫৩) যখন আমরা মরে যাবো, মাটির সাথে মিশে যাবো এবং অস্থি পিঞ্জরই থেকে যাবে তখন সত্যিই কি আমাদের শাস্তি ও পুরস্কার দেয়া হবে?
(৩৭:৫৪) তোমরা কি দেখতে চাও সে এখন কোথায় আছে ?”
(৩৭:৫৫) এ বলে যেমনি সে নিচের দিকে ঝুঁকবে তখনই দেখবে তাকে জাহান্নামের অতল গভীরে৷
(৩৭:৫৬) এবং তাকে সম্বোধন করে বলতে থাকবে, “আল্লাহর কসম, তুই তো আমাকে ধ্বংসই করে দিতে চাচ্ছিলি৷
(৩৭:৫৭) আমার রবের মেহেরবাণী না হলে আজ আমিও যারা পাকড়াও হয়ে এসেছে তাদের অন্তরভুক্ত হতাম৷ ৩২
(৩৭:৫৮) আচ্ছা, তাহলে কি এখন আমরা আর মরবো না?
(৩৭:৫৯) আমাদের যে মৃত্যু হবার ছিল তা প্রথমে হয়ে গেছে ? এখন আমাদের কোন শাস্তি হবে না?” ৩৩
(৩৭:৬০) নিশ্চিতভাবেই এটিই মহান সাফল্য৷
(৩৭:৬১) এ ধরনের সাফল্যের জন্যই কাজ করতে হবে তাদের যারা কাজ করে৷
(৩৭:৬২) বলো, এ ভোজ ভালো, না যাক্কুম গাছ? ৩৪
(৩৭:৬৩) আমি এ গাছটিকে জালেমদের জন্য ফিতনায় পরিণত করে দিয়েছি৷ ৩৫
(৩৭:৬৪) সেটি একটি গাছ, যা বের হয় জাহান্নামের তলদেশ থেকে৷
(৩৭:৬৫) তার ফুলের কলিগুলো যেন শয়তানদের মুণ্ডু৷ ৩৬
(৩৭:৬৬) জাহান্নামের অধিবাসীরা তা খাবে এবং তা নিয়ে পেট ভরবে৷
(৩৭:৬৭) তারপর পান করার জন্য তারা পাবে ফুটন্ত পানি৷
(৩৭:৬৮) আর এরপর তাদের প্রত্যাবর্তন হবে৷ এ অগ্নিময় দোজখের দিকে৷ ৩৭
(৩৭:৬৯) এরা এমনসব লোক যারা নিজেদের বাপ-দাদাদেরকে পথভ্রষ্ট পেয়েছে৷
(৩৭:৭০) এবং তাদেরই পদাংক অনুসরণ করে ছুটে চলেছে৷ ৩৮
(৩৭:৭১) অথচ তাদের পূর্বে বহু লোক পথভ্রষ্ট হয়ে গিয়েছিল৷
(৩৭:৭২) এবং তাদের মধ্যে আমি সতর্ককারী রসূল পাঠিয়েছিলাম৷
(৩৭:৭৩) এখন দেখো সে সতর্ককৃত লোকদের কি পরিণাম হয়েছিল৷
(৩৭:৭৪) এ অশুভ পরিণতির হাত থেকে কেবলমাত্র আল্লাহর সে বান্দারাই রেহাই পেয়েছে যাদেরকে তিনি নিজের জন্য স্বতন্ত্র করে নিয়েছেন৷
১৪. জালেম বলতে কেবল তাদেরকে বুঝানো হয়নি যারা অন্যের প্রতি জুলুম করেছে৷ বরং কুরআনের পরিভাষায় এমন প্রত্যেক ব্যক্তিই জালেম যে আল্লাহর মোকাবিলায় বিদ্রোহ , সীমালংঘন ও নাফরমানির পথ অবলম্বন করেছে৷
১৫. মূলে (আরবী ---------------) (আযওয়াজ ) শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে৷ এর অর্থ তাদের এমন সব স্ত্রীও হতে পারে যারা এ বিদ্রোহে সহযোগী ছিল৷ আবার এমনসব লোকও হতে পারে যারা তাদেরকেই মতো বিদ্রোহী সীমালংঘনকারী ও নাফরমান ছিল৷ এ ছাড়া এর অর্থ এও হতে পারে যে , এক এক ধরনের অপরাধীকে আলাদ আলাদা জোটের আকারে একত্র করা হবে৷
১৬. এখানে মাবুদদের অর্থ দু' ধরনের মাবুদ৷ এক , এমনসব মানুষ ও শয়তান যাদের নিজেদের ইচ্ছা ও প্রচেষ্টা এ ছিল যে , লোকেরা আল্লাহকে বাদ দিয়ে তাদের বন্দেগী করুক৷ দুই , এমনসব মূর্তি , গাছ , পাথর ইত্যাদি যাদের পূজায় দুনিয়াবাসীরা লিপ্ত ছিল৷ এর মধ্যে প্রথম ধরনের মাবুদরা নিজেরাই অপরাধীদের অন্তরভুক্ত হবে এবং শাস্তির জন্য তাদেরকে জাহান্নামের পথ দেখানো হবে৷ আর দ্বিতীয় ধরনের মাবুদদেরকে তাদের ইবাদাতকারীদের সাথে এ জন্য জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে যে , তারা এদেরকে দেখে সবসময় লজ্জা অনুভব করবে এবং নিজেদের নির্বুদ্ধিতার অনুশোচনা করতে থাকবে৷ এরা ছাড়া তৃতীয় আর এক ধরনের মাবুদ হচ্ছে , দুনিয়ায় যাদেরকে পূজা করা হয়েছে কিন্তু তারা কখনো তাদের পূজা - উপসনা করার প্রতি ইংগিত করেনি৷ বরং তাহারা সবসময় মানুষকে আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো পূজা করতে নিষেধ করেছেন৷ যেমন ফেরেশতা , আম্বিয়া ও আউলিয়া এ ধরনের মাবুদদেরকে মোটেই অন্যান্য মাবুদদের মতো তাদের উপাসনাকারীদের সাথে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে না৷
১৭. প্রথম বাক্যটি বলা হবে অপরাধীদেরকে সম্বোধন করে ৷ দ্বিতীয় কাব্যটি উপস্থিত এমনসব সাধারণ ব্যক্তিবর্গের উদ্দেশ্যে বলা হবে যারা সে সময় জাহান্নামের পথে অপরাধীদের রওয়ানা হবার দৃশ্য দেখতে থাকবে৷ এ বাক্যটি নিজেই জানিয়ে দিচ্ছে সে সময় অবস্থাটা কেমন হবে৷ বড় বড় তাগড়া অপরাধীদের কোমরের বল শেষ হয়ে যাবে ৷ কোন প্রকার প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি না করে তারা কোন ধরে জাহান্নামের দিকে চলে যেতে থাকবে ৷ কোথাও কোন ' জাহাপনা' ধাক্কা খেতে থাকবে এবং দরবারীদের মধ্য থেকে কেউ সেই " মহামতি মহামহিকে " উদ্ধার করতে এগিয়ে আসবে না৷ কোথাও কোন বিশ্ব বিজয়ী ও কোন ডিরেক্টর চরম লাঞ্ছনা সহকারে চলে যেতে থাকবে এবং তার পরাক্রমশালী সেনাদল নিজেরাই তাকে দণ্ড দেবার জন্য এগিয়ে দেবে৷ কোথাও কোন পীর সাহেব বা গুরুজী অথবা হোলি ফাদার জাহান্নামের শাস্তি লাভ করবে এবং মুরীদদের একজনও " হুজুর আলা'র মর্যাদাহানির কথা ভাববে না৷ কোথাও কোন জাতীয় নেতা বড়ই হীনতার মধ্যে জাহান্নামের পথে যাত্রা করবে এবং দুনিয়ায় যেসব লোক তার শ্রেষ্টত্ব ও প্রাধান্যের ঝাণ্ডা বুলন্দ করে বেড়াতো তারা সবাই তার দিক থেকে দৃষ্টি অন্যদিকে ফিরিয়ে নেবে৷ সবচেয়ে মজার ব্যাপার হচ্ছে এই যে , যে প্রেমিক দুনিয়ায় তার প্রেমাম্পদের জন্য জীবন দিকে প্রস্তুত ছিল সেও তার প্রেমাম্পদের দুরবস্থার দিকে ভ্রুক্ষেপই করবে না৷ এ অবস্থার চিত্র এঁকে মহান আল্লাহ আসলে একথা বুঝাতে চান যে , দুনিয়ায় মানুষের সাথে মানুষের যে সম্পর্ক খোদাদ্রোহিতার ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে তা কিভাবে আখেরাতে ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যাবে এবং এখানে যারা নিজের শ্রেষ্ঠত্বের অহংকার মত্ত হয়ে আছে সেখানে তাদের অহংকারের দেয়াল কিভাবে মিসমার হয়ে যাবে৷
১৮. মূলে বলা হয়েছেঃ (আরবী ----------------------------------------------) " তোমরা আমাদের কাছে আসতে ইয়ামীনের পথে৷ " ইয়ামীন শব্দটি আরবী ভাষায় বিভিন্ন অর্থে বলা হয়৷ যদি একে শক্তি অর্থে বলা হয় , তাহলে এর অর্থ হবে আমরা দুর্বল ছিলাম , তোমরা আমাদের ওপর প্রাধান্য লাভ করেছিলে তাই তোমরা নিজেদের শক্তি ব্যবহার করে আমাদের গোমরাহীর দিকে টেনে নিয়ে গিয়েছিল৷ যদি একে কল্যাণ অর্থে নেয়া হয় , তাহলে এর অর্থ হবে , তোমরা কল্যাণকামী সেজে আমাদের ধোঁকা দিয়েছে৷ তোমরা আমাদের নিশ্চয়তা দিচ্ছিলে , যে পথে তোমরা আমাদের চালাচ্ছো এটিই সত্য ও কল্যাণের পথ৷ তাই আমরা ধোঁকায় পড়ে গিয়েছিলাম ৷ আর যদি একে কসম অর্থে গ্রহণ করা হয় , তাহলে এর অর্থ হবে তোমরা কসম খেয়ে খেয়ে আমাদের নিশ্চিন্ত করতে যে , তোমরা যা পেশ করছো তাই সত্য৷
১৯. ব্যাখ্যার জন্য দেখুন তাফহীমূল কুরআন , সূরা সাবা , ৫১ , ৫২ , ৫৩ টীকা ৷
২০. অর্থাৎ নেতা ও অনুসারী এবং গোমরাহ ও গোমরাহকারী উভয়ই একই শাস্তি লাভ করবে৷ অনুসারীরদের এ ওযর মেনে নেয়া হবে না যে , তারা নিজেরা গোমরাহ হয়নি বরং তাদেরকে গোমরাহ করা হয়েছিল ৷ অন্যদিকে নেতাদের এ ওযর ও গ্রহণ করা হবে না যে , গোমরাহ লোকেরা নিজেরাই সরল - সত্য পথের প্রত্যাশী ছিল না৷
২১. রসূলদেরকে সত্য বলে মেনে নেয়ার তিনটি অর্থ রয়েছে এবং এ তিনটি অর্থই এখানে প্রযুক্ত৷ এক , তিনি পূর্ববর্তী এমন কোন রসূলের বিরোধিতা করেননি যার অনুসারীদের তাঁর বিরুদ্ধে পোষণ করার কোন যুক্তিসংগত কারণ থাকতো৷ বরং তিনি আল্লাহর সমস্ত পূর্ববর্তী রসূলদের সত্য বলতেন৷ দুই , তিনি কোন নতুন ও অভিনব কথা আনেননি৷ বরং শুরু থেকে আল্লাহর সব রসূল যে কথা বলে আসছিলেন তিনি ও সে একই কথা পেশ করতেন৷ তিন , পূর্ববর্তী রসূলগণ তাঁর সম্পর্কে যেসব খবর দিয়েছিলেন তিনি সেগুলোর সঠিক প্রয়োগক্ষেত্র ছিলেন৷
২২. অর্থাৎ এমন রিযিক যার সমস্ত গুণাবলী বর্ণনা করে দেয়া হয়েছে৷ যা পাওয়ার ব্যাপারে তারা নিশ্চিত৷ যে ব্যাপারে তারা একেবারে নিশ্চিন্ত যে , তা তারা চিরকাল পেতে থাকবে৷ যে ব্যাপারে কি পাওয়া যাবে কি না পাওয়া যাবে , এ ধরনের কোন অনিশ্চয়তা নেই৷
২৩. এর মধ্যে এদিকেও একটি সূক্ষ্ম ইশারা রয়েছে যে , জান্নাতে আহার্য দ্রব্যাদি খাদ্য হিসেবে নয় বরং স্বাদ উপভোগের জন্য ব্যবহৃত হবে৷ অর্থাৎ সেখানে খাবার এ উদ্দেশ্যে খাওয়া হবে না যে , শরীরের ক্ষয় হয়ে যাওয়া অংশগুলোর শূন্যতা পূরণ করা হবে৷ কারণ সে চিরন্তন জীবনে শরীরের অংশগুলোর কোন ক্ষয়ই হবে না৷ মানুষের সেখানে ক্ষুধাও লাগবে না৷ এ দুনিয়ায় শরীরের অংশের ক্ষয়ের কারণে মানুষের ক্ষুধা পায় ৷ আর শরীর নিজেকে জীবিত রাখার জন্য সেখানে খাদ্যও চাইবে না৷ এ কারণে জান্নাতের খাদ্যের জন্য (আরবী -----------------------) (ফাওয়াকেহ ) শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে৷ এর অর্থের মধ্যে " খাদ্যে পরিণত হওয়া " এর পরিবর্তে " স্বাদ উপভোগ করা " এর অর্থ অধিকতর লক্ষণীয়৷
২৪. আসলে এখানে শরাব শব্দটি সুস্পষ্ট করে বলা হয়নি৷ বরং শুধুমাত্র (আরবী -------------) (পানপাত্র ) শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে৷ কিন্তু আরবী ভাষায় (আরবী ----------) শব্দটি ব্যবহার করে সবসময় শরাব অর্থই গ্রহণ করা হয়৷ যে পেয়ালায় শরাবের পরিবর্তে দুধ বা পানি থাকে অথবা যে পেয়ালার কিছুই থাকে না তাকে (আরবী ----------) (কাস ) বলা হয় না"৷কাস শব্দটি একমাত্র তখনই বলা হয় যখন তার মধ্যে মদ থাকে৷
২৫. অর্থাৎ দুনিয়ায় ফল ও খাদ্য বস্তু পচিয়ে যে শরাব তৈরি করা হয় এ শরাব তেমন ধরনের হবে না৷ বরং তা প্রাকৃতিকভাবে ঝরণা থেকে উৎসারিত হবে এবং নদীর আকারে প্রবাহিত হবে৷ সূরা মুহাম্মাদের এ বিষয়বস্তুটি সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করা হয়েছেঃ

আরবী -----------------------------------------------------------------------------

" আর শরাবের নদী , যা পানকারীদের জন্য হবে সুস্বাদু৷ "
২৬. শরাবের পানপাত্র নিয়ে ঘুরে ঘুরে জান্নাতীদের মধ্যে করার পরিবেশন করবে সেকথা এখানে বলা হয়নি‌ ৷ এর বিস্তারিত বর্ণনা দেয়া হয়েছে অন্যান্য স্থানেঃ

আরবী -------------------------------------------------------------------------

" আর তাদের খিদমত করার জন্য ঘুরবে তাদের খাদেম ছেলেরা যারা এমন সুন্দর যেমন ঝিনুক লুকানো মোতি৷ " (আত , তূর , ২৪ )

আরবী ---------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------

"আর তাদের খিদমত করার ঘুরে ফিরবে এমন সব বালক যারা হামেশা বালকই থাকবে৷ তোমরা তাদেরকে দেখলে মনে করবে মোতি ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে৷ " (আদ দাহর , ১৯ )

তারপর এর বিস্তারিত বর্ণনা হযরত আনাস (রা) ও হযরত সামুরাহ ইবনে জুনদুবের (রা) বর্ণিত রসূলুল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর হাদীসগুলো থেকে পাওয়া যায়৷ সেগুলোতে বলা হয়েছে " মুশরিকদের সন্তানরা জান্নাতবাসীদের সেবক হবে৷ " (আবু দাউদ তায়ালিসী , তাবারানী ও বাযযার ) এ হাদীসগুলো সনদের দিক দিয়ে দুর্বল হলেও অন্যান্য বহু হাদীস থেকে ও জানা যায় , সে শিশুরা বায়প্রাপ্ত না হয়ে মারা যায় তারা জান্নাতে যাবে৷ তাছাড়া একথাও হাদীস থেকে জানা যায় যে , যেসব শিশুর পিতামাতা জান্নাতবাসী হবে তারা নিজেদের বাপ মায়ের সাথে থাকবে , যাতে তাদের চোখ শীতল হয়৷ এরপর অবশ্যই এমন সব শিশু থেকে যায় যাদের বাপ মা জান্নাতী হবে না৷ কাজেই তাদের ব্যাপারে একথা যুক্তিসংগত মনে হয় যে , তাদেরকে জান্নাতবাসীদের খাদেম বানিয়ে দেয়া হবে৷ (সম্পর্কিত বিস্তারিত আলোচনার জন্য " ফাতহুল বারী " ও " উমদাতুল কারী " র জানায়েয অধ্যায়ের ' মুশরিকদের সন্তানদের সম্পর্কে যা বলা হয়েছে , অনুচ্ছেদ , " রাসায়েল ও মাসায়েল " ৩ খণ্ড ১৭৭-১৮৭ পৃষ্ঠা দেখুন ৷)
২৭. অর্থাৎ দুনিয়ার শরাবে যে দু' ধরনের দোষ থাকে তা হবে তার স্পর্শ মুক্ত ৷ দুনিয়ার শরাবের এক ধরনের দোষ হচ্ছে মানুষ তার কাছে আসতেই প্রথমে তার পচা দুর্গন্ধ নাকে পৌঁছে যায় ৷ তারপর তার স্বাদ মানুষের জিহ্বাকে তিক্ত ও বিস্বাদ করে দেয়৷ এরপর গলার নিচে নামের সাথে সাথেই তা পেট তা যকৃত বা কলিজাকে প্রভাবিত করে এবং মানুষের স্বাস্থের ওপর তার খারাপ প্রভাব পড়তে থাকে৷ তারপর যখন নেশা খতম হয়ে যেতে থাকে তখন মানুষ নিদ্রালুতা ও অবসাদে আক্রান্ত হয়৷ এসব হচ্ছে শারীরিক ক্ষতি ৷ দ্বিতীয় ধরনের দোষ হচ্ছে , শরাব পান করে মানুষ বকবক করতে থাকে , উল্টা পালটা আজে বাজে অর্থহীন কথা বলতে থাকে , এগুলো শরাবের মানসিক ক্ষতি৷ দুনিয়ায় মানুষ কেবলমাত্র আনন্দ লাভের জন্য এ সমস্ত ক্ষতি বরদাশত করে৷ আল্লাহ বলেন , জান্নাতের শরাবে আনন্দলাভ করা যাবে পূর্ণভাবে (আরবী --------------------------) কিন্তু উপরোক্ত দু'ধরনের ক্ষতির কোনটারই সম্ভবনা সেখানে থাকবে না৷
২৮. অর্থাৎ নিজের স্ত্রী ছাড়া অন্য কারো প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করে না৷
২৯. সম্ভবত এরা সেসব মেয়ে হবে যারা প্রাপ্ত বয়স্কা হবার আগেই দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছে এবং যাদের পিতামাতা এবং যাদের পিতামাতা জান্নাতলাভের অধিকারী হয়নি৷ অনুমানের ভিত্তিতে একথা বলা যেতে পারে যে , এ ধরনের ছেলেদেরকে যেমন জান্নাতবাসীদের সেবায় নিযুক্ত করে দেয়া হবে এবং তারা হামেশা বালকই থাকবে ঠিক তেমনি এ ধরনের মেয়েদেরকে জান্নাতবাসীদের জন্য হূরে পরিণত করা হবে এবং তারা চিরকাল উঠতি বালিকাই থাকবে৷ অবশ্য এ ব্যাপারে আল্লাহই ভালো জানেন ৷
৩০. মূলে বলা হয়েছে (আরবী ----------------------------) " যেন তারা গোপন বা সংরক্ষিত ডিম " তাফসীর বিশারদগণ এ শব্দগুলোর বিভিন্ন ব্যাখ্যা পেশ করেছেন৷ কিন্তু সঠিক ব্যাখ্যা সেটিই হযরত উম্মে সালামাহ (রা) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে উদ্ধৃত করেছেন৷ তিনি বলেন , আমি নবী করীমকে (সা) এ আয়াতটির অর্থ জিজ্ঞেস করি৷ জবাবে তিনি বলেন , তাদের কোমলতা ও নাজুকতা এমন ঝিল্লির মত হবে যা ডিমের খোসা ও তার সাদা অংশের মাঝখানে থাকে৷ (ইবনে জারীর )
৩১. অর্থাৎ তোমারাও কি এমন দুর্বল বিশ্বাসীদের দলে ভীড়লে যারা মৃত্যু পরবর্তী জীবনের মতো অযৌক্তিক কথা মনে নিয়েছে ?
৩২. এ থেকে অনুমান করা যায় , আখেরাতে মানুষের শ্রবণশক্তি , দৃষ্টিশক্তি ও বাকশক্তি কোন ধরনের হবে ৷ জান্নাতে বসে এক ব্যক্তি যখন চাইবে কোন টেলিভিশন যন্ত্রের সহায়তা ছাড়াই সামান্য একটু ঝুঁকে পড়ে এমন এক ব্যক্তিকে দেখে নেবে যে তার থেকে নাজানি কত হাজার মাইল ব্যবধানে জাহান্নামের আযাবের মধ্যে আছে ৷ তারপর এখানেই শেষ নয় , তারা দু'জনই কেবল দু'জনকে দেখতে পাচ্ছে না বরং তাদের মধ্যে কোন টেলিফোন বা রেডিও যোগাযোগ ছাড়াই তারা সরাসরি কথার আদান প্রদানও করছে৷ এত দূরের ব্যবধান থেকে তারা কথা বলবে এবং পরস্পরের কথা শুনবে ৷
৩৩. বর্ণনাকারী পরিস্কার বলে দিচ্ছে , নিজের জাহান্নামী বন্ধুর সাথে কথা বলতে বলতে হঠাৎ এ জান্নাতী লোকটি তার নিজের সাথে কথা বলতে থাকবে এবং এ তিনটি বাক্য তার মুখ থেকে এমনভাবে বের হবে যেন কোন ব্যক্তি নিজেকে সব ধরনের প্রত্যাশা ও অনুমানের উর্ধের অবস্থায় পেয়ে চরম বিস্ময় ও আনন্দ বিহ্বলতার মধ্যে স্বতস্ফূর্তভাবে বলে যাচ্ছে৷ এ ধরনের কথায় কোন বিশেষ ব্যক্তিকে সম্বোধন করা হয় না এবং এখানে মানুষ যে প্রশ্ন করে তার উদ্দেশ্য আসলে কাউকে কিছু জিজ্ঞেস করা হয় না ৷ বরং সেখানে মানুষের নিজের মনের অনুভূতি প্রকাশ ঘটে তার নিজের ভাষায়৷ এ জান্নাতী লোকটি সৌভাগ্য তাকে কোথায় নিয়ে এসেছে৷ এখন মৃত্যু ও নেই , শাস্তিও নেই৷ সমস্ত কষ্টের অবসান ঘটেছে এবং সে এখন চিরন্তন জীবনের অধিকারী হয়েছে ৷ এ অনুভূতির ভিত্তিতে সে স্বতস্ফূর্তভাবে বলে ওঠে , আমি এখন এ মর্যাদায় উপনীত হয়েছি ?
৩৪. যাক্কুম এক ধরনের গাছ৷ তিহামা এলাকায় এ গাছ দেখা যায়৷ এর স্বাদ হয় তিতা , গন্ধ বিরক্তিকর এবং ভাঙলে এর মধ্য থেকে এক ধরনের দুধের মতো পদার্থ বের হয় যা গায়ে লাগলে গা ফুলে ওঠে ও ফোস্কা পড়ে ৷
৩৫. অর্থাৎ অস্বীকারকারীরা একথা শুনে কুরআনের নিন্দা ও নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বিদ্রূপ করার একটি নতুন সুযোগ পেয়ে যায়৷ এর ফলে তারা ঠাট্টা করে বলতে থাকে , নাও এখন নতুন কথা শোনো , জাহান্নামের জ্বলন্ত আগুনের মধ্যে নাকি আবার গাছ জন্মাবে৷
৩৬. এখানে এরূপ ভুল বুজাবুঝি হওয়া চাই না যে , শয়তানের মাথা কে দেখেছে যে যাক্কুম গাছের ফুলকে তার সাথে তুলনা করা হয়েছে ? আসলে এটি একটি কাল্পনিক উপমা৷ সাধারণভাবে প্রত্যেক ভাষার সাহিত্যে এর সাহায্য গ্রহণ করা হয়ে থাকে৷ যেমন আমরা একটি মেয়ের পরমা সুন্দরী হবার ধারণা প্রকাশ কারার জন্য বলি , বাহ মেয়েটি পরীর মতো সুন্দরী৷ অন্যদিকে কোন মেয়ের ন্যায় চরম কদাকার রূপ বর্ণনা করার জন্য বলি , মেয়েটি যেন একটি পেত্নী ৷ কোন ব্যক্তির নূরানী চেহারার বর্ণনা দেবার জন্য বলে থাকি , ঠিক ফেরেশতার মতো চেহারা ৷ আর কেউ যদি অত্যন্ত ভয়াল ভীষণ আকৃতি নিয়ে সামনে আসে তাহলে আমরা বলি , তাকে ঠিক শয়তানের মতো দেখাচ্ছে৷
৩৭. এ থেকে বুঝা যায় যে , জাহান্নামবাসীরা যখন ক্ষুধা পিপাসায় কাতর হয়ে যেতে থাকবে তখন তাদেরকে হাঁকিয়ে এমন জায়গায় নিয়ে যাওয়া হবে যেখানে রয়েছে যাক্কুম গাছ ও টগবগে ফুটন্ত পানির ঝরণা৷ তারপর সেখান থেকে খানাপিনা শেষ করার পর তাদেরকে আবার তাদের জাহান্নামের ফিরিয়ে আনা হবে৷
৩৮. অর্থাৎ তারা নিজেদের বুদ্ধি ব্যবহার করে তাদের বাপ দাদাদের থেকে যে রীতি রেওয়াজ চলে আসছে তা সঠিক কিনা সেকথা কোনদিন চিন্তা করেনি৷ ব্যাস , যে পথে অন্যদেরকে চলতে দেখছে চোখ বন্ধ করে তারা সে পথেই চলতে থেকেছে৷