(৩৭:১) সারিবদ্ধভাবে দণ্ডায়মানদের কসম,
(৩৭:২) তারপর যারা ধমক ও অভিশাপ দেয় তাদের কসম,
(৩৭:৩) তারপর তাদের কসম যারা উপদেশবাণী শুনায়,
(৩৭:৪) তোমাদের প্রকৃত মাবুদ মাত্র একজনই-
(৩৭:৫) যিনি পৃথিবী ও আকাশমণ্ডলীর এবং পৃথিবী ও আকাশের মধ্যে যা কিছু আছে তাদের সবার মালিক এবং সমস্ত উদয়স্থলের মালিক৷
(৩৭:৬) আমি দুনিয়ার আকাশকে তারকারাজির সৌন্দর্য দ্বারা সুসজ্জিত করেছি
(৩৭:৭) এবং প্রত্যেক বিদ্রোহী শয়তান থেকে তাকে সুরক্ষিত রেখেছি৷
(৩৭:৮) এ শয়তানরা উর্ধ জগতের কথা শুনতে পারে না,
(৩৭:৯) সবদিক থেকে আঘাতপ্রাপ্ত ও তাড়িত হয় এবং তাদের জন্য রয়েছে অবিরাম শাস্তি৷
(৩৭:১০) তবুও যদি তাদের কেউ তার মধ্য থেকে কিছু হাতিয়ে নিতে সক্ষম হয় তাহলে একটি জ্বলন্ত অগ্নিশিখা তার পেছনে ধাওয়া করে৷
(৩৭:১১) এখন এদেরকে জিজ্ঞেস করো, এদের সৃষ্টি বেশী কঠিন, না আমি যে জিনিসগুলো সৃষ্টি করে রেখেছি সেগুলোর ? এদেরকে তো আমি সৃষ্টি করেছি আঠাল কাদামাটি দিয়ে৷
(৩৭:১২) তুমি তো (আল্লাহর কুদরাতের মহিমা দেখে) অবাক হচ্ছো এবং এরা তার প্রতি করছে বিদ্রূপ৷
(৩৭:১৩) তাদেরকে বুঝালেও তারা বোঝে না৷
(৩৭:১৪) কোনো নিদর্শন দেখলে উপহাস করে উড়িয়ে দেয়
(৩৭:১৫) এবং বলে, “এ তো স্পষ্ট যাদু৷ ১০
(৩৭:১৬) আমরা যখন মরে একেবারে মাটি হয়ে যাবো এবং থেকে যাবে শুধুমাত্র হাড়ের পিঞ্জর তখন আমাদের আবার জীবিত করে উঠানো হবে, এমনও কি কখনো হতে পারে ?
(৩৭:১৭) আর আমাদের পূর্ব-পুরুষদেরকেও কি উঠানো হবে?”
(৩৭:১৮) এদেরকে বলো, হ্যাঁ, এবং তোমরা (আল্লাহর মোকাবিলায়) অসহায়৷ ১১
(৩৭:১৯) ব্যস, একটিমাত্র বিকট ধমক হবে এবং সহসাই এরা স্বচক্ষে (সেই সবকিছু যার খবর দেয়া হচ্ছে) দেখতে থাকবে৷ ১২
(৩৭:২০) সে সময় এরা বলবে, হায়! আমাদের দুর্ভাগ্য, এতো প্রতিফল দিবস৷
(৩৭:২১) “এটা সে ফায়সালার দিন যাকে তোমরা মিথ্যা বলতে৷” ১৩
১. মুফাসসিরদের অধিকাংশ এ ব্যাপারে একমত যে , এ তিনটি দলই হচ্ছে ফেরেশতাদের দল৷ হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা) , হযরত ইবনে আব্বাস (রা) , হযরত কাতাদাহ (রা) , মাসরূক , সাঈদ ইবনে জুবাইর , ইকরামা , মুজাহিদ সুদ্দী , ইবনে যায়েদ ও রাবী' ইবনে আনাস থেকে ও এ একই তাফসীর উদ্ধৃত হয়েছে৷ কোন কোন তাফসীরকার এর অন্য ব্যাখ্যাও দিয়েছেন৷ কিন্তু পরিবেশ পরিস্থিতির সাথে এ ব্যাখ্যাটিই বেশী সামঞ্জস্যশীল বলে মনে হয়৷

এখানে " সারিবদ্ধভাবে দাঁড়ানো " ---- এর মাধ্যমে এদিকে ইংগিত করা হয়েছে যে , বিশ্ব - জাহানের ব্যবস্থাপনার যেসব ফেরেশতা নিয়েজিত রয়েছে তারা আল্লাহর বান্দা ও গোলাম৷ তারা সারিবদ্ধভাবে তাঁর বন্দেগী ও আনুগত্য করছে এবং তাঁর হুকুম তামিল করার জন্য সর্বক্ষণ প্রস্তুত রয়েছে৷ সামনের দিকে গিয়ে ১৬৫ আয়াতে এ বিষয়বস্তুটির পুনরাবৃত্তি করা হয়েছে৷ সেখানে ফেরেশতারা নিজেদের সম্পর্কে বলছেঃ

আরবী -----------------------------------------------------------------------------

কোন কোন মুফাসসিরের মতে " ধমক ও অভিশাপ দেবার " অর্থ হচ্ছে , কিছু ফেরেশতা আছে তারা মেঘমালাকে তাড়িয়ে নিয়ে যায় এবং বৃষ্টির ব্যবস্থা করে ৷ যদিও এ অর্থও ভুল নয় , কিন্তু সামনের দিকের বিষয়বস্তুর সাথে যে অর্থ বেশী মানানসই তা হচ্ছে এই যে , ঐ ফেরেশতাদের মধ্যে একটি দল নাফরমানদেরকে ও অপরাধীদেরকে অভিশাপ দিয়ে থাকে এবং তাদের এ অভিশাপ কেবল শাব্দিক হয় না বরং তা মানুষের ওপর বড় বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও ঐতিহাসিক বিপদ মুসিবতের আকারে বর্ষিত হয়৷

"উপদেশবাণী শুনবার " অর্থ হচ্ছে ঐ ফেরেশতাদের মধ্যে এমন ধরনের ফেরেশতাও আছে যারা মানুষকে সত্য বিষয়ের প্রতি আকৃষ্ট করার জন্য উপদেশ দেবার দায়িত্ব পালন করে৷ সে উপদেশ দুর্যোগ দুর্ঘটনাদির আকারেও হয় , যা থেকে শিক্ষা গ্রহণকারীরা শিক্ষা গ্রহণ করে থাকে৷ আবার তা এমন শিক্ষার আকারেও হয় , যা ঐ ফেরেশতাদের মাধ্যমে নবীদের ওপর নাযিল হয়৷ আবার কখনো তা হয় তাদের মাধ্যমে সৎকর্মশীল লোকদের ওপর নাযিলকৃত ইলহাম অর্থাৎ অভাবনীয় পন্থায় মানুষের মনে আল্লাহ যে প্রেরণার সঞ্চার (Inspiration ) করেন তার আকারেও ৷
২. এ সত্যটির ভিত্তিতেই উল্লেখিত গুণাবলী সমৃদ্ধ ফেরেশতাদের কসম খাওয়া হয়েছে ৷ অন্য কথায় যেন বলা হয়েছে , এ সমগ্র বিশ্ব ব্যবস্থা যা আল্লাহর আনুগত্যের ভিত্তিতে সক্রিয় রয়েছে , এ বিশ্ব জাহানের এমন সমস্ত নিদর্শন যেগুলো আল্লাহর বন্দেগী বিমূখতার অশুভ ফল মানুষের সামনে তুলে ধরছে এবং বিশ্ব জাহানের এ আভ্যন্তরীণ ব্যবস্থা যার ফলে সৃষ্টির প্রথম দিন থেকে নিয়ে আজ পর্যন্ত অবিরাম একই সত্যের কথা বিভিন্নভাবে স্মরণ করানো হচ্ছে ---- এ সবকিছুই মানুষের " ইলাহ " যে একজন , তারই সাক্ষ পেশ করছে৷ "ইলাহ " শব্দটির ব্যবহার হয় দু'টি অর্থে৷ এক , এমন মাবুদ ও উপাস্য অর্থে , বাস্তবে ও সক্রিয়ভাবে যার বন্দেগী করা হচ্ছে৷ দুই , সে মাবুদ অর্থে , যিনি এমন মর্যাদার অধিকারী , যার ফলে প্রকৃতপক্ষে তাঁরই ইবাদাত ও বন্দেগী করা উচিত৷ এখানে ইলাহ শব্দটি দ্বিতীয় অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে৷ কারণ প্রথম অর্থে মানুষ তো বহু ইলাহ তৈরি কর রেখেছে৷ এ জন্য আমি ইলাহ শব্দটির অনুবাদ করেছি " প্রকৃত মাবুদ " ৷
৩. সূর্য সবসময় একই উদয়স্থল থেকে উদিত হয় না৷ বরং প্রতিদিন একটি নতুন স্থান থেকে উদিত হয়৷ তাছাড়া সারা দুনিয়ায় সে একই সময় উদিত হয় না বরং দুনিয়ায় বিভিন্ন অংশে বিভিন্ন সময় উদিত হয়৷ এসব কারণে উদয়স্থলের পরিবর্তে " সমস্ত উদয়স্থল " শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে এবং এ সংগে " সমস্ত অস্তস্থল " -- এর কথা না বলার কারণ হচ্ছে এই যে , সমস্ত উদয়স্থল শব্দেই অস্তস্থল প্রমাণ করে৷ তবুও এক জায়গায় (আরবী -------------------------------------) (উদয়স্থলগুলো ও অস্তস্থলগুলোর রব ) শব্দগুলোও এসেছে৷ (আল মা'আরিজ , ৪০ )
৪. এ আয়তগুলোকে যে সত্যটি বুঝানো হয়েছে সেটি হচ্ছে এই যে , বিশ্ব - জাহানের আসল মালিক ও শাসনকর্তাই মানুষের আসল মা'বুদ৷ তিনিই প্রকৃতপক্ষে মা'বুদ হতে পারেন এবং তাঁরই মাবুদ হওয়া উচিত ৷ রব (মালিক , শাসনকর্তা ও প্রতিপালক ) হবে একজন এবং ইলাহ (ইবাদাত লাভের অধিকারী ) হবে অন্যজন , এটা একেবারেই বুদ্ধি বিরোধী কথা৷ মানুষের লাভ ও ক্ষতি , তার অভাব ও প্রয়োজন পূর্ণ হওয়া , তার ভাগ্য ভাঙা - গড়া বরং তার নিজের অস্তিত্ব ও স্থায়িত্বই যার ক্ষমতার অধীনে তার শ্রেষ্টত্ব ও প্রাধান্য স্বীকার করা এবং তার সমানে নত হওয়া মানুষের প্রকৃতিরই দাবী৷ এটিই তার ইবাদাতের মৌল কারণ৷ মানুষ যখন একথাটি বুঝতে পারে তখন আপনা আপনি সে একথটিও বুঝতে পারে যে , ক্ষামতার অধিকারীর ইবাদাত না করা এবং ক্ষমতাহীনের ইবাদাত করা দু'টোই বুদ্ধি ও প্রকৃতির সুস্পষ্ট বিরোধী৷ কর্তৃত্বশালী ইবাদাত লাভের হকদার হন৷ কর্তৃত্বহীন সত্তারা এর হকদারও হয় না৷ তাদের ইবাদাত করে এবং তাদের কাছে কিছু চেয়ে কোন লাভও হয় না৷ কারণ আমাদের কোন আবেদনের ভিত্তিতে কোন কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করার কোন ক্ষমতাই তাদের নেই৷ তাদের সামনে বিনয় , দীনতা ও কৃতজ্ঞতা সহকারে মাথা নত করা এবং তাদের কাছে প্রার্থনা করা ঠিক তেমনিই নির্বুদ্ধিতার কাজ যেমন কোন ব্যক্তি কোন শাসনকর্তার সামনে হাজির হয়ে তার কাছে আর্জি পেশ করার পরিবর্তে অন্য প্রার্থীরা যারা সেখানে আবেদনপত্র নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে তাদের মধ্য থেকে কারো হাত জোড় করে দাঁড়িয়ে থাকে৷
৫. দুনিয়ার আকাশ বলতে বুঝানো হয়েছে নিকটবর্তী আকাশকে , কোন দূরবীনের সাহায্য ছাড়াই খালি চোখে যে আকাশকে আমরা দেখতে পাই৷ এ ছাড়া বিভিন্ন প্রকার শক্তিশালী দূরবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে যে বিশ্বকে আমরা দেখি এবং আমাদের পর্যবেক্ষণ যন্ত্রপাতির মাধ্যমে যেসব বিশ্ব এখনো আমাদের দৃষ্টিগোচর হয়নি সেগুলো সবই দূরবর্তী আকাশ৷ এ প্রসংগে মনে রাখতে হবে " সামা " বা আকাশ কোন নির্দিষ্ট জিনিসের নাম নয়৷ বরং প্রাচীনতমকাল থেকে নিয়ে আজ পর্যন্ত মানুষ এ শব্দটি এবং এর সামর্থক শব্দাবলীকে উর্ধ জগতের জন্য ব্যবহার করে আসছে৷
৬. অর্থাৎ উর্ধজগত নিছক মহাশূন্য নয়৷ যে কেউ চাইলেই তার মধ্যে প্রবেশ করতে পারে না৷ বরং এর বাঁধন অত্যন্ত মজবুত৷ এর বিভিন্ন অংশকে এমন সুদৃঢ় সীমান্ত দ্বারা পরিবেষ্টিত করা হয়েছে যার ফলে কোন বিদ্রোহী শয়তানের পক্ষে সে সীমানাগুলো অতিক্রম করা সম্ভব নয়৷ বিশ্ব জাহানের প্রত্যেকটি গ্রহ নক্ষত্রের নিজস্ব একটি কক্ষপথ ও আকাশ আছে৷ তার মধ্যে থেকে কারো বের হয়ে আসা যেমন অত্যন্ত কঠিন তেমনি বাইর থেকে কারো তার মধ্যে প্রবেশ করাও সহজ নয়৷ বাইরের দৃষ্টি দিয়ে দেখলে নিছক মহাশূন্য ছাড়া সেখানে আর কিছুই দেখা যায় না৷ কিন্তু আসলে সে মহাশূন্যের মধ্যে অসংখ্য ও অগণিত অংশকে এমন শক্তিশালী ও সুদৃঢ় সীমানা দিয়ে সংরক্ষিত করা হয়েছে যার মোকাবিলায় লৌহ প্রাচীর কিছুই নয়৷ মানুষের কাছের প্রতিবেশী চাঁদে পৌঁছুতে মানুষকে যেসব বিচিত্র সমস্যা ও বহুমুখী প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতে হচ্ছে তা থেকে এ ব্যাপারে কিছুটা অনুমান করা যেতে পারে৷ পৃথিবীর অন্যান্য জীব অর্থাৎ জিনদের উর্ধজগতে প্রবেশ করার পথে ও এমনি বাধা - প্রতিবন্ধকতা রয়েছে৷
৭. এ বিষয়টি বুঝতে হলে একটি কথা অবশ্যই দৃষ্টি সমক্ষে থাকতে হবে৷ সে সময় আরবে জ্যোতিষশাস্ত্রের ব্যাপক চর্চা ছিল৷ বিভিন্ন স্থানে গণক ও জ্যোতিষীরা বসে ভবিষ্যদ্বাণী করতো৷ অদৃশ্যের সংবাদ দিত৷ হারিয়ে যাওয়া জিনিসের সন্ধান দিত ৷ লোকেরা নিজেদের অতীত ও ভবিষ্যেতের অবস্থা জানান জন্য তাদের জন্য তাদের দ্বারস্থ হতো৷ এ গণকদের দাবী ছিল , জিন ও শয়তানরা তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং তারা তাদেরকে সব ধরনের খবর এনে দেয়৷ এ পরিবেশে রসূলুল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামা নবুওয়াতের দায়িত্বে অধিষ্ঠিত হন এবং তিনি কুরআন মজীদের আয়াত শুনাতে শুরু করেন৷ তাতে অতীতের ইতিহাস এবং ভবিষ্যতে যেসব অবস্থার সৃষ্টি হবে তার খবর দেয়া হয়েছিল৷ এ সংগে তিনি জানিয়ে দেন , একজন ফেরেশতা আমার কাছে এসব আয়াত নিয়ে আসেন এতে তাঁর বিরোধীরা সংগে সংগেই তাঁকে গণক বলে পরিহাস করতে থাকে৷ তারা লোকদেরকে বলতে থাকে , অন্যান্য গণকদের মতো তাঁর সম্পর্কেও এমন কোন শয়তানের সাথে রয়েছে যে উর্ধজগত থেকে আড়ি পেতে কিছু শুনে তাঁর কাছে নিয়ে আসে এবং তিনি তাকে আল্লাহর অহী বা‌নিয়ে পেশ করে দেন৷ এ অপবাদের জবাবে আল্লাহ যে সত্য বিবৃত করছেন তা এই যে , শয়তানরা তো উর্ধজগতে পৌঁছুতেই পারে না৷ ফেরেশতাদের কথা শোনা এবং তা নিয়ে এসে কাউকে বলার ক্ষমতা তাদের নেই৷ আর যদি ঘটনাক্রমে সমান্য একটু ছিটে ফোঁটা তথ্য কোন শয়তানের কানে পড়ে যায় তাহলে সে তা নিয়ে নিচে নেমে আসার আগেই একটি দ্রুতগামী অগ্নিশিখা তার পিছু নেয়৷ অন্যকথায় এর অর্থ হচ্ছে ফেরেশতাদের হস্তক্ষেপ মুক্ত৷ তাতে হস্তক্ষেপ করাতো দূরের কথা সে সম্পর্কে কিছু জানার ক্ষমতাও তাদের নেই৷ (আরো বেশী জানতে হলে তাফহীমূল কুরআন সূরা আল হাজর , ৮ থেকে ১২ টীকা দেখুন ৷)
৮. আখেরাত সম্পর্কে মক্কার কাফেররা যে সন্দেহ পেশ করতো একটি তার জওয়াব৷ তাদের মতে আখেরাত সম্ভব নয়৷ কারণ যেসব মানুষ মরে গেছে তাদের আবার দ্বিতীয়বার জন্মলাভ করা অসম্ভব৷ এর জবাবে আখেরাতের সম্ভাবনায় যুক্তি পেশ করতে গিয়ে আল্লাহ সর্বপ্রথম তাদের সামনে এ প্রশ্ন রাখেন , তোমাদের মতে যদি মৃত মানুষদেরকে পুনরায় সৃষ্টি করা অনেক কঠিন কাজ হয়ে থাকে এবং এ সৃষ্টি করার ক্ষমতা আমার না থেকে থাকে তাহলে বলো , এ পৃথিবী ও আকাশ এবং এদের যে অসংখ্য জিনিস রয়েছে এগুলো সৃষ্টি করা কি সহজ কাজ ? তোমাদের বুদ্ধি কোথায় হারিয়ে গেছে? যে আল্লাহর জন্য এ বিশাল বিশ্ব - জাহান সৃষ্টি করা কঠিন কাজ ছিল না এবং যিনি তোমাদের নিজেদেরকে একবার সৃষ্টিও করেছেন তাঁর ব্যাপারে তোমরা কেমন করে ভাবতে পারলে যে তোমাদেরকে পুনরায় সৃষ্টি করতে তিনি অক্ষম ?
৯. অর্থাৎ এ মানুষ তো বিরাট জিনিস নয়৷ মাটি দিয়ে একে তৈরি করা হয়েছে এবং এ মাটি দিয়ে আবার তৈরি করা যেতে পারে৷ আঠাল কাদামাটি দিয়ে মানুষ তৈরি করার অর্থ এও হতে পারে যে , প্রথম মানুষটিকে সৃষ্টি করা হয়েছিল মাটি দিয়ে এবং তারপর মানুষ বংশধারা ঐ প্রথম মানুষটির শুক্রবীজ থেকে অস্তিত্ব লাভ করেছে৷ এর অর্থ এও হতে পারে যে , প্রত্যেকটি মানুষ আঠাল কাদামাটির তৈরি৷ কারণ মানুষের অস্তিত্বের সমস্ত উপাদান মাটি থেকেই লাভ করা হয়৷ যে বীর্যে তার জন্ম তা খাদ্য থেকে তৈরি এবং গর্ভসঞ্চার থেকে শুরু করে মৃত্যুর সময় পর্যন্ত তার সমগ্র অস্তিত্ব যেসব উপাদানে তৈরি হয় তার খাদ্যই তার সবটুকু সরবরাহ করে ৷ এ খাদ্য পশু ও জীবজন্তু থেকে সরবরাহকৃত হোক বা উদ্ভিদ থেকে মূলত এর উৎস হচ্ছে মাটি , যা পানির সাথে মিশে মানুষের খাদ্য হওয়ার এবং তরকারী ও ফল উৎপন্ন করার যোগ্যতা অর্জন করে এবং জীবজন্তু লালন করারও যোগ্যতা অর্জন করে , যাদের দুধ ও গোশ্‌ত মানুষ আহার করে৷ কাজেই যুক্তির বুনিয়াদ এরি ওপর প্রতিষ্ঠিত যে , এ মাটি যদি জীবন গ্রহণ করার যোগ্যতা না রাখতো তাহলে তোমরা কেমন করে জীবিত আকারে দুনিয়ার বুকে বিরাজ করছো ? আর যদি তার মধ্যে জীবন সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা থেকে থাকে , যেমন তোমাদের অস্তিত্বই এ সম্ভানার দ্ব্যর্থহীন প্রমাণ পেশ করছ , তাহলে আগামীকাল এ একই মাটি থেকে তোমাদের সৃষ্টি অসম্ভব হবে কেন ?
১০. অর্থাৎ ঐন্দ্রজালিক জগতের কথা৷ এ ব্যক্তি বলছে কোন ঐন্দ্রজালিক জগতের কথা৷ সেখানে মৃতরা পুনরুজ্জীবিত হবে৷ আদালত প্রতিষ্ঠিত হবে ৷ জান্নাত আবাদ করা হবে৷ জাহান্নামীদের শাস্তি বিধান করা হবে৷ অথবা এর এ অর্থও হতে পারে যে , এ ব্যক্তিমন ভুলানো কথা বলছে৷ এর এ কথাগুলোই সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করছে যে , কেউ এর ওপর যাদু করে দিয়েছে , যার ফলে এ সুস্থ সচেতন ব্যক্তিটি এখন এ ধরনের আবোল তাবোল কথা বলছে৷
১১. অর্থাৎ আল্লাহ তোমাদেরকে যা ইচ্ছা তাই বানাতে পারে৷ যখন তিনি চাইলেন তখনই তাঁর একটি ইশারাতেই তোমরা অস্তিত্ব লাভ করলে৷ যখন তিনি চাইবেন তখনই তাঁর একটি ইংগিতেই তোমরা মৃত্যু বরণ করবে৷ আবার যখন তিনি চাইবেন সাথে সাথেই তাঁর একটি ইংগতিই তোমাদেরকে উঠিয়ে দাঁড় করিয়ে দেবে৷
১২. অর্থাৎ এ ঘটনা সংঘটিত হবার যখন এসে যাবে তখন দুনিয়াকে পুনরায় উত্থিত করা কঠিন কাজ হবে না৷ একটি মাত্র বিকট ধমক ঘুমন্তদেরকে জাগিয়ে উঠিয়ে দেবার জন্য যথেষ্ট হবে৷ " বিকট ধমক " শব্দটি বড়ই তাৎপর্যপূর্ণ৷ এর মাধ্যমে মৃতুর পর পুনরুত্থানের এমন কিছু ছবি চোখের সামনে ভেসে ওঠে যা থেকে বুঝা যায়, সৃষ্টির প্রথম দিন থেকে নিয়ে কিয়ামত পর্যন্ত যত মানুষ মরে গিয়েছিল সবাই যেন শুয়ে গুমোচ্ছে এবং হঠাৎ কেউ ধমক দিয়ে বললো , "উঠে পড়ো " আর সংগে সংগেই মুহূর্তের মধ্যে তারা সবাই দাঁড়িয়ে গেলো৷
১৩. হতে পারে মু'মিনরা তাদেরকে একথা বলে৷ এও হতে পারে , এটি ফেরশতাদের উক্তি৷ এও হতে পারে , হাশরের ময়াদনের সমগ্র পরিবেশ সে সময় সমকালীন পরিস্থিতির মাধ্যমে একথা বলছিল্‌ আবার এও হতে পারে , এটা তাদের নিজেদেরই দ্বিতীয় প্রতিক্রিয়া৷ অর্থাৎ নিজেদের মনে মনে তারা নিজেদেরকেই সম্বোধন করে বলছিল , এ দুনিয়ায় সারা জীবন তোমরা একথা মনে করতে থেকেছো যে , ফায়সালা করর দিন কখনো আসবে না , কিন্তু এখন তোমাদের সর্বনাশের সময় এসে গেছে , যেদিনকে মিথ্যা বলতে সেদিনটি আজ তোমাদের সামনে উপস্থিত ৷