(৩৬:১৩) তাদেরকে দৃষ্টান্ত স্বরূপ সেই জনপদের লোকদের কাহিনী শোনাও যখন সেখানে রসূলগণ এসেছিল৷ ১০
(৩৬:১৪) আমি তাদের কাছে দুজন রসূল পাঠিয়েছিলাম এবং তারা দুজনকেই প্রত্যাখ্যান করেছিল; তখন আমি তৃতীয়জনকে সাহায্যার্থে পাঠিয়েছিলাম এবং তারা সবাই বলেছিল, “তোমাদের কাছে রসূল হিসেবে আমাদের পাঠানো হয়েছে৷ ”
(৩৬:১৫) জনপদবাসীরা বললো, “তোমরা আমাদের মতো কয়েকজন মানুষ ছাড়া আর কেউ নও ১১ এবং দয়াময় আল্লাহ মোটেই কোন জিনিস নাযিল করেননি, ১২ তোমরা স্রেফ মিথ্যা বলছো৷ ”
(৩৬:১৬) রাসূলরা বললো, আমাদের রব জানেন আমাদের অবশ্যই তোমাদের কাছে রসূল হিসেবে পাঠানো হয়েছে
(৩৬:১৭) এবং সুস্পষ্টভাবে পয়গাম পৌছিয়ে দেয়া ছাড়া আমাদের ওপর আর কোন দায়িত্ব নেই৷ ১৩
(৩৬:১৮) জনপদবাসীরা বলতে লাগলো, “আমরা তো তোমাদেরকে নিজেদের জন্য অমঙ্গলজনক মনে করি৷ ১৪ যদি তোমরা বিরত না হও তাহলে আমরা তোমাদেরকে প্রস্তারাঘাতে নিহত করবো এবং আমাদের হাতে তোমরা বড়ই যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি ভোগ করবে৷
(৩৬:১৯) রসূলরা জবাব দিল, তোমাদের অমংগল তোমাদের নিজেদের সাথেই লেগে আছে৷ ১৫ তোমাদের উপদেশ দেয়া হয়েছে বলেই কি তোমরা একথা বলছো? আসল কথা হচ্ছে, তোমরা সীমালংঘনকারী লোক৷ ১৬
(৩৬:২০) ইতিমধ্যে নগরীর দূর প্রান্ত থেকে এক ব্যক্তি দৌড়ে এসে বললো, হে আমার সম্প্রদায়ের লোকেরা! রসূলদের কথা মেনে নাও৷
(৩৬:২১) যারা তোমাদের কাছে কোন পারিশ্রমিক চায় না এবং সঠিক পথের অনুসারী , তাদের কথা মেনে নাও৷ ১৭
(৩৬:২২) কেন আমি এমন সত্তার বন্দেগী করবো না যিনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন এবং যাঁর দিকে তোমাদের সবাইকে ফিরে যেতে হবে? ১৮
(৩৬:২৩) তাঁকে বাদ দিয়ে কি আমি অন্য উপাস্য বানিয়ে নেবো? অথচ যদি দয়াময় আল্লাহ আমার কোন ক্ষতি করতে চান তাহলে তাদের সুপারিশ আমার কোন কাজে লাগবে না এবং তারা আমাকে ছাড়িয়ে নিতেও পারবে না৷ ১৯
(৩৬:২৪) যদি এমনটি করি ২০ তাহলে আমি সুস্পষ্ট গোমরাহীতে লিপ্ত হয়ে পড়বো৷
(৩৬:২৫) আমি তো তোমাদের রবের প্রতি ঈমান এনেছি, ২১ তোমরাও আমার কথা মেনে নাও৷
(৩৬:২৬) (শেষ পর্যন্ত তারা তাকে হত্যা করে ফেললো এবং) সে ব্যক্তিকে বলে দেয়া হলো, “প্রবেশ করো জান্নাতে”৷ ২২
(৩৬:২৭) সে বললো, “হায়! যদি আমার সম্প্রদায় জানতো আমার রব কোন জিনিসের বদৌলতে আমার মাগফিরাত করেছেন এবং আমাকে মর্যাদাশালী লোকদের অন্তরভুক্ত করেছেন৷ ”২৩
(৩৬:২৮) এরপর তার সম্প্রদায়ের ওপর আমি আকাশ থেকে কোন সেনাদল পাঠাইনি, সেনাদল পাঠাবার কোন দরকারও আমার ছিল না৷
(৩৬:২৯) ব্যস, একটি বিস্ফোরণের শব্দ হলো এবং সাহসা তারা সব নিস্তব্ধ হয়ে গেলো৷ ২৪
(৩৬:৩০) বান্দাদের অবস্থার প্রতি আফসোস, যে রসূলই তাদের কাছে এসেছে তাকেই তারা বিদ্রুপ করতে থেকেছে৷
(৩৬:৩১) তারা কি দেখেনি তাদের পূর্বে কত মানব সম্প্রদায়কে আমি ধ্বংস করেছি এবং তারপর তারা আর কখনো তাদের কাছে ফিরে আসবে না? ২৫
(৩৬:৩২) তাদের সবাইকে একদিন আমার সামনে হাজির করা হবে৷
১০. প্রাচীন কুরআন ব্যাখ্যাতাগণ সাধারণভাবে এ মত পোষণ করেছেন যে, এ জনপদটি হচ্ছে সিরিয়ার ইন্তাকিয়া শহর৷ আর এখানে যে রসূলদের কথা বলা হয়েছে তাদেরকে হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম ইসলাম প্রচারের জন্য পাঠিয়েছিলেন৷ এ প্রসংগে যে বিস্তারিত কাহিনী বর্ণনা করা হয়েছে তাতে একথাও বলা হয়েছে যে, সে সময় ইন্তাখিশ ছিল এ এলাকার বাদশাহ৷ কিন্তু এ পুরো কাহিনীটিই ইবনে আব্বাস, কাতাদাহ, ইকরামাহ, কাবুল আহবার, ওহাব ইবনে মুনাব্বিহ প্রমুখ মনীষীগণ খৃষ্টানদের অনির্ভরযোগ্য বর্ণনা থেকে গ্রহণ করেছেন এবং ঐতিহাসিক দিক দিয়ে এটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন৷ ইন্তাকিয়ায় সালুতী পরিবারের(Seleucid dynasty)১৩ জন বাদশাহ এনটিউ কাস(Antiocas)নামে রাজ্য শাসন করেছিল৷ এ নামের শেষ শাসকের শাসন এবং সে সাথে গোটা পরিবারের শাসনকালও খৃস্টপূর্ব ৬৫ সালে শেষ হয়ে গিয়েছিল৷ হযতর ঈসা আলাইহিস সালামের যুগে ইন্তাকিয়াসহ সিরিয়া ও ফিলিস্তিনের সমগ্র এলাকা রোমানদের শাসনাধীনে ছিল৷ তাছাড়া হযতর ঈসা আলাইহিস সালাম নিজেই তাঁর সহচরদেরকে ইসলাম প্রচারের জন্য ইন্তাকিয়ায় পাঠিয়েছিলেন, খৃস্টানদের কোন নির্ভরযোগ্য বর্ণনা থেকে এ মর্মে কোন প্রমাণ পাওয়া যায় না৷ পক্ষান্তরে বাইবেলের 'প্রেরিতদের কার্য' অধ্যায় থেকে জানা যায়, ক্রুশবিদ্ধ হওয়ার ঘটনার কয়েক বছর পর খৃস্টান ধর্মপ্রচারকগণ প্রথমবার সেখানে পৌছেছিলেন৷ এখন একথা সুস্পষ্ট যে, যাদেরকে আল্লাহ রাসুল বানিয়ে পাঠাননি এবং আল্লাহর রসূল যাদেরকে নিযুক্ত করেননি তারা যদি নিজস্ব উদ্যোগে ধর্মপ্রচারে বের হন, তাহলে কোন ধরনের ব্যাখ্যার মাধ্যমে তাদেরকে আল্লাহর রসূল গণ্য করা যেতে পারে না৷ তাছাড়া বাইবেলের বর্ণনা মতে ইন্তাকিয়া হচ্ছে প্রথম শহর যেখানকার অইসরাঈলিরা বিপুল সংখ্যায় ঈসায়ী ধর্ম গ্রহণ করেছিল এবং ঈসায়ী গীর্জা অসাধারণ সাফল্যের অধিকারী হয়েছিল৷ অথচ কুরআন এখানে যে জনপদটির কথা বলছে সেটি এমন একটি জনপদ ছিল যার অধিবাসীরা রসূলদের দাওয়াত প্রত্যাখ্যান করেছিল এবং তার ফলে শেষ পর্যন্ত আল্লাহর আযাবের শিকার হয়েছিল৷ ইন্তাকিয়া যে এমন ধরনের ধ্বংসের সম্মুখীন হয়েছিল যাকে রিসালাত অস্বীকার করার কারণে আগত আযাব গণ্য করা যেতে পারে, তার কোন প্রমাণ ইতিহাসে নেই৷ এসব কারণে জনবসতি বলে এখানে ইন্তাকিয়া বুঝানো হয়েছে একথা গ্রহণযোগ্য নয়৷ কুরআন বা হাদীসে এ জনবসতিটিকে চিহ্নিত করা হয়নি৷ এমনকি এ রসূলগণ কারা ছিলেন এবং কোন যুগে এদেরকে পাঠানো হয়েছিল, কোন নির্ভরযোগ্য সূত্রে একথাও জানা যায়নি৷ কুরআন মজীদ যে উদ্দেশ্যে এ কাহিনী এখানে বর্ণনা করছে তা বুঝার জন্য জনপদের ও রসূলদের নাম জানার কোন প্রয়োজন নেই৷ কাহিনী বর্ণনা করার উদ্দেশ্য হচ্ছে কুরাইশদেরকে একথা জানানো যে, তোমরা হঠকারিতা ও সত্য অস্বীকার করার সে একই নীতির ওপর চলছো যার ওপর চলছিল এ জনপদের লোকেরা এবং তারা যে পরিণাম ভোগ করেছিল সে একই পরিণামের সম্মুখীন হবার জন্য তোমরা প্রস্তুতি নিচ্ছো৷
১১. অন্য কথায় তাদের বক্তব্য ছিল , তোমরা যেহেতু মানুষ, কাজেই তোমরা আল্লাহ প্রেরিত রসূল হতে পারো না৷ মক্কার কাফেররাও এ একই ধারণা করতো৷ তারা বলতো, মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)রসূল, নন, কারণ তিনি মানুষঃ

---------------------------

"তারা বলে, এ কেমন রসূল, যে খাবার খায় এবং বাজারে চলাফেরা করে"৷ (আল ফুরকান, ৭)

---------------------------

"আর জালেমরা পরস্পর কানুঘাষা করে যে, এ ব্যক্তি (অর্থাৎ মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তোমাদের মতো একজন মানুষ ছাড়া আর কি! তারপর কি তোমরা চোখে দেখা এ যাদুর শিকার হয়ে যাবে?" (আল আম্বিয়া, ৩)

কুরআন মজীদ মক্কার কাফেরদের এ জাহেলী চিন্তার প্রতিবাদ করে বলে, এটা কোন নতুন জাহেলিয়াত নয়৷ আজ প্রথমবার এ লোকদের থেকে এর প্রকাশ হচ্ছে না৷ বরং অতি প্রাচীনকাল থেকে সকল মূর্খ ও অজ্ঞের দল এ বিভ্রান্তির শিকার ছিল যে, মানুষ রসূল হতে পারে না এবং রসূল মানুষ হতে পারে ৷ নূহের জাতির সরদাররা যখন হযরত নূহের রিসালাত অস্বীকার করেছিল তখন তারাও একথাই বলেছিলঃ

---------------------------

"এ ব্যক্তি তোমাদের মতো একজন মানুষ ছাড়া আর কিছুই নয়৷ সে চায় তোমাদের ওপর তার নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠিত করতে৷ অথচ আল্লাহ চাইলে ফেরেশতা নাযিল করতেন৷ আমরা কখনো নিজেদের বাপ-দাদাদের মুখে একথা শুনিনি"৷ (আল মু'মিননূন, ২৪)

আদ জাতি একথাই হযরত হূদ (আ) সম্পর্কে বলেছিলঃ

---------------------------

"এ ব্যক্তি তোমাদের মতো একজন মানুষ ছাড়া আর কিছুই নয়৷ সে তাই খায় যা তোমরা খাও এবং পান করে তাই যা তোমরা পান করো৷ এখন যদি তোমরা নিজেদেরই মতো একজন মানুষের আনুগত্য করো তাহলে তোমরা বড়ই ক্ষতিগ্রস্ত হবে৷ " (আল মু'মিনূন, ৩৩-৩৪)

সামূদ জাতি হযরত সালেহ (আ) সম্পর্কেও এ একই কথা বলেছিলঃ

---------------------------

"আমরা কি আমাদের মধ্য থেকে একজন মানুষের আনুগত্য করবো?" (ক্বামার, ২৪)

আর প্রায় সকল নবীর সাথেই এরূপ ব্যবহার করা হয়৷ কাফেররা বলেঃ-------------"তোমরা আমাদেরই মতো মানুষ ছাড়া আর কিছুই নও৷ " নবীগণ তাদের জবাবে বলেনঃ

---------------------------

"অবশ্যই আমরা তোমাদের মতো মানুষ আর কিছুই নই৷ কিন্তু আল্লাহ তাঁর বান্দাদের মধ্য থেকে যার প্রতি চান অনুগ্রহ বর্ষণ করেন"৷ (ইবরাহীম, ১১)

এরপর কুরআন মজীদ বলছে, এ জাহেলী চিন্তাধারা প্রতি যুগে লোকদের হিদায়াত গ্রহণ করা থেকে বিরত রাখে এবং এরই কারণে বিভিন্ন জাতির জীবনে ধ্বংস নেমে এসেছেঃ

---------------------------

"তোমাদের কাছে কি এমন লোকদের খবর পৌছেনি? যারা ইতিপূর্বে কুফরী করেছিল তারপর নিজেদের কৃতকর্মের স্বাদ আস্বাদন করে নিয়েছে এবং সামনে তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি৷ এসব কিছু হয়েছে এজন্য যে , তাদের কাছে তাদের রসূলগণ সুস্পষ্ট প্রমাণ নিয়ে আসতে থেকেছে কিন্তু তারা বলেছে, এখন কি মানুষ আমাদের পথ দেখাবে? একারণে তারা কুফরী করেছে এবং মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে"৷ (আত তাগাবুন, ৫-৬)

---------------------------

"লোকদের কাছে যখন হিদায়াত এলো তখন এ অজুহাত ছাড়া আর কোন জিনিস তাদের ঈমান আনা থেকে বিরত রাখেনি যে, তারা বললো, "আল্লাহ মানুষকে রসূল বানিয়ে পাঠিয়েছেন ?"(বনী ইসরাঈল, ৯৪)

তারপর কুরআন মজীদ সুস্পষ্টভাবে বলছে, আল্লাহ চিরকাল মানুষদেরকেই রসূল বানিয়ে পাঠিয়েছেন এবং মানুষের হিদায়াতের জন্য মানুষই রসূল হতে পারে কোন ফেরেশতা বা মানুষের চেয়ে উচ্চতর কোন সত্তা এ দায়িত্ব পালন করতে পারে নাঃ

---------------------------

"তোমর পূর্বে আমি মানুষদেরকে রসূল বানিয়ে পাঠিয়েছি, যাদের কাছে আমি অহি পাঠাতাম৷ যদি তোমরা না জানো তাহলে জ্ঞানবানদেরকে জিজ্ঞেস করো৷ আর তারা আহার করবে না এবং চিরকাল জীবিত থাকবে, এমন শরীর দিয়ে তাদেরকে আমি সৃষ্টি করিনি"৷ (আল আম্বিয়া, ৭-৮)

---------------------------

"আমি তোমার পূর্বে যে রসূলই পাঠিয়েছিলাম তারা সবাই আহার করতো এবং বাজারে চলাফেরা করতো ৷ " (আল ফুরকান, ২০)

---------------------------

"হে নবী ! তাদেরকে বলে দাও, যদি পৃথিবীতে ফেরেশতারা নিশ্চিন্তে চলাফেরা করতে থাকতো , তাহলে আমি তাদের প্রতি ফেরেশতাদেরকেই রসূল বানিয়ে নাযিল করতাম"৷ (বনী ইসরাঈল, ৯৫)
১২. এটি আরো একটি মূর্খতা ও অজ্ঞতা৷ মক্কার কাফেররা এ মূর্খতা ও অজ্ঞতায় লিপ্ত ছিল৷ বর্তমানকালের তথাকথিত মুক্ত বুদ্ধির প্রবক্তারাও এতে লিপ্ত রয়েছে এবং প্রাচীনতমকাল থেকে প্রত্যেক যুগের অহী ও রিসালাত অস্বীকারকারীরা এতে লিপ্ত থেকেছে৷ চিরকাল এদের সবার চিন্তা ছিল, মানুষের হিদায়াতের জন্য আল্লাহ আদতে কোন অহী নাযিল করেন না৷ তিনি কেবলমাত্র উর্ধজগতের ব্যাপারে আগ্রহান্বিত৷ মানুষের ব্যাপারে মানুষদের নিজেদের ওপরই ছেড়ে দিয়েছেন৷
১৩. অর্থাৎ রব্বুল আলামীন তোমাদের কাছে যে পয়গাম পৌছিয়ে দেবার জন্য আমাদের ওপর দায়িত্ব অর্পণ করেছেন তা তোমাদের কাছে পৌছিয়ে দেয়া ছাড়া আর কোন কাজ আমাদের নেই৷ এরপর তা মেনে নেয়া বা না মেনে নেয়া তোমাদের ইচ্ছাধীন৷ তোমাদের ওপর বল প্রয়োগ করে মেনে নিতে বাধ্য করার দায়িত্ব আমাদের ওপর সোপর্দ করা হয়নি৷ আর তোমরা না মেনে নিলে তোমাদের কুফরীর কারণে আমরা পাকড়াও হবো না৷ বরং তোমাদের এ অপরাধের জন্য তোমাদের নিজেদেরকেই জবাবদিহি করতে হবে৷
১৪. তাদের এ বক্তব্যের উদ্দেশ্য ছিল একথা বুঝানো যে, তোমরা আমাদের জন্য কুলক্ষুণে ও অশুভ৷ তোমরা এসে আমাদের উপাস্য দেবতাদের বিরুদ্ধে যেসব কথাবার্তা বলতে শুরু করেছো তার ফলে দেবতারা আমাদের প্রতি রুষ্ট হয়ে উঠেছে এবং এখন আমাদের ওপর যেসব বিপদ আসছে তা আসছে তোমাদেরই বদৌলতে৷ ঠিক এ একই কথাই আরবের কাফের ও মোনাফিরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিরুদ্ধে বলতোঃ

---------------------------

"যদি তারা কোন কষ্টের সম্মুখীন হতো, তাহলে বলতো, এটা হয়েছে তোমার কারণে ৷ "(আন নিসা, ৭৮)

তাই কুরআন মজীদে বিভিন্ন স্থানে তাদের সম্পর্কে বলা হয়েছে , এ ধরনের জাহেলী কথাবার্তাই প্রাচীন যুগের লোকেরাও তাদের নবীদের সম্পর্কে বলতো৷ সামূদ জাতি তাদের নবীকে বলতো ---------"আমরা তোমাকে ও তোমার সাথীদেরকে অমংগল জনক পেয়েছি"৷ (আন্ নমল: ৪৭)

আর ফেরাউনের জাতিও এ একই মনোভাবের অধিকারী ছিলঃ

---------------------------

"যখন তারা ভালো অবস্থায় থাকে তখন বলে, এটা আমাদের সৌভাগ্যের ফল এবং তাদের ওপর কোন বিপদ এলে তাকে মূসা ও তার সাথীদের অলক্ষুণের ফল গণ্য করতো৷ (আল আরাফ, ১৩১)
১৫. অর্থাৎ কেউ কারোর জন্য অপয়া ও অলক্ষণ নয়৷ প্রত্যেক ব্যক্তির তাকদীরের লিখন তার নিজেরই গলায় ঝুলছে৷ কোন অকল্যাণ ও অঘটন ঘটলে তা হয় তার নিজের তাকদীরের ফল এবং শুভ ও কল্যাণকর কিছু ঘটলে তাও হয় তার তাকদীরের ফল৷

---------------------------

"প্রত্যেক ব্যক্তির কল্যাণ ও অকল্যাণের পরোয়ানা আমি তার গলায় ঝুলিয়ে দিয়েছি"৷
১৬. আসলে তোমরা কল্যাণ থেকে পালাতে চাও এবং হিদায়াতের পরিবর্তে গোমরাহী পছন্দ করো৷ তাই তোমরা যুক্তির মাধ্যমে হক ও বাতিলের ফায়সালা করার পরিবর্তে কুসংস্কার ও পৌরানিক ভাব কল্পনার মাধ্যমে বাহানাবাজি করছো৷
১৭. এ একটি বাক্যের মাধ্যমেই সেই ব্যক্তি নবুওয়াতের সত্যতার সপক্ষে সমস্ত যুক্তি বর্ননা করে দিয়েছেন৷ দুটি কথার মাধ্যমেই একজন নবীর সত্যতা যাচাই করা যেতে পারে৷ এক, তার কথা ও কাজ৷ দুই, তাঁর নিস্বার্থপর হওয়া৷ সে ব্যক্তির যুক্তি প্রদর্শনের উদ্দেশ্য ছিল এই যে, প্রথমত তাঁরা একটি ন্যায়সংগত কথা বলছেন এবং তাঁদের নিজেদের চরিত্র একেবারে নিষ্কুলুষ৷ দ্বিতীয়ত তাঁরা নিজেদের কোন স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য এ দীনের দাওয়াত দিচ্ছেন একথা কেউ চিহ্নিত করতে পারবে না৷ এরপর তাঁদের কথা কেন মেনে নেয়া হবে না তার কোন কারণ খুঁজে পাওয়া যায় না৷ সে ব্যক্তির এ যুক্তি উদ্ধৃত করে কুরআন মজীদ লোকদের সামনে একটি মানদণ্ড তুলে ধরেছে যে, নবীর নবুওয়াত যাচাই করতে হলে এরি নিরিখে যাচাই করো৷ মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কথা ও কাজ একথা জানিয়ে দিচ্ছে যে, তিনি সঠিক পথে রয়েছেন এবং তাছাড়া তাঁর প্রচেষ্টা ও সংগ্রামের পেছনে কোন ব্যক্তিগত স্বার্থের লেশ মাত্রও নেই৷ এরপর কোন বিবেকবান ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তি তাঁদের কথা প্রত্যাখ্যান করবে কিসের ভিত্তিতে?
১৮. এ বাক্যটি দুটি অংশে বিভক্ত৷ প্রথম অংশটিতে রয়েছে উন্নত যুক্তিবাদিতা এবং দ্বিতীয় অংশ সত্য প্রচারের সর্বোত্তম কৌশলের সমাবেশ ঘটানো হয়েছে৷ প্রথম অংশ তিনি বলছেন, স্রষ্টার বন্দেগী করা বুদ্ধি ও প্রকৃতির দাবীর নামান্তর মাত্র৷ অযৌক্তি কথা যদি কিছু থেকে থাকে, তাহলে যারা মানুষ সৃষ্টি করেনি মানুষ তাদের বন্দেগী করবে এটাই অযৌক্তিক৷ যিনি তাকে সৃষ্টি করেছেন মানুষ তার বন্দেগী করবে, এটা অযৌক্তিক নয়৷ দ্বিতীয় অংশে তিনি নিজের জাতির লোকদের মধ্যে এ অনুভূতি সৃষ্টি করেছেন যে, তোমাদের একদিন মরতে তো হবেই এবং যে আল্লাহর বন্দেগী করতে আজ তোমাদের আপত্তি তখন তাঁর কাছে ফিরে যেতে হবে৷ এখন তোমরা নিজেরাই ভেবে দেখো, তাঁর দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে তোমরা কোন কল্যাণের আশা পোষণ করতে পারো৷
১৯. অর্থাৎ তারা আল্লাহর এত প্রিয়ও নয় যে, আমি সুস্পষ্ট অপরাধ করবো এবং তিনি নিছক তাদের সুপারিশে আমাকে মাফ করে দেবেন৷ আবার তাদের এত শক্তিও নেই যে, আল্লাহ আমাকে শাস্তি দিতে চান এবং তারা নিছক নিজেদের শক্তির জোরে আমাকে তাঁর কবল থেকে ছাড়িয়ে আনতে পারেন৷
২০. অর্থাৎ এসব জেনে বুঝে যদি আমি তাদেরকে উপাস্য রূপে গ্রহণ করি৷
২১. এ বাক্যের মধ্যে আবার সত্য প্রচারের একটি সুক্ষ্ম কৌশলের অবতারণা করা হয়েছে৷ একথা বলে সে ব্যক্তি তাদের অনুভূতিকে এভাবে সজাগ করেন যে, আমি যে রবের প্রতি ঈমান এনেছি তিনি কেবল আমারই রব নন বরং তোমাদেরও রব৷ তাঁর প্রতি ঈমান এনে আমি ভুল করিনি বরং তাঁর প্রতি ঈমান না এনে তোমরাই ভুল করছো৷
২২. অর্থাৎ শাহাদাতের সৌভাগ্য লাভ করার সাথে সাথেই তাঁকে জান্নাতের সুসংবাদ দেয়া হলো৷ যখনই মৃত্যুর দরোজা পার হয়ে তিনি অন্য জগতে পৌছে গেলেন, ফেরেশতারা সেখানে তাঁকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য উপস্থিত ছিলেন এবং তারা তখনই তাঁকে এ মর্মে সুসংবাদ দিয়ে দিলেন যে, সুসজ্জিত বেহেশ্ত তাঁর অপেক্ষায় রয়েছে৷ এ বাক্যটির ব্যাখ্যার ব্যাপারে মুফাস্ সিরদের মধ্যে মতবিরোধ দেখা যায়৷ কাতাদাহ বলেন, "আল্লাহ তখনই তাঁকে জান্নাতে প্রবেশ করিয়ে দিয়েছেন, তিনি সেখানে জীবিত রয়েছেন এবং আহারলাভ করছেন৷ অন্যদিকে মুজাহিদ বলেন, "ফেরেশতারা একথা সুসংবাদ হিসেবে তাঁকে জানিয়ে দেন এবং এর অর্থ হচ্ছে, কিয়ামতের পরে যখন সকল মু'মিন জান্নাতে প্রবেশ করবেন তখন তিনিও তাদের সাথে প্রবেশ করবেন"৷
২৩. এটি সেই মু'মিন ব্যক্তির উন্নত নৈতিক মানসিকতার একটি শ্রেষ্ঠতম আদর্শ৷ যারা এ মাত্র হত্যা কর্ম সংঘটিত করেছিল তাদের বিরুদ্ধে তাঁর মনে কোন ক্রোধ ও প্রতিশোধ স্পৃহা ছিল না৷ তিনি আল্লাহর কাছে তাদের জন্য কোন বদদোয়া করছেন না৷ এর পরিবর্তে তিনি এখনো তাদের কল্যাণ কামনা করে চলছিলেন৷ মৃত্যুর পর তাঁর মনে যদি কোন আকাংখা জন্ম নিয়ে থাকে তাহলে তা ছিল কেবলমাত্র এতটুকু যে, হায়, আমার জাতি যদি আমার এ শুভ পরিণাম জানতে পারতো এবং আমার জীবন থেকে না হলেও আমার মৃত্যু থেকেও যদি শিক্ষা নিয়ে সত্য -সঠিক পথ অবলম্বন করতো৷ এ ভদ্র-বিবেকবান মানুষটি নিজের হত্যাকারীদের জন্যও জাহান্নামের প্রত্যাশা করতেন না৷ বরং তিনি চাইতেন তারা ঈমান এনে জান্নাতের অধিকারী হোক৷ এরি প্রশংসা করে হাদীসে বলা হয়েছে, -----------"এ ব্যক্তি জীবিত অবস্থায়ও নিজের জাতির কল্যাণকামী থেকেছে এবং মৃত্যুর পরও৷ "

এ ঘটনাটি বর্ণনা করে মহান আল্লাহ মক্কার কাফেরদেরকে পরোক্ষভাবে এ সত্যটির ব্যাপারে সতর্ক করে দিয়েছেন যে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং তাঁর সাথী মু'মিনরাও তোমাদের ঠিক তেমনি যথার্থ কল্যাণকামী যেমন এ মর্দে মু'মিন তাঁর জাতির কল্যাণকামী ছিল৷ তোমাদের সকল প্রকার উৎপীড়ন-নিপীড়ন সত্ত্বেও এরা তোমাদের বিরুদ্ধে কোন ব্যক্তিগত বিদ্বেষ ও প্রতিশোথধ স্পৃহা পোষণ করে না৷ তোমাদের সাথে এদের শত্রুতা নেই৷ বরং এদের শত্রুতা তোমাদের গোমরাহীর সাথে৷ তোমরা সত্যসঠিক পথে ফিরে আসবে, কেবল এ জন্যই এরা লড়াই করছে৷ এ ছাড়া এদের আর কোন উদ্দেশ্য নেই৷

যেসব আয়াত থেকে বরযখের (মৃত্যের পর থেকে কিয়ামতের পূর্ব পর্যন্ত)জীবনের সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায় এ আয়াতটি তার অন্যতম৷ এ থেকে জানা যায় মৃত্যুর পর থেকে কিয়ামত পর্যন্ত সময়-কাল চূড়ান্ত অস্তিত্ব বিলুপ্তির যুগ নয়৷ কোন কোন স্বল্পজ্ঞান-সম্পন্ন লোক এ রকম ধারণা পোষণ করে থাকে৷ বরং এ সময় দেহ ছাড়াই প্রাণ জীবিত থাকে, কথা বলে ও কথা শোনে, আবেগ-অনুভূতি পোষণ করে, আনন্দ ও দুঃখ অনুভব করে এবং দুনিয়াবাসীদের ব্যাপারেও তার আগ্রহ অব্যাহত থাকে৷ যদি এমনটি না হতো, তাহলে মৃত্যুর পর এ মর্দে মু'মিনকে কেমন করে জান্নাতের সুসংবাদ দেয়া হয় এবং তিনিই বা কেমন করে তার জাতির জন্য এ আকাংখা করেন যে, হায় যদি তারা তাঁর এ শুভ পরিণাম সম্পর্কে জানতে পারতো৷
২৪. মুল শব্দটি হচ্ছে "নিভে গেল"৷ এ শব্দের মধ্যে রয়েছে একটি সুক্ষ্ম ব্যাংগ৷ নিজেদের শক্তির জন্য তাদের অহংকার এবং সত্যদীনের বিরুদ্ধে তাদের সমস্ত ক্ষোভ ও আক্রোশ ছিল যেন একটি জলন্ত অগ্নিশিখা৷ তারা মনে করছিল, এটি ঐ তিনজন নবী ও তাদের অনুসারীদেরকে জ্বালিয়ে ভষ্ম করে দেবে৷ কিন্তু আল্লাহর আযাবের একটি আঘাতেই এ অগ্নিশিখা ঠান্ডা হয়ে গেলো৷
২৫. অর্থাৎ এমন ভাবে ধ্বংস হয়ে গেছে যে, কোথাও তাদের সামান্যতম চিহ্নও নেই৷ যে একবার পড়ে গেছে সে আর ওঠেনি৷ দুনিয়ায় আজ তাদের নাম নেবার মতো একজন লোকও বেঁচে নেই৷ তাদের সভ্যতা ও সংস্কৃতিই নয়, তাদের বংশধারাও বিলুপ্ত হয়ে গেছে৷