(৩৩:৩৫) একথা সুনিশ্চিত যে, ৫৩ যে পুরুষ ও নারী মুসলিম,৫৪ মুমিন, ৫৫ হুকুমের অনুগত, ৫৬ সত্যবাদী, ৫৭ সবরকারী,৫৮ আল্লাহর সামনে বিনত,৫৯ সাদকাদানকারী, ৬০ রোযা পালনকারী, ৬১ নিজেদের লজ্জাস্থানের হেফাজতকারী ৬২ এবং আল্লাহকে বেশী বেশী স্মরণকারী ৬৩ আল্লাহ তাদের জন্য মাগফিরাত এবং প্রতিদানের ব্যবস্থা করে রেখেছেন৷৬৪
(৩৩:৩৬) যখন আল্লাহ ও তাঁর রসূল কোনো বিষয়ের ফায়সালা দিয়ে দেন তখ কোনো মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীর ৬৫ সেই ব্যাপারে নিজে ফায়সালা করার কোনো অধিকার নেই৷ আর যে কেউ আল্লাহ ও তাঁর রসূলের নাফরমানী করে সে সুস্পষ্ট গোমরাহীতে লিপ্ত হয়৷৬৬
(৩৩:৩৭) হে নবী! ৬৭ স্মরণ করো, যখন আল্লাহ এবং তুমি যার প্রতি অনুগ্রহ করেছিলে ৬৮ তাকে তুমি বলছিলে, তোমার স্ত্রীকে ত্যাগ করো না এবং আল্লাহকে ভয় করো৷ ৬৯ সে সময় তুমি তোমার মনের মধ্যে যে কথা গোপন করছিলে আল্লাহ তা প্রকাশ করতে চাচ্ছিলেন, তুমি লোকভয় করছিলে, অথচ আল্লাহ এর বেশী হকদার যে, তুমি তাকে ভয় করবে৷ ৭০ তারপর তখন তার ওপর থেকে যায়েদের সকল প্রয়োজন ফুরিয়ে গেল ৭১ তখন আমি সেই (তালাকপ্রাপ্তা মহিলার) বিয়ে তোমার সাথে দিয়ে দিলাম,৭২ যাতে মুমিনদের জন্য তাদের পালক পুত্রদের স্ত্রীদের ব্যাপারে কোনো প্রকার সংকীর্ণতা না থাকে যখন তাদের ওপর থেকে তাদের প্রয়োজন ফুরিয়ে যায়৷ ৭৩ আর আল্লাহর হুকুম তো কার্যকর হয়েই থাকে৷
(৩৩:৩৮) নবীর জন্য এমন কোনো কাজে কোনো বাধা নেই যা আল্লাহ তার জন্য নির্ধারণ করেছেন ৭৪ ইতিপূর্বে যেসব নবী অতীত হয়ে গেছেন তাদের ব্যাপারে এটিই ছিল আল্লাহর নিয়ম, আর আল্লাহর হুকুম হয় একটি চূড়ান্ত স্থিরিকৃত সিদ্ধান্ত৷৭৫
(৩৩:৩৯) (এ হচ্ছে আল্লাহর নিয়ম তাদের জন্য) যারা আল্লাহর বাণী পৌঁছিয়ে থাকে, তাঁকেই ভয় করে এবং এক আল্লাহকে ছাড়া আর কাউকে ভয় করে না আর হিসেব গ্রহণের জন্য কেবলমাত্র আল্লাহই যথেষ্ট৷৭৬
(৩৩:৪০) (হে লোকেরা!) মুহাম্মাদ তোমাদের পুরুষদের মধ্য থেকে কারোর পিতা নয় কিন্তু সে আল্লাহর রসূল এবং শেষ নবী আর আল্লাহ সব জিনিসের জ্ঞান রাখেন৷৭৭
৫৩. পিছনের প্যারাগ্রাফের পরপরই এ বিষয়বস্তু উপস্থাপন করে এই মর্মে একটি সূক্ষ্ম ইংগিত করা হয়েছে যে, ওপরে রসূলের (সাঃ) পবিত্র স্ত্রীগণকে যে নির্দেশ দেয়া হয়েছে তা কেবলমাত্র তাঁদের জন্যই নির্দিষ্ট নয় বরং মুসলিম সমাজরে সামগ্রিক সংশোধন কাজ সাধারণভাবে এসব নির্দেশ অনুযায়ীই করতে হবে৷
৫৪. অর্থাৎ যারা নিজেদের জন্য ইসলামকে জীবন বিধান হিসেবে গ্রহণ করে নিয়েছে এবং এখন জীবন যাপনের ক্ষেত্রে এ বিধানের অনুসারী হবার ব্যাপারে স্থির সিদ্ধান্ত করে নিয়েছে৷ অন্য কথায়, যাদের মধ্যে ইসলাম প্রদত্ত চিন্তাপদ্ধতি ও জীবনধারার বিরুদ্ধে কোন রকমের বিরোধিতা ও প্রতিবন্ধকতার লেশমাত্র নেই৷ বরং তারা তার পরিপূর্ণ আনুগত্য ও অনুসরণের পথ অবলম্বন করেছে৷
৫৫. অর্থাৎ যাদের এ আনুগত্য নিছক বাহ্যিক নয়, গত্যন্তর নেই, মন চায় না তবুও করছি, এমন নয়৷ বরং মন থেকেই তারা ইসলামের নেতৃত্বকে সত্য বলে মেনে নিয়েছে৷ চিন্তা ও কর্মের যে পথ কুরআন ও মুহাম্মাদ (সাঃ) দেখিয়েছেন সেটিই সোজা ও সঠিক পথ এবং তারই অনুসরণের মধ্যে আমাদের সাফল্য নিহিত, এটিই তাদের ঈমান৷ যে জিনিসকে আল্লাহ ও তাঁর রসূল ভুল বলে দিয়েছেন তাদের নিজেদের মতেও সেটি নিশ্চিতই ভুল৷ আর থাকে আল্লাহ ও তাঁর রসূল (সাঃ) সত্য বলে বলে দিয়েছেন তাদের নিজেদের মন-মস্তিষ্কও তাকেই সত্য বলে নিশ্চিতভাবে বিশ্বাস করে৷ তাদের চিন্তা ও মানসিক অবস্থা এমন নয়৷ কুরআন ও সুন্নাত থেকে যে হুকুম প্রমাণিত হয় তাকে৷ তারা অসংগত মনে করতে পারে এবং এ চিন্তার বেড়াজালে এমনভাবে আটকে যেতে পারে যে, কোন প্রকারে তাকে পরিবর্তিত করে নিজেদের মন মাফিক করে নেবে অথবা দুনিয়ার প্রচলিত পদ্ধতি অনুসারে তাকে ঢালাইও করে নেবে আবার এ অভিযোগও নিজেদের মাথায় নেবে না যে, আমরা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের হুকুম কাটছাঁট করে নিয়েছি৷ হাদীসে নবী (সাঃ) ঈমানের সঠিক অবস্থা এভাবে বর্ণনা করেছেনঃ

(আরবী)

"ঈমানের স্বাদ আস্বাদন করেছে সেই ব্যক্তি যে আল্লাহকে তার রব, ইসলামকে তার দীন এবং মুহাম্মাদকে তার রসূল বলে মেনে নিতে রাজি হয়ে গেছে৷" (মুসলিম)

অন্য একটি হাদীসে তিনি এর ব্যাখ্যা এভাবে করেছেনঃ

()

"তোমাদের কোন ব্যক্তি মু'মিন হয় না যতক্ষণ না তার প্রবৃত্তি আমি যা এনেছি তার অনুগত হয়ে যায়৷"(শারহুস সুন্নাহ)
৫৬. অর্থাৎ তারা নিছক মেনে নিয়ে বসে থাকার লোক নয়৷ বরং কার্যত আনুগত্যকারী৷ তাদের অবস্থা এমন নয় যে, আল্লাহ ও তাঁর রসূল যে কাজের হুকুম দিয়েছেন তাকে সত্য বলে মেনে নেবে ঠিকই কিন্তু কার্যত তার বিরুদ্ধাচরণ করবে এবং আল্লাহ ও তাঁর রসূল যেসব কাজ করতে নিষেধ করেছেন নিজেরা আন্তরিকভাবে সেগুলোকে খারাপ মনে করবে কিন্তু নিজেদের বাস্তব জীবনে সেগুলোই করে যেতে থাকবে৷
৫৭. অর্থাৎ নিজেদের কথায় যেমন সত্য তেমনি ব্যবহারিক কার্যকলাপেও সত্য ৷ মিথ্যা, প্রতারণা, অসৎ উদ্দেশ্য, ঠগবৃত্তি ও ছলনা তাদের জীবনে পাওয়া যায় না ৷ তাদের বিবেক যা সত্য বলে জানে মুখে তারা তাই উচ্চারণ করে ৷ তাদের মতে যে কাজ ঈমানদারীর সাথে সত্য ও সততা অনুযায়ী হয় সে কাজই তারা করে ৷ যার সাথেই তারা কোন কাজ করে বিশ্বস্ততা ও ঈমানদারীর সাথে করে ৷
৫৮. অর্থাৎ আল্লাহ ও তাঁর রসূলের নির্দেশিত সোজা সত্য পথে চলার এবং আল্লাহর দীনকে প্রতিষ্ঠত করার পথে যে বাধাই আসে, যে বিপদই দেখা দেয়, যে কষ্টই সহ্য করতে হয় এবং যে সমস্ত ক্ষতির মুখোমুখি হতে হয়, দৃঢ়ভাবে তারা তার মোকাবিলা করে৷ কোনপ্রকার ভীতি, লোক ও প্রবৃত্তির কামনার কোন দাবী তাদেরকে সোজা পথ থেকে হটিয়ে দিতে সক্ষম হয় না৷
৫৯. অর্থাৎ তারা দম্ভ, অহংকার ও আত্মম্ভরীতামুক্ত৷ তারা এ সত্যের পূর্ণ সচেতন অনুভূতি রাখে যে, তারা বান্দা এবং বন্দেগীর বাইরে তাদের কোন মর্যাদা নেই৷ তাই তাদের দেহ ও অন্তরাত্মা উভয়ই আল্লাহর সামনে নত থাকে৷ আল্লাহ ভীতি তাদের ওপর প্রাধান্য বিস্তার করে থাকে৷ আত্মঅহমিকায় ম্‌ত্ত আল্লাহভীতি শূন্য লোকদের থেকে যে ধরনের মনোভাব প্রকাশিত হয় এমন কোন মনোভাব কখনো তাদের থেকে প্রকাশিত হয় না৷ আয়াতের বিন্যাসের প্রতি দৃষ্টিপাত করলে জানা যায়, এখানে এ সাধারণ আল্লাহভীতি মূলক মনোভাবের সাথে বিশেষ ভাবে "খুশু" বা বিনত হওয়া শব্দ ব্যবহার করায় এর অর্থ হয় নামায৷ কারণ এরপরই সাদকাহ ও রোযার কথা বলা হয়েছে৷
৬০. এর অর্থ কেবল ফরয যাকাত আদায় করাই নয় বরং সাধারণ দান-খয়রাতও এর অন্তরভুক্ত৷ অর্থাৎ তারা আল্লাহর পথে উন্মুক্ত হৃদয়ে নিজেদের অর্থ ব্যয় করে৷ আল্লাহর বান্দাদের সাহার্য্য করার ব্যাপারে নিদের সামর্থ অনুযায়ী প্রচেষ্টা চালাতে তারা কসুর করে না৷ কোন এতিম, রুগ্ন, বিপদাপন্ন, দুর্বল, অক্ষম, গরীব ও অভাবী ব্যক্তি তাদের লোকালয়ে তাদের সাহায্য থেকে বঞ্চিত থাকে না৷ আর আল্লাহর দীনকে সুউচ্চ আসনে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য প্রয়োজন হলে তার জন্য অর্থ-সম্পদ ব্যয় করতে তারা কখনো কার্পণ্য করে না৷
৬১. ফরয ও নফল উভয় ধরনের রোযা এর অন্তরভুক্ত হবে৷
৬২. এর দু'টি অর্থ হয়৷ একটি হচ্ছে, তারা যিনা থেকে দূরে থাকে এবং দ্বিতীয়টি হচ্ছে, তারা উলংগতাকে এড়িয়ে চলে৷ এই সাথে এটাও বুঝে নিতে হবে যে, কেবলমাত্র মানুষের পোশাক না পরে উলংগ হয়ে থাকাকে উলংগতা বলে না বরং এমন ধরনের পোশাক পরাও উলংগতার অন্তরভুক্ত, যা এতটা সূক্ষ্ম হয় যে, তার মধ্য দিয়ে শরীর দেখা যায় অথবা এমন চোস্ত ও আটসাঁট হয় যার ফলে তার সাহায্যে দৈহিক কাঠামো ও দেহের উঁচু-নীচু অংগ সবই সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে৷
৬৩. আল্লাহকে বেশী বেশী স্মরণ করার অর্থ হচ্ছে, জীবনের সকল কাজেকর্মে সমস্ত ব্যাপারেই সবসময় যেন মানুষের মুখে আল্লাহর নাম এসে যায়৷ মানুষের মনে আল্লাহর চিন্তা পুরোপুরি ও সর্বব্যাপী আসন গেঁড়ে না বসা পর্যন্ত এ ধরনের অবস্থা তার মধ্যে সৃষ্টি হয় না৷ মানুসের চেতনার জগত অতিক্রম করে যখন অচেতন মনের গভীরদেশেও এ চিন্তা বিস্তৃত হয়ে যায় তখনই তার অবস্থা এমন হয় যে, সে কোন কথা বললে বা কোন কাজ করলে তার মধ্যে আল্লাহর নাম অবশ্যই এসে যাবে৷ আহার করলে "বিসমিল্লাহ" বলে শুরু করবে৷ আহার শেষ করবে 'আলহামদুলিল্লাহ' বলে৷ আল্লাহকে স্মরণ করে ঘুমাবে এবং ঘুম ভাঙবে আল্লাহর নাম নিতে নিতে৷ কথাবার্তায় তার মুখে বারবার বিসমিল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, ইনশাআল্লাহ, মাশাআল্লাহ এবং এ ধরনের অন্য শব্দ ও বাক্য বারবার উচ্চারিত হতে থাকবে৷ প্রত্যেক ব্যাপারে বারবার সে আল্লাহর সাহায্য চাইবে৷ প্রত্যেকটি নিয়ামত লাভ করার পর আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে৷ প্রত্যেকটি বিপদ আসার পর তার রহমতের প্রত্যাশী হবে৷ প্রত্যেক সংকটে তার দিকে মুখ ফিরাবে৷ কোন খারাপ কাজের সুযোগ এল তাঁকে ভয় করবে৷ কোন ভুল বা অপরাধ করলে তাঁর কাছে মাফ চাইবে৷ প্রত্যেকটি প্রয়োজন ও অভাবের মুহূহর্তে তাঁর কাছে প্রার্থনা করবে৷ মোটকথা উঠতে বসতে এবং দুনিয়ার সমস্ত কাজকর্মে আল্লাহর স্মরণ হয়ে থাকবে তার কণ্ঠলগ্ন্‌ এ জিনিসটি আসলে ইসলামী জীবনের প্রাণ ৷ অন্য যে কোন ইবাদাতের জন্য কোন না কোন সময় নির্ধাতির থাকে এবং তখনই তা পালন করা হয়ে থাকে এবং তা পালন করার পর মানুষ তা থেকে আলাদা হয়ে যায়৷ কিন্তু এ ইবাদাতটি সর্বক্ষণ জারী থাকে এবং এটিই আল্লাহ ও তাঁর বন্দেগীর সাথে মানুষের জীবনের স্থায়ী সম্পর্ক জুড়ে রাখে৷ মানুষের মন কেবলমাত্র এসব বিশেষ কাজের সময়েই নয় বরং সর্বক্ষণ আল্লাহর প্রতি আকৃষ্ট এবং তার কণ্ঠ সর্বক্ষণ তাঁর স্মরণে সিক্ত থাকলেই এরি মাধ্যমেই ইবাদাত ও অন্যান্য দীনী কাজে প্রাণ প্রতিষ্ঠা হয় ৷ মানুষের মধ্যে যদি এ অবস্থার সৃষ্টি হয়, তাহলে তার জীবনে ইবাদাত ও দীনী কাজ ঠিক তেমনিভাবে বুদ্ধি ও বিকাশ লাভ করে যেমন একটি চারাগাছকে তার প্রকৃতির অনুকূল আবহাওয়ায় রোপণ করা হলে তা বেড়ে উঠে ৷ পক্ষান্তরে যে জীব্‌ন আল্লাহর এ সার্বক্ষণিক স্মরণ শূন্য থাকে সেখানে নিছক বিশেষ সময়ে অথবা বিশেষ সুযোগে অনুষ্ঠিত ইবাদাত ও দীনী কাজের দৃষ্টান্ত এমন একটি চারাগাছের মতো যাকে তার প্রকৃতির প্রতিকূল আবহাওয়ায় রোপণ করা হয় এবং নিছক বাগানের মালির বিশেষ তত্ত্বাবধানের কারণ এ বেঁচে থাকে৷ একথাটিই নবী (সাঃ) একটি হাদীসে এভাবে বর্ণনা করেছেন৷

(আরবী)

"মু'আয ইবনে আনাস জুহানী বর্ণনা করেন, এক ব্যক্তি রসূলুল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞেস করেন, হে আল্লাহর রসূল! জিহাদকারীদের মধ্যে সবচেয়ে বড় প্রতিদান লাভ করবে কে? জবাব দিলেন, যে তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশী আল্লাহকে স্মরণ করবে৷ তিনি নিবেদন করেন, রোযা পালনকারীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশী প্রতিদান পাবে কে? জবাব দিলেন, যে তাদের মধ্যে আল্লাহকে সবচেয়ে বেশী স্মরণ করবে৷ আবার তিনি একই ভাবে নামায, যাকাত, হ্‌জ্জ ও সাদকা আদায়কারীদের সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেন৷ জাবাবে নবী করীম (সাঃ) বলেণ, " যে আল্লাহকে সবচেয়ে বেশী স্মরণ করে৷" (মুসনাদে আহমাদ)
৬৪. আল্লাহর দরবারে কোন গুণাবলীকে আসল মূল্য ও মর্যাদা দেয়া হয় এ আয়াতে তা বলে দেয়া হয়েছে৷ এগুলো ইসলামের মৌলিক মূল্যবোধ ৷ একটি বাক্যে নারীর মধ্যে কোন ফারাক নেই৷ কাজের ভিত্তিতে নিসন্দেহে উভয় দলের কর্মক্ষেত্রে আলাদা৷ পুরুষদের জীবনের কিছু বিভাগে কাজ করতে হয়৷ নারীদের কাজ করতে হয় ভিন্ন কিছু বিভাগে৷ কিন্তু এ গুণাবলী যদি উভয়ের মধ্যে সমান থাকে তাহলে আল্লাহর কাছে উভয়ের মর্যাদা সমান এবং উভয়ের প্রতিদানও সমান হবে৷ একজন রান্নঘর ও গৃহস্থালী সামলালো এবং অন্যজন খেলাফতের মসনদে বসে শরীয়তের বিধান জারী করলো আবার একজন গৃহে সন্তান লালন-পালন করলো এবং অন্যজন যুদ্ধের ময়দানে গিয়ে আল্লাহ তাঁর দীনের জন্য প্রাণ উৎসর্গ করলেঅ এ জন্যে উভয়ের মর্যাদা ও প্রতিদানে কোন পার্থক্য দেখা দেবে না৷
৬৫. হযরত যয়নবের (রা) সাথে নবী (সাঃ) এর বিবাহ প্রসংগে যে আয়াত নাযিল হয়েছিল এখান থেকেই তা শুরু হচ্ছে৷
৬৬. ইবনে আব্বাস (রা), মুজাহিদ, কাতাদাহ, ইকরামাহ ও মুকাতিল ইবনে হাইয়ান বলেন, এ আয়াত তখন নাযিল হয়েছিল যখন নবী (সাঃ) হযরত যায়েদের (রা) জন্য হযরত যয়নবের (রা) সাথে বিয়ের পয়গাম দিয়েছিলেন এবং হযরত যয়নব ও তার আত্মীয়রা তা নামঞ্জুর করেছিলেন৷ ইবনে আব্বাস (রা) বর্ণনা করেছেন, নবী (সাঃ) যখন এ পয়গাম দেন তখন হযরত যয়নব (রা) বলেনঃ.........................আরবী৷ "আমি অভিজাত কুরাইশ পরিবারের মেয়ে, তাই আমি তাকে নিজের জন্য পছন্দ করি না৷" তাঁর ভাই আবদুল্লাহ ইবনে জাহশও (রা) এ ধরনের অসম্মতি প্রকাশ করেছিলেন এর কারণ ছিল এই যে, হযরত যায়েদ নবী (সাঃ) এর আযাদ করা গোলাম ছিলেন এবং হযরত যয়নব ছিলেন তাঁর ফুফু (উমাইমাহ বিনতে আবদুল মুত্তালিব)-এর কণ্যা৷ এত উঁচু ও সম্ভ্রান্ত পরিবারের মেয়ে, তাও আবার যাতা পরিবার নয়, নবীর নিজের ফুফাত বোন এবং তার বিয়ের পয়গাম তিনি দিচ্ছিলেন নিজের আযাদ করা গোলামের সাথে একথা তাদের কাছে অত্যন্ত খারাপ লাগছিল৷ এজন্য এ আয়াত নাযিল হয়৷ এ আয়াত শুনতেই হযরত যয়নব ও তাঁর পরিবারের সবাই নির্দ্বিধায় আনুগত্যের শির নত করেন৷ এরপর নবী (সাঃ) তাদের বিয়ে পড়ান৷ তিনি নিজে হযরত যায়েদের (রা) পক্ষ থেকে ১০ দীনার ও ৬০ দিরহাম মোহরানা আদায় করেন, কনের কাপড় চোপড় দেন এবং কিছু খাবার দাবারের জিনিসপত্র পাঠান৷ এ আয়াত যদিও একটি বিশেষ সময়ে নাযিল হয় কিন্তু এর মধ্যে যে হুকুম বর্ণনা করা হয় তা ইসলামী আইনের একটি বড় মূলনীতি এবং সমগ্র ইসলামী জীবন ব্যবস্থার ওপর এটি প্রযুক্ত হয়৷ এর দৃষ্টিতে যে বিষয়ে আল্লাহ ও তাঁর রসূলের পক্ষ থেকে কোন হুকুম প্রমাণিত হয় সে বিষয়ে কোন মুসলিম ব্যক্তি, জাতি, প্রতিষ্ঠান, আদালত, পার্লামেন্ট বা রাষ্ট্রের নিজের মতামত প্রকাশের স্বাধীনতা ব্যবহাম করার কোন অধিকার নেই৷ মুসলমান হবার অর্থই হচ্ছে আল্লাহ ও তাঁর রসূলের সামনে নিজের স্বাধীন ইখতিয়ার বিসর্জন দেয়া৷ কোন ব্যক্তি বা জাতি মুসলমানও হবে আবার নিজের জন্য এ ইখতিয়ারটিও সংরক্ষিত রাখবে৷ এ দু'টি বিষয় পরস্পর বিরোধী-এ দুটি কাজ এক সাথে হতে পারে না৷ কোন বুদ্ধিমান ব্যক্তি এ দু'টি দৃষ্টিভংগীকে একত্র করার ধারণা করতে পারে না৷ যে ব্যক্তি মুসলমান হিসেবে বেঁচে থাকতে চায় তাকে অবশ্যই আল্লাহ ও তাঁর রসূলের সামনে আনুগত্যের শির নত করতে হবে৷ আর যে মুসলমান নয়৷ যদি সে না মানে তাহলে নিজেকে মুসলমান বলে যত জোরে গলা ফটিয়ে চিৎকার করুক না কেন আল্লাহ ও বান্দা উভয়ের দৃষ্টিতে সে মুনাফিকই গণ্য হবে৷
৬৭. এখান থেকে ৪৮ আয়াত পর্যন্তকার বিষয় বস্তু এমন সময় নাযিল হয় যখন নবী (সাঃ) হযরত যয়নবকে (রা) বিয়ে করে ফেলেছিলেন এবং একে ভিত্তি করে মুনাফিক, ইহুদী ও মুশরিকরা রসূলের বিরুদ্ধে তুমূল অপপ্রচার শুরু করে দিয়েছিল৷ এ আয়াত গুলো অধ্যায়ন করার সময় একটি কথা অবশ্যই মনে রাখতে হবে৷ যে শত্রুরা নবী (সঃ) বিরুদ্ধে ইচ্ছা করেই দুর্নাম রটাবার এবং নিজেদের অন্তরজ্বালা মিটাবার জন্য মিথ্যা, অপবাদ, গালমন্দ ও নিন্দাবাদের অভিযান চালাচ্ছিল তাদেরকে বুঝাবার উদ্দেশ্যে এগুলো বলা হয়নি৷ বরং এর আসল উদ্দেশ্য ছিল তাদের এ অভিযানের প্রভাব থেকে মুসলমানদেরকে রক্ষ করা এবং ছাড়নো সন্দেহ-সংশয় থেকে তাদেরকে সংরক্ষিত রাখা৷ একথা স্পষ্ট, আল্লাহর কালাম অস্বীকারকারীদেরকে নিশ্চিন্ত করতে পারতো না৷ এ কালাম যদি কাউকে নিশ্চিন্ত করতে পারতো, তাহলে তারা হচ্ছে এমন সব লোক যারা একে আল্লাহর কালাম বলে জানতো এবং সে হিসেবে একে মেনে চলতো৷ শত্রুদের আপত্তি কোনভাবে তাদের মনেও সন্দেহ-সংশয় এবং তাদের মস্তিষ্কেরও জটিলতা ও সংকট সৃষ্টিতে সক্ষম না হয়ে পড়ে, সম্ভাব্য সকল সন্দেহ নিরসন করেছেন অন্যদিকে মুসলমানদেরকেও এবং স্বয়ং নবী (সাঃ) কেও এ ধরনের অবস্থায় তাদের ভূমিকা কি হওয়া উচিত তা জানিয়ে দিয়েছেন৷
৬৮. এখানে যায়েদের (রা) কথা বলা হয়েছে৷ সামনের দিকে কথাটি সুস্পষ্ট করে প্রকাশ করা হয়েছে৷ তাঁর প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ কি ছিল এবং নবী (সাঃ) এর অনুগ্রহ কি ছিল? এ বিষয়টি অনুধাবন কি ছিল এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি কাহিনীটি বর্ননা করে দেয়া জরুরী মনে করছি৷ তিনি ছিলেন আসলে কালব গোত্রের হারেসা ইবনে শারাহীল নামক এক ব্যক্তির পুত্র৷ তাঁর মাতা সু'দা বিনতে সা'লাব ছিলেন তাঈ গোত্রের বনী মা'ন শাখার মেয়ে৷ তাঁর বয়স যখন আট বছর তখন তাঁর মা তার নিয়ে বাপের বাড়ি চলে যান৷ সেখানে নবী কাইন ইবনে জাসকরের লোকেরা তাদের লোকালয় আক্রমণ করে এবং লুটপাট করে যেসব লোককে নিজেদের সাথে পাকড়াও করে নিয়ে যায় তদের মধ্যে হযরত যায়েদও ছিলেন৷ তারা তায়েফের নিকটবর্তী উকাযের মেলায় নিয়ে গিয়ে তাঁকে বিক্রি করে দেয়৷ হযরত খাদীজার (রা) ভাতিজা হাকিম ইবনে হিযাম তাঁকে কিনে নিয়ে যান৷ তিনি তাঁকে মক্কায় নিয়ে এসে নিজের ফুফুর খেদমতে উপঢৌকন হিসেবে পেশ করেন৷ নবী সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে হযরত খাদীজার (রা) যখন বিয়ে হয় তখন নবী করীম (সাঃ) তার কাছে যায়েদকে দেখেন এবং তার চালচলন ও আদব কায়দা তার এত বেশী পছন্দ হয়ে যায় যে, তিনি হযরত খাদীজার (রা) কাছ থেকে তাকে চেয়ে নেন৷ এভাবে এই সৌভাগ্যবান ছেলেটি সৃষ্টির সেরা এমন এক ব্যক্তিত্বের সংস্পর্শে এসে যান যাকে কয়েক বছর পরেই মহান আল্লাহ নবীর মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করতে যাচ্ছিলেন৷ তখন হযরত যায়েদের (রা) বয়স ছিল ১৫ বছর৷ কিছুকাল পরে তার বাপ চাচা জানতে পারেন তাদের ছেলে মক্কায় আছে৷ তারা তার খোজ করতে করতে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে পৌঁছে যার৷ তারা বলেন, আপতি মুক্তিপণ হিসেবে যা নিতে চান বলুন আমরা তা আপনাকে দিতে প্রস্তুত আছি, আপনি আমাদের সন্তান আমাদের হাতে ফিরিয়ে দিন৷ নবী করীম (সা) বলেন, আমি ছেলেকে ডেকে আনছি এবং তার ইচ্ছার ওপর ছেড়ে দি‌চিছ, সে চাইলে আপনাদের সাথে চলে যেতে পারে এবং চাইলে আমার কাছে থাকতে পারে৷ যদি সে আপনাদের সাথে চলে যেতে চায় তাহলে আমি এর বিনিময়ে মুক্তি পণ হিসেবে কোন অর্থ নেবো না এবং তাকে এমনিই ছেড়ে দেবো৷ আর যদি সে আমার কাছে থাকতে চায় তাহলে আমি এমন লোক নই যে, কেউ আমার কাছে থাকতে চাইলে আমি তাকে খামখা তাড়িয়ে দেবো৷ জাববে তারা বলেন, আপনি যে কথা বলেছেন তাতো ইনসাফেরও অতিরিক্ত৷ আপনি ছেলেকে ডেকে জিজ্ঞেস করে নিন৷ নবী করীম (সা) যায়েদকে ডেকে আনেন এবং তাকে বলেন, এই দু'জন ভদ্রলোককে চেনো? যায়েদ জবাব দেন, জি হ্যাঁ, ইনি আমার পিতা এবং ইনি আমার চাচা৷ তিনি বলেন, আচ্ছা, তুমি এদেরকেও জানো এবং আমাকেও জানো৷ এখন তোমার পূর্ণ স্বাধীনতা আছে, তুমি চাইলে এদের সাথে চলে যেতে পারো এবং চাইলে আমার সাথে থেকে যাও৷ তিনি জবাব দেন, আমি আপনাকে ছেড়ে কারো কাছে যেতে চাই না৷ তার বাপ ও চাচা বলেন, যায়েদ, তুমি কি স্বাধীনতার ওপর দাসত্বকে প্রাধান্য দিচ্ছো এবং নিজের মা-বাপ ও পরিবার পরিজনকে ছেড়ে অন্যদের কাছে থাকতে চাও? তিনি জবাব দেন, আমি এ ব্যক্তির যে গুণাবলী দেখেছি তার অভিজ্ঞতা লাভ করার পর এখন আর দুনিয়ার কাউকেও তার ওপর প্রাধান্য দিতে পারি না৷ যায়েদের এ জবাব শুনে তার বাপ ও চাচা সন্তুষ্ট চিত্তে তাকে রেখে যেতে রাজি হয়ে যান৷ নবী (সাঃ) তখনই যায়েদকে আযাদ করে দেন এবং হারাম শরীফে গিয়ে কুরাইশদের সাধারণ সমাবেশে ঘোষণা করেন, আপনারা সবাই সাক্ষী থাকেন আজ থেকে যায়েদ আমার ছেলে, সে আমার উত্তরাধিকারী হবে এবং আমি তার উত্তরাধিকারী হবো৷ এ কারণে লোকেরা তাঁকে যায়েদ ইবণে মুহাম্মাদ বলতে থাকে৷ এসব নবুওয়াতের পূর্বের ঘটনা৷ তারপর যখন নবী (সা) আল্লাহর পক্ষ থেকে নবুওয়াতের মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হন তখন চারজন এমন ছিলেন যারা এক মুহূর্তের জন্যও কোন প্রকার সন্দেহ ছাড়াই তাঁর মুখে নবুওয়াতের দাবী শুনতেই তাকে নবী বলে মেনে নেন৷ তাদের একজন হযরত খাদীজা (রা), দ্বিতীয়জন হযরত যায়েদ (রা), তৃতীয় জন হযরত আলী (রা) এবং চতুর্থজন হযরত আবু বকর (রা)৷ এ সময় হযরত যায়েদের (রা) বয়স ছিল ৩০ বছর এবং নবী করীমের (সা) সাথে তার ১৫ বছর অতিবাহিত হয়ে গিয়েছিল৷ হিজরাতের পরে ৪ হিজরীতে নবী (সা) নিজের ফুফাত বোনের সাথে তার বিয়ে দিয়ে দেন৷ নিজের পক্ষ থেকে তার মোহরানা আদায় করেন এবং ঘর-সংসার গুছিয়ে নেবার জন্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রও দেন৷ এ অবস্থায় প্রতিই মহান আল্লাহ তাঁর "যার প্রতি আল্লাহ ও তুমি অনুগ্রহ করেছিল" বাক্যাংশের মধ্যে ইশারা করেছেন৷
৬৯. এটা সে সময়ের কথা যখন হযরত যায়েদ (রা) ও হযরত যয়নবের (রা) সম্পর্ক তিক্ততার চরম পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল এবং তিনি বারবার অভিযোগ করার পর শেষ পর্যন্ত নবী (সা) এর কাছে নিবেদন করেন, আমি তাকে তালাক দিতে চাই৷ হযরত যয়নব (রা) যদিও আল্লাহ ও তাঁর রসূলের হুকুম মেনে নিয়ে তাকে বিয়ে করতে রাজি হয়ে যান কিন্তু নিজের মন থেকে এ অনুভূতিটি তিনি কখনো মুছে ফেলতে পারেননি যে, যায়েদ একজন মুক্তিপ্রাপ্ত দাস, তাদের নিজোদের পরিবারের অনুগ্রহে লালিত এবং তিনি নিজে আরবের সবচেয়ে সম্ভ্রান্ত পরিবারের মেয়ে হওয়া সত্ত্বেও এ ধরনের একজন নিম্নমানের লোকের সাথে তার বিয়ে দেয়া হয়েছে৷ এ অনুভূতির কারণে দাম্পত্য জীবনে তিনি কখনো হযরত যায়েদকে নিজের সমকক্ষ ভাবেননি৷ এ কারণে উভয়ের মধ্যে তিক্ততা বেড়ে যেতে থাকে৷ এক বছরের কিছু বেশী দিন অতিবাহিত হতে না হতেই অবস্থা তালাক দেয়া পর্যন্ত পৌঁছে যায়৷
৭০. কেউ কেউ এ বাক্যটির উল্টা অর্থ গ্রহণ করেছেন এভাবে, নবী (সাঃ) নিজেই হযরত যয়নবকে (রা) বিয়ে করতে ইচ্ছুক ছিলেন এবং তাঁর মন চচ্ছিল হযরত যায়েদ তাকে তালাক দিয়ে দিক৷ কিন্তু যখন যায়েদ (রা) এসে বললেন, আমি স্ত্রীকে তালাক দিতে চাই তখন তিনি নাউযুবিল্লাহ আসল কথা মনের মধ্যে চেপে রেখে কেবলমাত্র মুখেই তাকে নিষেধ করলেন৷ একথায় আল্লাহ বলছেন, তুমি মনের মধ্যে যে কথা লুকিয়ে রাখছিলে আল্লাহ তা প্রকাশ করতে চাচ্ছিলেন৷ অথচ আসল ব্যাপারটা এর সম্পূর্ণ উল্টো ৷ যদি এ সূরার ১,২,৩,ও ৭ আয়াতের সাথে এ বাক্যটি মিলিয়ে পড় হয়, তাহলে পরিষ্কার অনুভুত হবে যে, হযরত যায়েদ ও তার স্ত্রীর মধ্যে যে সময় তিক্ততা বেড়ে যাচ্ছি সে সময়ই আল্লাহ নবী (সাঃ) কে এ মর্মে ইংগিত দিয়েছিলেন যে, যায়েদ যখন তার স্ত্রীকে তালাক দিযে দেবে তখন তোমাকে তার তালাক প্রাপ্ত স্ত্রীকে বিয়ে করতে হবে৷ কিন্তু যেহেতু আরবের সে সমাজে পালকপুত্রের তালাকপ্রাপ্ত স্ত্রীকে বিয়ে করার অর্থ কি তা নবী (সাঃ) জানতেন এবং তাও এমন এক অবস্থায় যখন মুষ্টিমেয় কিছু সংখ্যক মুসলমান ছাড় বাকি সমগ্র আরব দেশ তাঁর বিরুদ্ধে ধনুকভাঙাপণ করে বসেছিল- এ অবস্থায় তিনি এ কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হতে ইতস্তত করছিলেন৷ এ কারণে হযরত যায়েদ (রা) যখন স্ত্রীকে তালাক দেবার সংকল্প প্রকাশ করেন তখন নবী করীম (সাঃ) তাঁকে বলেন আল্লাহকে ভয় করো এবং নিজের স্ত্রীকে তালাক দিয়ো না৷ তার উদ্দেশ্য ছিল, যায়েদ যদি তালাক না দেন, তাহলে তিনি এ বিপদের মুখোমুখী হওয়া থেকে বেঁচে যাবেন৷ নয়তো যায়েদ তালাক দিলেই তাকে হুকুম পালন করতে হবে এবং তারপর তাঁর বিরুদ্ধে খিস্তি-খেউড় ও অপপ্রচারের ভয়াবহ তুফান সৃষ্টি করা হবে৷ কিন্তু মহান আল্লাহ তাঁর নবীকে উচ্চ মনোবল, দৃঢ় সংকল্প ও আল্লাহর ফায়সালায় রাজি থাকার যে উচ্চমর্যাদার আসনে দেখতে চাচ্ছিলেন সে দৃষ্টিতে নবী করীমের (সা) ইচ্ছা করে যায়েদকে তালাক থেকে বিরত রাখ নিম্নমানের কাজ বিবেচিত হয়৷ তিনি আসলে ভাবছিলেন যে, এর ফলে তিনি এমন কাজ করা থেকে বেঁচে যাবেন যাতে তাঁর দুর্নামের আশংকা ছিল৷ অথচ আল্লাহ একটি বড় উদ্দেশ্য সাধনের জন্য তাঁকে দিয়ে সে কাজটি করাতে চাচ্ছিলেন৷ ''তুমি লোক ভয় করছ অথচ আল্লাহকে ভয় করাই অধিকতর সংগত"- এ কথাগুলো পরিষ্কারভাবে এ বিষয়বস্তুর দিকে ইগিত করছে৷

ইমাম যয়নুল আবেদীন হযরত আলী ইবনে হোসাই (রা) এ আয়াতের ব্যাখ্যায় একথাই বলেছেন৷ তিনি বলেন, "আল্লাহ নবী (সাঃ) কে এই মর্মে খবর দিয়েছিলেন যে, যয়নব (রা) আপনার স্ত্রী মধ্যে শামিল হতে যাচ্ছেন৷ কিন্তু যায়েদ (রা) যখন এসে তাঁর কাছে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করলেন তখন তিনি বললেন, আল্লাহকে ভয় করো এবং নিজের স্ত্রী ত্যাগ করো না৷ এ কথায় আল্লাহ বলেলেন, আমি তোমাকে পূর্বেই জানিয়ে দিয়েছিলাম, আমি তোমাকে যয়নবের সাথে আল্লাহ যেকথা প্রকাশ করতে চান তা গোপন করছিলে৷ (ইবনে জারীর ও ইবনে কাসীর ইবনে আবী হাতেমের বরাত দিয়ে)

আল্লামা আলূসীও তাফসীর রুহল মা'আনীতে এর একই অর্থ বর্ণনা করেছেন৷ তিনি বলেন, এটি হচ্ছে শ্রেয়তর কাজ পরিত্যাগ করার জন্য ক্রোধ প্রকাশ৷ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিশ্চুপ থাকতেন অথবা যায়েদকে (রা) বলতেন, তুমি যা চাও করতে পারো, এ অবস্থায় এটিই ছিল শ্রেয়তর৷ অভিব্যক্ত ক্রোধের সারৎসার হচেছঃ তুমি কেন যায়েদকে বললে তোমার স্ত্রীকে ত্যাগ করো না? অথচ আমি তোমাকে আগেই জানিয়ে দিয়েছি যে, যয়নব তোমার স্ত্রীদের মধ্যে শামিল হবে৷"
৭১. অর্থাৎ যায়েদ (রা) যখন নিজের স্ত্রীকে তালাক দিয়ে দিলেন এবং তার ইদ্দত পুরা হয়ে গেলো৷ প্রয়োজন পূর্ণ করলো শব্দ গুলো স্বতষ্ফূর্তভাবে একথাই প্রকাশ করে যে, তাঁর কাছে যায়েদের আর কোন প্রয়োজন থাকলো না৷ কেবলমাত্র তালাক দিলেই এ অবস্থাটির সৃষ্টি হয় না৷ কারণ স্বামীর আর কোন আকর্ষণ থেকে গেলে ইদ্দতের মাঝখানে তাকে ফিরিয়ে নিতে পারে৷ আর তালাকপ্রাপ্ত স্ত্রীর গর্ভবতী হওয়া বা না হওয়ার কথা জানতে পারার মধ্যেও স্বামীর প্রয়োজন থেকে যায়৷ তাই যখন ইদ্দত খতম হয়ে যায় একমাত্র তখনই তালাকপ্রাপ্ত স্ত্রীর মধ্যে স্বামীর প্রয়োজন ফুরিয়ে যায়৷
৭২. নবী (সাঃ) নিজেই নিজের ইচ্ছায় এ বিয়ে করেননি বরং আল্লাহর হুকুমের ভিত্তিতে করেন, এ ব্যাপারে এ শব্দগুলো একবারেই সুস্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন৷
৭৩. এ শব্দগুলো একথা পরিষ্কারভাবে বর্ণনা করে যে, আল্লাহ এ কাজ নবী (সাঃ) এর মাধ্যমে এমন একটি প্রয়োজন ও উদ্দেশ্য সম্পাদনের জন্য করিয়েছিলেন যা এ পদ্ধতিতে ছাড়া অন্য কোনভাবে সম্পাদিত হতে পারতো না৷ আরবে পালক পুত্রদের সম্পর্কিত আত্মীয়তার ব্যাপারে যে সমস্ত ভ্রান্ত রসম-রেওয়াজের প্রচলন হয়ে গিয়েছিল আল্লাহর রসূল নিজে অগ্রসর হয়ে না ভাঙলে সেগুলো ভেঙে ফেলার ও উচ্ছেদ করার আর কোন পথ ছিল না৷ কাজেই আল্লাহ নিছক নবীর গৃহে আর একজন স্ত্রী বৃদ্ধি করার উদ্দেশ্যে নয় বরং একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য পূর্ণ করার জন্য এ বিয়ে করিয়েছিলেন৷
৭৪. এ শব্দগুলো থেকে একথা পরিষ্কারভবে প্রকাশিত হয় যে, অন্য মুসলমানদের জন্য তো এ ধরনের বিয়ে নিছক মুবাহ তথা অনুমোদিত কাজ কিন্তু নবী (সাঃ) জন্য এটি ছিল একটি ফরয এবং এ ফরয আল্লাহ তাঁর প্রতি আরোপ করেছিলেন৷
৭৫. অর্থাৎ নবীদের জন্য চিরকাল এ বিধান নির্ধারিত রয়েছে যে, আল্লাহর পক্ষ থেকে যে হুকুমই আসে তা কার্যকর করা তাঁদের জন্য স্থিরীকৃত কর্তব্য ৷ এ কর্তব্য পালনে বিরত থাকার কোন অবকাশ তাদের জন্য নেই৷ যখন আল্লাহ নিজের নবীর ওপর কোন কাজ ফরয করে দেন তখন সারা দুনিয়া তাঁর বিরোধিতায় উঠে পড়ে লাগলেও তাঁকে সে কাজ করতেই হয়৷
৭৬. মূল শব্দগুলো হচ্ছে, ......আরবী ........ এর দু'টি অর্থ৷ এক, প্রত্যেকটি ভয় ও বিপদের মোকাবিলায় আল্লাহই যথেষ্টে৷ দুই, হিসেব নেবার জন্য আল্লাহ যথেষ্ট৷ তাঁর ছাড়া আর কারো কাছে জবাবদিহির ভয় করার কোন প্রয়োজন নেই৷
৭৭. বিরোধীরা নবী (সাঃ) এর এ বিয়ের ব্যাপারে যেসব আপত্তি উঠাচ্ছিল এ একটি বাক্যের মাধ্যমে সেসবের মূলোচ্ছেদ করে দেয়া হয়েছে৷

তাদের প্রথম অভিযোগ ছিল, তিনি নিজের পুত্রবধূকে বিয়ে করেন, অথচ তাঁর নিজের শরীয়াতেও পুত্রের স্ত্রী পিতার জন্য হারাম৷ এর জবাবে বলা হয়েছে, "মুহাম্মাদ তোমাদের পুরুষদের কারো পিতা নন৷" অর্থাৎ যে ব্যক্তির তালাকপ্রাপ্ত স্ত্রীকে বিয়ে করা হয়েছে তিনি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহ ওয়া সাল্লামের পুত্রই ছিলেন না, কাজেই তার তালাকপ্রাপ্ত স্ত্রীকে বিয়ে করা হারাম হবে কেন? তোমরা নিজেরাই জানো মুহাম্মাদ (সাঃ) এর আদতে কোন পুত্র সন্তানই নেই৷তাদের দ্বিতীয় আপত্তি ছিল, ঠিক আছে, পালক পুত্র যদি আসল পুত্র না হয়ে থাকে তাহলেও তার তালাক প্রাপ্ত স্ত্রীকে বিয়ে করা বড় জোর বৈধই হতে পারতো কিন্তু তাকে বিয়ে করার এমন কি প্রয়োজন ছিল? এর জবাবে বলা হয়েছে, "কিন্তু তিনি আল্লাহর রসূল৷" অর্থাৎ রসূল হবার কারনে তাঁর ওপর এ দায়িত্ব ও কর্তব্য আরোপিত হয়েছিল যে তোমাদের রসম-রেওআজ যে হালাল জিনিসটিকে অযথা হারাম গণ্য করে রেখেছে সে ব্যাপারে সকল রকমের স্বার্থপ্রীতির তিনি অবসান ঘটিয়ে দেবেন এবং তার হালাল হাবার ব্যাপারে কোন প্রকার সন্দেহ-সংশয়ের অবকাশই রাখবে না৷

আবার অতিরিক্ত তাকিদ সহকারে বলা হয়েছে, "এবং তিনি শেষ নবী৷" অর্থাৎ যদি কোন আইন ও সামাজিক সংস্কার তাঁর আমলে প্রবর্তিত না হয়ে থাকে তাহলে তাঁর পরে আগমনকারী নবী তার প্রবর্তন করতে পারতেন, কিন্তু তাঁর পরে আর কোন রসূল তো দূরের কথা কোন নবীই আসবেন না৷ কাজেই তিনি নিজেই জাহেলিয়াতের এ রসমটির মুলোচ্ছেদ করে যাবেন, এটা আরো অপরিহার্য হয়ে পড়েছিল৷

এরপর আরো বেশী জোর দিয়ে বলা হয়েছে, "আল্লাহ প্রত্যেটি বিষয়ের জ্ঞান রাখেন৷" অর্থাৎ আল্লাহ জানেন, এ সময় মুহাম্মাদ (সাঃ) এর মাধ্যমে জাহেলিয়াতের এ রসমটির মুলোচ্ছেদ করা কেন জরুরী ছিল এবং এমনটি না করলে কি মহা অনর্থ হতো ৷ তিনি জানেন, এখন আর তাঁর পক্ষ থেকে কোন নবী আসবেন না, কাজেই নিজের শেষ নবীর মাধ্যমে এখন যদি তিনি এ রসমটিকে উৎখাত না করেন তাহলে এমন দ্বিতীয় আর কোন সত্তাই নেই যিনি এটি ভঙ্গ করলে সারা দুনিয়ার মুসলমানদের মধ্য থেকে চিরকালেন জন্য এটি মূলোৎপাটিত হয়ে যাবে৷ পরবর্তী সংস্কারকগণ যদি এটি ভাঙেন, তাহলে তাদের মধ্য থেকে আরো কর্মও তাঁর ইন্তিকালের পরে এমন কোন বিশ্বজনীন ও চিরন্তন কর্তৃত্বের অধিকারী হবে না যার ফলে প্রত্যেক দেশের প্রত্যেক যুগের লোকেরা তার অনুসরণ করতে থাকবে এবং তাদের মধ্য থেকে কারো ব্যক্তিত্ব ও তাঁর নিজের মধ্যে এমন কোন পবিত্রতার বাহন হবে না যার ফলে তাঁর কোন কাজ নিছক তাঁর সুন্নাত হবার কারণে মানুষের মন থেকে অপছন্দনীয়তার সকল প্রকার ধারণার মূলোচ্ছেদ করতে সক্ষম হবে৷দুঃখের বিষয়, বর্তমান যুগের একটি দল এ আয়াতটি ভুল ব্যাখ্যা করে একটি বড় ফিতনার দরোজা খুলে দিয়েছে, তাই খতমে নবুওয়াত বিষটির পূর্ণ ব্যাখ্যা এবং এ দলটির ছড়ানো বিভ্রান্তিগুলো নিরসনের জন্য আমি এ সূরার তাফসীরের শেষে একটি বিস্তারিত পরিশিষ্ট সংযোজন করে দিয়েছি৷

পরিশিষ্ট

{৭৭ টীকার সাথে সংশ্লিষ্ট}

বর্তমান যুগে একটি দল নতুন নবুওয়াতের ফিতনা সৃষ্টি করেছে৷ এর "খাতামুন নাবিয়্যীন" শব্দের অর্থ করে "নবীদের" মোহর৷ এরা বুঝাতে চায় রসূলুল্লাহর (সা) পর তার মোহরাংকিত হয়ে আরো অনেক নবী দুনিয়ায় আগমন করবেন৷ অথবা অন্য কথায় বলা যায়, যতক্ষণ পর্যন্ত কারো নবুওয়াত রসূলুল্লাহর মোহরাংকিত না হয় ততক্ষণ তিনি নবী হতে পারবেন না৷

কিন্তু "খাতামুন নাবিয়্যীন" শব্দ সম্বলিত আয়াতটি যে ঘটনা পরস্পরায় বিবৃত হয়েছে, তাকে সেই বিশেষ পরিবেশে রেখে বিচার করলে, তা থেকে এ অর্থ গ্রহণের কোন সুযোগই দেখা যায় না৷ অধিকন্তু এ অর্থ গ্রহণ করার পর এ পরিবেশে শব্দটির ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তাই বিলুপ্ত হয়ে যায় এবং বক্তব্যের আসল উদ্দেশ্যের ও পরিপন্হী হয়ে দাঁড়ায়৷ এটা কি নিতান্ত অবান্তর ও অপ্রাসংগিক কথা নয় যে, যয়নবের নিকাহর বিরুদ্ধে উত্থিত প্রতিবাদ এবং তা থেকে সৃষ্ট নানা প্রকার সংশয়- সন্দেহের জবাব দিতে দিতে হঠাৎ মাঝখানে বলে দেয়া হলোঃ মুহাম্মাদ (সা) নবীদের মোহর৷ অর্থাৎ ভবিষ্যতে যত নবী আসবেন তারা সবাই তারই মোহরাংকিত হবেন৷ আগে পিছের এ ঘটনা মাঝখানে একথাটির আকস্মিক আগমন শুধু অবান্তরই নয়, এ থেকে প্রতিবাদকারীদের জবাবে যে যুক্তি পেশ করা হচ্ছিল, তাও দূর্বল হয়ে পড়ে৷ এহেন পরিস্থিতিতে প্রতিবাদকারীদের হাতে একটা চমৎকার সুযোগ আসতো এবং তারা সহজেই বলতে পারতো যে, আপনার জীবনে যদি এ কাজটা সম্পন্ন না করতেন, তাহলে ভালই হতো, কোন বিপদের সম্ভাবনা থাকতো না, এই বদ রসমটা বিলুপ্ত করার যদি এতেই প্রয়োজন হয়ে থাকে, তাহলে আপনার পরে আপনার মোহরাংকিত হয়ে যেসব নবী আসবেন, এ কাজটা তাদের হাতেই সম্পন্ন হবে৷

উল্লেখিত দলটি শব্দটির আর একটি বিকৃত অর্থ নিয়েছেঃ "খাতামুন নাবিয়্যীন" অর্থ হলঃ "আফজালুন নাবিয়্যীন"৷ অর্থাৎ নবুওয়াতের দরজা উন্মুক্তই রয়েছে, তবে কিনা নবুওয়াত পূর্ণতা লাভ করেছে রসূলুল্লাহর ওপর৷ কিন্তু এ অর্থ গ্রহণ করতে গিয়েও পূর্বোল্লিখিত বিভ্রান্তির পুনরাবির্ভাবের হাত থেকে নিস্তার নেই৷ অগ্রপশ্চাতের সাথে এরও কোন সম্পর্ক নেই৷ বরং এটি পূর্বাপরের ঘটনা পরস্পরার সম্পূর্ণ বিপরীত অর্থবহ৷ কাফের ও মুনাফিকরা বলতে পারতোঃ "জনাব, আপনার চাইতে কম মর্যাদার হলেও আপনার পরে যখন আরো নবী আসছেন, তখন এ কাজটা না হয় তাদের ওপরই ছেড়ে দিতেন৷ এ বদ রসমটাও যে আপনাকেই মিটাতে হবে, এরই বা কি এমন আবশ্যকতা আছে"!

১. বর্ণনার ধারাবাহিকতা অনুধাবন করার জন্য এ সূরার ৬৭ থেকে ৭৯ টীকার আলোচনাও সামনে রাখা দরকার ৷

আভিধানিক অর্থ

তাহলে পূর্বাপর ঘটনাবলীর সাথে সম্পর্কের দিক দিয়ে একথা নিসন্দেহে বলা যেতে পারে যে, এখানে "খাতামুন নাবিয়্যীন" শব্দের অর্থ নবুওয়য়াতের সিলসিলার পরিসমাপ্তি ঘোষণা অর্থাৎ রসূলুল্লাহর (সা) পর আর কোন নবী আসবেন না৷ কিন্তু শুধু পূর্বাপর সম্বন্ধের দিক দিয়েই নয়, আভিধানিক অর্থের দিক দিয়েও এটিই একমাত্র সত্য৷ আরবী অভিধান এবং প্রবাদ অনুযায়ী 'খতম'; শব্দের অর্থ হলঃ মোহর লাগানো, বন্ধ করা, শেষ পর্যন্ত পৌছে যাওয়া এবং কোন কাজ শেষ করে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি লাভ করা৷

খাতামাল আমাল(.........) অর্থ হলোঃ ফারাগা মিনাল আমাল(........) অর্থাৎ কাজ শেষ করে ফেলেছে৷

খাতামাল এনায়া(.....) অর্থ হলোঃ পাত্রের মুখ বন্ধ করে দিয়েছে এবং তার ওপর মোহর লাগিয়ে দিয়েছে, যাতে করে তার ভেতর থেকে কোন জিনিস বাইরে আসতে এবং বাইরে থেকে কিছু ভেতরে যেতে না পারে৷

খাতামাল কিতাব(......) অর্থ হলোঃ পত্রের মুখ বন্ধ করে তার ওপর মোহর লাগিয়ে দিয়েছে, ফলে পত্রটি সংরক্ষিত হবে৷

খাতামা আলাল কালব(.......) অর্থ হলোঃ দিলের ওপর মোহর লাগিয়ে দিয়েছে৷ এরপর কোন কথা আর সে বুঝতে পারবে না এবং তার ভেতরের জমে থাকা কোন কথা বাইরে বেরুতে পারবে না৷

খিতামু কুল্লি মাশরুব(.....) অর্থ হলোঃ কোন পানীয় পান করার পর শেষে যে স্বাদ অনুভূত হয়৷

খাতিমাতু কুল্লি শাইয়িন আকিবাতুহু ওয়া আখিরাতুহু অর্থাৎ প্রত্যেক জিনিসের খাতিমা অর্থ হলো তার পরিণাম এবং শেষ৷

খাতামাশ শাইয়্যি বালাগা আখিরাহ(......) অর্থাৎ কোন জিনিসকে খতম করার অর্থ হলো তার শেষ পর্যন্ত পৌঁছে যাওয়া৷ খতমে কুরআন বলতে এ অর্থ গ্রহণ করা হয় এবং এ অর্থের ভিত্তিতে প্রত্যেক সূরার শেষ আয়াতকে বলা হয় 'খাওয়াতিম'৷

খাতামুল কওমে আখেরুহুম(........) অর্থাৎ খাতামুল কওম অর্থ জাতির শেষ ব্যক্তি (দ্রষ্টব্যঃ লিসানুল আরব, কামুস এবং আকারাবুল মাওয়ারিদ ৷)

এ জন্যই সমস্ত অভিধান বিশারদ এবং তাফসীরকারগণ একযোগে "খাতামুন নাবিয্যীন" শব্দের অর্থ নিয়েছেন, আখেরুন নাবিয়্যীন অর্থাৎ নবীদের শেষ৷ আরবী অভিধান এবং প্রবাদ অনুযায়ী 'খাতাম' - এর অর্থ ডাকঘরের মোহর নয়, যা চিঠির ওপর লাগিয়ে চিঠি পোষ্ট করা হয় বরং সেই মোহর যা খামের মুখে এ উদ্দেশ্যে লাগানো হয় যে, তার ভেতর থেকে কোন জিনিস বাইরে বেরুতে পারবে না এবং বাইরের কোন জিনিস ভেতরে প্রবেশ করতে পারবে না৷

১. এখানে আমি মাত্র তিনটি আভিধানের উল্লেখ করলাম ৷কিন্তু শুধু এই তিনটি অভিধানই কেন, আরবি ভাষায় যে কোন নির্ভরযোগ্য অভিধান খুলে দেখুন, সেখানে 'খতম' শব্দের উপরোল্লিখিত ব্যাখ্যাই পাবেন৷ কিন্তু 'খতমে নবুওয়াত' অস্বীকারকারীরা আল্লাহর দীনের সুরক্ষিত গৃহে সিঁদ কাটার জন্য এর আভিধানিক অর্থকে পূর্ণরূপে এড়িয়ে গেছেন৷ তারা বলতে চান, কোন ব্যক্তিকে খাতামুশ শোয়ারা খাতামুল ফোকাহা অথবা 'খাতামুল মুফাসসিরীণ' বললে এ অর্থ গ্রহণ করা হয় না যে, যাকে ঐ পদবী দেয়া হয়, তার পরে আর কোন শায়ের তথা কবি, ফকিহ অথবা মুফাসসির পয়দা হননি৷ বরং এর অর্থ এই যে, ঐ ব্যক্তির ওপরে উল্লিখিত বিদ্যা অথবা শিল্পের পূর্ণতার পরিসমাপ্তি ঘটেছে৷ অথবা কোন বস্তুকে অত্যধিক ফুটিয়ে তুলবার উদ্দেশ্যে এই ধরনের পদবী ব্যবহারের ফলে কখনো খতম-এর অভিধানিক অর্থ 'পূর্ণ' অথবা 'শ্রেষ্ঠ' হয় না এবং শেষ অর্থে এর ব্যবহার ত্রুটিপূর্ণ বলেও গণ্য হয় না৷ একমাত্র ব্যাকরণ -রীতি সম্পর্কে অজ্ঞ ব্যক্তিই এ ধরনের কথা বলতে পারেন৷ কোন ভাষারই নিয়ম এ নয় যে, কোন একটি শব্দ তার আসল অর্থের পরিবর্তে কখনো কখনো দূর সম্পর্কের অন্য কোন অর্থে ব্যবহৃত হলে সেটাই তার আসল অর্থে পরিণত হবে এবং আসল আভিধানিক অর্থে তার ব্যবহার নিষিদ্ধ হয়ে যাবে৷ আপনি যখন কোন আরবের সম্মুখে বলবেন : (-------) (জাআ খাতামুল কওম)-- তখন কখনো সে মনে করবে না যে, গোত্রের শ্রেষ্ঠ অথবা কামেল ব্যক্তি এসেছে৷ বরং সে মনে করবে যে, গোত্রের সবাই এসে গেছে, এমনকি অবশিষ্ট শেষ ব্যক্তিটি পর্যন্তও৷

এই সংগে একথাটিও সামনে রাখতে হবে যে, কোন কোন লোককে যে "খাতামুশ শো'য়ারা" "খাতামুল ফুকাহা" ও "খাতামুল মুহাদ্দিসীন" উপাধিগুলো দোয়া হয়েছে সেগুলো মানুষরাই তাদেরকে দিয়েছে৷ আর মানুষ যে ব্যক্তিকে কোন গুণের ক্ষেত্রে শেষ বলে দিচ্ছে তার পরে ঐ গুণ সম্পন্ন আর কেউ জন্মাবে কিনা তা সে কখনোই জানতে পারে না৷ তাই মানুষের কথায় এ ধরনের উপাধির অর্থ নিছক বাড়িয়ে বলা এবং শ্রেষ্ঠত্ব ও পূর্ণতার স্বীকৃতি ছাড়া আর বেশী কিছু হতে পারে না৷ কিন্তু আল্লাহ যখন কারো ব্যাপারে বলে দেন যে, অমুক গুণটি অমুক ব্যক্তি পর্যন্ত শেষ হয়ে গেছে তখন তাকে মানুষের কথার মতো উপমা বা রূপক মনে করে নেবার কোন কারণ নেই৷ আল্লাহ যদি কাউকে শেষ কবি বলে দিয়ে থাকেন তাহলে নিশ্চিন্তভাবে তারপর আর কোন কবি হতে পারে না৷ আর তিনি যাকে শেষ নবী বলে দিয়েছেন তার পরে আর কোন নবী হওয়াই অসম্ভব৷ কারণ, আল্লাহ হচ্ছেন 'আলিমুল গাইব' এবং মানুষ আলিমুল গাইব নয়৷ আল্লাহর কাউকে 'খাতামুন নাবিয়্যীন' বলে দেয়া এবং মানুষের কাউকে 'খাতামুশ শোয়ারা বা খাতামুল ফুকারা' , বলে দেয়া কেমন করে একই পর্যায়ভুক্ত হতে পারে ?

খতমে নবুওয়াত সম্পর্কে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উক্তি

পূর্বাপর সম্বন্ধ এবং আভিধানিক অর্থের দিক দিয়ে শব্দটির যে অর্থ হয়, রসূলুল্লাহর (সা) বিভিন্ন ব্যাখ্যাও তা সমর্থন করে৷ দৃষ্টান্তস্বরূপ এখানে কতিপয় অত্যন্ত নির্ভুল হাদীসের উল্লেখ করছি:

(-----------------------------)

রসূলুল্লাহ (সা) বলেনঃ বনী ইসরাঈলের নেতৃত্ব করতেন আল্লাহর রসূলগণ৷ যখন কোন নবী ইন্তেকাল করতেন, তখন অন্য কোন নবী তার স্থলাভিষিক্তি হতেন৷ কিন্তু আমার পরে কোন নবী হবে না, শুধু খলীফা৷

(.....................)

রসূলুল্লাহ (সা) বলেনঃ আমি এবং আমার পূর্ববর্তী নবীদের দৃষ্টান্ত হলো এই যে, এক ব্যক্তি একটি দালান তৈরি করলো এবং খুব সুন্দর ও শোভনীয় করে সেটি সজ্জিত করলো৷ কিন্তু তার এক কোণে একটি ইটের স্থান শূন্য ছিল৷ দালানটির চতুর্দিকে মানুষ ঘুরে ঘুরে তার সৌন্দর্য দেখে বিস্ময় প্রকাশ করছিল এবং বলছিল, "এ স্থানে একটা ইট রাখা হয়নি কেন? বস্তুত আমি সেই ইট এবং আমিই শেষ নবী"৷ (অর্থাৎ আমার আসার পর নবুওয়াতের দালান পূর্ণতা লাভ করেছে, এখন এর মধ্যে এমন কোন শূন্যস্থান নেই যাকে পূর্ণ করার জন্য আবার কোন নবীর প্রয়োজন হবে৷)

এই বক্তব্য সম্বলিত চারটি হাদীস মুসলিম শরীফে কিতাবুল ফাযায়েলের বাবু খাতামুন নাবিয়্যানে উল্লেখিত হয়েছে৷ এবং শেষ হাদীসটিতে এতোটুকু অংশ বর্ধিত হয়েছে-(..........) "অতপর আমি এলাম এবং আমি নবীদের সিলসিলা 'খতম' করে দিলাম"৷

হাদীসটি তিরমিযী শরীফে এই শব্দ সম্বলিত হয়ে 'কিতাবুল মানাকিবের বাবু ফাদলিন নবী' এবং কিতাবুল আদাবের 'বাবুল আমসালে' বর্ণিত হয়েছে৷

মুসনাদে আবু দাউদ তিয়ালাসীতে হাদীসটি জাবের ইবনে আবদুল্লাহ বর্ণিত হাদীসের সিলসিলায় উল্লেখিত হয়েছে এবং এর শেষ অংশটুকু হলো (.....) "আমার মাধ্যমে নবীদের সিলসিলা 'খতম' করা হলো"৷

মুসনাদে আহমাদে সামান্য শাব্দিক হেরফেরের সাথে এই বক্তব্য সম্বলিত হাদীস হযরত উবাই ইবনে কা'ব, হযরত আবু সাঈদ খুদরী এবং হযরত আবু হুরাইরা (রা) হতে বর্ণিত হয়েছে৷

(...............)

রসূলুল্লাহ (সা) বলেনঃ "ছ'টা ব্যাপারে অন্যান্য নবীদের ওপর আমাকে শ্রেষ্ঠত্ব দান করা হয়েছেঃ (‌১) আমাকে পূর্ণ অর্থব্যঞ্জক সংক্ষিপ্ত কথা বলার যোগ্যতা দেয়া হয়েছে৷ (২) আমাকে শক্তিমত্তা ও প্রতিপত্তি দিয়ে সাহায্য করা হয়েছে৷ (৩) যুদ্ধলব্ধ অর্থ-সম্পদ আমার জন্য হালাল করা হয়েছে৷ (৪) পৃথিবীর যমীনকে আমার জন্য মসজিদে (অর্থাৎ আমার শরীয়াতে নামায কেবল বিশেষ ইবাদাতগাহে নয়, দুনিয়ার প্রত্যেক স্থানে পড়া যেতে পারে) এবং মাটিকে পবিত্রতা অর্জনের মাধ্যমে (শুধু পানিই নয়, মাটির সাহায্যে তায়াম্মুম করেও পবিত্রতা হাসিল অর্থাৎ অজু এবং গোসলের কাজ সম্পন্ন করা যেতে পারে) পরিণত করা হয়েছে৷ (৫) সমগ্র দুনিয়ার জন্য আমাকে রসূল হিসেবে পাঠানো হয়েছে এবং (৬) আমার ওপর নবীদের সিলসিলা খতম করে দেয়া হয়েছে"৷

(,...............)

রসূলুল্লাহ (সা) বলেনঃ "রিসালাত এবং নবুওয়াতের সিলসিলা খতম করে দেয়া হয়েছে৷ আমার পর আর কোন রসূল এবং নবী আসবে না"৷

(............)

রসূলুল্লাহ (সা) বলেনঃ "আমি মুহাম্মাদ৷ আমি আহমাদ৷ আমি বিলুপ্তকারী, আমার সাহায্যে কুফরকে বিলুপ্ত করা হবে৷ আমি সমবেতকারী আমার পরে লোকদেরকে হাশরের ময়দানে সমবেত করা হবে৷ (অর্থাৎ আমার পরে শুধু কিয়ামতই বাকি আছে) আমি সবার শেষে আগমনকারী হলো সেই) যার পরে আর নবী আসবে না" ৷

(.................)

রসূলুল্লাহ (সা) বলেনঃ "আল্লাহ নিশ্চয়ই এমন কোন নবী পাঠাননি যিনি তার উম্মাতকে দাজ্জাল সম্পর্কে সতর্ক করেননি৷ (কিন্তু এখন আমিই শেষ নবী এবং তোমরা শেষ উম্মাত৷ দাজ্জাল নিসন্দেহে এখন তোমাদের মধ্যে বহির্গত হবে"৷

(............)

আবদুর রহমান ইবনে জোবায়ের বলেনঃ আমি আবদুল্লাহ ইবনে উমর ইবনে আ'সকে বলতে শুনেছি, একদিন রসূলুল্লাহ (সা) নিজের গৃহ থেকে বরে হয়ে আমাদের মধ্যে তাশরীফ আনলেন৷ তিনি এভাবে আসলেন যেন আমাদের নিকট থেকে বিদায় নিয়ে যাচ্ছেন৷ তিনি তিনবার বললেন, আমি উম্মী নবী মুহাম্মাদ৷ অতপর বললেন, আমার পর আর কোন নবী নেই৷

(......................)

রসূলুল্লাহ (সা) বলেনঃ আমার পরে আর কোন নবুওয়াত নেই৷ আছে সুবংবাদ দানকারী ঘটনাবলী ৷জিজ্ঞেস করা হলো, হে আল্লাহর রাসূল,সুসংবাদ দানকারী ঘটনাগুলো কি? জবাবে তিনি বললেনঃ ভালো স্বপ্ন৷ অথবা বললেন, কল্যাণময় স্বপ্ন৷ (অর্থাৎ আল্লাহর অহী নাযিল হবার এখন আর সম্ভাবনা নেই৷ বড়জোর এতোটুকু বলা যেতে পারে যে, আল্লাহ তায়ালার পক্ষ হতে যদি কাউকে কোন ইঙ্গিত দেয়া হয়, তাহলে শুধু ভালো স্বপ্নের মাধ্যমেই তা দেয়া হবে)৷

(..................)

রসূলুল্লাহ (সা) বলেনঃ আমার পরে যদি কোন নবী হতো, তাহলে উমর ইবনে খাত্তাব সে সৌভাগ্য লাভ করতো৷

(...................)

রসূলুল্লাহ (সা) হযরত আলীকে (রা) বলনেঃ আমার সাথে তোমার সম্পর্ক মূসারসাথে হারুনের সম্পর্কের মতো৷ কিন্তু আমার পরে আর কোন নবী নেই৷

বুখারী এবং মুসলিম তাবুক যুদ্ধের বর্ণনা প্রসংগেও এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন৷ মুসনাদে আহমাদে এই বিষয়বস্তু সম্বলিত দুটি হাদীস হযরত সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস থেকে বর্ণিত হয়েছে৷ তন্মধ্যে একটি বর্ণনার শেষাংশ হলোঃ(........) "কিন্তু আমার পরে আর কোন নবুওয়াত নেই"৷ আবু দাউদ তিয়ালাসি, ইমাম আহমাদ এবং মুহাম্মাদ ইসহাক এ সম্পর্কে যে বিস্তারিত বর্ণনা উদ্ধৃত করেছেন তা থেকে জানা যায় যে, তাবুক যুদ্ধে রওয়ানা হবার পূর্বে রসূলুল্লাহ (সা) হযরত আলীকে (রা) মদীনা তাইয়্যেবার তত্ত্বাবধান এবং রক্ষণাবেক্ষণের জন্য রেখে যাবার ফায়সালা করেন৷ এ ব্যাপারটি নিয়ে মুনাফিকরা বিভিন্ন ধরনের কথা বলতে থাকে ৷ হযরত আলী (রা) রসূলুল্লাহকে (সা) বলেন, হে আল্লাহর রসূল, আপনি কি আমাকে শিশু এবং নারীদের মধ্যে ছেড়ে যাচ্ছেন? রসূলুল্লাহ (সা) তাকে সান্তনা দিয়ে বলেছিলেন- আমার সাথে তোমার সম্পর্কতো মূসার সাথে হারুনের সম্পর্কের মতো৷ অর্থাৎ তুর পর্বতে যাবার সময় হযরত মূসা (আ) যেমন বনী ইসরাঈলদের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য হযরত হারুনকে পেছনে রেখে গিয়েছিলেন অনুরুপভাবে মদীনার হেফাজতের জন্য আমি তোমাকে পেছনে রেখে যাচ্ছি৷ কিন্তু সংগে সংগে রসূলুল্লাহ (সা) মনে এই সন্দেহও জাগে যে, হযরত হারুনের সংগে এভাবে তুলনা করার ফলে হয়তো পরে এ থেকে কোন বিভ্রান্তি সৃষ্টি হতে পারে৷ কাজেই পরমুহুর্তেই তিনি কথাটা স্পষ্ট করে দেন এই বলে যে, "আমার পর আর কোন ব্যক্তি নবী হবে না"৷

(.......................)

হযরত সাওবান বর্ণনা করেছেন যে, রসূলুল্লাহ (সা) বলেনঃ আর কথা হচ্ছে এই যে, আমার উম্মতের মধ্যে ত্রিশজন মিথ্যাবাদী হবে৷ তাদের প্রত্যেকেই নিজেকে নবী বলে দাবী করবে৷ অথচ আমার পর আর কোন নবী নেই৷

এ বিষয়বস্তু সম্বলিত আর একটি হাদীস আবু দাউদ 'কিতাবুল মালাহেমে' হযরত আবু হুরাইরা (সা) থেকে বর্ণনা করেছেন৷ তিরমিযীও হযরত সাওবান এবং হযরত আবু হুরাইরা (সা) থেকে এ হাদীস দুটি বর্ণনা করেছেন৷ দ্বিতীয় বর্ণনাটির শব্দ হলো এই-

(...............)

অর্থাৎ এমন কি ত্রিরিশ জনের মতো প্রতারক আসবে৷ তাদের মধ্য থেকে প্রত্যেকেই দাবী করবে যে, সে আল্লাহর রসূল৷

(.......................)

রসূলুল্লাহ (সা) বলেনঃ তোমাদের পূর্বে অতিবাহিত বনী ইসরাঈল জাতির মধ্যে অনেক লোক এমন ছিলেন, যাদের সংগে কথা বলা হয়েছে, অথচ তারা নবী ছিলেন না৷ আমার উম্মাতের মধ্যে যদি এমন কেউ হয়, তাহলে সে হবে উমর৷

মুসলিমে এই বিষয়বস্তু সম্বলিত যে হাদীস উল্লেখিত হয়েছে, তাতে(....) এর পরিবর্তে (..)শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে৷ কিন্তু মুকাল্লাম এবং মুহাদ্দাস শব্দ দুটি সমার্থক৷ অর্থাৎ এমন ব্যক্তি যার সংগে আল্লাহ তায়ালা কথা বলেছেন অথবা যার সাথে পর্দার পেছন থেকে কথা বলা হয়৷ এ থেকে জানা যায় যে, নবুওয়াত ছাড়াও যদি এই উম্মাতের মধ্যে কেউ আল্লাহর সাথে কথা বলার সৌভাগ্য অর্জন করতো তাহলে তিনি একমাত্র হযরত উমরই হতেন৷

(.........................)

রসূলুল্লাহ (সা) বলেনঃ আমার পরে আর কোন নবী নেই এবং আমার উম্মাতের পর আর কোন উম্মাত (অর্থাৎ কোন ভবিষ্যত নবীর উম্মাত) নেই৷

(................)

রসূলুল্লাহ (সা) বলেনঃ আমি শেষ নবী এবং আমার মসজিদ (অর্থাৎ মসজিদে নববী) শেষ মসজিদ৷

রসূলুল্লাহর (সা) নিকট থেকে বহু সাহাবী হাদীসগুলো বর্ণনা করেছেন এবং বহু মুহাদ্দিস অত্যন্ত শক্তিশালী এবং নির্ভরযোগ্য সনদসহ এগুলো উদ্ধৃত করেছেন৷ এগুলো অধ্যয়ন করার পর স্পষ্ট জানা যায় যে, রসূলুল্লাহ (সা) বিভিন্ন পরিস্থিতিতে বিভিন্নভাবে বিভিন্ন শব্দের ব্যবহার করে একথা পরিষ্কার করে দিয়েছেন যে, তিনি শেষ নবী৷ তার পর কোন নবী আসবে না৷ নবুওয়াতের সিলসিলা তার ওপর খতম হয়ে গেছে এবং তার পরে যে ব্যক্তি রসূল অথবা নবী হবার দাবী করবে, সে হবে দাজ্জাল (প্রতারক) এবং কাজ্জাব ও মিথ্যুক৷কুরআনের "খাতামুন নাবিয়্যীন" শব্দের এর চাইতে বেশী শক্তিশালী, নির্ভরযোগ্য এবং প্রামান্য ব্যাখ্যা আর কি হতে পারে! রসূলুল্লাহর বানীই এখানে চরম সনদ এবং প্রমান৷ উপরন্তু যখন তা কুরআনের একটি আয়াতের ব্যাখ্যা করে তখন আরো অধিক শক্তিশালী প্রমাণে পরিণত হয়৷ এখন প্রশ্ন হলো এই যে, মুহাম্মাদের (সা) চেয়ে বেশী কে কুরআনকে বুঝেছে এবং তার চাইতে বেশী এর ব্যাখ্যার অধিকার কার আছে? এমন কে আছে যে খতমে নবুওয়াতের অন্য কোন অর্থ বর্ণনা করবে এবং তা মেনে নেয়া তো দূরের কথা, সে দিকে ভ্রূক্ষেপ করতেও আমরা প্রস্তুত হবো?

১. খতমে নবুওয়াত অস্বীকারীরা এ হাদীস থেকে প্রমাণ করে যে, রসূলুল্লাহ (সা) যেমন তাঁর মসজিদকে শেষ মসজিদ বলেছেন, অথচ এটি শেষ মসজিদ নয়; এরপরও দুনিয়ার বেশুমার মসজিদ নির্মিত হয়েছে অনুরূপভাবে তিনি বলেছেন যে, তিনি শেষ নবী৷ এর অর্থ হলো এই যে, তাঁর পরেও নবী আসবেন৷ অবশ্য শ্রেষ্ঠত্বের দিক দিয়ে তিনি হলেন শেষ নবী এবং তাঁর মসজিদ শেষ মসজিদ৷ কিন্তু আসলে এ ধরনের বিকৃত অর্থই একথা প্রমাণ করে যে, এ লোকগুলো আল্লাহ এবং রসূলের কালামের অর্থ অনুধাবন করার যোগ্যতা হারিয়ে ফেলেছে৷ মুসলিম শরীফের যে স্থানে হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে সেখানে এ বিষয়ের সমস্ত হাদীস সম্মুখে রাখলেই একথা পরিষ্ফুট হবে যে, রসূল্লাহ (সা) তাঁর মসজিদকে শেষ মসজিদ কোন্ অর্থে বলেছেন৷ এখানে হযরত আবু হুরাইরা (রা:), হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা:) এবং হযরত মায়মুনার (রা:) যে বর্ণনা ইমাম মুসলিম উদ্ধৃত করেছেন, তাতে বলা হয়েছে, দুনিয়ার মাত্র তিনটি মসজিদ এমন রয়েছে যেগুলো সাধারণ মসজিদগুলোর ওপর শ্রেষ্ঠত্বের দাবীদার৷ সেখানে নামায পড়লে অন্যান্য মসজিদের চেয়ে হাজার গুণ বেশী সওয়াব হাসিল হয় এবং এ জন্য একমাত্র এ তিনটি মসজিদে নামায পড়ার জন্য সফর করা জায়েয৷ দুনিয়ার অবশিষ্ঠ মসজিদগুলোর মধ্যে সমস্ত মসজিদকে বাদ দিয়ে বিশেষ করে একটি সমজিদে নামায পড়বার জন্য সেদিকে সফর করা জায়েয নয়৷ এর মধ্যে মসজিদুল হারাম হলো প্রথম মসজিদ৷ হযরত ইবরাহীম (আ:) এটি বানিয়েছিলেন৷ দ্বিতীয়টি মদীনা তাইয়েবার মসজিদে নববী৷ এটি নির্মাণ করেন রসূলুল্লাহ (সা:)৷ রসূলুল্লাহ (সা:) এরশাদের অর্থ হলো এই যে, এখন যেহেতু আমার পর আর কোন নবী আসবে না, সেহেতু আমার মসজিদের পর দুনিয়ার আর চতুর্থ এমন কোন মসজিদ নির্মিত হবে না, যেখানে নামায পড়ার সওয়াব অন্যান্য মসজিদের তুলনায় বেশী হবে এবং সেখানে নামায পড়ার উদ্দেশ্যে সেদিকে সফর করা জায়েয হবে৷

২. শেষ নবুওয়াতে অবিশ্বাসীরা নবী করিমের (সা:) হাদীসের বিপরীতে হযরত আয়েশার (রা:) বলে কথিত নিম্নোক্ত বর্ণনার উদ্ধৃতি দেয় : "বল নিশ্চয়ই তিনি খাতামুন নাবিয়্যীন, একথা বলো না যে তার পর নবী নেই৷" প্রথমত নবী করিমের (সা;) সুস্পষ্ট আদেশকে অস্বীকার করার জন্য হযরত আয়েশার (রাঃ) উদ্ধৃতি দেয়া একটা ধৃস্টতা ৷ অধিকন্তু হযরত আয়েশার (রা) বলে কথিত উপরোক্ত উদ্ধৃতি মোটেই নির্ভরযোগ্য নয় ৷ হাদীস শাস্ত্রের কোন প্রমাণিক গ্রন্থেই হযরত আয়েশার (রা) উপরোক্ত উক্তির উল্লেখ নেই ৷কোন বিখ্যাত হাদীস লিপিবদ্ধকারী এ হাদীসটি লিপিবদ্ধ বা উল্লেখ করেনি ৷ উপরোক্ত হাদীসটি 'দুররি মানসূর' নামক তাফসীর এবং 'তাকমিলাহ মাজমা-উল-বিহার' নামক অপরিচিত হাদীস সংকলন থেকে নেয়া হয়েছে; কিন্তু এর উৎপত্তি বা বিশ্বস্ততা সম্বন্ধে কিছুই জানা নেই ৷ রসূল (সা)-এর সুস্পষ্ট হাদীস বর্ণনাকারীরা খুবই নির্ভরযোগ্য সূত্র ধেকে বর্ণনা করেছেন, তাকে অস্বীকার করার জন্য হযরত আয়েশার (রা) উক্তির, যা দুর্বলতম সূত্রে বর্ণিত হয়েছে ৷উল্লেখ চূড়ান্ত ধৃষ্টতা মাত্র ৷

সাহাবীদের ইজমা-

কুরআন এবং সুন্নাহর পর সাহাবায়ে কেরামের ইজমা বা মতৈক্য হলো তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়৷ সমস্ত নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক বর্ণনা থেকে প্রমাণিত হয় যে, রসূলুল্লাহর (সা) ইন্তেকালের অব্যবহিত পরেই যেসব লোক নবুওয়াতের দাবী করে এবং যারা তাদের নবুওয়াত স্বীকার করে নেয়, তাদের সবার বিরুদ্ধে সাহাবায়ে কেরাম সম্মিলিতভাবে যুদ্ধ করেছিলেন৷ এ সম্পর্কে মুসাইলামা কাজ্জাবের ব্যাপারটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য৷ সে রসূলুল্লাহর (সা) নবুওয়াত অস্বীকার করছিল না; বরং সে দাবী করেছিল যে, রসূলুল্লাহর নবুওয়াতে তাকেও অংশীদার করা হয়েছে৷ রসূলুল্লাহর ইন্তেকালের পূর্বে সে তার নিকট যে চিঠি পাঠিয়েছিল তার আসল শব্দ হলো এইঃ

(...........................)

"আল্লাহর রসূল মুসাইলামার তরফ হতে আল্লাহর রসূল মুহাম্মাদের নিকট ৷ আপনার ওপর শান্তি বর্ষিত হোক৷ আপনি জেনে রাখুন, আমাকে আপনার সাথে নবুওয়াতের কাজে শরীক করা হয়েছে৷"

এ ছাড়াও ঐতিহাসিক তাবারী একথাও বর্ণনা করেছেন যে, মুসাইলামার ওখানে যে আযান দেয়া হতো তাতে(......) শব্দাবলীও বলা হতো৷ এভাবে ষ্পষ্ট করে রিসালাতে মুহাম্মাদীকে স্বীকার করে নেবার পরও তাকে কাফের ও ইসলামী মিল্লাত বহির্ভূত বলে ঘোষণা করা হয়েছে এবং তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা হয়েছে৷ ইতিহাস থেকে একথাও প্রমাণ হয় যে, বনু হোনায়ফা সরল অন্তকরণে তার ওপর ‌ঈমান এনেছিল৷ অবশ্য তারা এই বিভ্রান্তির মধ্যে পড়েছিল যে, মুহাম্মাদ (সা) নিজেই তাকে তার নবুওয়াতের কাজে শরীক করেছেন৷ এ ছাড়াও আর একটা কথা হলো এই যে, মদীনা তাইয়্যেবা থেকে এক ব্যক্তি কুরআনের শিক্ষা গ্রহণ করেছিল এবং বনু হোনায়ফার নিকটে গিয়ে সে কুরআনের আয়াতকে মুসাইলামার নিকট অবতীর্ণ আয়াতরূপে পেশ করেছিল৷ (...............) কিন্তু এ সত্ত্বেও সাহাবায়ে কেরাম তাকে মুসলমান বলে স্বীকার করেননি এবং তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন৷ অতপর একথা বলার যুযোগ নেই যে, ইসলাম বহির্ভূত হবার কারণে সাহাবীগণ তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেননি বরং বিদ্রোহ ঘোষণা করার কারণেই তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা হয়েছিল৷ইসলামী আইনের দৃষ্টিতে বিদ্রোহী মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা হলেও তাদের যুদ্ধ বন্দীদেরকে গোলামে পরিণত করা যেতে পারে না৷ বরং শুধু মুসলমানই নয় জিম্মীও (অসুমলিম) বিদ্রোহ ঘোষণা করলে , গ্রেফতার করার পর তাকে গোলামে পরিণত করা জায়েয নয়৷ কিন্তু মুসাইলামা এবং তার অনুসারীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সময় হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা) ঘোষণা করেন যে, তাদের মেয়েদের এবং অপ্রাপ্ত বয়স্কা ছেলেদেরকে গোলাম বানানো হবে এবং গ্রেফতার করার পর দেখা গেলো, সত্যি সত্যিই তাদেরকে গোলাম বানানো হয়েছে৷ হযরত আলী (রা) তাদের মধ্য থেকেই জনৈক যুদ্ধ বন্দিনীর মালিক হন৷ এই যুদ্ধ বন্দিনীর গর্ভজাত পূত্র মুহাম্মাদ ইবনে হানাফিয়াই হলেন পরবর্তীকালে ইসলামের ইতিহাসে সবর্জন পরিচিত ব্যক্তি৷ (………………)এ থেকে একথা স্পষ্ট হয়ে যায় যে, সাহাবায়ে কেরাম যে অপরাধের কারণে তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলেন, তা কোন বিদ্রোহের অপরাধ ছিল না বরং সে অপরাধ ছিল এই যে, এক ব্যক্তি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পরে নবুওয়াতের দাবী করে এবং অন্য লোকেরা তার নবুওয়াতের ওপর ঈমান আনে৷ রসূলুল্লাহর ইন্তেকালের অব্যবহিত পরেই এই পদক্ষেপ গৃহীত হয়৷ এর নেতৃত্ব দেন হযরত আবু বকুর সিদ্দীক (রা) এবং সাহাবীদের সমগ্র দলটি একযোগে তার নেতৃত্বাধীনে এ কাজে অগ্রসর হন৷ সাহাবীদের ইজমার এর চাইতে সুস্পষ্ট দৃষ্টান্ত আর কি হতে পারে৷

উম্মাতের সমগ্র আলেম সমাজের ইজমা-

শরীয়তে সাহাবীদের ইজমার পর চতুর্থ পর্যায়ের সবচাইতে শক্তিশালী দলিল হলো সাহাবীগণের পরবর্তী কালের আলেম সমাজের ইজমা৷ এদিক দিয়ে বিচার করলে দেখা যায়, হিজরীর প্রথম শতাব্দী থেকে নিয়ে আজ পর্যন্ত প্রত্যেক যুগের এবং সমগ্র মুসলিম জাহানের প্রত্যেক এলাকার আলেম সমাজ হামেশাই এ ব্যাপারে একমত রয়েছেন যে, "মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পরে কোন ব্যক্তি নবী হতে পারে না৷ এবং তার পর যে ব্যক্তি নবুওয়াতের দাবী করবে এবং যে ব্যক্তি এই মিথ্যা দাবীকে মেনে নেবে, সে কাফের এবং মিল্লাতে ইসলামের মধ্যে তার স্থান নেই৷"

এ ব্যাপারে আমি কতিপয় প্রমাণ পেশ করছিঃ

১) ইমাম আবু হানীফার যুগে (৮০-১৫০ হি) এক ব্যক্তি নবুওয়াতের দাবী করে এবং বলেঃ "আমাকে সুযোগ দাও, আমি নবুওয়াতের সংকেত চিহ্ন পেশ করব৷"

একথা শুনে ইমাম সাহেব বলেনঃ যে ব্যক্তি এর কাছ থেকে নবুওয়াতের কোন সংকেত চিহ্ন তলব করবে সেও কাফের হয়ে যাবে৷ কেননা রসূলুল্লাহ (সা) বলেছেনঃ (.....................)"আমার পর আর কোন নবী নেই৷ "

১.হানাফিয়া নামে বনু হানাফিয়্যা গোত্রের মহিলা ৷

২) আল্লামা ইবনে জারীর তাবারী (২২৪-৩১০ হি) তাঁর বিখ্যাত কুরআনের তাফসীরে(.................) আয়াতটির বর্ণনা প্রসংগে লিখেছেনঃ(.................)"যে নবুওয়াতকে খতম করে দিয়েছে এবং তার ওপর মোহর লাগিয়ে দিয়েছে কিয়ামত পর্যন্ত এর দরজা আর কারো জন্য খুলবে না৷" (তাফসীরে ইবনে জারীর ২২ খন্ড ১২ পৃষ্ঠা৷

৩) ইমাম তাহাবী (হি ২৩৯-৩২১) তার আকীদাতুস সালাফীয়া গ্রন্থে সালাফে সালেহীন (প্রথম যুগের শ্রেষ্ঠ সৎকর্মশীলগণ) এবং বিশেষ করে ইমাম আবু হানীফা, ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মাদ রাহেমাহুমুল্লাহর আকিদা বিশ্বাস বর্ণনা প্রসংগে নবুওয়াত সম্পর্কিত এ বিশ্বাস লিপিবদ্ধ করেছেন যে, "আর মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হচ্ছেন আল্লাহর প্রিয়তম বান্দা, নির্বাচিত নবী ও পছন্দনীয় রসূল এবং শেষ নবী, মুত্তাকীদের উম্মাত, রসূলদের সরদার ও রব্বুল আলামীনের বন্ধু৷ আর তার পর নবুওয়াতের প্রত্যেকটি দাবী পথভ্রষ্টতা এবং প্রবৃত্তির লালসার বন্দেগী ছাড়া আর কিছুই নয়৷" (শারহুত তাহাবীয়া ফিল আকীদাতিস সালাফিয়া, দারুল মা‌‌আরিফ মিসর,১৫,৮৭,৯৬,৯৭,১০০ ও ১০২ পৃষ্ঠা৷

৪) আল্লামা ইবনে হাজাম আন্দালুস (৩৮৪-৪৫৬) হি) লিখেছেনঃ নিশ্চয়ই রসূলুল্লাহ ইন্তেকালের পর অহীর সিলসিলা খতম হয়ে গেছে৷ এর সপক্ষে যুক্তি এই যে, অহী আসে একমাত্র নবীর কাছে এবং মহান আল্লাহ বলেছেন, মুহাম্মাদ তোমাদের পুরুষদের মধ্যে কারো পিতা নয়৷ কিন্তু সে আল্লাহ রসূল এবং সর্বশেষ নবী (আল মুহাল্লা, প্রথম খন্ড ২৬ পৃষ্ঠা)

৫) ইমাম গাযযালী বলেন-(৪৫০-৫০৫ হি)

(...........)"যদি এ দরোজাটি (অর্থাৎ ইজমাকে প্রমাণ হিসেবে মানতে অস্বীকার করার দরোজা) খুলে দেয়া হয় তাহলে বড়ই ন্যক্কারজনক ব্যাপার হয়ে দাঁড়াবে৷ যেমন যদি কেউ বলে, আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পরে অন্য কোন নবীর আগমন অসম্ভব নয়, তাহলে তাকে কাফের বলার ব্যাপারে ইতস্তত করা যেতে পারে না৷ কিন্তু বিতর্কের সময় যে ব্যক্তি তাকে কাফের আখ্যায়িত করতে ইতস্তত করাকে অবৈধ প্রমাণ করতে চাইবে তাকে অবশ্যই ইজমার সাহায্য নিতে হবে৷ কারণ নিরেট যুক্তি দ্বারা তার অবৈধ হবার ফায়সালা করা যায় না৷ আর কুরআন ও হাদীসের বাণীর ব্যাপারে বলা যায়, এ মতে বিশ্বাসী কোন ব্যক্তি "আমার পরে আর কোন নবী নেই ৷"

এবং "নবীদের মোহর"এ উক্তি দুটির নানা রকম চুলচেরা ব্যাখ্যা করতে অক্ষম হবে না৷ সে বলবে, "খাতামুন নাবীয়্যীন "মানে হচ্ছে অতীব মর্যাদাবান নবীদের আগমন শেষ হয়ে যাওয়া৷ আর যদি বলা হয়, "নবীগণ" শব্দটি দ্বারা সাধারণভাবে সকল নবীকে বুঝানো হয়েছে, তাহলে এই সাধারণ থেকে অসাধাণ ও ব্যতিক্রমী বের করা তার জন্য মোটেই কঠিন হবে না৷ "আমার পর আর নবী নেই" এ ব্যাপারে সে বলে দেবে, "আমার পর আর রসূল নেই" একথা তো বলা হয়নি৷ রসূল ও নবীর মধ্যে পার্থক্য আছে৷ নবীর মর্যাদা রসূলের চেয়ে বেশী৷ মোটকথা এ ধরনের আজেবাজে উদ্ভট কথা অনেক বলা যেতে পারে৷ আর নিছক শাব্দিক দিক দিয়ে এ ধরনের চুলচেরা ব্যাখ্যাকে আমরা একেবারে অসম্ভব ও বলি না৷ বরং বাহ্যিক উপমার ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে আমরা এর চেয়েও দূরবর্তী সম্ভাবনার অবকাশ স্বীকার করি৷ আর এ ধরনের