(৩৬:৩৩) এদের ২৬ জন্য নিষ্প্রাণ ভূমি একটি নিদর্শন৷ ২৭ আমি তাকে জীবন দান করেছি এবং তা থেকে শস্য উৎপন্ন করেছি, যা এরা খায়৷
(৩৬:৩৪) আমি তার মধ্যে খেজুর ও আংগুরের বাগান সৃষ্টি করেছি এবং তার মধ্যে থেকে ঝরণাধারা উৎসারিত করেছি,
(৩৬:৩৫) যাতে এরা তার ফল ভক্ষণ করে৷ এসব কিছু এদের নিজেদের হাতের সৃষ্ট নয়৷ ২৮ তারপরও কি এরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না?২৯
(৩৬:৩৬) পাক-পবিত্র সে সত্তা ৩০ যিনি সব রকমের জোড়া সৃষ্টি করেছেন , তা ভূমিজাত উদ্ভিদের মধ্য থেকে হোক অথবা স্বয়ং এদের নিজেদের প্রজাতির অর্থাৎ মানব জাতি মধ্য থেকে হোক কিংবা এমন জিনিসের মধ্য থেকে হোক যাদেরকে এরা জানেও না৷ ৩১
(৩৬:৩৭) এদের জন্য রাত হচ্ছে আর একটি নিদর্শন৷ আমি তার উপর থেকে দিনকে সরিয়ে দেই তখন এদের ওপর অন্ধকার ছেয়ে যায়৷ ৩২
(৩৬:৩৮) আর সূর্য, সে তার নির্ধারিত গন্তব্যের দিকে ধেয়ে চলছে৷ ৩৩ এটি প্রবল পরাক্রমশালী জ্ঞানী সত্তার নিয়ন্ত্রিত হিসেব৷
(৩৬:৩৯) আর চাঁদ, তার জন্য আমি মনযিল নির্দিষ্ট করে দিয়েছি, সেগুলো অতিক্রম করে সে শেষ পর্যন্ত আবার খেজুরের শুকনো ডালের মতো হয়ে যায়৷ ৩৪
(৩৬:৪০) না সুর্যের ক্ষমতা আছে চাঁদকে ধরে ফেলে ৩৫ এবং না রাত দিনের ওপর অগ্রবর্তী হতে পারে, ৩৬ সবাই এক একটি কক্ষপথে সন্তরণ করছে৷ ৩৭
(৩৬:৪১) এদের জন্য এটিও একটি নিদর্শন যে, আমি এদের বংশধরদেরকে ভরা নৌকায় চরিয়ে দিয়েছি ৩৮
(৩৬:৪২) এবং তারপর এদের জন্য ঠিক তেমনি আরো নৌযান সৃষ্টি করেছি যেগুলোতে এরা আরোহণ করে৷৩৯
(৩৬:৪৩) আমি চাইলে এদেরকে ডুবিয়ে দেই, এদের কোন ফরিয়াদ শ্রবণকারী থাকবে না এবং কোনভাবেই এদেরকে বাঁচানো যেতে পারে না৷
(৩৬:৪৪) ব্যস, আমার রহমতই এদেরকে কূলে ভিড়িয়ে দেয় এবং একটি বিশেষ সময় পর্যন্ত জীবনের দ্বারা লাভবান হবার সুযোগ দিয়ে থাকে৷ ৪০
(৩৬:৪৫) এদেরকে যখন বলা হয়, তোমাদের সামনে যে পরিণাম আসছে এবং যা তোমাদের পেছনে অতিক্রান্ত হয়েছে তার হাত থেকে বাঁচো, ৪১ হয়তো তোমাদের প্রতি অনুগ্রহ করা হবে (তখন এরা এক কান দিয়ে শুনে অন্য কান দিয়ে বের করে দেয়)৷
(৩৬:৪৬) এদের সামনে এদের রবের আয়াতসমূহের মধ্য থেকে যে আয়াতই আসে এরা সেদিকে দৃষ্টি দেয় না ৪২
(৩৬:৪৭) এবং যখন এদেরকে বলা হয়, আল্লাহ তোমাদের যে রিযিক দান করেছেন তার মধ্য থেকে কিছু আল্লাহর পথে খরচ করো তখন এসব কুফরীতে লিপ্ত লোক মু’মিনদেরকে জবাব দেয় “আমরা কি তাদেরকে খাওয়াবো, যাদেরকে আল্লাহ চাইলে নিজেই খাওয়াতেন? তোমরা তো পরিস্কার বিভ্রান্তির শিকার হয়েছো৷ ৪৩
(৩৬:৪৮) এরা ৪৪ বলে, “এ কিয়ামতের হুমকি কবে পুরা হবে? বলো, যদি তোমরা সত্যবাদী হও?৪৫
(৩৬:৪৯) আসলে এরা যে জিনিসের দিকে তাকিয়ে আছে তা তো একটি বিস্ফোরণের শব্দ যা সহসা এদেরকে ঠিক এমন অবস্থায় ধরে ফেলবে যখন এরা (নিজেদের পার্থিব ব্যাপারে)বিবাদ করতে থাকবে
(৩৬:৫০) এবং সে সময় এরা কোন অসিয়াতও করতে পারবে না এবং নিজেদের গৃহেও ফিরতে পারবে না৷ ৪৬
২৬. মক্কার কাফেররা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মোকাবিলায় অস্বীকার, মিথ্যা আরোপ ও সত্য বিরোধিতার যে কর্মনীতি অবলম্বন করে, পিছনের দু'রুকুতে তার নিন্দা করা হয়েছে৷ আর এখন ভাষনের মোড় ফিরে যাচ্ছে মুল বিবাদের দিকে, যা তাদের ও নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মধ্যকার দ্বন্দ্ব-সংঘাতের আসল কারণ ছিল৷ অর্থাৎ তাওহীদ ও আখেরাতের বিশ্বাস, যা নবী করীম (সা) পেশ করেছিলেন এবং কাফেররা মেনে নিতে অস্বীকার করছিল৷ এ প্রসঙ্গে একের পর এক কয়েকটি যুক্তি উপস্থাপন করে লোকদেরকে এ মর্মে চিন্তা -ভাবনা করার দাওয়াত দেয়া হচ্ছে যে, তোমাদের চোখের সামনে বিশ্ব-জাহানের এই যে, নিদর্শনাবলী প্রকাশ্যে দেখা যাচ্ছে, এগুলো কি সত্যটির প্রতি পরিস্কার অংগুলি নিদর্শন করছে না, যা এ নবী তোমাদের সামনে পেশ করছেন?
২৭. অর্থাৎ তাওহীদই সত্য এবং শিরক পুরোপুরি ভিত্তিহীন৷
২৮. এ বাক্যটির দ্বিতীয় অনুবাদ এও হতে পারে, "যাতে এরা খেতে পারে তার ফল এবং সে জিনিসগুলো, যা এদের নিজেদের হাত তৈরী করে ৷ " অর্থাৎ প্রাকৃতিক উৎপাদন ব্যবস্থার মাধ্যমে এরা নিজেরা যেসব কৃত্রিম খাদ্য তৈরী করে যেমন রুটি, তরকারী, মুরব্বা, আচার চাটনি এবং অন্যান্য অসংখ্য জিনিস৷
২৯. এ সংক্ষিপ্ত বাক্যগুলোতে ভূমির উর্বরতা ও উৎপাদন ক্ষমতাকে যুক্তি হিসেবে পেশ করা হয়েছে৷ মানুষ দিনরাত ভূমি থেকে উৎপাদিত শস্য-ফলমূল খাচ্ছে৷ তারা নিজেরা একে একটি মামুলি ব্যাপার মনে করে থাকে৷ কিন্তু গাফলতির পর্দা ছিন্ন করে গভীর দৃষ্টিতে নিরীক্ষণ করলে তারা জানতে পারবে যে, এ ভূমির আস্তরণ ভেদ করে সবুজ শ্যামল ফসল ও বন -বনানীর সৃষ্টি এবং তার মধ্যে নদ-নদী ও স্রোতস্বিনী প্রবাহিত হওয়া এমন কোন খেলা নয় যা নিজে নিজেই চলছে৷ বরং এর পেছনে সক্রিয় রয়েছে একটি বিরাট জ্ঞান, শক্তি এবং প্রতিপালন ও পরিচালন ব্যবস্থা৷ পৃথিবীর প্রকৃত স্বরূপ সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা করলে দেখা যাবে যেসব উপাদানের সাহায্যে এটি গঠিত হয়েছে সেগুলোর মধ্যে আপনা-আপনি বিকাশ, বৃদ্ধি এবং সমৃদ্ধি লাভ করার কোন ক্ষমতা নেই৷ এসব উপাদান এককভাবেও এবং সব রকমের মিশ্রণ ও সংগঠনের পরও থাকে একেবারেই অকেজো ও অনুপযোগী৷ এ কারণে এদের মধ্যে জীবনের নামমাত্রও নেই৷ এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এ নিষ্প্রাণ যমীনের বুক চিরে উদ্ভিদ জীবনের উন্মেষ সম্ভব হলো কেমন করে?এ সম্পর্কে অনুসন্ধান চালালে জানা যাবে , পূর্বেহ্নেই কয়েকটি বড় বড় কার্যকারণ সংগৃহীত না হলে এ জীবনধারা আদৌ অস্তিত্বলাভই করতে পারতো না৷

প্রথমত, পৃথিবীর বিশেষ অংশসমূহে তার উপরিভাগের ভুপৃষ্ঠে এমন অনেক জৈবিক উপাদনের আস্তরণ বিছানো হয়েছে যা উদ্ভিদের খাদ্যে পরিণত হবার উপযোগী হতে পারতো৷ এ আস্তরণকে নরম রাখা হয়েছে, যাতে উদ্ভিদদের শিকড় তার মধ্যে বিস্তার লাভ করে নিজের খাদ্য আহরণ করতে পারে৷

দ্বিতীয়ত, যমীনের ওপর বিভিন্ন পদ্ধতিতে পানি সিঞ্চনের ব্যবস্থা করা হয়েছে, যাতে খাদ্য উপাদানসমূহ তার মধ্যে অনুপ্রবেশ করে এমন পর্যায়ে উপনীত হতে পারে যার ফলে উদ্ভিদের শিকড়সমূহ তা চূষে নিতে সক্ষম হয়৷

তৃতীয়ত, ওপরের শুন্যলোকের বায়ূ সৃষ্টি করা হয়েছে৷ এ বায়ূ উর্ধলোকের বিপদ -আপদ থেকে যমীনের হেফাজত করে এবং বৃষ্টি পরিবহনের কাজ সম্পাদন করে৷ এ সংগে এর মধ্যে এমন সব গ্যাসের সমাবেশ ঘটে যা উদ্ভিদের জীবন এবং তাদের বৃদ্ধিও বিকাশলাভের জন্য প্রয়োজন৷

চতুর্থত, সূর্য ও পৃথীবীর মধ্যে এমনভাবে সম্পর্ক স্থাপন করা হয়েছে যার ফলে উদ্ভিদ তাদের জীবন গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় হারে উষ্ণতাএবং অনুকূল পরিবেশ ও মওসূম লাভ করতে পারে৷

এ চারটি বড় বড় কার্যকরণ (যেগুলো মূলগতভাবে অসংখ্য আনুষংগিক কার্যকারণের সমষ্টি) সৃষ্টি করে দেয়ার পর উদ্ভিদদের অস্তিত্ব লাভ করা সম্ভবপর হয়৷ তারপর এ উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টি করে দেবার পর উদ্ভিদ সৃষ্টি করা হয়েছে৷ এদের মধ্য থেকে প্রত্যেকের বীজ এমনভাবে তৈরী করা হয়েছে যার ফলে যখনই তা উপযোগী জমি, পানি, বাতাস ও মওসূমের সংস্পর্শে আসে তখনই তার মধ্যে উদ্ভিদ সুলভ জীবনের আনাগোনা শুরু হয়ে যায়৷ এছাড়াও এ বীজের মধ্যে এমন ব্যবস্থাও করে দেয়া হয়েছে যার ফলে প্রত্যেক উদ্ভিদ প্রজাতির বীজ থেকে অনিবার্যভাবে একই প্রজাতির চারা তার যাবতীয় শ্রেনী স্বাতন্ত্র ও উত্তরাধিকার বৈশিষ্ট সহকারে জন্ম নেয়৷ এর ওপর বাড়তি যে সৃজন কুশলতার অবতারণা করা হয় তা হচ্ছে এই যে, দশ-বিশ বা পঞ্চাশ শ্রেণীর নয় বরং অসংখ্য শ্রেণীর উদ্ভিদ সৃষ্টি করা হয় এবং সেগুলোকে এমনভাবে তৈরী করা হয় যার ফলে তারা অসংখ্য শ্রেণীর পশু ও মানবকূলের খাদ্য, ঔষুধ, পোশাক ও অন্যান্য অগণিত প্রয়োজন পূর্ণ করতে সক্ষম হয়, উদ্দের পরে পৃথিবীর বুকে এ প্রয়োজনগুলো অস্তিত্বলাভের অপেক্ষায় ছিল৷

এ বিস্ময়কর ব্যবস্থা সম্পর্কে যে ব্যক্তিই চিন্তা করবে সে যদি হঠকারিতা ও সংকীর্ণ স্বার্থপ্রীতির শিকার না হয় তাহলে তার অন্তর সাক্ষ দেবে , এসব কিছু আপনা-আপনি হতে পারে না৷ এর মধ্যে সুস্পষ্টভাবে একটি জ্ঞানদীপ্ত পরিকল্পনা কাজ করছে৷ এ ক্ষেত্রে মওসুমের সম্পর্ক উদ্ভিদের সাথে এবং উদ্ভিদের সম্পর্ক জীব জন্তু ও মানুষের প্রয়োজনের সাথে চরম স্পর্শকাতরতা ও সূক্ষতা বজায় রেখে প্রতিষ্ঠিত করা হয়৷ কোন বুদ্ধি বিবেকবান মানুষ ধারণা করতে পারে না এ ধরনের সর্বব্যাপী সম্পর্ক নিছক ঘটনাক্রমে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে ৷ তারপর এ ব্যবস্থাপনা আবার একথাও প্রমাণ করে যে, এটি বহু প্রভুর কৃতিত্ব হতে পারে না ৷ এটি এমন একজন মাত্র ইলাহর ব্যবস্থাধীনে সম্পাদিত হচ্ছে এবং হতে পারে যিনি মাটি, বাতাস, পানি, সূর্য, উদ্ভিদ, জীবজন্তু , ও মানব জাতি সবার স্রষ্টা ও রব৷ এদের প্রত্যেকের প্রভু যদি আলাদা আলাদা হতো তাহলে কেমন করে এমনি ধরনের একটি সর্বব্যাপী ও গভীর জ্ঞানময় সম্পর্ক রক্ষাকারী পরিকল্পনা তৈরী হয়ে যাওয়ার এবং লাখো-লাখো কোটি-কোটি বছর পর্যন্ত এমন সুশৃংখলভাবে যথানিয়মে পরিচালিত হবার কথা কল্পনা করা যেতে পারে৷

তাওহীদের সপক্ষে এ যুক্তি পেশ করার পর মহান আল্লাহ বলেনঃ---------অর্থাৎ এরা কি এমনই অকৃতজ্ঞ ও নিমকহারাম হয়ে গেছে যে, যে আল্লাহ এদের জীবনের জন্য এ সমস্ত সাজ-সরঞ্জাম সরবরাহ করে দিয়েছেন এরা তাঁর শোকরগুজারী করে না এবং তাঁর নিয়ামতগুলো উদরস্থ করে অন্যের শোকরগুজারী করে? তাঁর সামনে মাথা নত করে না এবং তাদের জন্য যে মিথ্যা উপাস্যরা একটি ঘাসও সৃষ্টি করেনি তাদের সামনে মাথা নত করে যষ্ঠাংগ প্রণিপাত করে?
৩০. অর্থাৎ সব রকমের দোষ-ত্রুটির আবিলতামূক্ত , সব রকমের দুর্বলতা ও ভ্রান্তির উর্ধে তাঁর কোন শরীক ও ভাগীদার আছে এ ধরনের চিন্তা -ভাবনার কোন অবকাশই নেই৷ মুশরিকদের আকীদা -বিশ্বাস খন্ডন করে সাধারণভাবে কুরআন মজীদে এ শব্দগুলো এ জন্য ব্যবহার করা হয় যে, শিরকের প্রতিটি আকীদা প্রকৃতপক্ষে মহান আল্লাহর প্রতি কোন না কোন দোষ-ত্রুটি, দুর্বলতা ও ভ্রান্তির অপবাদ৷ আল্লাহর জন্য শরীক নির্ধারণ করার অর্থই হচ্ছে এই যে, এ ধরনের কথা বলে সে আসলে মনে করে আল্লাহ একা তাঁর সার্বভৌম কর্তৃত্ব পরিচালনার যোগ্যতা রাখেন না অথবা তিনি নিজে তাঁর প্রভুত্বের কর্তৃত্ব পরিচালনায় কাউকে শরীক করতে বাধ্য কিংবা অন্য কতিপয় সত্তা আপনা আপনিই এত বেশী শক্তির অধিকারী হয়ে গেছে যে, তারা প্রভুত্বের ব্যবস্থাপনায় হস্তক্ষেপ করছে এবং আল্লাহ তাদের হস্তক্ষেপ বরদাশত করছেন অথবা নাউযুবিল্লাহ তিনি মানব বংশজাত, রাজা-বাদশাহদের মতো দুর্বলতার অধিকারী, যে কারণে মন্ত্রী, পরিষদবর্গ, মোসাহেব ও প্রিয় শাহজাদা ও শাহজাদীদের একটি বিরাট দলের দ্বারা তিনি ঘেরাও হয়ে আছেন এবং আল্লাহর সার্বভৌম কর্তৃত্বের বহু ক্ষমতা তাদের মধ্যে বন্টিত হয়ে গেছে৷ আল্লাহ সম্পর্কে এ জাহেলী ধ্যান-ধারণা যদি চিন্তা -চেতনার সাথে সম্পৃক্ত না থাকতো , তাহলে আদতে শিরকের চিন্তার জন্মাই হতে পারতো না৷ তাই কুরআন মজীদের বিভিন্ন স্থানে বলা হয়েছে, মুশরিকরা আল্লাহর সাথে যেসব দোষ, অভাব ও দুর্বলতা সম্পৃক্ত করে, আল্লাহ তা থেকে মুক্ত, পরিচ্ছন্ন ও পবিত্র৷
৩১. এটি তাওহীদের সপক্ষে আরো একটি যুক্তি ৷ এখানে আবার পূর্ব থেকে উপস্থিত সত্যগুলোর মধ্য থেকে কয়েকটিকে নিয়ে একথা বলা হচ্ছে যে, দিনরাত তোমরা যেসব জিনিস স্বচক্ষে দেখে চলছো এবং কোনপ্রকার ভাবনা -চিন্তা না করেই এমনিই সামনের দিকে এগিয়ে চলে যেতে থাকো সেগুলোর মধ্যেই সত্যের সন্ধান দেবার মতো নিদর্শনাবলী রয়ে গেছে৷ নারী ও পুরুষের জুটি তো মানুষের নিজের জন্মের উৎস৷ জীবন জন্তুর বংশধারাও পুরুষ ও স্ত্রী জাতীর পশুর মিলনের সাহায্যেই এগিয়ে চলছে৷ উদ্ভিদ সম্পর্কেও মানুষ জানে, তাদের মধ্যে বিপরীত লিংগের জুড়ি বাঁধার নীতি কার্যকর রয়েছে৷ এমনকি নিষ্প্রাণ জড় বস্তুর মধ্যেও দেখা যায় বিভিন্ন বস্তু যখন একটা অন্যটার সাথে যুথবদ্ধ হয় তখনই তাদের থেকে নানা প্রকার যৌগিক পদার্থ অস্তিত্ব লাভ করে৷ স্বয়ং পদার্থের মৌলিক গঠন ঋণাত্মক ও ধনাত্মক বৈদ্যুতিক শক্তির সংযোগেই সম্পন্ন হয়েছে৷ এ যুথিবদ্ধতা, যার মাধ্যে এ সমগ্র বিশ্ব-জাহান অস্তিত্ব লাভ করেছে, প্রজ্ঞা ও সৃষ্টি কুশলতার এমন সব সুক্ষ্মতা ও জটিলতার অধিকারী এবং তার মধ্যে প্রতিটি জোড়ায় সশ্লিষ্ট উভয় পক্ষের মধ্যে এমনসব সম্পর্ক পাওয়া যায়, যার ফলে স্বাধীন বুদ্ধিবৃত্তির অধিকারী কোন ব্যক্তি এ জিনিসটিকে একটি আকস্মিক ঘটনাচক্র বলতে পারেন না৷ আবার একথা মেনেও নিতে পারেনা না যে, বিভিন্ন ইলাহ এসব অসংখ্য জোট সৃষ্টি করে এদের মধ্যে এ ধরনের বুদ্ধিমত্তা সহকারে জুড়ি বেঁধে দিয়ে থাকবেন৷ পুরুষ ও স্ত্রীর পরস্পরের জুড়ি হওয়া এবং তাদের জুড়ি হবার ফলে নতুন জিনিসের সৃষ্টি হওয়া স্বয়ং স্রষ্টার একত্বের সুস্পষ্ট প্রমাণ৷
৩২. দিন-রাত্রির আসা-যাওয়াও পূর্ব থেকে উপস্থিত সত্যগুলোর অন্যতম৷ স্বাভাবিকভাবে দুনিয়ায় এগুলো নিয়মিত ঘটে চলেছে বলে নিছক এ জন্য মানুষ এগুলোর প্রতি মনোযোগ দেবার প্রয়োজন বোধ করে না৷ অথচ যদি দিন কেমন করে আসে, রাত কেমন করে অতিবাহিত হয় এবং দিনের চলে যাওয়ার ও রাতের ফিরে আসার মধ্যে কি কি বিজ্ঞতা ও কৌশল সক্রিয় রয়েছে সে সম্পর্কে সে চিন্তা-ভাবনা করতো তাহলে নিজেই অনুভব করতো যে, এটি একজন শক্তিশালী ও জ্ঞানবান রবের অস্তিত্ব এবং তাঁর একত্বের উজ্জ্বল প্রমাণ৷ পৃথিবীর সামনে থেকে সূর্যের সরে না যাওয়া পর্যন্ত কখনো দিনের বিদায় ও রাতের আগমন হতে পারে না৷ দিনের সরে যাওয়া এবং রাতের আগমনের মধ্যে যে চরম নিয়মানুবর্তিতা পাওয়া যায় তা সূর্য ও পৃথিবীকে একই অপরিবর্তনশীল বিধানের আওতায় আবদ্ধ না রেখে সম্ভবপর ছিল না৷ তারপর এ রাত ও দিনের আসা যাওয়ার যে গভীর সম্পর্ক পৃথিবীর সৃষ্ট জীবকুলের সাথে পাওয়া যায় তা পরিস্কারভাবে একথাই প্রমাণ করে যে, চরম বুদ্ধিমত্তা ও প্রজ্ঞা সহকারে কোন সত্তা ইচ্ছাকৃতভাবেই এ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত করেছেন৷ পৃথিবীর বুকে মানুষ, জীবজন্তু ও উদ্ভিদের অস্তিত্ব, বরং এখানে পানি, হাওয়া ও বিভিন্ন খনিজ দ্রব্যের অস্তিত্বও আসলে পৃথিবীকে সুর্য থেকে একটি বিশেষ দুরত্বে অবস্থান করাবার এবং তারপর পৃথিবীর বিভিন্ন অংশের একটি ধারাবাহিকতা সহকারে নির্ধারিত বিরতির পর সূর্যের সামনে আসার এবং তার সামনে থেকে সরে যেতে থাকার ফল৷ যদি পৃথিবীর দূরত্ব সূর্য থেকে খুব কম বা বেশী হতো অথবা তার এক অংশে সবসময় রাত ও অন্য অংশে সব সময় দিন থাকতো কিংবা দিন-রাত্রির পরিবর্তন অতি দ্রুত বা অতি শ্লথ গতিতে হতো অথবা নিয়ম বহির্ভুতভাবে হঠাৎ কখনো দিনের উদয় হতো আবার কখনো রাত ঢেকে ফেলতো, তাহলে এ পৃথিবীতে কোন জীবনের অস্তিত্ব লাভ সম্ভবপর হতো না৷ শুধু তাই নয় বরং এ অবস্থায় নিষ্প্রাণ পদার্থসমূহের আকার-আকৃতিও তাদের বর্তমান আকৃতি থেকে ভিন্নতর হতো৷ অন্তরের চোখ যদি বন্ধ করে না রাখা হয়, তাহলে মানুষ এ ব্যবস্থার মধ্যে এমন এক আল্লাহর কর্মতৎপরতা প্রত্যক্ষ করতে পারে যিনি এ পৃথিবীর বুকে এ বিশেষ ধরনের সৃষ্ট জীবকুলকে অস্তিত্ব দান করার সংকল্প করেন এবং তাদের যথাযথ প্রয়োজন অনুসারে পৃথিবী ও সূর্যের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপন করেন৷ আল্লাহর অস্তিত্ব ও তাঁর একত্ব যদি কোন ব্যক্তির দৃষ্টিতে বুদ্ধি বিরোধী হয়ে থাকে তাহলে সে নিজেই চিন্তা করে বলুক, এ কলাকৌশলকে বহু ইলাহর সাথে সংশ্লিষ্ট করা অথবা কোন অন্ধ ও বধির প্রাকৃতিক আইনের আওতায় আপনা আপনিই এসব কিছু হয়ে গেছে বলে মনে করা কতদূর বুদ্ধি বিরোধী হওয়া উচিত৷ যে ব্যক্তি কোন প্রকার প্রমাণ ছাড়াই শুধুমাত্র আন্দাজ অনুমানের ভিত্তিতে একেবারেই অযৌক্তিক এ শেষোক্ত ব্যাখ্যা মেনে নিতে পারে, সে যখন বলে, বিশ্ব-জাহানে আইন-শৃংখলা, জ্ঞান-প্রজ্ঞা, ও উদ্দেশ্যমুখিনতার সন্ধান পাওয়া আল্লাহর অস্তিত্বের প্রমাণের জন্য যথেষ্ট নয়, তখন আমাদের জন্য একথা মেনে নেয়া কষ্টকর হয়ে দাঁড়ায় যে, যথার্থই এ ব্যক্তিকোন মতবাদ বা বিশ্বাসকে স্বীকার করে নেবার জন্য কোন পর্যায়েরও যথেষ্ট বা অযথেষ্ট যৌক্তিক সাক্ষ প্রমাণের প্রয়োজন অনুভব করে৷
৩৩. অবস্থান বলতে এমন জায়গাও বুঝানো যেতে পারে যেখানে গিয়ে সূর্যকে সবশেষে থেকে যেতে ও অবস্থান করতে হবে আবার এমন সময়ও হতে পারে যখন সে থেমে যাবে৷ এ আয়াতের সঠিক অর্থ মানুষ তখনই নির্ধারণ করতে পারে যখন বিশ্ব-জাহানের নিগুঢ় তত্ত্ব সম্পর্কে সে সঠিক ও নির্ভুল জ্ঞান লাভ করতে সক্ষম হবে৷ কিন্তু মানুষের জ্ঞানের অবস্থা হচ্ছে এই যে, তা প্রত্যেক যুগে পরিবর্তনশীল ছিল এবং বর্তমানে বাহ্যত সে যা কিছু জানে যে কোন সময় তা পরিবর্তিত হয়ে যাবার সম্ভাবনা রয়েছে৷ প্রাচীন যুগের লোকেরা তাদের চাক্ষুষ দর্শনের ভিত্তিতে সূর্য সম্পর্কে এ নিশ্চিত বিশ্বাস পোষন করতো যে, সূর্য পৃথিবীর চারদিক ঘুরছে৷ তারপর আরো গবেষণা ও পর্যবেক্ষণের পরে এ মতবাদ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে, সে নিজের জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে এবং সৌর জগতের গ্রহসমূহ তার চারদিকে ঘুরছে৷ কিন্তু এ মতবাদও স্থায়ী প্রামাণিত হয়নি৷ পরবর্তীকালের পর্যবেক্ষণ থেকে প্রমাণিত হয়েছে যে, কেবলমাত্র সূর্যই নয় বরং সমস্ত তারকারাজি, যাদেরকে অনঢ়(Fixed Stars)মনে করা হতো, একদিকে ছুটে চলছে৷ তাদের চলার গতি প্রতি সেকেণ্ডে ১০ থেকে ১০০ মাইল বলে অনুমান করা হয়েছে৷ আর আধুনিক আকাশ বিজ্ঞান বিশেষজ্ঞগণ সূর্য সম্পর্কে বলেন যে, সে তার সমগ্র সৌরজগত নিয়ে প্রতি সেকেণ্ডে ২০ কিলোমিটার (অর্থাৎ প্রায় ১২ মাইল)গতিতে এগিয়ে চলছে৷ (দেখুন ইনসাইক্লোপেডিয়া ব্রিটানিকা, স্টার ও সান শব্দ)
৩৪. অর্থাৎ মাসের মধ্যে চাঁদের আবর্তন প্রতিদিন পরিবর্তিত হতে থাকে৷ প্রথম দিন সে 'হেলাল'আকারে উদিত হয়৷ তারপর প্রতিদিন তার দেহ বড় হতে থাকে৷ শেষ পর্যন্ত চতুর্দশীর রাতে সে পূর্ণ চন্দ্রে রূপান্তরিত হয়৷ তারপর প্রতিদিন তার দেহ হ্রাস পেতে থাকে৷ এমনকি শেষ পর্যন্ত আবার হেলালের আকারে ফিরে আসে৷ লাখো-লাখো বছর থেকে এ প্রক্রিয়া চলছে৷ এবং চাঁদের এ নির্ধারিত মনযিলগুলো পরিভ্রমণের মধ্যে কখনো কোন ব্যতিক্রম দেখা দেয়নি৷ এ কারণে মানুষ হিসেব করে সবসময় বলতে পারে চাঁদ কোন দিন মনযিলে থাকবে৷ চাঁদের আবর্তন যদি কোন নিয়মের অধীন না হতো, তাহলে এ ধরনের হিসেব করা সম্ভব হতো না৷
৩৫. এ বাক্যের দুটি অর্থ হতে পারে এবং দুটি অর্থই সঠিক৷ একটি হচ্ছে, চাঁদকে ধরে নিজের দিকে টেনে নেবার অথবা তার গতিপথে প্রবেশ করে তার সাথে সংঘাত বাধাবার ক্ষমতা সূর্যের নেই৷ দ্বিতীয়টি হচ্ছে, চাঁদের উদয়ের জন্য যে সময় নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে সূর্য কখনো তার মধ্যে প্রবেশ করতে পারে না৷ রাতে চাঁদ আকাশে আলো ছড়াচ্ছে এ সময় হঠাৎ দিগন্তে সূর্যের উদয় সম্ভব নয়৷
৩৬. অর্থাৎ দিনের নির্ধারিত সময় শেষ হয়ে যাবর আগে কখনো রাত এসে যাওয়া এবং দিনের আলোর জন্য যে সময় নির্ধারিত রয়েছে তার মধ্যে অকস্মাত নিজের অন্ধাকার নিয়ে তার উপস্থিত হওয়া কখনো সম্ভব নয়৷
৩৭. মুলে "ফালাক"শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে৷ আরবী ভাষায় "ফালাক" মানে গ্রহ-নক্ষত্রের কক্ষপথ(Orbit)এবং এর অর্থ আকাশের অর্থ থেকে ভিন্ন৷ "সবাই একটি কক্ষপথে সাঁতরাচ্ছে" এ উক্তি চারিটি সত্যের প্রতি অংগুলি নির্দেশ করছে৷ এক, কেবলমাত্র, সূর্য ও চন্দ্র নয় বরং সমস্ত তারকা ও গ্রহ এবং সমগ্র আকাশ জগত আবর্তন করছে৷ দুই, এদের প্রত্যেকের আকাশ অর্থাৎ প্রত্যকের আবর্তন পথ বা কক্ষপথ আলাদা৷ তিন, আকাশসমূহ তারকারাজিকে নিয়ে আবর্তন করছে না বরং তারকারাজি আকাশসমূহে আবর্তন করছে৷ চার, আকাশসমূহে তারকাদের আবর্তন এমনভাবে হচ্ছে যেমন কোন তরল পদার্থে কোন জিনিস ভেসে চলে৷

জ্যোতির্বিজ্ঞানের আলোচনা এ আয়াতগুলোর মুল উদ্দেশ্য নয় রবং মানুষকে একথা বুঝানোই এর উদ্দেশ্য যে, যদি সে চোখ মেলে তাকায় এবং নিজের বুদ্ধি ব্যবহার করে তাহলে পৃথিবী থেকে আকাশ পর্যন্ত যেদিকেই তাকাবে সেদিকেই তার সামনে আল্লাহর অস্তিত্ব এবং তার একত্বের অসংখ্য ও অগণিত যুক্তি -প্রমাণের সমাবেশ দেখতে পাবে৷ এ অবস্থায় সে কোথাও নাস্তিক্যবাদ ও শিরকের সপক্ষে একটি যুক্তি -প্রমাণের সমাবেশ দেখতে পাবে না৷ আমাদের এ পৃথিবী যে সৌরজগতের (Solar System)অন্তরভুক্ত তার বিশালত্বের অবস্থা হচ্ছে এই যে, তার কেন্দ্রীয় সূর্যটি পৃথিবীর তিন লক্ষ গুণ বড় এবং তার সবচেয়ে দূরবর্তী গ্রহ নেপচুনের দূরত্ব সূর্য থেকে কমপক্ষে ২শ' ৭৯ কোটি ৩০ লক্ষ মাইলে গিয়ে পৌছে৷ এ বিশালত্ব সত্ত্বেও এ সৌরজগত একটি বিরাট বিশাল ছায়াপথের নিছক একটি ছোট অংশ মাত্র৷ আমাদের এ সৌরজগত যে ছায়াপথটির (Galaxy)অন্তরভুক্ত তার মধ্যে প্রায় ৩ হাজার মিলিয়ন (৩শ' কোটি)সূর্য রয়েছে এবং তার নিকটবর্তী সূর্যটি আমাদের পৃথিবী থেকে এত দূরে অবস্থান করছে যে, তার আলো এখানে পৌছুতে ৪ বছর সময় লাগে৷ তারপর এ ছায়াপথই সমগ্র বিশ্ব-জাহান নয়৷ বরং এতদিনকার পর্যবেক্ষণ থেকে অনুমান করা হয়েছে যে, প্রায় ২০ লক্ষ নীহারিকাপুঞ্জের মধ্যে এটিও একটি এবং এদের নিকটতম নীহারিকা আমাদের থেকে এত বেশী দূরত্বে অবস্থিত যে, তার আলো আমাদের পৃথিবীতে পৌছুতে ১০ লক্ষ বছর লাগে৷ আর আমাদের অত্যাধুনিক দূরবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে সবচেয়ে দূরের যে নীহারিকা দৃষ্টিগোচর হয় তার আলো দুনিয়ায় পৌছুতে ১০ কোটি বছর লাগে৷ এরপরও মানুষ সমগ্র বিশ্ব-জাহান দেখে নিয়েছে, একথা বলা যায় না৷ আল্লাহর সার্বভৌম কর্তৃত্বের সামান্যতম অংশমাত্র এতদিন পর্যন্ত মানুষ পর্যবেক্ষণ করতে পেরেছে৷ সামনের দিকে আরো আত্যাধুনিক পর্যবেক্ষণ উপকরণ উদ্ভাবিত ও সংগৃহিত হলে আরো করো ব্যাপকতা মানুষের সামনে উন্মুক্ত হবে তা বলা সম্ভব নয়৷

বিশ্ব-জাহান সম্পর্কে এ পর্য়ন্ত যে পরিমান তথ্য সংগৃহীত হয়েছে তা থেকে প্রমাণিত হয়, আমাদের এ ক্ষুদ্র পৃথিবীটি যেসব উপাদানে গঠিত এ সমগ্র বিশ্ব-জাহান সে একই উপাদানে গঠিত হয়েছে এবং এর মধ্যে আমাদের পৃথিবীর মতো একই নিয়ম সক্রিয় রয়েছে৷ নয়তো এ পৃথিবীতে বসে আমরা যে অতি দূরবর্তী বিশ্বগুলো পর্যবেক্ষণ করছি, তাদের দূরত্ব পরিমাপ করছি এবং তাদের গতির হিসেব করছি এসব কোনক্রমেই সম্ভবপর হতো না৷ এসব কি একথার সুস্পষ্ট প্রমাণ নয় যে এ সমস্ত বিশ্ব-জাহান একই আল্লাহর সৃষ্টি এবং একই শাসকের রাজ্য? তারপর যে নিয়ম-শৃংখলা, প্রজ্ঞা-কলাকৌশল, দক্ষতা, -শিল্পকারিতা ও সম্পর্ক -সম্বন্ধ এসব লাখো লাখো ছায়াপথ ও তাদের মধ্যে সঞ্চরণশীল শত শত কোটি গ্রহ-নক্ষত্রের মধ্যে পাওয়া যায় তা দেখে কি কোন বুদ্ধিমান মানুষ একথা কল্পনা করতে পারে যে, এসব কিছু আপনা -আপনিই হয়ে গেছে? এ নিয়ম -শৃংখলার পেছনে কি কোন ব্যবস্থাপক, এ কলা -কৌশলের পেছনে কোন জ্ঞানী কৌশল, এ শিল্পকর্মের পেছনে কোন শিল্পী এবং এ সমন্বয় ও সম্পর্কের পেছনে কোন পরিকল্পনাকারী নেই?
৩৮. ভরা নৌযান মানে নূহ আলাইহিস সালামের নৌযান৷ আর মানব বংশধরদেরকে তাতে আরোহণ করিয়ে দেবার অর্থ হচ্ছে এই যে, এ নৌযানে বাহ্যত হযরত নূহের কয়েকজন সাথীই বসেছিলেন ঠিকই কিন্তু আসলে তাতে আরোহণ করেছিল কিয়ামত পর্যন্ত জন্মলাভকারী সমস্ত মানুষ৷ কারণ নূহের তুফানে তাদেরকে ছাড়া বাকি সমস্ত মানুষকে ডুবিয়ে মারা হয়েছিল এবং পরবর্তী মানব বংশধারা এ নৌযানে আরোহীদের থেকে শুরু হয়েছিল৷
৩৯. এ থেকে এ ইংগিত পাওয়া যায় যে, ইতিহাসে হযরত নূহ আলাইহিস সালামের নৌকাটিই ছিল প্রথম নৌকা৷ এর পূর্বে নদী ও সাগর পার হবার কোন উপায় মানুষ জানতো না৷ মহান আল্লাহ সর্বপ্রথম হযরত নূহকে (আ)এ উপায়টি শেখান৷ তাঁর তৈরী করা নৌকায় চড়ে যখন আল্লাহর কিছু বান্দা প্লাবন ও জলোচ্ছ্বাসের হাত থেকে রক্ষা পায় তখন পরবর্তীকালে তাদের বংশধররা সামুদ্রিক সফরের জন্য নৌযান তৈরী করতে থাকে৷
৪০. আগের নিদর্শনগুলো উল্লেখ করা হয়েছিল তাওহীদের সপক্ষে যুক্তি -প্রমাণ হিসেবে, আর এখানে এ নিদর্শনটির উল্লেখ করা হয়েছে এ ধারণা দান করার জন্য যে, প্রাকৃতিক শক্তি ব্যবহার করার যে ক্ষমতাও মানুষকে দেয়া হয়েছে তা সবই আল্লাহ প্রদত্ত, মানুষ নিজেই সেগুলো অর্জন করেনি৷ আর এ শক্তিগুলো ব্যবহার করার যে পদ্ধতি সে উদ্ধাবন করেছে তাও আল্লাহর পথনির্দেশনার মাধ্যমেই তার জ্ঞানের আওতাধীন হয়েছে, এগুলো তার নিজের উদ্ভাবন নয়৷ নিজ শক্তিতে এ বিশাল শক্তিগুলোকে বিজিত করার ক্ষমতা মানুষের ছিল না৷ প্রকৃতির রহস্য সন্ধান করা এবং তার শক্তি করা এবং তার শক্তিগুলোকে কাজে লাগাবার যোগ্যতাও তার ছিল না, তারপর যে শক্তিগুলোর ওপর আল্লাহ তাকে কর্তৃত্ব দান করেছেন তাদের ওপর তার নিয়ন্ত্রণ ততক্ষণ পর্যন্ত থাকে যতক্ষণ আল্লাহ তাদেরকে তার নিয়ন্ত্রণে রাখতে চান৷ অন্যথায় আল্লাহর ইচ্ছা যখন ভিন্নতর হয় তখন যেসব শক্তি মানুষের সেবা করে চলছিল সেগুলো অকস্মাত তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং মানুষ নিজেকে তাদের সামনে সম্পূর্ণ অসহায় দেখতে পায়৷ এ সত্যটি সম্পর্কে সজাগ করার জন্য আল্লাহ সামুদ্রিক সফরের ব্যাপারটিকে নিছক নমুনা হিসেবে পেশ করেছেন৷ আল্লাহ হযরত নূহের যদি নৌকা তৈরী করার পদ্ধতি না শিখিয়ে দিতেন এবং তাঁর প্রতি যারা ঈমান এনেছিল তারা তাতে আরোহণ না করতো তাহলে প্লাবনে সমগ্র মানব জাতি ধ্বংস হয়ে যেতো৷ তারপর আল্লাহর কাছ থেকে নৌকা নির্মাণের কায়দা-কানুন শিখে নিয়ে লোকেরা নদী ও সাগর অতিক্রম করার যোগ্যতা অর্জন করে৷ এর ফলে মানব জাতি সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে পড়তে সক্ষম হয়৷ কিন্তু এ প্রথম পর্ব থেকে আজকের বিশাল আকার জাহাজ নির্মাণ পর্যন্ত মানুষ যতদূর উন্নতি সাধন করেছে এবং নৌযান পরিচালনার ক্ষেত্রে যতটুকুই নিপুণতা ও দক্ষতা অর্জন করেছে তা সত্ত্বেও সে এ দাবী করতে পারে না যে, নদী ও সাগর সবই তার নিয়ন্ত্রণে এসে গেছে এবং তাদের ওপর সে পুরোপুরি বিজয় লাভ করেছে৷ আজো আল্লাহর পানি আল্লাহরই কুদরতের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং যখনই তিনি চান মানুষকে তার জাহাজসহ তার বুকে ডুবিয়ে দেন৷
৪১. অর্থাৎ তোমাদের পূর্ববর্তী জাতিরা যা দেখেছে৷
৪২. আয়াত বলতে আল্লাহর কিতাবের আয়াতই বুঝানো হয়েছে, যেগুলোর মাধ্যমে মানুষকে উপদেশ দেয়া হয় আবার এমন নিদর্শনাবলীও বুঝানো হয়েছে যেগুলো প্রাচীন সভ্যতার ধ্বংসাবশেষ ও মানুষের নিজের অস্তিত্ব ও তার ইতিহাসের মধ্যে পাওয়া যায়৷ এসব মানুষকে শিক্ষা দান করে৷ তবে এ জন্য অবশ্যই মানুষের শিক্ষা গ্রহণ করার মানসিকতা থাকা জরুরী৷
৪৩. এর মাধ্যমে একথা বলাই উদ্দেশ্য যে, কুফরী কেবল তাদের দৃষ্টিশক্তিকেই অন্ধ করে দেয়নি বরং তাদের নৈতিক অনূভূতিকেও নির্জীব করে দিয়েছে৷ তারা আল্লাহর ব্যাপারেও সঠিক চিন্তা-ভাবনা করে না এবং আল্লাহর সৃষ্টির সাথেও যথার্থ ব্যবহার করে না৷ তাদের কাছে রয়েছে প্রত্যেক উপদেশের উল্টা জবাব৷ প্রত্যেক পথভ্রষ্টতা ও অসদাচরণের জন্য একটি বিপরীত দর্শন৷ প্রত্যেক সৎকাজ থেকে দূরে থাকার জন্য একটি মনগড়া বাহানা তাদের কাছে তো রয়েছেই৷
৪৪. নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও কাফেরদের মধ্যে তাওহীদের পরে আর যে বিষয়টি নিয়ে বিরোধ চলছিল সেটি ছিল আখেরাত৷ এ সম্পর্কিত বুদ্ধিবৃত্তিক যুক্তি অবশ্যই সামনের দিকে আলোচনার শেষ পর্যায়ে উপস্থাপন করা হয়েছে ৷ কিন্তু যুক্তি উপাস্থাপনের পূর্বে এখানে এ বিষয়টির ভিত্তিতে তাদের সামনে আখেরাতের একটি শিক্ষনীয় চিত্র অংকন করা হয়েছে৷ এর ফলে তারা জানতে পারবে , যে বিষয়টি তারা অস্বীকার করছে তা তাদের অস্বীকার করার ফলে মূলতবী হয়ে যাবে না বরং অনিবার্যভাবে একদিন তাদের এসব অবস্থার সম্মুখীন হতে হবেই৷
৪৫. এ প্রশ্নের অর্থ এ ছিল না যে, যথার্থই তারা কিয়ামতের আসার তারিখ জানতে চায় এবং যদি তাদেরকে জানানো হতো, অমুক মাসের অমুক তারিখে কিয়ামত হবে তাহলে তাদের সন্দেহ দূর হয়ে যেতো এবং তারা তা মেনে নিতো৷ আসলে এ ধরনের প্রশ্ন তারা করতো নিছক চ্যালেঞ্জের ঢংয়ে কূটতর্ক করার জন্য৷ এ ব্যাপারে তারা একথা বলতে চাচ্ছিল যে, কোন কিয়ামত টিয়ামত হবে না, তোমরা খামখা আমাদের ভয় দেখাচ্ছো৷ এ কারণে তাদের জবাবে বলা হয়নি, কিয়ামত অমুক দিন আসবে বরং তাদেরকে বলা হয়েছে, তা আসবে এবং প্রচণ্ড শক্তিতে আসবে৷
৪৬. অর্থাৎ কিয়ামত আস্তে আস্তে ধীরে-সুস্থে আসবে এবং লোকেরা তাকে আসতে দেখবে, এমনটি হবে না৷ বরং তা এমনভাবে আসবে যখন লোকেরা পুর্ণ নিশ্চিন্ততা সহকারে নিজেদের কাজ কারবারে মশগুল থাকবে এবং তাদের মনের ক্ষুদ্রতম কোণেও এ চিন্তা জাগবে না যে, দুনিয়ার শেষ সময় এসে গেছে৷ এ অবস্থায় অকস্মাত একটি বিরাট বিস্ফোরণ ঘটবে এবং যে যেখানে থাকবে সেখানেই খতম হয়ে যাবে৷ হাদীসে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা) ও হযরত আবু হুরাইরার (রা)নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে একটি বর্ণনা লিপিবদ্ধ হয়েছে৷ তাতে বলা হয়েছেঃ লোকেরা পথে চলাফেরা করবে, বাজারে কেনাবেচা করতে থাকবে, নিজেদের মজলিসে বসে আলাপ আলোচনা করতে থাকবে, এমন সময় হঠাৎ শিংগায় ফুঁক দেয়া হবে৷ কেউ কাপড় কিনছিল৷ হাত থেকে রেখে দেবার সময়টুকু পাবে না, সে শেষ হয়ে যাবে৷ কেউ নিজের পশুগুলোকে পানি পান করাবার জন্য জলাধার ভর্তি করবে এবং তখনো পানি পান করানো শুরু করবে না তার আগেই কিয়ামত হয়ে যাবে৷ কেউ খাবার খেতে বসবে এবং এক গ্রাস খাবার মুখ পর্যন্ত নিয়ে যাবার সুযোগও পাবে না৷