(৩৩:৪১) হে ঈমানদারগণ! আল্লাহকে বেশী করে স্মরণ করো
(৩৩:৪২) এবং সকাল সাঁঝে তাঁর মহিমা ঘোষণা করতে থাকো৷৭৮
(৩৩:৪৩) তিনিই তোমাদের প্রতি অনুগ্রহ করেন এবং তাঁর ফেরেশতারা তোমাদের জন্য দোয়া করে, যাতে তিনি তোমাদেরকে অন্ধকার থেকে বের করে আলোকের মধ্যে নিয়ে আসেন, তিনি মুমিনদের প্রতি বড়ই মেহেরবান৷৭৯
(৩৩:৪৪) যেদিন তারা তাঁর সাথে সাক্ষাত করবে, তাদের অভ্যর্থনা হবে সালামের মাধ্যমে
(৩৩:৪৫) এবং তাদের জন্য আল্লাহ বড়ই সম্মানজনক প্রতিদানের ব্যবস্থা করে রেখেছেন৷৮০ হে নবী! ৮১ আমি তোমাকে পাঠিয়েছি সাক্ষী বানিয়ে, ৮২
(৩৩:৪৬) সুসংবাদদাতা ও ভীতি প্রদর্শনকারী করে ৮৩ আল্লাহর অনুমতিক্রমে তাঁর দিকে আহ্বানকারীরূপে ৮৪ এবং উজ্জ্বল প্রদীপ হিসেবে৷
(৩৩:৪৭) সুসংবাদ দাও তাদেরকে যারা ঈমান এনেছে (তোমার প্রতি) যে, তাদের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে রয়েছে বিরাট অনুগ্রহ৷
(৩৩:৪৮) আর কখনো দমিত হয়ো না কাফের ও মুনাফিকদের কাছে, পরোয়া করো না তাদের পীড়নের এবং ভরসা করো আল্লাহর প্রতি৷ আল্লাহই যথেষ্ট এজন্য যে, মানুষ তাঁর হাতে তার যাবতীয় বিষয় সোপর্দ করে দেবে৷
(৩৩:৪৯) হে ঈমানদারগণ! যখন তোমরা মুমিন নারীদেরকে বিয়ে করো এবং তারপর তাদেরকে স্পর্শ করার আগে তালাক দিয়ে দাও ৮৫ তখন তোমাদের পক্ষ থেকে তাদের জন্য কোনো ইদ্দত অপরিহার্য নয়, যা পুরা হবার দাবী তোমরা করতে পারো৷ কাজেই তাদেরকে কিছু অর্থ দাও এবং ভালোভাবে বিদায় করো৷৮৬
(৩৩:৫০) হে নবী! আমি তোমার জন্য হালাল করে দিয়েছি তোমার স্ত্রীদেরকে যাদের মহর তুমি আদায় করে দিয়েছো ৮৭ এবং এমন নারীদেরকে যারা আল্লাহ প্রদত্ত বাঁদীদের মধ্য থেকে তোমার মালিকানাধীন হয়েছে আর তোমার চাচাত, ফুফাত, মামাত, খালাত বোনদেরকে, যারা তোমার সাথে হিজরাত করেছে এবং এমন মুমিন নারীকে যে নিজেকে নবীর কাছে নিবেদন করেছে যদি নবী তাকে বিয়ে করতে চায়, ৮৮ এ সুবিধাদান বিশেষ করে তোমার জন্য, অন্য মুমিনদের জন্য নয়৷৮৯ সাধারণ মুমিনদের ওপর তাদের স্ত্রী ও বাঁদীদের ব্যাপারে আমি যে সীমারেখা নির্ধারণ করেছি তা আমি জানি, (তোমাকে এ সীমারেখা থেকে এজন্য আলাদা রেখেছি) যাতে তোমার কোনো অসুবিধা না হয়, ৯০ আর আল্লাহ ক্ষমাশীল ও মেহেরবান৷
(৩৩:৫১) তোমাকে ইখতিয়ার দেয়া হচ্ছে, তোমার স্ত্রীদের মধ্য থেকে যাকে চাও নিজের থেকে আলাদা করে রাখো, যাকে চাও নিজের সাথে রাখো এবং যাকে চাও আলাদা রাখার পরে নিজের কাছে ডেকে নাও৷ এতে তোমার কোন ক্ষতি নেই৷ এভাবে বেশী আশা করা যায় যে, তাদের চোখ শীতল থাকবে এবং তারা দুঃখিত হবে না আর যা কিছুই তুমি তাদেরকে দেবে তাতে তারা সবাই সন্তুষ্ট থাকবে৷৯১ আল্লাহ জানেন যা কিছু তোমাদের অন্তরে আছে এবং আল্লাহ সর্বজ্ঞ ও সহনশীল৷৯২
(৩৩:৫২) এরপর তোমার জন্য অন্য নারীরা হালাল নয় এবং এদের জায়গায় অন্য স্ত্রীদের আনবে এ অনুমতিও নেই, তাদের সৌন্দর্য তোমাকে যতই মুগ্ধ করুক না কেন,৯৩ তবে বাঁদীদের মধ্য থেকে তোমার অনুমতি আছে৷৯৪ আল্লাহ সবকিছু দেখাশুনা করছেন৷
৭৮. মুসলমানদেরকে এ উপদেশ দেয়াই এর উদ্দেশ্য যে, যখন শত্রুদের পক্ষ থেকে আল্লাহর রসূলের প্রতি ব্যাপকভাবে বিদ্রুপ ও নিন্দাবাদ করা হয় এবং আল্লাহর সত্য দীনকে ক্ষতিগ্রস্ত করার জন্য রসূলের বিরুদ্ধে অপপ্রচারের তুফান সৃষ্টি করা হয় তখন নিশ্চিন্তে এসব বাজে খিস্তি খেউড় শুনতে থাকা, নিজেই শত্রুদের ছাড়নো সন্দেহ সংশয়ে জড়িয়ে পড়া এবং জবাবে তাদেরকেও গালাগালি করতে থাকা মু'মিনদের কাজ নয়৷ বরং তাদের কাজ হচ্ছে, সাধারণ দিনগুলোর তুলনায় এসব দিনে বিশেষভাবে আল্লাহকে আরো বেশী করে স্মরণ করা৷ আল্লাহকে বেশী বেশী স্মরণ করার অর্থ ৬৩ টীকায় বর্ণনা করা হয়েছে৷ সকাল সাঝ আল্লাহ মহিমা ঘোষণা করার অর্থ হচ্ছে সর্বক্ষণ তাঁর তাসবীহ করা ৷ আর তাসবীহ করা মানে আল্লাহর পবিত্রতা বর্ণনা করা, নিছক তাসবীহর দানা হাতে নিয়ে গুণতে থাকা নয়৷
৭৯. মুসলমানদের মনে এ অনুভূতি সৃষ্টি করাই এর উদ্দেশ্য যে, কাফের ও মুনাফিকদের মনের সমস্ত জ্বালা ও আক্রোশের কারণ হচ্ছে আল্লাহর রহমত, যা তাঁর রসূলের বদৌলতে তোমাদের ওপর বর্ষিত হয়েছে৷ এরি মাধ্যমে তোমরা ঈমানী সম্পদ লাভ করেছো, কুফরী ও জাহেলিয়াতের অন্ধকার ভেদ করে ইসলামের আলোকে চলে এসেছো এবং তোমাদের মধ্যে এমন উন্নত নৈতিক বৃত্তি ও গুণাবলীর সৃষ্টি হয়েছে যেগুলোর কারণে অন্যদের থেকে তোমাদের সুস্পষ্ট শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিভাত হচ্ছে৷ হিংসুটেরা রসূলের ওপর এরি ঝাল ঝাড়ছে৷ এ অবস্থায় এমন কোন নীতি অবলম্বন করো না যার ফলে তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত হয়ে যাও৷অনুগ্রহের ভাব প্রকাশ করার জন্য মূলে সালাত.... শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে৷ "সালাত" শব্দটি যখন আরো অব্যয় সহকারে আল্লাহর পক্ষ থেকে বান্দাদের জন্য ব্যবহার করা হয় তখন এর অর্থ হয় রহমত, অনুগ্রহ, করুণা ও স্নেহশীষ৷ আর যখন এটি ফেরেশতাদের পক্ষ থেকে মানুষের জন্য ব্যবহৃত হয় তখন এর অর্থ হয় রহমতের দোয়া করা৷ অর্থাৎ ফেরেশতারা আল্লাহর কাছে মানুষের জন্য এই মর্মে দোয়া করে যে, হে আল্লাহ তুমি এদের প্রতি অনুগ্রহ করো এবং তোমার দানে এদেরকে আপ্লুত করে দাও৷ এভাবে ... এর অর্থ এও হয় যে, ...... অর্থাৎ আল্লাহ তাঁর বান্দাদের মধ্যে তোমাদেরকে খ্যাতি দান করেন এবং এমন পর্যায়ে উন্নীত করেন যার ফলে আল্লাহর সমুদয় সৃষ্টি তোমাদের প্রশংসা করতে থাকে এবং ফেরেশতারা তোমাদের প্রশংসা ও সুনামের আলোচনা করতে থাকে৷
৮০. কোন প্রকার জড়তা ও অস্পষ্টতা ছাড়াই এই দ্ব্যর্থহীন সত্যটিই হাদীস থেকে ফুটে উঠেছে ৷এই সুদীর্ঘ আলোচনার পর এ ব্যাপারে কোন প্রকার সন্দেহের অবকাশ থাকে না যে, "প্রতিশ্রুত মসীহ'র নামে আমাদের দেশে যে কারবার চালানো হচ্ছে তা একটি প্রকান্ড জালিয়াতি ছাড়া আর কিছুই নয় ৷

এ জালিয়াতির সবচাইতে হাস্যকর দিকটি এবার আমি উপস্থাপিত করতে চাই ৷যে ব্যক্তি নিজেকে এই ভবিষ্যদ্বানীতে উল্লিখিত মসীহ বলে ঘোষণা করেছেন, তিনি নিজে ঈসা ইবনে মারয়াম হবার জন্য নিম্নোক্ত রসালো বক্তব্যটি পেশ করেছেনঃ

"তিনি (অর্থাৎ আল্লাহ) বারাহীনে আহমদীয়ার তৃতীয় অংশে আমার নাম রেখেছন মারয়াম৷ আতপর যেমন বারাহীনে আহমদীয়ায় প্রকাশিত হয়েছে, দু'বছর পর্যন্ত আমি মারয়ামের গুনাবলী সহকারে লালিত হই--- অতপর --- মারয়ামের ন্যায় ঈসার রুহ আমার মধ্যে ফঁৎকারে প্রবেশ করানো এবং রূপকার্থে আমাকে গর্ভবতী করা হয়৷ অবশেষে কয়েকমাস পরে, যা দশ মাসের চাইতে বেশী হবে না, সেই এলকামের মাধ্যমে, যা বারাহীনে আহমদীয়ার চতুর্থ অংশে উল্লেখিত হয়েছে, আমাকে মারয়াম থেকে ঈসায় পরিণত করা হয়েছে৷ কাজেই এভাবে আমি হলাম ঈসা ইবনে মারয়াম"৷ (কিশতীয়ে নূহ ৮৭,৮৮,৮৯ পৃষ্ঠা)

অর্থাৎ প্রথমে তিনি মারয়াম হন অতপর নিজে নিজেই গর্ভবতী হন৷ তারপর নিজের পেট থেকে নিজেই ঈসা ইবনে মারয়াম রূপে জন্ম নেন৷ এরপরও সমস্যা দেখা দিল যে, হাদীসের বক্তব্য অনুযায়ী ঈসা ইবনে মারয়াম দামেশকে অবতরণ করবেন৷ দামেশক কয়েক হাজার বছর থেকে সিরিয়ার একটি প্রসিদ্ধ ও সর্বজন পরিচিত শহর৷ পৃথিবীর মানচিত্রে আজ ও এই শহরটি এই নামেই চিহ্নিত৷ কাজেই অন্য একটি রসাত্মক বক্তব্যের মাধ্যমে এ সমস্যাটির সমাধান দেয়া হয়েছেঃ

"উল্লখ্যে যে, আল্লাহর পক্ষ থেকে দামেশক শব্দের অর্থ আমার নিকট এভাবে প্রকাশ করা হয়েছে যে, এ স্থানে এমন একটি শহরের নাম দামেশক রাখা হয়েছে যেখানে এজিদের সভার সম্পন্ন ও অপবিত্র এজিদের অভ্যাস ও চিন্তন অনুসারী লোকদের বাস৷ ----- এই কাদীয়ান শহরটি এখানকার অধিকাংশ এজিদী স্বভাব সম্পন্ন লোকের অধিবাসের কারণে দামেশকের সাথে সামঞ্জস্য ও সম্পর্ক রাখে"৷ (এযালায়ে আওহাম, ফুটনোটঃ ৬৩ থেকে ৭৩ পৃষ্ঠা পর্যন্ত)

আর একটি জটিলতা এখনো রয়ে গেছে৷ হাদীসের বক্তব্য অনুসারে ইবনে মারয়াম একটি সাদা মিনারের নিকট অবতরণ করবেন৷ এ সমস্যার সমাধান সহজেই করে ফেলা হয়েছে অর্থাৎ মসীহ সাহেব নিজেই এসে নিজের মিনারটি তৈরি করে নিয়েছেন৷ এখন বলুন, কে তাকে বুঝাতে যাবে যে, হাদীসের বর্ণনা অনুসারে দেখা যায় ইবনে মারয়ামের অবতরণের পূর্বে মিনারটি সেখানে মওজুদ থাকবে৷ অথচ এখানে দেখা যাচ্ছে প্রতিশ্রুত মসীহ সাহেবের আগমনের পর মিনারটি তৈরি হচ্ছে৷

সর্বশেষে ও সবচাইতে জটিল সমস্যাটি এখানে রয়ে গেছে৷ অর্থাৎ হাদীসের বর্ণনা মতে ঈসা ইবনে মারয়াম (আ) লিড্ডার প্রবেশ দ্বারে দাজ্জালকে হত্যা করবেন৷ এ সমস্যার সমাধান করতে গিয়ে প্রথমে আবোলতাবোল অনেক কথাই বলা হয়েছে৷ কখনো স্বীকার করা হয়েছে যে, বায়তুল মুকাদ্দাসের একটি গ্রামের নাম লিড্ডা ( এযালায়ে আওহাম, আঞ্জুমানে আহমদীয়া, লাহোর কর্তৃক প্রকাশিত, ক্ষুদ্রাকার ২২০ পৃষ্ঠা) আবার কখনো বলা হয়েছে যে, "লিড্ডা এমন সব লোককে বলা হয় যারা অনর্থক ঝগড়া করে৷ ---- যখন দাজ্জালের অনর্থক ঝগড়া চরমে পৌছে যাবে তখন প্রতিশ্রুত মসীহর আবির্ভাব হবে এবং তার সমস্ত ঝগড়া শেষ করে দেবে" (এযালায়ে আওহাম, ৭৩০ পৃষ্ঠা)৷ কিন্তু এত করেও যখন সমস্যার সমাধান হলো না তখন পরিষ্কার বলে দেয়া হলো যে, লিড্ডা (আরবীতে লুদ) অর্থ হচ্ছে পাঞ্জাবের লুদিয়ানা শহর৷ আর লুদিয়ানার প্রবেশ দ্বারে দাজ্জালকে হত্যা করার অর্থ হচ্ছে, দুষ্টদের বিরোধিতা সত্ত্বেও মীর্জা গোলাম আহমদ সাহেবের হাতে এখানেই সর্বপ্রথম বাইয়াত হয়৷ (আলহুদা, ৯১ পৃষ্ঠা)

যে কোন সুস্থ বিবেক সম্পন্ন ব্যক্তি এসব বক্তব্য বর্ণনার নিরপেক্ষ পর্যালোচনা করলে এ সিদ্ধান্ত পৌঁছতে বাধ্য হবেন যে, এখানে প্রকাশ্য দিবলোকে মিথ্যুক ও বহুরূপীর অভিনয় করা হয়েছে৷
৮১. মুসলমানদেরকে উপদেশ দেবার পর এবার আল্লাহ তাঁর নবীকে সম্বোধন করে কয়েকটা সান্ত্বনার বাণী উচ্চারণ করেছেন৷ বক্তব্যের উদ্দেশ্য হচ্ছেঃ আপনাকে আমি এসব উন্নত মর্যাদা দান করেছি৷ এ বিরোধীরা অপবাদ ও মিথ্যাচারের তুফান সৃষ্টি করে আপনার কোন ক্ষতি করতে পারবে না৷ কারণ আপনার ব্যক্তিত্ব তার অনেক উর্ধে৷ কাজেই আপনি তাদের শয়তানির কারণে দুঃখ ভারাক্রান্ত হবেন না এবং তাদের প্রচারণাকে তিলার্ধও গুরুত্ব দেবেন না৷ নিজের আরোপিত দায়িত্ব পালন করে যেতে থাকেন এবং তাদের মনে যা চায় তাই বকবক করতে বলুন৷ এ সংগে পরোক্ষভাবে মু'মিন ও কাফের নির্বশেষে সকল মানুষকে বলা হয়েছে যে, কোন সাধারণ মানুষের সাথে তাদের মোকাবিলা হচ্ছে না বরং মহান আল্লাহ যাঁকে মর্যাদার উচ্চমার্গে পৌঁছিয়ে দিয়েছেন তেমনি এক মহান ব্যক্তিত্বের সাথে হচ্ছে তাদের মোকাবিলা৷
৮২. নবীকে সাক্ষী করার অত্যন্ত ব্যাপক অর্থবোধক৷ তিন ধরনের সাক্ষ প্রদান এর অন্তরভুক্তঃ

একঃ মৌখিক সাক্ষদান৷ অর্থাৎ আল্লাহর দীন যেসব সত্য ও মূলনীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত নবী তার সত্যতার সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে যাবেন এবং দুনিয়াবাসীকে পরিষ্কার বলে দেবেন, এটিই সত্য এবং এর বিরুদ্ধে যা কিছু আছে সবই মিথ্যা৷ আল্লাহর অস্তিত্ব ও তাঁর একত্ব, ফেরেশতাদের অস্তিত্ব, অহী নাযিল হওয়া, মৃত্যু পরবর্তী জীবনের অনিবার্যতা এবং জান্নাত ও জাহান্নামের প্রকাশ, দুনিয়া বাসীদের কাছে যতই অদ্ভুত মনে হোক না কেন এবং তারা একথাগুলোর বক্তাকে যতই বিদ্রুপ করুক বা তাকে পাগল বলুক না কেন, নবী কারো পরোয়া না করেই দাঁড়িয়ে যাবেন এবং সোচ্চার কন্ঠে বলে দেবেন, এসব কিছুই সত্য এবং যারা এসব মানে না তারা পথভ্রষ্ট৷ এভাবে নৈতিকতা ও সভ্যতা-সংস্কৃতির যে ধারণা, মূল্যবোধ, মূলনীতি ও বিধান আল্লাহ তাঁর সামনে সুস্পষ্ট করেছেন সেগুলোকে সারা দুনিয়ার মানুষ মিথ্যা বললেও এবং তারা তার বিপরীত পথে চললেও নবীর কাজ হচ্ছে সেগুলোকেই প্রকাশ্য জনসমক্ষে পেশ করবেন এবং দুনিয়ায় প্রচলিত তার বিরোধী যাবতীয় পদ্ধতিকে ভ্রান্ত ঘোষণা করবেন৷ অনুরূপভাবে আল্লাহর শরীয়াতে যা কিছু হালাল সারা দুনিয়া তাকে হারাম মনে করলেও নবী তাকে হালালই বলবেন৷ আর আল্লাহর শরীয়াতে যা হারাম সারা দুনিয়া তাকে হালাল ও ভালো গণ্য করলেও নবী তাকে হারামই বলবেন৷

দুইঃ কর্মের সাক্ষ৷ অর্থাৎ দুনিয়ার সামনে যে মতবাদ পেশ করার জন্য নবীর আবির্ভাব হয়েছে তিনি নিজের জীবনের সমগ্র কার্মকান্ডের মাধ্যমে তার প্রদর্শনী করবেন৷ যে জিনিসকে তিনি মন্দ বলেন তাঁর জীবন তার সকল প্রকার গন্ধমুক্ত হবে৷ যে জিনিসকে তিনি ভালো বলেন তাঁর চরিত্রে তা পূর্ণমাত্রায় দেদীপ্যমান হবে৷ যে জিনিসকে তিনি ফরয কলেন তা পালন করার ক্ষেত্রে তিনি সবচেয়ে অগ্রণী হবেন৷ যে জিনিসকে তিনি গোনাহ বলেন তা থেকে দূরো থাকার ব্যাপারে কেউ তাঁর সমান হবে না৷ যে জীবন বিধানকে তিনি আল্লাহ প্রদত্ত জীবন বিধান বলেন তাকে প্রতিষ্ঠিত করার ক্ষেত্রে তিনি কোন প্রচেষ্টার ত্রুটি করবেন না৷ তিনি নিজের দাওয়াতে ব্যাপারে কতটা সত্যনিষ্ঠ ও আন্তরিকতা তাঁর নিজের চরিত্র ও কার্যধারণাই সাক্ষ দেবে৷ তাঁর সত্তা তাঁর শিক্ষর এমন মুর্তিমান আদর্শ হবে, যা দেখে প্রত্যেক ব্যক্তি জানবে, যে দীনের দিকে তিনি দুনিয়াবাসীকে আহবান জানাচ্ছেন তা কোন মানের মানুষ তৈরি করতে চায়, কোন ধরনের চরিত্র সৃষ্টি তার লক্ষ্য এবং তার সাহায্যে সে কোন ধরনের জীবন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশা করে৷

তিনঃ পরকালীন সাক্ষ৷ অর্থাৎ আখেরাতে যখন আল্লাহর আদালত প্রতিষ্ঠিত হবে তখন নবী এ মর্মে সাক্ষ দেবেন, তাঁকে যে পয়গাম দেয়া হয়েছিল তা তিনি কোন প্রকার কাটছাঁট ও কমবেশী না করে হুবহু মানুষের কাছে পৌঁছিয়ে দিয়েছেন এবং তাদের সামনে নিজের কথা ও কর্মের মাধ্যমে সত্যকে সুস্পষ্ট করে তুলে ধরার ব্যাপারে সামান্যতম ত্রুটি করেননি৷ এ সাক্ষের ভিত্তিতে তার বানী মান্যকারী কি পুরস্কার পাবে এবং অমান্যকারী কোন ধরনের শাস্তির অধিকারী হবে তার ফায়সালা করা হবে৷

এ থেকে অনুমান করা যেতে পারে, নবী (সাঃ) কে সাক্ষদানের পর্যায়ে দাঁড় করিয়ে দিয়ে আল্লাহ তাঁর প্রতি কবত বড় দায়িত্ব অর্পণ করেছিলেন এবং এত উচ্চ স্থানে দাঁড়িয়ে থাকার জন্য কত মহান ব্যক্তিত্বের প্রয়োজন৷ একথা স্পষ্ট, কথা ও কর্মের মাধ্যমে আল্লাহর সত্য দীনের সাক্ষ প্রদান করার ক্ষেত্রে নবী (সাঃ) এর তিল পরিমাণও ত্রুটি হয়নি৷ তবেই তো তিনি আখেরাতে এই মর্মে সাক্ষ দিতে পারবেন, আমি লোকদের সামনে সত্যকে পুরোপুরি সুস্পষ্ট করে তুলে ধরেছিলাম৷ আর তবেই তো আল্লাহর প্রমাণ (হুজ্জাত) লোকদের ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাবে৷ অন্যথায় যদি সাক্ষ দেবার ব্যাপারে এখানে নাউযুবিল্লাহ তাঁর কোন ত্রুটি থেকে যায়, তাহলে না তিনি আখেরাতে তাদের জন্য সাক্ষী হতে পারবেন আর না সত্য অমান্যকারীদের অপরাধ সত্য প্রমাণিত হতে পারবে৷

কেউ কেউ এ সাক্ষদানকে এ অর্থে ব্যবহার করার চেষ্টা করেছেন যে, নবী (সাঃ) আখেরাতে লোকদের কাজের ওপর সাক্ষ দেবেন এবং এ থেকে তারা একথা প্রমাণ করেন যে, নবী করীম (সা) সকল মানুষের কার্যক্রম দেখছেন অন্যথায় না দেখে কেমন করে সাক্ষ দিতে পারবেন? কিন্তু কুরআন মজীদের দৃষ্টিতে এ ব্যাখ্যা একবারেই ভ্রান্ত৷ কুরআন আমাদের বলে, লোকদের কার্যক্রমের ওপর সাক্ষ কায়েম করার জন্য তো আল্লাহ অন্য একটি ব্যবস্থা করেছেন৷ এ উদ্দেশ্যে তাঁর ফেরেশতারা প্রত্যেক ব্যক্তির আমলনামা তৈরি করছে৷ দেখুন সূরা কাফ ১৭-১৮ আয়াত এবং আল কাহ্‌ফ ১৪৯ আয়াত) আর এ জন্য তিনি মানুষের নিজের অংগ প্র্রত্যংগেরও সাক্ষ নেবেন৷ (সূরা ইয়াসীন, ৬৫; হা মীম আস সাজদাহ, ২০-২১) বাকী রইলো নবীগণের ব্যাপার৷ আসলে নবীগণের কাজ বান্দাদের কার্যক্রমের ওপর সাক্ষ দেয়া নয় বরং বান্দাদের কাছে যে সত্য পৌঁছিয়ে দেয়া হয়েছিল, সে বিষয়ে তারা সাক্ষ দেবেন৷ কুরআন পরিষ্কার বলেঃ "যেদিন আল্লাহ সমস্ত রসূলকে সমবেত করবেন তারপর জিজ্ঞেস করবেন; তোমাদের দাওয়অতের কি জবাব দেয়া হয়েছিল? তখন তারা বলবে, আমাদের কিছুই জানা নেই৷ সমস্ত অজ্ঞাত ও অজানা কথাতো একমাত্র তুমিই জানো৷' (আল মা-য়েদাহ, ১০৯)

আর এ প্রসংগে হযরত ঈসা (আঃ) সম্পর্কে কুরআন বলে, যখন তাঁকে ঈসায়ীদের গোমরাহী সম্পর্কে প্রশ্ন করা হবে তখন তিনি বলবেনঃ

(আরবী)

"আমি যতদিন তাদের মধ্যে ছিলাম ততদিন পর্যন্ত তাদের ওপর সাক্ষী ছিলাম৷ যখন আপনি আমাকে উঠিয়ে নিয়েছেন তখন আপনিই তাদের তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন৷" (আল মা-য়েদাহ, ১১৭)

নবীগন যে মানুষের কাজের ব্যাপারে সাক্ষী হবে না এ সম্পর্কে এ আয়াতটি স্পষ্ট ৷ তাহলে তারা সাক্ষী হবেন কোন জিনিসের ? এর পরিষ্কার জবাব কুরআন এভাবে দিয়েছেঃ

--------------------

"আর হে মুসলমানগণ! এভাবে আমি তোমাদেরকে করেছি একটি মধ্যপন্থী উম্মাত, যাতে কোমরা লোকদের ওপর সাক্ষী হবে এবং রসূল তোমাদের ওপর সাক্ষী হন৷" (আল বাকারাহ, ১৪৩)

------------

"আর যেদিন আমি প্রত্যেক উম্মাতের মধ্যে তাদেরই মধ্যে থেকে একজন সাক্ষী উঠিয়ে দাঁড়া করিয়ে দেবো, যে তাদের ওপর সাক্ষ দেবে এবং (হে মাহাম্মাদ ) তোমাকে এদের ওপর সাক্ষী হিসেবে নিয়ে আসবো৷"(আন নাহল, ৮৯)

এ থেকে জানা যায় কিয়ামতের দিন নবী (সাঃ) এর উম্মাতকে এবং প্রত্যেক উম্মাতের ওপর সাক্ষদানকারী সাক্ষীদেরকে যে ধরনের সাক্ষদান করার জন্য ডাকা হবে নবী (সাঃ) এর সাক্ষ তা থেকে ভিন্ন ধরনের হবে না৷ একথা সুস্পষ্ট যে, এটা যদি কার্যাবলীর সাক্ষদান হয়ে থাকে, তাহলে সে সবের উপস্থিত ও দৃশ্যমান হওয়াও অপরিহার্য হয়ে দাঁড়ায়৷ আর মানুষের কাছে তার স্রষ্টার পয়গাম পৌঁছে গিয়েছিল কিনা কেবল এ বিষয়ের সাক্ষ দেয়ার জন্য যদি এ সাক্ষীদেরকে ডাকা হয়, তাহলে অবশ্যই নবী করীমকে (সা)ও এ উদ্দেশ্যেই পেশ করা হবে৷ বুখারী, মুসলিম, তিরমিযী, ইবনে মাজাহ ও ইমাম আহমাদ প্রমুখগণ আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ, আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস, আবুদ দারদা, আনাস ইবনে মালেক ও অন্যান্য বহু সাহাবা থেকে যে হাদসিগুলো উদ্ধৃত করেছেন সেগুলোও এ বিষয়বস্তুর সমর্থক সেগুলোর সম্মিলিত বিষয়বস্তু হচ্ছেঃ নবী (সাঃ) কিয়ামতের দিন দেখবেন তাঁর কিছু সাহাবীকে আনা হচ্ছে কিন্তু তারা তাঁর দিকে না এসে অন্যদিকে যাচ্ছে অথবা তাদেরকে ধাক্কা দিয়ে অন্য দিকে নিয়ে যাওয়া হবে৷নবী করীম (সা) তাদেরকে দেখে নিবেদন করবেন, হে আল্লাহ ! এরা তো আমার সাহাবী৷ একথায় আল্লাহ বলবেন, তুমি জানো না তোমার পর এরা কি সব কাজ করেছে৷ এ বিষয়বস্তুটি এত বিপুল সংখ্যক সাহাবী থেকে এত বিপুল সংখ্যক সনদ সহকারে বর্ণিত হয়েছে যে, এর নির্ভুলতায় সন্দেহ পোষণ করার কোন অবকাশ নেই৷ আর এ থেকে একথাও সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে, নবী (সাঃ) নিজের উম্মাতের প্রত্যেক ব্যক্তির এবং তার প্রত্যেকটি কাজের দর্শক মোটেই নন৷ তবে যে হাদীসে বলা হয়েছে যে, নবী (সা) এর সামনে তাঁর উম্মাতের কার্যাবলী পেশ করা হয়ে থাকে সেটি কোনক্রমেই এর সাথে সংঘর্ষশীল নয়৷ কারণ তার মূল বক্তব্য শুধুমাত্র এতটুকু যে, মহান আল্লাহ নবী করীমকে (সা) তাঁর উম্মাতের কার্যাবলী সম্পর্কে অবহিত রাখেন৷ তার এ অর্থ কোথা থেকে পাওয়া যায় যে, তিনি প্রত্যেক ব্যক্তির কার্যকলাপ চাক্ষুষ প্রত্যক্ষ করছেন ?
৮৩. এখানে এ পার্থক্যটা সামনে রাখতে হবে যে, কোন ব্যক্তিকে স্বে‌চ্ছাকৃতভাবে ঈমান ও সৎকাজের জন্য শুভ পরিণামের সুসংবাদ দেয়া এবং কুফরী ও অসৎকাজের অশুভ পরিণামের ভয় দেখানো এক কথা এবং কারো আল্লাহর পক্ষ থেকে সুসংবাদদাতা ও ভীতি প্রদর্শনকারী হয়ে প্রেরিত হওয়া সম্পূর্ণ আলাদা কথা৷ যে ব্যক্তিই আল্লাহর পক্ষ থেকে এ পদে নিযুক্ত হবেন তাঁর নিজের সুসংবাদ ও ভীতি প্রদর্শনের পেছনে অবশ্যই কিছু ক্ষমতা থকে, যার ভিত্তিতে তার সুসংবাদ ও সতর্কীকরণগুলো আইনের মর্যাদা লাভ করে৷ তার কোন কাজের সুসংবাদ দেয়ার অর্থ হয়, যে সর্বময় ক্ষমতা সম্পন্ন শাসকের পথ থেকে তিনি প্রেরিত হয়েছেন তিনি এ কাজটি পছন্দনীয় ও প্রতিদান লাভের যোগ্য বলে ঘোষণা দিচ্ছেন৷ কাজেই তা নিশ্চয়ই ফরয বা ওয়াজিব বা সুস্তাহাব এবং কাজটি যিনি করেছেন তিনি নিশ্চয়ই প্রতিদান লাভ করবেন৷ আর তার কোন কাজের অশুভ পরিণামের খবর দেয়ার অর্থ হয়, সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী সত্তা সে কাজ করতে নিষেধ করছেন, কাজেই তা অবশ্যই হারাম ও গোনাহের কাজ এবং নিশ্চিতভাবেই সে কার্য সম্পাদনকারী শাস্তি লাভ করবে৷ কোন অনিয়োগকৃত সতর্ককারী ও সুসংবাদ দানকারী কখনো এ মর্যাদা লাভ করবে না৷
৮৪. এখানেও একজন সাধারণ প্রচারকের প্রচার ও নবীর প্রচারের মধ্যেও সেই একই পার্থক্য রয়েছে যেদিকে ওপরে ইংগিত করা হয়েছে৷ প্রত্যেক প্রচারকই আল্লাহর দিকে দাওয়াত দেন এবং দিতে পারেন কিন্তু তারা আল্লাহর পক্ষ থেকে নিযুক্ত হন না৷ পক্ষান্তরে নবী আল্লাহর হুকুম দাওয়াত দিতে এগিয়ে যান৷ তাঁর দাওয়াত নিছক প্রচার নয় বরং তার পেছনেও থাকে তার প্রেরক রব্বুল আলামীনের শাসন কর্তৃত্বের ক্ষমতা ৷ তাই আল্লাহ প্রেরিত আহবায়কের বিরোধিতা স্বয়ং আল্লাহর বিরুদ্ধে যুদ্ধ হিসেবে গণ্য হয়৷ দুনিয়ার কোন রাষ্ট্রের সরকারী কার্যসম্পাদনকারী সরকারী কর্মচারীকে বাধা দেয়া যেমন সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ মনে করা হয় এও ঠিক তেমনি৷
৮৫. এ বাক্যটিতে একথা সুস্পষ্ট যে, এখানে নিকাহ তথা বিবাহ শব্দটি থেকে শুধুমাত্র বিবাহ বন্ধনের কথাই প্রকাশ হয়েছে৷ আরবী ভাষায় 'নিকাহ' শব্দটির আসল অর্থ কি অভিধানবিদদের মধ্যে এ ব্যপারে বহুতর মতবিরোধ দেখা গেছে৷ একটি দল বলে, এ শব্দটির মধ্যে শাব্দিকভাবে সংগম ও বিয়ে উভয় অর্থ প্রচ্ছন্নভাবে রয়েছে৷ তৃতীয় একটি দল বলে, এর আসল অর্থ হচ্ছে এক জোড়া মানব মানবীর বিবাহ এবং সংগমের জন্য একে রূপকভাবে ব্যবহার করা হয়৷ চতুর্থ দলটি বলে, এর আসল অর্থ হচ্ছে সংগম এবং বিয়ের জন্য একে রূপকভাবে ব্যবহার করা হয়৷ এর প্রমাণ হিসেবে প্রত্যেক দল আরবীয় প্রবাদ ও বাগধারা থেকে দৃষ্টান্ত পেশ করার চেষ্টা করেছেন৷ কিন্তু রাগেব ইস্‌ফাহানী অত্যন্ত জোরের সাথে দাবী করেছেনঃ

(আরবী)

"নিকাহ শব্দটির আসল অর্থ হচ্ছে বিয়ে, তারপর এ শব্দটিকে রূপক অর্থে সহবাসের জন্য ব্যবহার করা হয়েছে৷ এটা একবারেই অসম্ভব যে, এর আসল অর্থ হবে সহবাস এবং একে রূপক অর্থে বিয়ের জন্য ব্যবহার করা হয়েছে৷"

এর সপক্ষে যুক্তি হিসেবে তিনি বলেন, আরবী ভায়ায় বা দুনিয়ার অন্যান্য ভাষায় সহবাস-এর জন্য প্রকৃতপক্ষে যতগুলো শব্দ তৈরী করা হয়েছে তার সবই অশ্লীল ৷ কোন রুচিশীল ব্যক্তি কোন ভদ্র মজলিসে সেগুলো মুখে উচ্চারণ করাও পছন্দ করেন না৷ এখন যে শব্দটিকে প্রকৃতপক্ষে এ কাজের জন্য তৈরি করা হয়েছে মানুষের সমাজ তাকে বিয়ের জন্য রূপক হিসেবে ব্যবহার করবে, এটা কেমন করে সম্ভব? এ অর্থটি প্রকাশ করার জন্য তো প্রত্যেক ভাষায় রুচিশীল শব্দই ব্যবহার করা হয়, অশ্লীল শব্দ নয়৷

কুরআন ও সুন্নাতের ব্যাপারে বলা যায়, সেখানে নিকাহ একটি পারিভাষিক শব্দ৷ সেখানে এর অর্থ হচ্ছে নিছক বিবাহ অথবা বিবাহোত্তর সংগম৷ কিন্তু বিবাহ বিহীন সংগম অর্থে একে কোথাও ব্যবহার করা হয়নি৷ এ ধরনের সংগমকে তো কুরআন ও সুন্নাত বিয়ে নয়, যিনা ও ব্যভিচার বলে৷
৮৬. এটি একটি একক আয়াত৷ সম্ভবত সে সময় তালাকের কোন সমস্যা সৃষ্টি হবার কারণে এটি নাযিল হয়েছিল৷ তাই পূর্ববর্তী বর্ণনা ও পরবর্তী বর্ণনার ধারাবাহিকতার মধ্যে একে রেখে দেয়া হয়েছে৷ এ বিন্যাসের ফলে একথা স্বতস্ফূর্তভাবেই পরিষ্কার হয়ে যায় যে, এটি পূর্ববর্তী ভাষণের পরে এবং পরবর্তী ভাষণের পূর্বে নাযিল হয়৷

এ আয়াত থেকে যে আইনগত বিধান বের হয় তার সার সংক্ষেপ হচ্ছেঃ

একঃ আয়াতে যদিও "মু'মিন নারীরা" শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে, যা থেকে বাহ্যত অনুমান করা যেতে পারে যে, এখানে যে আইনের বর্ণনা দেয় হয়েছে কিতাবী (ইহুদী ও খৃস্টান) নারীদের ব্যাপারে সে আইন কার্যকর নয়৷ কিন্তু উম্মাতের সকল উলামা এ ব্যাপারে একমত হয়েছেন যে, পরোক্ষভাবে কিতাবী নারীদের জন্যও এ একই হুকুম কার্যকার হবে৷ অর্থাৎ কোন আহলি কিতাব নারীকে যদি কোন মুসলমান বিয়ে করে তাহলে তার তালাক, সহর, ইদ্দত এবং তাকে তালাকের পরে কাপড়-চোপড় দেবার যাবতীয় বিধান একজন মু'মিন নারীকে বিয়ে করার অবস্থায় যা হয়ে থাকে তাই হবে৷ উলামা এ ব্যাপারে একমত, আল্লাহ এখানে বিশেষভাবে যে কেবলমাত্র মু'মিন নারীদের কথা বলেছেন এর আসল উদ্দেশ্য হচ্ছে কেবলমাত্র এ বিষয়ের প্রতি ইংগিত করা যে, মুসলমানদের জন্য মু'মিন নারীরাই উপযোগী৷ ইহুদি ও খৃস্টান নারীদেরকে বিয়ে করা অবশ্যই জায়েয কিন্তু তা সংগত ও পছন্দীয় নয়৷ অন্যকথায় বলা যায়, কুরআনের এ বর্ণনারীতি থেকে একথা সুস্পষ্ট হয়ে যে, মু'মিনগণ মু'মিন নারীদেরকে বিয়ে করবে আল্লাহ এটাই চান৷

দুইঃ "স্পর্শ করা বা হাত লাগানো৷" এর আভিধানিক অর্থ তো হয় নিছক ছুঁয়ে দেয়া ৷ কিন্তু এখানে এ শব্দটি রূপক অর্থে সহবাসের জন্য ব্যবহার করা হয়েছে৷ এ দিক দিয়ে আয়াতের বাহ্যিক অর্থের দাবী হচ্ছে এই যে, যদি স্বামী সহবাস না করে থাকে, তাহলে সে স্ত্রীর সাথে একান্তে (খালওয়াত) অবস্থান করলেও বরং তার গায়ে হাত লাগালেও এ অবস্থায় তালাক দিলে ইদ্দত অপরিহার্য হবে না৷ কিন্তু ফকীহগণ সতর্কতামূলকভাবে এ বিধান দিয়েছেন যে, যদি "খালওয়াতে সহীহা" তথা সঠিক অর্থে অকান্তে অবস্থান সম্পন্ন হয়ে গিয়ে থাকে (অর্থাৎ যে অবস্থায় স্ত্রী সংগম সম্ভব হয়ে থাকে) তাহলে এরপর তালাক দেয় হলে ইদ্দত অপরিহার্য হবে এবং একমাত্র এমন অবস্থায় ইদ্দত পালন করতে হবে না যখন খালওয়াতের (একান্তে অবস্থান ) পূর্বে তালাক দিয়ে দেয়া হবে৷

তিনঃ খালওয়াতের পূর্বে তালাক দিলে ইদ্দত নাকচ হয়ে যাবার অর্থ হচ্ছে, এ অবস্থায় পুরুষের রুজু করার অর্থাৎ স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেবার অধিকার খতম হয়ে যায় এবং তালাকের পরপরই যাকে ইচ্ছা বিয়ে করার অধিকার নারীর থাকে৷ কিন্তু মনে রাখতে হবে, এ বিধান শুধুমাত্র খালওয়াতের পূর্বে তালাক দেবার সাথে সংশ্লিষ্ট৷ যদি খালওয়াতের পূর্বে স্বামী মারা যায় তাহলে এ অবস্থায় স্বামীর মৃত্যুর পর যে ইদ্দত পালন করতে হয় তা বাতিল হয়ে যাবে না বরং বিবাহিতা স্বামীর সাথে সহবাস করেছে এমন স্ত্রীর জন্য চারমাস দশ দিনের ইদ্দত পালন করা ওয়াজিব হয় তাই তার জন্যও ওয়াজিব হবে৷ (ইদ্দত বলতে এমন সময়কাল বুঝায় যা অতিবাহিত হবার পূর্বে নারীর জন্য দ্বিতীয় বিবাহ জায়েয নয়)

চারঃ (আরবী) (তোমাদের জন্য তাদের ওপর কোন ইদ্দত অপরিহার্য হবে না৷) এ শব্দগুলো একথা প্রকাশ করে যে, ইদ্দত হচ্ছে স্ত্রীর ওপর স্বামীর অধিকার৷ কিন্তু এর এ অর্থ নয় যে, এটা শুধুমাত্র পুরুষের অধিকার৷ আসলে এর মধ্যে রয়েছে আরো দু'টি অধিকার৷ একটি হচ্ছে সন্তানের অধিকার এবং অন্যটি আল্লাহর বা শরীয়াতের অধিকার৷ পুরুষের অধিকার হচ্ছে এ জন্য যে, এ অন্তরবর্তীকালে তার রুজু করার অধিকার থাকে৷ তাছাড়া আরো এ জন্য যে, তার সন্তানের বংশ প্রমাণ ইদ্দত পালনকালে স্ত্রীর গর্ভবতী হওয়া বা না হওয়ার বিষয়টি প্রকাশ হওয়ার ওপর নির্ভরশীল৷ সন্তানের অধিকার এর মধ্যে শামিল হবার কারণ হচ্ছে এই যে, পিতা থেকে পুত্রের বংশ-ধারা প্রমাণিত হওয়া তার আইনগত অধিকার প্রতিষ্ঠিত হবার জন্য জরুরী এবং তার নৈতিক মর্যাদাও তার বংশধারা সংশয়িত না হওয়ার ওপর নির্ভরশীল৷ তারপর এর মধ্যে আল্লাহর অধিকার (বা শরীয়াতের অধিকার) এ জন্য শামিল হয়ে যায় যে, যদি লোকদের নিজেদের ও নিজেদের সন্তানদের অধিকারের পরোয়া না-ই বা হয়ে তবুও আল্লাহর শরীয়াত এ অধিকারগুলোর সংরক্ষণ জরুরী গণ্য করে৷ এ কারণেই কোন স্বামী যদি স্ত্রীকে একথা লিখে দেয় যে, আমার মৃত্যুর পর অথবা আমার থেকে তালাক নেবার পর তোমার ওপর আমার পক্ষ থেকে কোন ইদ্দত ওয়াজিব হবে না তবুও শরীয়াত কোন অবস্থায়ই তা বাতিল করবে না৷

পাঁচঃ (আরবী) (এদেরকে কিছু সম্পদ দিয়ে ভালো মতো বিদায় করে দাও) এ হুকুমটির উদ্দেশ্য পূর্ণ করতে হবে দু'টি পদ্ধতির মধ্য থেকে কোন একটি পদ্ধতিতে ৷ যদি বিয়ের সময় মহর নির্ধারিত হয়ে থাকে এবং তারপর খালওয়াতের (স্বামী স্ত্রীর একান্ত অবস্থান) পূর্বে তালাক দেয়া হয়ে গিয়ে থাকে এবং তারপর খালওয়াতের (স্বামী স্ত্রীর একান্ত অবস্থান) পূর্বে তালাক দেয়া হয়ে গিয়ে থাকে তাহলে এ অবস্থায় অর্ধেক মহর দেয়া ওয়াজিব হয়ে যাবে যেমন সূরা বাকারার ২৩৭ আয়াতে বলা হয়েছে এ বেশী আর কিছু দেয়া অপরিহার্য নয় কিন্তু মুস্তাহাব৷ যেমন এটা পছন্দনীয় যে, অর্ধেক মহর দেবার সাথে সাথে বিয়ের করে সাজাবার জন্য জন্য স্বামী তাকে যে কাপড় চোপড় দিয়ে ছিল তা তার কাছে থাকতে দেবে অথবা যদি আরো কিছু জিনিসপত্র বিয়ের সময় তাকে দেয়া হয়ে থাকে তাহলে সেগুলো ফেরত নেয়া হবে না৷ কিন্তু যদি বিয়ের সময় মহর নির্ধারিত না করা হয়ে থাকে তাহলে এ অবস্থায় স্ত্রীকে কিছু না কিছু দিয়ে বিদায় করে দেয়া ওয়াজিব৷ আর এ কিছু না কিছু হতে হবে মানুষের মর্যাদা ও সমর্থ অনুযায়ী৷ যেমন সূরা বাকারার ২৩৬ আয়াতে বলা হয়েছে৷ আলেমগণের একটি দল এ মতের প্রবক্তা যে, মহর নির্ধারিত থাকা বা না থাকা অবস্থায়ও অবশ্যই "মুতা-ই-তালাক" দেয়া ওয়াজিব৷ (ইসলামী ফিকাহর পরিভাষায় মুতা-ই-তালাক এমন সম্পদকে বলা হয় যা তালাক দিয়ে বিদায় করার সময় নারীকে দেয়া হয়৷)

ছয়ঃ ভালোভাবে বিদায় করার অর্থ কেবল "কিছু না কিছু" দিয়ে বিদায় করা নয় বরং একথাও এর অন্তরভুক্ত যে, কোন প্রকার অপবাদ না দিয়ে এবং বেইজ্জত না করে ভদ্রভাবে আলাদা হয়ে যাওয়া৷ কোন ব্যক্তির যদি স্ত্রী পছন্দ না হয় অথবা অন্য কোন অভিযোগ দেখা দেয় যে কারণে সে স্ত্রীকে রাখতে চায় না, তাহলে ভালো লোকদের মতো সে তালাক দিয়ে বিদায় করে দেবে৷ এমন যেন না হয় যে, সে তার দোষ লোকদের সামনে বলে বেড়াতে থাকবে এবং তার বিরুদ্ধে এমনভাবে অভিযোগের দপ্তর খুলে বসবে যে অন্য কেউ আর তাকে বিয়ে করতে চাইবে না৷ কুরআনের এ উক্তি থেকে একথা সুস্পষ্টভাবে প্রকাশ হয়ে যায় যে, তালাকের প্রয়োগকে কোন পাঞ্চায়েত বা আদালতের অনুমতির সাথে সংশ্লিষ্ট করা আল্লাহর শরীয়াতের জ্ঞান ও কল্যাণনীতির সম্পূর্ণ পরিপন্থী৷ কারণ এ অবস্থায় " ভালোভাবে বিদায় দেবার " কোন সম্ভাবনাই থাকে না৷ বরং স্বামী না চাইলেও অপমান, বেইজ্জতি ও দুর্নামের ঝাক্কি পোহাতে হবেই৷ তাছাড়া পুরুষের তালাক দেবার ইখতিয়ার কোন পঞ্চায়েত বা আদালতের অনুমতি সাপেক্ষ হবার কোন অবকাশই আয়াতের শব্দাবলীতে নেই৷ আয়াত একদম স্পষ্টভাবে বিবাহকারী পুরুষকে তালাকের ইখতিয়ার দিচ্ছে এবং তার ওপরই দায়িত্ব আরোপ করছে, সে যদি হাত লাগাবার পূর্বে স্ত্রীকে ত্যাগ করতে চায় তাহলে অবশ্যই অর্ধেক মহর দিয়ে বা নিজের সামর্থ অনুযায়ী কিছু সম্পদ দিযে তাকে বিদায় করে দেবে৷ এ থেকে পরিষ্কারভাবে আয়াতের এ উদ্দেশ্য জানা যায় যে, তালাককে খেলায় পরিণত হওয়ার পথ রোধ করার জন্য পুরুষের ওপর আর্থিক দায়িত্বের একটি বোঝা চাপিয়ে দেয়া হয়েছে৷ এর ফলে সে নিজের তালাকের ইখতিয়ার ভেবে চিন্তে ব্যাবহার করবে এবং পরিবারের আভ্যন্তরীণ ব্যপারে বাইরের কোন হস্তক্ষেপও হতে পারবে না৷ বরং স্বামী কেন স্ত্রীকে তালাক দিচ্ছে একথা কাউকে বলতে বাধ্য হবার কোন সুযোগই আসবে না৷

সাতঃ ইবনে আব্বাস (রা), সাঈদ ইবনুল মুসাইয়েব, হাসান বাসরী আলী ইবনুল হোসাইন (যয়নুল আবেদীণ) ইমাম শাফেঈ ও ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল আয়াতের "যখন তোমরা বিয়ে করো এবং তারপর তালাক দিয়ে দাও" শব্দাবলী থেকে এ বিধান নির্ণয় করেছেন যে, তালাক তখনই সংঘটিত হবে যখন তার পূর্বে বিয়ে অনুষ্ঠিত হয়ে যায়৷ বিয়ের পূর্বে তালাক কার্যকর হয় না৷ কাজেই যদি কোন ব্যক্তি বলে, আমি অমুক মেয়েকে বা অমুক গোত্র বা জাতির মেয়েকে অথবা কোন মেয়েকে বিয়ে করলে তাকে তালাক " তাহলে তার এ উক্তি অর্থহীন পেশ করা যায়, রসূলে করীম (সা) বলেছেনঃ আরবী......."ইবনে আদম যে জিনিসের মালিক নয় তার ব্যাপারে তালাকের ইখতিয়ার ব্যবহার করার অধিকার তার নেই৷ আহমাদ, আবু দাউদ, তিরমিযি ও ইবনে মাজাহ৷ তিনি আরো বলেছেনঃ............ "বিয়ের পূর্বে কোন তালাক নেই" (ইবনে মাজাহ) কিন্তু ফকীহদের একটি বড় দল বলেন, এ আয়াত ও এ হাদীসগুলো কেবলমাত্র এখনই প্রযুক্ত হবে যখন কোন ব্যক্তি তার সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়নি এমন কোন মেয়েকে এভাবে বলে, তোমাকে তালাক অথবা আমি তোমাকে তালাক দিলাম৷ এ উক্তি যদি সে এভাবে বলে, যদি আমি তোমাকে বিয়ে করি তাহলে তোমাকে তালাক", তাহলে এটা বিয়ে করার পূর্বে তালাক দেয়া নয় বরং আসলে সে এ বিষয়ের সিদ্ধান্ত নিচ্ছে এবং ঘোষনা করছে যে, যখন সেই মেয়েটির সাথে তার বিয়ে হবে তখন তার ওপর তালাক অনুষ্ঠিত হবে৷ এ উক্তি অর্থহীন, উদ্ভটও প্রভাবহীন হতে পারে না৷ বরং যখনই মেয়েটিকে সে বিয়ে করবে তখনই তার ওপর তালাক সংঘটিত হয়ে যাবে৷ যেসব ফকীহ এ মত অবলম্বন করেছেন তাঁদের মধ্যে আবার এ বিষয়ে মতবিরোধ হয়েছে যে, এ ধরনের তালাকের প্রয়োগ সীমা কতখানি৷

ইমাম আবু হানীফা মুহাম্মাদ ও ইমাম যুফার বলেন, কোন ব্যক্তি যদি কোন মেয়ে কোন জাতি বা কোন গোত্র নির্দেশ করে বলে অথবা উদাহরণ স্বরূপ সাধারণ কথায় এভাবে বলে, "যে মেয়েটিকেই আমি বিয়ে করবো তাকেই তালাক"৷ তাহলে উভয় অবস্থায়ই তালাক সংঘটিত হয়ে যাবে৷ আবু বকর জাসসাস এ একই অভিমত হযরত ওমর (রা) হযরত আবদুল্লাহ হয়ে যাবে৷ আবু বকর জাস্‌সাস এ একই অভিমত হযরত ওমর (রা), হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা), ইবরাহীম নাখাঈ, মুজাহিদ ও উমর ইবনে আবদুল আযীয রাহেমাহুমুল্লাহ থেকে উদ্ধৃত করেছেন৷

সুফিয়ান সওরী ও উসমানুল বাত্তী বলেন, তালাক কেবলমাত্র তখনি হবে যখন বক্তা এভাবে বলবে, "যদি আমি অমুক মেয়েকে বিয়ে করি তাহলে তার ওপর তালাক সংগঠিত হবে৷‍‍‍"

হাসান ইবনে সালেহ, লাইস ইবনে সা'দ ও আমেরুশ শা'বী বলেন, এ ধরনের তালাক সাধারণভাবেও সংঘটিত হতে পারে, তবে শর্ত এই যে, এর প্রয়োগক্ষেত্র সুনির্দিষ্ট হতে হবে৷ যেমন এক ব্যক্তি এভাবে বললোঃ "যদি আমি অমুক পরিবার, অমুক গোত্রে, অমুক শহর, অমুক দেশ বা অমুক জাতির মেয়ে বিয়ে করি, তাহলে তার ওপর তালাক কার্যকর হবে৷"

ইবনে আবী লাইলা ও ইমাম মালেক ওপরে উদ্ধৃত মতের সাথে দ্বিমত পোষণ করে অতিরিক্ত শর্ত আরোপ করেন এবং বলেন, এর মধ্যে সময়-কালও নির্ধারিত হতে হবে৷ যেমন, যদি এক ব্যক্তি এভাবে বলে, "যদি আমি এ বছর বা আগামী দশ বছরের মধ্যে অমুক মেয়ে বা অমুক দলের মেয়েকে বিয়ে করি, তাহলে তার ওপর তালাক কার্যকর হবে অন্যথায় তালাক হবে না৷ বরং ইমাম মালেক এর ওপর আরো এতটুকু বৃদ্ধি করেন যে, যদি এ সময়-কাল এতটা দীর্ঘ হয় যার মধ্যে ঐ ব্যক্তির জীবিত থাকার আশা করা যায় না তাহলে তার উক্তি অকার্যকর হয়ে যাবে৷
৮৭. যারা আপত্তি করে বলতো, মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তো অন্যদের জন্য একই সময় চারজনের বেশী স্ত্রী রাখতে নিষেধ করেন কিন্ত তিনি নিজে পঞ্চম স্ত্রী গ্রহণ করলেন কেমন করে," এখানে আসলে তাদের জবাব দেয়া হয়েছে৷ এ আপত্তির ভিত্তি ছিল এরি ওপর যে, হযরত যয়নবকে (রা) বিয়ে করার সময় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের স্ত্রী ছিলেন চারজন৷ এদের একজন ছিলেন হযরত সওদা (রা)৷ তাঁকে তিনি বিয়ে করেছিলেন হিজরাতের ৩ বছর আগে৷ দ্বিতীয় ছিলেন হযরত আয়েশা (রা) তাঁকেও হিজরাতের ৩ বছর আগে বিয়ে করেছিলেন কিন্ত হিজরী প্রথম বছরের শওয়াল মাসে তিনি স্বামীগৃহে আসেন৷ তৃতীয় স্ত্রী ছিলেন হযরত হাফসা (রা) ৩ হিজরীর শাবান মাসে তাঁকে বিয়ে করেন৷ চতুর্থ স্ত্রী ছিলেন হযরত উম্মে সালামাহ (রা) ৪ হিজরীর শওয়াল মাসে নবী করীম (সা) তাঁকে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করেন৷ এভাবে হযরত যয়নব (রা) ছিলেন তার পঞ্চম স্ত্রী৷ এর বিরুদ্ধে কাফের ও মুনাফিকরা যে আপত্তি জানাচ্ছিল তার জবাব আল্লাহ এভাবে দিচ্ছেনঃ হে বনী!তোমার এ পাঁচজন স্ত্রী, যাদের মহর আদায় করে তুমি বিয়ে করেছো, তাদেরকে আমি তোমার জন্য হালাল করে দিয়েছি৷ অন্যকথায় এ জবাবের অর্থ হচ্ছে, সাধারণ মুসলমানদের জন্য চার-এর সীমা নির্দেশও আমিই করেছি এবং নিজের নবীকে এ সীমার উর্ধেও রেখেছি আমিই৷ যদি তাদের জন্য সীমানির্দেশ করার ইখতিয়ার আমার থেকে থাকে, তাহলে নবীকে সীমার উর্ধে রাখার ইখতিয়ার আমার থাকবে না কেন? এ জবাবের ব্যাপারে আবার একথা মনে রাখতে হবে যে, এর সাহায্যে কাফের ও মুনাফিকদেরকে নিশ্চিন্ত করা এর উদ্দেশ্য নয় বরং এমন মুসলমানদেরকে নিশ্চিন্ত করা এর উদ্দেশ্য ছিল ইসলাম বিরোধীরা যাদের মনে সন্দেহ-সংশয় সৃষ্টি করার চেষ্টা করছিল৷ তারা যেহেতু বিশ্বাস করতো, কুরআন আল্লাহর কালাম এবং আল্লাহর নিজের শব্দসহই এ কুরআন নাযিল হয়েছে, তাই কুরআনের একটি সুস্পষ্ট বক্তব্য সম্বলিত আয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ এ ঘোষণা দিয়েছেনঃ নবী নিজেই নিজেকে চারজন স্ত্রী রাখার সাধারণ আইনের আওতার বাইরে রাখেননি বরং ব্যবস্থা আমিই করেছি৷
৮৮. পঞ্চম স্ত্রীকে নবী সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্য হালাল করা ছাড়াও আল্লাহ এ আয়াতে তার জন্য আরো কয়েক ধরনের মহিলাদেরকে বিয়ে করার অনুমতি দিয়েছেনঃ

একঃ আল্লাহ প্রদত্ত বাঁদীদের মধ্য থেকে যারা তাঁর মালিকানাধীন হয়৷ এ অনুমতি অনুযায়ী তিনি বনী কুরাইযার যুদ্ধবন্দিনীদের মধ্য থেকে হযরত রাইহানাকে (রা), বনিল মুসতালিকের যুদ্ধবন্দিনীদের মধ্য থেকে হযরত যুওয়াইরাকে (রা), খয়বরের যুদ্ধবন্দিনীদের মধ্য থেকে হযরত সফীয়াকে (রা) এবং মিসরের মুকাওকিস প্রেরিত হযরত মারিয়া কিবতিয়াকে (রা) নিজের জন্য নির্দিষ্ট করে নেন ৷এদের মধ্য থেকে প্রথমোক্ত তিনজনকে তিনি মুক্তি দান করে তাদেরকে বিয়ে করেন৷ কিন্ত হযরত মারিয়া কিবতিয়ার (রা) সাথে মালিকানাধীন হবার ভিত্তিতে সহবাস করেন৷ তিনি তাকে মুক্তি দিয়ে বিয়ে করেন একথা তার সম্পর্কে প্রমাণিত নয়৷

দুইঃ তাঁর চাচাত, মামাত, ফুফাত ও খালাত বোনদের মধ্য থেকে যারা হিজরাতে তাঁর সহযোগী হন৷ আয়াতে তার সাথে হিজরাত করার যে কথা এসেছে তার অর্থ এ নয় যে, হিজরাতের সফরে তার সাথেই থাকতে হবে বরং এর অর্থ ছিল, ইসলামের জন্য তারাও আল্লাহর পথে হিজরাত করেন৷ তার ওপরে উল্লেখিত মুহাজির আত্মীয়দের মধ্য থেকেও যাকে ইচ্ছা তাকে বিয়ে করার ইখতিয়ারো তাকে দেয়া হয়৷ কাজেই এ অনুমতির ভিত্তিতে তিনি ৭ হিজরী সালে হযরত উম্মে হাবীবাকে (রা) বিয়ে করেন৷ (পরোক্ষভাবে এ আয়াতে একথা সুস্পষ্ট করে দেয়া হয়ছে যে, চাচা, মামা, ফুফী ও খালার মেয়েকে বিয়ে করা একজন মুসলমানের জন্য হালাল৷ এ ব্যাপারে ইসলামী শরীয়াত খৃষ্ট ও ইহুদী উভয় ধর্ম থেকে আলাদা সাত পুরুষ পর্যন্ত পুরুষের বংশধারা মিলে যায়৷ আর ইহুদীদের সমাজে সহোদর ভাইঝি ও ভাগনীকেও বিয়ে করা বৈধ৷)

তিনঃ যে মু'মিন নারী নিজেকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্য ‌'হিবা' তথা দান করে অর্থাৎ মহর ছাড়াই নিজেকে নবী সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করতে তৈরি হয়ে যায় এবং নবী (সা) তা গ্রহণ করা পছন্দ করেন৷ এ অনুমতির ভিত্তিতে তিনি ৭ হিজরীর শওয়াল মাসে হযরত মায়মুনাকে (রা) নিজের সহধর্মিনী রূপে গ্রহণ করেন৷ কিন্ত মহর ছাড়া তার হিবার সুযোগ নেয়া পছন্দ করেননি৷ তাই তার কোন আকাংখা ও দাবী ছাড়াই তাকে মহর দান করেন৷ কোন কোন তাফসীরকার বলেন, নবী সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লামের কোন হিবাকারিনী স্ত্রী ছিল না৷ কিন্তু এর অর্থ আসলে হচ্ছে এই যে, তিনি হিবাকারিনী কোন স্ত্রীকেও মহর থেকে বঞ্চিত করেননি৷
৮৯. এ বাক্যটির সস্পর্ক যদি নিকটের বাক্যের সাথে মেনে নেয়া হয়, তাহলে এর অর্থ হবে, অন্য কোন মুসলমানের জন্য কোন মহিলা নিজেকে তার হাতে হিবা করবে এবং সে মহর ছাড়াই তাকে বিয়ে করবে, এটা জায়েয নয়৷ আর যদি ওপরের সমস্ত ইবারতের সাথে এর সম্পর্ক মেনে নেয়া হয়, তাহলে এর অর্থ হবে, চারটির বেশী বিয়ে করার সুবিধাও একমাত্র নবী করীমের (সা) জন্যই নির্দিষ্ট, সাধারণ মুসলমানের জন্য নয়৷ এ আয়াত থেকে একথাও জানা যায় যে, কিছু বিধান নবী সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্য নির্দিষ্ট রয়েছে, উম্মাতের অন্য লোকেরা এ ব্যাপারে তার সাথে শরীক নেই৷ কুরআন ও সুন্নাহর মধ্যে তাত্ত্বিক অনুসন্ধান চালিয়ে এ ধরনের বহু বিধানের কথা জানা যায়৷ যেমন নবী করীমের (সা) জন্য তাহাজ্জুদের নামায ফরয ছিল এবং সমগ্র উম্মাতের জন্য তা নফল৷ তার ও তার পরিবারবর্গের জন্য সাদকা নেয়া হারাম এবং অন্য কারোর জন্য তা হারাম নয়৷ তার মীরাস বন্টন হতে পারতো না কিন্তু অন্য সকলের মীরাস বন্টনের জন্য সূরা নিসায় বিধান দেয়া হয়েছে৷ তার জন্য চারজনের অধিক স্ত্রী হালাল করা হয়েছে৷ স্ত্রীদের মধ্যে সমতাপূর্ণ ইনসাফ তার জন্য ওয়াজিব করা হয়নি৷ নিজেকে হিবাকারী নারীকে মহর ছাড়াই বিয়ে করার অনুমতি তাঁকে দেয়া হয়েছে৷ তার ইন্তেকালের পর তার পবিত্র স্ত্রীগণকে সমগ্র উম্মাতের জন্য হারাম করে দেয়া হয়েছে৷ এর মধ্যে এমন একটি বিশেষত্ত্ব ও নেই যা নবী করীম (সা) ছাড়া অন্য কোন মুসলমানও অর্জন করেছে৷ মুফাসসিরগণ তার আর একটি বৈশিষ্ট ও বর্ণনা করেছেন৷ তা হচ্ছে এই যে, আহলি কিতাবের কোন মহিলাকে বিয়ে করাও তার জন্য নিষিদ্ধ ছিল৷ অথচ উম্মাতের সবার জন্য তারা হালাল৷
৯০. সাধারণ নিয়ম থেকে মহান আল্লাহ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে যে আলাদা রেখেছেন তার মধ্যে রয়েছে এ সুবিধা ও কল্যাণ৷ "যাতে সংকীর্ণতা ও অসুবিধা না থাকে"- এর অর্থ এ নয় যে, নাউযুবিল্লাহ তাঁর প্রবৃত্তির লালসা খুব বেশী বেড়ে গিয়েছিল বলে তাকে বহু স্ত্রী রাখার অনুমতি দেয়া হয়, যাতে শুধুমাত্র চারজন স্ত্রীর মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে থাকতে তিনি সংকীর্ণতা ও অসুবিধা অনুভব না করেন৷ এ বাক্যাংশের এ অর্থ কেবলমাত্র এমন এক ব্যক্তি গ্রহণ করতে পারে যে বিদ্বেষ ও সংকীর্ণ স্বার্থপ্রীতিতে অন্ধহয়ে একথা ভুলে যায় যে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ২৫ বছর বয়সে এমন এক মহিলাকে বিয়ে করেন যার বয়স ছিল তখন ৪০ বছর এবং পুরো ২৫ বছর ধরেতিনি তার সাথে অত্যন্ত সুখী দাম্পত্য জীবন যাপন করতে থাকেন৷ তাঁর ইন্তিকালের পর তিনি অন্য একজন অধিক বয়সের বিগত যৌবনা মহিলা হযরত সওদাকে (রা) বিয়ে করেন৷ পুরো চার বছর পর্যন্ত তিনি একাই ছিলের তার স্ত্রী৷ এখন কোন বুদ্ধিমান বিবেকবান ব্যক্তি একথা কল্পনা করতে পারে যে, ৫৩ বছর পার হয়ে যাবার পর সহসা তার যৌন কামনা বেড়ে যেতে থাকে এবং তার অনেক বেশী সংখ্যক স্ত্রীর প্রয়োজন হয়ে পড়ে? আসলে "সংকীর্ণতা ও অসুবিধা না থাকে"- এর অর্থ অনুধাবন করতে হলে একদিকে নবী করীমের (সা) ওপর আল্লাহ যে মহান দায়িত্ব অর্পন করেছিলেন তার প্রতি দৃষ্টি রাখা এবং অন্যদিকে যে অবস্থার মধ্যে আল্লাহ তাকে এ মহান দায়িত্ব সম্পাদন করার জন্য নিযুক্তকরেছিলেন তা অনুধাবন করা জরুরী৷ সংকীর্ণ স্বার্থপ্রীতি থেকে মন-মানসিতকাকে মুক্ত করে যে ব্যক্তিই এ দু'টি সত্য অনুধাবন করবেন তিনিই স্ত্রী গ্রহণের ব্যাপারে তাকে ব্যাপক অনুমতি দেয়া কেন জরুরী ছিল এবং চারের সীমারেখা নির্দেশের মধ্যে তার জন্য কি সংকীর্ণতা ও অসুবিধা ছিল তা ভালোভাবেই জানতে পারবেন৷

নবী করীমকে (সা) যে কাজের দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল তা ছিল এই যে, তিনি একটি অসংগঠিত ও অপরিপক্ক জাতিকে, যারা কেবল ইসলামী দষ্টিকোণ থেকেই নয় বরং সাধারণ সভ্যতা সংস্কৃতির দৃষ্টিতেও ছিল অগোছালো ও অগঠিত, তাদেরকে জীবনের প্রতিটি বিভাগে শিক্ষা ও অনুশীলনের মাধ্যমে একটি উন্নত পর্যায়ের সুসভ্য, সংস্কৃতিবান ও পরিচ্ছন্ন জাতিতে পরিণত করবেন৷ এ উদ্দেশ্যে কেবলমাত্র পুরুষদেরকে অনুশীলন দেয়া যথেষ্ট ছিল না বরং মহিলাদের অনুশীলন ও সমান জরুরী ছিল৷ কিন্তু সভ্যতা ও সংস্কৃতির যে মূলনীতি শিখাবার জন্য তিনি নিযুক্ত হয়েছিলেন তার দৃষ্টিতে নারী ও পুরুষের অবাধ মেলামেশা নিষিদ্ধ ছিল এবং এ নিয়ম ভংগ করা ছাড়া তার পক্ষে মহিলাদেরকে সরাসরি অনুশীলন দান করা সম্ভবপর ছিল না৷ তাই মহিলাদের মধ্যে কাজ করার কেবলমাত্র একটি পথই তার জন্য খোলা ছিল এবং সেটি হচ্ছে, বিভিন্ন বয়সের ও বিভিন্ন বৃদ্ধিবৃত্তিক যোগ্যতাসম্পন্ন মহিলাদেরকে তিনি বিয়ে করতেন, নিজে সরাসরি তাদেরকে অনুশীলন দান করে তার নিজের সাহায্য সহায়তার জন্য প্রস্তুত করতেন এবং তারপর তাদের সাহায্যে নগরবাসী ও মরুচারী এবং যুবতী, পৌঢ় ও বৃদ্ধা সব ধরনের নারীদেরকে দীন, নৈতিকতা ও কৃষ্টি সংস্কৃতির নতুন নীতিসমূহ শিখবার ব্যবস্থা করতেন৷

এ ছাড়াও নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে পুরাতন জাহেলী জীবন ব্যবস্থার অবসান ঘটিয়ে তার জায়গায় কার্যত ইসলামী জীবন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত করার দায়িত্বও দেয়া হয়েছিল৷ এ দায়িত্ব সম্পাদন করার জন্য জাহেলী জীবন ব্যবস্থার প্রবক্তা ও পতাকাবাহীদের সাথে যুদ্ধ অপরিহার্য ছিল৷ এ সংঘাত এমন একটি দেশে শুরু হতে যাচ্ছিল যেখানে গোত্রীয় জীবনধারা নিজের বিশেষ বিশেষ সাংস্কৃতির অবয়বে প্রচলিত ছিল৷ এ অবস্থায় অন্যান্য ব্যবস্থার সাথে বিভিন্ন পরিবারে বিয়ে করে বহুবিধ বন্ধুত্বকে পাকাপোক্ত এবং বহুতর শত্রুতাকে খতম করার ব্যবস্থা করা তার জন্য জরুরী ছিল৷ তাই যেসব মহিলাকে তিনি বিয়ে করেন তাদের ব্যক্তিগত গুণাবলী ছাড়াও তাদের নির্বাচনের ক্ষেত্রে এসব বিষয় ও কমবেশী জড়িত ছিল৷ হযরত আয়েশা (রা) এ হযরত হাফসাকে (রা) বিয়ে করে তিনি হযরত আবুবকর (রা) ও হযরত উমরের (রা) সাথে নিজের সম্পর্ককে আরো বেশী গভীর ও মজবুত করে নেন৷ হযরত উম্মে সালামাহ (রা) ছিলেন এমন এক পরিবারের মেয়ে যার সাথে ছিল আবু জেহেল ও খালেদ ইবনে ওলিদের সম্পর্ক৷ হযরত উম্মে হাবীবা (রা) ছিলেন আবু সুফিয়ানের মেয়ে৷ এ বিয়েগুলো সংশ্লিষ্ট পরিবার গুলোর শত্রুতার জের অনেকাংশে কমিয়ে দেয়৷ বরং হযরত উম্মে হাবীবার সাথে নবী করীমের (সা) বিয়ে হবার পর আবু সুফিয়ান আর কখনো তার মোকাবিলায় অস্ত্র ধরেননি৷ হযরত সুফিয়া (রা), হযরত জুওয়াইরিয়া (রা) ও হযরত রাইহানা (রা) ইহুদি পরিবারের মেয়ে ছিলেন৷ তাদেরকে মুক্ত করে দিয়ে যখন নবী করীম (রা) তাদেরকে বিয়ে করেন তখন তার বিরুদ্ধে ইহুদিদের তৎপরতা স্তিমিত হয়ে পড়ে৷ কারণ সে যুগের আরবীয় নীতি অনুযায়ী যে ব্যক্তির সাথে কোন গোত্রের মেয়ের বিয়ে হতো তাকে কেবল মেয়েটির পরিবাবেরই নয় বরং সমগ্র গোত্রের জামাতা মনে করা হতো এবং জামাতার সাথে যুদ্ধ করা ছিল বড়ই লজ্জাকর৷

সমাজের কার্যকর সংশোধন এবং তার জাহেলী রসম রেওয়াজ নির্মূল করাও তার নবুওয়াতের অন্যতম দায়িত্ব ছিল৷ কাজেই এ উদ্দেশ্যেও তাকে একটি বিয়ে করতে হয়৷ এ সূরা আহযাবে এ বিষয়টির বিস্তারিত আলোচনা হয়ে গেছে৷

এসব বিষয় বিয়ের ব্যাপারে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্য কোন রকম সংকীর্ণতা ও অসুবিধা না রাখার তাগাদা করছিল৷ এর ফলে যে মহান দায়িত্ব তার প্রতি অর্পিত হয়েছিল তার প্রয়োজনের প্রেক্ষিতে তিনি প্রয়োজনীয় সংখ্যক বিয়ে করতে পারতেন৷

যারা মনে করেন একাধিক বিয়ে কেবলমাত্র কয়েকটি বিশেষ ব্যক্তিগত প্রয়োজনেই বৈধ এবং সেগুলো ছাড়া তা বৈধ হবার পেছনে অন্য কোন উদ্দেশ্য থাকতে পারে না, এ বর্ণনা থেকে তাদের চিন্তার বিভ্রান্তিও সুস্পষ্ট হয়ে যায়৷ একথা সুস্পষ্ট যে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের একাধিক বিয়ে করার পেছনে তা স্ত্রীর রুগ্নতা, বন্ধ্যাত্ব বা সন্তানহীনতা অথবা এতিম প্রতিপালনের সমস্যা ছিল না৷ এসব সীমাবদ্ধ ব্যক্তিগত প্রয়োজন ছাড়া তিনি সমস্ত বিয়ে করেন প্রচার ও শিক্ষামূলক প্রয়োজনে অথবা সমাজ সংস্কারার্থে কিংবা রাজনৈতিক ও সামাজিক উদ্দেশ্যে৷ প্রশ্ন হচ্ছে, যখন আজ হাতেগোনা যে কয়টি বিশেষ উদ্দেশ্যের কথা বলা হচ্ছে আল্লাহ নিজেই সেগুলোরর জন্য একাধিক বিয়েকে সীমাবদ্ধ করে রাখেননি এবং আল্লাহর রসূল এগুলো ছাড়া অন্যান্য বহু উদ্দেশ্যে একাধিক বিয়ে করেছেন তখন অন্য ব্যক্তি আইনের মধ্যে নিজের পক্ষ থেকে কতিপয় শর্ত ও বিধি-নিষেধ আরোপ করার এবং সে শরীয়াত অনুযায়ী এ নির্ধারণ করছে বলে দাবী করার কী অধিকার রাখে? আসলে একাধিক বিয়ে মূলতই একটি অপকর্ম, এই পাশ্চত্য ধারনাটি উক্ত সীমা নির্ধারণের মূলে কাজ করছে৷ উক্ত ধারণার ভিত্তিতে এ মতবাদের ও জন্ম হয়েছে যে, এ হারাম কাজটি যদি কখনো হালাল হয়েও যায় তাহলে তা কেবলমাত্র অপরিহার্য প্রয়োজনের জন্যই হতে পারে৷ এখন এ বাইর থেকে আমদানী করা চিন্তার ওপর ইসলামের জাল ছাপ লাগাবার যতই চেষ্টা করা হোক না কেন কুরআন ও সুন্নাহ এবং সমগ্র উম্মাতে মুসলিমার সাহিত্য এর সাথে মোটেই পরিচিত নয়৷
৯১. নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সংসার জীবনের সংকটমুক্ত করাই ছিল এ আয়াতটির উদ্দেশ্য৷ এর ফলে তিনি পরিপূর্ণ নিশ্চিন্ততার সাথে নিজের কাজ করতে পারতেন৷ যখন আল্লাহ পরিষ্কার ভাষায় তাকে পবিত্র স্ত্রীদের মধ্য থেকে যার সাথে তিনি যেমন ব্যবহার করতে চান তা করার ইখতিয়ার দিয়ে দেন তখন এ মু'মিন ভদ্রমহিলাদের তাকে কোনভাবে পেরেশান করার অথবা পরস্পর ঈর্ষা ও প্রতিযোগিতার কলহ সৃষ্টি করে সমস্যার মুখোমুখি করার আর কোন সম্ভাবনাই থাকে না৷ কিন্তু আল্লাহর কাছ থেকে এ ইখতিয়ার লাভ করার পর ও নবী করীম (রা) সকল স্ত্রীদের মধ্যে পূর্ণ সমতা ও ইনসাফ কায়েম করেন, কাউকেও কারো ওপর প্রাধান্য দেননি এবং যথারীতি পালা নির্ধারণ করে কায়েম করেন, তিনি সবার কাছে যেতে থাকেন৷ মুহাদ্দিসদের মধ্যে একমাত্র আবু রাযীন বর্ণনা করেন, নবী করীম (রা) কেবলমাত্র চারজন স্ত্রীর (হযরত আয়েশা, হযরত হাফসাহ, হযরত যয়নব ও হযরত উম্মে সালামাহ) জন্য পালা নির্ধারণ করেন, বাকি অন্য সকল স্ত্রীর জন্য কোন পালা নির্দিষ্ট করেননি৷ কিন্তু অন্য সকল মুহাদ্দিস ও মুফাসসির এর প্রতিবাদ করেন৷ তারা অত্যন্ত শক্তিশালী রেওয়ায়াতের মাধ্যমে এ প্রমাণ পেশ করেন যে, এ ইখতিয়ার লাভ করার পর ও নবী করীম (রা) সকল স্ত্রীর কাছে পালাক্রমে যেতে থাকেন এবং সবার সাথে সমান ব্যবহার করতে থাকেন৷ বুখারী, তিরমিযী, নাসাঈ ও আবু দাউদ প্রমুখ মুহাদ্দিসগন হযরত আয়েশার এ উক্তি উদ্ধৃত করেছেনঃ এ আয়াত নাযিলের পর নবী করীমের (সা) রীতি এটিই ছিল যে, তিনি আমাদের মধ্য থেকে কোন স্ত্রীর পালার দিন অন্য স্ত্রীর কাছে যেতে হলে তার কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে তবে যেতেন৷ আবু বকর জাসসাস হযরত উরওয়াহ ইবনে যবাইরের (রা) রেওয়ায়াত উদ্ধৃত করেছেন৷ তাতে বলা হয়েছে, হযরত আয়েশা (রা) তাকে বলেনঃ রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পালা বন্টনের ক্ষেত্রে আমাদের কাউকে কারো ওপর প্রাধান্য দিতেন না৷ যদিও এমন ঘটনা খুব কমই ঘটতো যে, তিনি একই দিন নিজের সকল স্ত্রীর কাছে যাননি৷ তবুও যে স্ত্রীর পালার দিন হতো সেদিন তাকে ছাড়া আর কাউকে স্পর্শও করতেন না৷ হযরত আয়েশা (রা) এ হাদীসটিও বর্ণনা করেছেনঃ যখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার শেষ রোগে আক্রান্ত হন এবং চলাফেরা করা তার জন্য কঠিন হয়ে পড়ে তখন তিনি সকল স্ত্রীদের থেকে অনুমতি চান এই মর্মে, আমাকে আয়েশার কাছে থাকতে দাও৷ তারপর যখন সবাই অনুমতি দেন তখন তিনি শেষ সময়ে হযরত আয়েশার (রা) কাছে থাকেন৷ ইবনে আবি হাতেম ইমাম যুহরীর উক্তি উদ্ধৃত করেছেন যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কোন স্ত্রীকে পালা থেকে বঞ্চিত করার কথা প্রমাণিত নয়৷ একমাত্র হযরত সওদা (রা) এর ব্যতিক্রম৷ তিনি সানন্দে নিজের পালা হযরত আয়েশাকে (রা) দিয়ে দেন৷ কারণ তিনি অনেক বয়োবৃদ্ধা হয়ে পড়েছিলেন৷ এখানে কারো মনে এ ধরনের কোন সন্দেহ থাকা উচিত নয় যে, আল্লাহ এ আয়াতে তার নবীর জন্য নাউযুবিল্লাহ কোন অন্যায় সুবিধা দান করেছিলেন এবং তা পবিত্র স্ত্রীগণের অধিকার হরণ করেছিলেন৷ আসলে যেসব মহৎ কল্যাণ ও সুবিধার জন্য নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের স্ত্রীদের সংখ্যার ব্যাপারটি সাধারণ নিয়মের বাইরে রাখা হয়েছিল নবীকে সাংসারিক জীবনে শান্তি দান করা এবং যেসব কারণে কারো মনে পেরেশানী সৃষ্টি হতে পারে সেগুলোর পথ বন্ধ করে দেয়া ছিল সেসব কল্যাণ ও সুবিধারই দাবী৷ নবীর পবিত্র স্ত্রীগণের জন্য এটা ছিল বিরাট মর্যাদার ব্যাপার৷ তারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ন্যায় মহামহিম ব্যক্তিত্ত্বের স্ত্রীর মর্যাদা লাভ করেছিলেন৷ এরি বদৌলতে তারা ইসলামী দাওয়াত ও সংস্কারের এ মহিমান্বিত কর্মে নবী করীমের (সা) সহযোগী হতে সক্ষম হয়েছিলেন, যিনি কিয়ামত পর্যন্ত মানবতার কল্যাণের মাধ্যমে পরিণত হতে যাচ্ছিলেন৷ এ উদ্দেশ্যে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যেমন অসাধারণ ত্যাগ ও কুরবানীর পথ অবলম্বন করেছিলেন এবং সমস্ত সাহাবায়ে কেরাম নিজেদের সামর্থের শেষ সীমা পর্যন্ত কুরবানী করে চলছিলেন ঠিক তেমনি ত্যাগ স্বীকার করা নবীর (সা) পবিত্র স্ত্রীগণেরও কর্তব্য ছিল৷ তাই নবী করীমের (সা) সকল স্ত্রী মহান আল্লাহর এ ফায়সালা সানন্দে গ্রহণ করেছিলেন৷
৯২. এটি নবী করীমের (সা) পবিত্র স্ত্রীগণের জন্যও সতর্কবাণী এবং অন্য সমস্ত লোকদের জন্যও৷ পবিত্র স্ত্রীগণের জন্য এ বিষয়ের সতর্কবানী যে, আল্লাহর এ হুকুম এসে যাবার পর যদি তাদের হৃদয় দুঃখ ভারাক্রান্ত হয়ে পড়ে তাহলে তারা পাকড়াও থেকে নিস্কৃতি লাভ করতে পারবে না৷ অন্য লোকদের জন্য এর মধ্যে এ সতর্কবানী রয়েছে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দাম্পত্য জীবন সম্পর্কে যদি তারা কোন প্রকার ভুল ধারনণাও নিজেদের মনে পোষণ করে অথবা চিন্তা-ভাবনার কোন পর্যায়েও কোন প্ররোচনা লালন করতে থাকে, তাহলে আলাহর কাছে তাদের এ প্রচ্ছন্ন দুস্কৃতি গোপন থাকবে না৷ এই সাথে আল্লাহর সহিঞ্চুতা গুণের কথাও বলে দেয়া হয়েছে৷ এভাবে মানুষ জানবে, নবী সম্পর্কে গোস্তাখীমূলক চিন্তা যদিও কঠিন শাস্তিযোগ্য তবুও যার মনে কখনো এ ধরনের প্ররোচনা সৃষ্টি হয় সে যদি তা বের করে দেয়, তাহলে আল্লাহর কাছে ক্ষমা লাভের আশা আছে৷
৯৩. এ উক্তিটির দুটি অর্থ রয়েছে৷ এক, ওপরে ৫০ আয়াতে নবী করীমের (সা) জন্য যেসব নারীকে হালাল করে দেয়া হয়েছে তারা ছাড়া আর কোন নারী এখন আর তার জন্য হালাল নয়৷ দুই, যখন তার পবিত্র স্ত্রীগণ অভাবে অনটনে তার সাথে থাকবেন বলে রাজী হয়ে গেছেন এবং আখেরাতের জন্য তারা দুনিয়াকে বিসর্জন দিয়েছেন আর তিনি তাদের সাথে যে ধরনের আচরণ করবেন তাতেই তারা খুশী তখন এ ক্ষেত্রে আর তার জন্য তাদের থেকে কাউকে তালাক দিয়ে তার জায়গায় অন্য স্ত্রী গ্রহণ করা হালাল নয়৷
৯৪. এ আয়াতটির পরিষ্কার করে একথা বর্ণনা করছে যে, বিবাহিতা স্ত্রীগণ ছাড়া মালিকানাধীন নারীদের সাথেও মিলনের অনুমতি রয়েছে এবং তাদের ব্যাপারে কোন সংখ্যা-সীমা নেই৷ সূরা নিসার ৩ আয়াতে, সূরা মু'মিনুনের ৬ আয়াতে এবং সূরা মা'আরিজের ৩০ আয়াতে এ বিষয়বস্তুটি পরিষ্কার করে বলে দেয়া হয়েছে৷ এ সমস্ত আয়াতে মালিকানাধীন মহিলাদেরকে বিবাহিতা নারীদের মোকাবিলায় একটি আলাদা গোষ্ঠী হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে এবং তারপর তাদের সাথে দাম্পত্য সম্পর্ক স্থাপনকে বৈধ গণ্য করা হয়েছে৷ এ ছাড়াও সূরা নিসার ৩ আয়াত বিবাহিতা স্ত্রীদের জন্য ৪ জনের সীমারেখা নির্ধারণ করে ৷ কিন্তু সেখানে আল্লাহ মালিকানাধীন মহিলাদের কোন সংখ্যাসীমা বেঁধে দেননি এবং এতদসংক্রান্ত অন্য আয়াতগুলোতেও কোথাও এ ধরনের কোন সীমার প্রতি ইংগিতও করেননি৷ বরং এখানে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সম্বোধন করে বলা হচ্ছে, আপনার জন্য এরপর অন্য মহিলাদেরকে বিয়ে করা অথবা কাউকে তালাক দিয়ে অন্য স্ত্রী নিয়ে আসা হালাল নয়৷ তবে মালিকানাধীন মহিলারা হালাল৷ এ থেকে পরিষ্কার প্রকাশ হয় মালিকানাধীন মহিলাদের ব্যাপারে কোন সংখ্যা-সীমা নির্ধারিত নেই৷ কিন্তু এর অর্থ এ নয়, ইসলামী শরীয়াত ধনীদের অসংখ্য বাঁদী কিনে আয়েশ করার জন্য এ সুযোগ দিয়েছে৷ বরং আসলে প্রবৃত্তি পূজারী লোকেরা এ আইনটি থেকে অযথা সুযোগ গ্রহণ করেছে৷ আইন তৈরি করা হয়েছিল মানুষের সুবিধার জন্য৷ আইন থেকে এ ধরনের সুযোগ গ্রহণের জন্যও তা তৈরি করা হয়নি৷ এর দৃষ্টান্ত হচ্ছে ঠিক তেমনি যেমন শরীয়াত একজন পুরুষকে চারজন পর্যন্ত মহিলাকে বিয়ে করার অনুমতি দেয় এবং তাকে নিজের স্ত্রীকে তালাক দিয়ে অন্য স্ত্রী গ্রহণ করারও অনুমতি দেয়৷ মানুষের প্রয়োজন সামনে রেখে এ আইন তৈরি করা হয়েছিল৷ এখন যদি কোন ব্যক্তি নিছক আয়েশ করার জন্য চারটি মহিলাকে বিয়ে করে কিছুদিন তাদের সাথে থাকার পর তাদেরকে তালাক দিয়ে আবার নতুন করে চারটি বউ ঘরে আনার ধারা চালু করে, তাহলে এটা তো আইনের অবকাশের সুযোগ গ্রহণ করাই হয়৷ এর পুরো দায়-দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ওপরই বর্তাবে, আল্লাহর শরীয়াতের ওপর নয়৷ অনুরূপভাবে যুদ্ধে গ্রেফতারকৃত মহিলাদেরকে যখন তাদের জাতি মুসলিম বন্দীদের বিনিময়ে ফিরিয়ে নিতে অথবা মুক্তিপণ দিয়ে ছাড়িয়ে নিয়ে যেতে এগিয়ে আসে না তখন ইসলামী শরীয়াত তাদেরকে বাঁদী হিসেবে গ্রহণ করার অনুমতি দিয়েছে৷ তাদেরকে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে যেসব ব্যক্তির মালিকানায় দিয়ে দেয়া হয় তাদের ঐ সব মহিলার সাথে সংগম করার অধিকার দিয়েছে৷ এর ফলে তাদের অস্তিত্ব সমাজে নৈতিক বিপর্যয় সৃষ্টির কারণ হয়ে দাঁড়ায় না৷ তারপর যেহেতু বিভিন্ন যুদ্ধে গ্রেফতার হয়ে আসা লোকদের কোন নির্দিষ্ট সংখ্যা থাকতে পারে না, তাই আইনগতভাবে এক ব্যক্তি একই সংগে ক'জন গোলাম বা বাঁদী রাখতে পারে, এরও কোন সীমা নির্ধারণ করা সম্ভব নয়৷ গোলাম ও বাঁদীদের বেচাকেনাও এ জন্য বৈধ রাখা হয়েছে যে, যদি কোন গোলাম বা বাঁদীর তার মালিকের সাথে বনিবনা না হয় তাহলে সে অন্য মালিকের অধীনে চলে যেতে পারবে এবং এক ব্যক্তির চিরন্তন মালিকানা মালিক ও অধীনস্থ উভয়ের জন্য আযাবে পনিণত হবে না৷ শরীয়াত এ সমস্ত নিয়ম ও বিধান তৈরি করেছিল মানুষের অবস্থা ও প্রয়োজন সামনে রেখে তার সুবিধার জন্য৷ যদি ধনী লোকেরা একে বিলাসিতার মাধ্যমে পরিণত করে নিয়ে থাকে তাহলে এ জন্য শরীয়াত নয়, তারাই অভিযুক্ত হবে৷