(৩৩:৫৯) হে নবী! তোমার স্ত্রীদের, কন্যাদের ও মু’মিনদের নারীদেরকে বলে দাও তারা যেন তাদের চাদরের প্রান্ত তাদের ওপর টেনে নেয়৷১১০ এটি অধিকতর উপযোগী পদ্ধতি, যাতে তাদেরকে চিনে নেয়া যায় এবং কষ্ট না দেয়া হয়৷১১১ আল্লাহ ক্ষমাশীল ও করুণাময়৷১১২
(৩৩:৬০) যদি মুনাফিকরা এবং যাদের মনে গলদ ১১৩ আছে তারা আর যারা মদীনায় উত্তেজনাকর গুজব ছড়ায়, ১১৪ তারা নিজেদের তৎপরতা থেকে বিরত না হয়, তাহলে আমি তাদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেবার জন্য তোমাকে উঠিয়ে দাঁড় করিয়ে দেবো; তারপর খুব কমই তারা এ নগরীতে তোমার সাথে থাকতে পারবে৷
(৩৩:৬১) তাদের ওপর লানত বর্ষিত হবে চারদিক থেকে, যেখানেই পাওয়া যাবে তাদেরকে পাকড়াও করা হবে এবং নির্দয়ভাবে হত্যা করা হবে৷
(৩৩:৬২) এটিই আল্লাহর সুন্নাত, এ ধরনের লোকদের ব্যাপারে পূর্ব থেকে এটিই চলে আসছে এবং তুমি আল্লাহর সুন্নাতে কোন পরিবর্তন পাবে না৷১১৫
(৩৩:৬৩) লোকেরা তোমাকে জিজ্ঞেস করছে, কিয়ামত কবে আসবে?১১৬ বলো, একমাত্র আল্লাহই এর জ্ঞান রাখেন৷ তুমি কী জানো, হয়তো তা নিকটেই এসে গেছে৷
(৩৩:৬৪) মোটকথা এ বিষয়টি নিশ্চিত যে, আল্লাহ কাফেরদেরকে অভিসপ্ত করেছেন এবং তাদের জন্য উৎক্ষিপ্ত আগুনের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন,
(৩৩:৬৫) যার মধ্যে তারা থাকবে চিরকাল, কোন অভিভাবক ও সাহায্যকারী পাবে না৷
(৩৩:৬৬) যেদিন তাদের চেহারা আগুনে ওলট পালট করা হবে তখন তারা বলবে “হায়! যদি আমরা আল্লাহ ও তার রসূলের আনুগত্য করতাম”৷
(৩৩:৬৭) আরো বলবে, “হে আমাদের রব! আমরা আমাদের সরদারদের ও বড়দের আনুগত্য করেছিলাম এবং তারা আমাদের সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত করেছে৷
(৩৩:৬৮) হে আমাদের রব!তাদেরকে দ্বিগুন আযাব দাও এবং তাদের প্রতি কঠোর লানত বর্ষণ করো”৷১১৭
১১০. মূল শব্দগুলো হচ্ছে,(.................) আরবী ভাষায় ‌জিলবাব‍‍‍‍ বলা হয় বড় চাদরকে৷ আর ইদন (....) শব্দের আসল মানে হচ্ছে নিকটবর্তী করা ও ঢেকে নেয়া৷ কিন্তু যখন তার সাথে আলা অব্যয় বসে তখন তার মধ্যে ইরখা (.....) অর্থাৎ ওপর থেকে ঝুলিয়ে দেয়ার অর্থ সৃষ্টি হয়৷ বর্তমান যুগের কোন কোন অনুবাদক ও তাফসীরকার পাশ্চাত্য ভাবধারায় প্রভাবিত হয়ে এ শব্দের অনুবাদ করেন শুধুমাত্র "জড়িয়ে নেয়া" যাতে চেহারা কোনভাবে ঢেকে রাখার হুকুমের বাইরে থেকে যায়৷ কিন্তু যা বর্ণনা করছেন আল্লাহর উদ্দেশ্য যদি তাই হতো, তাহলে তিনি(........) বলতেন৷ যে ব্যক্তিই আরবী ভাষা জানেন তিনি কখনো একথা মেনে নিতে পারেন না যে,(.......) মানে কেবলমাত্র জড়িয়ে নেয়া হতে পারে৷ তাছাড়া(.....) শব্দ দুটি অর্থ গ্রহণ করার পথে আরো বেশী বাধা হয়ে দাঁড়ায়৷ একথা সুষ্পষ্ট যে, এখানে মিন(..) শব্দটি কিছু অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে৷ অর্থাৎ চাদরের এক অংশ৷ আর এটাও সুস্পষ্ট যে, জড়িয়ে নিতে হলে পুরো চাদর জড়াতে হবে, নিছক তার একটা অংশ নয়৷ তাই আয়াতের পরিষ্কার অর্থ হচ্ছে, নারীরা যেন নিজেদের চাদর ভালোভাবে জড়িয়ে ঢেকে নিয়ে তার একটি অংশ বা একটি পাল্লা নিজেদের ওপর লটকিয়ে দেয়, সাধারণভাবে যাকে বলা হয় ঘোমটা৷

নবুওয়াত যুগের নিকটবর্তী কালের প্রধান মুফাসসিরগণ এর এ অর্থই বর্ণনা করেন৷ ইবনে জারীর ও ইবনুল মুনযিরের বর্ণনা মতে মুহাম্মাদ ইবনে সিরীন (রা)হযরত উবাইদাতুস সালমানীর কাছে এ আয়াতটির অর্থ জিজ্ঞেস করেন৷ (এই হযরত উবাইদাহ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সালালামের যুগে মুসলমান হন কিন্তু তার খিদমতে হাযির হতে পারেননি৷ হযরত উমরের (রা) হযরত উমরের (রা) আমলে তিনি মদীনা আসেন এবং সেখানেই থেকে যান৷ তাকে ফিকহ ও বিচার সংক্রান্ত বিষয়ে কাযী শুরাইহ- এর সমকক্ষ মনে করা হতো৷ তিনি জবাবে কিছু বলার পরিবর্তে নিজের চাদর তুলে নেন এবং তা দিয়ে এমনভাবে মাথা ও শরীর ঢেকে নেন যে তার ফলে পুরো মাথা ও কপাল এবং পুরো চেহারা ঢাকা পড়ে যায়, কেবলমাত্র একটি চোখ খোলা থাকে৷ ইবনে আব্বাসও প্রায় এই একই ব্যাখ্যা করেন৷ তার যেসব উক্তি ইবনে জারীর, ইবনে আবি হাতেম ও ইবনে মারদুইয়া উদ্ধৃত করেছেন তা থেকে তার যে বক্তব্য পাওয়া যায় তা হচ্ছে এই যে, "আল্লাহ মহিলাদেরকে হুকুম দিয়েছেন যে, যখন তারা কোন কাজে ঘরের বাইরে বের হবে তখন নিজেদের চাদরের পাল্লা ওপর দিয়ে লটকে দিয়ে যেন নিজেদের মুখ ঢেকে নেয় এবং শুধুমাত্র চোখ খোলা রাখে"৷ কাতাদাহ ও সুদ্দীও এ আয়াতের এ ব্যাখ্যাই করেছেন৷

সাহাবা ও তাবে'‍‌‌‌‌‌ঈদের যুগের পর ইসলামের ইতিহাসে যত বড় বড় মুফাসসির অতিক্রান্ত হয়েছেন তারা সবাই একযোগে এ আয়াতের এ অর্থই বর্ণনা করেছেন৷ ইমাম ইবনে জারীর তাবারী বলেনঃ(.........) অর্থাৎ ভদ্র ঘরের মেয়েরা যেন নিজেদের পোশাক আশাকে বাঁদীদের মতো সেজে ঘর থেকে বের না হয়৷ তাদের চেহারা ও কেশদাম যেন খোলা না থাকে৷ বরং তাদের নিজেদের ওপর চাদরের একটি অংশ লটকে দেয়া উচিত৷ ফলে কোন ফাসেক তাদেরকে উত্যক্ত করার দুঃসাহস করবে না৷ (জামেউল বায়ান ২২ খন্ড, ৩৩ পৃষ্ঠা)৷

আল্লামা আবু বকর জাসসাস বলেন, "এ আয়াতটি প্রমাণ করে, যবুতী মেয়েদের চেহারা অপরিচিত পুরুষদের থেকে লুকিয়ে রাখার হুকুম দেয়া হয়েছে৷ এই সাথে ঘর থেকে বের হবার সময় তাদের সতর ও পবিত্রতা সম্পন্না হবার কথা প্রকাশ করা উচিত৷ এর ফলে সন্দেহযুক্ত চরিত্র ও কর্মের অধিকারী লোকেরা তাদরকে দেখে কোন প্রকার লোভ ও লালসার শিকার হবে না"৷ (আহকামুল কুরআন, ৩ খন্ড,৪৫৮ পৃষ্ঠা)

আল্লামা যামাখশারী বলেন,(.......) অর্থাৎ তারা যেন নিজেদের চাদরের একটি অংশ লটকে নেয় এবং তার সাহায্যে নিজেদের চেহারা ও প্রান্তভাগগুলো ভালোভাবে ঢেকে নেয়"৷ (আল কাশশাফ, ২ খন্ড, ২২ পৃষ্ঠা )

আল্লামা নিযামুদ্দীন নিশাপুরী বলেন,(..............) অর্থাৎ নিজেদের ওপর চাদরের একটি অংশ লটকে দেয়৷ এভাবে মেয়েদেরকে মাথা ও চেহারা ঢাকার হুকুম দেয়া হয়েছে৷ (গারায়েবুল, কুরআন ২২, খন্ড ৩২ পৃষ্ঠা)

ইমাম রাযী বলেনঃ "এর উদ্দেশ্য হচ্ছে, লোকেরা যেন জানতে পারে এরা দুশ্চরিত্রা মেয়ে নয়৷ কারণ যে মেয়েটি নিজের চেহারা ঢাকবে, অথচ চেহারা সতরের অন্তরভুক্ত নয়, তার কাছে কেউ আশা করতে পারে না যে, সে নিজের সতর অন্যের সামনে খুলতে রাজী হবে৷ এভাবে প্রত্যেক ব্যক্তি জানবে, এ মেয়েটি পর্দানশীল, একে যিনার কাজে লিপ্ত করার আশা করা যেতে পারে না"৷ (তাফসীরে কবীর, ২ খন্ড, ৫৯১ পৃষ্ঠা)

এ আয়াত থেকে পরোক্ষভাবে আর একটি বিষয়ের সন্ধান পাওয়া যায়৷ অর্থাৎ এখান থেকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কয়েকটি কন্যা থাকার কথা প্রমাণিত হয়৷ কারণ, আল্লাহ বলছেন, "হে নবী! তোমার স্ত্রীদের ও কন্যাদেরকে বলো"৷এ শব্দাবলী এমনসব লোকদের উক্তি চূড়ান্তভাবে খন্ডন করে যারা আল্লাহর ভয়শূন্য হয়ে নিসংকোচে এ দাবী করেন যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কেবলমাত্র একটি কন্যা ছিল এবং তিনি ছিলেন, হযরত ফাতেমা রাদিয়াল্লাহু আনহা৷ বাদ বাকি অন্য কন্যারা তাঁর ঔরসজাত ছিলেন না, তারা ছিলেন তার স্ত্রীর পূর্ব স্বামীর ঔরসজাত এবং তার কাছে প্রতিপালিত৷ এ লোকেরা বিদ্বেষে অন্ধ হয়ে একথাও চিন্তা করেন না যে, নবী সন্তানদেরকে তার ঐরসজাত হবার ব্যাপারটি অস্বীকার করে তারা কতবড় অপরাধ করছেন এবং আখেরাতে এ জন্য তাদেরকে কেমন কঠিন জবাদিহির সম্মুখীন হতে হবে৷ সমস্ত নির্ভরযোগ্য হাদীস এ ব্যাপারে ঐকমত্য ব্যক্ত করেছে যে, হযরত খাদীজার (রা) গর্ভে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কেবলমাত্র একটি সন্তান হযরত ফাতেমা (রা) জন্ম গ্রহণ করেননি বরং আরো তিন কন্যাও জন্মলাভ করে৷ নবী করীমের (সা) সবচেয়ে প্রাচীন সীরাত লেখক মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক হযরত খাদীজার সাথে নবী করীমের (সা) বিয়ের ঘটনা উল্লেখ করার পর বলেনঃ "ইবরাহীম ছাড়া নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সমস্ত ছেলে মেয়ে তারই গর্ভে জন্ম নেয়৷ তাদের নাম হচ্ছেঃ কামেস, তাহের ও তাইয়েব এবং যয়নব, রুকাইয়া, উম্মে কুলসুম ও ফাতেমা৷ (সীরাতে ইবনে হিশাম, ১ খন্ড, ২০২ পৃষ্ঠা) প্রখ্যাত বংশতালিকা বিশেষজ্ঞ হিশাম ইবনে মুহাম্মাদ ইবনুস সায়েব কালবির বর্ণনা হচ্ছেঃ "নবুওয়াত লাভের পূর্বে মক্কায় জন্ম গ্রহনকারী নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রথম সন্তান হলো কাসেম৷ তারপর জন্ম লাভ করে যয়নব, তারপর রুকাইয়া, তারপর উম্মে কুলসুম৷ (তাবকাতে ইবনে সাদ, ১খন্ড, ১৩৩ পৃষ্ঠা)ইবনে হাযম জাওয়ামেউস সিয়ারে শিখেছেন, হযরত খাদীজার (রা) গর্ভে নবী করীমের (সা) চারটি কন্যা জন্ম গ্রহণ করেন৷ এদের মধ্যে সবার বড় ছিলেন হযরত যয়নব (রা), তার ছোট ছিলেন হযরত রুকাইয়া (রা), তার ছোট ছিলেন হযরত ফাতেমা (রা) এবং তার ছোট ছিলেন উম্মে কুলসুম (রা) (পৃষ্ঠা ৩৮-৩৯) তাবারী, ইবনে সা'দ আল মুহাব্বার গ্রন্থ প্রণেতা আবু জাফর মুহাম্মাদ ইবনে হাবীব এবং আল ইসতি আব গ্রন্থ প্রণেতা ইবনে আবদুল বার নির্ভরযোগ্য বরাতের মাধ্যমে বর্ণনা করেছেন৷ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পূর্বে হযরত খাদীজার (রা) আরো দু'জন স্বামী অতিক্রান্ত হয়েছিল৷ একজন ছিলেন আবু হালাহ তামিমী, তার ঔরসে জন্ম নেয় হিন্দ ইবনে আবু হালাহ৷ দ্বিতীয় জন ছিলেন আতীক ইবনে আয়েদ মাখযুমী৷ তার ঔরসে হিন্দ নামে এক মেয়ের জন্ম হয়৷ তারপর তার বিয়ে হয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে৷ সকল বংশ তালিকা বিশেষজ্ঞ এ ব্যাপারে একমত যে তার ঔরসে হযরত খাদীজার (রা) গর্ভে ওপরে উল্লেখিত চার কন্যা সন্তানের জন্ম হয়৷ (দেখুন তাবারী,২ খন্ড , ৪১১ পৃষ্ঠা তাবকাত ইবনে সা'দ,৮ খন্ড, ১৪-১৬ পৃষ্ঠা, কিতাবুল মুহাব্বার,৭৮,৭৯ ও ৪৫২ পৃষ্ঠা এবং আল ইসতি'আব, ২খন্ড,৭১৮ পৃষ্ঠা ৷) এ সমস্ত বর্ণনা নবী করীমের (সা) একটি নয় বরং কয়েকটি মেয়ে ছিল,কুরআন মজীদের এ বর্ণনাকে অকাট্য প্রমাণ করে৷
১১১. "চিনে নেয়া যায়" এর অর্থ হচ্ছে, তাদেরকে এ ধরনের অনারাড়ম্বর লজ্জা নিবারণকারী পোশাকে সজ্জিত দেখে প্রত্যেক প্রত্যক্ষকারী জানবে তারা অভিজাত ও সম্ভ্রান্ত পরিবারের পূত-পবিত্র মেয়ে, এমন ভবঘুরে অসতী ও পেশাদার মেয়ে নয়, কোন অসদাচারী মানুষ যার কাছে নিজের কামনা পূর্ণ করার আশা করতে পারে৷ "না কষ্ট দেয়া হয়" এর অর্থ হচ্ছে এই যে, তাদেরকে যেন উত্যক্ত ও জ্বালাতন না করা হয়৷ এখানে কিছুক্ষণ থেমে একবার একথাটি অনুবাধন করার চেষ্টা করুন যে, কুরআনের এ হুকুম এবং এ হুকুমের যে উদ্দেশ্য আল্লাহ নিজেই বর্ণনা করেছেন তা ইসলামী সমাজ বিধানের কোন ধরনের প্রাণ শত্তির প্রকাশ ঘটাচ্ছে৷ ইতিপূর্বে সূরা নূরের ৩১ আয়াতে এ নির্দেশ আলোচিত হয়েছে যে; মহিলারা তাদের সাজসজ্জা অমুক অমুক ধরনের পুরুষ ও নারীদের ছাড়া আর কারো সামনে প্রকাশ করবে না৷ "আর মাটির ওপর পা দাপিয়ে চলবে না, যাতে যে সৌন্দর্য তারা লুকিয়ে রেখেছে লোকেরা যেন তা জেনে না ফেলে"৷ এ হুকুমের সাথে যদি সূরা আহযাবের এ আয়াতটি মিলিয়ে পড়া হয় তাহলে পরিষ্কার জানা যায় যে, এখানে চাদর দিয়ে ঢাকার যে হুকুম এসেছে অপরিচিতদের থেকে সৌন্দর্য লুকানোই হচ্ছে তার উদ্দেশ্য৷আর একথা সুস্পষ্ট যে, এ উদ্দেশ্য তখনই পূর্ণ হতে পারে যখন চাদরটি হবে সাদামাটা৷ নয়তো একটি উন্নত নকশাদার ও দৃষ্টিনন্দন কাপড় জড়িয়ে নিলে তো উলটো এ উদ্দেশ্য আরো খতম হয়ে যাবে৷ তাছাড়া আল্লাহ কেবল চাদর জড়িয়ে সৌন্দর্য ঢেকে রাখার হুকুম দিচ্ছেন না বরং একথাও বলছেন যে, মহিলারা যেন চাদরের একটি অংশ নিজেদের ওপর লটকে দেয়৷ কোন বিচক্ষণ বিবেকবান ব্যক্তি এ উক্তিটির এ ছাড়া দ্বিতীয় কোন অর্থ করতে পারেন না যে, এর উদ্দেশ্য হচ্ছে ঘোমটা দেয়া যাতে শরীর ও পোশাকের সৌন্দর্য ঢাকার সাথে সাথে চেহারাও ঢাকা পড়বে৷ তারপর আল্লাহ নিজেই এ হুকুমটির 'ইল্লাত' (কার্যকারণ) এ বর্ণনা করেছেন যে, এটি এমন একটি সর্বাধিক উপযোগী পদ্ধতি যা থেকে মুসলমান মহিলাদেরকে চিনে নেয়া যাবে এবং তারা উত্যক্ত হবার হাত থেকেও বেচে যাবে৷ এ থেকে আপনা-আপনিই একথা প্রকাশ হয়ে যায় যে, এ নিদের্শ এমন সব মহিলাকে দেয়া হচ্ছে যারা পুরুষদের হাতে উত্যক্ত হবার এবং তাদের দৃষ্টিতে পড়ার ও তাদের কামনা-লালসার বস্তুতে পরিণত হবার ফলে আনন্দ অনুভব করার পরিবর্তে একে নিজেদের জন্য কষ্টদায়ক লাঞ্ছনাকর মনে করে, যারা সমাজে নিজেদেরকে বে-আবরু মক্ষিরাণী ধরনের মহিলাদের মধ্যে গণ্য করাতে চায় না৷ বরং সতী-সাধ্বী গৃহ প্রদীপ হিসেবে পরিচিত হতে চায় এ ধরনের শরীফ ও পূত চরিত্রের অধিকারিনী সৎকর্মশীলা মহিলাদের সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, যদি সত্যিই তোমরা এভাবে নিজেদেরকে পরিচিত করাতে চাও এবং পুরুষদের যৌন লালসার দৃষ্টি সত্যিই তোমাদের জন্য আনন্দাদায়ক না হয়ে থাকে, তাহলে এ জন্য তোমরা খুব লাভোভাবে সাজসজ্জা করে বাসর রাতের কনে সেজে ঘর থেকে বের হয়ো না এবং দর্শকদের লালসার দৃষ্টির সামনে নিজেদের সৌন্দর্যকে উজ্জল করে তুলে ধরোনা৷ কেননা এটা এর উপযোগী পদ্ধতি নয়৷ বরং এ জন্য সর্বাধিক উপযোগী পদ্ধতি এই হতে পারে যে, তোমরা একটি সাদামাটা চাদরে নিজেদের সমস্ত সৌন্দর্য ও সাজসজ্জা ঢেকে বের হবে, চেহারা ঘোমটার আড়ালে রাখবে এবং এমনভাবে চলবে যাতে অলংকারের রিনিঝিনি আওয়াজ লোকদেরকে তোমাদের প্রতি আকৃষ্ট করবে না৷ বাইরে বের হবার আগে যেসব মেয়ে সাজগোজ করে নিজেদেরকে তৈরী করে এবং ততক্ষণ ঘরের বাইরে পা রাখে না যতক্ষন অপরূপ সাজে নিজেদেরকে সজ্জিতা না করে নেয়, তাদের এর উদ্দেশ্য এ ছাড়া আর কি হতে পারে যে, তারা সারা দুনিয়ার পুরুষদের জন্য নিজেদেরকে দৃষ্টিনন্দন করতে চায় এবং তাদেরকে নিজেদের দিকে আকৃষ্ট করতে চায়৷ এরপর যদি তারা বলে, দর্শকদের ভ্রূভংগী তাদেরকে কষ্ট দেয়, এরপর যদি তাদের দাবী হয় তারা "সমাজের মক্ষিরানী" এবং "সর্বজনপ্রিয় মহিলা" হিসেবে নিজেদেরকে চিত্রিত করতে চায় না বরং পূত-পবিত্রা গৃহিনী হয়েই থাকতে চায়, তাহলে এটা একটা প্রতারণা ছাড়া আর কিছুই নয়৷ মানুষের কথা তার নিয়ত নির্ধারণ করে না বরং কাজেই তার আসল নিয়ত প্রকাশ করে৷ কাজেই যে নারী আকর্ষনীয়া হয়ে পর পুরুষের সামনে যায়, তার এ কাজটির পেছনে কোন ধরনের উদ্দেশ্য কাজ করছে সেটা ঐ কাজ দ্বারাই প্রকাশ পায়৷ কাজেই এসব মহিলাদের থেকে যা আশা করা যেতে পারে ফিতনাবাজ লোকেরা তাদের থেকে তাই আশা করে থাকে৷ কুরআন মহিলাদেরকে বলে, তোমরা এই সংগে "গৃহপ্রদীপ" ও "সমাজের মক্ষিরাণী" হতে পারো না৷ গৃহপ্রদীপ হতে চাইলে সমাজের মক্ষিরাণী হবার জন্য যেসব পদ্ধতি অবলম্বন করতে হয় তা পরিহার করো এবং এমন জীবনধারা অবলম্বন করো যা গৃহপদীপ হতে সাহায্য করতে পারে৷ কোন ব্যক্তির ব্যক্তিগত মত কুরআনের অনুকূল হোক বা তার প্রতিকূল এবং তিনি কুরআনের পথনিদের্শককে নিজের কর্মনীতি হিসেবে গ্রহণ করতে চান বা না চান, মোটকথা তিনি যদি ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে জাল-জুয়াচুরির পথ অবলম্বন করতে না চান, তাহলে কুরআনের অর্থ বুঝতে তিনি ভুল করতে পারেন না৷ তিনি যদি মুনাফিক না হয়ে থাকেন, তাহলে পরিষ্কারভাবে একথা মেনে নেবেন যে, ওপরে যা বর্ণনা করা হয়েছে তাই হচ্ছে কুরআনের উদ্দেশ্য৷ এরপর তিনি যে বিরুদ্ধাচরণই করবেন একথা মেনে নিয়েই করবেন যে, তিনি কুরআন বিরোধী কাজ করছেন অথবা কুরআনের নিদের্শনাকে ভুল মনে করছেন৷
১১২. অর্থাৎ ইতিপূর্বে জাহেলী জীবন যাপন করার সময় যেসব ভুল করা হয় আল্লাহ নিজ মেহেরবানীতে তা ক্ষমা করে দেবেন তবে এ জন্য শর্ত হচ্ছে, এখন পরিষ্কার পথ নিদের্শ লাভ করার পর তোমরা নিজেদের কর্মধারা সংশোধন করে নেবে এবং জেনে বুঝে তার বিরুদ্ধাচরণ করবে না৷
১১৩. "মনের গলদ" বলতে এখানে দু'ধরনের গলদের কথা বলা হয়েছে৷ এক, মানুষ নিজেকে মুসলমানদের মধ্যে গণ্য করা সত্ত্বেও ইসলাম ও মুসলমানদের অশুভাকাংকী হয়৷ দুই, মানুষ অসৎ সংকল্প, লাস্পট্য ও অপরাধী মানসিকতার আশ্রয় নেয়৷ এবং তার পূতিগন্ধময় প্রবণতাগুলো তার উদ্যোগ, আচরণ ও কর্মকান্ড থেকে বিচ্ছুরিত হতে থাকে৷
১১৪. এখানে এমন সব লোকের কথা বলা হয়েছে যারা মুসলমানদের মধ্যে ভীতি ও আতংক ছড়াবার এবং তাদের মনোবল ভেংগে দেবার জন্য সে সময় প্রতি দিন মদীনায় এ ধরনের গুজব ছড়িয়ে বেড়াতো যে, অমুক জায়গায় মুসলমানরা খুব বেশী মার খেয়ে গেছে, অমুক জাগয়ায় মুলসমানদের বিরুদ্ধে বিপুল শক্তিশালী সমাবেশ ঘটছে এবং শিগগির মদীনার ওপর অতর্কিত হামলা হবে৷ এই সংগে তাদের আর একটি কাজ এও ছিল যে, তারা নবীর পরিবার ও শরীফ মুসলমানদের পারিবারিক জীবন সম্পর্কে বিভিন্ন প্রকার অলীক গল্প তৈরি করে সেগুলো ছড়াতে থাকতো, যাতে এর ফলে জনগণের মধ্যে কুধারণা সৃষ্টি হয় এবং মুসলমানদের নৈতিক প্রভাব ক্ষতিগ্রস্থ হয়৷
১১৫. অর্থাৎ আল্লাহর শরীয়াতের একটি স্বতন্ত্র বিধান আছে৷ সে বিধান হচ্ছে, একটি ইসলামী সমাজ ও রাষ্ট্রে এ ধরনের ফাসাদীদেরকে কখনো সমৃদ্ধি ও বিকাশ লাভের সুযোগ দেয়া হয় না৷ যখনই কোন সমাজ ও রাষ্ট্রর ব্যবস্থা আল্লাহর শরীয়াতের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হবে, সেখানে এ ধরনের লোকদেরকে পূর্বেই সতর্ক করে দেয়া হবে, যাতে তারা নিজেদের নীতি পরিবর্তন করে নেয় এবং তারপর তারা বিরত না হলে কঠোরভাবে তাদেরকে দমন করা হবে৷
১১৬. সাধারণত কাফের ও মুনাফিকরা রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে এ ধরনের প্রশ্ন করতো৷ এর মাধ্যমে জ্ঞানলাভ করা তাদের উদ্দেশ্য হতো না৷ বরং তারা ঠাট্টা-মস্করা ও তামাশা-বিদ্রূপ করার জন্য একথা জিজ্ঞেস করতো৷ আসলে তারা আখেরাতে বিশ্বাস করতো না৷ কিয়ামতের ধারণাকে তারা নিছক একটি অন্তসারশূন্য হুমকি মনে করতো৷ কিয়ামত আসার আগে তারা নিজেদের যাবতীয় বিষয় ঠিকঠাক করে নেবার ইচ্ছা রাখে বলেই যে তারা তার আসার তারিখ জিজ্ঞেস করতো তা নয়৷ বরং তাদের আসল উদ্দেশ্য এই হতো, "হে মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)৷ আমরা তোমাকে ছোট করার জন্য এসব করেছি এবং আজ পর্যন্ত তুমি আমাদের কোন ক্ষতি করতে পারোনি৷ এখন তাহলে তুমি আমাদের বলো, সেই কিয়ামত কবে হবে যখন আমাদের শাস্তি দেয়া হবে"৷
১১৭. এ বিষয়বস্তুটি কুরআন মজীদের বহুস্থানে বর্ণনা করা হয়েছে৷ দৃষ্টান্ত স্বরূপ নিম্নলিখিত স্থানগুলো দেখুনঃ আল আ'রাফ ১৮৭ আন নাযি'আত ৪২ ও ৪৬ সাবা ৩ ও ৫, আল মুলক ২৪ ও ২৭ আল মুতাফফিফীন ১০ ও ১৭ আল হিজর ২ ও ৩ আল ফুরকান ২৭ ও ২৯ এবং হা-মীম আস সাজদাহ ২৬ ও ২৯ আয়াত৷