(৩৫:২৭) তুমি কি দেখো না আল্লাহ আকাশ থেকে পানি বর্ষন করেন এবং তারপর তার মাধ্যমে আমি নানা ধরনের বিচিত্র বর্ণের ফল বের করে আনি? পাহাড়ের মধ্যেও রয়েছে বিচিত্র বর্ণের সাদা, লাল ও নিকষকাল রেখা৷
(৩৫:২৮) আর এভাবে মানুষ, জীব-জনোয়ার ও গৃহপালিত জন্তুও বিভিন্ন বর্ণের রয়েছে৷ ৪৮ আসল ব্যাপার হচ্ছে, আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে একমাত্র জ্ঞান সম্পন্নরাই তাকে ভয় করে৷ ৪৯ নিসন্দেহে আল্লাহ পরাক্রমশালী এবং ক্ষমাশীল৷ ৫০
(৩৫:২৯) যারা আল্লাহর কিতাব পাঠ করে, নামায কায়েম করে এবং আমি তাদেরকে যা রিযিক দিয়েছি তা থেকে গোপনে ও প্রকাশ্যে খরচ করে, নিসন্দেহে তারা এমন একটি ব্যবসায়ের প্রত্যাশী যাতে কোনক্রমেই ক্ষতি হবে না৷
(৩৫:৩০) (এ ব্যবসায়ে তাদের নিজেদের সবকিছু নিয়োগ করা কারণ হচ্ছে এই যে) যাতে তাদের প্রতিদান পুরোপুরি আল্লাহ তাদেরকে দিয়ে দেন এবং নিজের অনুগ্রহ থেকে আরো বেশী করে তাদেরকে দান করবেন৷ ৫১ নিসন্দেহে আল্লাহ ক্ষমাশীল ও গুনগ্রাহী৷ ৫২
(৩৫:৩১) (হে নবী!) আমি তোমার কাছে অহীর মাধ্যমে যে কিতাব পাঠিয়েছি সেটিই সত্য, সত্যায়িত করে এসেছ তার পূর্বে আগত কিবাতগুলোকে৷ ৫৩ অবশ্যই আল্লাহ নিজের বান্দাদের অবস্থা অবগত আছেন এবং সব জিনিসের প্রতি দৃষ্টি রাখেন৷ ৫৪
(৩৫:৩২) তারপর আমি এমন লোকদেরকে এ কিতাবের উত্তরাধিকারী করেছি যাদেরকে আমি ( এ উত্তরাধিকারের জন্য) নিজের বান্দাদের মধ্য থেকে বাছাই করে নিয়েছি৷ ৫৫ এখন তাদের মধ্য থেকে কেউ নিজের প্রতি জুলুমকারী, কেউ মধ্যপন্থী এবং কেউ আল্লাহর হুকুমে সৎকাজে অগ্রবর্তী, এটিই অনেক বড় অনুগ্রহ৷ ৫৬
(৩৫:৩৩) চিরস্থায়ী জান্নাতে তারা প্রবেশ করবে৷ ৫৭ সেখানে তাদেরকে সোনার কংকন ও মুক্তা দিয়ে সাজানো হবে৷ সেখানে তাদের পোশাক হবে রেশমের
(৩৫:৩৪) এবং তারা বলবে- আল্লাহর শোকর,যিনি আমাদের দঃখ মোচন করেছেন৷ ৫৮ অবশ্যই আমাদের রব ক্ষমাশীল ও গুণের সমাদরকারী, ৫৯
(৩৫:৩৫) যিনি নিজ অনুগ্রহে আমাদেরকে স্থায়ী আবাসস্থল দিয়েছেন ৷ ৬০ এখন এখানে আমাদের না কোন কষ্ট হয় এবং না আসে কোন ক্লান্তি ৷৬১
(৩৫:৩৬) আর যারা কুফরী করেছে ৬২ তাদের জন্য রয়েছে জাহান্নামের আগুন৷ না তাদের অস্তিত্ব খতম করে দেয়া হবে যাতে তারা মরে যাবে এবং না তাদের জন্য জাহান্নামের আযাব কিছু কমানো হবে৷ এভাবে আমি প্রত্যেক কুফরীকারীকে প্রতিফল দিয়ে থাকি৷
(৩৫:৩৭) তারা সেখানে চিৎকার করে করে বলবে হে আমাদের রব! আমাদের এখান থেকে বের করে নাও, আমরা সৎকাজ করবো, আগে যে কাজ করতাম তা থেকে আলাদা৷ (তাদেরকে জবাব দেয়া হবে এই বলে) আমি কি তোমাদের এতটুকু আয়ুস্কাল দান করিনি যে, সময়ে কেউ শিক্ষাগ্রহণ করতে চাইলে শিক্ষাগ্রহণ করতে পারতো? ৬৩ আর তোমাদের কাছে সতর্ককারীও এসে গিয়েছিল৷ এখন স্বাদ আস্বাদন করো, জালেমদের জন্য কোন সাহায্যকারী নেই৷
৪৮. এ দ্বারা যে কথা বুঝতে চাওয়া হয়েছে তা এই আল্লাহর সৃষ্ট এ বিশ্ব-জাহানে কোথাও একঘেয়েমি ও বৈচিত্রহীনতা নেই৷ সর্বত্রই বৈচিত্র৷ একই মাটি ও একই পানি থেকে বিভিন্ন প্রকার গাছ উৎপন্ন হচ্ছে৷ একই গাছের দুটি ফলেরও বর্ণ , দৈহিক কাঠামো ও স্বাদ এক নয়৷ একই পাহাড়ের দিকে তাকালে তার মধ্যে দেখা যাবে নানা রংগের বাহার৷ তার বিভিন্ন অংশের বস্তুগত গঠনপ্রনালীতে বিরাট পার্থক্য পাওয়া যাবে৷ মানুষ ও পশুদের মধ্যে একই মা বাপের দুটি সন্তান ও একই রকম পাওয়া যাবে না৷ এ বিশ্ব জাহানে যদি কেই মেজাজ, প্রকৃতি ও মানসিকতার একাত্মতা সন্ধান করে এবং বিভিন্নতা, বৈচিত্রতা ও বৈষম্য দেখে আতংকিত হয়ে পড়ে, যেদিকে ওপরের ১৯ থেকে ২২ আয়াতে ইশারা করা হয়েছে, তাহলে এটা হবে তার নিজের বোধশক্তি ও উপলব্ধির ত্রুটি৷ এই বৈচিত্র ও বিরোধই জানিয়ে দিচ্ছে এ বিশ্ব জাহান কে কোন মহাপরাক্রমশালী জ্ঞানী সত্তা বহুবিধ জ্ঞান ও বিজ্ঞতা সহকারে সৃষ্টি করেছেন এবং এর নির্মাতা একজন নজীরবিহীন স্রষ্টা ও তুলনাবিহীন নির্মান কৌশলী৷ তিনি একই জিনিসের কেবল একটিমাত্র নমুনা নিয়ে বসে পড়েননি৷ বরং তার কাছে প্রত্যেকটি জিনিসের জন্য একের পর এক এবং অসংখ্য ও সীমাহীন ডিজাইন রয়েছে৷ তারপর বিশেষ করে মানবিক প্রকৃতি ও বুদ্ধি বৈচিত্র সম্পর্কে চিন্তা ভাবনা করলে যে কোন ব্যক্তি একথা বুঝতে পারে যে, এটা কোন আকস্মিক ঘটনা নয় বরং প্রকৃতপক্ষে অতুলনীয় সৃষ্টি জ্ঞানের নিদর্শন৷ যদি জন্মগতভাবে সমস্ত মানুষকে তাদের নিজেদের প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট, প্রবৃত্তি, কামনা, আবেগ অনুভুতি ঝোঁকপ্রবণতা ও চিন্তধারার দিক দিয়ে এক করে দেয়া হতো এবং কোন প্রকার বৈষম্য বিভিন্নতার কোন অবকাশই না রাখা হতো তাহলে দুনিয়ায় মানুষের মতো একটি নতুন ধরনের সৃষ্টি তৈরি করাই হতো পুরাপুরি অর্থহীন৷ স্রষ্টা যখন এ পৃথিবীতে একটি দায়িত্বশীল ও স্বাধীন ক্ষমতার অধিকারী সৃষ্টিকে অস্তিত্বশীল করার ফায়সালা করেছেন তখন তার কাঠামোর মধ্যে সব রকমের বিচিত্রতা ও বিভিন্নতার অবকাশ রাখা ছিল সে ফায়সালার ধরনের অনিবার্য দাবী৷ মানুষ যে কোন আকস্মিক দুর্ঘটনার ফল নয় বরং একটা মহান বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনার ফলশ্রুতি, এ জিনিসটি এর সবচেয় বড় সাক্ষ প্রদান করে৷ আর একথা সুষ্পষ্ট যে, বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা যেখানেই পাওয়া যাবে সেখানেই অনিবার্যভাবে তার পেছনে পাওয়া যাবে এক বিজ্ঞানময় সত্তার সক্রিয় সংযোগ৷ বিজ্ঞানী ছাড়া বিজ্ঞানের অস্তিত্ব কেবলমাত্র একজন নির্বোধই কল্পনা করতে পারে৷
৪৯. অর্থাৎ যে ব্যক্তি আল্লাহর গুনাবলীর ব্যাপারে যতবেশী অজ্ঞ হবে সে তার ব্যাপারে তত বেশী নির্ভীক হবে৷ পক্ষান্তরে আল্লাহর শক্তিমত্তা, জ্ঞান প্রজ্ঞা, ও বিজ্ঞানময়তা, ক্রোধ, পরাক্রম সার্বভৌম কর্তৃত্ব ক্ষমতা ও অন্যান্য গুনাবালী সম্পর্কে যে ব্যক্তি যতবেশী জানবে সে তত বেশী তার নাফরমানী করতে ভয় পাবে৷ কাজেই আসলে এ আয়াতে জ্ঞান অর্থ দর্শন, বিজ্ঞান, ইতিহাস, অংক ইত্যাদি স্কুল কলেজে পঠিত বিষয়ের জ্ঞান নয়৷ বরং এখানে জ্ঞান বলতে আল্লাহর গুনাবলীর জ্ঞান বুঝানো হয়েছে৷ এ জন্য শিক্ষিত ও অশিক্ষিত হবার প্রশ্ন নেই৷ যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে না সে যুগের শ্রেষ্ঠ পন্ডিত হলেও এ জ্ঞানের দৃষ্টিতে সে নিছক একজন মূর্খ ছাড়া আর কিছু নয়৷ আর যে ব্যক্তি আল্লাহর গুনাবলী জানে এবং নিজের অন্তরে তার ভীতি পোষণ করে সে অশিক্ষিত হলেও জ্ঞানী৷ এ প্রসংগে একথাও জেনে রাখা উচিত যে, আয়াতে উল্লেখিত উলামা শব্দটির অর্থ এমন পারিভাষিক উলামাও নয় যারা কুরআন , হাদীস, ফিকহ ও ইলমে কালামে জ্ঞান রাখার কারণে দীনী আলেম বলে পরিচিত৷ তারা সঠিক তখনই এ আয়াতটির প্রয়োগ ক্ষেত্রে পরিণত হবে যখন তাদের মধ্যে আল্লাহভীতি থাকবে৷ হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা) একথাই বলেছেন-

(...........................................)

"বিপুল সংখ্যাক হাদীস জানা জ্ঞানের পরিচায়ক নয় বরং বেশী পরিমান আল্লাহভীতিই জ্ঞানের পরিচয় বহন করে"৷

হযরত হাসান বাসরীও একথাই বলেছেন-

(...............................................)

"আল্লাহকে না দেখে যে ভয় করে সেই হচ্ছে আলেম৷ আল্লাহ যা কিছু পছন্দ করেন সেদিকেই আকৃষ্ট হয় এবং সে বিষয়ে আল্লাহ নারাজ সে ব্যাপারে সে কোন আগ্রহ পোষণ করে না"৷
৫০. অর্থাৎ তিনি এমন পরাক্রমশালী যে, নাফরমানদের যখনই চান পাকড়াও করতে পারেন৷ তার পাকড়াও মুক্ত হবার ক্ষমতা কারো নেই৷ কিন্তু তার ক্ষমতাগুনের ফলেই জালেমরা অবকাশ পেয়ে চলছে৷
৫১. ঈমানদারদের এ কাজকে ব্যবসায়ের সাথে তুলনা করা হচ্ছে৷ কারণ মানুষ ব্যবসায়ের নিজের অর্থ, শ্রম, ও মেধা নিয়োগ করে কেবলমাত্রা আসল ফেরত পাবার এবং শ্রমের পারিশ্রমিক লাভ করার জন্য নয় বরং বাড়তি কিছু মুনাফা অর্জন করার জন্য৷ অনুরূপভাবে একজন মু'মিন ও আল্লহর হুকুম পালন, তার ইবাদাত বন্দেগী এবং তার দীনের জন্য সংগ্রাম সাধনায় নিজের ধন, সময়, শ্রম ও যোগত্যা নিয়োগ করে শুধুমাত্র এসবের পুরাপুরি প্রতিদান লাভ করার জন্য নয় বরং এই সংগে আল্লাহ তার নিজ অনুগ্রহে বাড়তি অনেক কিছু দান করবেন এই আশায়৷ কিন্তু উভয় ব্যবসায়ের মধ্যে অনেক বড় পার্থক্য রয়েছে৷ অর্থাৎ পার্থিব ব্যবসায়ের নিছক মুনাফালাভেরই আশা থাকে না, লোকসান এবং দেউলিয়া হয়ে যাবার আশংকাও থাকে৷ কিন্তু একজন আন্তরিকতা সম্পন্ন বান্দা আল্লাহর সাথে যে ব্যবসায় করে তাতে লোকসান ও ক্ষতির কোন আশংকাই নেই৷
৫২. অর্থাৎ নিজের আন্তরিকতা সম্পন্ন মু'মিনদের সাথে আল্লাহ এমন সংকীর্ণমনা প্রভুর মত ব্যবহার করেন না, যে কথায় কথায় পাকড়াও করে এবং সামান্য একটি ভুলের দরুন নিজের কর্মচারীর সমস্ত সেবা ও বিশ্বস্ততা অস্বীকার করে৷ তিনি মহানুভব দানশীল প্রভু৷ তার বিশ্বস্ত বান্দার ভুল ভ্রান্তি তিনি উপেক্ষা করে যান এবং তার পক্ষে যা কিছু সেবা করা সম্ভব হয়েছে তাকে যথার্থ মূল্য দান করেন৷
৫৩. এর অর্থ হচ্ছে ,পূর্বে আগত নবীগণ যে শিক্ষা দিয়ে গেছেন৷ তিনি তার বিরোধী কোন নতুন কথা বলছেন না ৷ বরং সকল নবী চিরকাল যে আদি ও চিরন্তন সত্য পেশ করে গেছেন তিনি তারই পুনরাবৃত্তি করছেন ৷
৫৪. বান্দার কল্যাণ কোন জিনিসের মধ্যে রয়েছে তার নেতৃত্ব ও পথপ্রদর্শনের উপযোগী নীতি কি এবং তার প্রয়োজন অনুযায়ী যথাযথ নীতি নিয়ম কি কি এ সত্যগুলো সম্পর্কে সতর্ক করে দেয়াই হচ্ছে এখানে আল্লাহর এ গুনাবলী বর্ণনা করার উদ্দেশ্য৷ এ বিষয়গুলো আল্লাহ ছাড়া আর কেউ জানতে পারে না৷ কারণ বান্দার প্রকৃতি ও চাহিদা একমাত্র তিনিই জানেন এবং তার প্রকৃত প্রয়োজন ও কল্যানের প্রতি একমাত্র তিনিই দৃষ্টি রাখেন৷ বান্দা নিজেকে তত বেশী জানে না যত বেশী তার স্রষ্টা তাকে জানেন৷ তাই সত্য সেটিই এবং একমাত্র সেটিই হতে পারে যা তিনি অহীর মাধ্যমে জানিয়ে দিয়েছেন৷
৫৫. অর্থাৎ মুসলমানদেরকে৷ সমগ্র মানবজাতি থেকে ছাঁটাই বাছাই করে তাদেরকে বের করা হয়েছে৷ এভাবে তারা হবে আল্লহর কিতাবের উত্তরাধিকারী এবং মুহাম্মাদ (সা) এর পরে এ কিতাব নিয়ে তারা অগ্রসর হবে৷ যদিও কিতাব পেশ করা হয়েছে তাদেরকে এ মর্যাদা ও গৌরবের জন্য নির্ধারিত করে নেয়া হয়েছে যে, তারাই হবে কুরআনের ন্যায় মহিমান্বিত কিতাবের ওয়ারিস এবং মুহাম্মাদ (সা) এর ন্যায় মহান রসূলের শিক্ষা ও হিদায়াতের বিশ্বস্ত সংরক্ষক৷
৫৬. অর্থাৎ এ মুসলমানরা সবাই একরকম নয়৷ বরং এরা তিন শ্রেনীতে বিভক্ত হয়ে গেছে৷

এক- নিজেদের প্রতি জুলুমকারী৷ এরা হচ্ছে এমনসব লোক যারা আন্তরিকতা সহকারে কুরআনকে আল্লাহ কিতাব এবং মুহাম্মাদ (সা) কে আল্লাহর রসূল বলে মানে কিন্তু কার্যত আল্লাহর কিতাব ও রসূলের সুন্নাতের অনুসরণের হক আদায় করে না৷ এরা মু'মিন কিন্তু গোনাহদার৷ অপরাধী কিন্তু বিদ্রোহী নয়৷ দুর্বল ঈমানদার, তবে মুনাফিক এবং চিন্তা ও মননের দিক দিয়ে কাফের নয় ৷ তাই এদেরকে আত্মনিপীড়ক হওয়া সত্তেও কিতাবের ওয়ারিসদের অন্তরভূক্ত এবং আল্লাহর নির্বাচিত বান্দাদের মধ্যে শামিল করা হয়েছে ৷ নয়তো একথাসুস্পষ্ট, বিদ্রোহী, মুনাফিক এবং চিন্তা ও মননের দিক দিয়ে কাফেরদের প্রতি এ গুনাবলী আরোপিত হতে পারে না তিন শ্রেণীর মধ্য থেকে এ শ্রেণীর ঈমানদারদের কথা সবার আগে বলার কারণ হচ্ছে এই যে উম্মাতের মধ্যে এদের সংখ্যাই বেশী ৷

দুইঃ মঝামাঝি অবস্থানকারী৷এরা হচ্ছে এমন লোক যারা এ উত্তরাধিকারের হক কমবেশী আদায় করে কিন্তু পুরোপুরি করে না ৷ হুকুম পালন করে এবং অমান্যও করে ৷ নিজেদের প্রবৃত্তিকে পুরোপুরি লাগামহীন করে ছেড়ে দেয়নি বরং তাকে আল্লাহর অনুগত করার জন্য নিজেদের যথাসাধ্য প্রচেষ্টা চালায় কিন্তু কখনো তার বাগডোর ঢিলে করে দেয় এবং গোনাহে লিপ্ত হয়ে পড়ে ৷ এভাবে এদের জীবনে ভালো ও মন্দ উভয় ধরনের কাজের সমাবেশ ঘটে৷ এরা সংখ্যায় প্রথম দলের চইতে কম এবং তৃতীয় দলের চেয়ে বেশী হয় ৷ তাই এদেরকে দু' নম্বরে রাখা হয়েছে ৷

তিনঃ ভালো কাজে যারা অগ্রবর্তী ৷ এরা হয় কিতাবের উত্তরাধিকারীদের মধ্যে প্রথম সারির লোক ৷ এরাই আসলে এ উত্তরাধিকারের হক আদায়কারী ৷ কুরআন ও সুন্নাতের অনুসরণের ক্ষেত্রেও এরা অগ্রগামী ৷ আল্লাহর পয়গাম তাঁর বান্দাদের কাছে পৌছিয়ে দেবার ক্ষেত্রেও এরা এগিয়ে থাকে ৷ সত্যদীনের জন্য ত্যাগ স্বীকারেও এরাই এগিয়ে যায় ৷ তাছাড়া সত্য, ন্যায়, সুকৃতি ও কল্যাণের যে কোন কাজেও এরাই হয় অগ্রবর্তী ৷ এরা জেনে বুঝে গোনাহ করে না ৷ আর অজান্তে কোন গোনাহর কাজ আনুষ্ঠিত হলেও সে সম্পর্কে জানার সাথে সাথেই এদের মাথা লজ্জায় নত হয়ে যায়৷ প্রথম দু'টি দলের তুলনায় উম্মাতের মধ্যে এদের সংখ্যা কম ৷ তাই এদের কথা সবার শেষে বলা হয়েছে, যদিও উত্তরাধিকারের হক আদায় করার ক্ষত্রে এরাই অগ্রগামী ৷‍‍ ‍‌‌‌

"এটিই অনেক বড় অনুগ্রহ" বাক্যটির সম্পর্ক যদি নিকটতম বাক্যের সাথে ধরে নেয়া হয় তাহলে এর অর্থ হবে, ভলো কাজে অগ্রগামী হওয়াই হচ্ছে বড় অনুগ্রহ এবং যারা এমনটি করে মুসলিম উম্মতের মধ্যে তারাই সবার সেরা ৷ আর এ বাক্যটির সম্পর্ক পূর্ববর্তী বাক্যের সাথে মিল রেখে করা হলে এর অর্থ হবে, আল্লাহর কিতাবের উত্তরাধিকারের জন্য নির্বাচিত হওয়াই বড় অনুগ্রহ এবং আল্লাহর সকল বান্দাদের মধ্যে সেই বান্দাই সর্বশ্রেষ্ঠ যে কুরআন ও মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি ঈমান এনে নির্বাচনে সফলকাম হয়েছে ৷
৫৭. মুফাসসিরগণের একটি দলের মতে এ বাক্যের সম্পর্ক নিকটবর্তী দু'টি বাক্যের সাথেই রয়েছে ৷ অর্থাৎ সৎকাজে অগ্রগামীরাই বড় অনুগ্রহের অধিকারী এবং তারাই এ জান্নাতগুলোতে প্রবেশ করবে৷ অন্যদিকে প্রথম দু'টি দলের ব্যাপারে নিরবতা অবলম্ব করা হয়েছে, যাতে তারা নিজেদের পরিণামের কথা চিন্তা করে এবং নিজেদের বর্তমান অবস্থা থেকে বের হয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যাবার জন্য প্রচেষ্টা চালাতে পারে৷ আল্লামা যামাখ্ শারী এ অভিমতটি বলিষ্ঠভাবে বিবৃত করেছেন এবং ঈমাম রাযী একে সমর্থন দিয়েছেন৷

কিন্তু অধিকাংশ মুফাস্ সির বলেন, ওপরের সমগ্র আলোচনার সাথে এর সম্পর্ক রয়েছে৷ আর এর অর্থ হচ্ছে, এ তিনটি দলই শেষ পর্যন্ত জান্নাতে প্রবেশ করবে, কোন প্রকার হিসেব-নিকেশ ছাড়াই বা হিসেব নিকেশের পর এবং সব রকমের জবাবাদিহি থেকে সংরক্ষিত থেকে অথবা কোন শাস্তি পাওয়ার পর যে কোন অবস্থাতেই হোক না কেন কুরআনের পূর্বাপর আলোচনা এ ব্যাখ্যার প্রতি সমর্থন দিচ্ছে৷ কারণ সামনের দিকে কিতাবের উত্তরাধিকারীদের মোকাবিলায় অন্যান্য দল সম্পর্কে বলা হচ্ছে, আর যারা কুফরী করেছে তাদের জন্য রয়েছে জাহান্নামের আগুন৷ এ থেকে জানা যায়, যারা এ কিতাবকে মেনে নিয়েছে তাদের জন্য রয়েছে জান্নাত এবং যারা এর প্রতি ঈমান আনতে অস্বীকার করেছে তাদের জন্য রয়েছে জাহান্নাম৷ আবার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিম্নোক্ত হাদীসও এর প্রতি সমর্থন জানায়৷ হযরত আবুদ দারদা এ হাদীস বর্ণনা করেছেন এবং একে উদ্ধৃত করেছেন ইমাম আহমাদ, ইবনে জারীর, ইবনে আবী হাতেম, তাবারানী, বায়হাকী ও অন্যান্য মুহাদ্দিসগণ৷ হাদীসে নবী করীম (সা) বলছেন :

(-------------------------------------------------------)

"যারা সৎকাজে এগিয়ে গেছে‌ তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে কোনরকম হিসেব-নিকেশ ছাড়াই৷ আর যারা মাঝপথে থাকবে তাদের হিসেব -নিকেশ হবে, তবে তা হবে হালকা৷ অন্যদিকে যারা নিজেদের প্রতি জুলুম করেছে তাদেরকে হাশরের দীর্ঘকালীন সময়ে আটকে রাখা হবে, তারপর তাদেরকে আল্লাহর রহমতের মধ্যে নিয়ে নেয়া হবে এবং এরাই হবে এমনসব লোক যারা বলবে, সেই আল্লাহর শোকর যিনি আমাদের থেকে দু:খ দূর করে দিয়েছেন" ৷

এ হাদীসে নবী করীম (সা) নিজেই এ আয়াতটির পুরোপুরি ব্যাখ্যা করে দিয়েছেন৷ এখানে ঈমানদারদের তিনটি শ্রেণীর পরিণাম আলাদা আলাদাভাবে তুলে ধরেছেন৷ মাঝখানে অবস্থানকারীদের হালকা জবাবদিহির সম্মুখীন হবার অর্থ হচ্ছে, কাফেরদেরকে তো তাদের কুফরীর শাস্তি ছাড়াও তাদের প্রত্যেকটি অপরাধ ও গোনাহের পৃথক শাস্তিও দেয়া হবে৷ কিন্তু এর বিপরীতে ঈমানদারদের মধ্যে যারা ভালো ও মন্দ উভয় ধরনের কাজ নিয়ে হাজির হবে তাদের সৎ ও অসৎ কাজগুলোর সম্মিলিত হিসেব -নিকেশ হবে৷ প্রত্যেক সৎকাজের জন্য আলাদা পুরস্কার ও প্রত্যেক অসৎ কাজের জন্য আলাদা শাস্তি দেয়া হবে না৷ আর ঈমানদারদের মধ্যে থেকে যারা নিজেদের প্রতি জুলুম করবে তাদেরকে হাশরের সমগ্র সময় -কালে আটকে রাখা হবে - একথার অর্থ হচ্ছে এই যে, তাদেরকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে না বরং তাদেরকে আদালতের কার্যকাল শেষ হওয়া পর্যন্ত আটকে রাখার শাস্তি দেয়া হবে৷ অর্থাৎ হাশরের সমগ্র সময় -কাল (না জানি তা কত শত বছরের সমান দীর্ঘ হবে) তার পূর্ণ কঠোরতা সহকারে তাদের ওপর দিয়ে অতিক্রান্ত হবে৷ শেষ পর্যন্ত আল্লাহ তাদের প্রতি রহম করবেন এবং আদালতের কাজ শেষ হবার সময় হুকুম দেবেন, ঠিক আছে, এদেরকেও জান্নাতে দিয়ে দাও৷ এ বিষয়বস্তু সম্বলিত বিভিন্ন উক্তি মুহাদ্দিসগণ বিভিন্ন সাহাবী যেমন, হযরত উমর (রা), হযরত উসমান (রা), হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা), হযরত আবুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা), হযরত আয়েশা (রা), হযরত আবু সাঈদ ধুদরী (রা) এবং হযরত বারাআ ইবনে আজেব (রা) থেকে উদ্ধৃত করেছেন৷ আর একথা বলা নিস্প্রয়োজন যে, সাহাবীগণ এহেন ব্যাপারে কোন কথা ততক্ষণ পর্যন্ত বলতে পারেন না৷ যতক্ষণ না তাঁরা নবী সাল্লাল্লাহু ওয়া সাল্লামের মুখে তা শুনে থাকবেন৷

কিন্তু এ থেকে একথা মনে করা উচিত নয় যে, মুসলমানদের মধ্য থেকে যারা নিজেদের প্রতি জুলুম করেছে তাদেরকে কেবলমাত্র আদালত সমাপ্তিকালীন সময় পর্যন্ত আটকে রাখারই শাস্তি দেয়া হবে এবং তাদের মধ্য থেকে কেউ জাহান্নামে যাবেই না৷ কুরআন ও হাদীসে বহুবিধ অপরাধের কথা উল্লেখিত হয়েছে৷ এসব অপরাধকারীদের ঈমানও তাদেরকে জাহান্নাম থেকে বাঁচাতে পারবে না৷ যেমন যে মু'মিন কোন মু'মিনকে জেনে বুঝে হত্যা করে আল্লাহ নিজেই তার জন্য জাহান্নামের শাস্তি ঘোষণা করেছেন৷ অনুরূপভাবে উত্তরাধিকার আইনের আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত সীমারেখা ভংগকারীদের জন্যও কুরআন মজীদে জাহান্নামের শাস্তির ভয় দেখানো হয়েছে৷ সূদ হারাম হবার হুকুম জারী হবার পর যারা সূদ খাবে তাদের জন্য পরিস্কার বলে দেয়া হয়েছে, তারা আগুনের সাথি৷ এ ছাড়াও আরো কোন কোন কবীরাহ গোনাহকারীদের জন্যও হাদীসে সুস্পষ্টভাবে বলে দেয়া হয়েছে যে, তারা জাহান্নামে যাবে৷
৫৮. সব ধরনের দু:খ৷ দুনিয়ায় যেসব চিন্তা ও পেরেশানীতে আমরা লিপ্ত ছিলাম তার হাত থেকেও মুক্তি পাওয়া গেছে৷ কিয়ামতে নিজের পরিণাম সম্পর্কে যে দুশ্চিন্তা ছিল তাও খতম হয়ে যাবে এবং এখন সামনের দিকে অখন্ড নিশ্চিন্ততা, সেখানে কোন প্রকার দু:খ কষ্টের প্রশ্নই থাকে না৷
৫৯. অর্থাৎ আমাদের অপরাধ তিনি ক্ষমা করে দিয়েছেন এবং কর্মের যে সামান্যতম পুঁজি আমরা সাথে করে নিয়ে এসেছিলাম তাকে বিপুল মর্যাদা ও মূল্যদান করে তার বিনিময়ে তাঁর জান্নাত আমাদের দান করেছেন৷
৬০. অর্থাৎ দুনিয়া আমাদের আখেরাতের সফরের একটি মনযিল ছিল৷ এ মনযিলটি আমরা অতিক্রম করে চলে এসেছি৷ এখন আমরা এমন জায়গায় এসে পৌঁছেছি যেখান থেকে বের হয়ে আর কোথাও যেতে হবে না৷
৬১. অন্যকথায় আমাদের সমস্ত পরিশ্রম ও কষ্টের অবসান ঘটেছে৷ এখন এখানে আমাদের এমন কোন কাজ করতে হবে না যা করতে আমাদের পরিশ্রম করতে হবে এবং যা শেষ করে আমরা ক্লান্ত হয়ে পড়বো৷
৬২. অর্থাৎ আল্লাহ মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর যে কিতাব নাযিল করেছেন তা মেনে নিতে অস্বীকার করেছে৷
৬৩. এখানে এমন প্রত্যেকটি আয়ুস্কালের কথা বলা হয়েছে, যার মধ্যে মানুষ সত্য ও মিথ্যা এবং ভালো ও মন্দের মধ্যে ফারাক করতে চাইলে করতে পারে এবং গোমরাহী ত্যাগ করে হিদায়াতের পথে পাড়ি দিতে চাইলেও দিতে পারে৷ এ বয়সে পৌঁছে যাবার আগে যদি কোন ব্যক্তি মরে গিয়ে থাকে তাহলে এ আয়াতের দৃষ্টিতে তাকে কোনপ্রকার জবাবদিহি করতে হবে না৷ তবে যে ব্যক্তি এ বয়সে পৌঁছে গেছে তাকে অবশ্যই তার কর্মের জন্য জবাবদিহি করতে হবে৷ আর তারপর এ বয়স শুরু হয়ে যাবার পর যতদিন সে বেঁচে থাকবে এবং সতর্কতার সাথে সহজ সরল পথে চলার জন্য যতই সুযোগ সে পেয়ে যেতে থাকবে ততই তার দায়িত্ব কঠিন হয়ে যেতে থাকবে৷ এমনকি যে ব্যক্তি বার্ধক্যে পৌঁছেও সোজা হবে না তার জন্য কোন ওজরই থাকবে না৷ একথাটিই একটি হাদীসে হযরত সাহল ইবনে সাদ সায়েদী নবী সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেছেন এভাবে: যে ব্যক্তি কম বয়স পাবে তার জন্য তো ওজরের সুযোগ থাকে কিন্তু ৬০ বছর এবং এর বেশী বয়সের অধিকারীদের জন্য কোন ওজর নেই৷ (বাখারী, আহমাদ, নাসায়ী, ইবনে জারীর ও ইবনে আবী হাতেম ইত্যাদি)