(৩৩:৫৩) হে ঈমানদারগণ! নবী গৃহে বিনা অনুমতিতে প্রবেশ করো না,৯৫ খাবার সময়ের অপেক্ষায়ও থেকো না৷ হাঁ যদি তোমাদের খাবার জন্য ডাকা হয়, তাহলে অবশ্যই এসো ৯৬ কিন্তু খাওয়া হয়ে গেলে চলে যাও, কথাবার্তায় মশগুল হয়ে পড়ো না৷৯৭ তোমাদের এসব আচরণ নবীকে কষ্ট দেয় কিন্তু তিনি লজ্জায় কিছু বলেন না এবং আল্লাহ হককথা বলতে লজ্জা করেন না৷ নবীর স্ত্রীদের কাছে যদি তোমাদের কিছু চাইতে হয় তাহলে পর্দার পেছন থেকে চাও৷ এটা তোমাদের এবং তাদের মনের পবিত্রতার জন্য বেশী উপযোগী৷৯৮ তোমাদের জন্য আল্লাহর রসূলকে কষ্ট দেয়া মোটেই জায়েয নয় ৯৯ এবং তাঁর পরে তাঁর স্ত্রীদেরকে বিয়ে করাও জায়েয নয়, ১০০ এটা আল্লাহর দৃষ্টিতে মস্তবড় গোনাহ৷
(৩৩:৫৪) তোমরা কোন কথা প্রকাশ বা গোপন করো আল্লাহ সবকিছুই জানেন৷ ১০১
(৩৩:৫৫) নবীর স্ত্রীদের গৃহে তাদের বাপ, ছেলে ভাই-ভাতিজা, ভাগনা ১০২ সাধারণ মেলামেশার মহিলারা ১০৩ এবং তাদের মালিকাধীন দাসদাসীরা ১০৪ এলে কোন ক্ষতি নেই৷ (হে নারীগণ!) তোমাদের আল্লাহর নাফরমানি থেকে দূরে থাকা উচিত৷ আল্লাহ প্রত্যেকটি জিনিসের প্রতি দৃষ্টি রাখেন৷১০৫
(৩৩:৫৬) আল্লাহ ও তার ফেরেশতাগণ নবীর প্রতি দরূদ পাঠান৷১০৬ হে ঈমানদারগণ! তোমরাও তাঁর প্রতি দরূদ ও সালাম পাঠাও৷ ১০৭
(৩৩:৫৭) যারা আল্লাহ ও তার রসূলকে কষ্ট দেয় তাদেরকে আল্লাহ দুনিয়ায় ও আখেরাতে অভিশপ্ত করেছেন এবং তাদের জন্য লাঞ্ছনাদায়ক আযাবের ব্যব্স্থা করে দিয়েছেন৷ ১০৮
(৩৩:৫৮) আর যারা মু’মিন পুরুষ ও মহিলাদেরেক কোন অপরাধ ছাড়াই কষ্ট দেয় তারা একটি বড় অপবাদ ১০৯ ও সুষ্পষ্ট গোনাহের বোঝা নিজেদের ঘাড়ে চাপিয়ে নিয়েছে৷
৯৫. প্রায় এক বছর পরে সূরা নূরে যে সাধারণ হুকুম দেয়া হয় এটা তার ভূমিকা স্বরূপ৷ প্রাচীন যুগে আরবের লোকেরা নিসংকোচে একজন অন্যজনের ঘরে ঢুকে পড়তো৷ কেউ যদি কারো সাথে দেখা করতে চাইতো তাহলে দরোজায় দাঁড়িয়ে ডাকার বা অনুমতি নিয়ে ভেতরে যাবার নিয়ম ছিল না৷ বরং ভেতরে গিয়ে গৃহকর্তা গৃহে আছে কি নেই স্ত্রী ও ছেলেমেয়েদের কাছে জিজ্ঞেস করে তা জানতে চাইতো৷ এ জাহেলী পদ্ধতি বহু ক্ষতির কারণ হয়ে পড়েছিল৷ অনেক সময় বহু নৈতিক অপকর্মেরও সূচনা এখান থেকে হতো৷ তাই প্রথমে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের গৃহে এ নিয়ম জারী করা হয়৷ যে, কোন নিকটতম বন্ধু বা দূরবর্তী আত্মীয়-স্বজন হলেও বিনা অনুমতিতে তার গৃহে প্রবেশ করতে পারবে না৷ তারপর সূরা নূরে এ নিয়মটি সমস্ত মুসলমানের গৃহে জারী করার সাধারণ হুকুম দিয়ে দেয়া হয়৷
৯৬. এ প্রসংগে এটা দ্বিতীয় হুকুম৷ আরববাসীদের মধ্যে যেসব সভ্যতা বিবর্জিত আচরণের প্রচলন ছিল তার মধ্যে একটি এও ছিল যে, কোন বন্ধু বা পরিচিত লোকের গৃহে তারা পৌঁছে যেতো ঠিক খাবার সময় তাক করে৷ অথবা তার গৃহে এসে বসে থাকতো এমনকি খাবার সময় এসে যেতো৷ এহেন আচরণে গৃহকর্তা অধিকাংশ সময় বেকায়দায় পড়ে যেতো৷ মুখ ফুটে যদি বলে এখন আমার খাবার সময় মেহেরবানী করে চলে যান, তাহলে বড়ই অসভ্যতা ও রুঢ়তার প্রকাশ হয়৷ আর যদি খাওয়ায়, তাহলে হঠাৎ আগত কতজনকে খাওয়াবে৷যখনই যতজন লোকই আসুক সবসময় সংগে সংগেই তাদের খাওয়াবার ব্যবস্থা করার মতো সামর্থ সবাই রাখে না৷ আল্লাহ এ অভদ্র আচরণ করতে তাদেরকে নিষেধ করেন এবং হুকুম দেন, কোন ব্যক্তির গৃহে খাওয়ার জন্য তখনই যেতে হবে যখন গৃহকর্তা খাওয়ার দাওয়াত দেবে৷ এ হুকুম শুধুমাত্র নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্য নির্দিষ্ট ছিল না বরং সেই আদর্শগৃহে এ নিয়ম এ জন্যই জারী করা হয়েছিল যেন তা মুসলমানদের সাধারণ সাংস্কৃতিক জীবনের নিয়মে ও বিধানে পনিণত হয়ে যায়৷
৯৭. এটি আরো একটি অসভ্য আচরণ সংশোধনের ব্যবস্থা৷ কোন কোন লোক খাওয়ার দাওয়াতে এসে খাওয়া দাওয়া সেরে এমনভাবে ধরণা দিয়ে বসে চুটিয়ে আলাপ জুড়ে দেয় যেন আর উঠবার নামটি নেই, মনে হয় এ আলাপ আর শেষ হবে না৷ গৃহকর্তা ও গৃহবাসীদের এতে কি অসুবিধা হচ্ছে তার কোন পরোয়াই তারা করে না৷ ভদ্রতা জ্ঞান বিবর্জিত লোকেরা তাদের এ আচরণের মাধ্যমে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকেও কষ্ট দিতে থাকতো এবং তিনি নিজের ভদ্র ও উদার স্বভাবের কারণে এসব বরদাশত করতেন৷ শেষে হযরত যয়নবের ওলিমার দিন এ কষ্টদায়ক আচরণ সীমা ছাড়িয়ে যায়৷ নবী করীমের (সা) বিশেষ খাদেম হযরত আনাস (রা) বর্ণনা করেছেনঃ রাতের বেলা ছিল ওলিমার দাওয়াত৷ সাধারণ লোকেরা খাওয়া শেষ করে বিদায় নিয়েছিল৷ কিন্তু দু'তিনজন লোক বসে কথাবার্তায় মশগুল হয়ে গিয়েছিলন৷ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিরক্ত হয়ে উঠলেন এবং পবিত্র স্ত্রীদের ওখান থেকে এক চক্কর দিয়ে এলেন৷ ফিরে এসে দেখলেন তারা যথারীতি বসেই আছেন৷ তিনি আবার উঠে গেলেন এবং হযরত আয়েশার কামরায় বসলেন৷ অনেকটা রাত অতিবাহিত হয়ে যাবার পর যখন তিনি জানলেন তারা চলে গেছেন তখন তিনি হযরত যয়নবের (রা) কক্ষে গেলেন৷ এরপর এ বদ অভ্যাসগুলো সম্পর্কে লোকদেরকে সতর্ক করে দেয়া স্বয়ং আল্লাহর জন্য অপরিহার্য হয়ে পড়লো৷ হযরত আনাসের (রা) রেওয়ায়াত অনুযায়ী এ আয়াত সে সময়ই নাযিল হয়৷ (মুসলিম, নাসাঈ ও ইবনে জারীর)
৯৮. এ আয়াতকেই হিজাব বা পর্দার আয়াত বলা হয়৷ বুখারীতে হযরত আনাস ইবনে মালেকের (রা) উদ্ধৃত হয়েছে উমর (রা) এ আয়তটি নাযিল হবার পূর্বে নবী করীমের (সা) কাছে নিবেদন করেছিলেনঃ পূর্বে কয়েকবার নবী করীমের (সা) কাছে নিবেদন করেছিলেনঃ যে আল্লাহর রসূল! আপনার এখানে ভালোমন্দ সবরকম লোক আসে৷ আহা, যদি আপনি আপনার পবিত্র স্ত্রীদেরকে পর্দা করার হুকুম দিতেন৷ অন্য এক বর্ণনায় বলা হয়েছে, একবার হযরত উমর (রা) নবী করীমের (সা) স্ত্রীদের বলেনঃ যদি আপনাদের ব্যাপারে আমার কথা মেনে নেয়া হয় তাহলে আমার চোখ কখনোই আপনাদের দেখবে না৷ কিন্তু রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যেহেতু আইন রচনার ক্ষেত্রে স্বাধীন ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন না, তাই তিনি আল্লাহর ইশারার অপেক্ষায় ছিলেন৷ শেষ পর্যন্ত এ হুকুম এসে গেলো যে, মাহরাম পুরুষরা ছাড়া (যেমন সামনের দিকে ৫৫ আয়াতে আসছে) অন্য কোন পুরুষ নবী করীমের (সা) গৃহে প্রবেশ করবে না৷ আর সেখানে মহিলাদের কাছে যারই কিছু কাজের প্রয়োজন হবে তাকে পর্দার পেছনে থেকেই কথা বলতে হবে৷ এ হুকুমের পরে পবিত্র স্ত্রীদের গৃহে দরোজার ওপর পর্দা লটকে দেয়া হয় এবং যেহেতু নবী করীমের (সা) গৃহ সকল মুসলমানের জন্য আদর্শগৃহ ছিল তাই সকল মুসলমানের গৃহের দরোজায় ও পর্দা ঝোলানো হয়৷ আয়াতের শেষ অংশ নিজেই এদিকে ইংগিত করছে যে, যারাই পুরুষ ও নারীদের মন পাক পবিত্র রাখতে চায় তাদেরকে অবশ্যই এ পদ্ধতি অবলম্বন করতে হবে৷এখন যে ব্যক্তিকেই আল্লাহ দৃষ্টিশক্তি দান করেছেন সে নিজেই দেখতে পারে, যে কিতাবটি নারী পুরুষকে সামনা সামনি কথা বলতে বাধা দেয় এবং পর্দার অন্তরাল থেকে কথা বলার কারণ স্বরূপ একথা বলে যে, তোমাদের ও তাদের অন্তরের পবিত্রতার জন্য এ পদ্ধতিটি বেশী উপযোগী," তার মধ্যে কেমন করে এ অভিনব প্রাণপ্রবাহ সঞ্চার করা যেতে পারে, যার ফলে নারী পুরুষের মিশ্র সভা-সমিতি ও সহশিক্ষা এবং গণপ্রতিষ্ঠান ও অফিসসমূহে নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা একেবারেই বৈধ হয়ে যাবে এবং এর ফলে মনের পতিত্রতা মোটেই প্রভাবিত হবে না? কেউ যদি কুরআনের বিধান অনুসরণ করতে না চায়, তাহলে সে তার বিরুদ্ধাচরণ করুক এবং পরিষ্কার বলে দিক আমি এর অনুসরণ করতে চাই না, এটিই তার জন্য অধিক যুক্তিসংগত পদ্ধতি৷ কিন্তু কুরআনের সুস্পষ্ট বিধানের বিরুদ্ধাচরণ করবে এবং তারপর আবার বেহায়ার মতো বুক ফুলিয়ে বলবে, এটি ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা যা আমি উদ্ভাবন করে নিয়ে এসেছি- এটি বড়ই হীন আচারণ৷ কুরআন ও সুন্নাহর বাইরে কোন জায়গা থেকে তারা ইসলামের এ তথাকথিত শিক্ষা খুঁজে পেলেন?
৯৯. সে সময় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিরুদ্ধে যেসব অপবাদ ছড়ানো হচ্ছিল এবং কাফের ও মুনাফেকদের সাথে সাথে অনেক দুর্বল ঈমানদার মুসলমান ও তাতে অংশ গ্রহণ করতে শুরু করেছিলেন, এখানে সেদিকে ইংগিত করা হয়েছে৷
১০০. সূরার শুরুতে "নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের স্ত্রীগণ হচ্ছেন মু'মিনগণের মা" বলে যে বক্তব্য উপস্থাপন হয়েছে এ হচ্ছে তার ব্যাখ্যা৷
১০১. অর্থাৎ নবী করীমের (সা) বিরুদ্ধে কোন ব্যক্তি যদি অন্তরেও কোন খারাপ ধারণা পোষণ করে অথবা তার স্ত্রীদের সম্পর্কে কারো নিয়তের মধ্যে কোন অসততা প্রচ্ছন্ন থাকে, তাহলে আল্লাহর কাছে তা গোপন থাকবে না এবং এ জন্যে সে শাস্তি পাবে৷
১০২. ব্যাখ্যার জন্য সূরা নূরের তাফসীরের ৩৮ থেকে ৪২ পর্যন্ত টীকা দেখুন৷ এ প্রসংগে আল্লামা আলূসীর এ ব্যাখ্যাও উল্লেখযোগ্য যে, ভাই, ভাতিজা ও ভাগনাদের বিধানের মধ্যে এমন সব আত্মীয়রাও এসে যায় যারা একজন মহিলার জন্য হারাম-তারা রক্ত সম্পর্কিত আত্মীয় বা দুধ সম্পর্কিত যাই হোক না কেন৷ এ তালিকায় চাচা ও মামার উল্লেখ করা হয়নি৷ কারণ তারা নারীর জন্য পিতার সমান৷ অথবা তাদের উল্লেখ না করার কারণ হচ্ছে এই যে, ভাতিজা ও ভাগনার কথা এসে যাবার পর তাদের কথা বলার প্রয়োজন নেই৷ কেননা ভাতিজা ও ভাগনাকে পর্দা না করার পেছনে যে কারণ রয়েছে চাচা ও মামাকে পর্দা না করার কারণ ও তাই৷ (রুহুল মা'আনী)
১০৩. ব্যাখ্যার জন্য দেখুন সূরা নূরের তাফসীর ৪৩ টীকা৷
১০৪. ব্যাখ্যার জন্য সূরা নূরের তাফসীরের ৪৪ টীকা৷
১০৫. একথার অর্থ হচ্ছে, এ চূড়ান্ত হুকুম এসে যাবার পর ভবিষ্যতে এমন কোন ব্যক্তিকে বেপর্দা অবস্থায় গৃহে প্রবেশের অনুমতি দেয়া যাবে না যে ঐ ব্যতিক্রমী আত্মীয়দের গন্ডীর বাইরে অবস্থান করে৷ দ্বিতীয় অর্থ এও হয় যে, স্ত্রীদের কখনো এমন নীতি অবলম্বন করা উচিত নয় যার ফলে স্বামীর উপস্থিতিতে তাঁরা পর্দার নিয়ন্ত্রণ মেনে চলবে এবং স্বামীর অনুপস্থিতিতে গায়ের মাহরাম পুরুষদের সামনে পর্দা উঠিয়ে দেবে৷ তাদের এ কর্ম স্বামীর দৃষ্টির আড়ালে থাকতে পারে কিন্তু আল্লাহর দৃষ্টির আড়ালে থাকতে পারে না৷
১০৬. আল্লাহর পক্ষ থেকে নবীর প্রতি দরূদের অর্থ হচ্ছে, আল্লাহ নবীর প্রতি সীমাহীন করুণার অধিকারী৷ তিনি তার প্রশংসা করেন৷ তার কাজে বরকত দেন৷ তার নাম বুলন্দ করেন৷ তার প্রতি নিজের রহমতের বারি বর্ষণ করেন৷ ফেরেশতাদের পক্ষ থেকে তার প্রতি দরূদের অর্থ হচ্ছে, তারা তাকে চরমভাবে ভালোবাসেন এবং তার জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করেন, আল্লাহ যেন তাকে সর্বাধিক উচ্চ মর্যাদা দান করেন, তার শরীয়াতকে প্রসার ও বিস্তৃতি দান করেন এবং তাকে একমাত্র মাহমুদ তথা সবোর্চ্চ প্রশংসিত স্থানে পৌঁছিয়ে দেন৷ পূর্বাপর বিষয়বস্তুর প্রতি দৃষ্টি দিলে এ বর্ণনা পরস্পরায় একথা কেন বলা হয়েছ তা পরিষ্কার অনুভব করা যায়৷ তখন এমন একটি সময় ছিল যখন ইসলামের দুশমনরা এ সুস্পষ্ট জীবন ব্যবস্থার বিস্তার ও সম্প্রসারণের ফলে নিজেদের মনের আক্রোশ প্রকাশের জন্য নবী করীমের (সা) বিরুদ্ধে একের পর এক অপবাদ দিয়ে চলছিল এবং তারা নিজেরা একথা মনে করছিল যে, এভাবে কাঁদা ছিটিয়ে তারা তার নৈতিক প্রভাব নির্মূল করে দেবে৷ অথচ এ নৈতিক প্রভাবের ফলে ইসলাম ও মুসলমানরা দিনের পর দিন এগিয়ে চলছিল৷ এ অবস্থায় আলোচ্য আয়াত নাযিল করে আল্লাহ দুনিয়াকে একথা জানিয়ে দেন যে, কাফের, মুশরিক ও মুনাফিকরা আমার নবীর দুর্নাম রটাবার এবং তাকে অপদস্ত করার যতই প্রচেষ্টা চালাক না কেন শেষ পর্যন্ত তারা ব্যর্থ হবে৷ কারণ আমি তার প্রতি মেহেরবান এবং সমগ্র বিশ্ব জাহানের আইন ও শৃংখলা ব্যবস্থা যেসব ফেরেশতার মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে তারা সবাই তার সহায়ক ও প্রশংসাকারী৷ আমি যেখানে তার নাম বুলন্দ করছি৷ এবং আমার ফেরেশতারা তার প্রশংসাবলীর আলোচনা করছে সেখানে তার নিন্দাবাদ করে তারা কি লাভ করতে পারে? আমার রহমত ও বরকত তার সহযোগী এবং আমার ফেরেশতারা দিনরাত দোয়া করছে, হে রব্বুল আলামীন! মুহাম্মাদের (সা) মর্যাদা আরো বেশী উঁচু করে দাও এবং তার দীনকে আরো বেশী প্রসারিত ও বিকশিত করো৷ এ অবস্থায় তারা বাজে অস্ত্রের সাহায্যে তার কি ক্ষতি করতে পারে?
১০৭. অন্য কথায় এর অর্থ হচ্ছে, হে লোকেরা! মুহাম্মদ রসূলুল্লাহর বদৌলতে তোমরা যারা সঠিক পথের সন্ধান পেয়েছো তারা তার মর্যাদা অনুধাবন করো এবং তার মহা অনুগ্রহের হক আদায় করো৷ তোমরা মূর্খতার অন্ধকারে পথ ভুলে বিপথে চলছিলে, এ ব্যক্তি তোমাদের জ্ঞানের আলোক বর্তিকা দান করেছেন৷ তোমরা নৈতিক অধপতনের মধ্যে ডুবেছিলে, এ ব্যক্তি তোমাদের সেখান থেকে উঠিয়েছেন এবং তোমাদের মধ্যে যোগ্যতা সৃষ্টি করে দিয়েছেন, যার ফলে আজ মানুষ তোমাদেরকে ঈর্ষা করে৷ তোমরা বর্বর ও পাশবিক জীবন যাপন করছিলে, এ ব্যক্তি তোমাদের সর্বোত্তম মানবিক সভ্যতা ও সংস্কৃতির সাজে সুসজ্জিত করেছেন৷ তিনি তোমাদের ওপর এসব অনুগ্রহ করেছেন বলেই দুনিয়ার কাফের ও মুশরিকরা এ ব্যক্তির বিরুদ্ধে আক্রোশে ফেটে পড়ছে৷ নয়তো দেখো, তিনি কারো সাথে ব্যক্তিগতভাবে কোন দুর্ব্যবহার করেননি৷ তাই এখনি তোমাদের কৃতজ্ঞতার অনিবার্য দাবী হচ্ছে এই যে, তারা এ আপাদমস্তক কল্যান ব্রতী ব্যক্তিত্ত্বের প্রতি যে পরিমাণ হিংসা ও বিদ্বেষ পোষণ করে ঠিক এই পরিমাণ বরং তার চেয়ে বেশী ভালোবাসা তোমরা তার প্রতি পোষণ করো৷ তারা তাকে যে পরিমাণ ঘৃণা করে ঠিক ততটাই বরং তার চেয়ে বেশীই তোমরা তার প্রতি অনুরক্ত হবে৷ তারা তার যতটা নিন্দা করে ঠিক ততটাই বরং তার চেয়ে বেশী তোমরা তার প্রশংসা করো৷ তারা তা যতটা অশুভাকাংখী হয় তোমরা তার ঠিক ততটাই বরং তার চেয়ে বেশী শুভাকাংখী হয়ে যাও৷ এবং তার পক্ষে সেই একই দোয়া করো যা আল্লাহর ফেরেশতারা দিনরাত তার জন্য করে যাচ্ছে, হে দোজাহানের রব! তোমার নবী যেমন আমাদের প্রতি বিপুল অনুগ্রহ করেছেন তেমনি তুমিও তার প্রতি অসীম ও অগণিত রহমত বর্ষণ করো, তাঁর মর্যাদা দুনিয়াতেও সবচেয়ে বেশী উন্নত করো এবং আখেরাতেও তাকে সকল নৈকট্যলাভকারীদের চাইতেও বেশী নৈকট্য দান করো৷

এ আয়াতে মুসলমানদেরকে দু'টো জিনিসের হুকুম দেয়া হয়েছে৷ একটি হচ্ছে, "সাল্লু আলাইহে অর্থাৎ তার প্রতি দরূদ পড়ো৷ অন্যটি হচ্ছে, " ওয়া সাল্লিমূ তাসলীমা" অর্থাৎ তার প্রতি সালাম ও প্রশান্তি পাঠাও৷

"সালাত" শব্দটি যখন "আলা" অব্যয় সহকারে বলা হয় তখন এর তিনটি অর্থ হয়ঃ এক, কারো অনুরক্ত হয়ে পড়া! দুই, কারো প্রশংসা করা৷ তিন, কারো পক্ষে দোয়া করা৷ এ শব্দটি যখন আল্লাহর জন্য বলা হবে তখন একথা সুম্পষ্ট যে, তৃতীয় অর্থটির জন্য এটি বলা হবে না৷কারণ আল্লাহর অন্য কারো কাছে দোয়া করার ব্যাপারটি একেবারেই অকল্পনীয়৷ তাই সেখানে অবশ্যই তা হবে শুধুমাত্র প্রথম দুটি অর্থের জন্য৷ কিন্তু যখন এ শব্দ বান্দাদের তথা মানুষ ও ফেরেশতাদের জন্য বলা হবে তখন তা তিনটি অর্থেই বলা হবে৷ তার মধ্যে ভালোবাসার অর্থও থাকবে, প্রশংসার অর্থও থাকবে এবং দোয়া ও রহমতের অর্থও থাকবে৷ কাজেই মু'মিনদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পক্ষে "সাল্লু আলাইহে"- এর হুকুম দেয়ার অর্থ হচ্ছে এই যে, তোমরা তার ভক্ত-অনুরক্ত হয়ে যাও তার প্রশংসা করো এবং তার জন্য দোয়া করো৷

"সালাত" শব্দেরও দুটি অর্থ হয়৷ এক সবরকমের আপদ-বিপদ ও অভাব অনটন মুক্ত থাকা৷ এর প্রতিশব্দ হিসেবে আমাদের এখানে সালামতি বা নিরাপত্তা শব্দের ব্যবহার আছে, দুই শান্তি, সন্ধি ও অবিরোধিতা৷ কাজেই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পক্ষে "সাল্লিমূ তাসলিমা" বলার একটি অর্থ হচ্ছে, তোমরা তার জন্য পূর্ণ নিরাপত্তার দোয়া করো৷ আর এর দ্বিতীয় অর্থ হচ্ছে, তোমরা পুরোপুরি মনে প্রাণে তার সাথে সহযোগিতা করো, তার বিরোধিতা করা থেকে দূরে থাকো এবং তাঁর যথার্থ আদেশ পালনকারীতে পরিণত হও৷

এ হুকুমটি নাযিল হবার পর বহু সাহাবী রসূলুল্লাহু সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলেন, হে আল্লাহর রসূল! সালামের পদ্ধতি তো আপনি আমাদের বলে দিয়েছেন৷(অর্থাৎ নামাযে "আসসালামু আলাইকা আইয়ুহান নাবীয্যু ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ" এবং দেখা সাক্ষাত হলে "আসসালামু আলাইকা ইয়া রসূলুল্লাহ" বলা৷) কিন্তু আপনার প্রতি সালাত পাঠাবার পদ্ধতিটা কি? এর জবাবে নবী করীম (সা) বিভিন্ন লোককে বিভিন্ন সময় যেসব দরূদ শিখিয়েছোন তা আমি নীচে উদ্ধৃত করছিঃ

কা'ব ইবনে 'উজরাহ (রা) থেকেঃ

(..............)

এ দরূদটি সামান্য শাব্দিক বিভিন্নতা সহকারে হযরত কা'ব ইবনে উজ্ রাহ (রা:) থেকে বুখারী, মসলিম, আবু দাউদ, তিরমিযী, নাসাঈ, ইবনে মাজাহ, মুসনাদে ইমাম আহমাদ, ইবনে আবী শাইবাহ, আবদুর রাজ্জাক, ইবনে আবী হাতেম ও ইবনে জারীরে উদ্ধৃত হয়েছে৷‌‍

ইবনে আব্বাস (রা:) থেকে: তার থেকেও হালকা পার্থক্য সহকারে ওপরে বর্ণিত একই দরুদ উদ্ধৃত হয়েছে৷ (ইবনে জারীর)

আবু হুমাইদ সায়েদী (রা:) থেকে :

--------------

(মুআত্তা ইমাম মালেক, মুসনাদে আহমাদ, বুখারী, মুসলিম, নাসাঈ, আবু দাউদ ও ইবনে মাজাহ)

আবু মাসউদ বদরী (রা:) থেকে :

(....................)

(মালেক, মুসলিম, আবু দাউদ, তিরমিযী, নাসাঈ,আহমদ, ইবনে জারীর, ইবনে হাব্বান ও হাকেম)

আবু সাঈদ খুদরী (রা) থেকেঃ

(........................)

(আহমাদ, বুখারী, নাসাঈ ও ইবনে মাজাহ)

বুরাইদাতাল খুযাঈ থেকে :

--------------------

(আহমাদ, আবদ ইবনে হুমাইদ ও ইবনে মারদুইয়া)

হযরত আবু হুরাইরাহ (রা:) থেকে :

------------------(নাসাঈ)

হযরত তালহা (রা:) থেকে :

----------------------(ইবনে জারীর)

এ দরুদগুলো শব্দের পার্থক্য সত্ত্বেও অর্থ সবগুলোর একই৷ এগুলোর মধ্যে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে৷ এ বিষয়গুলো ভালোভাবে অনুধাবন করতে হবে৷

প্রথমত এসবগুলোতে নবী করীম (সা)মুসলমানদেরকে বলেছেন, আমার ওপর দরূদ পাঠ করার সবচেয়ে ভালো পদ্ধতি হচ্ছে এই যে, তোমরা আল্লাহর কাছে এ মর্মে দোয়া করো৷ হে আল্লাহ! তুমি মুহাম্মাদের (সা) ওপর দরূদ পাঠাও৷ অজ্ঞ লোকেরা, যাদের অর্থজ্ঞান নেই, তারা সংগে সংগেই আপত্তি করে বসে যে, এতো বড়ই অদ্ভুত ব্যাপার যে, আল্লাহ তো আমাদের বলছেন তোমরা আমার নবীর ওপর দরূদ পাঠ করো কিন্তু অপর দিকে আমরা আল্লাহকে বলছি তুমি দরূদ পাঠাও৷ অথচ এভাবে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম লোকদেরকে একথা বলেছেন যে, তোমরা আমার প্রতি "সালাতের" হক আদায় করতে চাইলেও করতে পারো না, তাই আল্লাহরই কাছে দোয়া চাও যেন তিনি আমার প্রতি দরূদ পাঠান৷ একথা বলা নিষ্প্রয়োজন, আমরা নবী করীমের (সা) মর্যাদা বুলন্দ করতে পারি না৷ আল্লাহই বুলন্দ করতে পারেন৷ আমরা নবী করীমের (সা)অনুগ্রহের প্রতিদান দিতে পারি না৷ আল্লাহই তার প্রতিদান দিতে পারেন৷ আমরা নবী করীমের (সা) কথা আলোচনাকে উচ্চমাপে পৌঁছাবার এবং তার দীনকে সম্প্রসারিত করার জন্য যতই প্রচেষ্টা চালাই না কেন আল্লাহর মেহেরবানী এবং তার সুযোগ ও সহায়তা দান ছাড়া তাতে কোন প্রকার সাফল্য অর্জন করতে পারি না৷ এমন কি নবী করীমের (সা) প্রতি ভক্তি ভালোবাসাও আমাদের অন্তরে আল্লাহরই সাহায্যে প্রতিষ্ঠিত করে তুলতে পারে৷ আল্লাহ আমাদের তা থেকে বাঁচান৷ কাজেই নবী করীমের (সা) ওপর দরূদের হক আদায় করার জন্য আল্লাহর কাছে তার প্রতি সালাত বা দরূদের দোয়া করা ছাড়া আর কোন পথ নেই৷ যে ব্যক্তি "আল্লাহুম্মা সাল্লে আলা মুহাম্মাদিন" বলে সে যেন আল্লাহ সমীপে নিজের অক্ষমতা স্বীকার করতে গিয়ে বলে, যে আল্লাহ! তোমার নবীর ওপর সালাত বা দরূদ পাঠানোর যে কর্তব্য আমার ওপর চাপানো আছে তা যথাযথভাবে সম্পন্ন করার সামর্থ আমার নেই, আমার পক্ষ থেকে তুমিই তা সম্পন্ন করে দাও এবং তা করার জন্য আমাকে যেভাবে কাজে নিয়োগ করতে হয় তা তুমি নিয়োগ করো৷

দ্বিতীয়ত নবী করীমের (সা) ভদ্রতা ও মহানুভবতার ফলে তিনি কেবল নিজেকেই এ দোয়ার জন্য নির্দিষ্ট করে নেননি৷ বরং নিজের সাথে তিনি নিজের পরিজন স্ত্রী ও পরিবারকেও শামিল করে নিয়েছেন৷ স্ত্রী ও পরিবার অর্থ সুস্পষ্ট আর পরিজন শব্দটি নিছক নবী করীমের (সা) পরিবারের লোকদের জন্য নির্দিষ্ট নয়৷ বরং এর মধ্যে এমনসব লোকও এসে যায় যারা তার অনুসারী এবং তার পথে চলেন৷ পরিজন অর্থে মূলে "আল" শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে৷ আরবী ভাষার দৃষ্টিতে "আল" ও "আহল" এর মধ্যে পার্থক্য হচ্ছে এই যে, কোন ব্যক্তির "আল" হচ্ছে এমন সব লোক যারা হয় তার সাথি, সাহায্যকারী ও অনুসারী, তারা তার আত্মীয় বা অনাত্মীয় হোক বা না হোক অবশ্যই তার আত্মীয়৷ কুরআন মজীদের ১৪টি স্থানে "আলে" ফেরাউন শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে৷ এর মধ্যে কোন জায়গাও আহল মানে ফেরাউনের পরিবারের লোকেরা নয়৷ বরং এমন সমস্ত লোক যারা হযরত মূসার মোকাবিলায় ফেরাউনের সমর্থক ও সহযোগী ছিল৷ (দৃষ্টান্ত স্বরূপ দেখুন সূরা বাকারার ৪৯-৫০, আলে ইমরানের ১১, আল আরাফের ১৩০ ও আল মু'মিনূনের ৪৬ আয়াত সমুহ) কাজেই এমন সমস্ত লোকই আলে মুহাম্মাদ (সা) এর বহির্ভূত হয়ে যায় যারা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আদর্শের অনুসারী নয়৷ চাই, তারা নবীর পরিবারের লোকই হোক না কেন৷ পক্ষান্তরে এমন সমস্ত লোক ও এর অন্তরভুক্ত হয়ে যায় যারা নবী করীমের (সা) পদাংক অনুসরণ করে চলে, চাই তারা নবী করীমের (সা) কোন দূরবর্তী রক্ত সম্পর্কিত আত্মীয় নাই হোক৷ তবে নবী পরিবারের এমন প্রত্যেতটি লোক সর্বতোভাবেই আলে মুহাম্মাদের (সা) অন্তরভুক্ত হবে যারা তার সাথে রক্ত সম্পর্ক ও রাখে আবার তার অনুসারীও৷

তৃতীয় তিনি যেসব দরুদ শিখিয়েছেন তার প্রত্যেকটিতেই অবশ্যই একথা রয়েছে এ যে, তার প্রতি এমন অনুগ্রহ করা হোক যা ইবরাহীম ও ইবরাহীমের পরিজনদের ওপর করা হয়েছিল৷ এ বিষয়টি বুঝতে লোকদের বিরাট সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছে৷ আলেমগণ এর বিভিন্ন জটিল ব্যাখ্যা (তাবীল) করেছেন৷ কিন্তু কোন একটি ব্যাখ্যাও ঠিকমতো গ্রহণীয় নয়৷ আমার মতে এর সঠিক ব্যাখ্যা হচ্ছে এই যে, (অব্শ্যই আল্লাহই সঠিক জানেন) আল্লাহ হযরত ইবরাহীমের প্রতি একটি বিশেষ করুণা করেন৷ আজ পর্যন্ত কারো প্রতি এ ধরনের করুণা প্রদর্শন করেননি৷ আর তা হচ্ছে এই যে, যারা নবুওয়াত, অহী ও কিতাবকে হিদায়াতের উৎস বলে মেনে নেয় তারা সবাই হযরত ইবরাহীমের (আ) নেতৃত্ত্বের প্রশ্নে একমত৷ এ ব্যাপারে মুসলমান, খৃষ্টান ও ইহুদির মধ্যে কোন ভেদাভেদ নেই৷ কাজেই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বক্তব্যের অর্থ হচ্ছে এই যে, যেভাবে হযরত ইবরাহীমকে মহান আল্লাহ সমস্ত নবীর অনুসারীদের নেতায় পরিণত করেছেন৷ অনুরূপভাবে আমাকেও পরিণত করুন৷ এমন কোন ব্যক্তি যে নবুওয়াত মেনে নিয়েছে সে যেন আমার নবুওয়াতের প্রতি ঈমান আনা থেকে বঞ্চিত না হয়৷

নবী করীমের (সা) প্রতি দরূদ পড়া ইসলামের সুন্নাত৷ তার নাম উচ্চারিত হলে তার প্রতি দরুদ পাঠ করা মুস্তাহাব৷ বিশেষ করে নামাযে দরূদ পড়া সুন্নাত৷ এ বিষয়ে সমগ্র আলেম সমাজ একমত৷ সমগ্র জীবনে নবী (সা) এর প্রতি একবার দরুদ পড়া ফরয, এ ব্যাপারে ইজমা অনুষ্ঠিত হয়েছে৷ কারণ আল্লাহ দ্ব্যর্থহীন ভাষায় এর হুকুম দিয়েছেন৷ কিন্তু এরপর দরূদের ব্যাপারে উলামায়ে কেরামের মধ্যে বিভিন্ন মত দেখা দিয়েছে৷

ইমাম শায়েঈ (রা) বলেন, নামাযে একজন মুসল্লী যখন শেষবার তাশাহহুদ পড়ে তখন সেখানে সালাতুন আলান নবী (.....) পড়া ফরয৷ কোন ব্যক্তি এভাবে না পড়লে তার নামায হবে না৷ সাহাবীগণের মধ্য থেকে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা), হযরত আবু মাসউদ আনসারী (রা), হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা) ও হযরত জাবের ইবনে আবদুল্লাহ (রা),তাবেঈদের মধ্য থেকে শা'বী, ইমাম মুহাম্মদ বাকের, মুহাম্মাদ ইবনে কা'ব কুরযী ও মুকাতিল ইবনে হাউয়ান এবং ফকীহগণের মধ্য থেকে ইসহাক ইবনে রাহওয়াইহও এ মতের প্রবক্তা ছিলেন৷ শেষের দিকে ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বাল ও মত অবলম্বন করেন৷

ইমাম আবু হানীফা (র), ইমাম মালেক (র) ও অধিকাংশ উলামা এ মত পোষণ করেন যে, দরূদ সারা জীবনে শুধুমাত্র একবার পড়া ফরয৷ এটি কালেমায়ে শাহাদাতের মতো৷ যে ব্যক্তি একবার আল্লাহকে ইলাহ বলে মেনে নিয়েছে এবং রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের রিসালাতের স্বীকৃতি দিয়েছে সে ফরয আদায় করে দিয়েছে৷ অনুরূপভাবে যে একবার দরূদ পড়ে নিয়েছে সে নবীর ওপর সালাত পাঠ করার ফরয আদায়ের দায়িত্ব মুক্ত হয়ে গেছে৷ এরপর তার ওপর আর কালেমা পড়া ফরয নয় এবং দরূদ পড়াও ফরয নয়৷

একটি দল নামাযে দরূদ পড়াকে সকল অবস্থায় ওয়াজিব গণ্য করেন৷ কিন্তু তারা তাশাহহুদের সাথে তাকে শৃংখলিত করেন না৷

অন্য একটি দলের মতে প্রত্যেক দোয়ায় দরূদ পড়া ওয়াজিব৷ আরো কিছু লোক নবী করীমের (সা) নাম এলে দরূদ পড়া ওয়াজিব বলে অভিমত পোষণ করেন৷ অন্য একটি দলের মতে এক মজলিসে নবী করীমের (সা) নাম যতবারই আসুক না কেন দরূদ পড়া কেবলমাত্র একবারই ওয়াজিব৷

কেবলমাত্র ওয়াজিব হবার ব্যাপারে এ মতবিরোধ৷ তবে দরূদের ফযীলত, তা পাঠ করলে প্রতিদান ও সওয়াব পাওয়া এবং তার একটি অনেক বড় সৎকাজ হবার ব্যাপারে তো সমস্ত মুসলিম উম্মাত একমত৷ যে ব্যক্তি ঈমানের সামান্যতম স্পর্শও লাভ করেছে তার এ ব্যাপারে কোন প্রশ্ন থাকতে পারে না৷ এমন প্রত্যেকটি মুসলমানের অন্তর থেকেই তো স্বাভাবিকভাবে দরূদ বের হবে যার মধ্যে এ অনুভুতি থাকবে যে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর পরে আমাদের প্রতি সবচেয়ে বড় অনুগ্রহকারী৷ মানুষের দিলে ঈমান ও ইসলামের মর্যাদা যত বেশী হবে তত বেশী মর্যাদা হবে তার দিলে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অনুগ্রহেরও ৷ আর মানুষ যত বেশী এ অনুগ্রহের কদর করতে শিখবে তত বেশীই সে নবী করীমের (সা) ওপর দরূদ পাঠ করবে৷ কাজেই বেশী বেশী দরূদ পড়া হচ্ছে একটি মাপকাঠি৷ এটি পরিমাণ করে জানিয়ে দেয় মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দীনের সংগে মানুষের সম্পর্ক কতটা গভীর এবং ঈমানের নিয়ামতের কতটা কদর তার অন্তরে আছে৷ এ কারণেই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ

(.........)

"যে ব্যক্তি আমার প্রতি দরূদ পাঠ করে ফেরেশতারা তার প্রতি দরূদ পাঠ করে যতক্ষণ সে দরূদ পাঠ করতে থাকে৷" (আহমাদ ও ইবনে মাজাহ)

(....................)

"যে আমার ওপর একবার দরূদ পড়ে আল্লাহ তার ওপর দশবার দরূদ পড়েন৷" (মুসলিম)

(..................)

"কিয়ামতের দিন আমার সাথে থাকার সবচেয়ে বেশী হকদার হবে সেই ব্যক্তি যে আমার ওপর সবচেয়ে বেশী দরূদ পড়বে৷" (তিরযিমী)

(...........)

"আমার কথা যে ব্যক্তির সামনে আলোচনা করা হয় এবং সে আমার ওপর দরূদ পাঠ করে না সে কৃপণ"৷ (তিরযিমী)

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি সাল্লাম ছাড়া অন্যের জন্য (................)অথবা(........) কিংবা এ ধরনের অন্য শব্দ সহকারে 'সালাত' পেশ করা জায়েয কিনা, এ ব্যাপারে উলামায়ে কেরামের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে৷ একটি দল, কাযী ঈয়াযের নাম এ দলের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য, একে সাধারণভাবে জায়েয মনে কের৷ এদের যুক্তি হচ্ছে, কুরআনে আল্লাহ নিজেই অ-নবীদের ওপর একাধিক জায়গায় সালাতের কথা সুস্পষ্টভাবে বলেছেন৷যেমন

(...........)

এভাবে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামাও একাধিকবার অ-নবীদের জন্য সালাত শব্দ সহকারে দোয়া করেন৷ যেমন একজন সাহাবীর জন্য তিনি দোয়া করেন(.........) (যে আল্লাহ! আবু আওফার পরিজনদের ওপর সালাত পাঠাও) হযরত জাবের ইবনে আবদুল্লাহর (রা) স্ত্রীর আবেদনের জবাবে বলেন,(.........) (আল্লাহ তোমার ও তোমার স্বামীর ওপর সালাত পাঠান)৷ যারা যাকাত নিয়ে আসতেন তাদের পক্ষে তিনি বলতেন,(........) (হে আল্লাহ ওদের ওপর সালাত পাঠাও)৷ হযরত সাদ ইবনে উবাদার পক্ষে তিনি বলেন, (.........)( হে আল্লাহ সা'দ ইবনে উবাদার (রা) পরিজনদের ওপর তোমার সালাত ও রহমত পাঠাও)৷ আবার মু'মিনের রূহ সম্পর্কে নবী করীম (সা) খবর দিয়েছেন যে, ফেরেশতারা তার জন্য দোয়া করেঃ(..........) কিন্তু মুসলিম উম্মাহর অধিকাংশের মতে এমনটি করা আল্লাহ ও তার রসূলে জন্য তো সঠিক ছিল কিন্তু আমাদের জন্য সঠিক নয়৷ তারা বলেন, সালাত ও সালামকে মুসলমানরা আম্বিয়া আলাইহিমুস সালামের জন্য নির্দিষ্ট করে দিয়েছে৷ এটি বর্তমানে তাদের ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে৷ তাই নবীদের ছাড়া অন্যদের জন্য এগুলো ব্যবহার না করা উচিত৷ এ জন্যই হযরত উমর ইবনে আবদুল আযীয একবার নিজের একজন শাসনকর্তাকে লিখেছিলেন, আমি শুনেছি কিছু বক্তা এ নতুন পদ্ধতি অবলম্বন করতে শুরু করেছেন যে, তারা সালাতু আলান নাবী এর মতো নিজেদের পৃষ্ঠপোষক ও সাহায্য কারীদের জন্যও সালাত শব্দ ব্যবহার করছেন৷ আমার এ পত্র পৌঁছে যাবার পরপরই তাদেরকে এ কাজ থেকে নিরস্ত করো এবং সালাতকে একমাত্র নবীদের জন্য নির্দিষ্ট করে অন্য মুসলমানদের জন্য দোয়া করেই ক্ষান্ত হবার নিদের্শ দাও৷ (রুহুল মা'আনী) অধিকাংশ আলেম এ মতও পোষণ করেন যে, নবী করীম (সা) ছাড়া অন্য কোন নবীর জন্যও "সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম" ব্যবহার করা সঠিক নয়৷
১০৮. আল্লাহকে কষ্ট দেবার অর্থ হয় দুটি জিনিস৷ এক, তার নাফরমানি করা৷ তার মোকাবিলায় কুফরী, শিরক ও নাস্তিক্যবাদের পথ অবলম্বন করা৷ তিনি যা হারাম করেছেন তাকে হালাল করা৷ দুই, তার রসূলকে কষ্ট দেয়া কারণ রসূলের আনুগত্য যেমন আল্লাহর আনুগত্য ঠিক তেমনি রসূলের নিন্দাবাদ আল্লাহর নিন্দাবাদের শামিল৷ রসূলের বিরোধিতা আল্লাহর বিরোধিতার সমার্থক৷ রসূলের নাফরমানি আল্লারই নাফরমানি৷
১০৯. এ আয়াতটি অপবাদের সংজ্ঞা নিরূপণ করে৷ অর্থাৎ মানুষের মধ্যে যে দোষ নেই অথবা যে অপরাধ মানুষ করেনি তা তার ওপর আরোপ করা৷ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও এটি সুস্পষ্ট করে দিয়েছেন৷ আবু দাউদ ও তিরমিযী বর্ণনা করেছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞেস করা হয়, গীবত কি? জবাবে বলেনঃ(..........) তোমার নিজের ভাইয়ের আলোচনা এমনভাবে করা যা সে অপছন্দ করে৷ জিজ্ঞেস করা হয়, যদি আমার ভাইয়ের মধ্যে সেই দোষ সত্যিই থেকে থাকে? জবাব দেনঃ

(...................)

"তুমি যে দোষের কথা বলছো তা যদি তার মধ্যে থাকে তাহলে তুমি তার গীবত করলে আর যদি তা তার মধ্যে না থাকে তাহলে তার ওপর অপবাদ দিলে৷"

এ কাজটি কেবলমাত্র একটি নৈতিক গোনাহই নয়, আখেরাতে যার শান্তি পাওয়া যাবে বরং এ আয়াতের দাবী হচ্ছে ইসলামী রাষ্ট্রের আইনেও মিথ্যা অপবাদ দান করাকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ গণ্য করতে হবে৷