(৩৪:৩১) এ কাফেররা বলে, “আমার কখন এ কুরআন মানবো না এবং এর পূর্বে আগত কোন কিতাবকে ও স্বীকার করবো না”৷ ৫০ হায়! যদি তোমরা দেখ এদের তখনকার অবস্থা যখন এ জালেমরা নিজেদের রবের সামনে দাড়িয়ে থাকবে৷ সে সময় এরা একে অন্যকে দোষারোপ করবে৷ যাদেরকে দুনিয়ায় দাবিয়ে রাখা হয়েছিল তারা ক্ষমতাগর্বীদেরকে বলবে, “যদি তোমরা না থাকতে তাহলে আমরা মুমিন হতাম”৷৫১
(৩৪:৩২) ক্ষমতাগর্বীরা সেই দমিত লোকদেরকে জবাবে বলবে, “তোমাদের কাছে যে সপথের দিশা এসেছিল তা থেকে কি আমরা তোমাদেরকে রুখে দিয়েছিলাম? বরং তোমরা নিজেরাই তো অপরাধী ছিলে”৷ ৫২
(৩৪:৩৩) সেই দমিত লোকেরা ক্ষমতাগর্বীদেরকে বলবে, “না বরং দিবারাত্রের চক্রান্ত ছিল যখন তোমরা আমাদের বলতে আমরা যেন আল্লাহ কুফরী করি এবং অন্যদেরকে তাঁর সমকক্ষ উপস্থাপন করি”৷৫৩ শেষ পর্যন্ত যখন তারা আযাব দেখবে তখন মনে মনে পস্তাতে থাকবে এবং আমি এ অস্বীকারকারীদের গলায় বেড়ী পরিয়ে দেবো৷ লোকেরা যেমন কাজ করেছিল তেমনি প্রতিদান পাবে, এ ছাড়া আর কোন প্রতিদান কি তাদেরকে দেয়া যেতে পারে?
(৩৪:৩৪) কখন এমনটি ঘটেনি যে, আমি কোন জনপদে কোন সতর্ককারী পাঠিয়েছি এবং সেই জনপদের সমৃদ্ধিশালী লোকেরা একথা বলেনি যে, তোমরা যে বক্তব্য নিয়ে এসেছ আমরা তা মানি না৷৫৪
(৩৪:৩৫) তারা সবসময় একথাই বলেছে, আমরা তোমাদের চাইতে বেশী সম্পদ ও সন্তানের অধিকারী এবং আমরা কখখনো শাস্তি পাব না৷ ৫৫
(৩৪:৩৬) হে নবী !তাদেরকে বলে দাও, আমার রব যাকে চান প্রশস্ত রিযিক দান করেন এবং যাকে চান মাপাজোপা দান করেন কিন্তু বেশীর ভাগ লোক এর প্রকৃত তাৎপর্য জানে না৷ ৫৬
৫০. এখানে আরবের কাফেরদের কথা বলা হয়েছে, যারা কোন আসমানী কিতাবের কথা স্বীকার করত না৷
৫১. অর্থাৎ সাধারন মানুষ, যারা আজ দুনিয়ায় নিজেদের নেতা, সরদার, পীর ও শাসকদের অন্ধ অনুসারী এবং তাদের বিরুদ্ধে কোন উপদেশদাতার কথারই কর্ণপাত করতে প্রস্তুত নয়, তারাই যখন প্রকৃত সত্য কি ছিল এবং তাদের নেতারা তাদেরকে কি বুঝাচ্ছিল তা স্বচক্ষে দেখবে এবং যখন তারা একথা জানতে পারবে যে, এ নেতাদের অনুসরণ তাদেরকে এ পরিণতির সম্মুখীন করে দিচ্ছে তখন তারা নিজেদের এসব মনীষীদের বিরুদ্ধে মারমুখ হবে এবং চিৎকার করে বলবে, হতভাগার দল! তোমরাই তো আমাদেরকে গোমরাহ করেছ৷ আমাদের সমস্ত বিপদের জন্য তোমরাই দায়ী৷ তোমরা আমাদের পথভ্রষ্ট না করলে আমরা আল্লাহ ও রসূলের কথা মেনে নিতাম৷
৫২. অর্থাৎ তারা বলবে, আমাদের কাছে এমন কোন শক্তি ছিল না যার সাহায্যে আমরা মাত্র গুটিকয় মানুষ তোমাদের মত কোটি কোটি মানুষকে জোরপূর্বক নিজেদের আনুগত্য করতে বাধ করতে পারতাম৷ যদি তোমরা ঈমান আনতে চাইতে তাহলে আমাদের সরদারি, নেতৃত্ব ও শাসন কর্তৃত্বের সিংহাসন উলটে ফেলে দিতে পারতে৷ আমাদের সেনাদল তো তোমরাই ছিলে৷ আমাদের শক্তি ও সম্পদের উৎস তো ছিল তোমাদেরই হাতে৷ তোমরা নজরানা ও ট্যাক্স না দিলে তো আমরা বিত্তহীনই থাকতাম৷ তোমরা আমাদের হাতে বাইয়াত না করলে আমাদের পীরালী একদিন ও চলত না৷ তোমরা জিন্দাবাদের শ্নোগান না দিলে কেউ আমাদের কথা জিজ্ঞেসও করত না৷ তোমরা আমাদের সৈন্য হয়ে সারা দুনিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে প্রস্তুত না হলে একজন মানুষের অপর ও আমাদের প্রভাব বিস্তৃত হতে পারত না৷ এখন একথা মেনে নিচ্ছো না কেন যে, আসলে রসূলগন তোমাদের সামনে যে পথ পেশ করে ছিলেন তোমরা নিজেরাই তার ওপর চলতে চাচ্ছিলে না? তোমরা ছিলে নিজেদের স্বার্থ ও প্রবৃত্তির দাস৷ আর তোমাদের প্রবৃত্তির এ চাহিদার রসূলদের দেখান তাকওয়ার পরিবর্তে আমাদের এখানেই পূর্ণ হত৷ তোমরা হালাল ও হারামের পরয়া না করে দুনিয়াবী আয়েশ ও আরামের প্রত্যাশী ছিলে এবং আমাদের কাছেই তোমরা তার সন্ধান পাচ্ছিলে৷ তোমরা এমন সব পীরের সন্ধানে ছিলে যারা তোমাদের সব রকমের পাপ কাজ করার ব্যাপক অনুমতি দিত এবং সামান্য কিছু নজরানা নিয়ে তোমাদের পাপ মোচনের দায়িত্ব নিজেদের মাথায় তুলে নিত৷ তোমরা এমনসব পন্ডিত ও মৌলবীদের সন্ধানে ফিরছিলে যারা প্রত্যেকটি শিরক ও বিদ'আত এবং তোমাদের প্রত্যেকটি মনের মত জিনিসকে প্রকৃত সত্য প্রমাণ করে তোমাদেরকে খুশী ও তোমাদের স্বার্থ উদ্ধার করে দিতো৷ তোমাদের এমনসব জালিয়াতের প্রয়োজন ছিল যারা আল্লাহর দীনকে পরিবর্তিত করে তোমাদের প্রবৃত্তির কামনা অনুযায়ী একটি নতুন দীন তৈরি করে দিতে পারত৷ তোমাদের এমন নেতার প্রয়োজন ছিল যারা পরকাল সমৃদ্ধ হক বা উৎসন্নে যাক তার পরোয়া না করে যে কোনভাবেই হোক না কেন তোমাদের দুনিয়াবী স্বার্থ উদ্ধার করে দিতে পারলেই যথেষ্ট৷ তোমাদের এমন সব শাসকের প্রয়োজন ছিল যারা নিজেরাই হবে অসচ্ছরিত্র এবং তাদের পৃষ্ঠপোশকতায় তোমরা সব রকমের গোনাহ ও অসৎ কাজ করার অবাধ সুযোগ লাভ করবে৷ এভাবে আমাদের ও তোমাদের মধ্যে সমান সমান লেনদেনের কথা হয়েছিল৷ এখন তোমরা এ কেমন ভড়ং সৃষ্টি করে চলেছ, যেন তোমরা বড়ই নিরপরাধ এবং আমরা জোর করে তোমাদেরকে বিভ্রান্ত করেছিলাম৷
৫৩. অন্যকথায় এ জনতার জবাব হবে, তোমরা এ দায়িত্বের ক্ষেত্রে আমাদেরকে সমান অংশীদার করছো কেমন করে? তোমাদের কি মনে আছে, তোমরা চালবাজী, প্রতারণা ও মিথ্যা প্রচারণার কেমন মোহময় যাদু সৃষ্টি করে রেখেছিলে এবং রাতদিন আল্লাহর বান্দাদেরকে নিজেদের ফাঁদে আটকাবার জন্য কেমন সব পদক্ষেপ নিয়েছিলে? তোমরা আমাদের সামনে দুনিয়া পেশ করেছিলে এবং আমরা তার জন্য জান দিয়ে দিলাম, ব্যাপারতো মাত্র এতটুকুই ছিল না বরং তোমরা রাতদিনের প্রতারণা ও চালাকির মাধ্যমে আমাদেরকে বেকুব বানাচ্ছিলে এবং তোমাদের প্রত্যেক শিকারী প্রতিদিন একটি নতুন জাল তৈরি করে নানা ছলচাতুরী ও কলা-কৌশলের মাধ্যেম আল্লাহর বান্দাদেরকে তাতে ফাঁসিয়ে দিচ্ছিলে, এটাও ছিল বাস্তব ঘটনা৷ কুরআনের বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন পদ্ধতিতে নেতা ও পীরদের এই বিবাদের উল্লেখ করা হয়েছে ৷ বিস্তারিত জানার জন্য নিম্নোক্ত স্থানগুলো দেখুনঃ আল আ'রাফ, ৩৮-৩৯; ইবরাহীম, ২১; আল কাসাস, ৬৩; আল আহযাব, ৬৬-৬৮; আল মু'মিন, ৪৭-৪৮ এবং হা মীম আস্ সাজদাহ, ২৯ আয়াত ৷
৫৪. একথা কুরআন মজীদের বহুস্থানে বর্ণনা করা হয়েছে যে, আম্বিয়া (আ) এর দাওয়াতকে সর্বপ্রথম ও সবার আগে রুখে দাঁড়াত সমাজের সচ্ছল শ্রেণী, যারা অর্থ-বিত্ত, সহায় সম্পদ ও কর্তৃত্ব ক্ষমতার অধিকারী ছিল৷ দৃষ্টান্ত স্বরূপ নিম্নোক্ত স্থানগুলো দেখুনঃ আল আন'আম,১২৩; আল আ'রাফ, ৬০, ৬৬, ৭৫, ৮৮, ৯০; হুদ,২৭; বনী ইসরাঈল, ১৬; আর মু'মিনূন, ২৪, ৩৩ থেকে ৩৮, ৪৬, ৪৭ এবং আয্ যুখরুফ, ২৩ আয়াত ৷
৫৫. তাদের যুক্তি ছিল, আমরা তোমাদের চেয়ে আল্লাহর বেশী প্রিয় ও পছন্দনীয় লোক৷ তাইতো তিনি আমাদের এমন নিয়ামত দান করেছেন যা থেকে তোমরা বঞ্চিত অথবা কমপক্ষে আমাদের তুলনায় নিম্ন পর্যায়ের৷ আল্লাহ যদি আমাদের প্রতি সন্তুষ্ট না হয়ে থাকতেন, তাহলে আমাদের শানশওকত ও অর্থ বিত্ত কেনই বা দিলেন- এখন আল্লাহ এখানে তো আমাদের প্রতি অঢেল অনুগ্রহ বর্ষণ করছেন আর আখেরাতে আমাদেরকে শাস্তি দেবেন, একথা আমরা কেমন করে মেনে নিতে পারি! শাস্তি দিলে তাদেরকেই দেবেন যারা এখানে তাঁর অনুগ্রহ বঞ্চিত হয়েছে৷ কুরআন মজীদের বিভিন্ন স্থানে দুনিয়া পূজারীদের এ বিভ্রান্তির উল্লেখ করে তা খন্ডন করা হয়েছে৷ দৃষ্টান্ত স্বরূপ নিন্মেক্ত স্থানগুলো দেখুন- আল বাকারাহ ১২৬, ২১২; তাওবা ৫৫, ৬৯; হুদ ৩,২৭ ;আর রা'দ ২৬; আল কাহফ, ৩৪-৪৩; মারয়াম,৭৩-৭৭; তা-হা, ১৩১; আল মু'মিনূন, ৫৫-৬১; আশ শু'আরা, ১১১; আল কাসাস, ৭৬-৮৩; আল রূম, ৯; আল মুদ্দাসসির, ১১-২৬ এবং আল ফাজর, ১৫-২০ আয়াত৷
৫৬. অর্থাৎ দুনিয়ায় রিযিক বন্টনের ব্যবস্থা যে জ্ঞান, কৌশল ও কল্যাণ বিধানের ওপর প্রতিষ্ঠিত তা তারা অনুধাবন করে না৷ ফলে তারা এ বিভ্রান্তির শিকার হয়ে পড়ে যে, আল্লাহ যাকে প্রশস্ত রিযিক দান করেন সে তার প্রিয়পাত্র এবং যার রিযিক তিনি সংকীর্ণ করে দেন সে তার গযবের মুখমুখি হয়েছে৷ অথচ কোন ব্যক্তি সামান্য চোখ মেলে তাকালে দেখতে পারে, অনেক সময় বড়ই নোংরা ও ভয়ংকর চরিত্রের লোকেরা বিত্ত ও সম্পদশালী হয়েছে এবং আয়েশী জীবন যাপন করছে, পক্ষান্তরে অনেক সৎকর্মশীল ভদ্রলোক যাদের চরিত্র গুণ সবার স্কীকৃতি পেয়েছে, তারা আর্থিক অনটনে জীবন যাপন করছে৷ এখন কোন বুদ্ধিমান ব্যক্তি বলতে পারে, আল্লাহ এ পাক-পবিত্র চরিত্রের অধিকারী লোকদের কে অপছন্দ করেন এবং দুষ্ট প্রকৃতির শয়তান চরিত্রের লোকদেরকেই ভালবাসেন?