(৩৬:৬৮) যে ব্যক্তিকে আমি দীর্ঘ আয়ূ দান করি তার আকৃতিকে আমি একেবারেই বদলে দেই ৫৭ (এ অবস্থা দেখে কি )তাদের বোধোদয় হয় না?
(৩৬:৬৯) আমি এ (নবী)-কে কবিতা শিখাইনি এবং কাব্য চর্চা তার জন্য শোভনীয়ও নয়৷ ৫৮ এ তো একটি উপদেশ এবং পরিস্কার পঠনযোগ্য কিতাব,
(৩৬:৭০) যাতে সে প্রত্যেক জীবিত ব্যক্তিকে সতর্ক করে দিতে পারে ৫৯ এবং অস্বীকারকারীদের ওপর প্রমাণ প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়৷
(৩৬:৭১) এরা কি দেখে না, আমি নিজের হাতে তৈরী জিনিসের ৬০ মধ্য থেকে এদের জন্য সৃষ্টি করেছি গবাদি পশু এবং এখন এরা তার মালিক৷
(৩৬:৭২) আমি এভাবে তাদেরকে এদের নিয়ন্ত্রণে দিয়ে দিয়েছি যে, তাদের মধ্য থেকে কারো ওপর এরা সওয়ার হয়, কারো গোশত খায়
(৩৬:৭৩) এবং তাদের মধ্য এদের জন্য রয়েছে নানা ধরনের উপকারীতা ও পানীয়৷ এরপর কি এরা কৃতজ্ঞ হয় না ৬১
(৩৬:৭৪) এ সবকিছু সত্ত্বেও এরা আল্লাহকে বাদ দিয়ে অন্য ইলাহ বানিয়ে নিয়েছে এবং এদেরকে সাহায্য করা হবে এ আশা করছে৷
(৩৬:৭৫) তারা এদের কোন সাহায্য করতে পারে না বরং উল্টো এরা তাদের জন্য সদা প্রস্তুত সৈন্য হয়ে বিরাজ করছে৷ ৬২
(৩৬:৭৬) হ্যাঁ, এদের তৈরী কথা যেন তোমাকে মর্মাহত না করে এদের গোপন ও প্রকাশ্য সব কথাই আমি জানি৷ ৬৩
(৩৬:৭৭) মানুষ ৬৬৪ কি দেখে না, তাকে আমি সৃষ্টি করেছি শুক্রবিন্দু থেকে এবং তারপর সে দাঁড়িয়ে গেছে স্পষ্ট ঝগড়াটে হয়ে ? ৬৫
(৩৬:৭৮) এখন সে আমার ওপর উপমা প্রয়োগ করে ৬৬ এবং নিজের সৃষ্টির কথা ভুলে যায় ৬৭ বলে, এ হাড়গুলো যখন পচে গলে গেছে এতে আবার প্রাণ সঞ্চার করবে কে?
(৩৬:৭৯) তাকে বলো, এদেরকে তিনি জীবিত করবেন যিনি প্রথমে এদেরকে সৃষ্টি করেছিলেন এবং তিনি সৃষ্টির প্রত্যেকটি কাজ জানেন৷
(৩৬:৮০) তিনিই তোমাদের জন্য সবুজ বৃক্ষ থেকে আগুন সৃষ্টি করেছেন এবং তোমরা তা থেকে নিজেদের চুলা জ্বালিয়ে থাকো৷ ৬৮
(৩৬:৮১) যিনি আকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন তিনি তাদের অনুরূপ সৃষ্টি করার ক্ষমতা রাখেন না ? কেন নয়, যখন তিনি পারদর্শী স্রষ্টা৷
(৩৬:৮২) তিনি যখন কোন কিছুর ইচ্ছা করেন তখন তাঁর কাজ হয় কেবল এতটুকু যে, তিনি তাকে হুকুম দেন, হয়ে যাও এবং তা হয়ে যায়৷
(৩৬:৮৩) পবিত্র তিনি যার হাতে রয়েছে প্রত্যেকটি জিনিসের পূর্ণ কর্তৃত্ব এবং তাঁরই দিকে তোমাদের ফিরে যেতে হবে৷
৫৭. আকৃতি বদলে দেয়ার মানে হচ্ছে, বৃদ্ধ বয়সে আল্লাহ মানুষের অবস্থা শিশুদের মতো করে দেন৷ ঠিক শিশুদের মতোই তারা চলতে ফিরতে অক্ষম হয়ে পড়ে৷ অন্যেরা তাদেরকে উঠাতে বসাতে ও সহায়তা দিয়ে চলাফেরা করাতে থাকে৷ অন্যেরা তাদেরকে পানাহার করায়৷ তারা নিজেদের কাপড়ে ও বিছানায় পেশাব পায়খানা করে দেয়৷ বালসুলভ কথা বলতে থাকে, যা শুনে লোকেরা হেসে ওঠে৷ মোট কথা যে ধরনের দুর্বলতার মধ্য দিয়ে তারা দুনিয়ার জীবন শুরু করেছিল, জীবন সায়াহ্নে প্রায় সেই একই অবস্থায় পৌছে যায়৷
৫৮. কাফেররা তাওহীদ, আখেরাত, মৃত্যুপরের জীবন ও জান্নাত -জাহান্নাম সম্পর্কে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কথাকে নিছক কাব্য কথা গণ্য করে নিজেরা তাকে গুরুত্বহীন করে দেবার যে প্রচেষ্টা চালাতো এখানে তারই জবাব দেয়া হয়েছে৷
৫৯. জীবন বলতে চিন্তাশীল ও বিবেকবান মানুষ বুঝানো হয়েছে৷ যার অবস্থা পাথরের মতো নির্জীব ও নিষ্ক্রিয় নয়৷ আপনি তার সামনে যতই যুক্তি সহকারে হক ও বাতিলের পার্থক্য বর্ণনা করেন না কেন এবং যতই সহানুভূতি সহকারে তাকে উপদেশ দেন না কেন সে কিছুই শোনে না, বোঝে না এবং নিজের জায়গা থেকে একটুও নড়ে না৷
৬০. হাত শব্দটি আল্লাহর জন্য রূপক অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে, এর অর্থ এ নয় যে, নাউযুবিল্লাহ পবিত্র ও মহান আল্লাহ শরীর ও দেহাবয়বের অধিকারী, এবং মানুষের মতো হাত দিয়ে কাজ করেন৷ বরং এর মাধ্যমে একথাই বুঝানো হয়েছে যে, এ জিনিসগুলো আল্লাহ নিজেই তৈরী করেছেন এবং এগুলোর সৃষ্টিকর্মের অন্য কারো সামান্যতমও অংশ নেই৷
৬১. নিয়ামতকে নিয়ামতদাতা ছাড়া অন্য কারো দান মনে করা, এ জন্য অন্য কারো অনুগ্রহভাজন হওয়া এবং নিয়ামতদাতা ছাড়া অন্য কারো কাছ থেকে নিয়ামতলাভের আশা করা অথবা নিয়ামত চাওয়া, এ সবকিছুর নিয়ামত অস্বীকারেরই নামান্তর৷ অনুসরূপভাবে নিয়ামতদাতার প্রতত্ত নিয়ামতকে তাঁর ইচ্ছার বিরুদ্ধে ব্যবহার করলেও নিয়ামত অস্বীকর করাই হয়৷ কাজেই একজন মুশরিক ও কাফের এবং মুনাফিক ও ফাসেক নিছক মুখে ধন্যবাদ শব্দ ব্যবহার করে আল্লাহর শোকরগুজার বান্দা গন্য হতে পারে না৷ এ জন্তু-জানোয়ারগুলোকে আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন, একথা মেনে নিতে মক্কার কাফেররা অস্বীকার করতো না৷ তাদের একজনও এগুলোর সৃষ্টির ব্যাপারে অন্য উপাস্যদের হাত আছে বলে দাবী করতো না৷ কিন্তু এ সবকিছু মেনে নেবার পরও যখন তারা আল্লাহ প্রদত্ত নিয়ামতের জন্য নিজেদর উপাস্য দেবতাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতো, তাদের সামনে নজরানা পেশ করতো এবং আরো নিয়ামত দান করার জন্য তাদের কাছে প্রার্থনা করতো, এ সংগে তাদের জন্য বলিদান করতে থাকতো, তখন আল্লাহর কাছে তাদের মৌখিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ সম্পূর্ণ অর্থহীন হয়ে পড়তো৷ এ জন্যই আল্লাহ তাদেরকে নিয়ামত অস্বীকারকারী ও অকৃতজ্ঞ বলে অভিহিত করেছেন৷
৬২. অর্থাৎ ঐ মিথ্যা উপাস্য দেবতারা নিজেরাই তাদের অস্তিত্ব, টিকে থাকা, সংরক্ষণ ও প্রয়োজন পূরণের জন্য এসব পূজা উপাসনাকারীর মুখাপেক্ষী৷ এ সেনাবাহীনি ছাড়া তাদের খোদায়ী এক দিনও চলে না৷ এরা তাদের সার্বক্ষনিক উপস্থিত দাস৷ এরা তাদের দরবার বানিয়ে ও সাজিয়ে রাখছে৷ এরা তাদের পক্ষে প্রচারণা চালিয়ে বেড়াচ্ছে৷ এরা ঝগড়া-বিবাদ ও যুদ্ধ -বিগ্রহ করছে৷ তারপরই তাদের খোদায়ী প্রতিষ্ঠিত হয়৷ নয়তো কেউ তাদের কথা জিজ্ঞেসও করতো না৷ তারা আসল খোদা নয়৷ কেউ তাদেরকে মেনে নিক বা না নিক তারা নিজ শক্তিতে বলীয়ান হয়ে সমগ্র বিশ্ব-জাহানে কর্তৃত্ব চালিয়ে যাবে, এমন ক্ষমতা তাদের নেই৷
৬৩. সম্বোধন করা হয়েছে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে৷ গোপন ও প্রকাশ্য কথা বলে এদিকে ইংগিত করা হয়েছে যে, মক্কার কাফেরদের বড় বড় সরদাররা তাঁর বিরুদ্ধে মিথ্যার ঝড় সৃষ্টি করেছিল৷ তারা ভালোভাবেই জানতো এবং নিজেদের ব্যক্তিগত মজলিসে একথা স্বীকার করতো যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিরুদ্ধে তারা যেসব অপবাদ দিচ্ছে সেগুলো একেবারেই ভিত্তিহীন৷ তারা লোকদের মনে তাঁর বিরুদ্ধে খারাপ ধারণা সৃষ্টি করার জন্য তাঁকে কবি, গণক, যাদুকর, পাগল এবং আরো নাজানি কত কি বলতো৷ কিন্তু তাদের নিজেদের বিবেক একথা মানতো এবং তারা পরস্পরের সামনে স্বীকারও করতো যে, এসব ডাহা মিথ্যা কথা এবং নিছক তাঁর দাওয়াতকে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য তারা এগুলো তৈরী করেছে৷ তাই আল্লাহ তার নবীকে বলছেন, এদের বাজে কথায় মন খারাপ করো না৷ যারা মিথ্যা দিয়ে সত্যের মোকাবিলা করে তারা শেষ পর্যন্ত এ দুনিয়াও ব্যর্থ হবে এবং আখেরাতেও নিজেদের অশুভ পরিণতি দেখে নেবে৷
৬৪. এবার কাফেরদের প্রশ্নের যুক্তিভিত্তিক জবাব দেয়া হচ্ছে৷ ৪৮ আয়াতে এ প্রশ্নটি উদ্ধৃত হয়েছে৷ "কিয়ামতের হুমকি কবে পূর্ণ হবে" তাদের এ প্রশ্ন এ জন্য ছিল না যে, তারা কিয়ামত আসার তারিখ জানতে চাচ্ছিল বরং এ জন্য ছিল যে, মৃত্যুর পর তারা মানুষের পুনরায় উঠানোকে অসম্ভব বরং বুদ্ধি বিরোধী মনে করতো৷ তাই তাদের প্রশ্নের জবাবে আখেরাতের সম্ভাবনার পক্ষে যুক্তি পেশ করা হচ্ছে৷ ইবনে আব্বাস (রা), কাতাদাহ ও সাঈদ ইবনে জুবাইর বর্ণিত হাদীস থেকে জানা যায়, এ সময় মক্কার কাফের সরদারদের মধ্য থেকে এক ব্যক্তি কবরস্তান থেকে কোন লাশের একটি গলিত হাড় নিয়ে আসে এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সামনে সেটি ভেঙে ফেলে এবং তার বিচূর্ণিত অংশগুলো বাতাসে ছড়িয়ে দিয়ে বলে, "হে মুহাম্মাদ , তুমি বলছো মৃতদেরকে আবার জীবিত করে উঠানো হবে৷ বলো, এ পচা-গলা হাড়গুলোকে আবার কে জীবিত করবে?" সংগে সংগেই এ আয়াতগুলোতে এর জবাব দেয়া হয়৷
৬৫. অর্থাৎ এমন শক্রবিন্দু যার মধ্যে নিছক একটি প্রাথমিক জীবন -কীট ছাড়া আর কিছুই ছিল না, তাকে উন্নতি দান করে আমি এমন পর্যায়ে পৌছিয়ে দিয়েছি যার ফলে সে কেবল প্রাণীদের মতো চলাফেরা ও পানাহার করতে থাকেনি বরং এর থেকে অগ্রসর হয়ে তার মধ্যে চেতনা , বুদ্ধি-জ্ঞান এবং তর্ক-বিতর্ক, আলাপ-আলোচনা , যুক্তি প্রদর্শন করা ও বাগ্মীতার এমন সব যোগ্যতা সৃষ্টি হয়ে গেছে যা অন্য কোন প্রাণীর মধ্যে নেই৷ এমন কি এখন সে নিজের স্রষ্টাকেও বিদ্রূপ করতে এগিয়ে আসছে৷
৬৬. অর্থাৎ আমাকে সৃষ্টিকুলের মতো অক্ষম মনে করে এবং এ ধারণা পোষণ করে যে, মানুষ যেমন কোন মৃতকে জীবিত করতে পারে না ঠিক তেমনি আমিও পারি না৷
৬৭. অর্থাৎ একথা ভুলে যায় যে, আমি নিষ্প্রাণ বস্তু থেকে এমন প্রাথমিক জীবন-কীট সৃষ্টি করেছি, যা তার সৃষ্টির উৎসে পরিণত হয়েছে এবং তারপর এ কীটকে লালন করে তাকে এত বড় করে দিয়েছি, যার ফলে সে আজ আমার সামনে কথা বলার যোগ্যতা অর্জন করেছে৷
৬৮. এর অর্থ হচ্ছে, তিনি সবুজ বৃক্ষসমূহে এমন দাহ্যবস্তু রেখে দিয়েছেন যা ব্যবহার করে তোমরা কাঠের সাহায্যে আগুন জ্বালিয়ে থাকো৷ অথবা এর মাধ্যমে 'মারখ' ও 'আফার'নামক দুটি গাছের দিকে ইংগিত করা হয়েছে৷ এ গাছ দুটির কাঁচা ডাল নিয়ে আরবের লোকেরা একটার ওপর আর একটাকে মারতো, ফলে তা থেকে আগুন ঝরে পড়তো৷ প্রাচীন যুগে গ্রামীণ আরবরা আগুন জ্বালাবার জন্য চকমকি হিসেবে এ ডাল ব্যবহার করতো এবং সম্ভবত আজো করে থাকে৷