(৩৫:১৫) হে লোকেরা! তোমরাই আল্লাহর মুখাপেক্ষী ৩৬ এবং আল্লাহ তো অভাবমুক্ত ও প্রশংসার্হ৷ ৩৭
(৩৫:১৬) তিনি চাইলে তোমাদের সরিয়ে কোন নুতন সৃষ্টি তোমাদের জায়গায় আনবেন৷
(৩৫:১৭) এমনটি করা আল্লাহর জন্য মোটেই কঠিন নয়৷ ৩৮
(৩৫:১৮) কোন বোঝা বহনকারী অন্যের বোঝা উঠাবে না৷ ৩৯ আর যদি ভারাক্রান্ত ব্যক্তি নিজের বোঝা উঠাবার জন্য ডাকে, তাহলে তার বোঝার সামান্য একটি অংশ উঠাবার জন্য ও কেউ আসবে না, সে তার নিকটতম আত্মীয় স্বজন হলেও৷ ৪০ (হে নবীঃ) তুমি কেবল তাদেরকেই সতর্ক করতে পারো যারা না দেখে তাদের রবকে ভয় করে এবং নামায কায়েম করে৷ ৪১ আর যে ব্যক্তিই পবিত্রতা অবলম্বন করে সে নিজেরই ভালোর জন্য করে এবং ফিরে আসতে হবে সবাইকে আল্লাহরই দিকে৷
(৩৫:১৯) অন্ধ ও চক্ষুষ্মান সমান নয়,
(৩৫:২০) না অন্ধকার ও আলো সমান পর্যায়ভুক্ত,
(৩৫:২১) না শীতল ছায়া ও রোদের তাপ একই পর্যায়ের
(৩৫:২২) এবং না জীবিত ও মৃতরা সমান৷ ৪২ আল্লাহ যাকে চান শুনান কিন্তু (হে নবী!) তুমি তাদেরকে শুনাতে পার না যারা কবরে শায়িত রয়েছে৷ ৪৩
(৩৫:২৩) তুমি তো একজন সতর্ককারী মাত্র৷ ৪৪
(৩৫:২৪) আমি তোমাকে সত্য সহকারে পাঠিয়েছি সুসংবাদদাতা ও ভীতি প্রদর্শনকারী বানিয়ে৷ আর এমন কোন সম্প্রদায় অতিক্রান্ত হয়নি যার মাধ্যে কোন সতর্ককারী আসেনি৷ ৪৫
(৩৫:২৫) এখন এরা যদি তোমার প্রতি মিথ্যা আরোপ করে থাকে তাহলে এদের পূর্বে অতিক্রান্ত লোকেরাও মিথ্যা আরোপ করেছিল৷ তাদের কাছে এসেছিল তাদের রসূলগণ সুষ্পষ্ট প্রমাণাদি ৪৬ সহীফা ও দীপ্তোজ্জল হিদায়াত দানকারী কিতাব ৪৭ নিয়ে৷
(৩৫:২৬) তারপর যারা মানেনি তাদেরকে আমি পাকড়াও করেছি এবং দেখে নাও আমার শাস্তি ছিল কেমন কঠোর৷
৩৬. অর্থাৎ আল্লাহ তোমাদের মুখাপেক্ষী, তোমরা তাকে আল্লাহ বলে মেনে না নিলে তার সার্বভৌম ও একচ্ছত্র কর্তৃত্ব চলবে না এবং তোমরা তার ইবাদাত ও বন্দেগী না করলে তার কোন ক্ষতি হয়ে যাবে, এ ভুল ধারণা পোষণ করো না৷ আসল ব্যাপার হচ্ছে, তোমরা তার মুখাপেক্ষী৷ তিনি যদি তোমাদের জীবিত না রাখেন এবং যেসব উপকরনের সহায়তায় তোমরা দুনিয়ায় বেঁচে থাক এবং কাজ করতে পারো সেগুলো তোমাদের জন্য সরবরাহ না করেন, তাহলে তোমাদের জীবন এক মুহুর্তের জন্যও টিকে থাকতে পারে না৷ কাজেই তার আনুগত্য ও ইবাদাতের পথ অবলম্বন করার জন্য তোমাদেরকে যে তাকীদ দেয়া হয় তা এ জন্য নয় যে, আল্লাহ এর প্রয়োজন আছে বরং এ জন্য যে, এরি ওপর নির্ভর করে তোমাদের দুনিয়ার ও আখেরাতের সাফল্য৷ এমনটি না করলে তোমরা নিজেদেরই সবকিছুর সর্বনাশ করে ফেলবে, আল্লাহর কোন ক্ষতি করতে পারবে না৷
৩৭. মূলে বলা হয়েছে "গনী" ও "হামীদ" মানে হচ্ছে, তিনি সবকিছুর মালিক, প্রত্যেকটি জিনিসের অভাবমুক্ত ও অমুখাপেক্ষী৷ তিনি কারো সাহায্যের মুখাপেক্ষী নন৷ আর হামীদ মানে হচ্ছে, তিনি নিজে নিজেই প্রশংসিত, কেউ তার প্রশংসা করুক বা না করুক প্রশংসা লাভ করার অধিকার একমাত্র তারই আছে৷ এ দুটি গুনকে একসাথে বর্ণনা করার কারণ হচ্ছে এই যে, নিছক গনী তো এমন ব্যক্তিও হতে পারে যে নিজের ধনাঢ্যতা দ্বারা কারো সাহায্য বা উপকার করে না৷ এ অবস্থায় সে গনী অবশ্যই হবে কিন্তু হামীদ বা প্রশংসিত হবে না৷ হামীদ সে হতে পারে এমন অবস্থায় যখন সে কারো সাহায্য নিজে লাভবান হবে না কিন্তু নিজের ধন সম্পদ থেকে অন্যদেরকে সব ধরনের সহায়তা দান করবে৷ আল্লাহ যেহেতু এ দুটি গুনের পূর্ণ আধার তাই বলা হয়েছে, তিনি নিছক গনী নন বরং এমন গুন যিনি সব রকমের প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা লাভের অধিকারী৷ কারণ তিনি তোমাদের এবং বিশ্ব জাহানের যাবতীয় জড় ও জীবের প্রয়োজন পূর্ণ করেন৷
৩৮. অর্থাৎ তোমরা নিজেদের শক্তিতে এ পৃথিবীর বুকে বিচরণ করছো না৷ তোমাদের কে এখান থেকে বিদায় এবং তার জায়গায় অন্য কোন জাতিকে এনে বসাবার জন্য তাঁর একটি ইশারাই যথেষ্ট৷ কাজেই নিজের মর্যাদা অনুধাবন করো এবং এমন নীতি অবলম্বন করো না যার ফলে শেষ পর্যন্ত জাতি গুলো ধ্বংস হয়ে যায়৷ আল্লাহর পক্ষ থেকে যখন কারো ধ্বংসের ফায়সালা এসে যায় তখন সমগ্র বিশ্ব জাহানে এমন কোন শক্তি নেই যে তার তা টেনে ধরতে পারে এবং ফায়সালা কার্যকর হবার পথ রোধ করতে সক্ষম হয়৷
৩৯. "বোঝা" মানে কৃতকর্মের দায় দায়িত্বের বোঝা৷ এর অর্থ হচ্ছে, আল্লাহর কাছে প্রত্যেক ব্যক্তি নিজেই তার কাজের জন্য দায়ী এবং প্রত্যেকের ওপর কেবলমাত্র তার নিজের কাজের দায় দায়িত্ব আরোপিত হয়৷ এক ব্যক্তির কাজের দায় দায়িত্বের বোঝা আল্লাহর পক্ষ থেকে অন্য ব্যক্তির ঘাড়ে চাপিয়ে দেবার কোন সম্ভাবনা নেই৷ কোন ব্যক্তি অন্যের দায় দায়িত্বের বোঝা নিজের ওপর চাপিয়ে নেবে এবং তাকে বাঁচাবার জন্য তার অপরাধে নিজেকে পাকড়াও করাবে এরও কোন সম্ভাবনা নেই৷ একথা এখানে বলার কারণ হচ্ছে এই যে, মক্কা মু'আযযমায় যারা ইসলাম গ্রহণ করছিল তাদেরকে তাদের মুশরিক আত্মীয় স্বজন ও গোত্রের লোকেরা বলছিল, আমাদের কথায় তোমরা এই নতুন ধর্ম ত্যাগ করো এবং নিজেদের বাপ- দাদার ধর্মের ওপর প্রতিষ্ঠিত থেকে যাও, এ জন্য পাপপুণ্যের বোঝা আমরা বহন করব৷
৪০. ওপরের বাক্যে আল্লাহর ন্যায়নীতির বিধান বর্ণনা করা হয়েছে৷ অর্থাৎ তিনি একজনের পাপে অন্যকে পাকড়াও করবেন না৷ বরং প্রত্যেককে তার নিজের পাপের জন্য দায়ী করবেন৷ তাই এখানে এ বাক্যে বলা হয়েছে, আজ যারা বলছে, তোমরা আমাদের দায়িত্বে কুফরী ও গোনাহের কাজ করে যাও কিয়ামতের দিন তোমাদের গোনাহর বোঝা আমরা নিজেদের ঘাড়ে নিয়ে নেব তারা আসলে নিছক একটি মিথ্যা ভরসা দিচ্ছে৷ যখন কিয়ামত আসবে এবং লোকেরা দেখে নেবে নিজেদের কৃতকর্মের জন্য তারা কোন ধরনের পরিণামের সম্মুখীন হতে যাচ্ছে তখন প্রত্যেকে নিজেকে বাঁচাবার ফিকিরে লেগে যাবে৷ ভাই ভাইয়ের থেকে এবং পিতা পুত্রের থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে৷ কেউ কারো সামান্যতম বোঝা নিজের ওপর চাপিয়ে নিতে প্রস্তুত হবে না৷
৪১. অন্য কথায় হঠকারী ও গোয়ারদের ওপর তোমার সতর্কবানী কার্যকর হতে পারে না৷ তুমি বুঝালে এমন সব লোক সত্য সঠিক পথে আসতে পারে যাদের দিলে আল্লাহর ভয় আছে এবং যারা নিজের প্রকৃত মালিকের সামনে মাথা নোয়াতে প্রস্তুত৷
৪২. এ উপমাগুলোতে মু'মিন ও কাফেরের বর্তমান ও ভবিষ্যতের পার্থক্য তুলে ধরা হয়েছে৷ এক ব্যক্তি প্রকৃত সত্য থেকে চোখ বন্ধ করে আছে৷ সে একবার ও দেখছে না বিশ্ব জাহানের সমগ্র ব্যবস্থা এবং এমনকি তার নিজের অস্তিত্ব কোন সত্যের প্রতি ইংগিত করছে৷ অন্যদিকে আর এক ব্যক্তির চোখ খোলা আছে৷ সে পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছে, তার ভেতরের ও বাইরের প্রত্যেকটি জিনিস আল্লাহর একত্ব এবং তার সামনে মানুষের জবাবাদিহির ওপর সাক্ষ দিচ্ছে৷ একদিকে এক ব্যক্তি জাহেলী কল্পনা ও ভাববাদ এবং ধারনা, আন্দাজ অনুমানের অন্ধকারে হাতড়ে মরছে এবং নবীর জ্বালানো প্রদীপের কাছাকাছি ঘেসতেও রাজি নয়৷ অন্যদিকে অপর ব্যক্তির চোখ একদম খোলা৷নবীর জ্বালানো আলোর সামনে আসতেই তার কাছে একথা একেবারেই পরিষ্কার হয়ে গেছে যে, মুশরিক, কাফের ও নাস্তিক্যবাদীরা যেসব পথে চলছে সেগুলো ধ্বংসের দিকে চলে গেছে এবং সাফল্য ও মুক্তির পথ একমাত্র সেটিই যেটি আল্লাহ ও তার রসূল দেখিয়েছন৷ এখন দুনিয়ায় এদের দুজনের নীতি এক হবে এবং দুজনে এক সাথে একই পথে চলতে পারবে, এটা কেমন করে সম্ভব? দুজনের পরিণতি এক হবে, দুজনই মরে খতম হয়ে যাবে, একজন তার কুপথগামিতার শাস্তি পাবে না এবং অন্যজন সৎপথে চলার জন্য কোন পুরস্কার পাবে না, এটাই বা কেমন করে সম্ভব? শীতল ছায়া ও রোদের তাপ সমান নয় এর মধ্যে এ পরিণতির দিকেই ইংগিত করা হয়েছে যে, একজন আল্লাহর রহমতের ছায়া আশ্রয় লাভকারী এবং জাহান্নামের উত্তাপে ঝলসানো ব্যক্তি৷ তোমরা কোন উদ্ভট চিন্তায় মেতে আছ? এরা দু'জনা কি একই পরিণাম ভোগ করবে? শেষে মুমিনকে জীবিতের সাথে এবং হঠকারী কাফেরদেরকে মৃতদের সাথে তুলনা করা হয়েছে৷ অর্থাৎ মু'মিন হচ্ছে এমন ব্যক্তি যার মধ্যে অনুভুতি, উপলদ্ধি, বিবেচনা, জ্ঞান, বুঝ ও চেতনা আছে এবং তার বিবেক তাকে ভালো ও মন্দের মধ্যকার পার্থক্য থেকে সবসময় সজাগ করছে৷ এর বিপরীত যে ব্যক্তি কুফরীর অন্ধতায় পুরোপুরি ডুবে গেছে তার অবস্থা এমন অন্ধের চেয়েও খারাপ যে অন্ধকারে পথ হারিয়েছে৷ তার অবস্থা এমন মৃতের মতো যার মধ্যে কোন অনুভুতিই নেই৷
৪৩. অর্থাৎ আল্লাহর ইচ্ছার ব্যাপার তো ভিন্ন৷ তিনি চাইলে পাথরকেও শ্রবনশক্তি দান করেন৷ কিন্তু যাদের বক্ষদেশে বিবেকের কবর রচিত হয়েছে তাদের হৃদয়ে নিজের কথা বদ্ধমূল করে দিতে পারা এবং যারা কথা শুনতেই চায় না তাদের বধির কর্ণকুহরে সত্যের ধ্বনি পৌছিয়ে দেবার সাধ্য রসূলের নেই৷ তিনি তো কেবলমাত্র তাদেরকেই শুনাতে পারেন যারা যুক্তিসংগত কথা শুনতে চায়৷
৪৪. অর্থাৎ লোকদেরকে সতর্ক করে দেবার চেয়ে বেশী আর কোন দায়িত্ব তোমার নেই৷ এরপর যদি কেউ সচেতন না হয় এবং নিজের গোমরাহীর মধ্যে ছুটে চলতে থাকে তাহলে এর কোন দায় দায়িত্ব তোমার ওপর নেই৷ অন্ধদের দেখাবার এবং বধিরদের শুনাবার দায়িত্ব তোমার ওপর সোপর্দ করা হয়নি৷
৪৫. একথাটি কুরআন মজীদের বিভিন্ন জায়গায় বলা হয়েছে৷ বলা হয়েছে দুনিয়ায় এমন কোন জাতি ও সম্প্রদায় অতিক্রান্ত হয়নি যাকে সত্য সঠিক পথের সন্ধান দেবার জন্য আল্লাহ কোন নবী পাঠাননি৷ সূরা রাআদে বলা হয়েছে৷

(................................................._)

সূরা হিজরে বলা হয়েছে

(.............................................)

সূরা নাহলে বলা হয়েছে

(......................................................)

সূরা শূআরায় বলা হয়েছে

(.............................................)

কিন্তু এ প্রসংগে দুটি কথা অনুধাবন করতে হবে৷ তাহলে আর ভুল বুঝাবুঝির অবকাশ থাকবে না৷ প্রথমত হচ্ছে, একজন নবীর প্রচারনা যতদূর পর্যন্ত পৌঁছুতে পারে ততদূর পর্যন্ত তিনিই যথেষ্ট৷ প্রত্যেকটি জনপদে ও প্রত্যেকটি জাতির মধ্যে পৃথক পৃথকভাবে নবী পাঠানো মোটেই জরুরী নয়৷ দ্বিতীয়ত, একজন নবীর দাওয়াত ও হিদায়াতের প্রভাব এবং তার নেতৃত্বের পদাংক যদতিন পর্যন্ত সংরক্ষিত থাকবে ততদিন পর্যন্ত অন্য কোন নতুন নবীর প্রয়োজন নেই৷ প্রত্যেক বংশ ও প্রত্যেক প্রজন্মের জন্য আলাদা নবী পাঠানো অপরিহার্য নয়৷
৪৬. অর্থাৎ এমন প্রমাণপত্র যা পরিষ্কারভাবে একথার সাক্ষ দিচ্ছিল যে, তারা আল্লাহর রসূল৷
৪৭. সহীফা ও কিতাবের মধ্যে সম্ভবত একটি বড় পার্থক্য থেকে থাকবে৷ সেটি হচ্ছে এই যে, সহীফা প্রধানত ছিল উপদেশাবলী ও নৈতিক পথ নিদের্শনার সমষ্টি৷ অন্যদিকে কিতাবে বিবৃত থাকত একটি পূর্ণাংগ শরীয়াত ব্যবস্থা৷