(৩৪:৪৬) হে নবী! এদেরকে বলে দাও, “আমি তোমাদেরকে একটিই উপদেশ দিচ্ছি- আল্লাহর জন্য তোমরা একা একা এবং দু’জন দু’জন মিলে নিজেদের মাথা ঘামাও এবং চিন্তা কর৷ তোমাদের সাথির মধ্যে এমন কি কথা আছে যাকে প্রলাপ বলা যায়? ৬৬ সেতো একটি কঠিন শাস্তি আসার আগে তোমাদেরকে সতর্ক করে দিচ্ছে”৷ ৬৭
(৩৪:৪৭) এদেরকে বলো, “যদি আমি তোমাদের কাছে কোন প্রতিদান চেয়ে থাকি তাহলে তা তোমাদের জন্যই থাকুক৷৬৮ আমার প্রতিদান দেবার দায়িত্ব তো আল্লাহরই এবং তিনি সব জিনিসের ওপর সাক্ষী”৷৬৯
(৩৪:৪৮) এদেরকে বলো, “আমার রব (আমার প্রতি) সত্যের প্রেরণা দান করেন ৭০ এবং তিনি সমস্ত গোপন সত্য জানেন”৷
(৩৪:৪৯) বলো, “সত্য এসে গেছে এবং এখন মিথ্যা যত চেষ্টাই করুক তাতে কিছু হতে পারে না”৷
(৩৪:৫০) বলো, “যদি আমি পথভ্রষ্ট হয়ে গিয়ে থাকি, তাহলে তা হবে আমার রব আমার প্রতি যে অহী নাযিল করেন তারই ভিত্তিতে৷ তিনি সবকিছু শোনেন এবং নিকটেই আছেন”৷ ৭১ আহা, যদি দেখতে তাদেরকে
(৩৪:৫১) সে সময় যখন তারা ভীত-সন্ত্রস্ত্র হয়ে ঘুরে বেড়াবে এবং কোথাও নিরাপদ বের হয়ে যেতে পারবে না বরং নিকট থেকেই পাকড়াও হয়ে যাবে৷৭২
(৩৪:৫২) সে সময় তারা বলবে, আমরা তার প্রতি ঈমান আনলাম, ৭৩ অথচ দূরে চলে যাওয়া জিনিস লাগালের মধ্যে আসতে পারে কেমন করে? ৭৪
(৩৪:৫৩) ইতিপূর্বে তারা কুফরী করেছিল এবং আন্দাজে বহুদূর থেকে কথা নিয়ে আসত৷৭৫
(৩৪:৫৪) সে সময় তারা যে জিনিসের আকাংখা করতে থাকবে তা থেকে তাদেরকে বঞ্চিত করে দেয়া হবে যেমনটি তাদের পূর্বসূরী সমপস্থীরা বঞ্চিত হয়েছিল৷ তারা বড়ই বিভ্রান্তিকর সন্দেহের মধ্যে পতিত ছিল৷৭৬
৬৬. অর্থাৎ স্বার্থ কামনা ও বিদ্বেষ মুক্ত হয়ে একান্ত আল্লাহর ওয়াস্তে চিন্তা করে দেখো৷ প্রত্যেক সদুদ্দেশ্যে আলাদা আলাদাভাবেও চিন্তা কর আবার দুজন চারজন মিলে মিশে একসাথে বলো ও নিরপেক্ষ ও স্বাধীনভাবে পরস্পর বিতর্ক আলোচনার মাধ্যেম এ মর্মে অনুসন্ধান চালাও যে, গতকাল পর্যন্তও যে ব্যক্তিকে তোমরা নিজেদের মধ্যে অত্যন্ত জ্ঞানী মনে করছিলে তাকে আজ কিসের ভিত্তিতে পাগল গণ্য করছ? নবুওয়াত লাভের মাত্র কিছুকাল আগেই তো একটি ঘটনা ঘটে গিয়েছিল কাবাঘর পুনরনিমার্ণের পর হাজরে আসওয়াদ সংস্থাপনের প্রশ্নে কুরাইশের গোত্রগুলো যখন পরস্পর লড়াই করতে প্রবৃত্ত হয়েছিল তখন তোমরাই তো একযোগে মুহাম্মাদ (সা) কে বিরোধ মীমাংসাকারী বলে স্বীকার করে নিয়েছিলে এবং তিনি এমনভাবে তোমাদের ঝগড়া মিটিয়ে দিয়েছিলেন যার ফলে তমরা সবাই নিশ্চিন্ত হয়ে গিয়েছিলে৷ তোমাদের সমগ্র জাতি যে ব্যক্তির বুদ্ধি জ্ঞান সম্পর্কে এ অভিজ্ঞতা লাভ করতে সক্ষম হয়েছিল এখন এরপর এমন কি ঘটনা ঘটে গেল যার ফলে তোমরা তাকে পাগল বলতে শুরু করেছো? হঠকারিতা ও গোয়ার্তুমির কথা তো আলাদা কিন্তু সত্যই কি তোমরা মুখে বা বলছো নিজেদের মনেও সেটাকেই সত্য বলে মনে করে থাকো?
৬৭. অর্থাৎ এ অপরাধের ভিত্তিতেই কি তোমরা তাকে মানসিক রোগী বলে গণ্য করছ? তোমাদের মতে বুদ্ধিমান কি এমন ব্যক্তিকেই বলা হবে যে তোমাদের ধ্বংসের পথে যেতে দেখে বলবে, সাবাশ, বড়ই চমৎকার পথে যাচ্ছো এবং পাগল বলা হবে তাকে যে তোমাদের কে দুঃসময় আসার আগে সতর্ক করে দেবে এবং বিপর্যয়ের পরিবর্তে সংশোধনের পথ বাতলাবে?
৬৮. মূলে বলা হয়েছে-(..............) এর একটি অর্থ আমি ওপরে অনুবাদে বলেছি৷ এর দ্বিতীয় একটি অর্থ এও হতে পারে, তোমাদের কল্যাণ ছাড়া আমি আর কিছুই চাই না এবং তোমরা ঠিক হয়ে যাও, এটিই আমার পুরস্কার৷ এ বিষয়বস্তুটি কুরআন মজীদের অন্যত্র এভাবে বলা হয়েছে-

(....................................)

"হে নবী! তাদেরকে বলো, তোমাদের কাছ থেকে এ কাজের জন্য এ ছাড়া আর কোন প্রতিদান আমি চাই না যে, যে চায় সে তার রবের পথ অবলম্বন করুক"৷ (আল ফুরকান, ৫৭)
৬৯. অর্থাৎ অপবাদদাতারা যা ইচ্ছা অপবাদ দিক কিন্তু আল্লাহ সবকিছু জানেন, তিনি সাক্ষী আছেন, আমি নিস্বার্থ এবং নিজের কোন ব্যক্তিগত স্বার্থে আমি এ কাজ করছি না৷
৭০. মূল শব্দ হচ্ছে , (........) এর একটি অর্থ হচ্ছে, অহীর মাধ্যমে তিনি সত্য জ্ঞান আমাকে দান করেন৷ অন্য অর্থটি হচ্ছে তিনি সত্যকে বিজয়ী করেন এবং মিথ্যার মাথায় সত্যের আঘাত হানেন৷
৭১. এ যুগের কোন কোন লোক এ আয়াত থেকে একথা প্রমাণ করেন যে, এর দৃষ্টিতে নবী (সা) পথভ্রষ্ট হতে পারতেন বরং হয়ে যেতেন৷ তাইতো মহান আল্লাহ নিজেই নবী করীম (সা) মুখে একথা বলে গিয়েছেন যে, যদি আমি পথভ্রষ্ট হই, তাহলে আমার পথভ্রষ্টাতার জন্য দায়ী হবো আমি নিজেই এবং আমি তখনই সঠিক পথে থাকি যখন আমার রব আমার প্রতি (অহী অর্থাৎ কুরআনের আয়াত) নাযিল করেন৷ এ ভুল ব্যাখ্যার সাহায্যে এ জালেমরা যেন একথা প্রমাণ করতে চায় যে, নবী করীমের (সা) জীবন ছিল (নাউযুবিল্লাহ) সঠিক পথে চলা ও ভুল পথে চলার সমাহার এবং মহান আল্লাহ কাফেরদের সামনে নবী করীম (সা) এর স্বীকার উক্তি এ জন্য করিয়েছিলন যে, কোন ব্যক্তি যেন তাকে পুরোপুরি সঠিক পথে রয়েছেন মনে করে তার পূর্ণাঙ্গ আনুগত্য না করে বসে৷ অথচ যে ব্যক্তিই বক্তব্যের ধারাবাহিকতা সম্পর্কে চিন্তা করবে সেই বুঝতে পারবে যে, এখানে "যদি আমি পথভ্রষ্ট হয়ে গিয়ে থাকি", কথাটার অর্থ এ নয় যে, (নাউযুবিল্লাহ) নবী করীম (সা) সত্যিসত্যি বিভ্রান্ত হয়ে যেতেন, বরং পুরো কথাটাই এ অর্থে বলা হয়েছে যে, " যদি আমি বিভ্রান্ত হয়ে গিয়ে থাকি, যেমন তোমরা আমার প্রতি অপবাদ দিচ্ছো এবং আমার এ নবুওয়াতের দাবী এবং আমার এ তাওহীদের দাওয়াত এ বিভ্রান্তিরই ফল, যেমন তোমরা ধারণা করছো, তাহলে আমার বিভ্রান্তির দায় আমার ওপরই পড়বে, এর দায়ে তোমরা পাকড়াও হবে না৷ কিন্তু যদি আমি সঠিক পথে থাকি, যেমন যথাযথই আমি আছি, তাহলে তার কারণ হচ্ছে এই যে, আমার কাছে আমর রবের পক্ষ থেকে অহী আসে, যার মাধ্যমে আমি সঠিক পথের জ্ঞান লাভ করেছি৷ আমার রব কাছেই আছেন৷ তিনি সবকিছু শুনছেন৷ আমি পথহারা অথবা তাঁর দিকে যাবার পথের সন্ধান পেয়েছি, তা তিনি জানেন৷
৭২. অর্থাৎ কিয়ামতের দিন অপরাধী এমনভাবে পাকড়াও হবে যেন মনে হবে পাকড়াওকারী কাছেই কোথাও লুকিয়ে ছিল৷ অপরাধী সামান্য একটু পালাবার চেষ্টা করার সাথে সাথেই যেন তাকে ধর ফেলেছে৷
৭৩. অর্থ হচ্ছে, এমন শিক্ষার প্রতি ঈমান আনলাম যা রসূল দুনিয়ায় পেশ করেছিলেন৷
৭৪. অর্থাৎ ঈমান আনার জায়গা ছিল দুনিয়া৷ সেখান থেকে এখন তারা বহুদুরে চলে এসেছে৷ আখেরাতের জগতে পৌঁছে যাবার পর এখন আর তাওবা করা ও ঈমান আনার সুযোগ কোথায় পাওয়া যেতে পারে৷
৭৫. অর্থাৎ রসূল, রসূলের শিক্ষা এবং ঈমানদারদের বিরুদ্ধে নানা ধরনের অপবাদ দিত, বিদ্রুপাত্মক শব্দ উচ্চারণ করত ও ধ্বনি দিত৷ কখন বলত, এ ব্যক্তি যাদুকর, কখন বলত পাগল৷ কখন তাওহীদ নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রুপ করত আবর কখন আখেরাতের ধারণাকে উপহাস করতো৷ কখনো এই মর্মে গল্প তৈরী করতো যে, রসূলকে অন্য কেউ পড়িয়ে ও শিখিয়ে দেয় আবার কখন মুমিনদের ব্যাপারে বলত, এরা শুধুমাত্র নিজেদের অজ্ঞতার কারনে রসূলের অনুসারী হয়েছে৷
৭৬. আসলে শিরক, নাস্তিক্যবাদ ও আখেরাত অস্বীকার করা বিশ্বাস কোন ব্যক্তি নিশ্চয়তার ভিত্তিতে গ্রহণ করে না এবং করতে পারে না৷ কারণ নিশ্চয়তা একমাত্র সঠিক জ্ঞান জানার ভিত্তিতেই অর্জিত হতে পারে৷ আর আল্লাহ নেই অথবা বহু আল্লাহ আছে কিংবা বহু সত্তা আল্লাহর সার্বভৌম কর্তৃত্ব ও ক্ষমতার অধিকারী অথবা পরকাল হওয়া উচিত নয় ইত্যাকার বিষয়গুলো সম্পর্কে কোন ব্যক্তিরই সঠিক জ্ঞান নেই৷ কাজেই যে ব্যক্তিই দুনিয়ায় এ আকীদা বিশ্বাস অবলম্বন করেছে সে নিছক আন্দাজ অনুমান ও ধারণার ভিত্তিতে একটি ইমারত নির্মাণ করেছে৷ এ ইমারতের মুল ভিত্তি সন্দেহ সংশয় ছাড়া আর কিছু নয়৷ আর এ সন্দেহ তাকে নিয়ে গেছে ঘোরতর বিভ্রান্তি ও ভ্রষ্টতার দিকে৷ আল্লাহর অস্তিত্বে সে সন্দিহান হয়েছে৷ তাওহীদের অস্তিত্বে সন্দিহান হয়েছে৷ আখেরাতের আগমনে সন্দেহ পোষণ করেছে৷ এমনকি এ সন্দেহকে সে নিশ্চিত বিশ্বাসের মত মনের মধ্যে বদ্ধমূল করে নবীদের কোন কথা মানেনি এবং নিজের জীবনের সমগ্র কর্মকালকে একটি ভুল পথে ব্যয় করে দিয়েছে৷