(৩৪:৩৭) তোমাদের এই ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি এমন নয় যা তোমাদেরকে আমার নিকটবর্তী করে; হ্যাঁ, তবে যারা ঈমান আনে ও সৎকাজ করে৷ ৫৭ এরাই এমন লোক যাদের জন্য রয়েছে তাদের কর্মের দ্বিগুণ প্রতিদান এবং তারা সুউচ্চ ইমারত সমূহে নিশ্চিন্তে নিরাপদে থাকবে৷৫৮
(৩৪:৩৮) যারা আমার আয়াতকে ব্যর্থ করার জন্য প্রচেষ্টা চালায় তারা শাস্তি ভোগ করবে৷
(৩৪:৩৯) হে নবী! তাদেরকে বলো, “আমার রব তার বান্দাদের মধ্য থেকে যাকে চান মুক্ত হস্তে রিযিক দান করেন এবং যাকে চান মাপাজোপা দেন৷ ৫৯ যা কিছু তোমরা ব্যয় করে দাও তার জায়গায় তিনি তোমাদের আরো দেন, তিনি সব রিযিকদাতার চেয়ে ভাল রিযিকদাতা”৷ ৬০
(৩৪:৪০) আর যেদিন তিনি সমস্ত মানুষকে একত্র করবেন তারপর ফেরেশতাদেরকে জিজ্ঞেস করবেন, “এরা কি তোমাদেরকেই পূজা করত”? ৬১
(৩৪:৪১) তখন তারা জবাব দেবে, “পাক-পবিত্র আপনার সত্তা, আমাদের সম্পর্ক তা আপনার সাথে, এদের সাথে নয়৷ ৬২ আসলে এরা আমাদের নয় বরং জিনদের পূজা করত এদের অধিকাংশ তাদেরই প্রতি ঈমান এনেছিল”৷৬৩
(৩৪:৪২) (তখন আমি বলব) - আজ তোমাদের কেউ কারো উপকারও করতে পারবে না অপকারও করতে পারবে না এবং জালেমদেরকে আমি বলে দেব, এখন আস্বাদন কর এ জাহান্নামের আযাবের স্বাদ, যাকে তোমরা মিথ্যা বলতে৷
(৩৪:৪৩) এদেরকে যখন আমার সুষ্পষ্ট আয়াত শুনানো হয় তখন এরা বলে, “এ ব্যক্তি তো চায় তোমাদের বাপ-দাদারা যেসব উপাস্যের পূজা করে এসেছে তাদের থেকে তোমাদেরকে দূরে সরিয়ে দিতে”৷ আর বলে, “এ (কুরআন) নিছক একটি মনগড়া মিথ্যা ছাড়া আর কিছুই নয়”৷ এ কাফেরদের সামনে যখনই সত্য এসেছে তখনই এরা বলে দিয়েছে “এ তো সুস্পষ্ট যাদু”৷
(৩৪:৪৪) অথচ না আমি এদেরকে পূর্বে কোন কিতাব দিয়েছিলাম, যা এরা পড়তো, আর না তোমার পূর্বে এদের কাছে কোন সতর্ককারী পাঠিয়েছিলাম৷৬৪
(৩৪:৪৫) এদের পূর্বে অতিক্রান্ত লোকেরা মিথ্যা আরোপ করেছিল৷ যা কিছু আমি তাদেরকে দিয়েছিলাম তার এক -দশমাংশেও এরা পৌঁছুতে পারেনি৷ কিন্তু যখন তারা আমার রসূলের প্রতি মিথ্যা আরোপ করল তখন দেখে নাও আমার শাস্তি ছিল কেমন কঠোর৷৬৫
৫৭. এর দু'টি অর্থ হতে পারে এবং দু'টিই সঠিক৷ এক, ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি আল্লাহর নিকটবর্তী করার মত জিনিস নয়৷ বরং ঈমান ও সৎকাজ মানুষকে আল্লাহর নিকটবর্তী করে৷ দুই, সম্পদ ও সন্তান একমাত্র এমন সৎ মু'মিনের জন্য আল্লাহ নৈকট্য লাভের মাধ্যম পরিণত হতে পারে, যে নিজের সম্পদ আল্লাহর পথে ব্যয় করে এবং নিজের সন্তানকে উত্তম শিক্ষা ও অনুশীলন দান করে তাকে আল্লাহ সম্পর্কে সঠিক জ্ঞানের অধিকারী ও সৎকর্মশীল করে গড়ে তোলার চেষ্টা করে ৷
৫৮. এর মধ্যে এ বিষয়ের প্রতি একটি সূক্ষ্ম ইংগিত রয়েছে যে, তাঁর এ নিয়ামত হবে অবিনশ্বর এবং এর প্রতিদানের ধারাবাহিকতা কোনদিনই ছিন্ন বা ক্ষুণ্ণ হয়ে যাবে না ৷ কারণ যে আয়েশ আরামের কখনো খতম হয়ে যাবার আশংকা থাকে, মানুষ পুরোপুরি নিশ্চিত হয়ে তা উপভোগ করতে পারে না ৷ এ ব্যপারে সবসময় ভয় থাকে কি জানি কখন এসব কিছু ছিনিয়ে নেয়া হবে ৷
৫৯. এ বিষয়টিকে পুনরুক্তি সহকারে বর্ণনা করার উদ্দেশ্য হচ্ছে একথার ওপর জোর দেয়া যে, রিযিক কম বেশী হওয়ার বিষয়টি আল্লাহ ইচ্ছার সাথে সম্পর্কিত, তার সন্তুষ্টির সাথে নয়৷ আল্লাহকে ইচ্ছা অনুসারে ভাল-মন্দ সব রকমের মানুষ রিযিক লাভ করছে৷ যারা আল্লাহকে মেনে নিয়েছে তারাও রিযিক পাচ্ছে এবং যারা অস্বীকার করেছে তারাও৷ প্রচুর রিযিক লাভ রিযিক লাভকারীর আল্লাহর প্রিয় বান্দা হবার কথা প্রমাণ করে না৷ আবার অন্যদিকে কম রিযিক লাভ বা রিযিকের অভাব অভাবগ্রস্তের প্রতি আল্লাহ ক্রোধান্বিত হবার আলামত পেশ করে না৷ আল্লাহ ইচ্ছা অনুযায়ী একজন জালেম এবং বেঈমান লোকও আংগুল ফুলে কলাগাছ হয়৷ অথচ জুলুম ও বেঈমান আল্লাহ পছন্দ করেন না৷ পক্ষান্তরে আল্লাহর ইচ্ছার অধীনে একজন সত্যাশ্রয়ী ও ঈমানদার ব্যক্তি ক্ষতিগ্রস্থ হয় ও কষ্ট সহ্য করতে থাকে অথচ আল্লাহ সত্যবাদিতা ও ঈমানদারী পছন্দ করেন৷ কাজেই বস্তুগত স্বার্থ ও মুনাফা অর্জনকে যে ব্যক্তি ভাল ও মন্দের মাপকাঠি গণ্য করে সে বিরাট ভুলের শিকার ও পথভ্রষ্ট৷ আসল জিনিস হচ্ছ আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং এটি অর্জিত হয় এমন সব নৈতিক গুণাবলীর মাধ্যমে যা আল্লাহ পছন্দ করেন৷ এ গুণাবলীর সাথে কেউ যদি দুনিয়ার নিয়ামত গুলোও লাভ করে, তাহলে নিসন্দেহে তা হবে আল্লাহ দান এবং এ জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা উচিত৷ কিন্তু যদি কোন ব্যক্তি নৈতিক গুণাবলীর দিক দিয়ে আল্লাহর বিদ্রোহী ও নাফরমান বান্দা হয়ে থাকে এবং এ সংগে তাকে দুনিয়ার নিয়ামত ও দান করা হয়, তাহলে তার অর্থ এই দাঁড়ায় যে, সে কঠিন জবাবদিহি ও নিকৃষ্টতম শাস্তি ভোগের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে৷
৬০. রিযিকদাতা, স্রষ্টা, উদ্ভাবক, দাতা এবং এ ধরেনর আরো বহু গুণ রয়েছে, যা আসলে আল্লাহরই গুন কিন্তু রূপক অর্থে বান্দাদের সাথে ও সংশ্লিষ্ট করা হয়৷ যেমন আমরা এক ব্যক্তি সম্পর্কে বলি, সে অমুক ব্যক্তির রোজগারের ব্যবস্থা করে দিয়েছে৷ অথবা সে এ উপহারটি দিয়েছে৷ কিংবা সে অমুক জিনিসটি তৈরি করেছে বা উদ্ভাবন করেছে৷ এ প্রেক্ষিতে আল্লাহ নিজের জন্য উত্তম রিযিক দাতা শব্দ ব্যবহার করেছেন৷ অর্থাৎ যাদের সম্পর্কে তোমরা ধারণা করে থাক যে, তারা রুজি দান করে থাকে তাদের সবার চেয়ে আল্লাহ উত্তম রিযিকদাতা৷
৬১. প্রাচীনকাল থেকে নিয়ে আজ পর্যন্ত প্রত্যেক যুগে মুশরিকরা ফেরশতাদেরকে দেব-দেবী মনে করে তাদের মূর্তি বানিয়ে পূজা করে আসছে৷ বৃষ্টির দেবতা, বিজলীর দেবতা, বায়ুর দেবতা, ধন-সম্পদের দেবী, মৃত্যু ও ধ্বংসের দেবী ইত্যাদি প্রত্যেকটি জিনিসের পৃথক দেবতা বা দেবীর মূর্তি তারা প্রতিষ্ঠিত করেছে৷ এর সম্পর্কে আল্লাহ বলেছেন, কিয়ামতের দিন এই ফেরেশতাদেরকে জিজ্ঞেস করা হবে, তোমরাই কি এদের উপাস্য হয়েছিলে? নিছক অবস্থা অনুসন্ধান করা এ প্রশ্নের উদ্দেশ্য নয় বরং এর মধ্যে এই অর্থ ও নিহিত রয়েছে যে, তোমরা কি তাদের পূজা অর্চনায় রাজি ছিলে? কিয়ামতে এ প্রশ্ন কেবল ফেরেশতাদেরকেই করা হবে না বরং দুনিয়ায় তাদের ইবাদাত ও পূজা করা হয় তাদেরকেও করা হবে৷ তাই সূরা ফুরকানে বলা হয়েছে-

(..........................................)

"যেদিন আল্লাহ এদেরকে এবং যেসব সত্তার এর ইবাদাত করতো তাদের সবাইকে একত্র করবেন তারপর জিজ্ঞেস করবেন, তোমরা কি আমার এ বান্দাদেরকে পথভ্রষ্ট করেছিলে, না এর নিজেরাই সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত হয়েছিল"?
৬২. অর্থাৎ তারা জবাব দেবে, অন্য কেউ খোদায়ী ও উপাস্য হবার ব্যাপারে আপনার সাথে শরীক হবে আপনার সত্তা এ থেকে পাক-পবিত্র এবং এর অনেক অনেক উর্ধে৷ এ লোকগুলোর সাথে আমাদের কোন সম্পর্ক নেই৷ এদের এবং এদের কাজ-কারবারের কোন দায়-দায়িত্ব আমাদের ওপর নেই৷ আমরা তো আপনার বান্দা৷
৬৩. এ বাক্যাংশে জিন বলতে জিনদের মধ্যকার শয়তানদের কথা বুঝান হয়েছে৷ ফেরেশতাদের এ জবাবের অর্থ হচ্ছে, বাহ্যত এরা আমাদের নাম নিয়ে এবং নিজেদের ধারণা অনুযায়ী আমাদের মূর্তি বানিয়ে যেন আমাদেরই ইবাদাত করত কিন্তু আসলে আমাদের নয় বরং এরা ইবাদাত করত শয়তানের৷ কারণ শয়তানরাই তাদেরকে এ পথ দেখিয়েছিল৷ আল্লাহকে বাদ দিয়ে অন্যদেরকে প্রয়োজন পূর্ণকারী মনে করার এবং তা তাদের সামনে নজরানা পেশ করার জন্য শয়তানরাই তাদেরকে উদ্ধৃদ্ধ করেছি৷

যারা জিনদেরকে পার্বত্য এলাকার অধিবাসী এবং গ্রামীন ও মরু এলাকার মানুষ অর্থে গ্রহন করেন এ আয়াতটি সুস্পষ্টভাবে তাদের সে চিন্তা ভুল বলে প্রমাণিত করে৷ কোন বুদ্ধিমান ব্যক্তি কি এ আয়াতটি পড়ে এরূপ ভাবতে পারে যে, লোকেরা পাহাড়ী, মরুচারী ও গ্রীমান লোকদের প্রতি ঈমান এনেছিল এবং তাদের ইবাদাত করতো?

এ আয়াত থেকে ইবাদাতের অন্য একটি অর্থের ওপরও আলোকপাত করা হয়৷ এ থেকে জানা যায় যে, ‌ইবাদাত কেবল উপাসনা, আরাধনা ও পূজা অর্চনারই নাম নয়৷ বরং কারো নিদের্শে চলা এবং চোখ-কান বন্ধ করে তার আনুগত্য করা ও ইবাদাত৷ এমনকি মানুষ যদি কাউকে অভিশাপ দেয় (যেমন শয়তানদেরকে অভিশাপ দেয়) এবং তারপরও তারই পথ অনুসরণ করে চলে তাহলেও সে তারই ইবাদাত করছে৷ এর অন্য দৃষ্টান্তগুলোর জন্য দেখুন তাফহীমুল কুরআন , সূরা আন নিসা, ১৪৫; আল মা-য়েদাহ, ৯১; আত্ তাওবা , ৩১; মারয়াম ,২৭ এবং আল কাসাস, ৮৬ টীকা ৷
৬৪. অর্থাৎ এর পূর্বে না এমন কোন কিতাব আল্লাহর পক্ষ থেকে আসে আর না এমন কোন রসূল আসেন, যিনি এসে তাদেরকে এমন শিক্ষা দেন, যার ফলে তারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে অন্যদের বন্দেগী ও পূজা করতো৷ তাই তারা কোন জ্ঞানের ভিত্তিতে নয় পুরোপুরি মূর্খতা ও অজ্ঞতার ভিত্তিতে কুরআন ও মুহাম্মাদ (সা) এর তাওহীদের দাওয়াত অস্বীকার করছে৷ এর সপক্ষে তাদের কাছে কোন যুক্তি প্রমাণ নেই৷
৬৫. অর্থাৎ এ জাতিগুলো যে পরিমাণ শক্তি ও প্রতিপত্তি অর্জন করেছিল মক্কার লোকেরা তার দশ ভাগের একভাগও অর্জন করতে পারেনি ৷ কিন্তু নবীগণ তাদের সামনে যে সত্য পেশ করেছিলেন তা মেনে নিতে তারা অস্বীকার করেছিল এবং মিথ্যার ওপর নিজেদের জীবন ব্যবস্থার ভিত্ রচনা করেছিল ৷ এর ফলে শেষ পর্যন্ত তারা কিভাবে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল এবং তাদের শক্তি ধন-সম্পদ তাদের কোন কাজে লাগেনি তা তোমরা নিজেরাই দেখে নাও ৷